বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৪
রানী আমিনা
নিজের লিসনিং ডিভাইসে বুলেটের অনবরত শব্দ আর বার্ডির আর্তচিৎকার শোনা মাত্রই থমকে গেলো রেড উড গাছের মগডালে বসে থাকা ফ্যালকন। ক্ষণিকের জন্য অসাড় হয়ে এলো ওর মস্তিস্ক, এই মুহুর্তে ঠিক কি করণীয় সেটা ঠাহর করতে ব্যর্থ হলো সে।
পরমুহূর্তে সম্বিত ফিরে পেতেই ভয়ে শঙ্কায় বিপর্যস্ত হয়ে রেড উড থেকে লাফিয়ে নেমে উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটে চলল সে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। ছুটতে ছুটে লিসনিং ডিভাইসে বারংবার ডেকে চলল,
“বার্ডি, বার্ডি তুমি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? বার্ডি….. রেসপন্স করো! বার্ডি…!”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলোনা।
ফ্যালকন উর্ধশ্বাসে ছুটে চলল, ওপাশ থেকে হাইনা ওকামি সকলে বার বার করে মানা করলো তাকে এদিকে ভুলেও না আসতে। কিন্তু সে শুনলোনা কারো কথা, ছোটা বাদ দিয়ে এবার ডানায় ভর দিয়ে প্রাণপণে উড়ে চলল যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দ্যেশ্যে। অশ্রু সিক্ত চোখের পরে ভেসে উঠলো বার্ডির বোকা বোকা চেহারাখানা, যাতে সর্বক্ষণ লেগে থাকে একটু আদর, একটু ভালোবাসা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা!
ডুকরে কেঁদে উঠলো ফ্যালকন। যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর গিয়ে চারদিকে সন্ধানী চোখে তাকিয়ে কয়েক পাক দিতেই চোখে পড়লো এক কোণে হিউম্যান ফর্মে পড়ে আছে বার্ডি, তার চতুর্দিকে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা ঘিরে রেখে উল্লাস করে চলেছে।
ফ্যালকনকে দেখা মাত্রই হাইনা আর আলফাদ মিলে দূর থেকে সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করতেই দলছুট হয়ে গেলো তারা, তারপর আবার দল বেধে নেমে পড়লো যুদ্ধে। হাইনারা তাদের প্রলুব্ধ করে সরিয়ে নিয়ে গেলো অন্যদিকে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ফ্যালকন তখনি নেমে পড়লো সেখানে, ছুটে গিয়ে আগলে নিলো বার্ডিকে, যেন পৃথিবীর সকল বিপদ হতে তাকে লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা! আতঙ্কিত, কাতর চোখে দেখলো বার্ডির তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়া, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকা নোনা জল। বুকে দুটো বুলেটের গভীর ক্ষত, কোমরের কাছে আরেকটা, রক্ত বইছে নদীর স্রোতের মতোন।
ফ্যালকন ওকে দুহাতে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে নিরাপদ স্থানে নিতে নিতে অস্থির হয়ে আর্তনাদের সুরে বলে উঠলো,
“এই কে বলেছিলো তোমাকে এখানে আসতে! হ্যাঁ? কেন এসেছো তুমি এখানে? তোমাকে না বলেছিলাম ওয়ার জোন থেকে দূরে থাকতে? কথা শুনোনা কেন?”
কোলাহল থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে ফ্যালকন হাত চাপা দিলো বার্ডির আঘাতপ্রাপ্ত স্থান গুলোতে, কিভাবে রক্ত বন্ধ করবে, কিভাবে কি করবে বুঝতে পারলোনা। লিসনিং ডিভাইসে লিন্ডাকে কানেক্ট করে কান্না জড়ানো আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“লিন্ডা, বার্ডি ভীষণ আহত হয়েছে, বুলেট লেগেছে তিনটে। তুই যত দ্রুত সম্ভব প্রাসাদের পূর্ব দিকে চলে আয় বোন! ওকে টানাটানি করলে রক্ত বেশি ঝরছে, দ্রুত আয় একটু!”
