Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬২
রানী আমিনা

ফুল ভিউ মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের বোতাম লাগাতে ব্যাস্ত মীর। সভাসদ দের সাথে আজ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। সকলে এতক্ষণে হাজির হয়ে গেছে মিটিং রুমে।
শার্টের স্লিভের বোতাম আটকাতে আটকাতে কামরার ভেতর পায়চারি শুরু করলো সে। পিচ্চিটাকে এখনো সে হাতে পেলোনা। মেয়েটা কেন স্বেচ্ছায় তার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কেন সকলে তার সাথে এমন লুকোচুরি খেলছে সেটা তাকে জানতে হবে, যেভাবেই হোক। মীরের দৃঢ় বিশ্বাস তার আশেপাশের মানুষ গুলো তার থেকে বড় কোনো সত্যি লুকিয়ে রাখছে, কোনোভাবেই সেই নিগুঢ় সত্য পর্যন্ত তাকে পৌছুতে দিচ্ছে না।

আনমনে পায়চারি করতে করতে হঠাৎই ডানদিকের দেয়ালে হাতের আঘাত লাগলো মীরের। তৎক্ষনাৎ একটা ফাঁপা শব্দ ভেসে এলো তার কানে।
মীর দাঁড়িয়ে গেলো, মনের ভুল ছিল কিনা নিশ্চিত হতে দ্বিতীয় বার আঘাত করলো দেয়ালের ওপর। আবারও ভেসে এলো একই ফাঁপা শব্দ। যেন কোনো পাতলা আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে অপরপাশের কোনো অজানা কুঠুরি।
মীরের ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। হাত বাড়িয়ে সে সরিয়ে ফেলতে চাইলো দেয়ালের শক্ত আবরণ, দেখতে চাইলো ফাঁপা আওয়াজের হেতু।
সেই মুহুর্তেই বাহিরে শোনা গেলো লিওর কন্ঠস্বর,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, জায়ান সাদি এসেছেন। আপনার সাথে কথা বলতে চান৷”
“অপেক্ষা করতে বলো।”
বলেই দেয়ালের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিলো মীর, ব্যাস্ত হয়ে গেলো তৈরি হতে। ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেলোনা দেয়ালের ওপাশে পড়ে আছে তার চিরচেনা কিছু দৃশ্য, কিছু ঘ্রাণ, কিছু স্পর্শ, কিছু স্মৃতি!
পুরোপুরি তৈরি হয়ে মীর বাইরে বেরিয়ে দেখলো জায়ান সাদি বেজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়, চোখ জোড়া নিবদ্ধ কিমালেবের পাহাড় সারির মেঘ ফুড়ে বের হওয়া শুভ্র চূড়া গুলোর দিকে। মীর বের হতেই আনুগত্য জানালো জায়ান।
মীর ভারী পা ফেলে এসে বসলো কাউচে। ইশারায় বসতে বলল জায়ানকে। জায়ান বসতেই মীর জিজ্ঞেস করলো,

“কি সংবাদ, জায়ান সাদি? এত সকাল সকাল শিরো মিদোরিতে?”
জায়ান দুহাতে একটা জমকালো ইনভিটেশন কার্ড এগিয়ে দিলো মীরের দিকে, মুখে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমার বড় ছেলে জাভেদের শুভ বিবাহ। আপনাকে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি বিবাহের অনুষ্ঠাবে যোগ দিতে। অনুগ্রহ করে দাওয়াত গ্রহণ করে আমাকে সম্মানিত করার অনুরোধ করছি।”
মীর কার্ডটি হাতে নিয়ে খুলে দেখলো, কনের পিতার নাম দেখেই জায়ানের দিকে চেয়ে বলল,
“কনে বদল হয়েছে নাকি? তুমি না বলেছিলে ফ্লাভকার মেয়েকে ছেলের বউ করবে?”
মীরের প্রশ্নে জায়ান মাথা নিচু করলো, দমে যাওয়া গলায় বলল,

