Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭
রানী আমিনা

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঝড়ের গতিতে এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে সুপার কারটি, আনাবিয়ার দৃঢ়, মনোযোগী দৃষ্টি রাস্তার ওপর নিবদ্ধ। পাশের সিটে ইলহান দু হাতে সর্ব শক্তি দিয়ে গাড়ির সিট আকড়ে ধরে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। শরীরের নানা স্থান হতে রক্ত ছুটছে তার, মাথার ভেতর চক্কর দিচ্ছে, যে কোনো সময়েই হয়তো জ্ঞান হারাবে সে!

তাড়াহুড়োয় সিট বেল্ট পরার মতোন সময় হয়নি তার, আর এই মেয়ে যে গতিতে গাড়ি সামনে টেনে চলেছে তাতে একটু এদিক ওদিক হলেই ইলহান ছিটকে বেরিয়ে যাবে গাড়ি থেকে।
ঘাড় ঘুরিয়ে তড়িতে এক পলক পেছনে তাকালো ইলহান, দূর রাস্তাতে ছুটে আসছে মীর; পাগলা, ক্ষ্যাপা ষাড়ের মতোন দেখাচ্ছে তাকে।
আনাবিয়া হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ঘন ঝোপঝাড়ের দিকে চালিয়ে দিলো গাড়ি, দৃষ্টি রাস্তার ওপর রেখেই নিজের ডান হাত খানা বাড়িয়ে দিলো পেছনের দিকে। মুহুর্তে পেছনে ফেলে আসা ঝোপঝাড় গুলো বেড়ে উঠে আঁটকে দিলো পথ, ঘন কুয়াশায় হঠাৎ আবৃত হয়ে উঠলো সম্পুর্ন এরিয়াটা। তৎক্ষনাৎ চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে পড়লো আনাবিয়া, ছুটে গাড়ির অন্যপাশে গিয়ে ইলহানকেও টেনে বের করলো সাথে সাথে।
ইলহান কোনো উচ্চবাচ্য করার সময় পাচ্ছে না। যা হচ্ছে সবকিছু আতঙ্ক, বিস্ময় নিয়ে দেখে চলেছে সে৷ আনাবিয়া ইলহানের বাহুখানা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে ডাক পাড়লো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“স্ত্রেলকা….!”
স্ত্রেলকা তখুনি নেমে পড়লো সেখানে, আনাবিয়া দ্রুত ইলহানকে স্ত্রেলকার পিঠে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে বসলো। পরক্ষণেই জঙ্গলের উঁচু গাছপালার আড়াল দিয়ে তড়িতে উড়াল দিলো আকাশের দিকে। গাড়িটি সজোরে গিয়ে বাড়ি খেলো সামনের কোনো মোটা গাছের গুড়ির সাথে।
ক্ষণিক পরেই মীর বুনো ঝোপ ঝাড়ের দফারফা করে এসে উপস্থিত হলো গাড়িটির কাছে। তীব্র আক্রোশে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো তার!
গাড়ির দরজা হাট করে খোলা, ভেতরটায় দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চতুর্দিকে নিজের হিংস্র, শকুনি দৃষ্টি ফেলে খুঁজতে শুরু করলো ওদের দুজনকে। শ্বাস পড়তে লাগলো তার জোরে জোরে।
ওই মেয়েটি, ওই সাদা চুলের মেয়েটি!

ক্রোধে ফুসতে শুরু করলো মীর। মেয়েটা আসলে কি চায়? গতকালও তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে হাইনা দের সাথে একযোগে যুদ্ধ করতে দেখেছে সে, আর আজ সে ইলহানকে নিয়ে পালালো! কোন পথে গেলো? কেন গেলো?
উদ্দ্যেশ্য কি তার? কি পরিকল্পনা, জটিলতা চলে তার মস্তিষ্কে? কেন সে এমন চরম বিশ্বাস ঘাতকতা করলো? কোন সাহসে মীরের মুঠো হতে তারই শিকার ছিনিয়ে নিয়ে গেলো? এত দুঃসাহস, এত স্পর্ধা কিভাবে হলো তার?
ক্ষুব্ধ হয়ে মীর নিজের চুল টেনে ধরলো মুঠি করে। পরক্ষণেই ক্রোধে চিৎকার দিয়ে একের পর এক পদাঘাতে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে শুরু করলো সুপার কারটি।

