ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫২
ছায়া
রাতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই তালুকদার বাড়িতে এক চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।ডাইনিং টেবিলে নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে,কিন্তু কারো মনেই স্বস্তি নেই। হালিমা মাথা নিচু করে বসে আছে তার চোখ দুটো ফোলা। একটা সুতি কামিজে তাকে বড্ড অসহায় লাগছে।
আরিয়ান আর ইলা নিচে নামতেই দেখল ইলার বড় বাবা করিম উদ্দিন আর রাশেদ তালুকদার গম্ভীর মুখে বসে আছেন। মেহেরাব খানের সাথে গল্প করছেন। নাফিযা বেগম হালিমাকে জোর করে এক গ্লাস দুধ খাওয়াতে চাইছেন কিন্তু সে বারবার না করে দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রায়েদ ক্যাজুয়াল শার্ট পরে শিস দিতে দিতে নিচে নামল। সবাইকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে তার শিস থেমে গেল।
রায়েদঃ- গুড মর্নিং এভরিওয়ান কী ব্যাপার, সবাই কি কোনো শোকসভা পালন করছে নাকি?
করিম উদ্দিন তালুকদার কড়া গলায় বললেন,
করিম উদ্দিনঃ- রায়েদ এদিকে আয় তো তোর সাথে জরুরি কথা আছে।
রায়েদ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে একটু সোজা হয়ে বসল। ইলা পাশে দাঁড়িয়ে রায়েদের দিকে সরাসরি তাকাল।
ইলাঃ- রায়েদ ভাইয়া হালিমা গতকাল যা বলেছে তা কি তুমি জানো? ও ওর বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে শুধু তোমার জন্য। তুমি কি একবারও ভেবেছো একটা মেয়ের ওপর দিয়ে কতটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে?
রায়েদ একটা বাঁকা হাসি দিল, যা দেখে হালিমা আরও বেশি কুঁকড়ে গেল।
রায়েদঃ- ইলা শোন আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি আমি ওকে পালিয়ে আসতে বলিনি।ও ইমোশনাল হয়ে একটা ভুল ডিসিশন নিয়েছে তার দায়ভার আমি কেন নেব? ভালোবাসা কি কোনো চ্যারিটি যে আবদার করলেই দিয়ে দেব?
হালিমা এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আরিয়ান রায়েদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
আরিয়ানঃ- রায়েদ ভালোবাসা চ্যারিটি নয় ঠিকই, কিন্তু রেসপনসিবিলিটি তো বটে। তুমি যদি ওকে পছন্দ না-ই করতে তবে ওর মনে এই আশাটা কেন ঢুকিয়েছিলে? একটা মেয়ের আবেগ নিয়ে খেলা করাটা তোমার মতো স্মার্ট ছেলের কাছে কাম্য ছিল না।
রায়েদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তারপর বড় বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
রায়েদঃ- বড় আব্বু আমি জানি আমি ভুল করেছি। ফ্লাট করা বা মজা করা আমার স্বভাব হতে পারে, কিন্তু আমি কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবিনি। এখন তোমরা যদি আমাকে জোর করো তবে আমি হয়তো ওকে বিয়ে করব কিন্তু ও কোনোদিন আমার মনে জায়গা পাবে না। হালিমা তুমি কি সারাজীবন একটা শূন্য মানুষের সাথে থাকতে চাও?
