বুনো মেঘের হাতছানি শেষ পর্ব
ইসরাত জাহান দ্যুতি
মাত্র একটি শব্দের জবাব! অথচ সেই সামান্য জবাবটা আশফির বুকের গহিনে হিমালয়ের সমান ভার হয়ে চেপে বসল। এবার ওর তীক্ষ্ণ চোখের তারায় আর কঠিন হয়ে ওঠা মুখটাতে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। যা দেখে মারিশার বুকের ভেতরটাই মোচড় দিয়ে উঠল নিমিষেই।
আইলিন ওপাশ থেকে ছটফটিয়ে উঠলেন। মারিশাকে বাঁচানোর জন্য নিজের ঘাড়ে সমস্ত অপরাধের দায় নিয়ে অনর্গল স্বীকারোক্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু আশফি তখন যেন কোনো এক শব্দহীন জগতের বাসিন্দা। সে এক বিন্দু নড়ল না, কোনো উত্তর দিল না। ওর দৃষ্টি মেঝের এক বিন্দুতে এমনভাবে স্থির হয়ে গেছে, যেন সারাজীবনের জন্য সে ওখানেই স্থবির হয়ে থাকবে। ওকে যেন এখন আর রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং এক জীবন্ত মূর্তির অবয়ব মনে হলো।
সেই নিথর অবয়ব দেখে মারিশার বুঝতে বাকি রইল না, ওর চেনা সেই শুদ্ধ হৃদয়ের মানুষটার ভেতর আজ সমস্ত বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটছে। মারিশা তখন যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এক ঝটকায় আইপ্যাডের কলটা কেটে দিয়ে সে পাগলের মতো আশফির কাছে ছুটে এল। ওর হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল।
কিন্তু এবার আর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই আশফির। একটু আগের সেই প্রলয়ংকরী রাগ, চোখের সেই দুর্বোধ্য কঠোরতা, সব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল মহাবিশ্বের সমস্ত শূন্যতা আর এক নিদারুণভাবে ঠকে যাওয়া প্রেমিকের কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিষাদ। মেঝেতে নিবদ্ধ ওর দৃষ্টিজোড়া তখনো নিষ্পলক।
মারিশার হাতের স্পর্শটুকু অনুভব হতেই এক নিস্পৃহ, নিস্তেজ কণ্ঠ ফিসফিসিয়ে উঠল ওর, “চারটা বছর…! আমার চারটা বছর কতটা মূল্যহীনভাবে শেষ হয়ে গেল!”
“আশফি…!” এক বুক ফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়ল মারিশা।
আশফি ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলে তাকাল। কিন্তু সেই চোখের তারাতে যেন এক মৃতপ্রায় সত্তার প্রতিচ্ছবি। একদম সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষের গলায় সে বলে উঠল, “আমার চার বছরের ভালোবাসাটা অদেখা ছিল তোমার৷ চার মাসের ভালোবাসা তো দেখেছিলে। আচ্ছা, একটু ধরিয়ে দেবে আমাকে, আমার করা কোন অভিনয়টা তোমার সবচেয়ে নিখুঁত মনে হয়েছিল? সেই যে তোমাকে এক নজর দেখার নেশায় রাত-দিন ফুপুর বাড়িতে অকারণে ছুটে যেতাম, সেটা? নাকি তোমাকে জয় করার নেশায় তোমার যেকোনো পাগলাটে চ্যালেঞ্জ মাথা পেতে নিতাম, সেসব? একান্তে কাছে পাওয়ার সুযোগ পেয়েও তোমাকে শুদ্ধভাবে কাছে পেতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম, সেটাও বুঝি অভিনয় ছিল? তারপর … তারপর তোমাকে হারানোর ভয়ে, তোমাকে বৈধভাবে আগলে রাখার জন্য সব কিছুকে তুচ্ছ করে এই যে আমাদের বিয়েটা, সবই কি স্রেফ সাজানো নাটক ছিল আমার?”
“না, কিচ্ছু অভিনয় ছিল না তোমার! কিচ্ছু না!” মারিশার কণ্ঠটা কান্নায় বুজে আসছিল, প্রতিটি শব্দে ঝরছিল তীব্র হাহাকার।
“নাহ, অভিনয়ই ছিল”, আশফির ঠোঁটের কোণে এবার বিষাক্ত এক বিদ্রূপের রেখা ফুটে উঠল এবার৷ যার চেয়ে নিষ্ঠুর কিছু আর হতে পারে না। “নয়তো মাত্র চার মাসে কেউ কাউকে অমন ডেস্পারেটলি ভালোবাসতে পারে? সত্যিই অবিশ্বাস্য! তোমার মোটেও ভুল ছিল না সেদিন আমাকে অবিশ্বাস করা।”
“ভুল ছিল, আশফি! ওটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল”, মারিশা পাগলের মতো ওকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। কিন্তু আশফির হাতদুটো আজ আর ওকে আগলে নিল না৷ অর্থবের মতোই চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল শুধু৷
কান্নায় মারিশার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঝাপসা চোখে আশফির নিস্পৃহ চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, “সেই ভুলের শাস্তি আমি চার বছর ধরে প্রতিটা সেকেন্ডে পেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওই চার মাসে তোমাকে যতটা না ভালোবেসেছিলাম, তোমাকে হারিয়ে ফেলার পর এই চার বছরে আমার সেই ভালোবাসা বাড়তে বাড়তে এখন সব ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। প্রতিটা রাত আমি শুধু তোমার জন্য পুড়েছি। আজ আমার নিজের অস্তিত্বের চেয়েও সবচেয়ে দামী তুমি, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা!”
“ভালোবাসা! কোথায় ভালোবাসা?” যেন সত্যিই মারিশার চোখের মাঝে তা খুঁজতে চাইছে আশফি। “আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমার অনুভব হচ্ছে না কেন? যেখানে বিশ্বাসের জায়গায় নেই, সেখানে ভালোবাসা বাস করে কোথায়?”
“আছে… সব আছে, আশফি৷ দোহাই তোমার, আমার কথাগুলো একটিবার অন্তত বোঝার চেষ্টা করো”, বাঁধভাঙা কান্নাটা কোনোমতে চেপে মারিশা এবার মরিয়া হয়ে বলতে শুরু করল, “আমি স্বীকার করি, আন্টির কথাগুলোতে আমি বড্ড বেশি ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে আমার ভুল বোঝা উচিত হয়নি৷ তোমার মনে আছে? একদিন তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার বাবা আর আমার আন্টির সম্পর্কের ব্যাপারে তুমি কিছু জানো কি না? তুমি বলেছিলে, সবই জানো। আমি তখন জানতে চেয়েছিলাম, তোমার বাবার সেই আচরণের ব্যাপারে তোমার মতামত কী? তিনি যেটা করেছিলেন আন্টির সাথে, সেটা কি ঠিক ছিল? তুমি খুব অনায়াসেই জবাব দিয়েছিলে, ‘ঠিক-বেঠিকের হিসেবে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কারণ আমি জানি আমার আব্বু কোনোদিন কারও সঙ্গে অন্যায় করেননি।’ তোমার সেই জবাবে আমি রেগে গিয়েছিলাম…”
বলতে বলতে মারিশার গলার স্বর কান্নায় বুজে এল, কিন্তু সে থামল না, “তারপর তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কাউকে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তা পূরণ না করে ফেলে চলে আসাটা কি অন্যায় নয়? তুমি তখন আরও ক্ষেপে গিয়ে বললে, আমি যেন আন্টির একতরফা কথা শুনে তোমার বাবাকে বিচার না করি, আর তার মতো মানুষকে বিচার করার মতো বোধবুদ্ধিও আমার হয়নি। তোমার দাবি ছিল, তোমার আব্বু আন্টিকে ছেড়ে আসেননি, বরং আন্টির অযৌক্তিক আবদারে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আন্টি চেয়েছিলেন বিয়ের পর তোমার আব্বু যেন ইস্তাম্বুলে সেটেল্ড হন। যেটা তোমার আব্বু কোনোদিনই মানতেন না। কিন্তু আমার কাছে সত্যটা ছিল অন্যনকম৷ কিন্তু তুমি আর আমার একটা কথাও শুনতে চাওনি। কঠিন গলায় বলে দিয়েছিলে, ভবিষ্যতে যেন এই টপিক আমাদের মধ্যে আর কখনো না ওঠে।”
চোখের জল গাল বেয়ে টুপটুপ করে মেঝেতে পড়ছে মারিশার। সে আবার মরিয়া হয়ে বলতে লাগল, “আমি তখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, তুমি তোমার বাবার মিথ্যেকেই ধ্রুবসত্য বলে ভাবো। তোমার নিষেধাজ্ঞার অবাধ্য হয়ে এরপরও একদিন আমি তোমাকে একটা কঠিন সত্য জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবার চরিত্রের ওপর আঙুল তোলায় তুমি সেদিন প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলে। অথচ আমি শুধু চেয়েছিলাম তোমাকে মেলিসার কথা বলতে! আমার আন্টির মেয়ে মেলিসা… যে ছোটোবেলা থেকে বাবার পরিচয় ছাড়া বড়ো হতে গিয়ে স্কুল-প্রতিবেশীদের কাছে কত বিদ্রূপ আর অপমানের শিকার হয়েছে, তা আমি রোজ চোখের সামনে দেখেছি। আর তার দায়ভার সম্পূর্ণ তোমার বাবারই ছিল৷ কারণ তাঁর সাময়িক মোহের ফসলই ছিল মেলিসা!”
