বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮২
রানী আমিনা
কামরার নিকট আসতেই অচেনা কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সতর্ক হয়ে উঠলো মীর। ভারী পায়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বিছানায় বসে থাকা মেয়েটি তড়িঘড়ি উঠে আনত চোখে দাঁড়িয়ে গেলো মেঝেতে। আতঙ্কে, উত্তেজনায় কাঁপতে রইলো তার পাতলা শরীর।
মীর আচমকা বিভ্রান্ত হলেও পরক্ষণেই সামলে নিলো নিজেকে। এই পোশাক তার চেনা, এই অলঙ্কার গুলোও তার চেনা, এই সাজও! মেয়েটির সফেদ পোশাকের দিকে কিয়ৎক্ষণ নজর দিয়ে আচমকা ক্রুদ্ধ স্বরে শুধোলো,
“এই পোশাক কোথায় পেয়েছো?”
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী দ্-দিয়েছেন!”
কম্পিত স্বরে বলে উঠলো মেয়েটি। গলা শুকিয়ে এলো তার, ঢোক গিলতে রইলো বারবার। কিন্তু তার কথায় চোয়াল শক্ত হয়ে এলো মীরের, ফুলে উঠলো কপালের রগ! উগ্র স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“এ কামরায় কে পাঠিয়েছে তোমাকে?”
“শেহ্-শেহজাদী, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মীর পরক্ষণেই বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। রুক্ষ, উচ্চস্বরে ডেকে উঠলো,
“মহসিন! মহসিন!”
মহসিন কিচেনে ঢুকে বসেছিলো চুপচাপ, ফিলোমেলা অন্য কোণায় চুপটি করে বসে। মীরের কন্ঠ পেতেই ফিলোমেলার দিকে ফিরলো সে। ফিলোমেলার মুখখানা পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে ইতোমধ্যেই, আগে যদি জানতো এই রয়্যাল ফ্লোরে প্রতিমুহূর্তে তার প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়বে তবে কখনোই আসতোনা!
শুকনো ঢোক গিলে কিচেন থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো মহসিন। ভীত পায়ে এগোলো খাসকামরার দিকে। মীর দাঁড়িয়ে বাইরে, মহসিন আসা মাত্রই ক্রুদ্ধ স্বরে সে বলে উঠলো,
“কোন সাহসে আমার অনুমতি ছাড়া আমার কামরায় একে ঢুকিয়েছো? এই মুহুর্তে এই মেয়েটিকে আমার চোখের সামনে থেকে দূর করো। শিনজোর যা কিছু ওর গায়ে চড়েছে সেগুলো যথাসম্ভব পরিষ্কার করে আবার যথাস্থানে রেখে আসবে এবং এই রয়্যাল ফ্লোরে আমার অনুমতির বাইরে যদি কেউ প্রবেশ করে তবে তাকে এবং তোমাকে আমি দেখে নিবো মহসিন, মাইন্ড ইট!”
মেয়েটি অবুঝ চোখে একবার মীরের কঠিন মুখশ্রী আরেকেবার মহসিনের অসহায়, অপরাধী চেহারায় দেখছিলো। আচমকা মীর ঘাড় ঘুরিয়ে ধ্বংসাত্মক চোখে তাকালো তার দিকে, মেয়েটি ওর শকুনি চাহনির নিঃশব্দ আদেশে আতঙ্কিত হয়ে ত্রস্ত পায়ে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। মহসিন দ্রুতপায়ে তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো রয়্যাল ফ্লোর থেকে।
মীর ভারী পায়ে এগোলো ভেতরে, ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে আনাবিয়ার কামরার দরজায় করাঘাত করলো ক্ষিপ্র বেগে। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না আসায় ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে তালা খুলে সজোরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মীর। আনাবিয়া স্থীর বসে বিছানার ওপর, এক কোণে। মীর ঢুকতেই তাকালো সে, চোখের চাহনি খাপছাড়া!
