ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৯
ছায়া
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি।ঢাকার আর্মি হেডকোয়ার্টারের ভেতর টানটান উত্তেজনা এত বড় একটি ক্রিমিনাল কেস, আর তার ওপর ভিকটিম একজন আর্মি ক্যাডেট।
সিসিটিভি ফুটেজ,রোড ক্যামেরা, বাইকের GPS, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সত্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল।গাড়িটা লিয়ান চৌধুরীর আরিয়ানকে মারার উদ্দেশ্য পরিষ্কার।
অন্যদিকে,
ICU এর লোহার দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল ধাম শব্দে।ইলা এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ সরাল না দরজা থেকে মনে হচ্ছিলো তার হৃদপিণ্ডটাও ওই দরজার ওপাশেই বন্ধ হয়ে আছে।
সাজু খান তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।সেই কঠোর, সামরিক কঠিন মুখের মানুষটাও কয়েক সেকেন্ড নীরব।তার ভ্রু কুঁচকে গেছে, যেন নিজের মনেই কিছু হিসাব করছে
এই মেয়েটা কে?
কেন আরিয়ান এর জন্য এত ভেঙে পড়েছে?
কেন ICU-র কাছে দাঁড়িয়েও নিজের দুঃখ চেপে রাখতে পারছে না?হালিমা পেছন থেকে ধীরে বলল,
হালিমাঃ- ইলা তুই একটু বস দাঁড়িয়ে আছিস অনেকক্ষণ…
ইলার গলা ভাঙা, চোখ লাল, তবুও ভিতরে অদ্ভুত এক জেদ।সাজু খান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ইলার দিকে তাকাল।তার চোখের কঠোরতা একটু কমে গেল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল
সাজুঃ- আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন। আরিয়ানের ভিটালস আমি নিজেই চেক করব ডাক্তারদের সাথে কথা বলব।
এখন আপনার ভেঙে পড়লে কেউ লাভবান হবে না।ইলা মাথা নেড়ে নিচে তাকিয়ে বসে গেল হাত দুটি শক্ত করে জোড়া ঠোঁট কাঁপছে। হালিমা তার পাশে বসে পাতার মতো কাঁপতে থাকা হাতটা ধরে রাখল।
সময় তখন সকাল ৬:৩০ ভোরের সোনালি আলো জানালার ধারে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ সামরিক দৌড়াদৌড়ি দূরে করিডোরে আর্মিদের বুটের শব্দ।কয়েকজন র্যাঙ্কড অফিসার দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে।সাজু খান এগিয়ে গিয়ে বলল “আপডেট”
একজন আর্মি গম্ভীর গলায় বলল
“ স্যার একটা সাদা রঙের গাড়ি ট্র্যাক করেছি। CCTV ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।ইচ্ছে করেই আরিয়ান স্যার এর বাইককে টার্গেট করা হয়েছে। গাড়িতে যে ছিলো জানা গেছে তার নাম লিয়ান চৌধুরী।
সামির চোখ লাল হয়ে উঠল “লিয়ান”তার নামটা এমনভাবে বলল,যেন বুকের ভেতর জমে থাকা রাগের আগুন ফেটে বেরিয়ে আসছে। তখনই তার চোখ আবার ইলার দিকে গেল।সে মাটির দিকে তাকিয়ে কাঁদছে, কিছুটা অচেতন মানুষের মতো।সাজু দাঁত চেপে বলল
সাজুঃ- আরিয়ানকে মারতে চাওয়ার কারণ কি হবে পারে। যে কারণেই হক একজন নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা? ওকে আমি ছাড়বো না।
সকাল ৭:১২ মিনিট মোহাম্মদপুর চৌধুরী ভিলার সামনে তিনটি আর্মি গাড়ি এসে দাঁড়াল।পাড়ার লোকজন ভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়।আর্মিরা দরজায় জোর ধাক্কা
“মিসেস চৌধুরী দরজা খুলুন আমরা আর্মি ইন্টেলিজেন্স”
মিসেস চৌধুরী দৌড়ে এলেনমু খে আতঙ্ক নিয়ে দরজা খুলে দিলো
“লিয়ান কোথায়?
“লিয়ান তো উপরে সে কি করেছে ?
