বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪১
রানী আমিনা
পায়ের শব্দ পেয়ে ঝটিতি পেছনে ফিরলো সুদীর্ঘ অবয়বটি, তার স্বর্ণাভ শিকারী দৃষ্টি সরাসরি এসে পড়লো কোকোর মুখের ওপর। কোকো কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো, পা জোড়া গেঁথে গেলো যেন মাটিতে৷ মস্তিষ্ক হঠাৎই নিষ্ক্রিয় হয়ে উঠলো যেন, কোনো নির্দেশ এলো না তার থেকে। কেবল সেই স্বর্ণাভ চোখের অগ্নি দ্বীপ্তিতে স্থবির হয়ে রইলো কোকো, হয়ে রইলো অবশ, বাকরুদ্ধ!
মীর নিজের গরম পোশাকে মোড়ানো সুদীর্ঘ, প্রশস্ত শরীর নিয়ে ধীর, দৃঢ় পদক্ষেপে এসে থামলো কোকোর সামনে। তার ক্ষমতার অদৃশ্য, ভয়ানক দাপটের প্রবল প্রভাবে আপনিই নুয়ে এলো কোকোর মাথা, আনুগত্যের সাথে চোখ নামিয়ে নিলো ওই শকুনি দৃষ্টি থেকে।
“আমার শিনজো কোথায়?”
মীরের গমগমে কন্ঠস্বরে চমকে মাথা তুললো কোকো, ভীষণ বিস্ময়ে আলগা হয়ে এলো ওর অধর। পরক্ষণেই ওই ভয়াল দৃষ্টির নিরব, শীতল শাসনে নামিয়ে নিলো দৃষ্টি, শুকনো ঢোক গিলে উত্তর করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি…. আম্মা কোথায় গেছেন আমরা কেউই জানিনা। উ-উনি কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে গেছেন, কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ করেননি। আর….তাঁর সাথে যোগাযোগের কোনো উপায়ও নেই।”
কোকোর গলা কেঁপে উঠলো সামান্য, ক্ষনিক থেমে নিচু স্বরে কথার সাথে যোগ করলো,
“জঙ্গলের ভেতর… আমি আম্মার ফোনটা পেয়েছি, দু টুকরো হয়ে পড়েছিলো।”
ট্রাউজারের পকেট থেকে ছোট্ট মখমলি থলেতে মোড়ানো টুকরো দুটো দুহাতে তুলে মীরের দিকে বাড়িয়ে দিলো কোকো। মীর শীতল চোখে নীল রঙা থলেটিকে কিছুক্ষণ দেখে দু আঙুলের সাহায্যে তুলে নিলো, দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো না। কেবল ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ বাক ফুটে উঠলো তার, বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“তোকে প্রাসাদে যেতে হবে, বেইজমেন্টের নিচের প্রিজনে। জায়ান, নওয়াস দুজনেরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রবল বলে জানতে পেরেছি। আমি চাই তোরা ক’জন মিলে অবিলম্বে জায়গাটা চেক দিয়ে আয়।”
কোকো এখনো তার সম্মুখে দন্ডায়মান দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটির মুখনিঃসৃত কোনো কথাই বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখে মুখে এখনো গাঢ় হয়ে লেগে আছে বিস্ময়ের ছাপ, চারপাশে অদ্ভুত ঘোর লাগা অনুভূতি, যেন হাটতে হাটতে হঠাৎই কোনো স্বপ্নালোকে চলে এসেছে সে, যেখানে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে৷ নইলে কিভাবে….!