মীর নাকের পাটা ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“একটি দিনও কি আমি ঘরে ফিরে এসে সবকিছু স্বাভাবিক পাবো না শিনজো? কি করতে চাও তুমি আদতে? কবে শেষ হবে তোমার আমাকে এভাবে টর্চার করা? সমস্যা কি তোমার?”
আনাবিয়া নিরুত্তর রইলো, এক পলক মীরের মুখপানে চেয়ে আবার ফিরিয়ে নিলো দৃষ্টি। মীরের ধৈর্য শেষ হতে রইলো, সে পূর্বের চেয়েও কঠিন স্বরে বলে উঠলো,
“দিনের চব্বিশটা ঘন্টার ভেতর আঠারো ঘন্টা আমাকে বাইরে বাইরেই কাটাতে হয়, যথেষ্ট কষ্ট হয় আমার! আমি এখানে ফিরে এসে বিছানায় শরীর রাখতে পারিনা তার পূর্বেই আমাকে আবার উঠে যেতে হয়! দু মিনিট চোখের পাতা এক করতে পারিনা আমি, ঘুম হয়না আমার! একটু শান্তি চাই আমি শিনজো, কিছুক্ষণ নির্জনতা চাই; কলহ, কোলাহল মুক্ত পরিবেশ চাই। কিন্তু আমি তা পাচ্ছিনা, তুমি আমাকে দিচ্ছোনা! কি করতে চাইছো তুমি?”
“আমি শুধু আমার কর্তব্য পালন করতে চেয়েছি।”
মৃদুস্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর দাঁতে দাঁত চাপলো তৎক্ষনাৎ, চোখ জোড়া বন্ধ করে শ্বাস ছেড়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো তার ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরিরর ন্যায় ক্রোধ! উগ্র গলায় বলে উঠলো,
“এমন কর্তব্য তোমাকে পালন করতে হবে না শিনজো! আমার খেয়াল রাখতে না পারো অন্তত নিজের খেয়ালটা ভালোভাবে রাখো। যে সময়টুকু এসব ছাইপাশ ভেবে আর করে কাটাও সেটুকু নিজের শরীর, স্বাস্থ্য আর খাবারের পেছনে দাও। এতে অন্তত উপকার হবে তোমার। বোঝা গেছে?”
আনাবিয়া মাথা নাড়লো ওপর নিচে৷ মীর কিয়ৎক্ষণ ওর দিকে শীতল চোখে চেয়ে থেকে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে ফিরে এলো নিজের কামরায়। বাঁজখাই গলায় ডেকে উঠলো,
“ইব্রাহিম!”
ইব্রাহিম নামক দেহরক্ষীটি তৎক্ষনাৎ এসে দাঁড়ালো বারান্দায়। মীর বাইরে বেরিয়ে এলে ঘুমের ওষুধ দুইটা মীরের হাতে হস্তান্তর করতেই মীর গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“আরও দুটো নিয়ে এসো।”
ইব্রাহিম চমকে তাকালো মাথা তুলে, ইতস্তত করে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, এটা অনেক পাওয়ারফ্…”
“যেটা বলেছি সেটা করো।”
ইব্রাহিমের কথার মাঝেই ধমকে বলে উঠলো মীর৷ ধমক খেয়ে ছেলেটা তৎক্ষনাৎ মাথা নামিয়ে এগোলো আবার মেডিক্যাল জোনের দিকে।
অনেক রাতে আচমকা মীরের কামরা থেকে খুটখাট আওয়াজ পেয়ে উঠে বসলো আনাবিয়া। কান খাড়া করে শুনলো কিছুক্ষণ, ঘড়িতে দেখলো তিনটে বেজে পনেরো। এতরাতে উঠে লোকটা কি করছে ভেবে পেলোনা সে।
আচমকা একটা জোরালো, ভারী শব্দ হতেই চমকালো আনাবিয়া, কিছুক্ষণ বসে রইলো অন্য কোনো শব্দ আসে কিনা শুনতে। কিন্তু কোনো শব্দই না পেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে এগোলো দরজার দিকে, নিকটে গিয়ে কান পাতলো। কোনো শব্দ আসছে না, নিঃস্তব্ধ পুরোটাই।
কৌতুহল হলো আনাবিয়ার, নিঃশব্দে দরজার নব ঘুরিয়ে সে উঁকি দিলো এক চোখে। সরু ফাঁকা দিয়ে ভালোভাবে দেখতে না পেয়ে সতর্ক হাতে দরজাটা ঠেললো আরেকটু। তখনি দৃষ্টিগোচর হলো বিছানার ওপাশে, মেঝের ওপর অযত্নে, অবহেলায় নিথর পড়ে থাকা জোড়া শ্যামরঙা, পুরুষালি পদদ্বয়!
