বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৭
ইশরাত জাহান
দাদাজানের কামরায় তড়িৎ গতিতে ছুটে আসে দিজা। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে,“দাদাজান তোমার নাতবউ গেলো।”
দাদাজান হুমড়ি খেয়ে বলেন,“গেলো মানে কোথায় গেলো?”
“বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে।”
“কেন?”
“তোমার নাতি থাপড়ে তার গালটা লাল করে দিয়েছে।সেই ক্ষোভে।”
দাদাজান কপট রাগ দেখিয়ে বলেন,“দিদার আমার বন্দুক হাজির করো।”
দিদার মাথা চুলকে বলে,“অসময়ে পাখি শিকার করতে যাবে দাদাজান?”
“আহাম্বক!এখন আমার নাতি নাতবউয়ের সংসার ঠেকাতে যাবো।”
দিজা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বলে,“তোমার পাখি শিকার করা লাইসেন্স প্রাপ্ত বন্দুক দিয়ে এখন কি করবে?”
“লাইসেন্ট যেটারই থাকুক খুন আজ আমার হাতে একটা হবেই।”
বলেই দাদাজান উঠতে নিলে পড়ে যান।বসে পড়েন বিছানায়।দিজা মুখ ভেংচে বলে,“এই শরীরে নাকি খুন করবেন!”
দিদার অট্টহাসি দিয়ে বলে,“যত যাই করো ভাইয়ের সংসার হবেনা।”
“আমিও দেখবো কতদিন এভাবে চলতে থাকে।দিদার তুমি বন্দুক এনে আমার হাতে দেও।”
বাধ্য হয়ে দিদার এনে দিলো বন্দুক।দিজা ধরলো দাদাজানের হাত।নাতনিকে ভর করে হলরুমে যাচ্ছেন দাদাজান নাতির বিচার করতে।পিছনে দিদার হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ে।
নিজ কামড়ায় এসে শোভা কল করে শামীমের নাম্বারে।শামীম ধরতেই শোভা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে,“আমি আজকেই বাড়িতে যাবো ভাইয়া।আমাকে নিয়ে যাও।”
দর্শন এসে নিজের বইগুলো ঘাটছে।শোভার দিকে ফিরেও তাকালো না।শোভাও ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।ওপাশ থেকে শামীম বলে,“কিন্তু বোন আমরা তো যশোরে নেই।আমরা গ্রামে এসেছি।তোর ভাবীর বাসায় ঘুরবো কয়েকদিন।”
শোভা জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “চাবিটাও নিয়ে গেছো?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আমরা না থাকলে চাবি কোথায় থাকবে তাই নিয়ে এসেছি।”
“আমাকে না বলেই চলে গেলে তোমরা?”
“তোর দাদাস্বশুর আঃ!”
বলেই শামীম তাকালো পাশে।মিতু চিমটি কেটে বলে,“পাগলরের মত সব বলে দিচ্ছ কেন?এতে সংসারের মায়া বাড়বে না।অজানা ভাবে ভালোবাসা বৃদ্ধি পেলেই সংসারের প্রতি টান আসবে।”
ফিসফিস করে বলে মোবাইল নিয়ে মিতু বলে,“ভালো আছো শোভা?”
“না ভালো নেই।এই জায়গার সবাই ভালো শুধু একজন বাদে।জানে না বোঝে না শুধু বকতেই থাকে।কিছু ঘটার আগেই ওনার থেকে পারমাণবিক বোমা ছুঁড়ে আসে।এমন লোকের সাথে সংসার করা যায়না।উনি বাজে লোক।”
দর্শনের কথা দর্শনকে ফিরিয়ে দিলো শোভা।দর্শনের মেজাজ গরম হলো।তাকে বাজে বলা!ক্ষেপে গিয়ে ব্যালকনিতে এসে বলে,“তখন থেকে তোমার ফালতু কথা শুনছি।আমার ঘরে থেকে আমাকে বাজে বলো।সাহস তো কম না তোমার?”