হালিমা উঠে দাঁড়িয়ে রায়েদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল তার চোখে এখন আগুনের আভা।
হালিমাঃ- আমি শূন্যতা নিতেই এসেছি রায়েদ ভাইয়া আপনি আমাকে না ভালোবাসেন, অন্তত করুণা তো করবেন না। আমি আমার বাড়ির সবাইকে অমান্য করে এসেছি, এখন ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ। আপনি যদি আমাকে আশ্রয় না দেন, তবে আমার মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
ইলা পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এল। সে হালিমার হাত ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল।
ইলাঃ- আব্বু বড় বাবা, আমি একটা প্রস্তাব দিতে চাই। হালিমার বাবা-মার সাথে আমাদের কথা বলতে হবে। হালিমা এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিক। ও আমাদের এখানে কিছুদিন থাকুক। রায়েদ ভাইয়াকেও সময় দেওয়া উচিত। জোর করে বিয়ে দিলে কারোই ভালো হবে না।
রাশেদ তালুকদার সায় দিয়ে বললেন,
রাশেদঃ- হ্যাঁ ইলা ঠিকই বলেছে হালিমা মা, তুমি আমাদের মেয়ের মতো। আমরা তোমার বাবা-মার সাথে কথা বলে ব্যাপারটি মীমাংসা করার চেষ্টা করব। আর রায়েদ, তুই অন্তত এই কয়দিন ওর সাথে একটু ভালো ব্যবহার করবি।
রায়েদ আর দ্বিমত করল না। সে গটগট করে বাইরে চলে গেল। হালিমা ডুকরে কেঁদে ইলার বুকে মুখ লুকাল।
Time Skip…
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো বাড়ির বড়রা সবাই হালিমার বাবার সাথে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। তারা রাজি হয়েছেন যে হালিমা কিছুদিন এখানে থাকুক, তারপর তারা এসে ওকে নিয়ে যাবেন বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিকেলে বাড়ির পেছনের বাগানে আরিয়ান আর ইলা বসে ছিল।আরিয়ান ইলার চুলে একটা কাঠগোলাপ গুঁজে দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আজকের দিনটা পুরো হালিমা আর রায়েদের টেনশনে গেল। আমাদের সময়টা তো একদমে উধাও হয়ে গেল ইলাফুল।
ইলা আরিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
ইলাঃ- মানুষের জীবনটা বড্ড অদ্ভুত তাই না? কেউ ভালোবাসা পেয়েও বোঝে না, আর কেউ একটু ভালোবাসার জন্য নিজের সবটা বাজি ধরে।
আরিয়ান ইলার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল।
আরিয়ানঃ- তুমি কিন্তু আমার বাজি হারতে দাওনি তিলবতী। আমার এই ভয়েজ কি আর অন্য কারো জন্য বাজবে? না, এটা শুধু তোমার জন্যই সংরক্ষিত।
ইলা মুচকি হেসে বলল,
ইলাঃ- আপনি না থাকলে আমার জীবনটা একদম ফিকে হয়ে যেত। হালিমাকে দেখলে আমার নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আমিও তো অনেক লড়াই করেছি।
আরিয়ান ইলাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল।
আরিয়ানঃ- আচ্ছা অনেক তো মন খারাপ হলো। চলো তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিই।
ইলা উৎসুক হয়ে তাকাল।
ইলাঃ- আবার কী সারপ্রাইজ?
আরিয়ান পকেট থেকে দুটো বিমানের টিকেট বের করল।
আরিয়ানঃ- আমাদের অফিসিয়াল হানিমুন আগামী কাল আমরা মালদ্বীপ যাচ্ছি। কোনো ঝামেলা নেই শুধু তুমি আর তোমার এই ভয়েজ কিং।
ইলা খুশিতে চিৎকার করে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।দূর থেকে হালিমা জানালার পর্দা সরিয়ে তাদের দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। সে জানত না তার ভাগ্যে কী আছে, কিন্তু ইলা আর আরিয়ানের এই গভীর প্রেম তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাল। ভালোবাসা মানে কি শুধু পাওয়া? হয়তো ত্যাগের মাঝেও কোনো সুখ লুকানো থাকে।
রায়েদ তখন ছাদ থেকে নিচে নামছিল। হালিমার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে একবার থামল। হালিমার বিষণ্ণ মুখটা দেখে তার মনে এক অদ্ভুত খচখচানি হলো। সে কি আসলেই খুব বেশি নিষ্ঠুর হয়ে গেছে?
রাতে খান বাড়িতে যেন হঠাৎ করেই ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করা হয়েছে। ডাইনিং রুম থেকে শুরু করে বসার ঘর সবখানে শুধু একটাই আলোচনা, রায়েদ আর হালিমার বিয়ে। হালিমার বাবা-মা পরে ফোনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মেয়ে যেহেতু ওই বাড়িতে গিয়ে উঠেছে, আর লোকে জানাজানি হয়েছে, তাই বিয়ে না দিয়ে তারা একে আর বাড়িতে ফেরাবেন না। আত্মীয়-স্বজন বাজে কথা বলছে।
বড় বাবা করিম উদ্দিনের রায়েদ এর বাবা রফিকুল তালুকদার কে ফোন দিয়ে সব কিছু জানিয়েছে রফিকুল তালুকদার এর হুকুম, “আজ রাতেই ঘরোয়াভাবে বিয়ে দিয়ে দেয়া হক রায়েদ আর হালিমাকে।
রায়েদ নিজের রুমে পায়চারি করছিল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে বিয়ের করতে নয়, ফাঁসির মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে। আরিয়ান, ইলা, পরি আর আদিব রুমে ঢুকতেই রায়েদ আর্তনাদ করে উঠল।
রায়েদঃ- আরিয়ান ভাই,আদিব ভাই বাঁচাও! আমাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। আমি কি দেখতে খুব বেশি ধার্মিক? যে এই বয়সেই আমাকে সংসার নামের তসবিহ হাতে ধরিয়ে দিতে চাইছে?
