Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭ (২)

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭ (২)

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭ (২)
ছায়া

ফ্ল্যাশব্যাক দুই দিন আগের রাতেরঃ
যখন শাওন,রাফায়েল,আর সামির তিনজনের সামনে ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে ছাদে চাঁদ দেখছিলো।রাফায়েল আর সামির দুজনেই একটা জিনিস লক্ষ্য করছিল কিছুক্ষণ ধরে। সেটা হচ্ছে শাওন ছুটি থেকে আসার পর থেকে কেমন যেনো হয়ে গেছে।তার উপর আবার বলছে কোনো এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে
রাফায়েলঃ- ওই শাওন কথা ঘুরাচ্ছিস কেন?তোর কি হইছে ভাই বল না আর কে সেই মেয়েটা?
সামিরঃ- হ্যাঁ, কে সেই রমনী যে আমার বন্ধুর এই পাথরের দেয়াল ভেদ করে ডুকে পড়েছে। কে সেই ভাগ্যবতী?
সামিরের কথায় রাফায়েল হেসে উঠল শাওন প্রেমে পড়েছে কারো জন্য ব্যাকুল হচ্ছে এটা ভেবেই তারা হাসছে। শাওন কোনো কথা বলল না শুধু কফির কাপটা টেবিলে চেপে ধরল।তার চোখে ঝলকে উঠল একটা স্মৃতি বিয়ের দিন দৌড়ে আসা একটা মেয়ে যে তাকে আবির মাখিয়ে আবার দৌরে চলে গেলো। রাফায়েল আর সাজিদ দেখে শাওন অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে এটা দেখে রাফায়েল শাওন কে ঝাকি দিলো শাওন নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
শাওনঃ- তোরা ছাড় না ঐসব কথা কাজের কথা বল।

রাফায়েলঃ- না আজকে না সত্যিটা বলল ছাড়ছি না ভাই। তোকে তিনবার জিজ্ঞেস করেছি এইবার যদি না বলিস আমি শপথ করে বলছি তোর মনে ডুকে ঐ মেয়েকে চুরি করে পালিয়ে যাবো।
সামির- আর আমি প্যারেড গ্রাউন্ডে বলবো শাওন গার্লফ্রেন্ডের জন্য রাতে কাঁদে।
দুজনের বোকাটে হাসিতে শাওন বিরক্ত, কিন্তু ভেতরে কোথাও নরম হয়ে গেল।সে জানত এই দুইজন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।যখন সে মারা যাওয়ার মুখো মুখি থাকবে ঠিক এরা দুজনই বলবে “ভাই চিন্তা করো না আমরা আছি অবশেষে শাওন ধীরে বলল
শাওনঃ- ঠিক আছে শোন তাহলে কিন্তু কাউকে বলবি না।
রাফায়েল আর সামির এবার হুমড়ি খেয়ে এগিয়ে এল শাওনের দিকে।
রাফায়েলঃ- আমি আমার কান বাদে আর কাউকে বলবো না।
সামিরঃ- আমার আত্মাও জানবে না আই প্রমিজ।
শাওন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তার চোখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল ইলার প্রথম দিনটার স্মৃতি যখন ইলা শাওন কে ভুল রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিলো

শাওনের বিয়ের গল্প (ফ্ল্যাশব্যাকের ভেতর আরেক ফ্ল্যাশব্যাক):
সেই দিন দুপুরে আমি যখন আদিবের শশুর বাড়ি খুজে পাচ্ছিলাম না তখন আমি বাজারের মানুষের কাছে এড্রেস জেন নিচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় একটা ১৮-১৯ বছর বয়সি মেয়ে আমার সামনে আসে তাকে দেখে আমি প্রথমে কিছুটা অবাক হয়ে যাই। এই ডানা কাটা পরি আমার সামনে কিভাবে আসলো। তার পরে ঐ মেয়ে জিজ্ঞেস করে আমি কই যাবো। আমি এড্রেস বললে আমাকে নিজের বাইকে করে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছা করে ভুল রাস্তা দেখিয়ে দেয়।
সেদিনের পর আমার তার উপরে মেজাজ খারাপ ছিলো আমি সব সময় ইগনোর করেই চলতাম।কিন্তু তার রুপ তার দুষ্টুমি বার বার আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করতো।তাই আমি সারাক্ষণ ফোনে মনোযোগ দিতাম যাতে ঐ মেয়ের প্রতি আমার নজর না যায়।তো বিয়ের দিন সকালে সবাই আবির খেলছিলো ঐ মেয়ে ও আমাকে আবির দিয়ে দৌরে পালাচ্ছিলো তো আমি একটু দুষ্টুমি করে তার পিছু পিছু ছাদে দিয়ে তাকে আবির দিয়ে আসি।
আর এইটা আমার জীবনের কাল হয়ে যায়। কোনো এক বান্দীর পোলা না মাইয়া সেটা ছবি তুলে ai দিয়ে kissing ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করে দেয়।