“জ্বি, ইয়োর ম্যাজেস্টি। কিন্তু ছেলে তাকে বিয়ে করতে নারাজ। আমি ভেবেছিলাম বিয়ে একবার হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু…..!”
“কিন্তু?”
“কিন্তু আমার গুণধর ছেলে সেদিন সোজা বিয়ে করে বউ সহ বাড়িতে ফিরেছে। সেটাও করেছে এক মাতাল, চরিত্রহীন লোকের মেয়েকে। এলাকায় আমি আর মুখ দেখাতে পারছিনা! আমার ছেলে হয়ে কিনা শেষে একটা মাতালের মেয়ে বিয়ে করলো?”
শেষোক্ত কথাটা বেশ ক্ষোভের সাথেই বলল জায়ান। মীর মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলো,

“মেয়ে কেমন?”
“মেয়ে অনেক ভালো, ইয়োর ম্যাজেস্টি। অস্বীকার করবোনা। কিন্তু….. এমন একটা পরিবারের মেয়েকে আমি সাদি পরিবারের বউ হিসাবে কিভাবে মেনে নিবো? মেয়ে গরীব হোক তাতে আমার আপত্তি ছিলোনা, কিন্তু এমন অসভ্য একটা পরিবারের মেয়েকে আমি বাড়ির বউ হিসেবে কিভাবে মেনে নিবো, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
“তবে খুব ঘটা করে বিয়ের কার্ড বিলি করে বেড়াচ্ছো যে!”
কার্ডটি টেবিলে রাখতে রাখতে বলল মীর৷ জায়ান ফোস করে শ্বাস ছেড়ে উত্তর করলো,
“সেটা বিপদে পড়ে, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
“কিসের বিপদ?”
“শেহজাদী হুমকি দিয়েছ্‌……”

বলতে গিয়ে মাঝপথেই থেমে গেলো জায়ান, চকিতে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে একবার তাকালো মীরের দিকে। দেখলো মীর মুখে হাত ঠেকিয়ে শীতল চোখে তারই দিকে তাকিয়ে। এবার কি হবে তার? সে তো হিজ ম্যাজেস্টিকে বলেছিলো শেহজাদী তার সাথে কোনো যোগাযোগই করছেন না, তিনি কোথায় সেটাও সে জানেনা!
জায়ানের হাত পা কাঁপা-কাঁপি শুরু হলো হঠাৎ, গলা শুকিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। অতিরিক্ত উত্তেজনায় কান মাথা গরম হতে শুরু করলো তার। জড়ানো গলায় আমতা-আমতা করে বলল,
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি, আই ক্যান এক্সপ্লেইন! আম্‌-আমি ইচ্ছে করে…. ইচ্ছে করে ক্‌-কিছু করিনি, বিশ্বাস করুন!”
মীর হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো ওকে। টি টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস এগিয়ে গিয়ে ভ্রুর ইশারায় খেয়ে নিতে বললো। জায়ান দ্রুত বেগে গ্লাসটা নিয়ে কাঁপা হাতে পানি খেলো। পরক্ষণেই তাকে অবাক করে দিয়ে আনাবিয়ার প্রসঙ্গ সম্পুর্ন এড়িয়ে মীর শান্ত গলায় বলল,