আরিয়ান সোফায় আরাম করে বসে বলল,
আরিয়ানঃ- কিছু করার নাই ভাই আমিও একদিন এই বলির পাঁঠা হইছিলাম। কিন্তু এখন ভালো আছি হয়তো তোমার ও ফিউচার ভালো আছে।তাই বিয়েটা করে নাও আর বিয়ে করা তো ভালো।সারারাত একা একা দেয়ালের সাথে কথা বলতে হবে না।
রায়েদঃ- দেয়াল অন্তত পাল্টা জবাব দেয় না ভাই কিন্তু হালিমা তো একবার কথা শুরু করলে থামার নাম নেয় না। ওর নাম হালিমা না রেখে ‘রেডিও হালিমা’ রাখা উচিত ছিল।আর ইলা,পরি আরিয়ান ভাই আদিব ভাই না হয় পরের ছেলে ওদের কথা বাদ দিলাম কিন্তু তোরা তো আমার বোন তোরা কিছু বল!
ইলা হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া তুমি তো নিজেই বলেছিলে তুমি প্লে-বয়। তাই এখন প্লে-বয়ের খেলা শেষ করে ভালো জামাই’ হওয়ার প্রস্তুতি নিও।
রায়েদঃ- ভালো জামাই আর আমি! আরে আমি তো নিজের রুমের চাবি কই রাখি খুঁজে পাই না, আমি সংসার সামলাবো কিভাবে? শোনো আরিয়ান ভাই, আমাকে যদি জোর করে কবুল পড়ানো হয় আমি কিন্তু কাজির সামনে গিয়ে বলব এরা আমাকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।
পরিঃ- আমরা বলবো জোর করে না কট দিয়ে বিয়ে দিছি।
রায়েদ মাথা চুলকে বলল,
রায়েদঃ- তোমরা সবাই মিলে আমাকে এত জোর করছ কেন? আমি কি তোমাদের কোনো লোন নিয়েছি যে এখন রিপেমেন্ট বিয়ে দিয়ে করতে হবে?
ইলা হেসে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া এটা লোন না এটা হার্টের লোন। হালিমা তোমাকে দিয়েছে এখন তুমিও রিটার্ন দাও।
রায়েদ উঠে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
রায়েদঃ- ঠিক আছে সবাই যখন চাও আমি বলির পাঁঠা হই আর আমার হেড কোয়াটার থেকেও যেহেতু ওয়াডার হয়ে গেছে তাহলে তো এখন বিয়ে ছাড়া আর উপায় নেই।
সবাই হাসির রোল দিয়ে উঠল রায়েদের কথা শুনে আরিয়ান রায়েদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
আরিয়ানঃ- দেখলে একটু প্রেশার দিলেই মন খুলে যায়।
রায়েদ বাঁকা হেসে বলল,
রায়েদঃ- প্রেশার না দিলে আমি তো চিরকাল সিঙ্গেল থাকতাম এখন দেখি ফিউচার কী হয়।
ঠিক তখনই করিম উদ্দিন দরজায় টোক দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। হাতে একটা রেশমি পাঞ্জাবি।
করিম উদ্দিনঃ- রায়েদ এই পাঞ্জাবিটা পরে নে। কাজি সাহেব চলে এসেছেন।আর মনে রাখিস, কোনো উল্টোপাল্টা করলে তোকে এবার ত্যাজ্যপুত্র করা হবে।
রায়েদ করুণ সুরে বলল,
রায়েদঃ- বড় আব্বু ত্যাজ্যপুত্র করলেই তো ভালো হতো অন্তত ব্যাচেলর লাইফটা তো বাঁচত। এই পাঞ্জাবিটা পরে আমাকে তো মনে হচ্ছে বলির পাঁঠা। আমাকে কি একদম বিরিয়ানির প্যাকেটের মতো সাজানো দরকার ছিল?
