ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৬
ছায়া
সময় সব ঠিক করে দেয় এই কথাটা হয়তো সবাই বলে,কিন্তু ইলার জীবনে তা সত্যি হতে অনেক সময় লেগেছিল। শাওনের কাছে শেষ মেসেজ পাঠানোর পর থেকে ঠিক এক বছর কেটে গেছে। এই এক বছরে ইলা কেঁদেছে, লড়েছে, নিজেকে বদলেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে চিনেছে।
এক বছর পর…
আজ ফলাফল প্রকাশের দিন সকাল থেকেই ইলার বাসায় এক অদ্ভুত উত্তেজনা সবাই টেনশনে আছে রেজাল্ট এর।তালুকদার বাড়িতে তখন সবার মুখে উৎকণ্ঠা রাশেদ তালুকদার হাতে মোবাইল নিয়ে ফলাফল দেখছেন হঠাৎ উচ্ছ্বাসে উঠে দাঁড়ালেন
রাশেদঃ- ইলা মা তুই গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিস মা, আমাদের পরি ও গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে।
এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি ভরে গেলো করতালিতে সাবিহার চোখেও আনন্দের অশ্রু, বড় মা দোয়া পড়ছেন আর পরি দৌড়ে গিয়ে ইলাকে জড়িয়ে ধরলো। ইলা নীরবে চোখ বন্ধ করে শুধু বললো “আলহামদুলিল্লাহ… আমার আল্লাহ আমাকে অপমানের জবাব দিয়েছেন নিজের কৃতিত্বে”
পরিঃ- ইলা রেজাল্ট বের হইছে গোল্ডেন এ প্লাস তুই গোল্ডেন পাইছিস রে।
ইলা তখন জানালার পাশে বসে ছিলো ধীরে ঘুরে তাকালো পরির দিকে। চোখে একচিলতে হাসি কিন্তু সেটা শান্ত আগের মতো উত্তেজিত নয়। হয়ে বা ইলা আগে থেকেই জানতো ইলার রেজাল্ট এমন একটা অবস্থা। তবুও পরির দিকে তাকিয়ে বলল
ইলাঃ- তুইও তো পাইছিস পরি।
পরিঃ- ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমাদের দু’জনের নাম যদি আসে ভাব না কেমন লাগবে?
ইলাঃ- তখন মনে হবে জীবন আসলে হারায় না নতুনভাবে শুরু হয়।
আবার শুরু হলো তাদের নতুন যুদ্ধ দুইজনই খুব পড়াশুনা করে বেশ কয়েকটা ভার্সিটিতে পরিক্ষা দিলো। কয়েকদিন পরেই ফলাফল এলো দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। পরির সাবজেক্ট সোসিওলজি, আর ইলার সাবজেক্ট জার্নালিজম। বাড়ির সবাই অনেক খুশি, ইলা আর পরির অপেক্ষা কবে তারা তাদের সেই ভার্সিটিতে যাবে মুক্ত ভাবে ঘুরতে পারবে।
অপেক্ষার প্রহর শেষ করে ইলা ও পরি চলে গেলো তালুকদার বাড়ি ছেরে ঢাকাতে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের গেট দিয়ে যখন ইলা আর পরি প্রথম ঢুকলো, মনে হচ্ছিল একদম নতুন একটা পৃথিবীতে এসেছে সে। সবাই ব্যস্ত, কেউ বই নিয়ে, কেউ চা হাতে, কেউ প্রেমের গল্পে।
পরি আর ইলা দু’জন একসাথে একই হোস্টেলে উঠেছে রুম নাম্বার ২১৩, “শহীদ জননী হল” হলরুমের বারান্দায় বিকেলের আলো পড়লে দূরে সংসদ ভবনের ছায়া দেখা যায়।সেই আলোয় বসে ইলা প্রতিদিন বই পড়ে, চুপচাপ গান শোনে, রেগুলার ক্লাস করে।