ভেজা চোখে আশফির দিকে চেয়ে বলতে লাগল সে, “আমি তখন বুঝলাম, তুমি আমার কোনো কথা কোনোদিন বিশ্বাসই করবে না। বরং যতবারই এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই তুমি এক অচেনা আশফিতে পরিণত হতে। তোমার সেই কঠোর ভঙ্গি দেখে আমার কেবল মনে হত, তুমিও ঠিক তোমার বাবার মতোই নিষ্ঠুর। আমি না চাইতেও তোমার ওই আচরণের জন্যই আন্টির কথাগুলোতে দিনে দিনে এমন বিষাক্তভাবে প্রভাবিত হতে থাকলাম যে, তোমার প্রতিও আমার সব বিশ্বাস ফিকে হয়ে আসছিল। আমি সত্যিই তোমাকে সন্দেহ…”
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই আশফি আচমকা ওকে থামিয়ে দিল। ওর চোখের চাউনি বদলে গেল মুহূর্তেই। যেন কোনো এক পুরনো ধাঁধার উত্তর আজ হঠাৎ করেই মিলে গেছে। এক যন্ত্রণাদায়ক উপলব্ধি নিয়ে সে বলে উঠল, “আর ঠিক এই কারণেই … এই কারণেই তুমি চলে যাওয়ার আগের দিনগুলোতে আমাকে ওভাবে ইগনোর করতে শুরু করেছিলে? আমি কাছে এলেই কোনো না কোনো বাহানায় তুমি দূরে সরে যেতে চাইতে?”
ঠিক তখনই আশফির হাত থেকে শিথিল হয়ে প্যাকেটটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সেই বিভীষিকাময় ছবিগুলো আর সেই চিরকুটটা। চোখের সামনে ওগুলো দেখামাত্রই মারিশার জবান যেন কেউ সহসাই চেপে ধরল। ওর সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করল। কাঁপতে কাঁপতেই কোনোমতে ঝুঁকে পড়ে দুটো ছবি আর চিরকুটটা তুলে নিল সে। কয়েক মুহূর্ত সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর মারিশার ভেতর থেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আবারও পাগলের মতো, দিশেহারার মতো জাপটে ধরল আশফির হাতটা। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “আমি খুনি, আশফি! আমি সত্যিই খুনি! কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি শুধু নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। সেদিন ডেনিজের মা আর বোনকে আমি নিজের হাতে খুন করে ফেলেছিলাম! ওরা এজেন্সির পর আমাদের বাড়িগুলোও বাবার কাছ থেকে জোর করে লিখে নিতে চাইছিল। আমি যখন বাধা দিতে গেলাম, ওরা পিশাচের মতো আমাকে মারধর শুরু করল … আমি আর সহ্য করতে পারিনি! হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কীভাবে যেন একা হাতেই ওদের দুজনকে রক্তাক্ত করে ফেলেছিলাম। ওরা যে সত্যি মরে যাবে, তা আমি কল্পনাও করিনি! বাবাকে প্যারালাইজড করে ফেলেছিল ওরা৷ সে অবস্থাতেই আমাকে আটকাতে চেষ্টা করেছিল সেদিন৷ কিন্তু আমি রাগে অন্ধ হয়ে বেখেয়ালেই বাবাকে ধাক্কা দিলে বাবা সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। কিন্তু ডেনিজের মা, বোনকে খুন করার পরই আমি মুক্তির সন্ধান পেলাম৷ আমার এই পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট এমিরের সহায়তায় সেদিন আমার খুনের দায়টা ডেনিজের ঘাড়ে চাপাতে পেরেছিলাম৷”
হাতে ধরা ছবিটার একজন পুরুষকে দেখাল মারিশা। তাকে চিনতেও পারল আশফি৷ সেদিন এই পুরুষটার ওপরই তো চড়াও হয়েছিল সে।
মারিশা বলল তারপর, “আর বাবাকে খুনের চেষ্টার দায়টাও সেলিনকে দিই৷ সব কিছু সহজ হয়েছিল এমিরের জন্যই৷ সেলিনের ডান হাত হওয়ার অভিনয়টা করে ওদের বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণ পুলিশকে দিয়েছিল এমির। ডেনিজ পালিয়ে গেল, আর সেলিন পুলিশের হাতে বন্দি হলো তারপরই আমি চিরতরে মুক্তি পাই ওদের হাত থেকে।”
গলা ফেটে কান্নায় মারিশার কথা আটকে আসছিল। আশফির একটা হাত নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলতে লাগল, “আমি অনেক বড়ো পাপী, আশফি। কিন্তু খোদার কসম, আমার সতীত্বটুকু আমি কারও হাতে তুলে দিইনি! এই পুরুষগুলোকে সেই দিনগুলোতে ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো উপায় পাইনি আমি। ডেনিজের কাছেও নিজেকে কলঙ্কিত করতে দিইনি। যার জন্য নিজের শরীরটাকে প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত করেছি, নিজেকে বিভৎস করতে চেয়েছি।”
মারিশার এই করুণ আকুতি সত্ত্বেও আশফির ভেতরে কোনো আলোড়ন হলো না। সে শুধু কয়েক পলক ওর বুকের ওপর চেপে রাখা নিজের হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিরাসক্তভাবে, যেন কোনো এক অচেনা মানুষের স্পর্শ সরাচ্ছে, তেমন করেই নিজের হাতটা টেনে নিল সে।
একবারও মারিশার চোখের দিকে তাকাল না। মেঝের দিকে তাকিয়ে একদম নিচু স্বরে, অনেকটা নিজের মনে বিড়বিড় করার মতো করে বলল, “আমি তোমার সুন্দর শরীরটাকে তো ভালোবাসিনি, মাহি৷ আমি ভালোবেসেছিলাম এই শরীরের মাঝে থাকা সুন্দর মনটাকে৷ তুমি ডেনিজের কাছে সতীত্ব হারালেও আমার কোনো আফসোস ছিল না৷ সেটা তুমি কখনো বোঝোইনি, না? না বোঝারই কথা৷ যেখানে আমার ভালোবাসাটাই ছিল তোমার কাছে অবিশ্বাস্য৷”
কথাটা শেষ করে আশফি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুক চিরে আসা সেই দীর্ঘশ্বাসে কোনো রাগ নেই, আছে কেবল এক গভীর ক্লান্তি। সেই ক্লান্তি নিয়ে মারিশার দিকে স্থির চোখে চাইল। ধীর গলায় বলল তারপর, “ডেনিজের কাছ থেকে রক্ষা পেতে নিজেকে তুমি শেষ করে দিতে চেয়েছ, এটা সত্যি। কিন্তু আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কোনোকালেই ছিল না, এটা তার চেয়েও বড়ো সত্যি। তুমি কেবল একটা সাইকোপ্যাথ থেকে নিজের সম্মান বাঁচাতে চেয়েছ। আমার কথা তখন তো তোমার মনে থাকারই কথা না।”
“সব সময় মনে ছিল … সারাক্ষণ আমার মন-মস্তিষ্কে ছিলে তুমি”, মারিশা ডুকরে উঠল৷
পাগলের মতো মাথা নাড়তে লাগল, “আমার ভালোবাসাকে অবিশ্বাস কোরো না প্লিজ! খুব ভালোবাসি তোমাকে।”
আশফি মুখ তুলে চাইল। কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই খুব ধীর গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “ভালোবাসলে কেউ কি ওভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে? আমি তো বারবার তোমার দুয়ারে গিয়েছিলাম শুধু তোমাকে ফিরে পাওয়ার আশায়। কিন্তু তুমি আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও দেখা দাওনি। ফিরিয়ে দিয়েছিলে কতটা অবহেলার সাথে। আমি যেন আর কোনোদিন তোমার ছায়া না মাড়াই, সেজন্যও মিরানের কাছে কত বিষাক্ত কথা শুনিয়েছিলে আমাকে। এর পেছনে কী ব্যাখ্যা আছে তোমার? বলো, আজ সবই শুনতে চাই।”
সে একদৃষ্টিতে আশফির দিকে তাকিয়ে রুদ্ধস্বরে বলল, “আমি তোমার প্রতি অবিশ্বাস আর রাগ নিয়ে চলে গিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু আমার সেই ভুলটা ভেঙেছিল যখন তুমি বারবার আমার কাছে ছুটে এসেছিলে। কিন্তু তখন আমি ডেনিজের জালে আটকে গেছি। বাবাও তখন অন্ধের মতো ডেনিজকে বিশ্বাস করত। তোমার বারবার আসার খবর পেয়ে বাবা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। ডেনিজকে বলেও দিয়েছিল তোমার যে-কোনো ব্যবস্থাই ও নিতে পারে৷ আমি ভয় পেয়েছিলাম। তাই আর চাইনি তুমি ছুটে আসো।”
“আচ্ছা?” আশফির ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড মারিশার দিকে তাকিয়ে থেকে অসার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আর এই চার বছর? এই চার বছরেও আমাকে একটাবার না ডাকার কারণ? আমার সঙ্গে একটাবার যোগাযোগ না করার কারণ?”