“সাবধানে কাজ করবি, নীচে অনেক ভয়ঙ্কর প্রাণী মুক্ত অবস্থায় আছে। ওরা হিংস্র, রক্তপিপাসু। ওদের দৃষ্টি, নাগাল থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবি। আমি আপাতত এদিকে থাকছিনা, জরুরি কিছু কাজে অন্যত্র যেতে হবে। কিন্তু যে কোনো মূল্যে আমার আপডেট চাই।”
বলে ছোট্ট কবরের ওপর থাকা লাল রঙা গোলাপটির দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে প্যান্টের পকেটে বা হাতখানা ঢুকিয়ে প্রস্থান করতে উদ্যত হলো মীর। কোকো তখনো অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে মীরের দিকে৷ মীর দুকদম এগিয়ে গিয়েও থামলো আবার, ঘাড় কাত করে কড়া গলায় বলে উঠলো,
“হয়ার্স ইয়োর ম্যানার্স?”
“ইয়েস, ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার আদেশ শিরোধার্য।”
তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে বলে উঠলো কোকো। মীর হাসলো মৃদু, ওর ঠোঁটের এহেন রহস্যময়তা কোকোর দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে গেলো।
হাঁপাতে হাঁপাতে কোকো যখন জোভীর বাসায় এসে উপস্থিত হলো তখন ব্রেকফাস্ট শেষ করে প্রায় সকলেই ঘুরতে বেরিয়েছে। ফ্যালকন আর ওকামি মিলে ডাইনিংয়ে পাঞ্জা লড়ছিলো। রেক্সাকে রেফারি পদে উন্নিত করে পাশেই একটা চেয়ার টেনে বসিয়ে রেখে দিয়েছে, সে মনোযোগী দৃষ্টিতে কার হাত কত মিলিমিটার এদিক ওদিক গিয়েছে সেটারই হিসেব কষছিলো মনে মনে।
কোকো ডাইনিংয়ের ভেতরে ছুটে এসে দুহাতে হাটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে দম ছাড়তে শুরু করলো। ওর হঠাৎ আগমনে খেলায় ভঙ্গ দিয়ে তিনজনেই কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কোকোর দিকে৷ যেনতেন কারণে যে কোকো ছুটবেনা সেটা ওদের ভালোভাবেই জানা৷
ওকামি কোকোর দিকে ঘুরে বসে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে তোর? পাগলা ষাড়ের তাড়া খাওয়ার মতো হাপাচ্ছিস কেন?”
“বার্ডি কোহ্….কোথায়?”
হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো রকমে জিজ্ঞেস করলো কোকো।
“উত্তর কোণার বড় পাইন গাছটার উপর থেকে গুনে গুনে ছ নম্বর ডালে।”
মুখস্তবিদ্যার মতোন করে নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিলো ফ্যালকন। ওর উত্তর শোনা মাত্রই সকলে ভ্রু কুচকে সন্দিহান চোখে তাকালো ওর দিকে, কোকো নিজেও হাঁফানো বাদ দিয়ে কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো ফ্যালকনের দিকে।
ফ্যালকন চুপসে গেলো, আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? তোরা এভাবে তাকাচ্ছিস কেন?”
“তুই এত পিন পয়েন্ট ডিটেইলস কিভাবে জানিস? খুব খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে দেখি!”
মুখ খানা এগিয়ে নিয়ে এসে ভ্রু তুলে বলল ওকামি। ফ্যালকন অপ্রস্তুত হেসে তোতলানো স্বরে বলল,
“আরেহ্… মানে… আমরা আমরাই তো! ওয় এখন আমাদের গ্রুপের না..?
কি আজব, তোদেরকে ইনফর্মেশন দিলেও এখন সমস্যা দেখি!”
শেষে এসে রেগে গেলো ফ্যালকন।
“তোদের এসব বালের আলাপ রাখবি? ওদিকে ডিজাস্টার হতে চলেছে!”