লিন্ডা ওপাশ থেকে ‘এখনি আসছি’ বলতেই ফ্যালকন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বার্ডির চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ব্যাকুল, ব্যাস্ত গলায় বলে উঠলো,
“লিন্ডা এখুনি চলে আসবে, তুমি চিন্তা কোরোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু সহ্য করে নাও কিছুক্ষণ!”
বার্ডি চোখ ঘুরিয়ে দেখলো ওকে, বিড়বিড়িয়ে বলতে চাইলো কিছু। ফ্যালকন মাথাটা এগিয়ে নিয়ে গেলো শুনতে, কি বলতে চাইছে সে। মনোযোগ দিয়ে শুনতেই কানে এলো বার্ডির অস্পষ্ট উচ্চারিত শব্দ,
“পানি…..”
“আম্-আমি এখুনি নিয়ে আসছি৷ তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি যাবো আর আসবো। ঠিক আছে?”
ফ্যালকন হন্তদন্ত হয়ে যেতে নিলো, কিন্তু তার শার্টের এক কোণা বার্ডির হাতে মুষ্টিবদ্ধ, প্রাণপণে আকঁড়ে ধরে রেখেছে! ফ্যালকন যাওয়া থামিয়ে কাছাকাছি এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ে শুধলো,
“আমি যাবোনা?”
বার্ডি ক্লান্ত ভাবে দুদিকে মাথা নাড়ালো সামান্য, ফ্যালকন দুহাতে ওর মুখখানা আগলে নিয়ে শুধোলো,
“পানি খাবেনা তুমি?”
বার্ডি প্রতিউত্তরে বলল না কিছুই, চোখ জোড়া বেয়ে শুধুই উপচে পড়লো পানি। শ্বাস ফেলতে রইলো জোরে জোরে৷ অবস্থা বেগতিক দেখে ফ্যালকন সিদ্ধান্ত নিলো ওকে কোলে তুলে এগিয়ে যাওয়ার৷ তড়িঘড়ি উঠে বার্ডিকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে অসহায় ভাবে বলে উঠলো,
“আরেকটু কষ্ট করো, আমার কোলে চড়ো! আমরা রেড জোনে ফিরে যাবো, লিন্ডা আর ফাতমা মিলে তোমাকে সারিয়ে তুলবে। তারপর আর কোনো কষ্ট হবে না!”
ফ্যালকন সন্তর্পণে বার্ডির পাতলা শরীরের উপরাংশ ধরে বসিয়ে দিলো, হাত রাখলো পিঠের ওপর৷ হাতে গরম তরল অনুভূত হতেই চমকালো সে৷ বার্ডিকে নিজের বুকে ঠেস দিয়ে ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে তাকাতেই দেখলো পিঠের ওপর ঠিক বুকের মতোনই দুটি ছিদ্র! বুলেট এফোড় ওফোড় করে দিয়েছে তার অবুঝ বুকটাকে! স্রোতের মতোন রক্ত বেরিয়ে চলেছে সে স্থান হতে, রক্তে ভিজে উঠছে মাটি।
দুঃসহ শঙ্কায়, ত্রাসে হতভম্ব হয়ে সেদিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইলো ফ্যালকন। তড়িঘড়ি নিজের বুক থেকে বার্ডিকে সরিয়ে ওর ফ্যাকাসে চেহারা, বন্ধ হয়ে যেতে চাওয়া চোখ জোড়া দেখতেই বুকের ভেতর সব ভেঙেচুরে যেতে রইলো যেন!
অস্থির হয়ে দ্রুত বেগে বার্ডিকে কোলে তুলে নিলো ফ্যালকন, তারপর জঙ্গল হয়ে মসভেইলের দিকে উর্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে লিন্ডার সাথে লিসনিং ডিভাইস কানেক্ট করেই ভেজা গলায় চিৎকার করে বলে উঠলো,
“লিন্ডা, আমার বার্ডি মরে যাচ্ছে রে, পানি খাবে ও, ওর জন্য একটু পানি নিয়ে আয়!”