মাথাটা নিচু করে ফেলল মারিশা। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় ওর ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। এক দীর্ঘ নীরবতার পর বিড়বিড় করে বলল, “আমার বিবেক আমাকে আটকে দিয়েছিল, আশফি। যে মানুষকে অবিশ্বাস করে আমি মাঝপথে ছেড়ে চলে এসেছি, তাকেই আবার নিজের বিপদে টেনে আনার কোনো মুখ আমার ছিল না। আমি চাইনি আমার অভিশপ্ত জীবনে জড়িয়ে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হোক। আমি তো নিজেই জানতাম না … আমি কোনোদিন ওই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাব!”
“আর কত… আর কত সাজিয়ে মিথ্যেটা বলবে, মাহি? এবার তো থামো প্লিজ”, প্রচণ্ড কষ্টে এ পর্যায়ে আশফির গলাটাও কেঁপে উঠল। চোখে জল নেই ঠিকই, তবে ওর ভেজা গলার স্বর বলে দিচ্ছিল ভেতরটা একদম দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।
মারিশা ছটফটিয়ে উঠল কিছু বলার জন্য। কিন্তু আশফি এবার আর ওকে কোনো সুযোগই দিল না। এক বিধ্বস্ত ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ভাঙা স্বরে বলতে লাগল, “ভালোবাসার মানুষটা চোখের আড়ালে থাকলে, তাকে দেখতে না পেল, তার সাথে দুটো কথা বলতে না পারলে কী অসহ্য যন্ত্রণা হয়, তা তুমি জানোই না! কোনোদিন সেই নরকযন্ত্রণা তুমি অনুভব করতে পারোনি। কারণ তুমি তো কোনোদিন ভালোই বাসোনি!”
এক মুহূর্তের জন্য থামল আশফি, যেন শ্বাস নেওয়ার শক্তিটুকুও ফুরিয়ে আসছে ওর। পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, “নয়তো চার বছরে একটা মেসেজ … অন্তত একটা মিসড কল! মিরানের কাছেও তো একটা ছোট্ট খবর পৌঁছে দিতে পারতে, তুমি আমারই আছ? এটুকু করার মতো সময় কি সত্যিই তোমার ছিল না? এটুকু করেও তো আমার এই খাঁ খাঁ করা বুকটার তৃষ্ণা মেটাতে পারতে! কিন্তু তা করোনি। কারণ তুমি একবারের জন্যও আমাকে মনেই করোনি৷ আমি তোমাকে হারিয়ে কেমন থাকতে পারি, সেই চিন্তাটুকু তোমার এক মুহূর্তের জন্যও হয়নি। কেন হয়নি জানো? উত্তর একটাই, তুমি আমাকে ভালোবাসোইনি।”
দুচোখে এক গভীর শূন্যতা নিয়ে অবজ্ঞার স্বরে বলল, “তুমি নিজের প্রয়োজনে সবার সাহায্য নিয়েছ। এই পুরুষগুলোকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছ। এমিরের মতো কাউকে ভালোবাসার মিথ্যে লোভ দেখিয়ে পাশে রেখেছ। অথচ তোমার স্বামী যে পুরুষটা ছিল, তার অভাব কি একবারের জন্যও অনুভব হয়নি তোমার? চারটা বছর আমি একটুখানি শান্তি খুঁজতে কী করেছি! শুধু যাযাবরের মতো এখানে ওখানে ছুটে বেরিয়েছি, কখনো তোমাকে ভুলতে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়েছি! কিন্তু তাও আমাকে কখনো এক ফোঁটা শান্তি দিল না খোদা৷ কতজনের মনে কষ্টও দিয়ে ফেলেছি৷ হয়তো সেই কষ্ট থেকে তাদের অভিশাপও কুড়িয়েছি। আমার কি এতটা নির্মমতা প্রাপ্য ছিল? সত্যি যদি ভালোবাসতে, তবে কি একটা দিনের জন্যও আমার সাথে মাত্র দুটো মিনিট কথা বলতে ইচ্ছে হলো না তোমার? আমি জানি সুযোগ তোমার ছিল, মাহি৷ কিন্তু তুমি আসলে চাও-ইনি আমাকে!”
“আশফি, প্লিজ আমার ভালোবাসাকে মিথ্যে বোলো না”, কণ্ঠস্বরটা আবার রুদ্ধ হয়ে এসেছে মারিশার৷ যেন ফুসফুসের সবটুকু বাতাস ফুরিয়ে গেছে ওর, “আমি তোমার খবর রাখিনি, এটা ভুল। রাগ, অভিমানে ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখিনি বলে সরাসরি তোমার কথা জানা হয়নি ওর থেকে। কিন্তু আমি সবসময় তোমার খবর নিতাম ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক ম্যাগাজিনের পাতায়। তোমাকে নিয়ে আসা প্রতিটি ম্যাগাজিন আমি খুব যত্নে জমিয়ে রেখেছি। সেখানে প্রায়ই ভিন্ন ভিন্ন নারীর পাশে তোমাকে দেখে আমি ভেবেছিলাম…”
এ পর্যায়ে মুখটা ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল মারিশা। কান্নার দমকে ওর সারা শরীর কাঁপছে। সেই কম্পিত কণ্ঠেই আশফির দিকে চেয়ে আর্তনাদ করে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি মুভ অন করে নিয়েছ৷”
“উফ্! দ্যাট’স আ ব্রিলিয়ান্ট পয়েন্ট”, সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড তিরস্কারের সঙ্গে বলে উঠল আশফি, “এবার বিশ্বাস করেছ তুমি ম্যাগাজিনের গল্পগুলো৷ কিন্তু সেই গল্পটার পেছনের গল্পটা জানলে না যে তুমি যাওয়ার পর এক ছন্নছাড়া, লক্ষ্যহীন, যাযাবর আশফি আনজার বানিয়ে রেখে গেছ আমায়? আচ্ছা, ওই ছবিগুলো দেখে তোমার মনে কোনো জেলাসি, কোনো অভিমান হয়নি? যদি ভালোই বাসতে, তবে তো একবার ফোন করে আমার ওপর ফেটে পড়ার কথা ছিল! মিরানের কাছে অন্তত রাগ, ক্ষোভ জাহির করতে পারতে! কই, তার কিছুই তো করলে না!”