খেকিয়ে উঠে বলল কোকো। ধমক খেয়ে চুপ হয়ে গেলো ওরা সকলেই। আগ্রহী চোখে তাকিয়ে রইলো কি হয়েছে জানার জন্য। কোকো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,
“হিজ ম্যাজেস্টির সমস্তই স্মরণে এসেছে। একটু আগেই আমার সাথে দেখা হয়েছিলো তাঁর, ওদিকের অর্কিড বাগানে, শেহজাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে আমার কাছে আম্মার খোঁজ জানতে চাইলেন, এবং আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, আম্মাকে তিনি ‘শিনজো’ বলে সম্বোধন করেছেন।
আমি কোনো রকমে পরিস্থিতি সামলে বলেছি, আমরা কেউই আম্মার ব্যাপারে কিছু জানিনা, যাওয়ার আগে তিনি কাউকেই কিছু জানাননি।
আম্মার ভাঙা ফোনের দুই টুকরো, যেটা বার্ডি কুড়িয়ে এনেছিলো সেটাও হিজ ম্যাজেস্টির হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু….!”
এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে থেমে ঢোক গিললো কোকো, বসলো পাশের চেয়ার টেনে৷ অন্যরা কিন্তু’র পরের অংশ শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলো।
“কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টি কিভাবে….. কিভাবে তার সব স্মরণে এলো সেটাই বুঝতে পারছিনা। সেদিনও তিনি কিছুই জানতেন না, আম্মাকে নূর বলে সম্বোধন করতেন। তবে?”
মেঝের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল কোকো। ফ্যালকন চুপ করে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে এক প্রকার লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
“লাইফ ট্রি কি মানুষের ট্রিটমেন্ট করার ক্ষমতা রাখে? তোরা জানিস?”
“হ, মোটামুটি খুব ক্রিটিক্যাল কেইস না হলে সেটা মানুষকে হ্যিল করার ক্ষমতা রাখে। কেন?”
ভাবুক ভঙ্গিতে কথা গুলো বলে প্রশ্ন করলো কোকো। ফ্যালকনের চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো, উত্তেজনায় চেয়ার ঠেলে নিয়ে কাছাকাছি এগিয়ে এসে সে বলল,
“তোমার মনে আছে? আমরা যেদিন ট্রি হাউজ থেকে আম্মার জিনিসপত্র লরিতে তুলছিলাম, তুমি আগে চলে গেছিলে, আমি বলছিলাম আমি পরে আসবো?”
“হু….”
“সেদিন এখান থেকে যাওয়ার সময় আমি হিজ ম্যাজেস্টি কে ট্রি হাউজের দিকে আসতে দেখে লুকিয়ে পড়ি৷ উনি এদিকে শেহজাদীকে খুঁজতে এসেছিলেন খুব সম্ভবত। ট্রি হাউজে না পেয়ে উনি হাটতে হাটতে লাইফ ট্রির দিকে চলে যান৷
এমনও তো হতে পারে ওইদিনই লাইফ ট্রি হিজ ম্যাজেস্টিকে হ্যিল করে দিয়েছে! হয়তো তিনি লাইফট্রির সংস্পর্শে গিয়েছিলেন আর লাইফট্রি তার যাবতীয় শারীরিক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে!”
কোকো চিন্তিত মুখে ভাবলো কিছুক্ষণ, ক্ষনিক পরেই তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,
“বার্ডিকে খবর দে, আম্মাকে এখনি জানাতে হবে।”
কিমালেবের অগণিত পাহাড়-শ্রেণির আড়ালে লুকিয়ে থাকা, জনপদ হতে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন, আনাবিয়ার ‘মুনহল্যো’ নামকরণ কৃত সুগভীর খাদটির ঢাল বেয়ে নামতেই চতুর্দিক হতে জেঁকে ধরে এক অদ্ভুত নীরবতা, শব্দ বলতে কেবল দূর হতে ভেসে আসে একটানা পানির কলকল ধ্বনি।
খাদের গভীরতা যতই বাড়ে ততই বদলাতে শুরু করে আলোর রঙ। উপরের আকাশ হয়ে ওঠে ফিকে, অচেনা, জাদুকরী আভায় ভরে ওঠে চারপাশ।
পাহাড়সারির চূড়ায় জমা মেঘ যেখানে থেমে গেছে, ঠিক তার নিচেই বিশাল খাদ তৈরি করে নিয়েছে নিজের এক আলাদা পৃথিবী। মেঘসীমার ঠিক নিচেই খাদের উপরাংশ জুড়ে ভেসে আছে ছোট ছোট তুলোর পেজার মতোন মেঘের সারি। দ্বিপের ভেতর থেকেও দ্বীপ হতে সম্পুর্ন আলাদা, নিজস্ব জলবায়ু ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সে যুগের পর যুগ!
