Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি পর্ব ৫

বিয়ে পাগলি পর্ব ৫

বিয়ে পাগলি পর্ব ৫
নিলুফা নাজমিন নীলা

আজ সায়রার স্বপ্নের দিন, বিয়ের দিন। ঝিনুক খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিচ্ছে তাকে। লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা, হাত ভর্তি চুড়ি, গলায় ভারি মালা, নলক, টিকলি সব মিলিয়ে যেন রূপকথার রাজকন্যা। ঘরজুড়ে আতরের গন্ধ, বাইরে অতিথিদের কোলাহল কিন্তু সায়রার মনে শুধু একটাই অস্থিরতা।
ঝিনুক কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

“আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই বিয়েতে না, যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছিস!”
সায়রা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“কখন আসবে দেখতাম, এক ডজনকে জামাই সাজলে কেমন লাগে!”
ঝিনুক হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“এক ডজন নিয়ে বকবক বন্ধ কর, না হলে মানুষ ভাববে তুই সত্যিই পাগল।”
হঠাৎ সায়রা নরম স্বরে ঝিনুকের হাত ধরে বলল,
“ঝিনুক, আমার যে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তোর কষ্ট হবে না?”
ঝিনুক চুপ করে তাকিয়ে রইল। ঝিনুকের ঠোঁট কাঁপছে, চোখে এক অদ্ভুত মায়া। সায়রা আবার হেসে নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল,

“দূর, আমি-ই বা কি বলি! তুই তো চাইতি আমি চলে যাই, যাতে তোর শান্তিতে থাকা হয়। আমার দুষ্টামির জন্য তুই অনেক বিপদে পড়েছিস।”
ঝিনুকের চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু মুখে সে তাচ্ছিল্য হাসি এনে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম তুই মানুষের মনের কথা পড়তে পারিস। কিন্তু না, আমি ভুল ভেবেছিলাম।”
সায়রা খুব ভালো করেই জানে ঝিনুক যে তাকে শুধু ফ্রেন্ড না বোনের মতো ভালোবাসে।তবুও সায়রা বলল,
“আমি চলে গেলে নতুন একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে খুঁজে নিস।”
ঝিনুক এবার রাগে বলল,
“এ্যাই তুই নিজেকে কি মনে করিস?তোর কি মনে হয় আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড আছি তোর জোরাজোরিতে?আমি কি পারতাম না তোকে ইগনোর করে অন্য কারো সাথে মিশতে? কেন কারো সাথে মিশিনি বলতো?তোকে ভয় পেয়ে নাকি?”
সায়রা তাকিয়ে আছে ঝিনুকের মুখে।ঝিনুকের চোখে পানি টলমল করছে।

“আমার বোন নেই। সবাই বলে বোনেরা নাকি খুব দুষ্টামি করে।আমি কখনো সেই অনূভুতি পাইনি।কিন্তু তোর সাথে ফ্রেন্ডশিপ হওয়ার পর বুঝিছি আসলে বোনের ভালোবাসা কাকে বলে।তোর দুষ্টামি গুলো না দেখলে আমার ভেতরে মনে হয় কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।”
ঝিনুকের কন্ঠ ভারি হয়ে এসেছে।চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।সায়রা এবার ঝিনুককে জড়িয়ে ধরল।ঝিনুকের শরীর ঝাঁকুনি খাচ্ছে কান্নার সাথে সাথে। সায়রার চোখ বেয়েও পানি পড়ছে।কত বছর পর মেয়েটা কাঁদছে কে জানে।সায়রার মনে নেই সে ঠিক কবে কেঁদেছিল।
ঝিনুক এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“হয়েছে আর কাঁদতে হবেনা।আজকে তোর খুশির দিন।আজ নো কান্নাকাটি।”
বলেই সায়রার চোখ আবারও ঠিক করে দিল।তার পর আয়নার সামনে সায়রাকে বসিয়ে দিল।ঝিনুক গিয়ে সায়রা পেছনে দাঁড়ালো। ঝিনুক বলল,