এভাবে দুই সপ্তাহ কেটে গেলো রুমের এক কোণে দুই মেয়ে একসাথে বসে সকালের চা খাচ্ছে। এক জনের চোখে ফ্রেমের চশমা, চুল কাঁধ ছোঁয়া, আর মুখে এক শান্ত আত্মবিশ্বাস সে ইলা। পড়ার চাপের কারণে ইলা চুল কেটে ছোট করে দিয়েছে। যখন বাড়ি ছিলো তখন ইলার মা ইলার চুল ধুয়ে দিতো কিন্তু এখন ইলা একা একা চুলের যত্ন করতে পারে না। তাই চুল ছোট করে নিয়েছে।
আর আরেকজন আগের মতোই চঞ্চল খিলখিল হাসি মুখে সব সময় ইলার পিছনে লাগে সে হচ্ছে পরি। এই দুই মেয়ের সঙ্গে এখন নতুন একজন যুক্ত হয়েছে হালিমা সরকার।
হালিমা একটু বেখেয়ালী, একটু হাস্যকর, কিন্তু মনটা একদম শিশুর মতো সবসময় কথা বলে, হাসে, মজা করে। কখনো ভুল করে চা’তে লবণ দেয়, আবার কখনো রাত্রে পরি-ইলাকে ডেকে তার আজাইরা গল্প শোনায়। যা ইলা আর পরি মন দিয়ে শুনে। তবুও ওর মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাদেরকে আলাদা করে না। হালিমাকে তার বাবা মা অস্ট্রেলিয়াতে পাঠাতে চেয়েছিলো কিন্তু হালিমা যাবে না বলে দিয়েছিলো যার কারণে হালিমা বাবা মা রাগ করে আছে। হালিমা মন খারাপ করে ইলা আর পরিকে বলল
হালিমাঃ- তোরা জানিস তোরা ছাড়া আমার কেউ নাই, আব্বু আম্মু ভাইয়ারা কেউ তেমন কথা বলে না আমি শুধু তোদের কারণেই এখানে হাসি খুশি থাকতে পারছি।
পরিঃ- তুই পাগল আমরা আছি তো তোর সাথে আমরা তিনজন একটা টিম চিরকাল এভাবে থাকবো। আর না হলে আমাদের রায়েদ ভাইয়ের বউ বানিয়ে নিবো।
হালিমাঃ- মাফ চাই ভাই, তোদের ঐ প্লে-বয় ভাইকে আমি বিয়ে করতে চাই না। এমনিতেও আমি উনাকে ভয় পাই।
পরি হালিমার কথা শুনে হেসে উঠে ইলাও হাসছে কিন্তু ইলার হাসি বাকি দুইজন দেখতে পেলো না কারণ ইলা তখন বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলো। ইলা বইয়ের দিয়ে চোখ রেখেই বলল
ইলাঃ- হালিমা তুই আমাদের হাসির কারণ তুই আছিস বলেই এই রুমটা বেঁচে আছে।
এই এক বছরে ইলা অনেক বদলে গেছে আগের সেই কান্না ভেজা নিরব মেয়ে এখন আত্মবিশ্বাসে ভরা। তার চোখে একটা দৃঢ়তা, মুখে নরম কিন্তু শক্ত হাসি। শাওন নামের মানুষটা এখন শুধু তার অতীতের একটা অধ্যায়। সে আর ফোনের ওয়ালপেপারে শাওনের ছবি রাখে না। না কোনো নোটবুকে “S” অক্ষর লিখে রাখে।
সে এখন নিজের জীবনের লক্ষ্য নিয়েই ব্যস্ত একজন ভালো সাংবাদিক হবে,মানুষের গল্প বলবে,মানুষের গল্প শুনবে। কারণ একসময় তার নিজের গল্প কেউ শুনেনি।
ইলা এখন প্রতি সকালে ক্যাম্পাসের টাওয়ার ঘুরে বেড়ায়, হাতে নোটবুক, গলায় ক্যামেরা। আর পরি ও হালিমা মিলে হাসতে হাসতে ওকে বলে
পরিঃ- আমাদের ইলা এখন পুরো রিপোর্টার লেডি।
ইলাঃ- তোরাই তো আমার পাওয়ার আমি একা কিছুই না।
হালিমা চুপচাপ বিছানায় বসে বই পড়ছে পরি পাশে বসে মোবাইল স্ক্রল করছে, আর ইলা জানালার ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রাতের চাঁদ, টিমটিমে আলো, দূর থেকে এসার এর আজানের ধ্বনি সবকিছু মিলিয়ে একটা শান্ত আবহাওয়া হালিমা হঠাৎ বলল
হালিমাঃ- ইলা কখনো পুরনো কাউকে মিস করিস?