দেমিয়ান প্রাসাদে হুলস্থুল পড়ে গিয়েছে। শেহজাদা জাজীব ইলহানের পতন ঘটেছে, বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান দখল করে নিয়েছেন তার অধিকার, তার সিংহাসন। পুরাতনকে ঝেড়ে মুছে আবার নতুনকে বরণ করে নিতে ব্যাস্ত তারা। সমস্ত প্রাসাদ জুড়ে দাস দাসী দের কলকাকলির শব্দ। দেমিয়ান প্রাসাদকে আবারও দশ বছর পূর্বের আদল দিতে ব্যাস্ত তারা।

প্রাসাদের সম্মুখে পড়ে আছে হাজার হাজার মৃতদেহ, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা একটি ব্যাক্তিও আর বেঁচে নেই। ভোর হওয়ার আগ মুহুর্তে কোনো এক দানবীয় বস্তু এসে মাড়িয়ে পিষে রেখে গেছে তাদের। সকলে লেগে পড়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে। রক্ত মাংসের পঁচা গন্ধে পেটের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসার উপক্রম!
মীর হেটে চলেছে রয়্যাল ফ্লোরের বারান্দা দিয়ে, তার কামরা অভিমুখে। পেছন পেছন কাঞ্জি। বারান্দাটা চকচক করছে, ক্ষণিক আগেও যে এখানে রক্তের বন্যা বয়েছে সেটা বোধগম্য হচ্ছে না।
মীর দরজা ঠেলে ঢুকলো ভেতরে, চিরচেনা কামরাটিকে সম্পুর্ন অন্যরকম দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার৷ সিংহাসনের চতুর্দিকে, দেয়ালে আঁচড়। যেন সুক্ষ, ধারাল কোনো কিছু দিয়ে টেনে টেনে ক্ষত করা হয়েছে সেখানে।
সেগুলো কিসের ক্ষত জানার আগ্রহ দেখালোনা মীর, ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলো সিংহাসনের ওপর। কয়েকটি শুকনো পাতা পড়ে আছে সেখানে, কামরার ভেতর শুকনো পাতা দেখে সামান্য বিস্মিত হলো মীর। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে বসে পড়লো সে সিংহাসনে, নিজের হারিয়ে ফেলে আবার দখল করে নেওয়া সিংহাসনে! এলিয়ে দিলো নিজের ঘর্মাক্ত, অন্যের রক্তে রক্তাক্ত শরীর। চোখ জোড়া বুজে নিয়ে শ্বাস ছাড়লো বুক ভরে।
কাঞ্জি দাঁড়িয়ে রইলো দরজার নিকট, মীর তাকে উদ্দ্যেশ্য করে প্রশ্ন করলো,

“লিও কেমন আছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, তার শরীর থেকে বুলেট বের করা হয়েছে। বিপদ কেটে গেছে, কিন্তু রক্তের প্রয়োজন পড়ায় অ্যানিম্যাল টাউনে পাঠানো হয়েছে৷ এখন সে সম্পুর্ন বিপদমুক্ত।”
“কোকো?”
“তার হাতে জখম হয়েছিলো, তাকেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সে এখন সুস্থ আছে৷ লিওর সাথে সেও অ্যানিম্যাল টাউনেই আছে৷”
“আমার কামরা সংস্কারের ব্যাবস্থা করো কাঞ্জি। এখানের সমস্ত কিছুর পরিবর্তন চাই আমার। ইলহানের ব্যাবহৃত কোনো কিছুর উপস্থিতিই যেন এই প্রাসাদের কোথাও না থাকে। আমি আমার কামরা পূর্বের মতোন দেখতে চাই।”
চোখ বন্ধ রেখে গমগমে স্বরে বলল মীর। কাঞ্জি মাথা নুইয়ে আনুগত্যের সাথে বললো,
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর দুহাত ভাজ করে মাথার নিচে রেখে চোখ বুজে পড়ে রইলো, যেন এতদিন পর এই সিংহাসনে বসেই তার বিগত শত রাতের না হওয়া ঘুম গুলো আচমকা হামলা করে
কাঞ্জি দাঁড়িয়ে রইলো মীরের পরবর্তী আদেশ শোনার জন্য। ক্ষণিক নিরবতার পরেই মীর গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,