আমি তো বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে ঘুমিয়ে যাই তো পরের দিন সকালে চিল্লাচিল্লি তে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠে শুনি আমার আর ঐ মেয়ের ভিডিও নাকি কোন ভাইরাল হয়েছে।
নিচে গিয়ে দেখি মেয়েটাকে তার মা খুব মারছে। কিন্তু তবুও ঐ মেয়ে আমার নাম বলেনি যে ভিডিওতে ছেলেটি আমি ছিলাম। আমি সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করতে গেলাম।
মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে ভয়ে কাঁপছে কান্না করছে চুল মুখে লেপ্টে গেছে চোখে আতঙ্ক। আমি তার বাড়ির লোকদের বললম এটা এডিট করা ভিডিও কিন্তু কেউ বিশ্বাস করলো না।
উল্টো আমাদের দুইজন কে কট দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলো বল এটা কি মেনে নেয়ার মত। আর আমি আমার আব্বুর বাধ্য ছেলের মত বিয়ে করে নিলাম যেহেতু আব্বু কথা দিয়ে ফেলেছিলো।

( বাকিটা কি হয়েছে তোমরা জানো বুঝে নিও ভাই)
আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল কিন্তু এই সত্যটা কেউ বিশ্বাস করলো না।
রাফায়েল দুই হাত মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল
রাফায়েলঃ- মানে এভাবে রিয়েলি ভাই চলচ্চিত্রের থেকেও বেশি ফিল্মি ভাবে তো বিয়েটা হয়েছে।
সামিরঃ- ওরে বাবা তুই তো আসলেই নাটক নিয়ে হাঁটিস তুই কট খেয়ে বিয়ে করে নিলি ভাই। আবার ঐ মেয়ের প্রেমেও পরে গেলি। কিন্তু ভাই শুন না মেয়েটা কেমন বল না সুন্দর নাকি শুধু কিউট?
রাফায়েলঃ- হ্যাঁ, হ্যাঁ আমরা না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারব না তোর ডানা কাটা পরি কেমন দেখতে তাই ছবি দে শাওন দে দে দে।

শাওন মুখ ঘুরিয়ে নিল সে ইলার ছবি কাউকে দেখাতে চায় না…কাউকে না। কিন্তু এদের দুজনের মুখের একগাদা প্রশ্ন একগাদা চাপ আর না দেখালে মাথা খেয়ে শেষ করবে। সবকিছু মিলিয়ে ভেবে শাওন বিরক্ত হয়ে বলল
শাওনঃ- তোরা শান্ত হবি না তাই তো ঠিক আছে।
শাওন আস্তে করে ফোন খুলল গ্যালারিতে গেল।একটা ছবি বের করলো তার আর ইলার বিয়ের ছবি।রাফায়েল আর সামির দুজন একসাথে চিৎকার করল
রাফায়েলঃ- হায় আল্লাহ্‌ এত সুন্দর??
সামিরঃ- তুই তো রীতিমতো রাজকন্যাকে বিয়ে করে ফেলেছিস ভাই।
তিনজনের সামনে রাখা কফির কাপগুলোতে ধোঁয়া উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এখন এদের কারো মনেই কফি নেই।রাফায়েল আর সামিরের চোখ শুধু আটকে আছে শাওনের হাতে ধরা ফোনটার স্ক্রিনে সেই ছবি শাওন আর ইলার বিয়ের ছবি।