লিন্ডা ফাতমাকে সাথে করে মাত্রই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে বের হয়েছিলো প্রাসাদের পূর্ব দিকের উদ্দ্যেশ্যে। ফ্যালকনের কথা শোনা মাত্রই ফাতমার কাছে সমস্ত বুঝিয়ে দিয়ে ওকে দ্রুত এগোতে বলে সে আবার ছুটলো পানি নিতে।
লাইফট্রির চারপাশ সুনসান, রাত নামলো মাত্র। দূর হতে এখনো ভেসে আসছে যুদ্ধের দামামা। রেক্সা বসে আছে দুরুদুরু বুকে, কোলের ওপর তার কোকোর নিঃসাড় দেহ। শ্বাস পড়ছে ধীর গতিতে। কত ঘন্টা হতে চলল হিসেব নেই তার। লিন্ডা সেই যে চলে গেলো, প্রায় ঘন্টা দুই হতে চলল, এখনো তার ফেরার নাম গন্ধ নেই! বার্ডির কি কিছু হলো?
এলোমেলো চিন্তাতে ভারী হয়ে আসছে রেক্সার মস্তিষ্ক। কোলের ওপর ঘুমন্ত কোকোর চেহারাটা প্রচন্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে, গায়ের চাপা রঙ আরও চাপা হয়ে গেছে যেন। শরীর প্রচন্ড গরম, জ্বর এসে গেছে এরই ভেতর।
চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে, কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে তার। লাইফট্রি সেই যে স্থীর হয়েছে, তার আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। ভেতরে জ্বলে আছে এক অদ্ভুত আলো, বাকল চিরে বেরিয়ে আসছে আলোর ক্ষীণ চ্ছটা।
ধূ ধূ নিরবতার ভেতরেই হঠাৎ রেক্সার কানে এলো শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি, যেন কারা সন্তর্পণে হাটছে পাতার ওপর দিয়ে। আঁতকে উঠে শব্দের উৎসের দিকে তাকালো রেক্সা। অন্ধকারে তেমন কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না তার, এক ভৌতিক আবহাওয়া যেন বিরাজ করছে তার আশপাশ জুড়ে।
কোকোকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে জবুথবু হয়ে বসে রইলো রেক্সা, সতর্ক চোখে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। বিপদ আসলে সে কি করবে? সে তো ট্রান্সফর্ম হতে পারেনা! হিউম্যান ফর্ম লাভ করার পর কখনোই হয়নি। শেহজাদা ইলহানের কড়া মানা ছিলো তার ওপর, এসব জংলী পনা তিনি সহ্য করতেন না।
কোকো কতবার চেষ্টা করেছে তাকে দিয়ে ট্রান্সফর্ম করানোর, কিন্তু তার ভয় করে৷ ভয় করে ওই যন্ত্রণাটার, যা বয়ে যায় তার মেরুদণ্ড বয়ে, ট্রান্সফর্ম হতে গিয়েও প্রতিবার ওই তীব্র যন্ত্রণায় থেমে যায় সে। কোকো অভয় দিয়ে কতবার বলেছে যে কিছুই হবে না, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারেনি!
বিপদ আসলে আজ কি হবে? শেহজাদী আদেশ করে গেছেন কোকোকে যেন কোনোভাবেই এইখান হতে না সরানো হয়। চাইলেও সে এই স্থান হতে চলে যেতে পারছে না, কোকোকে এখানে একা ফেলে সে কিভাবে যাবে? কিন্তু ভয় করে তো…!
