Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৩
ছায়া

সকালবেলার রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে ইলার ঘরে ঢুকেছে। ইলা চোখ মেলেই প্রথমেই জানালার দিকে তাকালো হাওয়া বইছে রোদে ঝিলমিল করছে বৃষ্টির ফোঁটার রেখা। কিন্তু তার চোখে শুধু একটাই দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছে আরিয়ানের মুখ, অন্ধকারে তার চোখের গভীর দৃষ্টি। ইলার বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগল হাত দিয়ে নিজের বুকটা ছুঁয়ে বলল ফিসফিস করে,
ইলাঃ- আমি কি সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম নাকি অন্য কিছু ছিলো সেখানে।
হালিমা তখন ঘরে ঢুকলো কফির কাপ হাতে দুই হাতে দুইটা কফির কাপ। হালিমা এসে দেখে ইলা কিছু একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা করছে।

হালিমাঃ- এই তুই এখনো ওই চেহারা নিয়ে বসে আছিস? কাল রাতে কি ভূত দেখছিস নাকি? কি এত চিন্তা করছিস তুই যা ফ্রেশ হয়ে আয়।
ইলা বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হতে গেলো।ফ্রেশ হয়ে এসে কফির কাপটা হাতে নিলো
ইলাঃ- না মানে ঘুম ভাঙছে মাত্র আর তুই আসলি।
হালিমা চোখ সরু করে তাকালো,
হালিমাঃ- ঘুম ভাঙছে নাকি মনে ভাঙছে তোর।
ইলাঃ- তুই কথা পাস না ঠেস মেরে কথা বলিস সব সময়।
হালিমাঃ- না কিন্তু তোর চেহারা দেখে বুঝতেছি রাতের বৃষ্টি তোকে শুধু ভিজায় নাই তোর সাথে কারো চোখেও ভিজিয়েছে।

ইলা মুখ গোমড়া করে কফির কাপটা টেবিলে রাখলো। বাইরে তখন সবাই বিয়ের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত গেটের সামনে লাইট ঝুলছে ঘরে ঘরে অতিথিরা। সকালের রান্নার সুবাস আসছে খিচুড়ি, রোস্ট, আর মিষ্টির ঘ্রাণ।
আরিয়ান গেস্ট হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শার্টে হাতা ভাঁজ করা। চোখে কালো সানগ্লাস কিন্তু ভেতরের দৃষ্টি যেন কেউ দেখতে না পায় বলেই পড়া এই সানগ্লাস আদিব এসে পাশে দাঁড়ালো।
আদিবঃ- ব্রো আজ সকাল থেকে এত সিরিয়াস কেনো?
আরিয়ানঃ- সিরিয়াস না শুধু ভাবছি।
আদিবঃ- তুমি কি ঐ মেয়েকে কখনো ভুলতে পারবে না, যে তোমাকে কিছু না বলেই সব কিছু ছেরে চলে গেছে।
আরিয়ান একটু হেসে তাকালো

আরিয়ানঃ- ভুলিনি নিতো আমি,
তোমার মুখের হাসি,
আমার গাওয়া গানে,
তোমাকে ভালোবাসি,
আসো আবার ও কাছে,
হাতটা ধরে পাশে,
তোমায় নিয়ে যাবো,
আমার পৃথিবীতে,
আদিবঃ- তাকে না ভুলতে পারলে ইলার প্রতি এত টান কেনো সৃষ্টি হয়েছে তোমার। তুমি যদি তাকে ভালো নাই বাসো।