বড় বাবা ধমক দিতেই রায়েদ বাধ্য হয়ে পাঞ্জাবিটা হাতে নিল।বড় বাবা বেরিয়ে যেতেই সে ইলার দিকে তাকিয়ে বলল,
রায়েদঃ- ইলা একটা বুদ্ধি দে তো বিয়ের আসরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করলে কি কাজ হবে? নাকি কাজি সাহেব অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে দিয়ে টিপসই করিয়ে নেবে?
আরিয়ান হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- তোমার যা ফিগার অজ্ঞান হলেও কেউ তোকে কোলে তুলতে পারবে না। তার চেয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো বিয়েটা করে ফেলো।
হালিমা মেয়েটা তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে।
রায়েদ পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়াতে চড়াতে আয়নায় নিজেকে দেখল আর বিড়বিড় করে বলল,
রায়েদঃ- আয়না ভাই শেষবারের মতো দেখে নাও এক মুক্ত পুরুষকে। এরপর থেকে এই চেহারায় শুধু শপিং ব্যাগ আর বাজার করার টেনশন ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। হে আল্লাহ, কবুল বলার সময় যেন আমার মুখ দিয়ে ‘না’ না বেরিয়ে যায়!
বিয়ের আসরে…
হালিমাকে লাল বেনারসিতে বেশ সুন্দর লাগছে, যদিও তার চোখ দুটো এখনো ভেজা। সে ভয়ে ভয়ে রায়েদের দিকে তাকাচ্ছিল। কাজি সাহেব খাতা খুলে বসলেন।
কাজি সাহেবঃ- বাবা রায়েদ তুমি কি তিরিশ লক্ষ টাকা মোহরানা ধার্যে হালিমা সরকারকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করে নিচ্ছ?
রায়েদ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।পুরো ঘর নিস্তব্ধ।রায়েদ একবার আরিয়ানের দিকে তাকাল, একবার হালিমার দিকে।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
রায়েদঃ- কাজি সাহেব ইএমআই-তে মোহরানা দেওয়ার সিস্টেম আছে কি?না মানে কিস্তিতে দিলে সুবিধা হতো আরকি।
আরিয়ান টেবিলের নিচ দিয়ে রায়েদের পায়ে একটা লাথি মারল রায়েদ বিষম খেয়ে বলে উঠল,
রায়েদঃ- কবুল! কবুল! কবুল! (মনে মনে বলল আল্লাহ, আমার উইকেট তো পড়ে গেল!)
মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়ে গেল হালিমা লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল।রায়েদ তার পাশে গিয়ে বসতেই হালিমা ফিসফিস করে বলল,
হালিমাঃ- আপনি কি খুব বেশি রাগ করেছেন?
রায়েদ হালিমার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
রায়েদঃ- রাগ করে কী লাভ হালিমা বেগম? এখন তো তুমি আমার লিগ্যাল হোম মিনিস্টার।শুধু একটা রিকোয়েস্ট সপ্তাহে অন্তত একদিন আমাকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিও, আর সিংগ্যাল ডে পালন করতে দিও।নাহলে আমি পাগল হয়ে যাবো এক সাথে এত শর্ড নিতে পারবো না।
ইলা আর আরিয়ান পাশ থেকে হাসছে। আরিয়ান ইলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
ইলাঃ- দেখলেন তো শেষ পর্যন্ত রায়েদ ভাইয়াও ধরা পড়ে গেল।
আরিয়ান ইলার কানে মুখ নিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- ধরা তো সবাইকেই পড়তে হয় ইলাফুল।কেউ পড়ে ভয়ে আর কেউ পড়ে আমার মতো এই সুন্দর মায়াজালে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে খান বাড়িতে নতুন এক দম্পতির যাত্রা শুরু হলো।যদিও রায়েদ এখনো মনে মনে নিজেকে ‘শহীদ’ ভাবছে, কিন্তু হালিমার চোখের খুশিতে বোঝা যাচ্ছিল এই অগোছালো ছেলেটাকেই সে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নিতে চেয়েছিল।কিন্তু সেটা বলতে পারেনি কখনো।
খান বাড়ির দোতলার একটা ঘর সাজানো হয়েছে ফুল আর আলো দিয়ে। লাল শাড়ির ওপর সোনালি জরির কাজ, বিছানায় গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো সাথে রজনীগন্ধা। হালিমা লাল বেনারসিতে বসে আছে, মাথায় ঘোমটা। চোখ নিচু কিন্তু ঠোঁটে একটা লাজুক হাসি।
ঘরের দরজাটা বন্ধ করেই রায়েদ দরজায় হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রুমটা রজনীগন্ধার গন্ধে ম ম করছে, হালিমা ঘোমটা টেনে একদম মূর্তির মতো বসে আছে। রায়েদ সাবধানে পা টিপে টিপে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল।
রায়েদঃ- (ফিসফিস করে নিজেকে) আল্লাহ, এখনো সময় আছে। দৌড়ে পালাই? না না, বড় আব্বু ত্যাজ্য করে দেবে। ঠিক আছে শান্ত থাক রায়েদ। এটা তো শুধু একটা রাত… তারপর সারাজীবন!