বুকের ভেতর ধক করে উঠলো আনাবিয়ার! আতঙ্কে শীতল হয়ে এলো তার শিরদাঁড়া! ভীত, শঙ্কিত হয়ে দ্রুত পায়ে তৎক্ষনাৎ ভেতরে ছুটলো সে।
মীরের অসাড়, ভারী শরীরটা পড়ে আছে মেঝেতে! তবে কি একটু আগের ভারী পতনের শব্দটা মীরেরই ছিলো? প্রমাদ গুণলো আনাবিয়া! বুকের ভেতর মুহুর্তেই তোলপাড় শুরু হলো তার, এক অশুভ আশঙ্কায় হিম হয়ে এলো হাত-পা! অস্থির পায়ে ছুটে এলো সে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মীরের কাছে, সশব্দে হাটুগেড়ে বসে কাঁপা শঙ্কিত গলায় ডাকলো দুবার,
“মীর… মীর!”
কন্তু গলা দিয়ে যেন স্বর ফুটলোনা ওর, এক অবর্ণনীয় আতঙ্কে শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো কন্ঠস্বর! ডুকরে কেঁদে উঠে দ্রুতহাতে উপুড় হয়ে থাকা মীরকে সোজা করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে রইলো সে! দুহাতে বলিষ্ঠ বাহুখানা আঁকড়ে ধরে গায়ের জোরে নিজের দিকে ফেরাতেই হতভম্ব হয়ে গেলো আনাবিয়া!
মীরের মোহময়, স্বর্ণাভ চোখ জোড়া বিস্ফোরিত! ভয়ঙ্কর রক্ত বর্ণ ধারণ করেছে তা! রক্তলাল চোখের কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গাঢ় মেরুণ রঙা তরল!
দুঃসহ ত্রাসে হতবাক হলো আনাবিয়া, আতঙ্কিত হয়ে তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো সে মীরের নিঃসাড় দেহ, পায়ে ঘেঁষে পিছিয়ে গেলো কিছুটা! হাত জোড়া তিরতির করে কাঁপতে শুরু করলো তার! অবিশ্বাস্য চোখে একবার তাকালো সে মীরের নিস্পন্দ দেহ স্পর্শ করা নিজের কম্পমান হাতজোড়ার দিকে৷ পরক্ষণেই আকাশ বাতাস কাপিয়ে চিৎকার করে উঠলো সে!
সেই মুহুর্তেই আচমকা ঘুম ভাঙলো আনাবিয়ার! আতঙ্কে আঁতকে উঠে তৎক্ষনাৎ শোয়া থেকে উঠে বসলো সে! হাঁফাতে শুরু করলো আচমকা, দম নিতে রইলো সশব্দে, যেন এতক্ষণ দমটা আঁটকে ছিলো তার!
ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ! হাত বাড়িয়ে সাইড টেবিলের ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলো, অন্ধকার কামরাটা ভরে উঠলো সোনালি আলোয়। পাশে থাকা গ্লাস থেকে পানি খেলো সশব্দে, ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিলো তার!