আরিয়ানঃ- আমি ইলাকে ভালোবাসি না কিন্তু মেয়ে আমার মাথার ভেতর এমন করে জায়গা নিচ্ছে যে মনে হয় আমি সত্যিই তার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি।
ইলা নিচে নামছে হাতে নীল চুরি, নিল শাড়ি, চুলগুলো খোলা । সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে হঠাৎ চোখে পড়ল আরিয়ান। দুজনের চোখ মিলতেই এক মুহূর্তে সময় থেমে গেল। আরিয়ান সানগ্লাস খুলে ফেললো চোখে এক গভীর চাহনি ইলা চোখ নামিয়ে ফেলল। মুখে কোনো কথা নেই কিন্তু বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন চারপাশে বাজছে। ঠিক তখনই নোহা দৌড়ে এসে ইলাকে সাইডে ডেকে নিয়ে গেলো।
নোহাঃ- ইলা আপু ভাইয়া আজ সকালে নাকি খিচুড়ি খেতে বসে ভুলে খিচুড়িতে লবন নিয়ে নিয়েছে।
ইলা হাসি চেপে বলল,

ইলাঃ- আচ্ছা তাই নাকি?
নোহাঃ- হ্যাঁ আর তারপর যখন বুঝতে পেরেছে তখন রেগে গিয়ে বলেছে যদি আজ কেউ চা না দেয় তাহলে নাকি ভাইয়া সারাদিন ডায়েট করবে।
ইলাঃ- ও আচ্ছা তাহলে ভাইয়ার জন্য চা পাঠাতে হবে মনে হয়।
নোহাঃ- তাহলে তুমি বানিয়ে দাও না ইলা আপু আমি ভাইয়াকে বলবো এটা স্পেশাল চা জানোতো আমি খুব করে চাই তোমার মত একটা কিউট ভাবি যেনো আমার হয়।
ইলা নোহার কথা শুনে লজ্জা পায় “পাগলি একটা” বলে নোহার মাথায় হালকা চাটি মেরে বলল
ইলাঃ- আচ্ছা ঠিক আছে চা বানিয়ে দিবো একটা শর্তে ঐ রা….. তোমার ভাইয়া যেনো না জানে চা টা আমি বানিয়েছি।

নোহাঃ- অকে ডিল ডান।
ইলা রান্নাঘরে গিয়ে চা বানালো তার পরে চা নিয়ে নোহা আরিয়ান কে দিলো। আরিয়ান চা তে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো আরিয়ানকে চোখ বন্ধ করতে দেখে নোহা জিগ্যেস করলো
নোহাঃ- কি রে ভাইয়া চা কি ভালো হয়নি?
আরিয়ানঃ- চা টা অসাধারণ হয়েছে কে বানিয়েছে রে?
নোহাঃ- সেটা বলা যাবে না তবে এমন চা রোজ খেতে চাইলে বিয়ে করে নে।
আরিয়ানঃ- আমাকে মেয়ের বাবা মা রা মেয়ে দিবে না।
নোহাঃ- কেন দিবে না তুই এত ভালো একটা জ…….
আরিয়ানঃ- চুপ কোনো কথা বলবি না
নোহা আর কোনো কথা না বলে চায়ের কাপটা নিয়ে চলে গেলো। সারা বাড়ি জুড়ে উৎসবের সাজ পরি, আদিব, হালিমা, রায়েদ,ইলা সবাই ব্যস্ত। নোহা আর নেহা তখনও ইলার পাশে বসে গল্প করছে,
নেহাঃ- জানো আপু ভাইয়া একবার প্রেমে পড়ে ছিল।

ইলাঃ- কি প্রেমে?
নোহাঃ- হুম কিন্তু সেই মেয়ে ওকে ধোঁকা দেয়। তখন থেকে ভাইয়া কাউকে বিশ্বাস করে না।
ইলাঃ- মেয়েটা ধোকা কেনো দিলো?
নেহাঃ- আমি তো এত কিছু জানি না আপু। মেয়েটা কে সেটাও কোনো দিন প্রকাশ করেনি।
ইলা চুপচাপ হয়ে গেল বুকের ভেতর হালকা ব্যথা লাগলো ঠিক তখনই পেছন থেকে গভীর গলায় আওয়াজ
আরিয়ানঃ- নোহা-নেহা তোরা এখানেই বসে কি গল্প করছিস তোদেরকে আম্মু খুজে বেরাচ্ছে যা নিচে যা।
নেহাঃ- জি ভাইয়া যাচ্ছি।
বলে পালিয়ে গেল ইলা ধীরে ঘুরে তাকালো। আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, কালো শার্টের হাত গুটানো, ভেজা চুল কপালে পড়ে আছে দুজনের মাঝে নিঃশব্দ বাতাস কেউ কিছু বলে না। শুধু চোখে চোখে হাজার কথা আরিয়ান ধীরে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,