রাফায়েলের মুখটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল হাসি উধাও… চোখে একটা অবাক, হতবাক, অচেনা ঝড়। সামির তো এখনো “রাজকন্যা.. রাজকন্যা” করে যাচ্ছে, কিন্তু রাফায়েল আর একদম যান্ত্রিক হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
রাফায়েলঃ- শাওন তোর বউ এর নামটা কি ইলা তালুকদার??
শাওন- হুম ইলা তালুকদার কিন্তু তুই কিভাবে জানলি।
রাফায়েল দুহাতে মাথা চুলকে উঠে দাঁড়ালো তারপর এমন নিশ্বাস ফেলল যেন বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো ধুলো হঠাৎ উড়ে বেরিয়ে এলো।
রাফায়েলঃ- মানে এই মেয়েটা এই ইলা তালুকদার এইটাই??
সামির থমকে গেল শাওন চোখে অবাক ভাব তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল
শাওন- তুই কি আগে থেকেই চিনিস নাকি ওকে?
রাফায়েল গভীর নিঃশ্বাস নিল ঠোঁট কামড়ে চেয়ে রইল চাঁদের দিকে।তারপর খুব আস্তে খুব ভারী গলায় বলল
রাফায়েলঃ- এই সেই মেয়ে যাকে প্রথম দেখেয় আমি বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেছিলাম কিন্তু সে আমাকে রিজেক্ট করেছিলো।

সামির প্রায় লাফিয়ে উঠল
সামির- হাঁআআ??? কি বলিস
শাওনের বুক ধুপ করে উঠল কানের কাছে যেন রক্ত জমে বাজছে।এক মুহূর্তে তার মন অদ্ভুত ভারী হয়ে গেল। যাকে সে এখন বুকের ভেতর আগলে রাখে চায় যে মেয়েটার হাসিতে সে বেঁচে থাকতে চায় যে তার বউ তার ইলাফুল আর্কিন রাফায়েল এর বউ হতে চেয়েছিলো।
তার পরে ধীরে ধীরে রাফায়েল আবার বলতে শুরু করলো, রাফায়েলের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল
“এক বছর আগের কথা ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পরে আন্টি আমাকে ডেকে বলেছিলো এক মেয়ে আছে, ইলা তালুকদার চাইলে দেখতে যেতে পারি। তার বান্ধবীর মেয়ে ভাল ফ্যামিলি, ভাল মেয়ে তাই বলেছিলাম যাবো। আব্বু আম্মুর সাথে তাদের বাড়ি গেছিলাম দেখতে।

রাফায়েল হেসে উঠল সেই হাসিটা ব্যথায় কাঁপছিলো।“যেদিন ওকে দেখতে গিয়েছিলাম ওকে আমি দেখার সাথে সাথেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বিয়ে করলে এই মেয়েকেই করবো। তার পরে আলাদা কথা বলতে চাইলাম সেখানে ও এমন এমন কথা বলল যে না হেসে থাকতে পারিনি। ও ভেবেছিলো এই কথা গুলো বললে হয়তো আমি অকে বিয়ে করবো না কিন্তু অকে অবাক করে দিয়ে আমি বলেছিলাম আমি বিয়েতে রাজি। সব ঠিক আছিলো কিন্তু তার বাবা সময় চেয়ে নিলো। আমরা সময় দিলাম কিন্তু আমি পরের দিন তার সাথে দেখা করি সে বলে সে আমাকে বিয়ে করতে পারবে না আমাকে সামনাসামনি ‘না’ বলে দেয়।
কোনো ঘুরানো কথা ছাড়াই কেউ না বলতে পারে এটা তো আমার কাছে নতুন কিছু না। কিন্তু… ওর না টা ছিলো অন্যরকম।সামির আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এলো