সেই মুহুর্তে আবারও কানে এলো শুকনো পাতার ওপর পা ফেলানোর শব্দ। দ্রুতই আবার পেছনে তাকাতেই নিজের পেছনে জনা দশেক বন্দুকধারীকে দেখামাত্রই ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো রেক্সা।
বন্দুকধারীদের একজন এগিয়ে এসে রেক্সার চুল মুঠি করে ধরে হ্যাচকা টেনে সরিয়ে নিলো কোকোর নিকট থেকে, তারপর মাটিতে টেনে হিঁচড়ে জঙ্গলের ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে শাসানো গলায় বলে উঠলো,
“একদম আওয়াজ করবিনা জংলী মা*, কথা বললে তোকেও ওর সাথে কতল করে রেখে দিবো। বাঁচতে চাইলে চুপ থাকবি, তোকে খাওয়া শেষে ছেড়ে দিবো।”
বলে খিকখিক করে নোংরা হাসলো সে৷ বাকিরা রেক্সার এলোমেলো পোশাকের ভেতর দিয়ে ওর উন্মুক্ত ঊরুদ্বয়ের দিকে লোভাতুর চোখে চেয়ে বাকা হেসে মাটিতে পড়ে থাকা কোকোর দিকে মনোযোগ দিলো।
রেক্সা ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে চলল সমানে! দূর হতে চোখে বাধলো কোকোকে ঘিরে ফেলছে ওরা। রেক্সা উচ্চস্বরে কেঁদে বলে উঠলো,
“ওকে কিছু কোরোনা! ওর একটা হাত নিয়ে নিয়েছো তোমরা, আর কি চাই তোমাদের? ছেড়ে দাও ওকে….. ওকে মেরোনা! ওকে বাঁচতে দাও!”
রেক্সাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া লোকটি কষে একটি থাপ্পড় মারলো ওর মুখে, মুহুর্তেই কেটে গেলো রেক্সার ঠোঁটের কোণা। তবুও সে কান্নাভেজা চোখে অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলো কোকোর দিকে।
জেগে থাকতে যার ধারে কাছেও কেউ ঘেঁষতে চাইতোনা, যার সামনে ভয়ে কেউ দাঁড়াতে চাইতোনা, আজ সে সামান্য চোখ বোজা মাত্রই সকলে হামলে পড়েছে! এতটা অবহেলা তাকে? এতটা অসম্মান? এখন কি আর সে নিছকই কোকো আছে? সে এখন আর্মি চিফ কোকো, সে এখন শুধুমাত্র শেহজাদীর আদরের, রেড জোনের ভয়ানক কোকো তো নয়! রেক্সা হঠাৎই ক্রোধে লাল হয়ে উঠলো, জোর গলায় বলে উঠলো,
“কাপুরুষের দল! একজন হাতহীন, জ্ঞানহীন মানুষকে এতগুলো অমানুষ মিলে মারতে লজ্জা করে না? সাহস থাকে তো সে সজ্ঞানে থাকা অবস্থায় তার সামনে গিয়ে দাঁড়াস! একটাকেও আর এই দুনিয়ার মুখ দেখতে হবে না!”
বন্দুকধারীদের কজন রেক্সাকে আটকানো লোকটিকে উদ্দ্যেশ্য করে ধমকে বলে উঠলো,
“কি হচ্ছে আর্থার, একটা মেয়ের মুখ বন্ধ করতে পারিস না? কি বাল পারিস তুই?”
আর্থার লোকটির আঁতে ঘা লাগলো যেন। রেক্সাকে সর্বশক্তি দিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে, গলা চেপে ধরে সে হিংস্র গলায় বলে উঠলো,
“এই মা* তোকে না বলেছি চুপ থাকবি? এত কথা বলিস কেন?”
রেক্সা দাঁতে দাঁত চেপে ধ্বংসাত্মক চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। আর্থার রেক্সার এমন চাহনি দেখে বলে উঠলো,
“চোখ নামা বলছি, নইলে আঙুল দিয়ে তোর চোখ গেলে দেবো।”
রেক্সা চোখ নামালোনা, উপরন্তু আরও হিংস্র হলো তার চাহনি। তখনি কেউ একজন বন্দুক উঁচু করে তাক করলো কোকোর দিকে। আর সেই মুহুর্তেই কোনো এক জাদুবলে ভীষণ গর্জন দিয়ে ঘুরে উঠে এক বিশাল ক্রোকোডাইলে পরিণত হলো রেক্সা। আজ সে পরোয়া করলোনা কোনো যন্ত্রণার, কোনো ভীতির!