আজ দু’দিন হলো মীর ঘুম থেকে ওঠেনি। সেইযে চারটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়েছে, এখনো সেভাবেই ঘুমিয়ে আছে, কোনো নড়চড় নেই তার! হেকিম এসে দেখে গেছে কয়েকবার, জানিয়েছে সে সুস্থ আছে, চিন্তার কিছু নেই৷
আনাবিয়া ঢোক গিললো, ঘড়িতে দেখলো তিনটে বেজে পনেরো। বুক কাঁপলো তার আবারও! স্বপ্নে দেখা সময়ের সাথে বাস্তব সময়ের কেন মিল হলো সেটা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো সে৷ ব্যাস্তপায়ে ছাড়লো বিছানা।
দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিয়ে একবার দেখলো মীরকে। ঘুমিয়ে আছে সে বিছানায়, চিৎহয়ে। মাথাটা নেমে গেছে বালিশের ওপর থেকে। শ্বাস…. শ্বাস কি পড়ছে?
আনাবিয়ার বুক কাঁপলো, মনোযোগী চোখে দেখলো মীরের উন্মুক্ত বক্ষ, উদর। কিন্তু ক্ষণিক তাকিয়ে থেকেও তাদের কোনো নড়চড় দেখতে না পেয়ে শঙ্কিত পায়ে ছুটে গেলো মীরের কাছে।
এক হাত পুরুষালি, বলিষ্ঠ বক্ষপরে রেখে অন্য হাত রাখলো মীরের নাসারন্ধ্রের সম্মুখে। হৃৎপিণ্ডটি ধুকপুক করছে, ধীরে! শ্বাসটাও মৃদু, যেন নেই! আনাবিয়ার স্পর্শে যেন একটু জোরালো হলো তার হৃৎপিণ্ডের গতি, শ্বাসটিও দ্রুততর হলো পূর্বের তুলনায়।
আনাবিয়া স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বসলো মীরের পাশে, মাথাটা আলগোছে উঠিয়ে দিলো বালিশে। ক্ষণিক মীরের মুখপানে চেয়ে থেকে আচমকা খুব মায়া হলো তার, মনে পড়লো পূর্বের কতশত সুখময় স্মৃতি!
এই নিষ্ঠুর, ব্যাস্ত লোকটিকে সে ভালোবাসে, অসম্ভব রকম ভালোবাসে। এই বিশাল পৃথিবীতে যদি কাউকে সে সত্যিকার ভালোবেসে থাকে তবে সেটা মীরই! এই একটি মানুষের স্থানে সে অন্য কাউকে কখনো ভাবতে পারেনি, কোনোদিনও নয়! কখনো পারবেও না, তার পক্ষে সেটা অসম্ভব!
নরম হাতে মীরের ঝাকড়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো আনাবিয়া। কতদিন হলো সে মীরের পাশে ঘুমোয় না, মীরের বাহুডোরে বন্দি করেনা নিজেকে। অথচ এমনও দিন গেছে তার যখন মীরকে এক মুহুর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেয়নি, মীরের স্পর্শ হতে এতটুকু সময়ের জন্য দূরে সরায়নি নিজেকে।
কতগুলো দিন…. কত্তগুলো দিন!
কি হবে মীরের? সে কি মারা যাবে? সে কি বাঁচবেনা? সে কি আর আনাবিয়ার কাছাকাছি থাকবেনা? এই প্রাসাদে তবে আনাবিয়া একা হয়ে যাবে? মীরের অবর্তমানে সে কি এই প্রাসাদে থাকবে? কখনো থাকবে? থাকতে পারবে? যেখানে মীর নেই সেখানে সে কিভাবে থাকবে? মীর….. মীর এ পৃথিবীতে না থাকলে সে কোথায় যাবে? সে কিভাবে…. সে কিভাবে মীর বিহীন এ পৃথিবীতে থাকবে? এ সুন্দর পৃথিবী যে মীরের অনুপস্থিতিতে তার কাছে গরলসম ঠেকবে!
