বজ্রমেঘ পর্ব ৩১ (২)
ফাবিয়াহ্ মমো
ভয়ংকর ভাবে থতমত খেল শাওলিন। ওর ফোন ট্যাপড! কাজটা করেছে মিথ্যুক প্রতারক। কত বড়ো খারাপ! কত বড়ো জো-চ্চর! কিন্তু ফোনে টাইপ করতে গিয়ে দেখল আঙুলগুলো অবশ। থরথরিয়ে কাঁপছে, গলাটাও কেমন শুকিয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল দুবার। নিজেকে শান্ত বানিয়ে কিবোর্ডের বাংলা অক্ষরে বুড়ো আঙুলটা ছোটাতে লাগল,
– আপনি আমার ফোনে আড়ি পেতেছেন? দূর থেকে এইসব করে শুনছেন! কবে এই থার্ডক্লাস ঘটনাটা করেছেন বলুন!
ম্যাসেজটা পাঠিয়ে দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে দম ছাড়ল। অপেক্ষা করতে লাগল পাঁচ মিনিট। কিন্তু দশ মিনিটেও যখন উত্তর এল না তখন মনে মনে ধরেই নিল অসভ্য প্রকৃতির চরম চালাক লোকটা ওর কথার প্রত্যুত্তর দেবে না। বাইরে ক্লান্ত সন্ধ্যা ভর করছিল, সঙ্গে পাহাড়ি বন্য বাতাস। জানালার কপাট দুটো ত্রস্তগতিতে আঁটকে দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় কানে ঢুকল ‘ বিপ বিপ ‘ আওয়াজ। চকিতে হাত দুটো ছুটিয়ে ঘাড় পিছু করে তাকাল শাওলিধ। কপালে ভ্রুঁ কুঞ্চন করতে করতে বুঝল নতুন ম্যাসেজ এসেছে ফোনে, ক্লিক করতে দেখল আমেরিকান ইংরেজিতে প্রত্যুত্তর।
“Someone made a move on your phone.
I shut it down before they even got close. ”
ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে লেখাটা পড়ছিল শাওলিন, কিন্তু মাঝপথেই ঠোঁট স্থির হয়ে শ্বাসরোধ হলো! চোখে ফুটল বেমক্কা বিস্ফোরণ। কে ভয়াবহ কাজটা করতে যাচ্ছিল? মানুষটা কী… প্রশ্নটা মাথায় চিড়িক দিয়ে উঠতে ফটাফট টাইপে ফিরল শাওলিন। আঙুলগুলো এবার জড়তাহীন, সাবলীল, ত্রস্ত ভঙ্গিতে লিখে দিল,
– কাজটা কে করেছে জানেন? এটা কবের ঘটনা?
এবারও দু মিনিট বিরতি। এই দু মিনিটের ভেতর বারকয়েক নিচের ঠোঁটটা দাঁতে কামড়ে চলল। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ঠোঁট কামড়াতে থাকে প্রচণ্ড। মাঝে মাঝে ত্বক ফেটে টাটকা রক্ত চলে আসে। এখনো ব্যাপারটা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিল, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিপ্ বিপ্ মাঝপথে বাঁধা দিল,
– ‘Before that little situation. The surveillance camera in your BATHROOM . ‘
শাওলিন হাঁ হয়ে যায় লেখাটা পড়ে। মস্তিষ্কের ভেতর যেন সহস্র মৌমাছি ভোঁ ভোঁ করছে। কানে কিছু শুনছে না, চোখের পাতা পড়ছে না, কণ্ঠনালী প্রচণ্ড শুকিয়ে কাঠ। আঙুলটা বহু কষ্টে নাড়াল,
– কে ছিল?
– You know the answer. DON’T make me say it.