ইলা চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বাইরে, তারপর মৃদু হেসে বলল,
ইলাঃ- না রে এখন কাউকে মিস করি না হয়তো মাঝে মাঝে মনে পড়ে, কিন্তু কষ্ট লাগে না। কারণ আমি জানি আমার কষ্টগুলোই আমাকে আজকের আমি বানিয়েছে।
পরি ইলার দিকে তাকিয়ে দেখলো ইলার ফেস কেমন হয়েছে দেখে ইলা স্বাভাবিক আছে। পরি তখন হালিমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল
পরিঃ- দেখলি আমাদের ইলা এখন দার্শনিক হয়ে গেছে।
তিনজন একসাথে হেসে উঠলো হাসিটা গড়িয়ে পড়লো জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয়। হ্যাঁ এই এক বছরে ইলা শাওনের ভিডিও কথা কোনো কিছুই কাউকে বলে নি। ইলা জানেও না শাওন এখন কোথায় আছে কি করছে। বিয়ে করেছে কি না কিছুই জানে না আর জানতেও চায় না।
ইলা এখন জানে জীবন শুধু ভালোবাসা হারানোর গল্প না জীবন মানে নিজেকে ফিরে পাওয়ার গল্পও হতে পারে। শাওনের নাম এখন কোনো দাগ না শুধু একটা শিক্ষা।
আর পরি আর হালিমা ওরা এখন ইলার পৃথিবী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই হোস্টেলের ছাদের নিচে, তিনটি মেয়ের হাসি মিলেমিশে যায় শহরের কোলাহলে যেন বলে দেয় “একসময় যারা ভেঙে গিয়েছিল তারাই একদিন সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে”
একদিন গরম বিকেলটা একটু অস্বাভাবিক লাগছিলো ইলার কাছে। ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের রাস্তাটা তখনো জনাকীর্ণ, গাছের পাতা গরম হাওয়ায় নড়ছে। ইলার হাতে একটা ফাইল, কানে এয়ারপড বাজছে তার প্রিয় গান “ তুমি জানতে পারোনি তোমায় কতো ভালোবেসেছি” চোখে রোদ পড়ছে, আর সে হাঁটছে নিজের জগতে হারিয়ে। সবার থেকে সব কিছু লুকালেও সত্যি বলতে ইলা এখনো শাওনের নিরবে ভালোবেসে যায়। হয়তো সেটা প্রকাশ করে না কিন্তু ইলা শাওনকে কখনো ভুলতে পারবে না। কারণ শাওন ইলার প্রথম ভালোবাসা ছিলো আচগে থাকবে।
ইলা হাটছে নিজের মত করে পূরো দুনিয়ে মনে হয় চুপ হয়ে গেছে মাথায় তখনও শাওন, পুরনো কষ্ট, নতুন লক্ষ্য সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে এক বাইক ছুটে আসছে ফুল স্পিডে চালকের কণ্ঠে আতঙ্ক “হেই…হেই মিস…সাইডে যান হর্ণ শুনছেন না”
কিন্তু ইলার কানে তখনও এয়ারপড মিউজিক বাজার কারণে ইলা কিছু শুনতে পাচ্ছে না। বাইক আর ইলার মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি। এই মনে হয় এক্সিডেন হলো বলে ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ একজন পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে জোরে টেনে নেয় ইলাকে “ধপাস” দু’জনেই রাস্তার ধারে পড়ে গেলো।
ইলা পুরোটা সময় বুঝেই উঠতে পারলো না কী ঘটলো সে নিজের ব্যাগটা ঠিক করে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। ইলা দেকলো বাইকটা চলে গেলো ইলা বুঝতে পারলো ছেলেটা তাকে বাচানোর জন্য এভাবে টান মারছিলো। তাই ইলা ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
ইলাঃ- এক্সকিউজ মি, থ্যাঙ্ক ইউ আপনি না টানলে হয়তো আমি আজ এক্সিডেন্টে করতাম।
ছেলেটা উঠে দাড়ালো ইলার কথা শেষ হবার আগেই “ঠাস”একটা তীব্র শব্দ। ইলা হতভম্ব তার গালে জ্বালা ধরেছে চড় মেরেছে ছেলেটা ইলাকে এত জোরে মেরেছে মনে হচ্ছে কান দিয়ে ধোয়া বের হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইলো ইলা তারপর চমকে বলল
ইলাঃ- এইযে মিস্টার আপনি এত জোরে আমাকে মারলেন কেনো?