পেজা পেজা তুলোর মতোন মেঘের রাজ্য হতে নিচে নামতেই দেখা মেলে এক আশ্চর্য জগতের, যেন অন্য কোনো গ্রহের কোলে হারিয়ে যাওয়া এক খণ্ড স্বপ্নরাজ্য।
খাদের বুক জুড়ে অর্ধচন্দ্র আকৃতির এক বিস্তৃত লেক, স্বচ্ছ পানির ওপর গোধুলির আলো প্রতিফলিত হয়ে রূপ নিয়েছে আগুন ঝরা আলোক স্রোতে! লেকের তলদেশে থাকা শৈবালের ঝাক গুলো ছড়িয়ে চলেছে নীলাভ আলোকরশ্মি, ঢেউয়ের তালে তালে নীলচে আলো এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ন্যায় বালুকাময় তীরে! স্বচ্ছ পানির বুকে ফুটে থাকা নীল রঙা পদ্ম গুলো ঢেউয়ের তালে দুলে চলেছে বারংবার। লেকের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল এল্ম গাছের সারি।
লেকের ধার হতে কিছু দূরেই লতাগুল্মে ঘেরা এক কাঠের তৈরি চোখ ধাধানো দোতলা অট্টালিকা। ওপর তলার প্রশস্ত বারান্দা জুড়ে আনুভূমিকভাবে অর্ধ চন্দ্রের আকৃতিতে ঝুলে আছে সাদা আর গোলাপ রঙা বুনোফুলের সারি সারি লতা। লতার ভেতর ছোট্ট একটি নকশাদার কাঠের প্যানেলে খোদাই করে লেখা ‘মুনহল্যো ম্যানর’।
মোটা মোটা, গোলগাল, স্বাস্থবান, পালিশ করা কাঠগুলো চকচক করছে গোধুলি লগ্নের লালচে আলোর ছোয়ায়। নকশাদার চওড়া স্তম্ভ আর দেয়াল গুলোতে জড়িয়ে আছে মাটি ফুড়ে উঠে আসা লতা-পাতার ঝাঁক, অফ হোয়াইটের বুকে মেরুণ রঙের ছোয়া দেওয়া ফুল ফুটে আছে সেগুলোতে। ছাদের চতুর্দিক হতে ঝুলে আছে ল্যাভেন্ডার আর সাদা রঙের উইস্টেরিয়ার ঝাড়ের মিশেল।
খাদের সেই স্বপ্নালোকের এক কোণে, লেকের ধারের নরম ঘাসের উপর স্ত্রেলকার পেটে শরীর এলিয়ে শুয়ে আছে স্বল্পবসনা আনাবিয়া, মুখের ওপর ধরা একখানা বই, মলাটের ওপর বড় বড় করে লেখা ‘টেস অব ডার্বাভিলজ’।
তুষার শুভ্র চুল গুলো ছড়িয়ে আছে স্ত্রেলকার সফেদ শরীরের ওপর। গোধুলির রাঙা আলোয় লালচে দ্যুতি ছড়িয়ে ঝিকিমিকি করছে ওর রেশমী কেশগুচ্ছ। হীরের মতোন দীপ্ত চোখ জোড়ার মনোযোগী দৃষ্টি ঘুরে চলেছে বইয়ের পাতার সমান্তরাল মসীমাখা লেখা গুলোতে।
এক ঝাঁক লাল সাদা রঙে মাখা গোলগাল খরগোশের মতোন প্রানী ঘুরে চলেছে ওর আশেপাশে, কয়েকটা এসে বসেছে ওর উন্মুক্ত ঊরু ঘেঁষে, উষ্ণ শরীর থেকে তাপাহোরনের নিমিত্তে৷
ছোট্ট ছোট্ট এক দল রাস্টি বিড়াল ঘুরে ঘুরে ছুটে চলেছে লেকের ধার ঘেঁষে, শুভ্র গা জুড়ে ওদের চিতার মতোন কালো রঙা ফোটা৷ লায়রা মিশে গেছে ওদের সাথে, সেও ম্যাও ম্যাও ধ্বনিতে লাফিতে খেলে বেড়াচ্ছে ওদের সাথে।