সামিরঃ- কি বলেছিলো?
রাফায়েল হালকা কাঁপা স্বরে বলল
রাফায়েলঃ- ও বলেছিলো আমি বিয়ে করবো না। কারণ আমি কাউকে ভালোবাসি আমার ভয়েজ কিংকে না দেখলে, না জেনে, না বুঝে আমি তাকে ভালোবেসেছি আমার এই মনে অন্য কাউকে মেনে নিতে পারবো না।
শাওনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল ভয়েজ কিং?নামটা তো চেনা চেনা লাগে।
রাফায়েলঃ- টিকটকে কারো একজনের ভিডিও দেখতো সেও নাকি আর্মি ছিলো কিন্তু নামটা বলেনি।বাট শালায় ভাগ্যবান ইলার মত একজনের ভালোবাসা পেয়েছে।
ঐ দিন আমার চোখ লাল হয়ে গেছিলো প্রচণ্ড কেঁদেছছিলাম।আমি তখনই বুঝেছিলাম কাউকে ভালোবেসে না পেলে কেমন লাগে। ও আমাকে রিজেক্ট করেনি কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে।আর তার ভালোবাসাটা ছিলো পবিত্র।
দুইদিন পর জানতে পারলাম ও নাকি বিয়েটা ভেঙেছে বলে ওর মা নাকি ওকে খুব মেরেছিলো।ও খুব কষ্টে ছিলো তার ভয়েজ কিং এর জন্য কিন্তু ঐ ছেলে সেটা কখনো বুঝেনি।
সামির ফিসফিস করে বলল
সামিরঃ- মানে…ইলা বিয়েটা করেনি বলে ওর মা অকে মেরেছিলো।
রাফায়েল মাথা নেড়ে বলল “হ্যাঁ
শাওনঃ- আরে কিছু হলেই ওর মা অকে মারে, আমিও মেয়েটাকে না যে অনেক কষ্ট দিয়েছিরে আমিও অনেক মেরেছি।

শাওনের নিশ্বাস আটকে গেল তার সামনে ভেসে উঠল সেই দিনের ইলা লাল চোখ, ভয়ে কাঁপছে,মায়ের হাতে মার খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর শাওন দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে “এটা এডিট করা ভিডিও” কিন্তু কেউ শুনছিলো না।
রাফায়েলঃ- তখন থেকেই মনে হতো মেয়েটা খুব ভাঙা কিন্তু সাহসী। কিন্তু আমার একটা আফসোস মেয়েটা তার ভয়েজ কিং কে পেলো না।
শাওনের বুকটা ধক করে উঠলো, ইলা এই সেই ইলা যে তার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করতো কিন্তু সে পাত্তা দিতো না। মেয়েটা এতটা তার জন্য পাগল ছিলো আর শাওন জানতেও পারেনি।
শাওনঃ- তোকে আর আফসোস করতে হবে না।
রাফায়েলঃ- হ্যাঁ আর আফসোস করে কি হবে সব তো শেষ হয়ে গেছে।
শাওনঃ- কিছু শেষ হয়নি আজ থেকে শুরু হলো
রাফায়েলঃ- মানে কি?

শাওনঃ- মানে হচ্ছে ঐ ভয়েজ কিং আর কেউ নয় আমি ছিলাম। আর সে যাকে চেয়েছিলো তাকেই পেয়েছে।
রাফায়েল ধীরে বসে পড়ল শাওনের পাশে তার গলা ভারী কিন্তু এবার ব্যথা নেই এবার আছে হালকা একটা হাসি।
শাওনঃ- ভাই তুই সত্যি বলছিস তুই সেই ভয়েজ কিং।
সামির এবার জোরে হেসে উঠল
সামিরঃ- এটা কি ভাগ্য রে ভাই তোর জন্য ঠিক ছিলো ঐ মেয়ে যাকে সত্যি ভালোবাসলো যাকে বিয়ে করতে চাইলো সে তুই।
শাওন মাথা নিচু করে ফেলল কণ্ঠ নরম হয়ে গেল
শাওনঃ- আজ থেকে ও আমার সব ভাই আমার জন্য আর কষ্ট পেতে হবে না তোমাকে “লিটিলহার্ট”
শাওনঃ- ভাই তুই কথা দে মেয়েটাকে আর কষ্ট দিবি না।
শাওন লজ্জায় মাথা ঘুরিয়ে বলল
শাওন- ভাই আমি এই ১ বছর অকে অনেক খুজেছি।কিন্তু কোথাও পাইনি আমাকে কেউ মেসেজ দিলেই আমি আগে নাম জিগ্যেস করতাম আর বাসা কোথায় সেটা জিগ্যেস করতাম এই আশায় যে ইলা মেসেজ দিবে কিন্তু ও আর ফিরে আসেনি।