নাম উচ্চারণ না করেও বুঝতে পারল, ব্যক্তিটা কে ছিল। শাওলিন প্রচণ্ড ধাক্কার মতো চুপ করে রইল। এই ঘটনা চাপা পড়ে ছিল, বাথরুমের সেই গোপন ক্যামেরাটারও আগে। একটা ব্যাপার এখনো রহস্য ছাড়ল না। তাহমিদ গোপন ক্যামেরাটা কী উদ্দেশ্যে লাগিয়েছিল? শুধুই কি অশ্লীল চাহিদা পূরণ করতে? ওর মন কেন জানি এই বাক্যে সন্তুষ্ট হতে পারে না। বারবার কুয়াশার মতো পাতলা আবরণ ওর চিন্তাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ খেয়াল হলো ডান মুঠোটা কাঁপছে। ঝটকা দিয়ে ভ্রম ভেঙে ফোনে তাকাল শাওলিন, মানুষটার ইনকামিং কল। এক মুহুর্ত দ্বিধা করে কলটা কানে চেপে বলল,
– হ্যালো।
পৌরুষদীপ্ত ভারি কণ্ঠে শোয়েব বলল,
– জ্বর কমেছে?
– কমেছে।
– রেবার কথা শুনেছি বলে রাগ হচ্ছে?
সত্যটাই বলতে চাইল চটান। কিন্তু শেষমুহুর্তে থামল শাওলিন। গভীরভাবে দম টেনে সেটা আস্তে ছেড়ে বলল,
– রাগ হওয়াটাই কী স্বাভাবিক ছিল না?
প্রশ্নটা করল ঠিকই, কিন্তু ওপাশ থেকে একই সময় আরেকটি কণ্ঠ এল, ভীষণ উত্তেজিত গলায় কেউ বলছে,
– শোয়েব স্যার, স্যার… আরেকটা লাশ! এটাও বিকৃত। পচে মুখের কঙ্কাল বেরিয়ে গেছে।
কথাটা শোনার পর শোয়েব কিছু বলবে, তার আগেই আর্তনাদ করে উঠল শাওলিন,
– লাশ! কার লাশ? আপনি এখন কোথায় আছেন?
শোয়েব অপ্রস্তুত চোখে তাকাল রেঞ্জ অফিসার অতুল সাহার পানে। কলটা ভাগ্যিস ব্লু টুথ ডিভাইসে কানেক্ট। অতুল সাহা শুনতে পায়নি। শোয়েব পেশাদার কণ্ঠে অতুল সাহাকে বলল,
– অতুল, সময় কম! জায়গাটা দুই মিনিটের ভেতর ক্লিয়ার করো। নিকটবর্তী থানার ওসিকে কল দাও। ফরেনসিক টিম ডাকো। কুইক! ডু ফাস্ট!
– জ্বি স্যার। এক্ষুণি দিচ্ছি। স্যার, আপনি… আপনি কোয়ার্টারে যান। সুনীল স্যার আপনার সিকিউরিটি নিয়ে টেন্সড।
এরপর আর কথা বলা যায় না। কানে কল, সামনে অতুল, অদূরে লাশ। সবকিছু জরিপ করে শোয়েব চক্ষু ইশারায় যেতে বলে। জায়গাটা থেকে অল্প দূরে সরে কানে ডান তর্জনী চেপে বলল,
– শাওলিন, মন দিয়ে শুনবে। একদম ঘাবড়াবে না। আমি রাঙামাটিতে আছি। যেভাবে ঔষুধগুলো দিয়ে এসেছি, সেভাবে সবটা নিয়ো। তোমাকে ফ্রি হয়ে —
শাওলিন কিচ্ছু বলতে দিল না। মুখের কথা বেদম ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
– লাশটা কার? আপনি এখন কোথায় আছেন? মানে জায়গাটার নাম তো হবে? রাঙামাটি জেলার কোন —
– আমি আছি। রাঙামাটিতেই আছি।
শাওলিন থামল না,
– কোন জায়গায় আছেন!
– শাওলিন পরে কল করি।
– না বলেছি! আপনি জায়গার নাম বলুন!
এবার রাগীভাবে কথার লাগাম টানল শোয়েব। শাওলিনকে চুপ বানাতে হঠাৎ ধমকে উঠল,
– শাওলিন, চুপ!