রায়েদ বিছানার কোণে বসল। হালিমা একবার তাকাল তারপর আবার চোখ নামাল।
রায়েদঃ- হালিমা বেগম? ঘুমানোর প্ল্যান আছে নাকি সারারাত এভাবে মূর্তির কম্পিটিশন করার ইচ্ছা?
হালিমা আস্তে করে ঘোমটা সরাল। তার চোখ দুটো এখনো লাল, কিন্তু মুখে একটা জয়ের হাসি। সে ফিসফিস করে বলল,
হালিমা: আপনি কি আমার উপরে এখনো রেগে আছেন?
রায়েদ: না রাগ করিনি কিন্তু শোনো হালিমা, আগেভাগেই ক্লিয়ার করি আমি কিন্তু কোনো রোমান্টিক হিরো না। মুভিতে যেমন বাসর রাতে ছেলেরা গয়না দেয়, শাড়ি দেয় আমি সেসব আনিনি। আমি শুধু এক প্যাকেট চিপস আর দুইটা ডেইরি মিল্ক এনেছি।তবে দুইজন ভাগ করে খাবে? এটা আদিব ভাই বলেছে যে বাশর রাতে বউকে কিছু দিতে হয় তাই এটা নিয়ে এসেছি।
হালিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। রায়েদ পকেট থেকে চিপসের প্যাকেট বের করতে করতে আবার শুরু করল,
রায়েদ: দেখো কাজি সাহেব তো আমাকে তিরিশ লক্ষ টাকার মোহরানা নামক ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’-এ সই করিয়ে নিয়েছে। এখন আমার কাছে শুধু তোমার ওই ভালোবাসার ‘কিস্তি’ ছাড়া দেওয়ার মতো কিছু নেই। তুমি কি রাজি এই আজীবনের দেনা বহন করতে?
হালিমা হেসে ফেলল রায়েদকে এই অবস্থায় দেখে তার সব অভিমান ধুয়ে গেল।
রায়েদ: আরে হেসো না সিরিয়াসলি বলছি, আর হ্যাঁ মাঝরাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলতে পারবে না ‘ওগো শুনছো, একটা তেলাপোকা!’ তেলাপোকা দেখলে আমি নিজেই খাটের নিচে লুকিয়ে যাই। আর তোমাকে বাচাবো কই থেকে।
হালিমা রায়েদের হাতটা ধরল রায়েদ চমকে উঠল যেন শক খেয়েছে।
রায়েদ: (মনে মনে বাপরে শুরু হয়ে গেল নাকি) হালিমা আমি কিন্তু এখনো মানসিকভাবে এই রিলেশনশিপের জন্য প্রস্তুত না। আমাকে একটু ‘ওয়ারেন্টি পিরিয়ড’ দেওয়া যায় না?
হালিমা মিষ্টি করে বলল,
হালিমাঃ- আপনাকে কিছু করতে হবে না। শুধু পাশে থাকলেই হবে।
রায়েদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
রায়েদঃ- ঠিক আছে তবে আজ রাতটা আমরা ‘ফ্রেন্ডশিপ মোড’-এ কাটাই। চলো চিপস খাই আর গল্প করি, গান শুনি, Netflix দেখি… পরে দেখা যাবে।
হালিমা চোখ বড় করে তাকাল।
হালিমাঃ- Netflix? এখন? বাশর রাতে?