“দেখ আমার বোনটাকে দেখতে কতটা সুন্দর লাগছে।কারো নজর না লাগক।” সায়রা ঝিনুকের কপালে ছোট করে একটা চুমু খেল।
তখনি একটি মেয়ে এসে বলল,
“জামাই এসে গেছে।”

সায়রার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল।সে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালো। বলল,
“চল ঝিনুক জামাইয়ের গেইট ধরব।”
“এ্যাই তুই পাগলামিটা আজ বন্ধ কর। মানুষ খারাপ বলবে প্লিজ এখানেই বসে থাক।”
কিছুতেই সায়রা এখানে বসতে রাজি না সে যাবেই। কোনো
উপায় না পেয়ে ঝিনুক আলমারি থেকে একটা শাল বের করে সায়রা শরীরে দিয়ে মুখ ডেকে দিল।বলল,
“এবার চল আমার সাথে।”

তারা দুজন হাজির হলো যেখানে বরের গেইড আটকানো হয়েছে।ঝিনুক ভয় পাচ্ছে যদি কেউ চিনে ফেলে।এখনে কেউ চিনতে পারেনি সায়রাকে।আর এই সায়রার কোনো বিশ্বাস নেই।
সায়রা সবার মাঝখানে গিয়েই শাল টা ফেলে দিল।ঝিনুক আটকানোর চেষ্টা করল।এই ভয়টাই পাচ্ছিল ঝিনুক।এবার সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সায়রার দিকে।
যেখানে শাওন দাড়িয়ে আছে তার সামনে সায়রা গিয়ে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম বর সাহেব।”
সকলে বিস্মিত চোখে দেখছে।সায়রার বাবা মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“আল্লাহ দিলো দিলো আবার আমার মান সম্মান শেষ করে।”
শাওনের বন্ধুরা সবাই হইহই করে উঠল,
“এই না হলে আমাদের ভাবি।”
সকলে স্লোগান দিতে লাগল,

“আমাদের ভাইয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম আমাদের ভাবির আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম।”
ঝিনুক সায়রাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু না সে যাবেনা।
সবাইকে থামিয়ে দিয়ে সায়রা বলল,
“হয়েছে এবার গেইডের টাকা দিয়ে ভেতরে আসেন।”
শাওনের ভাই শুভ্র বলে উঠল,
“ভাবি ভাইয়ের টাকা মানে আপনার টাকা কেন শুধু শুধু টাকা গুলো নষ্ট করাবেন।”
“আমি এত কিছু বুঝিনা এখনো বিয়ে হয়নি বুঝলেন। ”
শাওন সবাইকে থামিয়ে দিয়ে একটু ঝুঁকে সায়রাকে বলল,
“ওয়ালাইকুম সালাম।কত চাই কণে সাহেবা?”
“বেশি না পঞ্চাশ হাজার দিলেই হবে।”

বর পক্ষ এত টাকা দিবেনা বলছে কিন্তু শাওন সবাইকে থামিয়ে দিয়ে সায়রার কথা মতো টাকা দিয়ে দিল।
এবার শাওনরা ভিতরে ঢুকে পড়ল।আর সায়রা আবার রুমে ঢুকে গেল।ঝিনুক বলল,
“এমনটা করার কি খুব দরকার ছিল?”
“কেন কি এমন হয়ছে?আর শাওন কিন্তু একদমি রাগ করেনি।”
“হুম তা ঠিক।”
সায়রা এবার বলে উঠল,
“শুন ঝিলিক যখন কাজী আসবে আমাকে বলবে কবুল বলতে তখন আমি বলব না বুঝলি।”
“কি বলছিস তুই বলবিনা কেন?তুই কি রাজি না?”
“অবশ্যই রাজি বুঝিসনা কেন আমি যদি সাথে সাথে কবুল বলে পেলি তাহলে সবাই ভাববে আমি #বিয়ে_পাগলি হয়ে গেছি।”
ঝিনুক ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তোর কি মনে হয় কেউ বুঝে নি তুই যে বিয়ে পাগলি হয়ে আছিস।”
“এত কিছু বুঝিনা আমি যা বললাম তাই করবি ওকে।”
তখনি কাজী প্রবেশ করল।সায়রা মাথার কাপরটা বড় করে দিয়ে বসে আছে।কাজি বলল,
আপনি কি এই বিয়েতে রাজি আছেন থাকলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
সায়রা কিছু বলল না বসে রইল একই ভাবে।কাজি আবার বলল রাজি থাকলে বলুন কবুল।
এবারো সায়রা চুপ করে রইল।পাশ থেকে শুভ্র বলে উঠল,
“কণে মনে হয় বিয়েতে রাজি নয়। বিয়েটা ভেঙে দিই।”
সাথে সাথে সায়রা বলতে লাগল,
“আলহামদুলিল্লাহ,আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, কবুল কবুল কবুল কবুল… ”
কাজি সায়রাকে বলল,
“করছো কি মা থামো তুমি তো রেলগাড়ী চালিয়ে দিয়েছো।”
সায়রা বলল, “হয়নি?আবার বলবো?”
কাজি সাহেব বলল,