ঝাঁকুনির মতো চমকে কেঁপে উঠল শাওলিন। একেবারে চুপ হয়ে গেল। শোয়েব বলে চলল ক্ষীপ্তভাবে,
– একদম চুপ! আর একটা কথা না। আমি ফিরব। ফেরার পর যা বলার তখন বলবে। এখন কল রাখছি।
স্পষ্ট আন্দাজ করল খবরটা শুনে ভয় পেয়েছে মেয়েটা। হয়ত ভয় পাচ্ছে তার নিরাপত্তা নিয়েই। রুক্ষ ভাবে বলাটা ঠিক হলো না জেনেও শোয়েব অটল রইল। ওপাশ থেকে মৃদু ধমক খেয়ে শাওলিন তখন শক্ত,
– ভালো থাকুন।
লাইন কেটে টুট টুট আওয়াজ শুনল শোয়েব। চোখের পাতা হতাশ ভাবে বুজে এল। কল্পনায় ভেসে উঠল প্রথম মৃতদেহ। মুখে ছিঁটেফোঁটা মাংস নেই। সাদা কঙ্কাল বেরিয়ে মাছির ঝাঁক ভনভন করছে। বুকের মাঝ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত প্রকাণ্ড হাঁ করা। ভেতরের নাড়িভুঁড়ি উথলে ওঠে, সবকিছু মাটিতে পরে আছে। মৃতদেহের নাম ফাইরুজ। সদ্য ইন্টার্ন করা নার্স। মেয়েটা নিখোঁজ ছিল এতোমাস। হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়তে অতুল সাহার আগমন। প্রথমে মৃদু গলায় ‘ স্যার ‘ ডেকে উঠলে শোয়েব পিছু তাকায়। অতুল দুহাতে কিছু একটা বাড়িয়ে ধরে বলল,
– শোয়েব স্যার, এটা পাওয়া গেছে। মারা যাবার আগে এটাই আপনার হাতে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু. . পারল না।
কথাটা বলতে যেয়ে গলা কেঁপে উঠল। অতুল সাহা ধাক্কাটা সামলাতে পারল না, জায়গাটা দ্রুত ছেড়ে অন্যত্র চলে গেল। অতুলদের প্রতিবেশি কোয়ার্টারে এই ফুটফুটে মেয়েটা থাকতো। চাচার বাড়িতে থেকে এখানকার একটি বড়ো হাসপাতালে হাসিখুশি ইন্টার্নশীপ করছিল। মেয়েটা এখন নেই . . . খুব যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেল।
শোয়েব হাতের বস্তুটার দিকে তাকাল। নাযীফের সেই হারানো ক্যামেরা! যে ক্যামেরা ফাইরুজ চুরি করেছিল। শোয়েব বুঝেছিল ফাইরুজই ওটা হাতবদল করেছে। কিন্তু ফাইরুজ কখনোই তা স্বীকার করেনি।
রাত সাড়ে আট। ফাতিমা নাজ দোর দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। পিন পড়লেও শব্দ হবে এমন নির্জন বাংলোটা। অধরা দোতলার ডানে, বারান্দা ঘেরা সুদৃশ্য ঘরে স্বামীর সঙ্গে কথা বলছে। তাহিয়া রাবেয়ার হাতে তেল দিয়ে নিচ্ছে চুলে, বাড়ির বাইরের অংশ, যেখানে ভৃত্যশ্রেণির বাসস্থান। রাবেয়া তাহিয়ার চুলে আঙুল চালিয়ে বলল,
– ভাবী, একটা কথা বলি বলি করতেছি। আপনেরে কথাটা খুইলা কই?
তাহিয়া অমত করল না। সায় জানিয়ে বলল,
– বল।
বুকে ভরসা পেয়ে চঞ্চল চোখদুটো দেখে নিল আশপাশ। বড়ো বোন রোকেয়াকে না দেখে স্বস্তির দম ছেড়ে বলল,
– রোকেয়াবুর কাছে বলিয়েন না ভাবী। কথাটা শুধু আপনেরেই বলতেছি।
বাতাসে রহস্যের গন্ধ পেয়ে তাহিয়া চোখ মেলল। কিছুটা গাঢ় কণ্ঠে বলল,
– কী কথা রে?
