Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭ (২)

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭ (২)

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭ (২)
ইশরাত জাহান

পিরোজপুর এসে গাড়ি থামতেই দর্শন দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ছুট লাগাল দাদাজানের সেই পুরাতন ঘরটিতে।সবাই হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখতে থাকে।মিতু এসে শামীমের কানে বলে,“অবশেষে আমার ননদের সংসার সুখের হতে চলল।”
শামীম স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।দাদাজান এগিয়ে আসলেন তুহিনের দিকে।তুহিনের মধ্যে ছটফটানি কাজ করছে কিন্তু ও সবার সামনে থেকে ছুটে গিয়ে দিজাকে জড়িয়ে ধরার দুঃসাহস পায়না।বিষয়টি দাদাজান ঠাওর করতে পেরে বলেন,“নাটক কম করো নাতজামাই।”
“কিসের নাটক দাদাজান?”
“আমার নাতনির কাছে যেতে মন চাইছে তোমার।”
মাথার পিছনে হাত দিয়ে মুখ মাথাটা নিচু করে লাজুক হেসে তুহিন বলে,“ব্যাপারটা এমন না।”
“ব্যাপারটা কেমন বাপু?”

তুহিন চুপসে গেলো।কোনো উত্তর খুঁজে পায়না।দাদাজান বলেন,“স্বামী তার বউয়ের কাছে যাবে।এটা হলো গর্বের কাজ।আমার নাতিকে দেখেছো?ছুটে গেলো বউয়ের কাছে।গুরুজনদের মানলো না বেশরম একটা।তুমিও একটু বেশরম হও তো।আমার নাতনি তাহলে সিনেমার হিরো পাবে।”
তুহিন ধীর কন্ঠে দাদাজানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,“বলছেন তাহলে?”
দাদাজান সাহস দেখিয়ে বলেন,“একদম,সিনেমার হিরোদের মত যদি হিরোইনের পিছনে ঘুরঘুর করতে না পারো তাহলে তাহলে তুমি কোন গ্রহের হিরো?”
“আপনি যখন সম্মতি দিচ্ছেন আমি নিজেকে হিরো হওয়া থেকে আটকাতে পারিনা দাদাজান।”
“তাহলে দেখিয়ে দেও তোমার হিরোগিরি।”

তুহিন সামনে তাকালো।দিজা বের হলো।সাথে আছে শোভা।শোভার মুখ ঢেকে রাখা হিজাব দিয়ে।দিজা নিজের সালোয়ার কামিজ পরিহিত।খোপা করে সেখানে কাটা দিয়ে আটকে দেওয়া।দুজনকে দেখে তুহিন নিজেও ছুটে গেলো।অবাক হয়ে তাকালো দিজা।আচমকা দর্শন যখন তুহিনকে ছুটে আসতে দেখে নিজেকে আটকে নিলো।অন্যদিক থেকে দিজাও এগিয়ে আসছে।দুজনেই এখন সামনাসামনি খোলা আকাশের নিচে।তুহিন হাঁফাতে হাঁফাতে তাকালো একবার পিছনে।দাদাজানের দিকে তাকাতেই দাদাজান ভ্রু নাচালেন।চশমার আড়ালে চোখ টিপে হেসে দিলো তুহিন।দর্শন দুজনের কাণ্ড দেখছে।এর মাঝেই সবাইকে অবাক করে দিজাকে উঁচু করে ধরে তুহিন।নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো দিজা।আচমকা আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ে।তুহিন খুশিতে দিজাকে নিয়ে গোল আকারে ঘুরতে শুরু করে।দিজার খোপা খুলে গেলো।তুহিনের পাগলামি দেখে সবাই হেসে দিলেও শামীম পিছনে ঘুরে তাকায়।ও এসব কখনও দেখেনি আগে।লজ্জাও পায়।মিতু মুখ টিপে হেসে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলে,“ওহে নিরামিষ পুরুষ কিছু শিখো এদেরকে দেখে।”