কষ্টে কষ্টে ভেতরটা এবার তিক্ত হয়ে উঠল ওর৷ নিজের ওপর চরম করুণা নিয়ে সে বলে উঠল, “আরে… এসব হতে গেলে তো ভালোবাসা লাগে! আমি নিজেকে মুভ অন করানোর চেষ্টা শুরু করেছিলাম তোমাকে হারানোরও দু’বছর পর। তাহলে তার আগের দুটো বছর কেন একবারও আমাকে স্মরণ করোনি, বলো? চারটা মাস তুমি আমাকে খুব কাছ থেকে দেখেছ, মাহি। অথচ দিনশেষে নিজের আপন মানুষের মুখ থেকে শোনা বিষটুকুই তোমার কাছে অমৃত হয়ে গেল। আর আমার ভালোবাসাটা? সেটা তোমাকে এক বিন্দুও প্রভাবিত করতে পারল না! আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা থাকলে অন্তত সেই দাবি থেকেও তো আমার সঙ্গে শেষবারের মতো বোঝাপড়াটা করে তারপর আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারতে?”
আশফি একটু থামল। ওর চোখ দুটো এবার তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, যেন কোনো এক লুকানো সত্য ছিঁড়ে বের করতে চায় সে। হঠাৎ অত্যন্ত নিচু আর শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল, “আরেকটা উত্তর দেবে আমাকে? আমাদের ফার্স্ট নাইটের দিনটাই কেন বেছে নিলে তুমি? তার আগেও তো চলে যেতে পারতে?”
মারিশার জবান যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল এবার। কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাষা ওর জানা নেই। অপরাধীর মতো মাথাটা নুইয়ে ফেলল আবার৷
আর ওর এই কুঁকড়ে যাওয়া নিস্তব্ধতাই আশফির বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে দিল আবার। জবাবটা খুঁজে পেয়ে গেল সে। বিস্মিত স্বরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “প্রতিশোধ?”
প্রশ্নটা শুনতেই অপরাধবোধের এক তীব্র দহন মারিশাকে যেন ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল।
“আমার প্রতি সেদিন ঠিক কতটা রাগ আর ঘৃণা তৈরি হয়েছিল আমার গুরাসের?”
ভেজা স্বরে এতটা দরদ মিশিয়ে ওকে ডেকে উঠল আশফি, আর ওর অসহায় ভঙ্গুর সুরে ওই প্রশ্নটা — যা শুনে মারিশার ভেতরের অপরাধবোধ আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠল। এক অসহ্য আর্তনাদে ভেঙে পড়ে শব্দ করে অঝোরে কাঁদতে লাগল সে।
কোনোমতে মুখটা তুলে তারপর বলল, “কোনো ঘৃণা ছিল না! বিশ্বাস করো? আমি কেবল চেয়েছিলাম তুমি আন্টির কষ্টটা একবার নিজের মনে অনুভব করো। আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, আমি বুঝতে পারিনি আমি কত বড়ো পাপ করছি! আমাকে মাফ করবে, আশফি?”
আশফি যেন সে প্রশ্ন শুনতেই পেল না। সে মেঝেতে পড়ে থাকা ছবিগুলোর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎই ওর অভিব্যক্তি বদলে গেল৷ দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা ফিরল আবার, “মেলিসা আব্বুর অবৈধ সন্তান, এটাই তো তোমার বিশ্বাস, তাই না? কিসের ভিত্তিতে এটা বিশ্বাস করলে? কোনো ডিএনএ রিপোর্ট বা অকাট্য প্রমাণ কি তোমার হাতে আছে?”
অপরাধীর মতো ঘাড়টা নেড়ে না জানাল মারিশা৷
আশফি তখন একই সুরে আবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমাকে যখন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, তখন কোনো প্রমাণ পেয়েছিলে? যেটার ভিত্তিতে তুমি তোমার আন্টির কথাকেই সেদিন একমাত্র সত্য বলে ভেবে নিয়েছিলে?”
এবারও মাথাটা নাড়ানো ছাড়া আর কোনো জবাব দিতে পারল না মারিশা।
আশফির ঠোঁটে এক শুষ্ক, প্রাণহীন হাসি ফুটে উঠল এবার, “কিন্তু তোমার কি তখন উচিত ছিল না, এমন কোনো প্রমাণ আমাকে দেখানোর পর আমার কী রিয়্যাকশন পেতে, তার ওপর নির্ভর করে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া? আচ্ছা তোমার মতে হোক আমার আব্বু বেইমান৷ কিন্তু আমার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আগে তো তুমি কারও মতামতের ওপর নির্ভর করোনি৷ তাহলে আমার আব্বু, তোমার আন্টির অতীতের ছায়া কেন আমাদের সম্পর্কে টেনে আনলে?”
মারিশাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ আর দিল না আশফি। তিক্তপূর্ণ যন্ত্রণায় আর কোনো অভিব্যক্তিই প্রকাশ পেল না ওর মাঝে৷ বিষণ্ণ গলায় শুধু বলল, “এরপরও তুমি বোঝাতে চাও, কখনো ভালোবাসতে পেরেছে আমাকে তুমি? আমার যে কী লজ্জা হচ্ছে আজ! তোমার হৃদয় থেকে এক বিন্দু বিশ্বাস আমার ভালোবাসা অর্জন করতে পারেনি কোনোদিন। অথচ আমি কিনা সেই দিনগুলোতে কিচ্ছু টের পাইনি? ভালোবাসলে মানুষ কতটা বোকা, অন্ধ বনে যায়, তা আজ নিজেকে দিয়েই হাড়েহাড়ে বুঝতে পারলাম৷ আমি বোকা কিনা এও ভাবতাম, তোমাকে এই পৃথিবীতে আমার থেকে বেশি আর কেউ চিনতেই পারেনি৷ কী হাস্যকর! অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ চেনার ক্ষমতা তবে আজও আমি পাইনি।”
“আশফি…!” আর্তস্বরে ডেকে উঠেই ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মারিশা। শার্ট খামচে ধরে অবুঝের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাকে মাফ করে দাও, প্লিজ! আমি ভুল ছিলাম৷ সবটা নিজের মতো নিজে ভেবে নিয়ে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, আমিও কষ্টে মরেছি৷ আমি তো ভালো থাকিনি৷ কিন্তু আমার কষ্টগুলো দিনে দিনে যতখানি বেড়েছে, ততখানিই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাও৷ তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি, কী এক অমূল্য রত্নকে আমি অবহেলায় ফেলে এসেছি৷ আমার মন আর আমার আল্লাহ জানে, প্রতিদিন কত হাজারবার তোমাকে স্মরণ করেছি আমি৷ কেবল ডাকিনি নিজের অপরাধবোধের ভারে৷ আমি সারাজীবন শুধু তোমার কাছে থাকার সুযোগটুকুই চাই, আশফি। আর কিছুই চাই না৷ ঘৃণা করো, ভালো না বাসো৷ কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। মাফ করো আমাকে, প্লিজ!”
আশফি ওকে আগলে নিল না, এমনকি সরিয়েও দিল না। এক নিথর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে সে শান্ত, ভাবলেশহীন গলায় বলল, “তুমি তো আমার কাছে কোনো অপরাধী নও, মাহি। আমি তোমাকে কোনো কাঠগড়ায় দাঁড় করাইনি। তাহলে ক্ষমার প্রশ্ন আসবে কেন? আমি ভালোবেসেছি, বিনিময়ে তুমি আমায় ভালোবাসতে পারোনি বা বিশ্বাস করতে পারোনি—এটা শুধুই আমার ব্যর্থতা। কারো মনের ওপর তো আর জোর খাটে না।”
ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মারিশা ওর মুখটা দু হাতে আগলে ধরে পাগলের মতো প্রলাপ সুরে বলতে লাগল, “আমি ভালোবাসি, আশফি৷ আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছি৷ ভুল বুঝে ছেড়ে আসার পরও আমার এই জেদি মনটা তোমায় ভালোবাসা থামাতে পারেনি। আমার ভালোবাসা হয়তো তোমার মতো অতটা শুদ্ধ, অতটা নিখাদ ছিল না৷ কিন্তু আজ তা অগভীরও নয়!”