সৈন্যদের কোনো ধারণাই ছিলোনা যে এই মেয়েটাও একটা কুমির, সেটাও সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল! ওরা ভেবেছিলো এটা বোধ হয় কোকোদের সাথে থাকা বিল্লিটা।
রেক্সা অপেক্ষা করলো না এক মুহুর্তও, তৎক্ষনাৎ নিজের বিরাট শরীর, আর শক্তিশালী দাঁতের আক্রমণে ছিড়ে ফেললো আর্থারের দেহ। আর্থার চিৎকার করার সুযোগটুকু পর্যন্ত পেলোনা।
সৈন্যদের কয়েকজন ছুটে গেলো রেক্সাকে ঠেকাতে। বাকিরা কোকোর দিকে বন্দুকতাক করে ট্রিগার চাপার আগেই হঠাৎ নড়ে উঠলো লাইফট্রি। ভয় পেয়ে ছুটে পিছিয়ে গেলো ওরা তৎক্ষনাৎ, কিন্তু দূরে গিয়েও ওরা বন্দুক তাক করে রইলো কোকোকে শেষ করার জন্য৷
কিন্তু সেই মুহুর্তেই খুলে গেলো লাইফট্রির দরজা, তার ভেতর হতে ঠিকরে পড়তে রইলো উজ্জ্বল সাদা আলোচ্ছটা। আলোর ঝলকানিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকা দুষ্কর হলো সৈন্যদের জন্য, চোখ কুচকে কোকোকে নিশানা করার চেষ্টা করতে রইলো তারা। কিন্তু তীব্র আলোকের কারণে ব্যর্থ হলো।
সেই চোখ ধাধানো আলোকবর্তিকার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কিছু একটা। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য রাখার আগেই রেক্সা এসে হামলে পড়লো তাদের ওপর৷ সৈন্যরা দিকবিদিকশুন্য হয়ে গুলি ছোড়া শুরু করলো একের পর এক, কিন্তু রেক্সার পুরু চামড়া ভেদ করে তা ঠিক জুৎ করতে পারলো বলে মনে হলোনা, উলটো আরও হিংস্র করে তুললো তাকে।
রেক্সা ওদেরকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো কোকোর থেকে, কোকোকে আগলে দাঁড়িয়ে এক চাপা হিংস্র গর্জন ছাড়লো সে সৈন্যদের উদ্দ্যেশ্যে। কিন্তু তারা হার মানার পাত্র নয়, ইযান হাসেমি নিজেই এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাদের ওপর, আজ তাকে কোনোভাবেই অসন্তুষ্ট করা চলে না৷ যেভাবেই হোক কোকোকে তাদের শেষ করতেই হবে!
কিন্তু তার জন্য এই মেয়েটাকে শেষ করা জরুরি, নইলে কোকো পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের ভালোই বেগ পেতে হবে৷ একে অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে একই ভাবনাতে পৌঁছেই তারা শুরু করলো উপর্যুপরি গুলি বর্ষণ, যেন তা রেক্সাকে ছাপিয়ে কোকোকেও আঘাত করে। কিন্তু রেক্সা যে তা কোনো ভাবেই হতে দিবেনা৷
নিজের বিরাট শরীর নিয়ে তেড়ে এলো সে সৈন্যদের দিকে, কিন্তু রেক্সাকে আসতে দেখে মুহুর্তেই জায়গা হতে সরে দাঁড়ালো তারা, তবুও থামালো না গুলি বর্ষণ। চারদিক থেকে রেক্সা কে ঘিরে ফেলে তারা রেক্সাকেই প্রথমে মেরে ফেলতে চাইলো। রেক্সা এত এত বুলেটের আঘাতে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে রইলো। শরীরের স্পর্শকাতর স্থান গুলোতে সহজেই বুলেট গেঁথে গেলো তার৷
যন্ত্রণায় পিছিয়ে গেলো রেক্সা, তাকে পেছাতে দেখে সৈন্যরাও এগিয়ে গেলো সামনে। পেছাতে পেছাতে রেক্সা কোকোর কাছাকাছি এসে যখনই কোকোর শরীরের ওপর উঠতে গেলো, তখনি টের পেলো সেখানে কোকো নেই!