আরিয়ানঃ- গত রাতে কি ভয় পেয়েছিলেন?
ইলা চুপ করে আছে শুধু চোখে এক ঝলক আতঙ্ক আরিয়ান আবার বলল,
আরিয়ানঃ- আমি শুধু বুঝতে চাই আপনি আমাকে কেনো এত কাছে টানেন কি আছে আপনার মাঝে।
ইলাঃ- সেটা আমি কি করে বলবো আমি ছোট মানুষ এত কিছু বুঝি না।
আরিয়ান হাসল ঠোঁটে সেই আগের মতো এক মৃদু রুক্ষ হাসি
আরিয়ানঃ- অকে তাহলে এবার থেকে আমি বুঝিয়ে দিবো কিন্তু আপনি পালাতে পারবেন না।
ইলার বুক কেঁপে উঠলো কিছু না বলে চলে গেল নিচে আরিয়ান তাকিয়ে রইলো ওর চলে যাওয়া পিঠের দিকে আকাশে তখন হালকা মেঘ বাতাসে সুবাস অপরাধবোধের সঙ্গে মিশে থাকা অজানা টান। দূর থেকে পরি আর আদিব হাসতে হাসতে এসে দাঁড়ালো।

পরিঃ- এই বাড়িতে এখন প্রেমের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সবাই এই রোগে আক্রান্ত।
আদিবঃ- বিশেষ করে ছাদে দাঁড়ানো এই মানুষটা।
আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি তো শুধু পর্যবেক্ষণ করি কিন্তু হয়তো এখন আমাকেই কেউ পর্যবেক্ষণ করছে।
Time skip….
দুপুরের পরে তালুকদার বাড়িতে তখন যেন উৎসবের হাওয়া। বাড়ি জুরে খিলখিল হাসির শব্দ এই সময়েই আদিবের কয়েকজন কাজিন আসে (রিমা আপু)আদিবের বড় ফুপির মেয়ে সবসময় ক্যামেরা হাতে ভ্লগার হওয়ার স্বপ্ন। (সায়েম) ছোটখাটো চশমাওয়ালা কিন্তু কথায় তেজি সবকিছুর ওপর কমেন্ট করতে ভালোবাসে। (নেহা) ক্লাস নাইন পড়ে কিন্তু নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবে। আর আছে (রাফি) আর (সামিন) দুজনেই আদিবের ফ্রেন্ডলি কাজিন সবসময় একসাথে ঘোরে।

ওরা সবাই তালুকদার বাড়িতে ঢুকেই হাসি-ঠাট্টায় শুরু করে দেয়।
রিমাঃ- এই বাড়িটায় ঢুকলেই মনটা শান্ত হয়ে গেলো কত কত ফুল আমার ভিডিও কন্টেন্ট পেয়ে গেছি।
নেহাঃ- হ্যাঁ সব কিছুই সুন্দর কিন্তু আমি এদের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার কারণে আরো বেশি সুন্দর হয়ে গেছে।
সায়েমঃ- তাই নাকি তাহলে আমি একটু হেটে যাই দেখি কত সুন্দর স্মেল আসে।
রাফিঃ- তুই হেটে গেলে বাগানে এখন শুধু বজ্রপাত হবে ভাই
(সবাই হেসে ওঠে)