“আপনি কি খুব ভালো?আপনি কম কিছুতে না।”
কানে ফোন রেখে অন্যদিকে ফিরে দর্শনের দিকে না চেয়েই বলে শোভা।কিছুটা ভয় মেশানো কন্ঠ থাকে।ওদিক থেকে মিতু জানায়,“আমরা তো বাড়িতেই নেই।কয়েকটা দিন একটু সামলে চলো।ওটাই তো এখন তোমার বাড়ি।”
শোভা বেক্কল বনে গেলো।মিতু কল কেটে দিলো।শোভা এবার ওপাশের সারা না পেয়ে বলে,“হেলো?হেলো ভাবী হেলো?”
সাড়াশব্দ না পেয়ে শোভা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে কল কেটে গেছে।দর্শন বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বলে, “বাচালকে সুযোগ না দিয়েই কল কেটেছে।ঠিক কাজ করেছে।এখন আমার ঘর থেকে দ্রুত বিদায় হও।”
শোভা কিছু বলতে নিবে এর মধ্যেই শুনতে পায়,“ঘর কি তোমার বাপের?”
দাদাজান কামড়ায় ঢুকতে ঢুকতে বলেন।শোভা মাথায় হাত দিয়ে দেখে কাপড় ঠিক আছে কিনা।হ্যাঁ ঠিকই আছে।সাথে হাতা অব্দি এগিয়ে দেয় হিজাব।যেনো হাতের কব্জির জায়গা না দেখা যায়।দাদাজানকে দেখে দর্শন এগিয়ে এসে বলে,“এই শরীরে উঠে এলে কেন?”
“কারণ তুমিই চাওনা আমি সুস্থ থাকি।আসলে আমি সুস্থ থাকলে আমার নাতবৌ চলে যাবে।তখন তোমার কষ্ট হবে।”
“হোয়াট!”
“হোয়াট মোয়াট বাদ দেও,আমার উপদেশ মেনে নেও।চুপচাপ স্বামী স্ত্রী মিলে,একে অপরকে গ্রহণ করবে।”
“সম্ভব না!আমি এই সংসার করব না।”
একসাথে বলে দুজনে।দাদাজান অবাকের সাথে বলেন,“দুজনের মতামত তো দেখি একই।তাহলে আর কি?যেখানে স্বামী স্ত্রীর মতের মিল থাকে সেখানে সংসার সুখের থাকে।তোমাদের তাহলে বিচ্ছেদ হচ্ছেনা।”
দর্শন কিছু বলতে নিবে তার আগে দাদাজান আঙুল উঁচিয়ে বলেন,“আমাকে কিন্তু এখন আবার না খেয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ রাখতে বাধ্য করবে না।”
দর্শন রাগ নিবারণ করতে না পেরে দিলো ফুলদানিতে এক লাথি।বেচারা/বেচারি ফুলদানি মাটির ছিলো বলে শোভার পায়ের উপর পড়ে ভেঙ্গে গেলো।দাদাজান অব্দি কেঁপে উঠেছেন ভাংচুরের শব্দে।তাও যখন পরিবেশ নীরব হলে তিনিও হুংকার ছেড়ে বলেন,“একটা ফুলদানি গেলে আরো একটা আসবে।এসব ভাংচুরের ভয় পাইনা আমি।”
দিজা ছুটে এসে শোভার পায়ে হাত দিতে নেয় শোভা বলে,“আমি পরিষ্কার করতে পারব।”
পারুল বেগম ছুটে এসে শোভাকে দেখে হতাশ হয়ে দর্শনের দিকে তাকালেন।দাদাজানের দিকে আড়চোখে ফিরতেই ইশারা পেয়ে থেমে গেলেন।শোভাকে নিয়ে বের হতে হতে বলেন,”পেরেছিস তো শুধু রাগ পুষে রাখতে।এমনটা হলে বউ টিকবে না দুইদিনে।”
দর্শনের মাথায় কথাটা আবারও বারি দিচ্ছে।তবে এবার নিজেকে সামলে বলে,“বেশিদূর গড়ানোর আগেই তো আমি নিজে থেকে তাকে ছাড়তে চাই।”
দাদাজান শুনতে পান কথাটা তাই চুপচাপ দেখছেন দর্শনকে।অতীত মনে পড়তেই তারও কষ্ট লাগে
তবে তিনি আর দর্শন দুইরকম পরিস্থিতির স্বীকার।তাই একজন আরেকজনের কষ্ট বুঝবে না।
শোভাকে নিয়ে এলো পারুল বেগম।শোভা খোরাতে থাকে দেখে দীপ্ত ফরাজি প্রশ্ন করেন,“কি হলো ওর?”