ছেলেটা ৫’১১ ইঞ্চি উঁচু, ফর্সা, লম্বাটে মুখ, চোখ দুটি মাঝামাঝি আকারের গভীর চাওনি, ভ্রু গুলো মাঝারি ঘনত্বের স্বাভাবিক আকৃতির, নাখটা সোজা, ঠোঁট দুটি পূর্ন নিচের ঠোঁটটি সামান্য বেশি মোটা, ঠোঁট কালার গোলাপি।চুল গুলো কালো মাঝারি আকারের কপালের উপরে ঝুলে আছে। কালো টি-শার্ট হাতে ঘড়ি ইলার আর বুঝতে বাকি রইলো না এটা ভার্সিটির সিনিয়র কেউ। ইলার প্রশ্নের উত্তর দিতে ছেলেটি বলল
আরিয়ানঃ- আমার নাম আরিয়ান খান আর চড়টা লাগার জন্য মেরেছি যাতে নেক্সট টাইম রাস্তায় হাটার সময় মন অন্য কোথাও না থাকে।
ইলা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে চোখে অবিশ্বাস, মুখে রাগ, আবার কোথাও যেন একটা অদ্ভুত শিহরণও।
ইলাঃ- মানে আপনি কে আমাকে এভাবে মারার আর আমাকে শেখানোর?
আরিয়ানঃ- আমি এমন একজন যে নিজের চোখের সামনে কাউকে মরতে দেখতে পারে না। আর যাকে বাঁচাই সে যদি ধন্যবাদ দিতে আসে তার আগে নিজের ভুলটা শেখানো আমার কাজ।
ইলাঃ- (গাল চেপে বলল ইলা) আপনার এই শেখানোর ধরনটা একটু ব্যথাদায়ক হয়ে গেলো জানেন?
আরিয়ানঃ- ব্যথা ছাড়া মানুষ কিছু শেখে না মিস…”
ইলাঃ- ইলা তালুকদার।
আরিয়ানঃ- ভালো নাম, কিন্তু নামের মতো মানুষের মিল নেই আমার মনে হয় আপনি উগান্ডা থেকে এসেছেন।
ইলাঃ- আপনি জানেন আমি কে?
আরিয়ানঃ- না জানি না আর জানতেও চাই না। তবে এই রাস্তায় আবার হেডফোন কানে দিয়ে হাঁটলে, আমি ট্রাক এনে পিশে দিয়ে চলে যাবো।
ইলা রাগে কাঁপছে তবু কিছু বলতে পারছে না। কারণ ঢাকাতে সে নতুন আর ইচ্চাও নেই কারো সাথে ঝামেলা করার। তাই নিজের রাগ কন্ট্রোল করে নিলো। আরিয়ান হেলমেটটা হাতে তুলে বাইকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পিছনে না তাকিয়ে বলল
আরিয়ানঃ- বাই দ্য ওয়ে গালে লালচে দাগ পড়েছে বরফ লাগিয়ে নেবেন।
ইলাঃ- বরফ কি এখন আমার দাদু আমাকে এনে দিবে এখানে??