শামীম নাকমুখ কুঁচকে বলে,“এসব দেখাও পাপ।পিছন ঘুরো তাড়াতাড়ি।ওরা গোপন কাজ করছে।”
মিতু ফিক করে হেসে বলে,“নাদান স্বামী আমার।”
দিজাকে নামাতেই দর্শন এগিয়ে আসল।শক্ত মুখ করে বলে,“মাত্রই একশন নিতে যাচ্ছিলাম।মাঝখান থেকে তুই এন্ট্রি নিলি কেন?”
“তোকে কে আটকে রেখেছে ইয়ার?তুই যা না তোর বউয়ের কাছে।আমি তো আমার বউয়ের কাছে এসেছি।”
“ওই পর্যন্ত যেনো সীমাবদ্ধ থাকে।অন্য কোনো মেয়ের দিকে যেনো নজর না যায়।”
“তোর বন্ধু আমি।আস্থা নেই আমার উপর?”
“আস্থা আছে কিন্তু শয়তান তো মানুষের সাথেই বাস করে।বলা যায়না কার ঘাড়ে কখন চেপে বসে হাসিখুশি সংসার ভাঙতে।তাছাড়া ভাই হিসেবে আমার বোনকে সুখে দেখাটা আমার দায়িত্ব।”
“তোকে চিন্তামুক্ত হতে বলব না।কারণ কথা না দিয়েই তোর বোনের সুখের সংসার আমি করে দেখাবো।”
দর্শন মৃদু হেসে তুহিনের ঘাড়ে আলতো চাপড় দিয়ে চলে যায়।এগিয়ে আসে শোভার নিকট।বড় বড় চোখজোড়া চেয়ে আছে স্বামীর দিকে।দর্শন হাত বাড়াতেই শোভা পিছিয়ে যায়।চোখ ভিজে আসে।কাঠকাঠ গলায় বলে,“দূরে থাকুন।”
দর্শন কাতর হয়ে বলে,“অনেকদিন পর দেখা।একটু আলিঙ্গন করতে দেও প্লিজ ওয়াইফি।”

“অসম্ভব।”
“কেন অসম্ভব?”
“আমাদের বিয়ের চুক্তি অনুযায়ী আজ শেষদিন।তালাক হবে আমাদের।কেনই বা অহেতুক আলিঙ্গন করবো আমি?”
দর্শনের মাথায় যেনো কেউ পাথর ছুঁড়ে মারে।মাথা ঝিমঝিম করে।দাঁত খিচে বলে,“কে বলল তালাক হবে?”
“দাদাজান জানিয়েছেন।”
দর্শন পিছন ফিরে তাকাতেই দাদাজান বুক ভার করে সাহসিকতার সাথে বলেন,“একমাসের চুক্তি শেষ।এবার তো তোমাদের তালাকের পালা।”
“আমার তালাক নিয়ে তুমি এত উৎসাহিত কেন?”
“ওমা,তোমার সাথে নাতবউয়ের তালাক হলে নাতবউকে আবার একটা বিয়ে দিবো।সেখানে আমি মজার মজার খাবার খাবো। আহ!বিয়ে বাড়ির ঘ্রাণ।এখনই নাকে এসে বারি দিচ্ছে।”
“বেশি বিয়ে বাড়ির খাবার খেতে চেওনা দাদাজান।দেখা যাবে কারো চল্লিশার আয়োজন হয়ে যাবে সেখানে।”
পারুল বেগম মুখ টিপে হাসেন।দাদাজান ধমকে বলেন,“এই শিক্ষা দিয়েছো তোমার ছেলেকে?”
পারুল বেগম নরম কণ্ঠে বলে,“ছেলেকে রাগাচ্ছেন কেন আব্বা?”