প্রশ্নগুলো জলোচ্ছাসের মতো বারংবার বাড়ি খেতে লাগলো আনাবিয়ার মস্তিষ্কের ভেতর৷ চোখের সামনে ভেসে উঠলো ক্ষণিক পূর্বের দুঃস্বপ্নটি! মীরকি তবে ওভাবেই মারা যাবে? অতটা কষ্ট পেয়ে? সে কিভাবে দেখবে মীরের মৃত্যু? কিভাবে সহ্য করবে? সে তো শেষ হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে সে!
আচমকা ঘুমের ভেতরেই অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠলো মীর, কপালে ভাজ পড়লো তার! আনাবিয়া সচকিত হয়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ, তাকালো মীরের যন্ত্রণায় কুচকে আসা ভ্রু জোড়ার দিকে। মাথা যন্ত্রণাটা কি তবে এতই পীড়া দিচ্ছে তাকে? এই গভীর ঘুমের ভেতরেও তাকে এতটুকু নিস্তার দিচ্ছেনা যন্ত্রণাটা!
হাত রাখলো আনাবিয়া ওর কপালের ওপর, বৃদ্ধাঙ্গুলি বুলিয়ে দিলো ললাটপরে। ক্ষণিক পরেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো মীরের ভাজ পড়া কপাল। মীরকে শান্ত হতে দেখে হাত সরিয়ে নিলো আনাবিয়া, তখনি আবার অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠলো মীর!
যন্ত্রণা হচ্ছে তার, ভীষণ যন্ত্রণা! এমন শক্তপোক্ত মানুষটিকেও ঘায়েল করে ফেলছে সে, এতই তীব্রতা তার! এ যন্ত্রণা তার মীরি কিভাবে সহ্য করবে? কেন সে সেদিন লাইফ ট্রিকে বাধ্য করেছিলো মীরের মেমোরি ডিলিট করতে? কেন সে এতটা যন্ত্রণা দিলো মীরকে? তার কাছে কি আর কোনো উপায় ছিলোনা? অন্য কোনোভাবে কি মীরকে শাস্তি দেওয়া যেতোনা? এভাবেই কেন? কি ভেবে সে এমনটা করেছিলো? এখন কি করলে কমবে এই যন্ত্রণা? কি করলে একটু শান্তিতে ঘুমোবে মীর? একটু তৃপ্তি ভাসবে তার মুখপরে!
বুক ফেটে কান্না আসতে চাইলো আনাবিয়ার। তার জন্যই তো এমন হয়েছে, তার বোকামির জন্যই! তার জন্যই আজ মীরকে এত ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে, এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে! ঘুমিয়েও তার শান্তিটুকু নেই, ঘুমও তাকে ব্যাথা থেকে নিস্তার দিচ্ছে না!
ভাবতে ভাবতেই আচমকা স্থীর হয়ে গেলো আনাবিয়া, অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক হয়ে এলো তার অস্থির, অসহায় মুখশ্রী। উঠে গেলো সে মীরের পাশ থেকে, নিজের কামরায় ফিরে গিয়ে হাতে তুলে নিলো মাথার বালিশখানা, ফিরে এলো আবার এ কামরায়।
মীরের শ্বাস পড়ছে ঘন ঘন, ঘুমের ভেতরেই যন্ত্রণার তীব্র দংশনে সাড়াশির ন্যায় আঙুলগুলো দিয়ে খামচে ধরছে সে বিছানা! ভ্রুদ্বয় কুচকে যাচ্ছে বারেবার, মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে এক অস্ফুট আর্তনাদ!
আনাবিয়া দুহাতে বালিশটা ধরে নিয়ে দাঁড়ালো মীরের শিয়রে। ক্ষণিক তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট, শ্যামরঙা মুখখানার দিকে চেয়ে থেকে আচমকা সজোরে বালিশ চেপে ধরলো মীরের মুখের ওপর!