“না আর বলতে হবেনা হয়েছে।”
এবার সাক্ষর করার পালা।সায়রা কলমটা হাতে নিল।সে সাক্ষর করতে পারছেনা কেমন জানি হাত কাঁপছে ।সায়রা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।এমনটা তো হওয়ার কথা না!ঝিনুক সায়রার পিটে হাত রাখল চোখে ইশারা করল কিছু হবেনা সাক্ষর করে দে।
সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এবার বিদায়ের পালা। এখনো সায়রার চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। সায়রার বাবা–মা এসে সায়রার হাত শাওনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
“বাবা, আমার মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। আমার মেয়েটাকে ভালো রেখো। কোনো সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলবে।”
সায়রার বুকটা কেমন যেন করে উঠল বাবা–মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। তাদের দুজনের চোখের কোণেই অশ্রু জমে আছে। শাওন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“চিন্তা করবেন না। আমার জীবন দিয়ে আমি আগলে রাখব আমার সহধর্মিণীকে। তাকে কোনোদিন কষ্ট পেতে দেব না।”
শুভ্র সুভার কানে কানে বলল,
“দেখলি, ভাইয়া এখনই দায়িত্ববান স্বামী হয়ে গেছে।”
সুভা ধমক দিয়ে উত্তর দিল,
“চুপ থাক তুই।”
সায়রা তার বাবা–মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, বিশেষ করে সায়রার ভার্সিটির বান্ধবীরা। কিন্তু ঝিনুক একটুও অবাক হয়নি, কারণ সে জানত এমনটা হবেই। তার থেকে ভালো সায়রাকে আর কেই বা চিনবে?
সায়রা ছোট বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল,
“বাবা, মা, আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারব না।”
সায়রার বাবা–মাও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। মেয়েদের জন্য এই দিনটাই সবচেয়ে কষ্টের। যে ঘরে এতগুলো বছর লালন পালন আর বেড়ে ওঠা, সেই ঘর একদিন ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। এটাই যেন জীবনের কঠিনতম মুহূর্ত।

শাওন আর সায়রা গাড়ি করে যাচ্ছে। শাওন স্টিয়ারিংয়ে, আর সায়রা পাশের সিটে বসে বাহিরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কান্নার কারণে তার শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। অন্য সকলে অন্য গাড়িতে গেছে, শুধু শাওন নিজের গাড়ি নিয়ে সায়রাকে সাথে নিয়েই যাচ্ছে। রাত হয়ে এসেছে, আর বাহিরে রাতের আকাশটা আজ যেন অদ্ভুত শান্ত ও সুন্দর।
শাওন হঠাৎ বলল,
“শুনো মেয়ে, তোমাকে এমন স্থির, নীরব মানায় না।”
সায়রা ধীরে ধীরে শাওনের দিকে তাকালো। শাওন তখন ড্যাশবোর্ড থেকে একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল,
“চোখ মুছে নাও।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৪

সায়রা বাধ্য মেয়ের মতো চোখ মুছে নিল। এখনো তার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু নিস্তব্ধতা।
শাওন গাড়িটা সামনে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ থামাল।
সায়রা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এখানে কেন থামালেন?”
শাওন হালকা হেসে উত্তর দিল,
“একটু নেমে প্রকৃতির বাতাস লাগাও শরীরে। ভালো লাগবে।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৬