অতঃপর দর্শনের দিকে ফিরে বলে,“দাদাজান তোমাদের সাথে মজা করেছে।”
দাদাজান বিরোধ করে বলেন,“কিসের মজা?এই ছোকরা যা শুরু করেছে।আমি কবে বড় বাবা হবো?আমার বংশে কি আর নতুন প্রজন্ম আসবে না?ওদেরকে নিয়ে তো ভরসা পাইনা।”
দীপ্ত ফরাজি গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন,“কি হচ্ছে কি?ছেলে মেয়েরা আছে তো এখানে।”
“ছেলে মেয়েরাই তো নতুন প্রজন্ম নিয়ে আসবে।এখানে ভুল কিছু তো বলিনি।বংশের এক প্রজন্ম শেষে আরেক প্রজন্ম আসে।এটাই স্বাভাবিক।আমার বাবার পর আমি এসেছি আমার পর তুমি তোমার পর আমার নাতি এখন পরবর্তী ধাপ বাকি।এখানে হিমশিম খাওয়ার কি আছে?”
“ওদের সামনে এসব না বললেই কি না?”
“আমার বংশের বৃদ্ধি করবে ওরা আমি ওদেরকে এডভাইস দিবো নাকি অন্যদের দিবো?”
“তোমার সাথে আমি পারব না।”

“পারতেও হবে না।পোড়া কপালে একটা নাতি পেয়েছি আমি।বিয়ের বয়স চার থেকে পাঁচ বছরে চলতে গেলো কিন্তু তারা বাবা মা হবার খবর দিতে পারল না।আমি কি মরার আগে বড় বাবা হবো না?অক্ষম জীবন নিয়ে আবার দেমাগ দেখাবে।”
দর্শন আর শোভা থমকে দেখছে।কি থেকে কি হলো!দর্শন ভ্রুকুটি করে বলে,“বাই এনি চান্স তুমি কি আমাকে খোঁচা মারলে দাদাজান?”
“সরাসরি যদিও বলি তুমি বাবা হতে অক্ষম তাহলে কি কথা ভুল?”
“দাদাজান ভালো হচ্ছে না কিন্ত।”
“কিছুই তো ভালো হচ্ছে না এমনিতেও।তাড়াতাড়ি তালাকের কাজ সেরে নেও তো।তোমার বউকে আবার নতুন করে সংসার গোছানোর ব্যবস্থা করে দিবো।”

“তালাক দিতে পারলাম না তুমি তো দেখি আমার বউয়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়েও ভাবতে শুরু করেছো।”
“অবশ্যই ভাববো। আমিই তো ভাববো।মেয়েটার মায়ের কাছে আমি ওয়াদাবদ্ধ।ওকে সুখে রাখবো বলে ওয়াদা করেছি এক মৃত ব্যক্তির কাছে।পালন তো করতেই হবে।”
“সে নাহয় ভালো কথা আমার শাশুড়ির কাছে ওয়াদা করেছো।তাই বলে তালাকের কথা উঠবে কেন?”
“মেয়েটার সুখের জন্য।”
“আমার বউয়ের সুখের জন্য আমি আছি।”
“তোমাদের সংসারটাই তো সুখের না।”
“তোমার মতো দাদাজান থাকলে সংসার সুখের এমনিতেই হবেনা।”
“কতবড় বাটপার হলে আমার দিকে দোষ ঘুরিয়ে দেয়।”
“আমার বউকে কিডন্যাপ করে আমার থেকে দূরে রেখে আবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করো?”
“বেশ করেছি কিডন্যাপ করেছি।”

“তোমার ভাগ্য ভালো তুমি আমার দাদাজান।অন্য কেউ হলে আমার বউকে কিডন্যাপ করার জন্য জেলে চলে যেতো এতক্ষণে।”
দাদাজান হেঁয়ালি হেসে বলেন,“এই দিলদার ফরাজিকে জেলের ভয় দেখাইও না ছোকরা।আইনকে আমিও কিনতে জানি।”
শোভা ছাউনি থেকে নেমে শামীমের দিকে এগিয়ে গেলো।মনক্ষুন্ন কণ্ঠে বলে,“আমার জন্য তোমাদের অনেক কষ্ট হলো?”
শামীম আদরে আগলে নিয়ে বলে,“তোর সুখ দেখার জন্য এটা তো কিছুই না বোন।”
মৌলিকে কোলে নিলো শোভা।আদর করে চুমু দিয়ে বলে,“কেমন আছে আমার সোনা?”
মৌলি ফোকলা হেসে বলে,“খুব ভালো।”
শোভা জড়িয়ে ধরে মৌলিকে।শান্তি পেলো অনেকটা।বাচ্চা মেয়েকে জড়িয়ে।দাদাজান এবার দর্শনকে ইশারা করে বলেন,“দেখেছো তো মেয়েটা বাচ্চা পেয়ে কত খুশি।”