ঘুমন্ত মীর শ্বাসে বাধা পাওয়া মাত্রই ছটফটিয়ে উঠলো, ঘুম ভাঙলো তার তৎক্ষনাৎ! হতচকিত হয়ে চাপা আর্তনাদ করে উঠে সে মুখের ওপর থেকে সজোরে ছিনিয়ে নিলো বালিশখানা, ক্ষিপ্র বেগে ছুড়ে ফেললো মেঝেতে! পরক্ষণেই হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে বসে হতবাক চোখে তাকালো আনাবিয়ার দিকে!
আনাবিয়া হুশ ফিরলো যেন, আতঙ্কিত হয়ে একবার মেঝেতে পড়ে থাকা বালিশ আরেকবার মীরের হতভম্ব মুখপানে চাইলো সে। নিজের এহেন কর্মে শঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম, ভীতসন্ত্রস্ত চোখে তাকালো মীরের দিকে! এটা সে কি করতে চলেছিলো! কিভাবে সে এমন কিছু করতে যাচ্ছিলো!
মীর ক্ষণিক অবিশ্বাসী, দ্বিধাভরা চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার শঙ্কিত, বিপর্যস্ত মুখপানে; যেন আনাবিয়াকে চিনতে অসুবিধা হলো তার। এই আনাবিয়া যেন সে নয় যাকে সে চিনতো এতদিন, এ যেন অন্য কেউ!
আনাবিয়া ঢোক গিললো, ভয় হলো তার ভীষণ ভয়! ঘেমে উঠতে শুরু করলো কপাল, গরম হয়ে উঠলো মাথার তালু। মীর ওর দিকে দৃষ্টি রেখেই ধীর পায়ে নেমে এলো বিছানা থেকে। ওকে নামতে দেখেই প্রমাদ গুণলো আনাবিয়া, আতঙ্কে দম আঁটকে এলো তার! চোখের সামনে ঘনিয়ে আসতে রইলো আঁধার!
মৃদু পায়ে মীর এগিয়ে এলো ওর দিকে। আনাবিয়া কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আচমকা কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটে পালাতে নিলো কামরা ছেড়ে, কিন্তু মীর তৎক্ষনাৎ নিজের শক্ত মুঠিতে ধরে ফেললো তার হাত, হ্যাচকা টানে নিয়ে এলো নিজের বুকপরে। আনাবিয়া ঝড়ে পড়া চড়ুই পাখিটির মতোন কাঁপতে রইলো; মীরকে আঘাত করতে চাওয়ার অপরাধবোধে, শঙ্কায়, উৎকন্ঠায়!
মীর দুহাতের ভেতর আঁকড়ে ধরলো ওর অস্থির, ভীত, মোলায়েম মুখমণ্ডল। হীরকখণ্ডের ন্যায় ঝলমলে, জল চিকচিকে চোখ জোড়ায় দৃষ্টি রেখে স্নিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“মেরে ফেলতে চাও আমাকে?”
আনাবিয়া দুদিকে মাথা নাড়লো সজোরে! চায়না সে মীরকে মেরে ফেলতে, একদমই চায়না! একটু আগে তার কি হয়েছিলো সে নিজেও জানেনা! মীরকে এই তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলো শুধু, এ ছাড়া আর কিছুই নয়! ঠোঁট ফুলে উঠলো আনাবিয়ার, চোখ জোড়া ভর্তি হলো লোনা জলে।
মীর নীরিক্ষণী চোখে দেখলো ওর মুখখানা, নানা কারণে ওর মনোযোগ দেওয়া হয়নি ওর শিনজোর দিকে। অবহেলা সইতে পারেনা ওর প্রাণ, সইতে পারেনা এতটুকু অমনোযোগীতা! ওর ব্যাস্ততা, ওর নানা রকম কাজ ভীষণ রকম প্রভাব ফেলছে ওর শিনজোর নরম, কোমল মনের ওপর! এমনটা তো সে চায়নি, ওর শিনজোকে একটু স্বস্তি দেওয়ার জন্যই তো এত দৌড়ঝাপ ওর!