রাবেয়া কণ্ঠটা আরো খাদে পাঠাল,
– আপনে যে চিঠিটা খোঁজ করতাছেন, ওই চিঠিটা রোকেয়াবুর খাতার ভিতরে। বুবু ঝাড়ু দিতে গিয়া ওইটা পাইছে।
– কী বলিস! ওটা খাতার ভেতরে? খাতার ভেতরে কীভাবে গেল? আমি তো সমস্ত জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষ! চল তো রাবেয়া, খাতাটা আমাকে দেখাবি।
সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে তর্জনী চেপে ‘শশশ..’ করে রাবেয়া। তাহিয়াকে সাবধান করতে গিয়ে বলল,
– ওই খাতাটা বুবুর খাস খাতা। ওইখানে এমন কিছু লেখে, যেটা কাউরে দেখায় না।
কপাল কুঞ্চন করল তাহিয়া,
– কী লেখে? প্রেমের কপচা?
আরো ফিসফিস করে রাবেয়া,
– না ভাবী। প্রেমের না। আমি একবার খাতাটা খুইলা দেখছিলাম, ওইখানে নাম লেখা।
তাহিয়া থমকে গেল,
– নাম? কীসের নাম?
রাবেয়া আরো গলা নামিয়ে ফিসফিস করল,
– মানুষের নাম। কাদের নাম আমি জানি না। শুধু একটা নাম মনে আছে।
– কী নাম সেটা?
নামটা মনে করতে লাগল রাবেয়া,
– মনে হয় ফা… ফাই.. ফাইরুজ।
রাতটা কেটে গেল, কিন্তু তবু রাতটা শেষ হল না শাওলিনের কাছে। বারবার চোখ বুজেছে, আবার খুলেছে। বালিশে মুখ গুঁজেছে, উঠে বসেছে। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, আবার দরজার কাছে থমকে গেছে। এক মুহুর্তও কাছ ছাড়া করেনি ফোনটাকে। যখনি দূরে রেখে ওয়াশরুম বা পানি খেতে উঠেছে, তখনি ছুটে গিয়ে ফোনটা চেক করেছে। না, কল আসেনি, টেক্সট করেনি, কিচ্ছু না। যখনি চোখটা একটু লেগে এসেছে, তখনি ঝট করে উঠে গেছে। হাতে ঝড় তুলে ফোন খুঁজতে থাকত, কিন্তু ফোন হাতে পেলেও কল থাকত না। একবার, দুবার, দশবার কল দিয়েও থেমে গেছে। ‘ নেটওয়ার্ক নেই ‘ কথাটার আড়ালে কী হচ্ছে, ভাবতেও বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যেতো।
মাঝরাতে উঠে পড়ে শাওলিন। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ, আবার পানি খেয়ে আলমারি থেকে লাগেজটা খুলে ওটা বের করে। ফোনটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরোয়। অন্ধকার করিডোর, সিঁড়িতে ফোনের ফ্ল্যাশ আলো জ্বেলে নিচতলায় অফিস ঘরে ঢুকল। দরজাটা শোয়েব খোলে, সেই বন্ধ করে বেরোয়। এখন শাওলিন খুলল, ঘরটার চর্তুদিকে তাকিয়ে দরজা চাপিয়ে দিল। কাঠ ও কবজার মরচে ধরা ক্যাচ ক্যাচ শব্দে ঘরটা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। যেন বহুদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে কেউ ঢুকে পড়েছে তার সীমানায়। কোণের দিকে সাজানো টেবিল-চেয়ার। কালো গদি মোড়া রিভলভিং চেয়ারটা অদ্ভুতভাবে স্থির। শাওলিন ধীরে এগিয়ে গিয়ে আঙুল ছুঁইয়ে দিল চেয়ারে। তারপর বসে পড়ল। মনে হলো, এই চেয়ারটাতেই বসে মানুষটা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। শাওলিন ডায়েরি খোলে, টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় ফুটে ওঠে খালি পাতা। সামনে কাঠ নির্মিত ছোট্ট কলমদানি, একটা কলম তুলে মনের সমস্ত কথা, অস্থিরতা, ভয়, দুশ্চিন্তা সব লিখতে শুরু করে,