জবাব এল না দুইজন অফিসার সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।কোনো অনুমতি লাগলো না। লিয়াদের দরজা লাগানো দরজা খুলতে বলা হলে সে দরজা খুলে না তাই দরজা ভাঙা হলো দরজা ভেঙে ঢুকতেই দেখা গেল মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ইয়েস্টারডের ব্যান্ডেজ,শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।বিছানার পাশে মোবাইল ফেলে রাখা।আর লিয়ান দাঁড়িয়ে আছে জানালার সামনে চোখ লাল, চোয়াল শক্ত করে মনে হচ্ছে মরিয়া হয়ে পালানোর পথ খুঁজছিল।একজন অফিসার চিৎকার করে বলল
“লিয়ান চৌধুরী হাত ওপরে তুলুন আপনি ধরাপড়ে গেছেন।
লিয়ান চোখ তুলে হাসল ওই পাগলাটে,ঠাণ্ডা হাসি।
লিয়ানঃ- ধরবেন আমাকে? কিন্তু কেনো আমার ইলাকে ভালোবাসা ক্রাইম না কি?আমি তো শুধু তাকে নিজের করতে…
এক সেকেন্ডে আর্মিরা তাকে দেয়ালে চেপে ধরল।হাতকড়া ক্ল্যাং করে বেজে উঠল ধাতুর শব্দে।মিসেস চৌধুরী দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন
“লিয়ান কি করলি কেন করলি এই সব?
লিয়ানকে গাড়িতে তোলা হলো।সে মাথা ঘুরিয়ে অসুস্থ চাহনিতে মাকে দেখে বলল
লিয়ানঃ- ইলা আমার হবে আম্মু ওর পাশে আর কেউ থাকতে পারবে না আরিয়ানও না।আমি সব ঠিক করেই ফেলেছি।
মায়ের বুক ভেঙে গেল তিনি গাড়ির দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন
” তুই কেনো এমন পাগলামি করছিস বাবা তুই তো সুস্থ হয়ে গিয়েছিলি তাহলে আবার কেনো এমনটা করছিস।
গাড়ি স্টার্ট হলো লিয়ান জানালার ওপাশে তাকিয়ে রইল চোখে ছিল ভয়ংকর শান্তি। গাড়ি ছুটলো ক্যান্টরমেন্টে এর দিকে।
ক্যান্টরমেন্ট:
ইলা মাথা নিচু করে বসে আছে ঠোঁট ফাটা, চোখ লাল।হঠাৎ সে হালিমার হাত শক্ত করে চাপল।
ইলাঃ- বার বার আমার সাথে কেনো এমন হচ্ছে বলতে পারিস কি অপরাধ আমার।
হালিমাঃ- চুপ কর কিছু হবে না আরিয়ান ভাই শক্ত মানুষ।তোকে তো এসব ভাবতেও হবে না সব ঠিক হয়ে যাবে
ইলা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল
ইলাঃ- আমি তো তাকে নিয়ে কখনো এমন অনুভব করিনি তাহলে আজ কেনো তার জন্য আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।
ইলার চোখ বেয়ে অঝোরধারা নেমে এলো।দূর থেকে সাজু কান পেতে শুনল কথাগুলো সে থমকে গেল।একজন সিভিলিয়ান মেয়ের মুখ থেকে এত সত্য, এত ভাঙা, এত গভীর অনুভূতি বের হতে শুনে।সাজু প্রথমবার বুঝল এই মেয়েটা মিথ্যে নয়।এই মেয়েটা সত্যিই আরিয়ানকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে।
ICU-এর দরজা খুলল ডেন্টিস্ট্রীক ব্লুর লাইটে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন মুখে গভীর ক্লান্তি।ইলা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল
ইলাঃ- ডাক্তার আরিয়ান কেমন আছে?
ডাক্তার মুখ শক্ত করে বলল
ডাক্তারঃ- এখনো ক্রিটিক্যাল কিন্তু প্রথম ৩ ঘণ্টা পেরিয়েছে এটা ভালো লক্ষণ।
ইলা ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল তার চোখে আবার কান্না জমে উঠল।সাজু ডাক্তারকে সরিয়ে নিয়ে গেল ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে। কিছুক্ষণ পর সাজু ফিরে এসে ইলার সামনে দাঁড়াল।
সাজুঃ- আপনি কি সত্যিই তার খুব কাছের মানুষ?
ইলা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নেড়ে বলল
ইলাঃ- হ্যাঁ তবে কেউ জানে না।
সাজুঃ- জানে না?