ওদের হাসির ফাঁকে আরিয়ান চুপচাপ বসে আছে সোফার পাশে। কিন্তু মাঝে মাঝে হাসিটা চেপে রাখতে পারে না। ইলা পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো দেখল আরিয়ান চুপচাপ মুখে সামান্য হাসি নিয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইলার মনে হচ্ছিলো এই মানুষটা যতই সিরিয়াস হোক মুচকি হাসিটা ভয়ানক সুন্দর তার।
বিকেল বেলা মেহেদী প্রোগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই আকাশে হালকা সোনালি আলো, পুরো তালুকদার বাড়ি জুড়ে বাতি ঝুলানো চারপাশে ফুলের সাজ। মেয়েরা মেহেদী প্রোগ্রামের জন্য ব্যস্ত ছেলেরা সবাই একসাথে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আজ ছেলেরা সবাই মিন্ট-গ্রিন রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে সাথে সাদা পায়জামা আর বাদামি নাগরা জুতো।একদম রুচিশীল শান্ত একটা লুক।

রায়েদ সামনে আয়নায় চুল ঠিক করছে স্লিভ গুটিয়ে নিচ্ছে চেহারায় একটা আত্মবিশ্বাসী মিষ্টি হাসি। তার পাশে দাঁড়িয়ে আরিয়ান চুল পেছনে স্টাইল করছে পাঞ্জাবির গলায় হালকা সোনালি বোতাম উপরের দুটো খুলা সাথে হাতঘড়ির পড়া অন্য হাতে একটা কালো বেসলেট পড়া। আরিয়ান এর চোখে সেই চেনা গাম্ভীর্য কিন্তু মৃদু হাসিতে লুকিয়ে আছে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ।
দূর থেকে রিমা আরিয়ানের এই রুপ দেখে অবাক এত সুন্দর ছেলে কোথায় ছিলো এত দিন। রিমা নেহাকে জিগ্যেস করলো।

রিমাঃ- ও মাই গড ওই পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা কে?
নেহাঃ- আরে ওটাই তো আরিয়ান ভাই আদিব ভাইয়ার মামার ছেলে উনি নাকি আর্মিতে জব করেন।
সায়েমঃ- হুম তাই তো বলি ছেলে এত ফিট আর হ্যান্ডসাম কেনো। দেখেই বোঝা যায় ড্যাঞ্জার জোনে আছে ছেলেটা।
আদিবঃ- এটা নিয়ে তদের যেনো কোনো কথা বলতে না শুনি আরিয়ান ব্রো একটা সিকরেট মিশনে আছে।
নেহাঃ- না মানে ভাইয়া…. আমি তো
আদিবঃ- একদম স্টোপ হয়ে যা আর ভুলেও এটা মুখ ফুটে উচ্চারণ করবি না তোরা আরিয়ান এর প্রফেশন সম্পর্কে জানিস।

অন্য দিকে বাড়ির মেয়েরা পরি, তানহা, রাফিকা, হালিমা, ইলা, তাবাসুম, নেহা, রিমা সবাই মেহেদীর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে হালকা সোনালি আলো মিশে আছে বাতাসে।
আজ মেয়েরা সবাই হালকা গ্রীন ও সোনালি কাজের লেহেঙ্গা পড়েছে একই ডিজাইন ঝিকমিকে। চারপাশে সুবাস চুলের, ফুলের আর পারফিউম এর রুমের কোণে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইলা চুপচাপ নিজের লেহেঙ্গা ঠিক করছিলো। ওর সাজ অন্যদের মতো ভারী না চোখে হালকা আইলাইনার একটু মাসকারা, ঠোঁটে নিউড লিপস্টিক, আর কপালে ছোট্ট কালো টিপ। চুল খোলা সামনের চুল গুলো রিবন্ড করা মুখে নেমে এসেছে তাই যেনো ইলাকে অপরূপ সরল সুন্দর লাগাচ্ছে।