তবে ওর শিনজো এতটা আতঙ্কিত কেন? এতটা দূরের কেন? এতটা দ্বিধান্বিত কেন? সে কিভাবে উপেক্ষা করে গেলো তার শিনজোর মানসিক স্বাস্থ্যের এই অবনতি!
মৃদু ভঙ্গিতে কপাল ঠেকালো সে আনাবিয়ার শুভ্র ললাটে, চোখ জোড়া বন্ধ করে শুধোলো,
“আমাকে মেরে ফেললে তোমার ভালো লাগবে?”
ফুপিয়ে উঠলো আনাবিয়া। ভালো লাগবে না তার, একদমই ভালো লাগবে না! মীরকে করা আঘাত যে তার হৃৎপিণ্ডেই দ্বিগুণ জোরে আঘাত করবে প্রতিবার! মীর দুহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো ওকে, শক্ত করলো বাহুবন্ধনী, আনাবিয়াকে প্রায় পিষে নিলো নিজের বুকের ভেতর। শুধোলো,
“কি হয়েছে তোমার?”
“তুমি… তুমি আমাকে আর ভালোবাসোনা!”
ফুঁপিয়ে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর হাসলো মৃদু, শুধোলো আবার,
“কে বলেছে ভালোবাসিনা?”
“আমি বলছি।”
“ওই বলদের কথা বিশ্বাস করিওনা।”
আনাবিয়ার কপালে ঠোঁট ছুইয়ে বলে উঠলো মীর। তাকে বলদ সম্বোধন করায় নাকের পাটা ফুলালো আনাবিয়া, কান্নাজড়ানো উগ্র স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“সত্য বললেই তো আমি বলদ হয়ে যাই, তাই না? ভালোবাসো তুমি আমাকে?”
“বাসি।”
মোলায়েম স্বরে উত্তর করলো মীর, ঠোঁট জোড়া এখনো ছোয়ানো আনাবিয়ার কপালে। আনাবিয়া নাক টেনে কান্না আটকালো, শুধোলো,
“কতখানি?”
“অনেক!”
“কত অনেক?
“অনেক অনেক!”
উত্তর করেই আনাবিয়াকে বুকের সাথে চেপে ধরে এগোলো বিছানার দিকে। আনাবিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্নিগ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“পাগলী হয়ে যাচ্ছো দিনে দিনে, ঠেসে ঠেসে আদর খাওয়ানো দরকার তোমাকে।”
আনাবিয়া ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফটিয়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ, কিন্তু মীর ছাড়লোনা ওকে এতটুকুও, বুকে জড়িয়ে ধরেই এগিয়ে গেলো নিজের বুক শেলফের দিকে। সেখানের একটি মোটাসোটা বই সরাতেই দেয়ালে দেখা দিলো একটি ছোট্ট লাল রঙা বাটন। চাপতেই আচমকা গমগমে শব্দে কামরার ছাদ হতে চারদিকের দেয়াল ঘেঁষে নামলো কাঁচের দেয়াল, মেঝে স্পর্শ করা মাত্রই একটি আর্টিফিসিয়াল ভয়েস বলে উঠলো,
“সাউন্ডপ্রুফ”
আনাবিয়া আঁতকে উঠলো তৎক্ষনাৎ, ছাড়া পেতে ছটফট উঠতেই ওকে সজোরে বুকে চেপে ধরে নাক নাক ঘঁষলো মীর, পরক্ষণেই তার আগ্রাসী চুম্বনের আক্রমণে হাঁসফাঁস করে উঠলো আনাবিয়া। নিজেকে মীরের বাহুবন্ধনী হতে মুক্ত করার জন্য বিদ্রোহী হয়ে উঠলো তার শরীর, আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো মীরকে! কিন্তু তার বিদ্রোহ টলাতে পারলোনা মীরকে এতটুকু। আনাবিয়ার ওপর ক্রমে শক্তিশালী, অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলো তার আধিপত্য। অতঃপর একসময় তার দৃঢ় আধিপত্যের সম্মুখে নত হয়ে হার মানতে বাধ্য হলো আনাবিয়ার বিদ্রোহী শরীর!