“দেখেছি।”
“কি বুঝলে তাহলে?”
“একটা বাচ্চাকে বাচ্চা গিফট করতে হবে।”
সবাই ভাবনায় পড়ে।বাচ্চাকে বাচ্চা মানে?দাদাজান ভাবতে ভাবতে বলেন,“একটু ঝেড়ে কেশে বলোতো।”
“অত কষ্ট করতে পারব না।বুদ্ধি থাকলে বুঝে নেও।”
দাদাজান ভাবনায় পড়লে দিদার কানের কাছে এগিয়ে এসে বলে,“ভাই ভাবী মিলে তোমাকে বড় বাবা হওয়ার ব্যাবস্থা করবে। মানে আমি কাকা।”
“তো!বাচ্চাকে কিভাবে বাচ্চা দেয়?”
দর্শন বুকে হাতভাঁজ করে বলে,“তোমার নাতবউয়ের মতো বাচ্চা মেয়েকে আর কিই বা বলা যায়?”
শোভা ক্ষেপে বলল,“আমি মোটেও বাচ্চা না।যথেষ্ট বড় হয়েছি আমি।”
“হ্যাঁ,বাচ্চার মা হলেই বুঝতে পারবে সবাই।”
“আপনি কি গুরুজনদের মেনে কথা বলতে পারেন না?”
“আমি গুরুজনদের অমান্য করলাম কখন?”
“আপনি কি শুরু করলেন?”

“এখনও তো শুরুই করলাম না।ইতিমধ্যে ঘামছো?”
দাদাজান নিজেই এবার লাজুক হেসে বলেন,“ইয়ে মানে আমি আছি এখানে।”
দর্শন ইচ্ছাকৃত বুঝেশুনেই বলে,“তো?তুমি আছো তাতে কি?”
“আমার সামনে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলতে নেই।”
“দুষ্টু কথা কোথায় বললাম?তুমি বড় বাবা হতে চেয়েছো আমি রাজি হয়েছি।আমার ক্ষমতা নিয়েও কথা উঠিয়েছিলে।ভাবছি আজকে থেকেই আমার ক্ষমতা দেখিয়ে দিব।প্রস্তুত থাকো দাদাজান।”
“লে হালুয়া!বাবা হবে তুমি প্রস্তুত কেন হবো আমি?”
পারুল বেগম দীপ্ত ফরাজিকে নিয়ে চলে গেলেন।তার লজ্জা লাগছে।শামীম চলে গেলো অন্যদিকে।মিতু আর গেলো না।দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছে।তুহিন আলতো ধাক্কায় ইশারা করে দিজাকে।অন্যপাশে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত দেয়।দিজা না করে মজা নিতে থাকে।দর্শন উঠেপড়ে লেগেছে দাদাজানকে আজ হারাবে।তাই বলে,“আমার একেকটা বাচ্চা তুমি সামলাবে তাই।”