লায়রা কে মেনে নিলেও ফক্সি কে ওরা প্রথমে মেনে নিতে চায়নি একদমই। পরে লায়রার সাথে তাদের ঘন্টাখানেক মিটিং হয়েছে, ফক্সি পুরোটা সময় আনাবিয়ার চুলের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেছে ওদের এই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং।
মিটিংয়ে লায়রা জয়ী হয়েছে বোধ হয়, কারণ মিটিং শেষ হতেই ফক্সি কে ওরা ওদের দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে৷ লায়রার সাথে সাথে এখন সেও নেচে চলেছে ওদের পেছন পেছন।
আনাবিয়া কিছুক্ষণ পর পর বই থেকে মুখ তুলে দেখছে ওদের। কোথাও আবার আঘাত টাঘাত না লেগে বসে নাচতে নাচতে৷
স্ত্রেলকা ঘুমে কাঁদা। কিছুক্ষণ আগে লেকের পাশের একাংশের ঘাস সাবাড় করে ফেলেছে একাই, খেয়ে পরে আর নড়তে পারে না। আনাবিয়া টানাটানি করে এনে এখানে বসিয়েছিলো, বসতে বসতে সে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে৷
আনাবিয়া উঠে বসলো, গোধুলির আলো শরীরে লাগানোর জন্য পোশাক কমিয়ে শুধুই অন্তর্বাস আর তার ওপর একটা সাদা শার্ট চড়িয়ে দিয়েছিলো। সূর্য ডুবে গেছে, শীত লাগতে শুরু করেছে এখন ওর।
ম্যানরের দিকে কয়েক পা এগোতেই আকাশ থেকে ভেসে এলো কোনো বাজ পাখির তীক্ষ্ণ আর্তস্বর। চকিতে আকাশপানে তাকালো আনাবিয়া, তুলোর মতো মেঘে ফুড়ে বিদ্যুৎ গতিতে ছুরির ফলার মতোন প্রবেশ করলো বার্ডি। মাটিতে নেমেই নিজের হিউম্যান ফর্মে ফিরে এলো সে। পরক্ষণেই বড় দম ছেড়ে মাথা নুইয়ে বলে উঠলো,
“শেহজাদী… হিজ ম্যাজেস্টির সব কিছু স্মরণে এসেছে…!”
আনাবিয়া চমকালো, কিন্তু সেটা ওর চেহারায় ফুটলো না। স্থীর হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে বলল,
“খুলে বলো।”
বার্ডি সকাল বেলা কোকোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো একে একে বিস্তারিত বর্ণনা দিলো। আনাবিয়া শুনে গেলো চুপচাপ, মীরের বলা প্রতিটা কথা যেন ওর কানে এসে বাড়ি খেলো সেই চিরচেনা গমগমে স্বরে। শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেলো ওর, সেটা হিমশীতল বাতাসের ছোয়ায় নাকি মীরের এই বিস্তৃত, নীরব, শক্তিশালী প্রভাবে তা বুঝলো না আনাবিয়া।
সমস্ত বলা শেষে আনত মুখে আনাবিয়ার পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় বার্ডি দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। আনাবিয়া শুধোলো,
“প্রাসাদে কে কে যাচ্ছে? সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা?”