ইলাঃ- আমরা দুজনেই চাইনি আমাদের সম্পর্কেটা এখনি কেউ জানুক।
তার কথা শুনে সাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কঠোর স্বরে বলল
সাজুঃ- ঠিক আছে।
একটা খবর দিই আরিয়ান এখনো লড়াই করছে ও যুদ্ধ করে বাঁচতে জানে।আপনার কান্নায় নয় আপনার শক্তিতে ও টিকে থাকবে। ইলা মাথা তুলল তার চোখে প্রথমবার ছোট্ট একটুকু আলো। ঠিক তখনই পিছন থেকে দ্রুত বুটের শব্দ গার্ড এসে স্যালুট দিয়ে বলল
“স্যার আরিয়ান স্যার এর বাবা-মা গেটের কাছে।
ইলার বুক ধক করে উঠল। সাজু খান সেনাদের সাথে বেরিয়ে গেলো গেট দিয়ে দুইটা গাড়ি একসাথে ঢুকল।একটা সাদা প্রাডো আরিয়ানের বাবা মা।আরেকটা কালো হাইএস ইলার বাবা, মা, ইলার বড় বাবা, বড় মা পরি, আদিব, রায়েদ সবাই।
গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে বের হলেন নাফিযা খান চেহারা সম্পূর্ণ ভাঙা, চোখ লাল, চুল এলোমেলো।
নাফিযাঃ- আমার ছেলে আমার আরিয়ান কোথায়?আমাকে ভিতরে যেতে দিন।
মেহেরাব খান তার কাঁধ ধরে সামলানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার নিজের হাতও কাঁপছে। সাজু ছুটে এসে সালাম দিল,
সাজুঃ- আন্টি আংকেল আমাকে অনুসরণ করুন কিন্তু এক সাথে এত লোক এলাও করবে না।
নাফিযার চোখে আতঙ্ক জমে গেল
নাফিযাঃ- এরা সবাই আরিয়ানের শশুর বাড়ির লোক।
সাজুঃ- আরিয়ান বিয়ে করেছে??
মেহেরাবঃ- হ্যাঁ বাবা কিছুদিন হলো বিয়ে করেছে।
সাজুঃ- তাহলে ICU এর সামনে যে বসে আছে সে আরিয়ানের ওয়াইফ??
নাফিযাঃ- হ্যাঁ, আরিয়ান এখন কেমন আছে??
সাজুঃ- আন্টি ও খুব ফাইট করছে কিন্তু অবস্থা ক্রিটিক্যাল।
এই কথায় নাফিযার হাঁটু কেঁপে উঠল,তিনি প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন।মেহেরাব তাকে ধরে বললেন
মেহেরাবঃ- ভেঙে পড়বে না আমরা এসেছি আরিয়ানও অপেক্ষা করছে ওর কিছু হবে না।
সাজু আরিয়ানের বাবা মা আর ইলার বাবা মাকে নিয়ে ভিতরে গেলো বাকিরা বাইরে আছে। রাশেদ তালুকদার যে সাধারণত যাঁর ভরাট গলা ও দৃঢ় চোখ সবকিছু কাঁপিয়ে দেয়, আজ সেই মানুষটির চেহারা ফ্যাকাশে,ঠোঁট কাঁপছে। তার পাশে ইলার মা সাদা ওড়না ভেজা চোখে চেপে ধরে বারবার বলছেন
সাবিহাঃ- আমার মেয়েটা সারারাত একা ছিল? না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে।
ICU এর সামনে গিয়ে রাশেদ তালুকদার বলতে লাগলো
রাশেদঃ- ইলা কোথায়?আমি এসে গেছি আমার মেয়েটা কোথায়?