“বাচ্চা তোমার আমি সামলাবো কোন দুঃখে?”
“দুঃখে না বরং বলো সুখে।পরবর্তীতে আবারো বাবা হবার প্রস্তুতি নিতে হবে আমাকে।”
“আবার!”
“অফ কর্স আবার।আমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তো তোমার দুশ্চিন্তা বেশি।প্রমাণ ছাড়া আমার ক্ষমতা নেই বলে দাবি করেছো।এখন ক্ষমতাটা দেখিয়েই দিতে হয়।কি বলো?”
“তোমার ক্ষমতা তুমি দেখাবে।আমার কাছে এসব বলছো কেন?”
“প্রস্তুতি নেবার জন্য।”
দাদাজানের মাথা ভনভন করতে শুরু করে। নাতি তার পেকেছে।দাদাজান হালকা কেশে বলেন,“ইচড়ে পাকা একটা।”
“বয়স বাড়ছে আমার।পাকতে তো হবেই।”
“ধুর!পাগল ছাগলের সাথে কথা বলতে আমার মন চাইছে না।আমি গেলাম।তুমি তোমার ক্ষমতা নিয়ে যা খুশি করো।”
বলেই চলে যায় দাদাজান।দিদার দৌড়ে গেলো পিছন পিছন।তুহিন এবার দিজাকে উদ্দেশ্য করে বলে,“ওদেরকে স্পেস দেওয়া উচিত।”

দিজা সম্মতি দিয়ে চলে গেলো।মিতু ভাবীও শোভার কোল থেকে মৌলিকে নিয়ে চলে গেলো।জায়গাটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে।সবাই চলে যেতেই শোভার উদ্দেশে দর্শন বলে,“চলো।”
শোভা কেঁপে উঠে বলে,“কোথায়?”
“ঘরে।”
“এখন!”
দর্শনের হাসি পেলো।শোভা ঘাবড়ে আছে।দর্শন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,“হ্যাঁ এখন।বোঝাপড়া বাকি আছে তো।”
এই কাঠফাটা রোদেও শোভার গা কেঁপে ওঠে।ঘেমে আছে তাও মনে হচ্ছে চারিদিকে ঠান্ডা বাতাসের শিহরণ।কাপা কাপা কণ্ঠে বলে, “ন না।”
“আরে চলো।”
“কি শুরু করলেন কি?”
“যা এতদিন করিনি তাই শুরু করতে হবে।”
বলেই শোভাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেলো ঘরে।দরজা আটকে দিতেই দুর থেকে দাদাজান দেখে বলেন,“কতবড় ফাজিল।”

“তোমার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত।”
দীপ্ত ফরাজি কথাটা বলতেই দাদাজান মুখ ভেংচি দেন।গ্রামের আত্মীয়রা এসেছে দাদাজানের সাথে দেখা করতে।তাদের সাথে আলাপ করতে থাকেন।
পুরোনো কাঠের দরজা লাগাতেই মড়মড় শব্দ হয়।কেঁপে ওঠে শোভা।দর্শন পিছন ঘুরে শোভার দিকে এগিয়ে আসতে নেয়।শোভা হুমকি দিয়ে বলে,“ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।কাছে আসবেন না একদম।”
“কাছে না আসলে তুমি মা হবে কীভাবে ওয়াইফি?”
“আপনি!”
“হ্যাঁ আমি?”
“আপনি বড় নির্লজ্জ।”
“আসো তোমাকেও নির্লজ্জ বানিয়ে দেই।”
“না,আমি মোটেও নির্লজ্জ হতে চাই না।”
“ওকে ফাইন।তাহলে আমার নির্লজ্জতা উপভোগ করো।”
“আপনার নির্লজ্জতা উপভোগ করব মানে?”
“কথায় না কাজে বুঝিয়ে দিচ্ছি।”

বলেই শোভার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের নিকট আনলো দর্শন।শোভা ফেলফেল করে তাকালো।শোভার হিজাবের বাঁধন পিছন থেকে খুলতে থাকে।বাঁধন খুলতেই নাকের উপর থেকে কাপড় নিচে পরে যায়।শোভার ওষ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয়ে তাকালো দর্শন।এই ওষ্ঠ কাপতে শুরু করেছে।শোভার দুই বাহুতে দর্শনের হাত।আজ শক্ত করে ধরেনি বরং আগলে নেওয়ার মতো আছে।শোভা ঢোক গিলে।দর্শন বুঝতে পারে শোভার মধ্যে এক ছটফটানি কাজ করছে।যদিও দর্শনের উদ্দেশ্য ছিল শোভাকে ক্ষেপিয়ে দেওয়া কিন্তু শোভার মধ্যে ছটফটানি দেখে নিজেকে দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ দর্শন।শোভার ওষ্ঠ নিজের দখলে নিলো।শোভার চোখটা বরাবরের মতো বড় হলো।দর্শন অনুভব করছে শোভা কাপছে।কিছুক্ষণ পর শোভাকে ছেড়ে শোভার আপাদমস্তক দেখে।ঘেমে গেছে মেয়েটা।দর্শন ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে বলে,“আর ইউ ফিল হট,ওয়াইফি?”