রাফায়েলঃ- তাহলে ইলা যে তোর সামনে এত ঘুরাঘুরি করলো তোর কি মনে হয়নি এটাই সেই মেয়ে?
শাওনঃ- অনেক বার মনে হয়েছে কিন্তু এই ইলা আর ঐ ইলা অনেক পার্থক্য ঐ ইলা সব সময় দুষ্টুমি করতো আর এই ইলা সব সময় চুপচাপ থাকে। আর বড় কথা ইলা বলেছিলো তার বাড়ি বগুড়াতে আর এই ইলার বাড়ি তো দিনাজপুর এ তাহলে কিভাবে বুঝবো এটাই সেই ইলা।
রাফায়েল আর সামির দুজনেই চিৎকার করে উঠল “ইয়ে” তার মানে তুই আরো এক বছর আগেই প্রেমে পড়েছিস তোর ইলাফুলের তাদের হাসি ছাদজুড়ে ছড়িয়ে গেল।কিন্তু সেই হাসির ভিতরে আরও একটা সত্য খুব নিঃশব্দে জন্ম নিল
শাওন প্রথমবার বুঝল ইলা শুধু একাই তাকে ভালোবেসে গেছে।এবার তার পালা ইলার সব কষ্ট দূর করে দেয়া।
আর রাফায়েল প্রথমবার মুক্ত হলো সেই পুরোনো শূন্যতা থেকে।এখন সে ও অনেক খুশি ইলা তো তার ভয়েজ কিং কে পেয়েছে।

ইলার অতীত আর বর্তমান দুই জায়গাতেই তার হৃদয়ের রাখা পুরুষ এখন তার স্বামী মেজর আরিয়ান খান শাওন।আর আকাশের দিকে তাকিয়ে শাওন মনে মনে বলল
শাওনঃ লিটিলহার্ট তুমি জানো না তোমার জন্য নতুন গল্প অপেক্ষা করে আছে।
আকাশে চাঁদ ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাচ্ছে,ঠিক যেমন শাওনের বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে হাজারটা ঝড়, জ্বালা, অপরাধবোধ, প্রেম সব মিলিয়ে একটা বিস্ফোরণ। রাফায়েল কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল তার মুখে আর আগের মতো হাসি নেই।
সে শাওনের দিকে হালকা ঝুঁকে আবার বলল
রাফায়েলঃ- শাওন তাহলে কিছু কথা পরিষ্কার করি।তুই বলছিস তুই-ই সেই ভয়েজ কিং যাকে ইলা ভালোবাসছিলো?যে মানুষটাকে না দেখেও বিয়ে করতে চেয়েছিলো?
শাওন মাথা নিচু করে শুধু একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল।তা-ই উত্তর সামির তো প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল উত্তেজনায়
সামিরঃ- ভাই…ভাই…আমার মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।মানে তোর বউ তোর প্রেমে পড়েছিলো আবার তুই তার প্রেমে পরেছিলি,দুজন একে অন্যকে খুঁজছিস কিন্তু জানিস না কে কে এটা সিনেমাকেও হার মানায়।হায় খোদা…এতো লাকি মানুষও পৃথিবীতে আছে নাকি।

রাফায়েল এবার আস্তে করে শাওনের কাঁধে হাত রাখল।তার গলা আগের মতো শক্ত নয় বরং খুব নরম ভাইয়ের মতো, বন্ধুর মতো, মানুষের মতো।
রাফায়েলঃ- দেখ আমি আজকে খুব খুশি আমি খুশি যে ইলার ভালোবাসা ভুল মানুষের কাছে যায়নি।কিন্তু…(সে থেমে শাওনের মুখের দিকে তাকাল)তুই কি ওকে সত্যিটা বলবি না? ও সারাজীবন ভয়েজ কিং কে খুঁজছিলো।যে মানুষটাকে মনে করে বাঁচতে শিখছিল তুই যদি এখনই বলিস ও তো আনন্দে কান্না করে দিবে মনে হয়।
শাওন চোখ বন্ধ করে ফেলল ভেতরে একটা আগুন,আবার একটা গভীর স্নেহ দুটোই লড়ছে সে ধীরে ধীরে বলল “না”
এই একটা শব্দ শুনে রাফায়েল আর সামির দুজনেই চমকে উঠল।
রাফায়েলঃ- না মানে কি? তুই বলবি না এটা কেন শাওন?
শাওন আকাশের দিকে তাকাল মেঘের আড়ালে চাঁদ।চোখে হালকা জল চিকচিক করল কিন্তু সে আড়াল করল তাড়াতাড়ি।