বার্ডি অচেতন, চোখের পাতায় ক্ষণে ক্ষণে কাঁপুনি লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ ফাতমা প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছে তার রক্ত বন্ধ করার, কিন্তু এ স্রোত যেন আজ কোনো ভাবেই থামার নয়, বয়েই চলেছে, নিরন্তর…..!
ফাতমার চোখ জোড়া ভেজা, প্রবল জোরে কান্না চাপিয়ে রেখেছে সে। লিন্ডা মাটিতে আশাহতের ন্যায় বসে আছে, চোখে তার শূন্যতা। এখন কিভাবে, কোথায়, কার কাছে নিবে ওরা বার্ডিকে? কার কাছে নিলে তাকে সুস্থ করা যাবে? কার কাছে নিলে রক্তের এই অসীম স্রোত থামবে?
ফ্যালকন বসে আছে বার্ডির মাথাটা কোলের পরে নিয়ে, মুখখানা প্রচন্ড ফ্যাকাসে। ব্রায়ানকে খবর পাঠানো হয়েছে, সে এখুনি এসে পৌছবে হয়তো।
ব্রায়ান বলে দিয়েছে বার্ডিকে যেন জাগিয়ে রাখা হয়, সে যেন কোনো ভাবেই চেতনা না হারায়। ফ্যালকন তাই অসহায়, ব্যাকুল হয়ে বার বার ডেকে চলেছে বার্ডিকে, চোয়ালে আলতো চাপড় দিয়ে চলেছে ক্ষণে ক্ষণে।
কিছুক্ষণ পরেই শার্লট আর ব্রায়ান এসে উপস্থিত হলো সেখানে, হাতে ওদের স্ট্রেচার। ব্রায়ান এসে দ্রুতই পরীক্ষা করলো বার্ডিকে। বুক থেকে কাপড় ছিড়ে ব্রায়ান কিছুক্ষণ খেয়াল করে দেখেই বলল,
“বুলেট প্রোব্যাবলি হৃৎপিণ্ডের পাশ ঘেঁষে গেছে, তাই রক্ত বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো হৃৎপিণ্ডে সামান্য ক্ষতও হয়েছে, তবে সেটা হয়তো গভীর নয়। গভীর ক্ষত হলে এতক্ষণ বার্ডি বেঁচে থাকতো না৷ ওর এখন ইমিডিয়েট অপারেশন প্রয়োজন, নইলে ওকে বাঁচানো ইম্পসিবল হবে। ওকে স্ট্রেচারে ওঠাও দ্রুত।”
“কিন্তু ওকে আমরা কোথায় নিবো?”
অসহায় ভাবে জিজ্ঞেস করলো ফাতমা। ব্রায়ান আর লিন্ডা মিলে বার্ডিকে সন্তর্পণে স্ট্রেচারে তুলছিলো, ফাতমার প্রশ্নে ব্রায়ান উত্তর করলো,
“অ্যানিম্যাল টাউনে যে হসপিটালটি আছে সেখানেই নিবো। ওখানে যে যন্ত্রপাতি আছে তাতেই হয়ে যাবে৷ সেখানে একজন সার্জন আছেন, যদিও তিনি কার্ডিও সার্জন নন, জেনারেল সার্জন। কিন্তু আপাতত কাজ চালিয়ে নিতে পারলেই হবে, পরবর্তীতে যতদ্রুত সম্ভব ওকে কার্ডিও সার্জনের নিকট নিতে হবে৷”
জঙ্গল বয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে সকলে মিলে। ব্রায়ান সকলের সামনে, স্ট্রেচারের অগ্রভাগ ধরর আছে সে। অন্য অংশ লিন্ডার হাতে৷
মানসিক ভাবে ফ্যালকন এখন সম্পুর্ন বিধ্বস্ত, এই অল্প সময়েই যেন এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে। বুঝতে শেখার পর, যেদিন ওর প্রাণপ্রিয় শেহজাদী হারিয়ে যান, সেদিনের কষ্টই ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত! আজকের তীব্র যন্ত্রণা অবিরাম তাকে সেই পুরোনো দিনটির স্মৃতিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে!