“কোকোকে খবর পাঠাও, ইলহানকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সাদা চুলের মেয়েটিকে আমার সামনে যে কোনো মূল্যে হাজির করা চাই। যেখান থেকে হোক, যেভাবে হোক ওই মেয়েটিকে টেনে হিঁচড়ে যেন আমার পায়ের কাছে ফেলানো হয়। আমি নিজের হাতে তার প্রাণ নিবো। তার বিচ্ছিন্ন মাথা হাতুড়ি দিয়ে চূর্ণ করা পর্যন্ত আমি শান্তি পাবোনা।”
শেষোক্ত কথা গুলো দাঁতে দাঁত পিষে বলল মীর।
মীরের কথা কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই আঁতকে উঠলো কাঞ্জি। শেহজাদী তবে শেহজাদা ইলহানকে নিয়ে পালিয়ে গেছেন? এসব কখন হলো? কি হবে এখন? কিভাবে সামলাবে ওরা এসব?
কাঞ্জির মুখের রঙ পালটে গেলো মুহুর্তেই, একটা শুকোনো ঢোক গিলে সে বলল,
“আমি এখনি কোকোকে খবর পাঠাচ্ছি ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
তার পরেই মীরকে আনুগত্য জানিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো প্রাসাদ হতে। এখুনি তাকে অ্যানিম্যাল টাউনে যেতে হবে।

জ্ঞান ফিরতেই ধীরে ধীরে চোখ মেলেলো ইলহান। এক অদ্ভুত, ভারী, কুয়াশাচ্ছন্ন ঘুম ভাঙানির অনুভূতিতে ছেয়ে গেলো তার শরীর। মাথার ভেতরে অনবরত একটি চাপা বোঁ-বোঁ শব্দ। শরীরটা যেন সিমেন্টের বস্তার মতোন ভারী, চারপাশে একটা অচেনা, ওষুধ ওষুধ গন্ধ।
​ক্ষণিক এক দৃষ্টে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। ঘুমটা ভালো ভাবে ভাঙতেই মাথার ভেতরের বোঁ-বোঁ শব্দ টা ফিকে হয়ে এলো, চোখে পড়লো নকশাদার সিলিং এর সৌন্দর্য। হঠাৎ পাশে থেকে কাশির শব্দ পেতেই চমকে উঠে ফিরে তাকালো ইলহান।
জ্ঞানলুপ্ত রোগীকে আচমকা নড়ে উঠতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে তৎক্ষনাৎ চিক্কুর পাড়লো বাহার। ইলহানের দিকে আতঙ্কিত চেহারা নিয়েই স্ট্যাচুর মতোন দাঁড়িয়ে রইলো সে।
ইলহান ওকে দেখা মাত্রই চতুর্দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“এটা কোথায়? আমি কোথায়?
আর তুমি এখানে কি করছো বিশ্বাসঘাতিনী?”
বাহার ইলহানের জন্য আনাবিয়ার কেনা পোশাক গুলো গুছিয়ে রাখছিলো, নিজের এহেন সম্বোধন শুনে নাকের পাটা ফোলালো সে। পরক্ষণেই নিজেকে সংবরণ করে আনুগত্যের সাথে বলে উঠলো,
“আপনি কিমেলেবে শেহাজাদা, এটি শেহজাদীর বাড়ি। উনি আমাকে এখানে দয়া করে থাকতে দিয়েছিলেন, এখন আপনাকেও।”
ইলহান জানার পর্দা সরিয়ে বাইরে দেখলো। জায়গাটা তার চেনা, কিমালেব শহরের অভিজাত এলাকা, জেসিওন। এখানে সে পূর্বেও এসেছে অনেকবার। জায়ান সাদিও এই এরিয়াতেই থাকে, হয়তো আশেপাশেই কোথাও তার বাসা৷ সেদিকে দেখতে দেখতেই ইলহান প্রশ্ন করলো,