ইলা ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে এল। চোখ দুটো পুরো লাল মুখ সাদা, হাত বরফের মতো ঠান্ডা।রাশেদ এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন
রাশেদঃ- ভয় পাস না মা আমরা এসে গেছি কিচ্ছু হবে না জামাইর।
ইলা বাবার বুক চেপে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল
ইলাঃ- আব্বু আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে আব্বু কেনো আমার সাথে এমনটা হচ্ছে কেনো সব কিছু বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
ইলার মা কান্না আটকে রাখতে না পেরে বললেন
সাবিহাঃ- ইলা মা তুই ভেঙে পরিস না আমরা চলে এসেছি কিছু হবে না আরিয়ান বাবার।
ICU সামনে দুই পরিবার এসে দাঁড়াতেই পরিবেশ নিস্তব্ধ।নাফিযা খানের চোখ হঠাৎ ইলার দিকে পড়ল।ইলাকে দেখে তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন নরম কষ্ট আর মাতৃত্বের মেশানো দৃষ্টি ভেসে উঠল।তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন
নাফিযাঃ- কাদিস না মা আল্লাহ কে ডাক সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইলা মাথা নিচু করে চোখের জল মুছছে। নাফিযা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইলার মাথা দুই হাতে ধরলেন।শব্দগুলো তার গলার গভীর থেকে আসছে
নাফিযাঃ- আমার ছেলে অনেক স্ট্রং কিছু হবে না অকে ফিরতেই হবে।আমার আরিয়ান এর কিছু হবে না তুমি শক্ত থাকো।
মেহেরাব খানও ইলার বাবা রাশেদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললেন
মেহেরাবঃ- কখনো ভাবিনি এভাবে বিয়ে দিয়েও দুজন দুজনের একটা আপন হয়ে যাবে।ওদের জন্য দোয়া করেন যেনো এভাবেই থাকতে পারে।
রাশেদ তালুকদার নিচু স্বরে বললেন
রাশেদঃ- আমি আমার মেয়েকে এভাবে কাদতে দেখতে পারি না আমার বুক ফেটে যায়।আমার মেয়ের চোখে এই ভাঙা অবস্থাটা আমি সহ্য করতে পারছি না।
দুই বাবা একে অপরের দিকে সংকোচময়, ব্যথায় ভারী দৃষ্টিতে তাকালেন তাদের সন্তানদের জীবন দুভাগে ঝুলে আছে।
ICU দুইজন ডাক্তার মুখে মাস্ক নামিয়ে বাইরে এল।মেহেরাব খান ডক্টর এর কাছে গেলো ইলা, নাফিযা, রাশেদ সবাই একসাথে সামনে ছুটে এল। ডাক্তার থেমে গম্ভীর মুখে বলল
ডাক্তারঃ- আরিয়ান এর অবস্থা ক্রিটিক্যাল কিন্তু স্ট্যাবল করা গেছে।
নাফিযা হাঁটুতে ভেঙে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন“আলহামদুলিল্লাহ”ইলার বুক থেকে একটা ভারী হাহাকার বেরিয়ে এল”আল্লাহ তুমি মহান”
আরিয়ানের বাবা-মা ইলার বাবা-মা উদ্বেগে পায়চারি করছেন।ঠিক তখনই বাইরের গেটে হঠাৎ সামরিক জীপের শব্দ গেট শক্ত করে খুলে দেওয়া মাত্র দুইটা মিলিটারি জীপ নির্দয় গতিতে ভেতরে ঢুকল সাথে সাথে সবাই চমকে উঠল। জীপের দরজা খুলে নামল দুইজন স্পেশাল ফোর্স সদস্য। তাদের ইউনিফর্ম, চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে কোনো কথা নেই ভয়ংকর চাপা উত্তেজনা চারপাশে ছড়িয়ে গেল।তারপর টেনে নামানো হলো লিয়ানকে।হাত পেছনে বাঁধা, মুখে রক্তের দাগ,গালে সারা রাতের ভয় আর উন্মাদনা জমে আছে।চোখে ঘুম নেই, শুধু ভয় আর পাগলামির মিশ্র কালো ছাপ।একজন অফিসার ঠান্ডা স্বরে সাজুকে বলল
“সার সন্দেহভাজন আরিয়ান স্যারের বাইক-অ্যাক্সিডেন্টের মূল অপরাধী”লিয়ান চৌধুরী তাকে ঘটনাস্থলের CCTV ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে”
আরিয়ানের মা বাবা চমকে উঠে এগিয়ে এলেন মেহেরাব খান রাগে কেঁপে বলল
মেহেরাবঃ- তোমরা নিশ্চিত?
অফিসার ক্যামেরা থেকে ছবি দেখিয়ে বলল
“জি স্যার সে ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দিয়েছে। ধাক্কা দেওয়ার পরে গাড়ি ঘুরিয়ে পালিয়েছে।
নাফিযা খান কেঁদে উঠলেন,লিয়ানকে টেনে আনা হলে তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল ইলার দিকে যে ঠিক তখনই ভেতর থেকে বের হলো ইলা এক মুহূর্ত থমকে গেল।তার চোখ কর্কশ, লাল, দুঃখে ভেজা। লিয়ান পাগল হাসি দিয়ে বলল
লিয়ানঃ- ইলা তুমি কাঁদছ কেন?আমি তো তোমার সব বাধা সরিয়ে দিলাম আরিয়ান এখন…..