শাওন- আমি ওকে পেতে চাই ওর হৃদয়কে পেতে চাই আমার জন্য আরিয়ান খান হিসেবে ভয়েজ কিং শাওন হিসেবে নয়।
রাফায়েল হতবাক সামির তো হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
সামিরঃ- মানে কি ভাই এইটা আবার কেমন কথা।
শাওনঃ- ও আমাকে ভয়েজ কিং ভেবে ভালোবেসেছিলো। যাকে ও কখনো দেখেনি কখনো ছুঁয়েও দেখে নি কিন্তু তাও বিয়ে করতে চাইছিলো।
কথা বলতে বলতে তার চোখে যেন সেই পুরনো মুহূর্তগুলো জেগে উঠল ইলার ছোট মুখ আবির মাখা হাত মায়ের মারে ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া শরীর অবুঝ শিশুর মতো কান্না…
শাওন- কিন্তু আজকের ইলা আমাকে চেনে
আমার রাগ দেখে আমার খারাপ ব্যবহার দেখে
আমার ঠান্ডা আচরণ দেখে তারপরও ইলা যদি আমাকে ভালোবাসতে শিখে তাহলে সেটা হবে আমার জয়। আমার নামের জয় আমার ভালোবাসার জয়।
রাফায়েলঃ- কিন্তু ভাই ও তো সারাজীবন ভয়েজ কিং কে খুঁজছে।তুই যদি না বলিস ও কি কখনো জানবে সত্যিটা তুই আসলে সেই ভয়েজ কিং।

শাওন উদাস হেসে বলল
শাওনঃ- একদিন জানবে হয়তো আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়…হয়তো আমাকে বকা দিতে দিতে…হয়তো আমার সন্তানকে কোলে নিয়ে…হয়তো কোনো ঝগড়ার রাতে কাঁদতে কাঁদতে…কিন্তু আজ না এখন এই মূহুর্তে না।
সামিরঃ- আচ্ছা এটা প্রেম নাকি নাটক?তুই নিজের বউ এর কাছেও রহস্য হয়ে থাকবি কিন্তু ভাই একটা কথা বলতে চাই
সামির হাসতে হাসতে বলল
সামির- তুই যদি চুপ থাকিস আর এই সত্যিটা যখন ভাবি নিজে থেকে জানবে তখন তো ভাবি আনন্দে তোকে মেরেই ফেলবে।
তিনজন একসাথে হেসে উঠল হাসির মাঝে শাওনের চোখ ভিজে যায় আবার।রাফায়েল আরো কাছে এসে বলল

রাফায়েলঃ- তুই যা করিস কিন্তু একটা প্রতিশ্রুতি দে আরকে কষ্ট দিবি না।
শাওন এবার এতটাই নরম হয়ে গেল যে তার গলা কেঁপে উঠল
শাওন- আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ইলার চোখে আর কখনো কষ্টের জল আসবে না। ও আর কখনো আমার জন্য কষ্ট পেয়ে কাঁদবে না।
ওর মা যত কষ্ট দিয়েছে আমি তার উল্টোটা দেবো।আমি তাকে সুখ দেবো আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি এবার তাকে হারাবো না।
হঠাৎ বাতাস একটু জোরে বইল চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তিন বন্ধু চুপ তারপর রাফায়েল ধীরে বলল
রাফায়েলঃ- ঠিক আছে তাহলে তুই সুন্দরভাবে শুরু কর ভালোবাসা দিয়ে নিজের মতো করে। তার পরে একদিন ওকে সত্যিটা বলবি কিন্তু যেদিন বলবি আমাকে থাকতে দিবি, আমি দেখতে চাই ওর চোখে সেই আনন্দ
শাওন- ঠিক আছে ভাই সেদিন তুই সামনে দাঁড়িয়ে থাকবি।যেদিন আমি বলবো “লিটিলহার্ট আমি তোমার ভয়েজ কিং”

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭ 

রাফায়েল হাত বাড়িয়ে দিল সাজিদও হাত রাখল।শাওন হাত রাখল তাদের উপরে তিনজনের বন্ধন আরও শক্ত হলো।চাঁদের আলো ছাদের রেলিংয়ে পড়ে ঝলমল করছিলো ঠিক শাওনের বুকের ভেতরের নতুন শুরুটার মতো।আজ থেকে সত্যিটা বুকের কাছে লুকিয়ে শুধু ভালোবাসা দিয়ে ইলাকে জয় করবে শাওন এটাই নতুন শুরু, নতুন প্রতিজ্ঞা,নতুন ভালবাসা।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৮