“জ্বি শেহজাদী। কোকো ভাইজান কাঞ্জি আর লিও ভাইজানকে সাথে নিবেন বলছিলেন, অন্যদেরকে প্রয়োজন হলে ডেকে নিবেন। ফ্যালকন এবং আমি বাইরে থাকবে, কোনো অসুবিধা বুঝলে যেন তাদের সতর্ক করতে পারি তার জন্য৷”
“এখুনি শিরো মিদোরিতে ফিরে যাও, ওদের বলো আমি আসছি। ওদের তিনজনের জন্য সেখানে একা যাওয়া একদমই নিরাপদ নয়। সেখানের প্রাণী গুলো তোমাদের ধারণার চাইতেও বেশি ভয়ঙ্কর৷ ওরা দেমিয়ান ব্যাতিত অন্য কারো পরোয়া করে না। আমি এদিকটা সামলেই বেরিয়ে পড়বো। তুমি আগেই চলে যাও।”
“আপনার যেমন আদেশ, শেহজাদী।”
আনাবিয়া দ্রুত পায়ে ম্যানরের দিকে এগোলো, বার্ডিও নিজের বার্ড ফর্মে ফিরে যেতে নিচ্ছিলো, আনাবিয়া হঠাৎ থেমে গিয়ে পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“খাওয়া হয়েছে তোমার দুপুরে?”
বার্ডি শুকনো মুখে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
“না, শেহজাদী।”
“ভেতরে এসো, খেয়ে যাবে৷”
বার্ডির চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কৃতজ্ঞতায়৷
আনাবিয়া এগোলো আবার ভেতরের দিকে, ওর পেছন পেছন নত মুখে মিষ্টি হেসে এগোলো বার্ডি, শেহজাদীর হাতের সুস্বাদু খাবারের লোভে পেটের ক্ষিধে টা দিগুণ হয়ে মোচড়ানো শুরু করে দিলো তৎক্ষনাৎ৷
মধ্যরাত,
আকাশে অর্ধেক চাঁদ ঝলমল করছে, হালকা নীলাভ আলোতে ছেয়ে আছে রেড জোন জঙ্গল। শীতল বাতাসে সড়সড় শব্দ করে চলেছে গাছের শুকনো পাতা গুলো।
কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে ক্রমশ, চারদিক ঝাপসা হয়ে আছে। দূর হতে কানে আসছে জঙ্গলের ভেতরকার ঝর্ণাটির ঝমঝম শব্দ। শীতের কারণে পানি স্বল্পতা হলেও ঝমঝমানি কমেনি তার৷ চারদিক থেকে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে শেয়াল আর নেকড়ের আর্ত কন্ঠস্বর।
পরিত্যাক্ত ট্রি হাউজের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় বসে আছে ওরা কজন, আনাবিয়ার অপেক্ষায়৷ চাপা স্বরে আলোচনা করে চলেছে নিজেদের ভেতরে৷
“গার্ড দের অবস্থান কি খুব বেশিই পরিবর্তন হয়েছে?”