সেদিন যেমন তার বুকটা শূন্যতায় ভরে গিয়েছিলো, মনে হয়েছিলো এই জগতে সে নিঃসঙ্গ, একা! এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে তার আর কেউ রইলোনা— আজও সেই একই অনুভূতি গ্রাস করেছে তাকে। যেন আর কেউ নেই…… কেউ নেই!
কিছুদূর যেতেই বার্ডি হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলো, আচমকা জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করলো সে। ঘাড় ঘুরিয়ে অসহায় ভাবে তাকাতে রইলো চতুর্দিকে। কালবিলম্ব না করে ব্রায়ান তড়িঘড়ি নামিয়ে দিলো ওকে মাটিতে, ফ্যালকন তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে ছুটে এলো তার কাছে, দুহাতে আলতো করে বার্ডির মুখখানা ধরে কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলো,
“কি হচ্ছে তোমার? কষ্ট হচ্ছে? এইতো আরেকটু, আরেকটু সহ্য করো বার্ডি, আমরা এসে গেছি প্রায়৷”
বার্ডি চোখ বড় বড় করে তাকালো ওর দিকে, স্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
“পানি…..!”
পানি লিন্ডার কাছেই ছিলো, তখন বার্ডির চেতনা লুপ্ত হওয়ায় পানি খেতে পারেনি আর। ফ্যালকন দ্রুতই ওর হাত থেকে বোতল নিয়ে মুখ খুলে বার্ডির মাথাখানা সামান্য উঁচু করে পানি খাওয়াতে গেলো। পানির ফোটা ঠোঁট স্পর্শ করার ঠিক আগ মুহুর্তে স্থীর হয়ে গেলো বার্ডি, বিস্ফোরিত চোখ জোড়া তখনো পানি পানের তীব্র আকাঙ্খায় আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফ্যালকনের দিকে৷ পানির যে ফোটা গুলো পড়লো তার মুখপরে সেগুলো আর পৌছোলো না তার গালে, মেটাতে পারলো না তার আজন্ম তৃষ্ণা, আর কখনো হয়তো এই তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব হবে না!
ফ্যালকন পানির বোতল হাতে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো বার্ডির সুস্থির চোখ জোড়াতে। কেমন বোকাবোকা করে তাকিয়ে আছে যেন এখনো, যেন এখুনি জিজ্ঞেস করবে কোনো বোকা বোকা প্রশ্ন, যা শুনে হাসবে ওরা সবাই!
ফ্যালকন কাঁপা হাতে আলতো করে চাপড় দিলো বার্ডির চোয়ালে, কোনো অনুভূতি ফুটে উঠলো না তাতে। ফ্যালকন ঝুঁকে এসে অস্ফুট স্বরে ডাকলো, বলল,
“বার্ডি….. পানি খাবেনা তুমি?
যুদ্ধ শেষ হলে তোমাকে বর্ডার ঘুরিয়ে দেখাবো বলেছিলাম না……! তুমি একবার কথা বলে দেখো, তোমাকে আমি সমস্ত পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাবো…… বিশ্বাস করো….! বলবে না কথা….? ”
বার্ডির থেকে কোনো উত্তর এলোনা। ফ্যালকন কিছুক্ষণ ওর নিষ্পাপ চোখ জোড়ার দিকে চেয়ে নিজের কাঁপা হাত বুলিয়ে দিলো চোখের ওপর, মুহুর্তেই চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো চোখ জোড়া। আর সেই মুহুর্তেই জঙ্গল কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো ফ্যালকন!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৩
লিন্ডা মুখে হাত চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো তৎক্ষনাৎ! ফাতমা নিষ্পলকে চেয়ে রইলো বার্ডির নিথর মুখের দিকে, শার্লট পাংশু মুখে ফাতমার ওপর ছেড়ে দিলো নিজের ভর, আশাহতের ন্যায় বসে রইলো দুজনে।
ব্রায়ান মাটির ওপর বসে রইলো চুপচাপ, চোখ জোড়া রইলো আকাশের দিকে। সকলের অগোচরে টুপ করে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো তার চোখ থেকেও।