কিন্তু কথাগুলোর একটা শব্দও আর ঠিকঠাক কানে পৌঁছাল না আশফির। হঠাৎ ওর মনে হলো, চারপাশের বাতাস যেন ফুরিয়ে আসছে। এক অসহ্য দমবন্ধ করা হাঁসফাঁস নিয়ে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। বিড়বিড় করে বলল, “আমার নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে … আমি একটু বাইরে যেতে চাই। একটু একা থাকতে চাই, প্লিজ!”
বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। মারিশার কান্নাকাটিকে পেছনে ফেলে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আর তখনই মারিশার মনে হলো, ওর চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে লাগল। ভয় হতে লাগল, এই মুহূর্তেই যদি আশফিকে না থামানো যায়, তবে ওর থেকে চিরতরেই হারিয়ে যাবে হয়তো। এক নিদারুণ শূন্যতা থেকে জন্ম নেওয়া ভয় ওকে পাগল করে তুলল। টালমাটাল পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে ছুটতে শুরু করল। দুই হাতে নিজের দীর্ঘ গাউনটা কোনোমতে সামলে আর্তনাদ করে উঠল, “আশফি! আশফি, প্লিজ দাঁড়াও! আশফি … যেয়ো না প্লিজ!”
আশফি একবারও পেছন ফিরল না। কোনো এক ঘোরের মাঝে কোনো অশুভ ছায়া যেন গ্রাস করে রেখেছে ওকে৷ করিডোরের অন্যপ্রান্তের মোড় ঘোরার সময় ওর অবয়বটা একবার শেষবারের মতো দেখা গেল।
মারিশা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে গতি বাড়াতে গিয়েই বিপত্তিটা ঘটল তখন। লম্বা গাউনের ঝালর ওর নিজের পায়েই পেঁচিয়ে গেল। এক মুহূর্তের টাল সামলাতে না পেরে সে সরাসরি শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। আঙুলটা মচকে যাওয়ার এক তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মুহূর্তেই ওর মগজে গিয়ে বিঁধল। ব্যথায় যেন ওর নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। মেঝের ওপর হাতড়ে অবুঝ শিশুর মতো সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, “আশফি… ফিরে এসো প্লিজ! আমাকে শাস্তি দাও৷ তবু যেয়ো না… দোহাই লাগে তোমার! আশফি…”
ঠিক তখনই লবি থেকে ফিরল দিলিশা। মারিশার এই অসহায় করুণ দশা দেখে সে একটুও অবাক হলো না৷ আশফির চলে যাওয়াটা সে দেখেছে। ওর পাশ কেটেই গেল মানুষটা৷ কিন্তু মনে হচ্ছিল ওর দেহটা ছেড়ে পার্থিব জগতের বাইরে চলে গিয়েছে ওর আত্মাটা৷ আশপাশের কিছুই ওর খেয়াল ছিল না তাই।
শান্ত পায়ে হেঁটে এসে মারিশার সামনে দাঁড়াল দিলিশা৷ মারিশা তখন একবিন্দু লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে ওর পা আঁকড়ে ধরে ভাঙা গলায় মিনতি করে বলল, “দিলিশা, প্লিজ! আশফিকে আটকাও! ও চলে যাবে! ওকে হারিয়ে যেতে দিয়ো না প্লিজ৷ ওকে আটকাও।”
ওর আকুতি শুনে দিলিশার চোখের মণিগুলো যেন উল্লাসে জ্বলে উঠল। কোনো মায়া নয়, করুণা নয়, বরং এক পৈশাচিক তৃপ্তিতে ওর ঠোঁট বেঁকে গেল। মারিশার দিকে একটুখানি ঝুঁকে নিচু গলায় চরম অবজ্ঞায় সে ফেটে পড়ল, “আটকাব? কিসের জন্য? তোমার মতো একটা দুশ্চরিত্রা মেয়ের জন্য?”
আশপাশের কাউকে তোয়াক্কা না করে সে চিৎকার করে বলে উঠল, “তোমার মতো একটা নোংরা স্লাটের জন্য এটাই সবচেয়ে বড়ো পাওনা ছিল! কী ভেবেছিলে? সবার সাথে নোংরামো করে এসে আশফির মতো মানুষের ওপর রাজত্ব করবে? তুমি তো এর চেয়েও জঘন্য কোনো শাস্তি ডিজার্ভ করো! তোমার মতো মেয়েদের জায়গা আসলে ব্রোথেল হওয়া উচিত, আশফির মতো পুরুষের জীবনে নয়।”
দিলিশা নিজের পা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট করে চলে গেল। সেই আচমকা ধাক্কায় মারিশা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের ওপর খানিকটা ছিটকে পড়ল। ওর কান্নার শব্দ করিডরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দিলিশা একবার পেছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধও করল না।
রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে আসতেই সকালের তীক্ষ্ণ রোদটা আশফির চোখেমুখে এসে লাগল। সকাল নটার মতো এখন। পাহাড়ি আকাশে রোদের তেজ এরই মধ্যে বেশ কড়া। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে রিসোর্টের গেট পেরিয়ে মূল রাস্তায় চলে এল ও। রাস্তার একপাশে ছোটো ছোটো ঝকঝকে সাদা রঙের মারুতি অল্টো আর সুজুকি ট্যাক্সিগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। চালকেরা অলস ভঙ্গিতে গাড়িতে হেলান দিয়ে একে অপরের সঙ্গে নেপালি ভাষায় গল্প করছে, কেউ বা প্লাস্টিকের বোতল থেকে জল নিয়ে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন পরিষ্কার করতে ব্যস্ত।
আশফি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাস্তার ধারের নাম না জানা বুনো ঘাসে তখনো ভোরের শিশির লেগে আছে। দূরে অন্নপূর্ণার ধবল চূড়াটা রোদে রুপোলি হয়ে জ্বলছে, কিন্তু ওর মাথার ভেতর তখন কেবল মারিশার সকল স্বীকারোক্তিগুলোই হাতুড়ির মতো পিটছে। চারটে বছর! একটা সাজানো মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজের অস্তিত্বকে তিলে তিলে ক্ষয় করেছে। যার কষ্টের কথা ভেবে সে নিজেকে অপরাধী মনে করত, সেই মানুষটাই তাকে কেবল বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বোঝাতে কী নিদারুণ প্রতিশোধটা নিয়েছে।
“এ দাই! ট্যাক্সি চাই? (ও ভাই, ট্যাক্সি লাগবে?)” সামনে থেকে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল এক চালক।
তার ডাকেই সংবিৎ ফিরল যেন আশফির। বোবার মতো কয়েক পলক তার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। চালক লোকটা টুপিতে হাত দিয়ে আবারও একই প্রশ্ন করল। আশফির দৃষ্টিতে কোনো ভাষা নেই, কেবল এক গভীর নিস্তব্ধতা। সে কোনো কথা না বলে যান্ত্রিকভাবে হেঁটো গিয়ে পেছনের সিটে উঠে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। জানালার বাইরে দিয়ে লেকসাইডের ব্যস্ত দোকানপাট আর তিব্বতিয়ান ফ্ল্যাগ ওড়ানো ক্যাফেগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। ড্রাইভার আয়নায় কয়েকবার আশফিকে দেখে নিল। কিছুটা সময় যাওয়ার পর যখন জনবসতি কমে এল, তখন সে নেপালি টানে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, “সাহাব, কাহাঁ জানা হ্যায়? নিচে লেকসাইড যায়গা ইয়া কঁহি অওর?”