“তোমার বড় ছেলের কর্ম।”
“ওর কি চব্বিশ ঘণ্টা রাগ মাথায় চেপে থাকে?”
“আর কি শিখিয়েছে তোমার বোন ওকে?মৌসুমে মৌসুমে আসবে একেকটা ভালো জিনিস খুঁটিয়ে নিবে আর কানে ফালতু পরামর্শ দিবে।সবকিছু ধরে না রাখলেও রাগ নিয়ে জীবন চলা যায় এটা শিখেছে। আর পারে মেয়েদের ঘৃণা করতে।”
“মেয়েদের ঘৃণা করবে ভালো কথা তাই বলে বউকেও ঘৃণা করবে?”
পারুল বেগম বিরক্তিতে তাকিয়ে বলেন,“কথা বলো না তো।মেয়েটার পায়ে লাল দাগ হয়েছে।দেখতে পাচ্ছো না?”
শোভা মনে মনে বলে,“আপনারা পায়ের দাগ দেখছেন উনি যে আমার গালে মারল তার বেলায়?”
শোভা পা সরিয়ে নিয়ে বলে,“আমি মলম লাগাচ্ছি।”
পারুল বেগম বাধা দিলেন না।শোভার ইতস্ততা বাড়ছে। দিজাকেও হাত লাগাতে দেয়নি।নিজ হাতে যখন পারবে বাধা দিলো না আর।নিজের পায়ে মলম লাগিয়ে শোভা বলে,“ভাইয়া ভাবী গ্রামে গেছে।আসবে কবে জানিনা।আমি কোথায় থাকবো?”
দাদাজান ঘরে ঢুকে বলেন,“তোমার স্বামীর ঘরে।”
শোভা পায়ের দিকে চেয়ে বলে, “এরপরও?”
“হ্যাঁ এরপরও।তবে এবার তুমিও তাকে এই ব্যাথা ফেরত দিয়ে দিবে।”
শোভা ভাবছে পায়ে নাহয় ছলে বলে কৌশলে ফুলদানি ফেলবে কিন্তু গালে থাপড় দিবে কিভাবে? আর কোনো ভাবে যদি দেয়ও তাহলে তখন পরিস্থিতি কেমন হবে!শোভা কল্পনা করলো,দর্শন তার গালজুড়ে টানা পাঁচ মিনিট দ্রুত গতিতে চড়িয়েই যাচ্ছে।অবশেষে চড়ানো শেষ হলে তাকে আয়নার সামনে রাখলো।নিজের গাল কেমন হতে পারে এটা আয়নায় না দেখলেও শোভা এটা বুঝতে পারলো নিজেকে কেমন বিকট দেখতে লাগবে।তাই ঘরভর্তি লোকের মাঝে দিলো এক চিৎকার।দিজা ও পারুল বেগম আতঙ্কের সাথে শোভার সামনে এসে ঝুকে পড়লেন।পারুল বেগম প্রশ্ন ছুড়লেন,“কি হয়েছে?”
শোভা কিছু জানানোর আগেই উপর থেকে আরেকটা ভাংচুরের শব্দ ভেসে আসলো সাথে চিল্লানি,“বাড়িতে মানুষ তো নয় যেন আছে গন্ডারের জাতি।”
সবাই ভয় পেলেও যেই দাদাজান বলেন,“নিজের জন্য বরাদ্দ করা কথাটা যখন নিজেই বলে শুনতে বড় হাস্যকর লাগে।”
সাথে সাথে হেসে দিল ঘরের সকলে মিলে। দিদার হাসতে হাসতে বলে,“এই বুদ্ধিগুলো নিয়ে তুমি ঘুমাও কিভাবে?”