ইলা যখন আয়নায় পুরো নিজের দিকে তাকালো হঠাৎ একটু থমকে গেলো। নিজের এই লুক দেখে নিজের হেসে দিলো নিজের মনে বলছে ” আচ্ছা আমি সত্যি এত সুন্দর??
হালিমাঃ- না তুই সুন্দর তুই তো দেখতে সাদা কাকের মত, আর সাদা কাক কি সুন্দর হয় নাকি।
ইলা সাজ শেষ করে যখন লেহেঙ্গাটা পড়লো তখন দেখে চোলি অনেক টাইট। ইলার হাসফাস লাগছে ইলার এই অবস্থা দেখে হালিমা হাসতে হাসতে বলল।
হালিমাঃ- ওরে বাবা তোর তো এই ড্রেস পড়ে হাঁটাও মুশকিল এক কাজ কর চেঞ্জ করে অন্যটা পরে নে।
ইলাঃ- না রে সবাই সেম ড্রেস পড়ছে আমি কেনো আলাদা হবো একটু কষ্ট হলে তাতেই বা কি।
হালিমাঃ- মেয়েটা যত জেদি ততই বেশি কিউট।
ইলার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে অন্যদিকে রাফিকা আয়নার সামনে বসে আছে সামনে সাজের সরঞ্জাম। চোখে গাঢ় স্মোকি আইশ্যাডো, ঠোঁটে উজ্জ্বল লাল লিপস্টিক, কানে ভারী ঝুমকা। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে “আজ তুমি আমার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারবে না, মিস্টার আরিয়ান খান” তার কণ্ঠে হালকা আত্মবিশ্বাস আর হিংস্র রোমান্সের মিশ্রণ।

সবাই নিচে নামতে শুরু করলে রাফিকা ফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে। সামনে আরিয়ান তখন ফোনে কথা বলছে সাদা পায়জামা আর মিন্ট-গ্রিন পাঞ্জাবিতে দাঁড়িয়ে আছে। চুলে হালকা ভেজা ভাব জেল দেয়ার কারণে গলায় সামান্য ঘাম জমে চিকচিক করছে আর আরিয়ানের সেই মন মাতাল করা পারফিউম এর ঘ্রাণ যেন পুরো তালুকদার বাড়ির আলো কেড়ে নিয়েছে। রাফিকা এগিয়ে গিয়ে মিষ্টি করে বলে
রাফিকাঃ- হাই আরিয়ান ভাইয়া আপনাকে আজ একদম ড্যাশিং লাগছেন।
আরিয়ান চোখ না তুলে ফোনে কথা শেষ করে রাফিকা কে বলল
আরিয়ানঃ- হুম ধন্যবাদ।
রাফিকাঃ- আচ্ছা আজ রাতে মেহেদীতে একটা ডান্স পারফর্ম করবো আপনি অবশ্যই থাকবেন প্লিজ।
আরিয়ানঃ- আমি এখানে এসেছি বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে নাটক দেখতে না।
রাফিকাঃ- মানে?

আরিয়ানঃ- মানে আপনি যা করছেন এখন এইটাকেই তো নাটক বলে মিস রাফিকা।
রাফিকার মুখের হাসি মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় সে দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে। আরিয়ান ফোনটা পকেটে রাখে হালকা নিঃশ্বাস নেয় চোখ ফেরায় চারপাশে আর তখনই ওর চোখ পড়ে ইলার দিকে। সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে ইলা হালকা গ্রীন ও সোনালি কাজের লেহেঙ্গা ইলার গায়ের গঠনটাকে এমনভাবে তুলে ধরছে যে চোখ সরানো দায়। হালকা বাতাসে চুলের গুলো উড়ে এসে গালে লেগে যাচ্ছে পায়ের পায়েল ঝনঝন শব্দ করছে চোখের কোণে টলটলানো কাজল।
আরিয়ান একদম স্থির হয়ে যায় তার চারপাশের আওয়াজ মিলিয়ে যায় শুধু ইলার পায়ের শব্দ আর মুখের হালকা হাসিটা শুনতে পাচ্ছিলো। আরিয়ান মনে মনে বলে উঠলো,
আরিয়ানঃ- এই মেয়েটা আজ সত্যিই আমার শান্তি কেড়ে নেবে।
হালিমা নিচে নিমেই আরিয়ানের দিকে লক্ষ করলো হালিমা বুঝতে পারলো আরিয়ান ইলার দিকে তাকিয়ে আছে তাই ইলার পাশে গিয়ে হালিমা বলল,