“ঠাস”
ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার সরাসরি এগিয়ে এসে লিয়ানের গালের উপর এমন একটা চড় মারলেন যাতে করে লিয়ান এর মাথা ফিরিয়ে গেল।চারপাশের আর্মিরাও এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ।রাশেদের চোখ লাল গলা কাঁপছে
রাশেদঃ- তুই আমার মেয়ের জীবনে আগুন ধরিয়েছিস মানুষ হয়েও এমন পশুর মতো কাজ করলি?
লিয়ান গলা শুকনো হাসিতে বলল
লিয়ানঃ- ইলা আমার সে আমারই সেটা যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হক।আরিয়ান মারা গেলে সব সহজ হয়ে যাবে।
এই কথা বলতেই ইলা হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল।তাকে ধরে রাখতে হালিমা ছুটে এলেও ইলা লিয়ানের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল।চোখে ঘৃণা, কষ্ট,সব একসাথে ইলা ভাঙা গলায় বলল
ইলাঃ- আপনি সুস্থ মানুষ না আপনি অসুস্থ।আরিয়ান যদি কিছু হয় আমি কখনো তোমাকে ক্ষমা করব না কখনো না।
লিয়ান চিৎকার করে উঠল
লিয়ানঃ- ইলাআআ তুমি আমাকে ছাড়তে পারবে না তোমাকে আমারই হতে হবে।তুমি চিন্তা করো না আরিয়ান মরলে সব ঠিক হয়ে যাবে…
“ঠাস”
এবার আঘাত করলেন আরিয়ানের বাবা, মেহেরাব খান।তিনি লিয়ানের কলার ধরে বললেন
মেহেরাবঃ- তুই আমার ছেলের জীবন নেয়ার চেষ্টা করেছিস?তোকে আমি আইনের হাতে দেব যে তুই সারা জীবন বাইরের আলো দেখতে পারবি না।
লিয়ান এবার সত্যিই ভয় পাবার অভিনয় করে চোখ বড় বড় করে আর্মিদের দিকে তাকিয়ে বলল
লিয়ানঃ- আমি কিছু করিনি সে-ই বাইক নিয়ে…
অফিসার কঠোরভাবে বাধা দিল
“চুপ তোমার গাড়ির ব্ল্যাকবক্স,রাস্তার CCTV, সাক্ষী সব প্রমাণ আছে।আমরা তোমাকে মিলিটারি কাস্টডিতে নিয়ে যাচ্ছি।
“আরিয়ান স্যার আমাদের ইউনিটের একজন সদস্য এটা ‘অ্যাটেম্পটেড মার্ডার’ আর্মি কোর্টে বিচার হবে।
লিয়ানকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে সে শেষবার ইলার দিকে তাকিয়ে বলল
লিয়ানঃ- ইলা তুমি দেখবে আমি ছাড়া তোমার কেউ নেই আরিয়ান আর ফিরবে না।
ইলা মুখ ঘুরিয়ে রাশেদের কাঁধে মাথা রাখল।তার চোখ দিয়ে আবারো পানি ঝরছে।জীপগুলো লিয়ানকে নিয়ে বেরিয়ে গেল চারপাশে সাইরেনের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।ইলা আইসিইউর দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই কথা বলল
ইলাঃ- আরিয়ান আপনি ফিরে আসুন দয়া করে ফিরে আসুন।
কিছু সময় কেটে গেলো সবাই অপেক্ষায় আসছে আরিয়ানের জ্ঞান ফিরার ঘরটা নিস্তব্ধ।মনিটরের বিপ-বিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ, মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন, শ্বাস নিতে দরকার অক্সিজেন সাপোর্ট তবু এত লড়াইয়ের মাঝেও আরিয়ান হার মানেনি। ডাক্তাররা তিন ঘণ্টার ক্রিটিক্যাল সার্জারি শেষে বলেছিল
“যদি বাঁচে তবে এই কয়েক ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ইলা তখনো বাইরে দাঁড়িয়ে দুই হাত কাঁপছে, চোখ লাল, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে বারবার তাকে ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। তবু ইলা জানে আরিয়ান জেগে ওঠলেই হবে আর কিছু চায় না সে।হঠাৎ মনিটরের শব্দ বদলে গেল একজন নার্স দৌড়ে এল। মনিটরের রিদম বদলে গেছে আরিয়ান ধীরে ধীরে নড়ছে।
ডিউটি ডাক্তার দ্রুত মাস্ক ঠিক করে এগিয়ে গেলেন।আরিয়ান চোখ খুলতে চেষ্টা করল।পালকের মধ্যে আটকে থাকা ভারী অবসাদ, মাথার ভেতর তীব্র ব্যথা, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ তারপর একটা ক্ষীণ নিঃশ্বাস।মাথা জোরে ব্যথায় ধুকপুক করলেও সে প্রথম যে নামটা খুঁজলো “ইলাফুল” ডাক্তার এগিয়ে এসে বললেন
“মি. আরিয়ান আপনি শুনতে পাচ্ছেন কোথাও ব্যথা লাগছে?