“আমার কামরায় তোমার কি কাজ?”
“শেহজাদী আমাকে আপনার যাবতীয় সেবাযত্নের জন্য নিয়োগ দিয়েছেন। বিনিময়ে তিনি আমাকে মাসিক বেতন দিবেন। আমি এখানে একা নই, আরও একজন মেয়ে আছে, আমাকে সাহায্য করার জন্য। সে নিচে, আপনার জন্য স্যুপ গরম করছে৷ এখুনি চলে আসবে।”
পর্দা নামিয়ে সোজা হয়ে বসলো ইলহান। মনের ওপর হঠাৎ বিষাদ এসে ভিড় করলো তার, বসে রইলো চুপচাপ। আনমনে তাকিয়ে রইলো কোনো এক দিকে৷
ইলহানকে চুপ হয়ে যেতে দেখে বাহার বলল,

“আপনার কিছু প্রয়োজন হলে জানাবেন শেহজাদা।”
ইলহান তৎক্ষনাৎ উত্তর করলোনা, ক্ষণিক নিজের বিস্তৃত ব্যান্ডেজে মোড়া বা পা’টার দিকে চেয়ে থেকে দমে যাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আমার মেয়ে কোথায়?”
“শেহজাদী রোজ দুপুর একটা বাজে আপনাকে দেখতে আসেন, তারপরেই আবার ফিরে যান। একটা প্রায় বাজতে চলেছে, উনি একটু পরেই চলে আসবেন আশা করি।”
“কোথায় থাকে সে?”
“ক্ষমা করবেন শেহজাদা, আমি বলতে পারবোনা। উনি নিষেধ করেছেন।”
“আশেপাশেই?”
“বলা নিষেধ, শেহজাদা। ক্ষমা করবেন।”
ইলহান বালিশে ঠেস দিয়ে বসলো এবার, বাহার সাহায্য করতে চাইলে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো তাকে। জিজ্ঞেস করলো,
“আমি এখানে এসেছি কতদিন হচ্ছে?”
“ছ’ দিন শেহজাদা।”
এমন সময় নীচ তলা থেকে একটি মেয়ে খাবার নিয়ে কামরায় ঢুকলো। ইলহানকে আনুগত্য জানিয়ে ট্রে বাহারের হাতে দিয়ে প্রস্থান করলো তৎক্ষনাৎ। বাহার ইলহানের সামনে একটি ওভার বেড টেবিল রেখে তার ওপর খাবারের ট্রে দিলো। বলল,

“আপনার হাতে সামান্য ফ্রাকচার হয়েছিলো। ডাক্তার আজ ভোরে এসেই ব্যান্ডেজ খুলে দিয়েছেন। হাত নাড়াতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা একটু দেখুন শেহজাদা।”
ইলহান ডান হাত নাড়িয়ে দেখলো, উঁচু করতে গেলে ব্যাথা পাচ্ছে এখনো। কিন্তু সেটাকে পাত্তা না দিয়ে স্যুপের বাটি থেকে চামচে কিছু তরল তুলে মুখে দিতে গেলো। কিন্তু ঠোঁট অব্দি হাত পৌছোলনা তার, তার আগেই চিনচিনে ব্যাথায় থেমে যেতে হলো তাকে।
“আপনি অনুমতি দিলে আমি খাইয়ে দেই?”
বাহারের প্রশ্নে ইলহান চোখ তুলে তাকালো। পরক্ষণেই কাঠকাঠ গলায় বলল,
“না, আমিই পারবো।”
আরেকবার চেষ্টা করতে নিতেই দরজার নিকট শোনা গেলো কারো পদশব্দ। ইলহান চোখ তুলে তাকালো। আনাবিয়া দাঁড়িয়ে, মুখে তার এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। চুল গুলো ভেজা, পিঠময় ছড়ানো। হয়তো গোসল দিয়েই বেরিয়েছে সে।
“শরীর কেমন এখন?”

ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া। ইলহান বাহারের দিকে তাকাতেই বাহার দুজনকে আনুগত্য জানিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। ইলহান বলল,
“ভালো আছি আনাবিয়া।”
আনাবিয়া এসে একটা চেয়ার টেনে বসলো ইলহানের বিছানার পাশে। ইলহানের মুখখানা হঠাৎ থমথমে হয়ে উঠলো, নিচের দিকে চেয়ে বলল,
“আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ আনাবিয়া, তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হয়তো শেষ হবে না৷ কিন্তু আমার একটাই প্রশ্ন তোমার কাছে, আমাকে কেন আসওয়াদের হাত থেকে উদ্ধার করলে? আসওয়াদ যে এ কাজের জন্য তোমাকে ছেড়ে দিবেনা সেটা তো তুমি অবশ্যই জানতে, তাহলে কেন?”
“দুটি কারণে চাচাজি। প্রথম কারণ, আমি চাইনি আমার স্বামী সকলের সামনে নিজের হাতে নিজের সহোদরকে হত্যা করে কোনো নিয়ম ভঙ্গ করুক। তার যদি আপনাকে শেষ করতেই হয় তবে জনসম্মুখে নয়, কোনো সাক্ষী রেখে নয়।
আর…. দ্বিতীয় কারণটি হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না।”