“ছেলে যেখানে বিয়ে করতে চায় সেখানেই তাকে বিয়ে দাও জায়ান সাদি। তোমার ছেলে এখন বড় হয়েছে, নিজের ভালো মন্দ বুঝতে শিখেছে। তার জীবনে তোমার দখল দারির কোনো প্রয়োজন দেখিনা৷”
জায়ান জড়সড় হয়ে মাথা নিচু রেখে বলল,
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর অত্যন্ত শান্ত, নির্বিকার মুখে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে গমগমে স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“লিও নিশ্চয় তোমাকে জানিয়েছে পিচ্চিটার মান্থলি স্যালারি ডাবল করে দেওয়ার ব্যাপারে, দিয়েছো?”
জায়ানও উঠে দাঁড়ালাও তৎক্ষনাৎ, আনুগত্যের স্বরে বলল,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি তাকে দিতে গেছিলাম, কিন্তু তিনি নেননি৷ বলেছেন, যেহেতু তিনি দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করেছেন তাই দেমিয়ান সাম্রাজ্যের কোষাগার হতে একটা মুদ্রাও তিনি গ্রহণ করবেন না৷”
মীর ঠোঁটের কোণা বাকিয়ে হাসলো। খুব তেজ ওয়ালা হয়েছে দেখি, কার মতো ঠিক হয়েছে বুঝলোনা মীর। সালিম, নাকি আজলান চাচাজান? নাকি তার মা ইনায়ার মতোন! ইনায়া সালিমকে প্রচন্ড জ্বালাতন করতো, একটু কিছু হলেই গাল ফুলিয়ে বসে থাকতো। অভিমান চলতো তার ঘন্টার পর ঘন্টা, সালিম এসে অভিযোগ করতো মীরের কাছে, এমন বউ নিয়ে সে কি করবে? বুঝে কম, তেজ করে বেশি!
ঠোঁটের হাসিটি বজায় রেখে মীর কাউচের ওপর থেকে ওভারকোটটি নিয়ে রয়্যাল ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল,

“তোমার সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো জায়ান সাদি, শুধু এক শর্তে।”
“আপনি যে শর্তই দিবেন আমি তাতেই রাজি, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“একদমই আমি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবো না৷”
বুকে হাত বেধে গাল ফুলিয়ে বলল আনাবিয়া, গালের সাথে সাথে নাকের পাটাও ফুলে উঠছে তার ক্ষণে ক্ষণে!
পাশেই চেয়ারে বসে জায়ান, জাভেদ, জেসার, জুনায়েদ, ফারিশ আর ওর দুই মেয়ে। সকলে মিলে আনাবিয়াকে রাজি করতে এসেছে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু আনাবিয়া যখনই শুনেছে সেখানে মীর স্বয়ং আসবে তারপর থেকেই সে বেঁকে বসেছে৷
ইলহান আর ফ্যালকন নির্বাক শ্রোতা, তারা এমনিতেও ওদিকের কোনো প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করবেনা। ইলহান তো সর্বক্ষণ ভয়ে থাকে। তার খোঁজ এখন আর মীর করেনা, এখন তার সমস্ত ধ্যান জ্ঞান আনাবিয়াকে নিজের আয়ত্তে নেওয়ার প্রচেষ্টায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে৷

তবুও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনা ইলহান। জাভেদের বিয়ের দিনে তো সে কামরা থেকেই বের হবে না। মীর যদি কোনো ভাবে টের পেয়ে যায় তবে ওকে সেদিনই মহাকাশের টিকিট ধরিয়ে দিবে৷
ফ্যালকনও চুপচাপ। মীরকে জানানো হয়েছিলো ফ্যালকন অসুস্থতাজনিত কারণে কাজ ছেড়ে দিয়েছে, এখন যদি দেখে ফ্যালকন বিয়ের অনুষ্ঠানে টো টো কম্পানি করে বেড়াচ্ছে তখন ফ্যালকনের ওপর একটা পারমাণবিক বোমা পড়ার আশঙ্কা আছে৷ বর্তমানে সেও তাই ইলহানের মতোই চুপ, শুধু মাঝে মাঝে লুসির ছোট ছোট হাতের চুল টানা খেয়ে চাপা স্বরে চিৎকার ব্যাতিত আর কোনো শব্দ তার মুখ থেকে বের হচ্ছে না।
জায়ান অনুরোধের সুরে বলল,