ঘুম ভাঙতেই আনাবিয়াকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে তৃপ্তিতে মন ভরে উঠলো মীরের। নিষ্পাপ মুখশ্রীতে তুষ্টি ছাপানো, টেরাকোটা ঠোঁট জোড়ায় মৃদু বাক। উন্মুক্ত, সফেদ বক্ষ জুড়ে প্রকট হয়ে আছে মীরের উন্মত্ততার চিহ্ন। শুভ্র চুলগুলোর কয়েকটি এসে দখল করেছে মোলায়েম মুখখানা।
মীর চোখ কচলে ভালো ভাবে দেখলো আনাবিয়াকে, বিড়ালের মতোন চুপটি করে শুয়ে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে তার প্রাণ। মনে চাইলো এই তৃপ্তিময় ঘুমটা ভাঙিয়ে চেপে চেপে আরেক দফা আদর খাওয়াতে, কিন্তু নিজেকে সামলে নিলো সে। এত্ত আদুরে ঘুম ভাঙানোর সাধ্য যে তার নেই!
মুখের ওপর থেকে সফেদ চুল গুলো আলতো হাতে সরিয়ে কপালে টুপটাপ কতকগুলো চুমু খেলো মীর। অবশেষে একটু শান্ত হয়েছে তার ছোট্ট বউটা, কিছুদিনের জন্য বিদ্রোহী তেজ একটু কমবে তার।
টেরাকোটা ঠোঁট জোড়ায় একটা মোলায়েম চুমু খেয়ে উঠে পড়লো মীর। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে তার ঘুমিয়ে, এগুলো যত দ্রুত সম্ভব পুষিয়ে নিতে হবে৷ ঝটপট তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। মহসিন আর ফিলোমেলা দাঁড়িয়ে ছিলো বাইরেই, মীরকে এভাবে খোশমেজাজে বেরোতে দেখে বেশ অবাকই হলো দুজনেই, অগোচরে একবার চোখাচোখি করে নিলো একে অপরকে। মীর এগিয়ে এসে প্রফুল্ল চিত্তে মহসিনকে বলল,
“সকালের খাবারটা মিটিং রুমে পৌছে দিবে মহসিন। আর আমার শিনজোর ঘুম ভাঙা মাত্রই ক্ষিদে লাগবে শিওর, ওর জন্য এখনি বিফ স্টেক আর সি ফুডের ব্যাবস্থা করো। এর বাইরে যদি অন্য কিছু খেতে চায় দিয়ে দিবে, ফাস্টফুড হলেও, তবে যেন প্রোটিনে ভরপুর হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে।”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮১
কথাটি বলে সহাস্যে, সৌহার্দের ভঙ্গিতে মহসিনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে রয়্যাল ফ্লোর থেকে বেরিয়ে গেলো মীর৷ চাপড় খেয়ে মহসিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মীরের গমন পথের দিকে। ফিলোমেলা বিস্মিত স্বরে বলে উঠলো,
“হিজ ম্যাজেস্টির নিশ্চয় কিছু হয়েছে মহসিন চাচা, ইয়াসির হেকিমকে একটা খবর দিবেন?”
“হু..? হ্যাঁ, ইয়াসির হেকিমকেই ডাকতে হবে মনে হচ্ছে। আমি যাই, তাকে গিয়ে খবর জানিয়ে আসি। তুমি শেহজাদীর খাবারের ব্যাবস্থা করো।”
বলে মহসিন স্বপ্নালু ভঙ্গিতে এগোলো মেডিক্যাল জোনের দিকে।

Next part ta taratari deben please