“বলো, আমি শুনতে চাই।”
“আমি আমার পরিবারের আর কাউকে হারাতে চাইনা। অনেক হারিয়েছি, অনেক খুইয়েছি। আর নয়। অন্তত আমি জীবিত থাকতে আর কাউকে হারাতে চাইনা। আমার মৃত্যুর পর আপনারা দুভাই যা ইচ্ছা করবেন, মারামারি কাটাকাটি এভরিথিং। আমি আর বাধা দিতে আসবোনা।”
ইলহান শুনলো, চোখ জোড়া হঠাৎ জ্বলে উঠলো তার, ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিৎ বাকেরও দেখা মিললো।
ক্ষণিক নিরবতার পর ইলহান স্যুপ খাওয়ার চেষ্টা করলো আবারও। কিন্তু যন্ত্রণায় চামচটা তার মুখগহ্বর পর্যন্ত পৌছোলোনা। কয়েকবারের ব্যর্থ চেষ্টার পর আনাবিয়া উঠে এসে বসলো বিছানায়। স্যুপের বাটিটা নিজের হাতে নিয়ে চামচে তুলে বাড়িয়ে ধরলো ইলহানের মুখের কাছে। ইলহান মিষ্টি করে হেসে বলল,
“পঞ্চদ্বীপের বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান যদি জানতে পারেন তার একমাত্র বউ এর হাতে আমি স্যুপ খেয়েছি তবে আমার স্যুপ খাওয়ার শখ এ জীবনের মতো মিটিয়ে দিবেন।”
ইলহানের মশকরায় চটে গেলো আনাবিয়া, কিঞ্চিৎ ধমকের সুরে বলল,

“বেশি ঢং করলে কিন্তু এইখানেই বাটিঘটি সব ফেলে রেখে চলে যাবো!”
“মাফ চাই, আমার ভুল হয়েছে। কৃপা করুন। আপনি তেজ করে চলে গেলে এই অধমকে এ বেলা না খেয়ে মরতে হবে।”
দু হাত জোড় করে ভ্রু ওপরে তুলে অসহায় আসামীর ন্যায় অভিনয় করে বলল ইলহান।
“হু, হয়েছে৷ খান এখন।”
বলে ইলহানের মুখের ভেতর চামচটা জোর করে ঢুকিয়ে দিলো আনাবিয়া।

জেসিওনের একটি আভিজাত্যপূর্ণ রেস্টুরেন্টের ভেতর বসে আছে আনাবিয়া। তার মুখোমুখি বসে জায়ান সাদি। জায়ান বন্দিজীবনের ধকল কাটিয়ে উঠেছে বেশ। চিমসানো শরীরে পূর্বের ন্যায় মাংস ফিরে এসেছে, বরং একটু বেশিই এসেছে। কদিনে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে গেছে সে৷
আনাবিয়াই কথা শুরু করলো, জিজ্ঞেস করলো,
“আমাকে এখানে কেন ডেকেছেন চাচাজান?”
“শেহজাদী, শিরো মিদোরি থেকে আপনি কোনো সংবাদ পেয়েছেন?”
“কোন বিষয়ে?”
“হিজ ম্যাজেস্টি আপনাকে রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।”
“না, এখনি জানতে পেলাম।”
“শেহজাদা ইলহানকে বাঁচানো আপনার উচিত হয়নি শেহজাদী। হিজ ম্যাজেস্টি বলেছেন আপনি যেখানেই থাকবেন সেখান থেকে আপনাকে যেন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে তার পায়ে ফেলা হয়। উনি নিজের হাতে আপনার গর্দান নিবেন।”
আনাবিয়া হাসলো নিঃশব্দে, ক্ষণিক চুপ থেকে বলে উঠলো,