“আপনি না গেলে বিয়ে টা পরিপূর্ণ হবে না শেহজাদী! আপনিই তো ওদের বিয়েটা দিয়েছেন, এখন যদি সেই আপনিই ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেন তবে কেমন হয় বলুন!”
জাভেদও বাবার সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
“বাবা ঠিক বলেছেন আপা। হিজ ম্যাজেস্টি আসলেও তিনি তো থাকবেন অন্যদিকে, পুরুষদের উপস্থিতি যেখানে বেশি থাকবে। আপনি তো অন্দরমহলে থাকবেন, উনি আপনার উপস্থিতি টেরই পাবেননা। চলুননা আপা! পুরো সময় না হোক অন্তত বিয়ে পড়ানোর সময় টুকুতে থাকবেন! প্লিজ আপা!”
আনাবিয়া ফোস করে শ্বাস ছাড়লো, বলল,
“যদি সে বুঝতে পারে আমি সেখানেই আছি এবং আমাকে তার সাথে ধরে বেধে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তখন? তখন কি হবে? আপনারা কি আমাকে তার হাত থেকে ছাড়াতে পারবেন? কখনোই পারবেন না, তাই আমি যাবোইনা!”

“আমি কথা দিচ্ছি আপা, উনি আপনার হদিসই পাবেন না৷ উনাকে আমি যে কোনো ভাবে হোক ব্যাস্ত রাখবো সারাক্ষণ। আর তাছাড়া সব দ্বীপ থেকে অনেক বড় বড় লোকজন আসবে, কোকো ভাইজানও থাকবেন সেখানে। হিজ ম্যাজেস্টি সুযোগ পাবেন না আপনাকে খুঁজে পাওয়ার। প্লিজ আপা, রাজি হয়ে যান!”
আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা, তারপর বলল,
“ঠিক আছে, আমি আসবো। তবে যদি কোনো অঘটন ঘটেছে তবে আমি কিন্তু কাউকে ছেড়ে দিবোনা। যদি ফাসি তবে সবাইকে নিয়েই ফাসবো, কে কি করেছে কি করেনি সব কিন্তু আমার জানা আছে, একে একে সব বলে দিবো আমি মীরকে৷”
“ঠিক আছে, আপনার যা খুশি আপনি করবেন, আমরা কেউ কিচ্ছু বলবো না৷”
জাভেদ দুহাত জোড় করে বলল। আনাবিয়া ছোট্ট করে বিদায় জানিয়ে ওর পার্স ব্যাগটা হাতে তুলে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট থেকে। ফ্যালকনও গেলো তার পিছু পিছু। সকলে বেরিয়ে গেলে ইলহান আর ফারিশ মিলে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে চলে গেলো যার যার বাসায়৷

আকাশে বাঁকা চাঁদ। জায়ান সাদির প্রাসাদসম বিরাট বাড়িটি ঝলমলে আলোয় সেজেছে আজ। আত্মীয় স্বজন আর গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের ভিড়ে দম ফেলানো দায়। লোকজন গিজগিজ করছে চারদিকে, তাদের অট্টহাসি আর মনখোলা গল্পে মাতোয়ারা হয়ে আছে সাদী ম্যানসনের সম্মুখের বিরাট গার্ডেন।
কোকো তার পেশাদারি পোশাকে মাত্রই এসে উপস্থিত হলো সাদী ম্যানসনে। মীর এখনো এসে পৌছেনি। কোকো দেখলো এই-ই সুযোগ। সোজা ম্যানসনের ভেতর ঢুকে গিয়ে জাভেদকে খুঁজে বের করলো সে৷
জাভেদ মাত্রই শেরওয়ানি পরে বাইরে বেরিয়েছিলো, কোকো ছুটে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলো,
“জাভেদ মামা, আমার আম্মা কই?”
“সোজা উপর তলায় চলে যাও, ওখানের ডান দিনের উইংটি সম্পুর্ন আপার জন্য খালি করে দেওয়া হয়েছে৷ আপা, ফ্যালকন আর একটা বাচ্চা মেয়ে ছাড়া সেখানে কেউ নেই।”
কোকো জাভেদকে কোনো রকমে ধন্যবাদ জানিয়ে ছুটলো ওপর তলায়। উপরে পৌঁছে উইং এর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পেলো। কয়েকবার কলিং বেল বাজিয়েও যখন কেউ দরজা খুললোনা তখন ক্রমাগত সজোরে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলো কোকো।
কিছুক্ষণ পরেই দরজা খুলে ফ্যালকন বেরিয়ে এসে কোকোকে দেখে ভ্রুকুটি করে বলল,