শোভা নিজেও বুঝতে পারছে আজকে তার মধ্যে উন্মাদনা কাজ করছে।বাইরে লাগামছাড়া কথা শুনে মাথায় ওসব ধারণাই আসে।শোভা নিজেকে ছাড়িয়ে বলে,“দমবন্ধ লাগছে আমার।”
“খোলো।”
শোভা চমকে উঠে বলে,“কি খুলবো?”
“হিজাব।না মানে তোমার দমবন্ধ লাগছে তো তাই বলছি।তুমি কি ভাবলে?”
শোভা মাথা নাড়িয়ে বলে,“কিছু না।”
“কিছু না?”
“হুমমম, কিছু না।”
“সত্যি বলছো?”
“কি অদ্ভুত আপনি আমার পিছনে লাগলেন কেন?”
“তুমি চাইলে আমি তোমার পিছনে না লেগে গায়ে সাথে ঘেঁষে থাকতে পারি।”
শোভা কথা না বাড়িয়ে হিজাব খুলে জানালার কাছে দাঁড়ালো।বাইরের বাতাসে একটু শান্তি পায়।দর্শন এসে পিছনে দাঁড়াতেই শোভা তাকালো এক পলক।আবারও আকাশের দিকে তাকায় শোভা আর অভিমানী কণ্ঠে বলে,“আমার মতো গেঁয়ো, আনকালচার,মিডিলক্লাস মেয়ের পাশে আপনাকে মানায় না।”

“আমি কি এটা বলেছি কখনও?”
“না বলেননি কিন্তু আমাকে দুরদুর কম করেননি।”
“তখন তো ঠিকই কাঁঠালের আঠার মতো লেগে ছিলে।এখন দূরে সরলে কেন?”
“কাঁঠালের আঠায় সরিষার তেল পড়েছে।তাই সরতে হলো।”
দর্শন ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই শোভা বলে,“কাঁঠালের আঠা ছাড়ানোর জন্য সরিষার তেল খুব কাজের ঠিক তেমনই আমাকে আপনার থেকে আলাদা হওয়ার জন্য সিনথিয়া খুব কাজের।”
“বেশ তো যুদ্ধ করেছো নিজের অধিকারের জন্য ওই মেয়েটার সাথে।এত তাড়াতাড়ি হার মানলে?”
“যার জন্য যুদ্ধ সেই তো আমার হয়ে কিছু করলো না।”
“যুদ্ধ হয় দুজনের মাঝে।আমি তৃতীয় ব্যক্তি কি করতে পারি?”
“কিছুই না কিন্তু আপনি ওকে উস্কানি দেন।অধিকার বেশি দেন।যেগুলো আমাকে দেননি।”
“ওকে কিসের অধিকার দিলাম আমি?”
“আপনার জিনিস ধরার অধিকার ওই মেয়ের আছে অথচ আমি পেলাম না।”
“আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরির পর একবারও আমার জিনিসে হাত দেবার চেষ্টা করেছো?দেখেছো আমি না করি কিনা?”