জিজ্ঞেস করলো কোকো। ফ্যালকন একটা বিস্কিট তুলে তাতে এক কামড় দিয়ে বলল,
“উহুম, শুধু গার্ডের সংখ্যা একটু বেড়েছে। প্রাসাদে ঢোকার পথে আরও জনা দশেক গার্ড বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর বেজমেন্টের প্রিজনে যাওয়া গেলেও লোয়ার প্রিজনের এনট্রেন্সে ডার্ক প্যালেসের মতোন লক সিস্টেম করে দেওয়া হয়েছে৷ দেমিয়ান সদস্য ব্যাতিত খুলবে না। শেহজাদী আমাদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভালোই হয়েছে আমাদের, নইলে আমাদের আর কিছুই করা হতো না।”
বিস্কুট টুকু পানি দিয়ে গিলে নিয়ে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে এক টানে ঠোঁট মুছে নিয়ে ফ্যালকন আবার বলল,
“রাত একটার দিকে গার্ড বদল হয়, একদল যায় একদল আসে, ওই সময়ে ওদের ব্রেক টাইম, তখন শুধু পাঁচ জন একসাথে প্যাট্রোল করে, ওইটাই সুযোগ, প্রাচীর টপকে চলে যাওয়া যাবে। তা ছাড়া প্রাসাদের ইনভিজিবল বর্ডারে আমাদের আটকাবে না, আমাদের ইনফর্মেশন সেখানে আগে থেকেই সেট করা আছে, যদিনা শেহজাদা ইলহানের লোকজন আমাদের ইনফর্মেশন সরিয়ে দিয়ে থাকে তো৷ আমি এখনি একবার ওদের ওয়েবসাইট ক্রাক করে দেখে নিতে পারবো, যদি আমাদের ইনফর্মেশন অ্যাড করা না থাকে তবে আবার অ্যাড ও করতে পারবো। কিন্তু সময় লাগবে।
আর এই সময়ের ভেতরে যদি ওরা টের পায় কেউ ওদের সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে তবে সাথে সাথেই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ওরা আমাদের ধরে ফেলবে৷ এবং একবার ধরে ফেললে আমাদের টা-ই হ্যাক হয়ে যাবে। আর কখনো ফেরত পাবোনা, সুতরাং রিস্ক আছে।”
একটানা কথা গুলো বলে আরেকটা বিস্কুট মুখে পুরে চিবোতে শুরু করলো ফ্যালকন। জোভীর বাড়িতে খাওয়া দাওয়া ওদের তেমন ভালো হচ্ছে না, তার ওপর সকাল থেকে এদিক সেদিক দৌড় ঝাপ করতে গিয়ে ভালো মতো খাওয়া হয়নি কারো। এখন সকলে শুকনো খাবার গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে চলেছে৷ কোকো তো চিবোনোর সময় টুকু পাচ্ছে না।
বার্ডি আনাবিয়ার হাতের রান্না খেয়ে এসেছে শোনার পর থেকে কেউ ওর সাথে কথা বলছে না। বার্ডি তাতে একটুও কষ্ট পাচ্ছে না, বরং ওর মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে, শালা গুলো এতদিন শেহজাদীর আদর যত্ন পেয়েছে, এখন সময় ওর অনুকূলে।
“সবই তো হলো, কিন্তু আমরা বেরোবো কোন দিক দিয়ে?”
চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলো লিও, কোকো তিনখানা বিস্কুট একবারে মুখে পুরে চিবোচ্ছিলো, হাত উঁচিয়ে বলবে বলবে করে বিস্কিট গুলো গুলির বেগে চিবিয়ে গিলে ফেলে বলল,
“সেটা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর৷ আমি লোয়ার প্রিজনে জীবনে দুই/তিন বার গিয়েছি, সেটাও হিজ ম্যাজেস্টির পেছন পেছন৷ তবে কোনো ভয়ানক প্রাণি দেখিনি। সেগুলোকে হয়তো আরও গভীরে রাখা৷
হিজ ম্যাজেস্টি বলেছিলেন ভেতরের দিকে একটা সিক্রেট রুট আছে বাইরে বেরোনোর। ওই রুট সোজা রেড জোনের ভেতর দিয়ে ঘেউল দের আস্তানায় পৌছায়। রাস্তাটা ঘেউল দের ওইদিকে দেওয়া হয়েছে কারণ, কোনো আসামী ওই রাস্তা দিয়ে পালিয়ে গিয়েও বাঁচতে পারবেনা, ঘেউলে খেয়ে ফেলবে, কিন্তু দেমিয়ান দের কোনো সমস্যা নেই।”
“এই দেমিয়ান দের কত বুদ্ধি!”