আশফি কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেও জানে না তার গন্তব্য কোথায়। চার বছর পর যখন সে হারিয়ে ফিরে পাওয়া মানুষটাকে নিয়ে মনের মাঝে একটা সংসারের স্বপ্ন দেখে মনে মনেই ঘরও সাজিয়ে ফেলেছিল, আজ সেই ঘরটা ধসে পড়েছে।
ড্রাইভার আবারও তাগাদা দিতেই আশফি দেখল গাড়িটা তখন পাহাড়ঘেরা নির্জন এক রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। একপাশে গভীর খাদ, আর রাস্তার কিনারায় পর্যটকদের বসার জন্য সিমেন্টের তৈরি ছোট একটা জায়গা। অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল তখন, “এখানেই নামিয়ে দিন।”
ভাড়া চুকিয়ে গাড়ি থেকে নামার পর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করল ওকে। জায়গাটা বেশ সুনসান। রাস্তার ঠিক ধারেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন কিছু দেবদারু গাছ। দূরে পাহাড়ের গায়ে ধোঁয়াটে মেঘের আনাগোনা। সকালের রোদে বুনো পাইন আর ভেজা মাটির একটা সোঁদা গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। নিচে কোনো ঝরনার ঝিরঝির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আশফির কাছে সবটাই আজ অর্থহীন।
সে আর হাঁটতে পারল না। গলার বো টাই খুলে ছুড়ে ফেলল দূরে কোথাও। গলার কাছে বোতামগুলো খুলে দিয়ে টাক্সিডোটা হাতের ওপর রাখল। তারপর রাস্তার ঠিক ধারেই, যেখানে পিচঢালা রাস্তাটা শেষ হয়ে পাথুরে কিনারা শুরু হয়েছে, সেখানেই ধপ করে বসে পড়ল। সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথটা সকালের কুয়াশা ভেদ করে নিচের উপত্যকায় নেমে গেছে। ওপরের বিশাল নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই উজ্জ্বল সকালে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল রাস্তায় দাঁড়িয়েও সে আজ নিঃস্ব, একা।
আশফি রাস্তার কিনারায় পাথরের ওপর মাথা নিচু করে বসে রইল। চারপাশের পাহাড়ের নিস্তব্ধতা যেন ওর ভেতরের চিৎকারগুলোকে আরও বড় করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল, ইতিহাস কি তবে নিষ্ঠুরভাবে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে?
আজকের এই ধোঁকা ওকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল অনেকগুলো বছর আগে। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার সেই বিধ্বস্ত মুখটা।
চৌধুরী বাড়ির বড়ো বউ আফসানা শারমিন, লুকিয়ে নিজের প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে প্রায়ই দেখা করতে যেতেন। এ খবর মাহবুব সাহেব ছাড়া আর কেউ জানতেন না। কেবল সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সংসারটা বাঁচাতে কখনো শান্ত বেশে, কখনো ধৈর্য হারিয়ে রাগে পাগল হয়ে ওই মানুষটিকে ফিরে আসতে বলতেন। কিন্তু চব্বিশ বছরের আফসানা বেগম কথা দিয়েও কখনো কথা রাখতে পারেননি৷ তেমনই একদিন অভিসার শেষে প্রেমিকের গাড়িতে করে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান দুজনই। সমাজ জানবার আগেই স্ত্রীর সম্মানটুকু রক্ষা করতে মাহবুব সাহেব বুকের সবটুকু রক্তক্ষরণ পাথরচাপা দিয়ে দাফন সম্পন্ন করেছিলেন। দাফন সেরে ঘরে ফিরে ওই মাটিমাখা হাতেই পাঁচ বছরের আশফি আর চার বছরের দিশানকে বুকে জাপটে ধরেছিলেন তিনি। সদ্য ত্রিশে পা দেওয়া সেই মানুষটা সেদিন নীরবে বুক ভাসিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের বুঝতে দেননি তাদের মা আসলে কত বড়ো ধোঁকা দিয়ে চলে গেছেন।
মা আর বাবা, দুটো ভূমিকাই পালন করে ওদেরকে বড়ো করছিলেন তিনি। কিন্তু বত্রিশ বছর বয়সে সুদর্শন মাহবুব সাহেবের জীবনে ঝড়ের মতো একদিন আইলিন সুলতানের আগমন ঘটে। বোনের খোঁজ নিতে ইস্তাম্বুল গেলে তার সেই বেপরোয়া, আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত ভালোবাসার কাছে তিনি বেশিদিন নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। আইলিন তাকে পাগলের মতো চাইতেন। মাহবুব সাহেবও ভেবেছিলেন, হয়তো এবার ঘরটা পূর্ণ হবে। ছেলেদের মায়ের অভাবটাও ঘুচবে। কিন্তু আইলিনকে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই ছেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ছোটো ছোটো সেই দুটো মানুষের চোখের দিকে চেয়ে সরাসরি বিয়ের অনুমতি চেয়েছিলেন। বড় ছেলে হিসেবে আশফি সেদিন বাবার চোখের সেই আর্তি আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্নটা বুঝতে পেরেছিল।
ছেলেরা খুশি মনে সায় দেওয়ার পর তিনি একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ইস্তাম্বুল পাড়ি দিয়েছিলেন আইলিনকে আনতে। ছোট্ট আশফি আর দিশানও অপেক্ষায় ছিল এক নতুন আগামীর, এক নতুন মমতার আশ্রয়ের। কিন্তু ইস্তাম্বুল থেকে ফিরলেন তিনি একদম শূন্য হাতে। ফিরে এসে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সেই মানুষটা ওদের দুই ভাইকে আদরে ভরিয়ে দিয়ে বিষণ্ণ সুরে বলেছিলেন, “তোমাদের কোনো মায়ের প্রয়োজন নেই, আমার জান! আমি আর তোমাদের দাদাই সারাজীবন তোমাদের সব আদর দেব।”
নির্দয় মায়ের সেই ধোঁকা আগে কখনো এতটা কষ্ট দেয়নি ওকে, যতটা আজ অনুভব হলো আশফির৷ বাবার সেই পরাজিত মুখটা মনে পড়তেই ওর ভেতরটা একেবারেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বাবা ঠকেছিলেন নিজের স্ত্রীর কাছে, দাদাও ঠকেছিলেন প্রথম স্ত্রী মার্গারেটের কাছে৷ যিনি ছিলেন বৃটিশ বাসিন্দা। আর আজ সেও ঠিক একইভাবে ঠকল তার সবচেয়ে প্রিয় গুরাসের কাছে। ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাসটা আজ এত নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে দিলেন সৃষ্টিকর্তা যে আশফি ভেবেই নিল, চৌধুরী বংশের পুরুষেরা হয়তো দুর্ভাগা, নয়তো অভিশপ্ত। তাই বুঝি ভালোবাসা তাদের জন্য লিখেননি বিধাতা!
মারিশার সেই অবশ হয়ে যাওয়া শরীরটাকে কেউ একজন টেনেহিঁচড়ে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। চারপাশের ঘরে ফিরেই সে কাঁপাকাঁপা হাতে দিশানকে কল করল। ওর কণ্ঠ থেকে তখন শব্দের বদলে শুধু কান্নার তোড়ে ভেসে আসা কিছু অসংলগ্ন আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল। ওপাশ থেকে দিশান তখন ভয় পেয়ে বারবার জিজ্ঞেস করছিল, “কী হয়েছে, মাহি? কাঁদছো কেন তুমি?”
কিন্তু মারিশার মুখে তখন একটাই কথা, “আশফি চলে গেছে, দিশান৷ আমাকে ছেড়ে ও চলে গেছে!”