“যার হাত ধরে এই পৃথিবীতে এসেছিলাম আবার তার হাত ধরেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিবো। ক্ষতি কি?”
জায়ানকে কেমন অধৈর্য অসহায় ঠেকলো হঠাৎ। সে হাঁসফাঁস করে উঠে বলল,
“শেহজাদী, আপনি আমার বাসায় চলুন। আমি হিজ ম্যাজেস্টি থেকে আপনাকে সর্বোচ্চ প্রোটেকশন দিবো। উনি আপনাকে কখনোই খুঁজে পাবেন না৷
আর তাছাড়া আপনি এখানে কোথায়, কিভাবে থাকবেন, একা একা? আমার বাসায় আমার ছেলেরা আছে, আপনি চাইলে ওদের সাথে থাকতে পারবেন। ওরা আপনাকে কখনোই লোনলি ফিল করতে দিবে না। দয়া করে চলুন শেহজাদী!”

“দুঃখিত চাচাজান, আমি আপনার অনুরোধ রক্ষা করতে পারবোনা। আমি এতদিন যেখানে থেকেছি সেখানেই থাকবো। এর বাইরে আমি কোথাও যাবোনা। মীর যদি আমাকে এভাবেই খুঁজে পায় তবে আমি স্বেচ্ছায় নিজের মৃত্যুকে গ্রহণ করবো। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি মৃত্যুভয়ে পালিয়ে বেড়াবোনা কখনো।”
মোলায়েম স্বরে উত্তর দিলো আনাবিয়া। জায়ান আনত চোখে চেয়ে চুপ করে রইলো। ক্ষণিক পর বলে উঠলো,
“ঠিক আছে শেহজাদী, আপনার যেমন ইচ্ছা। তবে আপনার জন্য আমার বাসার দরজা সমসময়ই খোলা থাকবে, আপনি যখন ইচ্ছা আমার বাসায় আসবেন, যতদিন খুশি থাকবেন, যা ইচ্ছা করবেন। আপনাকে আমি অনুরোধ করছি আমার বাসায় নিয়মিত আসার জন্য। আশা করছি আপনি আমার এই অনুরোধটি রাখবেন।”
“ধন্যবাদ, আমি চেষ্টা করবো চাচাজান। এখন আমাকে উঠতে হবে, বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে ফক্সি লায়রা চিন্তা করবে৷”

বলে উঠে পড়লো আনাবিয়া, তারপর জায়ানের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো মুনহল্যো ম্যানরের উদ্দ্যেশ্যে। যাওয়ার পথে কোকোকে কল করলো সে, কোকো ফোন তুলতেই বলল,
“ফ্যালকনকে আমার এখানে পাঠিয়ে দে। তোরা সবাই কিছুদিন পর যে যার কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়বি, তখন ওর পক্ষে একা রেড জোনে সার্ভাইব করা কষ্টকর হবে। কখন কি ভুল করে বসবে ও আমার কাছেই বেশি নিরাপদ থাকবে।”
“ঠিক আছে আম্মা, আপনি যা বলবেন তাই হবে।”
আনাবিয়া ফোন রাখতে চাইলে কোকো দ্রুত বলে উঠলো,
“আম্মা আম্মা, ফোন রাখবেন না, শুনুন না!”
“বল।”
“হাঁসের বাচ্চাটাকে আমি আপনার কাছে নিয়ে আসি?”
“হুম! কি খাবেন বলুন, শ্রদ্ধেয় আর্মি চিফ।”
কোকো হেসে ফেললো, বলল,
“ব্লু ফিন টুনা নিয়ে আসবো আম্মা, আপনি টুনা স্টেক করবেন। খেয়েই পুরোদমে কাজে লেগে পড়বো, একদম ফাঁকি দিবোনা, পাক্কা প্রমিজ।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৬

“আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে?”
“না না, ছিঃছিঃ! তওবা তওবা! আপনাকে তো আমি খুঁজেই পাইনি, টেনে হিঁচড়ে কিভাবে নিবো বলুন! আপনাকে খুঁজে পেয়ে টেনে হিঁচড়ে নেওয়ার আগে আমি মরে যাবো আম্মা, আপনি চিন্তা করবেন না।”
আনাবিয়া হাসলো, বলল,
“হু হয়েছে, অত ডায়লগবাজি করতে হবে না। সময় মতো চলে আসিস।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