“কিরে গণ্ডার! দরজা ভেঙে ফেলবি নাকি রে তুই শালা?”
“এতক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি খুলিস না কেন হাঁসের ছাও? আমার আম্মা কই?”
“বাড়িতে নেই, আপনি অন্য কোনো সময় আসবেন।”
বলে দরজা বন্ধ করে দিতে গেলো ফ্যালকন। কোকো জোর জবরদস্তি করলে দুজন দরজা ধরে ঠেলাঠেলি লাগিয়ে দিলো। ফ্যালকন গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে দরজা ঠেকিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
“শেহজাদী বলেছেন কাউকে যেন আমি ঢুকতে না দেই! মোটেও ঢুকবিনা শালার কুমির!”
“ভালোয় ভালোয় দরজা থেকে সরে যা হাঁসের পোনা, নইলে কিন্তু দরজা দিয়ে চেপে তোকে গলিয়ে দেবো বলে দিলাম!”

“কোনোদিন সরবোনা, কি করবি কর!”
“আমি ঢুকলে আম্মা কিছু বলবেন না, সর বলছি পাতিহাস!”
বলতে বলতে শরীর গলিয়ে ঢুকে পড়তে নিলো কোকো। ফ্যালকন আরও জোরে দরজায় চাপ দিয়ে বলল,
“শেহজাদী একবারও তোর নাম ধরে বলেননি ঢুকতে দিতে, তাই দিবোনা, বাইর হ কচ্ছি!”
তখুনি পেছন থেকে ভেসে এলো আনাবিয়ার রিনরিনে স্বরের বকুনি,
“কি শুরু করেছিস তোরা দুজন? তোরা কি আর কখনো ভালো হবিনা?”
মুহুর্তেই দুজন দরজা ছেড়ে দিয়ে নিতান্ত শান্ত শিষ্ট ছেলের মতো দাঁড়িয়ে পড়লো পাশাপাশি, তৎক্ষনাৎ দুজনের চোখ গেলো আনাবিয়ার দিকে। ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দুজনেই।
এমারাল্ড গ্রিণ আর কালোর সংমিশ্রণের একটি ফ্লাপি বল গাউন পরণে আনাবিয়ার, কৃত্রিম আলোয় ঝিকমিক করছে পোশাকের ক্রিস্টাল পাথরের নকশা গুলো। হাত জোড়া আবৃত কালো রঙা লেইস গ্লাভসে। সফেদ চুল গুলোতে এলোমেলো খোপা, কয়েক গোছা চুল অবহেলায় নুইয়ে আছে শুভ্র কাঁধের ওপর। হীরক খণ্ডের ন্যায় চোখ জোড়া আজ আর কোনো লেন্সের আড়ালে লুকায়িত নেই৷ গাঢ়, স্মোকি কাজলে আবৃত আয়তকার চোখ জোড়া যেন শুষে নিতে চাইছে হৃৎপিণ্ডের সমস্ত প্রাণশক্তি! টেরাকোটা রঙা ঠোঁট জোড়াতে সামান্য লালিমার ছোয়া, তাতেই যেন রূপ ফেটে পড়ছে তার!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬১

কোকো নিজেকে ধাতস্থ করে এগিয়ে এসে আনাবিয়াকে ঠেলে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আম্মা, আপনি আজ ভুলেও বাইরে যাবেন না! আপনি বাইরে গেলে আজ সকলের মাথা খারাপ হয়ে যাবে, আমি ড্যাম শিওর! আমারই মাথা খারাপ হয়ে যেতে চাইছে, অন্য দের কথা আর কি বলবো বলুন আম্মা!”
আনাবিয়া হাত বাড়িয়ে ওর কান টেনে দিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,
“আম্মা হই আমি তোর, একদম আমার সাথে উল্টাপাল্টা মজা করবিনা কোকো!”
কোকো হো হো করে হেসে উঠে দুহাতে টিপে দিলো আনাবিয়ার তেজে ফোলা টসটসে গাল।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৩