পরিস্থিতি কিছুই বুঝতে না পারলেও বিপদের আঁচ পেয়েই দিশান আর হৃদয় যখন রিসোর্টে পৌঁছাল, তখন বেলা গড়িয়েছে অনেকটা। ঘরে ঢুকেই ওদের চোখ আটকে গেল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা সেই পুরনো ফটোগ্রাফগুলোর ওপর। একপলক তাকিয়েই দিশান ভ্রু কুঁচকে ফেলল। বুঝতে পারল কিছু একটা খারাপ ঘটেছে। কিন্তু তবু ওর বিশ্বাস হলো না, ওর ভাইয়ের মতো ছেলে এসব ছবির ওপর ভিত্তি করে মারিশাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে না। নেপথ্যে নিশ্চয়ই আরও গভীর আর ভয়াবহ কোনো সত্য উন্মোচিত হয়েছে। সে ছবিগুলো মুঠোয় নিয়ে দিশেহারা মারিশার দিকে তাকাল, কিন্তু মারিশা তখন কোনো কিছু ব্যাখ্যা করার অবস্থায় নেই।
পাগলের মতো আশফিকে কল করতে শুরু করল দিশান, হৃদয়৷ কিন্তু ফোনটা বন্ধ বলল। দিব্যকে রেখে এসেছে ওরা ওই ভিউপয়েন্টের কাছাকাছি। যাতে সাজানো জায়গাটা কেউ নষ্ট না করে ফেলে৷ ওর কাছে কল করল দ্রুত৷ দিব্যও হতাশ করল, আশফি যায়নি সেখানে।
অসহায় দিশান আর হৃদয় তখন রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে গিয়ে আন্দাজের ওপর আশফিকে খুঁজতে শুরু করল। সারাটা দিন পোখরার অলিগলি, ক্যাফে আর পাহাড়ি বাঁকে বাঁকে ওরা হন্যে হয়ে ফিরল। রোদ মরে এল, দীর্ঘ ছায়া নামল পাহাড়ের গায়ে, কিন্তু আশফির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। নেপাল থাকা ওর দুয়েকজন পরিচিতদের কাছেও খবর নিল। আশাহত করল তারাও৷ কারও কাছেই যায়নি আশফি।
মারিশা ফোন করলে দিশান যখন শেষবারের মতো জানাল কোনো খোঁজ পায়নি ওর, তখন মারিশার ভেতরটা এক হিমশীতল শূন্যতায় ডুবে গেল। সে বুঝে নিল, মানুষটা আজ ওকে ছেড়ে সত্যিই হারিয়ে গেছে।
বিকেলের শেষ আলোয় মারিশা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। দিশানরা কেউ তখনো ফেরেনি। পরনে ওর সেই তুবড়ানো বিয়ের পোশাক, চোখের কোলে শুকিয়ে যাওয়া জল। রাস্তায় উঠতেই একটা ক্যাবে চেপে সোজা রওনা হলো অন্নপূর্ণা ভিউপয়েন্টের দিকে।
গাড়ি যত ওপরে উঠছে, বাতাস তত ভারী আর শীতল হয়ে আসছে। পাহাড়ের খাঁজকাটা রাস্তাগুলো সাপের মতো একেবেঁকে ওপরে উঠে গেছে। ধুলোমাখা সেই দীর্ঘ পথে ক্যাব থেকে নেমে যখন ও একা হাঁটতে শুরু করল, ওর শরীরের প্রতিটি পেশি যেন বিদ্রোহ করছিল। ট্রেকিং করার মতো মানসিক জোর আর শারীরিক শক্তি, কোনোটাই ওর অবশিষ্ট নেই। পাথুরে চড়াইগুলোতে পা রাখতে গিয়ে মচকানো আঙুলের ব্যথাটা তীব্র হয়ে প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন বুকের খাঁচায় ফালি ফালি করে বিঁধছিল। কিন্তু এক দুর্নিবার নেশায় ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলল। ওই তো, সামনেই সেই নির্দিষ্ট চূড়াটা।
একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে মারিশা থমকে দাঁড়াল। এখানেই আশফি ওর জন্য চমকটা রেখেছিল। বিকেলের ম্লান আলোয় অন্নপূর্ণার চূড়াগুলো তখন আবির রঙে ভিজেছে। চারপাশটা নিথর, শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। মারিশার বুকটা ধক করে উঠল। সামনে তাকিয়ে ও দেখল, এই জনমানবহীন পাহাড়ের চূড়ায় ওর জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক দৃশ্য, যা ও কল্পনাও করতে পারেনি। ভালোবাসার এক চরম অর্ঘ্য ওখানে সাজানো আছে। কিন্তু যে মানুষটা এই মায়ার জগত সাজাল, সে তো আজ সব বিশ্বাসের সমাধি দিয়ে বহুদূরে কোনো এক অনিশ্চিত পথে হারিয়ে গেছে।
মারিশা টালমাটাল পায়ে এগিয়ে এল। সাজানো প্রতিটি ছোটখাটো জিনিসের ওপর সে হাত বুলাতে লাগল। প্রতিটি ছোঁয়ায় এক একটা স্মৃতির হুল ফুটছে ওর বুকে। তারপর ছবিগুলোতে আঙুল ছোঁয়াতেই ওর বহুক্ষণের চেপে রাখা কান্নাটার বাঁধ ভেঙে গেল। বুক ফাটা হাহাকারে রূপ নিল তা। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে৷ শরীরের সবটুকু শক্তি হারিয়ে ধপ করে বসে পড়ল শতরঞ্জির ওপর।
অন্নপূর্ণার চূড়ায় এখন শেষ বিকেলের বিষণ্ণ আলো। মারিশা অপলক চেয়ে রইল দূর আকাশের দিকে, যেখানে সাদা তুলোর মতো একদল বুনো মেঘ উদাসীনভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাতাসের ঝাপটায় ওর অবিন্যস্ত চুলগুলো মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই। কতক্ষণ নির্জীবের মতো সেভাবে বসে রইল কে জানে! তারপর হঠাৎ বিড়বিড় করে উঠল, “আশফি, তুমি আমার বুনো গন্ধরাজ নও৷ তুমি আসলে ওই বুনো মেঘের মতোই অধরা। মায়ায় জড়িয়ে কাছে ডাকো শুধু৷ কিন্তু ছুঁতে গেলেই মেঘের মতো দূরে হারিয়ে যাও।”
শতরঞ্জির এক কোণে রাখা ছিল সেই কাশ্মীরি চাদরটা। সেটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরল মারিশা। বুকের ওপর চেপে ধরে ওর মনে হলো, এখান থেকে এখনো আশফির গায়ের সেই পরিচিত গন্ধটা মিশে আছে। চাদরে মুখ গুঁজে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “কতটা যত্ন তোমার আমাকে ঘিরে! এই নির্জন পাহাড়েও তুমি আমার আরামের কথা ভেবেছ! কিন্তু সেই আমার ভালোবাসা তুমি বিশ্বাস করলে না? একই যন্ত্রণা ফিরিয়ে দিলে আমায়? প্রতিশোধ নিলে তুমিও?”
আচমকা এক তীব্র অভিমান যেন ওর কণ্ঠনালীতে আটকে গেল। চোখের জলে চাদরটা ভিজিয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল, “কিন্তু আশফি, আজ তো কেবল আমি একাই মিথ্যেবাদী হলাম না! তুমিও যে কথা দিয়ে কথা রাখলে না। তুমি তো বলেছিলে, কোনোদিন আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না! তবে আজ কেন আমাকে একা ফেলে পালিয়ে গেলে?”
বলেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। শতরঞ্জির ধুলোয় মাথা কুটে বলতে লাগল, “এত পাপ, এত অন্যায়ের বোঝা নিয়ে আমি যে আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু পাচ্ছি না, আশফি!”
“ওহ আশকিম! তোমার বুঝি মরে যাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছে?”