সামনে দিয়ে একটা লোক আইস্ক্রিম নিয়ে যাচ্ছিলো আরিয়ান একটা আইস্ক্রিম কিনে ইলার দিকে এগিয়ে আসলো। এসে দেখে ইলার ফর্সা গালে আরিয়ানের হাতের ৫ টা আঙুলের ছাপ উঠে গেছে। আরিয়ান গালে আইস্ক্রিম লাগাতে যেতেও কিছু ভেবে ইলাকে বলল
আরিয়ানঃ- এই যে লাগিয়ে নিন ভালো লাগবে কিছুটা।
ইলা দাঁড়িয়ে রইলো স্তব্ধ হয়ে তার বুক ধকধক করছে, গাল এখনো জ্বলছে, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত ঝড়। রাগ, অপমান, আর অজানা কৌতূহলের মিশেল। মনে মনে বলল “আরিয়ান খান… নামটা ঠিক মনে রাখলাম। পরেরবার দেখা হলে আমি এই চড়ের বদলা না নিয়ে ছাড়বো না।
ইলা গালে হাত দিয়ে হলে চলে গেলো পরি আর হালিমা ইলার এই অবস্থা দেখে কিছুটা অবাক হলো। ইলা কান্না করবে করবে অবস্থা। পরি দ্রুত ইলার কাছে আসলো সাথে হালিমাও
পরিঃ- কিরে তোর গালে কি হয়েছে? এই অবস্থা কেনো গালের??
ইলা কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো চোখের কোণে জল চিকচিক করছে, ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না।
হালিমাঃ- ইলা কে মারলো তোকে এভাবে বলবি?
পরিঃ- বল ইলা চুপ কেনো?কে এই কাজটা করলো বল তো, আমি এখনই দেখি ওর কপালে কি লেখা আছে আজ ওর একদিন আমার ৫-৬ দিন।
ইলাঃ- কিছু না পরি আমি নিজেই…পড়ে গিয়েছিলাম।
পরিঃ- নিজেরে মারছিস নাকি তুই? একটা বড় হাতের ৫ টা আঙুলের চাপ বসে গেছে।এইভাবে পড়ে কেউ এমন দাগ করে তুই কি ভাবিস আমি বোকার হালি?
ইলাঃ- প্লিজ পরি এখন কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আমি একটু একা থাকতে চাই।
হালিমা নিঃশব্দে পরির দিকে তাকালো দুজনেই বুঝতে পারছে ইলার ভিতরে কিছু একটা ভেঙে গেছে।
পরিঃ- ঠিক আছে কিন্তু তুই একা একা রুমে থাকলে আমরা দুইটা কি করবো।
ইলাঃ- আমার জন্য নুডুলস নিয়ে আয় যা।
ইলা আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে রুমে চলে গেলো দরজা বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের জল গড়িয়ে পড়লো বালিশে।
সময় এভাবে যাচ্ছিলো ইলাও সেদিনের পরে আর ঐছেলেকে দেখেনি। ইলা সব ভুলে গেছিলো আবার আগের মত সময় যেতে লাগলো। কিন্তু ইলা আর রাস্তায় গান শুনে না গান শুনার ইচ্ছা হলেই সেই থাপড়ের কথা মনে পড়ে।
কিন্তু কিছু দিন পরে ভার্সিটির সেই সকালটা ছিল অন্যরকম আকাশে হালকা রোদ, ক্যাম্পাসের প্রতিটা কোণে নতুন সেমিস্টারের কোলাহল। ইলা,পরি আর হালিমা তিনজন একসাথে হাঁটছিলো। মেয়েদের হাসির ফাঁকে ইলার মুখে একটা অদ্ভুত গম্ভীর ভাব।
কিন্তু বেশি সময় লাগলো না চারপাশের হাসি মিলিয়ে যেতে। হঠাৎ সামনেই দাঁড়িয়ে গেলো ভার্সিটির কয়েকজন সিনিয়র চারজন ছেলে মুখে অহংকার মেশানো হাসি। তাদের মধ্যে একজন বললো,
“এই তোমরা নতুনরা আমাদের সামনে দাঁড়াও।
পরি আর হালিমা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে গেলো কিন্তু ইলা সোজা তাকালো সেই ছেলেটার চোখে।
ইলাঃ- কেনো আমরা দাড়াবো,আপনারা কি আমাদের অপমান করার লাইসেন্স নিয়েছেন নাকি ভার্সিটি থেকে।
সিনিয়ররা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, তারপর ইলার সামনে দাঁড়িয়ে একজন সিনিয়র বলল
“তোমার তো দেখি অনেক সাহস তাহলে ওই মিষ্টি গলায় একটু গান গাইতে হবে তোমার আর তারপর হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের সিনিয়র ভাইদের সালাম দিতে হবে বুঝছো?