আলুটিলা জোন।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য অঞ্চল।
২১ আগস্ট, শনিবার।
এখন সময় মধ্যরাত। ঘুম আসছে না। অদ্ভুত এক অস্থিরতা মাথার ভেতরটা গুলিয়ে দিচ্ছে। যুক্তি দিয়ে যেটা বোঝার চেষ্টা করি, কোনো কিছুই ঠিকমতো ধরা দিচ্ছে না। আমার পুরোনো ডায়েরিটা নেই। সেই ডায়েরি — যেখানে কাঠগোলাপ খোদাই করা ছিল, যেখানে দাদার চিহ্ন লুকিয়ে থাকত। থাকলে হয়তো আজ এই কথাগুলো সেখানেই লিখতাম। মনে হতো, ওখানে লিখলে আমি যেন দাদাকেই বলছি।
আমার একটা মাত্র ভাই ছিল। আমার ভাইয়া।কখনোই বলতে পারিনি, দাদা, তোমায় মিস করি।বাবাকে আমি পাইনি, তুমি পেয়েছিলে। মাকে আমরা দুজনই পেয়েছিলাম, কিন্তু মা সহ্য করতে না পেরে চলে গেলেন। তুমিও কেন সেই একই নিষ্ঠুরতার মুখে পড়লে? মানুষের সবচেয়ে বড়ো দুঃখ কী জানো? কোনো মানুষ না থাকা। তার কথা শোনার মতো কেউ না থাকা। বুকের ভেতরের এই ছিঁড়ে যাওয়া অনুভূতি যদি কোনোভাবে দেখানো যেত, তাহলে হয়তো বোঝা যেত যন্ত্রণা কেমন।
কাল খুব ভয়ংকর একটা দিন ছিল। আমার জীবনে ভয়ংকর দিনের অভাব নেই। একটার পর একটা আসে, পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে, তারপর চুপচাপ হারিয়ে যায়। আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
মণি প্রথমে বলেছিলেন, আমি বড়ো হয়েছি।আঠারো বছর বয়সটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো যুবকের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। যদি বলতেই হয়, তবে মনের মতো মান্য-যোগ্য-শ্রেষ্ঠ পাত্র খুঁজে নিতে হবে। আমি এসবের কিছুই বুঝি না। আমি কেবল একটা গুটিয়ে থাকা মেয়ে। অসামাজিক, নির্জন, নিজের ভেতরেই বন্দি। ক্লাস করি, পরীক্ষা দিই, ফলাফল নিয়ে ফিরে আসি। এই পর্যন্তই আমার পৃথিবী।আমার প্রত্যাশা নেই। কুড়িতে অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই আমার বুকবাঁধা স্বপ্ন, আকাশ ছোঁয়া ইচ্ছে, রঙিন বুরুজে রাঙানো সাতরঙা ক্যানভাস — সব একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যাদের বাবা-মা নেই, জীবনে অভিভাবকের ঘরটা ফাঁকা, তাদের জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে না।
জাবিতে ঢোকার পর শ্রেষ্ঠার মতো বড়ো বোনকে পেলাম। সে-ই আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমার দুঃখগুলোকে নিঃশব্দেও কীভাবে যেন বুঝে ফেলত। আমার চোখ ওর চোখে পড়লেই শ্রেষ্ঠা গম্ভীর হয়ে বলত, “তুই কী ভাবিস জানা?” আমার নাম কিন্তু জানা না। আগের ওই ডায়েরিটায় এর কারণটা লিখেছিলাম। আজ ছোটো করে লিখি। আমার তিনটে বড়ো বড়ো নাম— শেহজানা, আলম, শাওলিন। শ্রেষ্ঠা শেহজানা নামটাকে পছন্দ করল। ওটাকে খাটো করল। ক্যাম্পাসে ওর নেত্রীসুলভ জয়ে ‘শেহজানা’ তখন ‘জানা’ হয়ে গেল। কিন্তু একটা মানুষ আমাকে অন্যভাবে ডাকল। শাওলিনকে ফার্স্ট নেম বানিয়ে ডাকতে থাকল — শাওলিন আলম।