“আমি তো ঘুমাই না।সারাদিন তোমার দাদীজানের কথা চিন্তা করি।পাষাণ মহিলা আমাকে একলা করে চলে গেছে।”
পারুল বেগম জিহ্বায় কামড় দেয়।দীপ্ত ফরাজি জানান,“বাবা এখানে বাচ্চারা আছে।”
দাদাজান চারিদিকে পরখ করে বলেন,“কোথায় বাচ্চারা?আমি তো তাদের দেখিনা।আমি দেখি কয়েকটা দামড়া বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে ছেলে।যারা এখনো বিয়েই করতে পারেনি।”
দিদার আফসোস করে বলে,“তোমার নাতির জন্যই তো আমার বিয়ে হচ্ছেনা। হবেও না আর চার বছরের আগে।”
পারুল বেগম শাসন করে বলেন,“ডাক দিবো দর্শনকে?”
দাদাজান থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আঃ বউমা!বকবে না দাদুভাইকে।সে যদি মনে করে বিয়ে করে সংসার করবে ভুল কোথায়?নিজস্ব ব্যবসা আছে।বড় ভাই যেহেতু নিজের আলাদা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করছে তারমানে ছোট ভাই একাই বংশীয় ব্যাবসা পাবে।এটাতেই তো দাদুভাইয়ের ভাগ্য খুলে যাবে।আলাদা চাকরি খোঁজার প্রয়োজনটাও নেই।”
দিদার কানে কানে বলে,“সত্যি?”
“আমি কি মিথ্যা বলি?”
“তাহলে ফারিয়াকে বলি বিয়ের ব্যাপারে বাসায় কথা বলতে?ওর বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে তো।”
“অপেক্ষা কিসের আর?এই বিয়ে করে যদি তুমি সুখে থাকো আমরাও তাই।ব্যাবস্থা যখন আছে বিয়ে হয়ে যাওয়াই ভালো।”
পারুল বেগম ভ্রুকুটি করে বলেন,“কি ফুসফুস করা হচ্ছে?”
“ওগুলো বুঝবে না দাদা নাতির কথা।আমি বলছিলাম দাদুভাইয়ের সেই বান্ধবীটির বাসায় একটা প্রস্তাব নিয়ে যাব।”
“কিন্তু বাবা ওর পড়াশোনা?”
“ব্যাবসা চালাচ্ছে পড়াশোনা করবে সংসারও করবে।”
“ব্যাবসা কোথায় চালায় ও?সেই তো আর বাপকে হুইল চেয়ার করে যেতে হয়।”
“ওটা যায় বলেই যেতে হয়।আমার দাদুভাই একেবার যে কাজে অমনোযোগী তাও না।”
“তাই বলে বাইশ বছর বয়সী ছেলে বিয়ে দিবেন?”
“বয়স অল্প না বউমা তোমাদের আধুনিকতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।একটা ছেলে বিয়ের জন্য আঠারোতেই পরিপক্ব হয়ে যায়।তাও আমি ধরে নিলাম পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়তে সময় লাগে।কিন্তু এর মাঝেও অনেকে উচ্ছন্নে যায় আবার অনেকে সুযোগ থাকতেও সুযোগ হারায়।যেখানে দিদারের একটা সুযোগ আছে নিজের পরিবারের মাধ্যমে আয় করে সংসার করার,সেখানে কেন সে একটা মেয়েকে ভালোবেসে তার থেকে দূরে থাকবে?এতে কি আমরা আহামরি ঠিক কিছু করব?আমরা দুটো মনের বাধা তৈরি করছি।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬
দীপ্ত ফরাজি একটু ভেবে বলেন,“দেখো তাহলে মেয়েটার আচার আচরণ কেমন,পারিবারিক চলাফেরা দেখে ভালো লাগলে নাহয় আগাবে।”
দিদার খুশি হয়ে দাদাজানকে জড়িয়ে ধরে।পারুল বেগম একবার ছেলেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।শোভা ভাবছে সে কিভাবে থাকবে রাতে ওই লোকের সাথে?