হালিমাঃ- ইলা চুপ থাক ওদের সাথে লাগিস না…।
কিন্তু ইলার চোখে রাগের আগুন জ্বলছে ইলা এত সহজে ছাড়ার মেয়ে না। আর ইলার বাবা সব সময় বলে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে। ইলা রাগি কন্ঠে বলল
ইলাঃ- তোমরা নিজেদের সিনিয়র দাবি করো অথচ মেয়েদের সম্মান দিতে জানো না লজ্জা হওয়া উচিত তোমাদের।
এই কথাতেই পাশের এক সিনিয়র রেগে গিয়ে ইলার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
“বেশি কথা বলবি না তুই, তুই জানিস আমরা কে কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস।
সেই মুহূর্তে ইলার শরীরের রক্ত যেন ফুটে উঠলো চোখের সামনে চোখ গুলো লাল ঝাপসা হয়ে গেলো। এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঠাসসস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিলো ছেলেটার গালে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। ছেলেটার চোখ লাল হয়ে গেলো চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো ছেলেটা রাগে লজ্জায় ইলাকে বলল
“তোকে আজ এমন শিক্ষা দেবো যে তুই কাউকে মুখ দেখাতে পারবি না।
ওরা তিনজন মেয়েকে ঘিরে ফেললো পরি ভয় পেয়ে ইলার হাত চেপে ধরেছে হালিমা ফিসফিস করে বললো,
হালিমাঃ- ইলা চল এখান থেকে…।
কিন্তু সিনিয়ররা তখন রেগে আগুন ইলার চুল ধরে টেনে সাইডের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। পরি আর ইলা চিলায় হেল্প চাচ্ছে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না হেল্প করার জন্য। সবাই ফোন এ ভিডিও করতে ব্যাস্ত। ইলাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে পরি আর হালিমা কান্না করছে। ঠিক তখনই এক প্রচণ্ড ভারী আওয়াজ শোনা গেলো ” ঐ বাচ্চার দল থাম” সবাই তাকালো সামনের দিকে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ছেলো উঁচু দেহ,কালো শার্টে গাঢ় চোখদুটো জ্বলছে হাতে একটা ক্রিকেট ব্যাট।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তার চেহারায় এমন এক ভয়ংকর শান্তি যে চারজন সিনিয়রের বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরলো।ব্যাট টা কাঁধে রেখে ছেলেটা উচু গলায় বললো,
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৫
“বান্দির পোলা হাত ছাড় মেয়েটার।
এক মুহূর্তের জন্য সবার নিঃশ্বাসও বের হলো এমন এক অবস্থা। তার চোখে এমন কিছু ছিলো যা না রাগ, না ভয় বরং একধরনের হুঁশিয়ারি,যেটা কারো সাহস হয় না উপেক্ষা করার।
সিনিয়ররা একে অপরের মুখ চেয়ে ধীরে ধীরে ইলার হাত ছেড়ে দিলো।ইলা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো সেই ছেলেটার দিকে। ইলার চিনতে বাকি রইলো না ছেলেটাকে। তার হাতে ব্যাটটা এখনো শক্ত করে ধরা মুখে কোনো হাসি নেই চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু হালকা বাতাসে ইলার চুল উড়ছে আর সেই ছেলেটার গলায় ভেসে আসছে একটাই কথা
“আর একবার হাত ধরার চেষ্টা করলে হাত ভাঙবো তোদের সব কয়টার।