এতক্ষণ বিস্ময়ে হা হয়ে এদের আলোচনা শুনতে শুনতে মন্তব্য করলো বার্ডি। কিন্তু ওর কথায় কেউ পাত্তা দিলোনা, শোনেইনি এমন ভাব করে নিজেদের ভেতর কথা চালিয়ে যেতে লাগলো। বার্ডি মুখ বাকিয়ে অন্য দিকে ফিরে বসে রইলো।
“এখন যদি আমরা ধরা না পড়ে ভালোয় ভালোয় ভেতর টা দেখে আসতে পারি, আর জায়ান সাদী, নওয়াস জাবিনের খোঁজ পেয়ে যাই তবে আবার এই রুট দিয়েই ফিরে আসবো। কারণ ওই সিক্রেট রুট নিরাপদ নয়, সেখানে অনেক ভয়ানক প্রাণী ছেড়ে দেওয়া আছে, সাপ বেশি। ব্লাক মাম্বা, কিং কোবরা, রাসেল্স ভাইপার ছাড়াও নানা রকমের ভাইপারের ঝাঁকের কারণে মাটিতে পা দেওয়া যাবে না বোধ হয়! এখন…. আমি শিওর জানিনা, ওদিকে আমি কখনো যাইনি, হিজ ম্যাজেস্টিও যেতে দেন নি।
তবে… যদি আমাদের উপস্থিতির ব্যাপারে গার্ডরা জেনে যায় তবে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তবে যেহেতু আম্মা থাকবে সাথে সেহেতু নো টেনশন। আম্মা আছে মানে আমরা এক্কেরে ফিট অ্যান্ড ফাইন থাকবো।”
“তবে বাইক নিয়ে ওকামি দের কোন দিকে অপেক্ষা করতে বলবো?”
জিজ্ঞেস করলো ফ্যালকন। কোকো উত্তর দিলো,
“ওদেরকে মেইন এনট্রেন্সের দিকেই থাকতে বলে দিবি। সব কিছু ঠিক থাকলে আমরা আবার এদিকেই ফিরে আসবো। আর যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তবে তোদের জানিয়ে দিবো, তোরা ওদেরকে ঘেউল এরিয়াতে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলবি৷ আর, তুই আর বার্ডি তো থাকবিই বাইরে, কোথাও কোনো অ্যাবনর্মালিটি দেখা মাত্রই আমাদেরকে ইনফর্ম করবি।
আর হ্যাঁ, যদি বেশি বিপদ বুঝি তবে আমরা ভাগ হয়ে যাবো। জায়ান সাদীদেরকে পাওয়া যদি যায় তবে লিও কাঞ্জির সাথে ওদিক থেকে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে আমি আম্মার সাথে থাকবো। আমরা মেইন এনট্রেন্স দিয়েই বেরোনোর চেষ্টা করবো। ধরা পড়লেও ক্ষতি নেই, আম্মা আছেন তো!”
ওদের কথার মাঝেই বাইরের মাটিতে শব্দ হলো বিকট, কেঁপে উঠলো মাটি। বার্ডি ভয়ে চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে গিয়ে ঢুকে পড়লো ফ্যালকনের কোলের ভেতর৷ বাকিরা সকলেই রইলো নির্বিকার। ফ্যালকন ভীষণ রকম অপ্রস্তুত হয়ে একবার কোকোর দিকে তো আরেকবার লিও কাঞ্জির দিকে তাকাতে লাগলো।
লিও কাঞ্জি দুজনে মিলে দুষ্টু ইশারা করতে শুরু করলো ফ্যালকনকে, ফ্যালকন অভিযোগের ভঙ্গিতে অসহায় চোখে তাকালো কোকোর দিকে। কিন্তু কোকো ক্ষেপে আছে বার্ডির ওপর।
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪০
কেন ওই বজ্জাত মেয়ে তার আম্মার হাতের সুস্বাদু খানা খেয়ে এলো, আর সে এইখানে বসে বসে শুকনো বিস্কুট পানি দিয়ে গিলে খাচ্ছে এই রাগে কোকো কিছু দেখতে চাইছে না।
ফ্যালকন নিজের দুই হাতের তর্জনী দুইটা দিয়ে বার্ডিকে নিজের ওপর থেকে গুতিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে ইতস্তত করে বলল,
“উঠে বসো বার্ডি, সব ঠিক আছে এখানে, ভয়ের কোনো কারণ নেই, শেহজাদী এসেছেন।”