হালিমাঃ- দেখ না আরিয়ান ভাই কেমন করে তাকিয়ে আছে তোর দিকে।
ইলার হালিমার কথা শুনে মনে মনে কেমন জানি লাগলো এক ঝলক আরিয়ানের দিকে তাকাল কিন্তু দেখলো সে ফোনে ব্যস্ত ভ্রু কুঁচকে ঠোঁটে একরকম রাগী মনোযোগ। ইলার চোখের ভেতর হালকা একটা বিরক্তির ঝিলিক খেলে গেল ঠিক তখনই ‘ঠাস’ হালিমার হাতে হালকা একটা চাটি পড়লো।
হালিমাঃ- এই কেন মারলি
ইলাঃ- কারণ তুই বেশি কথা বলিস।

দুজনের এই টুকরো কথোপকথনে আশেপাশের মেয়েরা হেসে উঠলো ঠিক তখনই পেছনের দিক থেকে শোনা গেল “এই দেখো পরি এসেছে” সব চোখ ঘুরে গেল দরজার দিকে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে পরি লালচে কমলা শাড়ি পড়ে শাড়ির বর্ডারে সোনালি কাজ, কানে বড় ঝুমকা, গলায় হালকা গোল্ড সেট, মুখে মিষ্টি হাসি। চুলটা একপাশে স্টাইল করে বাধা চোখে হালকা কজল, ঠোঁটে লিপস্টিক সব মিলিয়ে যেন সন্ধ্যার আলোয় ঝলমল এক রাজকন্যা।
আদিব দূর থেকে তাকিয়ে ছিলো পরির দিকে চোখ পড়তেই তার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো।শব্দ না করে ঠোঁটের কোণে একরকম হাসি ফুটে উঠলো “আজ বুঝি আমি আমার বউ এর প্রেমে পড়ে গেলাম নতুন করে”
আদিব পরির দিকে হেটে এগিয়ে আসলো আজ আদিব পড়েছে গাঢ় সাদা পাঞ্জাবি এর কলারে হালকা সোনালি এমব্রয়ডারি,সাথে ম্যাচিং লাল দোপাট্টা গোলায় পেচানো। পরির শাড়ির সঙ্গে যেন দুজনের রঙ একেবারে কাপল ম্যাচ দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়ানো দেখে মনে হচ্ছিলো যেন তারা একে অপরের অর্ধেক।
মেহেদির আর্টিস্টরা এসে বসেছে টেবিল সাজানো মেহেদী সাথে হালকা সুর বাজছে পেছনে “মেহেদি হ্যায় মেহেদি …”

আর্টিস্টদের একজন আদিব কে বলল,
” ভাইয়া আগে আপনি একটু শুরু করে দেন কনের হাতে এক ফোঁটা মেহেদি লাগিয়ে।
আদিবঃ- আপনারা শুরু করুন আমি শেষ এ নাম লিখে শেষ করবো আমি আমার বউয়ের শুরুতে না শেষ এ থাকতে চাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
এক মুহূর্তে চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো তারপর সবাই হাততালি দিলো “ওওওওও” পরির গাল লাল হয়ে গেলো, চোখ নামিয়ে হাসলো আর আদিবের দৃষ্টিতে যেন এক অব্যক্ত প্রতিজ্ঞা। ইলা পাশে বসে হালিমার কানে ফিসফিস করে বললো,

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২২

ইলাঃ- এই আদিব ভাইয়ের মতো যদি কেউ আমারে ভালোবাসতো না।
হালিমা হাসি চাপতে না পেরে বললো,
হালিমাঃ- তাহলে আদিব ভাইয়ের রাক্ষস ভাইকে তুই তোর রাজকুমার বানিয়ে নে।
ইলার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো আর দূর থেকে আরিয়ান ঠিক সেই হাসিটাই লক্ষ্য করছিলো চোখে অদ্ভুত এক মিশ্র আবেগ রাগ আর টান দুটোই।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৪