থমকে গেল কলম। শাওলিন কোথাও যেন হারিয়ে গেল। অন্যমনষ্কতা ওকে ভাবনার দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে বন্ধ দুয়ারের ওপাড়ে ওই মানুষটিরই রাজত্ব। শোয়েব ফারশাদ। নামটা হৃদয়ের প্রতিটি কোণ ছুঁয়ে গেল। শাওলিন শিরশির করে কাঁপল। বুক মথিত হয়ে নিঃশ্বাস থমকাতে চাইল সহসা। কলম যেদিকে থেমেছিল, সেদিকে আবার চলল গতিময়তা।
“…খাগড়াছড়ি, জীবনের প্রথম ভ্রমণ আমার। পাহাড়, বনভূমি, মেঘের রাজ্য দেখাটা স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমাকে হাসতে হাসতে সেখানে টেনে নিয়ে গিয়েছে। যেখানে মণির পছন্দ করা পাত্র তাহমিদ মর্তুজার সঙ্গে বিয়েটা হতোই। কিন্তু আজ একুশ আগস্ট, এই মধ্যরাতে লিখছি — আমি কখনোই চাইনি বিয়েটা মর্তুজার সঙ্গে হোক। বিয়েটা হয়নি।
আমি যেদিন প্রথম অনুভব করেছিলাম, আমার কিছু একটা খাগড়াছড়িতে রয়ে গেছে, যা আমি সঙ্গে আনতে পারিনি, পারছি না — সেই দিনই বুঝেছি আমার চূড়ান্ত ভরসা, বিশ্বাসের জায়গা, সেই পুরুষ, যার উপস্থিতি অনুপস্থিতির মতো ছিল। যার অদৃশ্য হাত দৃশ্যমান হাত থেকেও বড়ো। যার পুরোটা আমি জানি না, কিন্তু আমার অজানাটা তার জানা।
হ্যাঁ, ভাগ্য নির্মম। আমি সঠিক সময়ে ভুল ব্যক্তির হতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সঠিক সময়ে সবচেয়ে নির্ভুল ব্যক্তির হাতে চলে গেলাম। আজ সে ডিউটিতে ব্যস্ত। এই প্রথম তার কণ্ঠ প্রফেশনাল ব্যক্তির চেয়ে পার্সোনাল ব্যক্তির মতো পেতে চাইল। যেন আমার কলটা কেন কাটল — এতে আমার সীমাহীন রাগ হয়েছে। পরে কলটা কেন দিল না — এতেও বালিকাসুলভ অভিমান হয়েছে। আমিও যে টেনশন করতে পারি, আমারও তাকে নিয়ে ভয় হয়, দুর্ভাবনা আসে — এসব কিছু একে একে অনুভব করছি। কিন্তু সুযোগ দিতে সাহস দরকার। সাহসটা এখন পাচ্ছি না। যদি তার কাছে পুরোটা সপে দিলে, সে যদি কাঁচের মতো সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে?”
এমন সময় কী একটা বিপ বিপ করে উঠল। টেবিলে মৃদু কম্পন হলো একটা। শাওলিন ঝটিতি কলম ফেলে হুড়মুড়িয়ে উঠেছে। খপ করে ফোনটা তুলেই সোজা কানে ধরল! শাওলিন এক মুহুর্তও দেরি করে না; অস্থির, ব্যাকুল, উত্তেজনাপূর্ণে বলল,
বজ্রমেঘ পর্ব ৩১
– হ্যালো?
যদি একবার নামটায় ভালোভাবে দেখতো শাওলিন, তবে বুঝতো নামটা অন্য কারোর! আশ্চর্য হয়ে ভাবতো, এই ব্যক্তি কেন কল দিল এখন? লেকচারার মিসেস স্নেহা মাহমুদ! ট্রু-কলার অ্যাপসটা যদি ওর জন্য কার্যকর হতো, তবে দেখতে পেতো রেজিঃ নাম — তাশরিফ সাগ্রত।