আচমকা এক শীতল, বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বরে মারিশার বিলাপ থমকে গেল। মুখটা তুলে তাকাল মারিশা৷ ডেনিজ! কেন যেন ওকে দেখেও একটুও চমকাল না সে।
ওকে অনুসরণ করে এই নির্জন ভিউপয়েন্ট পর্যন্ত চলে এসেছে ডেনিজ। ওর ধারাল সুন্দর মুখটাতে গা ছমছমা করা সেই পরিচিত হাসিটা। ধীর পায়ে এগিয়ে এল ওর কাছে৷ ওর মুখোমুখি বসে অবজ্ঞার সুরে বলল, “প্লিজ, আমাকে তোমার সেই ইচ্ছেটুকু পূরণ করার সুযোগ দাও।”
মারিশা কোনো জবাবই দিল না৷ চোখে ওর নেই কোনো ভয়। সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু দাঁড়িয়ে জেনেও সে পালানোর নূন্যতম চেষ্টাটুকু করল না। প্রাণহীন এক জোড়া চোখের দৃষ্টি মেলে সে কেবল চেয়ে রইল।
কিন্তু ডেনিজ ওর এই নির্লিপ্ততায় যেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। এক ঝটকায় ওর চুলের মুঠি মুচড়ে ধরল। নিষ্ঠুরভাবে টেনে মুখটা নিজের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল, “ডিয়ার এক্স, আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমার মৃত্যুটা তোমার ভাবনার চেয়েও বেশি নির্মম করব। আমার মা আর আমার বোন যতটা যন্ত্রণা পেয়েছে, তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি কষ্টে মরবে তুমি। কথা দিলাম!”
মারিশার মুখে কোনো রা নেই। সে যেন এক প্রস্তর মূর্তি। আশফিকে যে হারিয়ে ফেলেছে, তাই তার কাছে মৃত্যু এখন বড়োই তুচ্ছ। সে তো এসেছেই নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু এখানেই ত্যাগ করতে৷ ডেনিজের হাতেই যদি সেই শেষ নিঃশ্বাসটা যায়, তবে তাই হোক। ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে চেয়ে মৃত্যুর মুহূর্তটুকু গুনতে লাগল সে।
ডেনিজের ভেতরের পশুটা যেন এবার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে উন্মাদের মতো মারিশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম চড়টা যখন মারিশার গালে আছড়ে পড়ল, ওর মাথাটা সজোরে পাথুরে মাটির দিকে হেলে গেল। কিন্তু ডেনিজ থামল না। ওর শক্ত বুট পরা পায়ের একেকটা লাথি যখন মারিশার পাঁজরে আর পেটে এসে বিঁধছিল, হাড়ের মটমট শব্দ যেন বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল।
মারিশার শরীরটা এক সময় খড়কুটোর মতো শতরঞ্জির ওপর লুটিয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোণ ফেটে উষ্ণ, গাঢ় রক্ত গড়িয়ে চিবুক বেয়ে সাদা পোশাকটাকে কলঙ্কিত করল। যন্ত্রণার এক একটা ঢেউ ওর মস্তিষ্ককে অবশ করে দিচ্ছিল, চোখের সামনে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওর সেই নীল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো থেকে একটা আর্তনাদও বের হলো না। এমনকি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে ‘উফ’ শব্দটুকুও করল না সে।
ওর এই অস্বাভাবিক নীরবতা ডেনিজকে আরও বেশি পৈশাচিক করে তুলল। মারিশার রক্তমাখা মুখটা চুলের মুঠি ধরে ওপরের দিকে টেনে তুলল সে। ওর নিস্তেজ চোখের মণি দুটো তখন স্থির হয়ে আছে অন্নপূর্ণার সেই ধবল চূড়ার দিকে। ও যেন এই পৃথিবীতে নেই, ওর আত্মাটা যেন অনেক আগেই এই শরীর ছেড়ে ওই বুনো মেঘেদের ভিড়ে মিশে গেছে। শরীরটা কেবল একটা রক্তমাংসের পিণ্ড হয়ে ডেনিজের লাঞ্ছনা সয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি আঘাতের সাথে ও মনে মনে শুধু ভাবছিল, যে শরীরটাকে পুতুলের মতো যত্ন করে আগলে রাখত আশফি, আজ সেই শরীরটাকে ডেনিজ নামের পিশাচটা কী অবর্ণনীয় আনন্দে রক্তাক্ত করে যাচ্ছে। আচ্ছা এই রক্তক্ষরণ কি ওর মনের সব পাপ ধুয়ে দিচ্ছে? আশফির দেওয়া যন্ত্রণার কাছে এই হাড় ভাঙা ব্যথাটা যে বড়ো নগণ্য, বড়ো তুচ্ছ!
কিন্তু ওর এই মরণপণ নীরবতা ডেনিজকে হতাশ করল। সে মার থামিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “উফ্! তুমি তো দেখছি মরার আগেই মরে গেছ। এভাবে মেরে ঠিক মজা পাচ্ছি না। আমার জীবনটাকে জাহান্নাম করার জন্য চলো এবার বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হও। জীবনের শেষ কালিমাটা পড়ে নাও জলদি!”
মারিশার চারপাশের পৃথিবীটা তখন একদম নিথর হয়ে গেছে। সে কোনো পাল্টা উত্তর দিল না, এমনকি প্রাণ বাঁচানোর আকুতিটুকুও জানাল না। যেন এক পরম শান্তির অপেক্ষায় সে ধীরে ধীরে নিজের চোখের পাতা দুটো এক করল। চারপাশের সব কোলাহল ছাপিয়ে ওর অন্তরে তখন পবিত্র কালিমার শব্দগুলো গুঞ্জরিত হতে লাগল। শেষবারের মতো নিজের মানসপটে ও আঁকড়ে ধরল দুটি প্রিয় মুখ — ওর বাবা আর ওর আশফি। জীবনের সব অপরাধবোধ আর যন্ত্রণার ওপারে গিয়ে ও কেবল এক পলকের মুক্তি চাইল।
ঠিক তারপরই পুরো প্রকৃতিকে কাঁপিয়ে দিয়ে বজ্রপাতের মতো একটা গুলির শব্দ হলো। পাহাড়ের দেয়ালে সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে না হতেই পরমুহূর্তে দ্বিতীয়বার গর্জে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র।
এক বীভৎস, আকাশফাঁটা আর্তনাদ সেই নির্জন গিরিখাতকে কাঁপিয়ে দিল। শতরঞ্জি, আর তার ওপর যত্ন করে রাখা সেই কাশ্মীরি সাদা শালটাও ধীরে ধীরে গাঢ় লাল রক্তে ভিজে সপসপে হয়ে উঠল।
বিকেলের শেষ আলো তখন নিভে আসছে। পাহাড়ের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে নিচে উপত্যকায় নেমে গেছে। আশফি একা, এলোমেলো পায়ে কোনো এক নাম না জানা রাস্তা ধরে তখনো হেঁটেই চলেছে। ওর গন্তব্য নির্ধারিত হয়নি, হওয়ার প্রয়োজনও বোধ করছে না সে। মাথার ভেতর সব চিন্তা এখন স্থবির, শুধু বুকের বাঁ পাশে এক আশ্চর্য অসারতা।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ওর মনে হলো পাসাঙের কথা। এই মুহূর্তে হয়তো পাসাঙই ওর কোনো গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারবে।
কিন্তু তাও দ্বিধায় ভুগতে লাগর৷ সেই দ্বিধান্বিত চিন্তায় সে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ল যে, নিজের অজান্তেই কখন ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত মেইন রাস্তার মাঝখানে উঠে এল, সে খেয়াল ওর হলো না। চারপাশের পৃথিবীর সাথে ওর সব সংযোগ যেন মুহূর্তের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩ (২)
ঠিক তখনই যমদূতের মতো গর্জে উঠল এক ঘাতক ইঞ্জিনের শব্দ। আশফি সংবিৎ ফিরে পাওয়ার আগেই দেখল, পাহাড়ের বাঁক ঘুরে একটি গাড়ি ওর দিকেই ধেয়ে আসছে। ব্রেক কষার তীক্ষ্ণ আওয়াজ আর পিচের রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণে এক বীভৎস শব্দে চারপাশটা কেঁপে উঠল।
পরমুহূর্তেই একটা আর্তনাদ ছড়িয়ে গেল চারদিকে। জনহীন পাহাড়ের বাঁকে সেই আর্তনাদটা প্রতিধ্বনিত হতে হতে ধীরে ধীরে এক গভীর নিস্তব্ধতায় তলিয়ে গেল। রাস্তার একপাশে ধুলো আর রক্তের দাগ লেগে রইল, আর পাহাড়ের সেই শেষ বিকেলের বিষণ্ণ রোদটুকুও যেন মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে এল।
সমাপ্ত