“ওসব জিনিস ধরার প্রয়োজন বোধ করিনি আমি।”
“দিস ইজ দ্যা ফ্যাক্ট।তুমি ধরোনি।একটাবার ধরে দেখতে।ইনফ্যাক্ট তুমি তো আমার ল্যাপটপ নষ্ট করেছো।আমি কি পানিশমেন্ট দিয়েছিলাম?”
“না।”
“সিনথিয়াকে কিন্তু দিয়েছি পানিশমেন্ট।”
শোভা অবাক হয়ে তাকালো।দর্শন নিউজ দেখালো।সিনথিয়াকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।অনেকগুলো ক্রাইমের জন্য সিনথিয়াকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে।দর্শন বুঝিয়ে বলল সবকিছু।সব শুনে শোভা বলে,“আমাকে আগে থেকে কেন জানাননি?”
“কারণ তুমি আমার থেকে মুক্তি চেয়েছিলে আর সেই মুক্তির শাস্তি দেওয়াটাও আমার একটা কারণ ছিল।”
“আপনি পাষাণ।”
“আর তুমি?তুমি কি?কিভাবে পারলে যে সংসার করার জন্য এত অপেক্ষা করে আবার সেই সংসারের হাল ছেড়ে দিতে?”

“আত্মসম্মান বলেও কিছু আছে আমার।কতবার বেহায়াপনা করবো আপনার কাছে?”
“তুমি জানো আমি তোমার বেহায়াপনাকে কতটা চাই?”
শোভা অপলক চেয়ে থাকতে দর্শন বলে,“আমি গম্ভীর স্বভাবের।সংসারের শুরুটা আমার দ্বারা হুট করেই আমিষে ভরপুর থাকবে না এটাই তো স্বাভাবিক।তোমার বেহায়াপনা আমাকে নিরামিষ থেকে আমিষে রূপান্তর করেছে।একেকদিন একেক কাণ্ডে আমি তোমার প্রতি ডেসপারেট হয়েছি।তোমার গায়ে সামান্য দাগ লাগলেও আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি।তোমার জ্বর আসলে আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়।তোমাকে কেউ আঘাত করতে নিলে আমি হিংস্র হয়ে উঠি। এইসবকিছু তুমি তোমার আচরণ দিয়েই আদায় করেছো ওয়াইফি।”
“ভালোবাসেন আমাকে?”

“শুধু ভালোবাসা হয়তো এটাকে বলে না আমার মধ্যে তোমার জন্য ভালোবাসার থেকেও উন্মাদনা বেশি কাজ করে।এই উন্মাদনা আমাকে শিখিয়েছে তোমাকে নিজের করার।তোমাকে আগলে রাখার।তোমাকে হারাবার ভয়।”
শোভা মুচকি হাসে।দর্শনের দিকে ফিরে তাকালো।দর্শনকে দেখে বলে,“আপনি অনেক ক্লান্ত।আপনার চোখমুখ কেমন শুকিয়ে গেছে এই তিনদিনে।”
“বউ শূন্যতায় ভুগেছি তিনদিন।হন্যে হয়ে তাকেই খুঁজেছি।কতটা ধকল গেছে আমার উপর দিয়ে বুঝতে পারবে না।”
“বুঝতে হয়তো ঠিক পারছিনা কিন্তু এমন অবস্থায় আপনাকে দেখে আমার ভালো লাগছে না।”
“কি করতে চাও?”
“আপনার সেবা করে আপনাকে আগের মতো তরতাজা রাখতে চাই।”
“তাই?”
“হুমমম,এবার চলুন।বাইরে কলপার থেকে গোসল সেরে নিবেন।এরপর কিছু খেয়ে একটু ঘুম দিবেন।ক্লান্ত ভাব দূর হবে।”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭

বলেই শোভা মাথায় ওড়না দিতে নিলে দর্শন আচমকা জড়িয়ে ধরে।শোভা অবাক হলেও জড়িয়ে ধরে দর্শনকে।এখন আর না করলো না।অভিমান নেই যে।স্বামীর থেকে অভিমান কেতেগেলে আবারও তাকে আপন করা যায়।আর অভিমান থাকলে তার থেকে দূরে যাওয়ার জন্য পাঁয়তারা চলে।

বাবুই পাখির সুখী নীড় শেষ পর্ব