কিন্তু আরিয়ানের কণ্ঠ কাঁপা, দুর্বল, অথচ তীব্র উদ্বেগে ভরা
আরিয়ানঃ- ইলা কোথায়?ইলা ঠিক আছে তো?
ডাক্তার স্থির হয়ে গেলেন একটা কথা পরিষ্কার এই ছেলেটা অর্ধমৃত অবস্থায় থেকেও যার খোঁজ করছে সে শুধু একজনই তার মনের গভীরের কেউ ডাক্তারের রুমের বাইরে ইলার কান কাঁপল দূর থেকে একটা নার্স দৌড়ে এসে বলল
“উনি জেগে উঠেছেন আর প্রথমেই ইলা নাম বলেছেন তার কথা জিগ্যেস করেছেন।
ইলার বুক কেঁপে উঠল চোখের পানি থামলো না।আরিয়ানের বাবা-মা ইলার বাবা- মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ইলা দৌড়ে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল।ভেতরে ডাক্তাররা আরিয়ানকে স্থির করার চেষ্টা করছে,কিন্তু আরিয়ান বারবার দুর্বল কণ্ঠে একই কথা
“ইলাকে…ডাকুন…প্লিজ… আমাকে ইলার সাথে… কথা বলতে দিন…”
আরিয়ানের চোখের দৃষ্টি শুধু ইলাকে খুঁজছে।অফিসার রায়হান এগিয়ে এলেন ইলার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন
“ওকে মাত্র একটা মিনিটের জন্য দেখতে দেয়া যাবে।মানসিকভাবে স্থির করানো দরকার তুমি কি প্রস্তুত?
ইলা মাথা নাড়তে পারল না শুধু চোখ বুজে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করল।ইলার পায়ের নিচে শক্তি নেই তবুও দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল আইসিইউ রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো আরিয়ান মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। চোখে ভয় দুশ্চিন্তা আকুলতা।চোখের কোণে শুকানো লবণাক্ত দাগ,ঠোঁটে কাঁপুনি।আরিয়ান নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে তাকিয়ে রইল তার চোখ জ্বলে উঠল এক সেকেন্ডে “ইলাফুল” আমার “লিটিলহার্ট” ইলার বুক ভেঙে গেল শব্দটা শুনে।সে এগিয়ে গেল ধীরে ধীরে।আরিয়ান হাত তুলতে চাইল ব্যথায় কেঁপে উঠল।
আরিয়ানঃ- আপনি ঠিক আছেন?আপনার কিছু হয়নি তো?
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৮
ইলার চোখে টলমল পানি সে আরিয়ানর হাতটা নিজের দুই হাতে ধরে ফেলল।
ইলাঃ-আমি ঠিক আছি।আপনি জেগে উঠেছেন এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।
আরিয়ান গভীর শ্বাস নিল চোখ বন্ধ করল
আরিয়ানঃ- ভেবেছিলাম হয়তো আর কখনো আপনাদের দেখতে পাবো না
ইলার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।ওই মুহূর্তে পুরো পৃথিবী যেন নিস্তব্ধ।বাইরে আর্মিদের চোখেও সম্মান অফিসার রায়হান দূর থেকে দৃশ্যটা দেখলেন। একজন আর্মি মেজর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে শুধু একটি নামের জন্য “ইলাফুল”