রায়েদঃ- আরে হ্যাঁ কেন, বাশর রাত মানে তো কথা বলা, হাসি-ঠাট্টা। আমি তো ভাবছিলাম তুমি হয়তো আমাকে লেকচার দেবে “রায়েদ ভাইয়া এখন থেকে রাত ১০টার মধ্যে বাড়ি ফিরবেন। অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বলতে পারবেন না।
হালিমা হেসে ফেলল।
হালিমাঃ- আমি তো সেরকম না কিন্তু আপনি যদি সত্যি চান আমি এই সব করি?
রায়েদ লাফ দিয়ে উঠল
রায়েদঃ- না না কখনোই না। বাদ দাও এই সব তাহলে চলো ফোনটা বের করি। কোন সিরিজ দেখবে? “Money Heist”? না কি “Sacred Games”? ওয়েট… বাশর রাতে কি রোমান্টিক কিছু দেখা উচিত?
হালিমা লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল।
হালিমাঃ- না না আল্লাহ! আপনি সত্যি পাগল।
রায়েদ হঠাৎ বিছানায় শুয়ে পড়ল হাত মাথার পেছনে।
রায়েদঃ- আজ আপাতত ঘুমাও আমার আপাতত চিন্তা করি কালকে আরিয়ান ভাইদের মালদ্বীপ যাওয়ার প্ল্যানটা ভেস্তে দেওয়া যায় কিভাবে।
হামিলাঃ- কেনো আপনি এটা করবেন কেনো?
রায়েদঃ- কারণ আমার একা একা জেল খাটতে ভালো লাগছে না। তাই তাদের যাইতে দিবো না
অন্যদিকে….
ছাদে আরিয়ান আর ইলা চাঁদের আলোয় দুজনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান ইলাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আজ রায়েদের বিয়ে দেখে মনে হলো…আমি আমাদের বিয়েটা দেখলাম যখন তুমি আর আমি দুজনি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না।
ইলা পিছনে ফিরে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
ইলাঃ- হ্যাঁ তখন ছিলাম না কিন্তু এখন আমরা দুই দেহ এক প্রান হয়ে গেছি।
আরিয়ান ইলার ঠোঁটে আলতো চুমু দিল।
আরিয়ানঃ- এই রাত গুলো শুধু তোমার আর আমার কোনো টেনশন নেই। শুধু তুমি আমি আর এই চাঁদ।
ইলা আরিয়ানের বুকে মুখ লুকাল।
ইলাঃ- আপনার ভয়েজটা শুধু আমার জন্য গাইবে?
আরিয়ান হেসে গুনগুন করে উঠল,
~তোমার আমার ভালোবাসা শেষ হওয়ার নয়~
~শুধু তোমায় কাছে চায় এ হৃদয় ~
আরিয়ান ইলাকে কোলে তুলে নিয়ে রুমে চলে গেলো। ইলা নীল রং এর শাড়ি পড়ে ছিলো চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ইলার মুখে এসে পড়েছে আরিয়ান ঘুরে তাকাল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক অতল সমুদ্র।
আরিয়ানঃ- জানো ইলাফুল আজকের চাঁদটা যেন তোমার রূপের কাছে হিংসে করে মেঘের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছে।
ইলা লাজুক হেসে আরিয়ানের শার্টের বোতাম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
ইলাঃ- আপনি সবসময় এত সুন্দর করে গুছিয়ে মিথ্যা বলেন কীভাবে?
আরিয়ান এক ঝটকায় ইলাকে কাছে টেনে নিল।ইলার নিশ্বাস আরিয়ানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।আরিয়ান ইলার কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই ভরাট নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল
আরিয়ানঃ- এটা মিথ্যা নয় ইলাফুল এটা আমার হৃদয়ের সেই আওয়াজ যা শুধু তোমার কানেই পৌঁছায়। কাল আমরা যখন এই নীল জলরাশির দেশে পৌঁছাবো, তখন পুরো পৃথিবীটা আমাদের কাছে থেমে যাবে।
ইলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। আরিয়ান আলতো করে ইলার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু আঁকল। তার স্পর্শে ইলা শিউরে উঠল।
আরিয়ানঃ- ভয়েজের মায়াজালে তো অনেক আগে থেকেই জড়িয়েছিলে এখন আমার জীবনের প্রতিটা নিশ্বাসে জড়িয়ে গেছ। তুমি কি জানো ইলাফুল তোমাকে ছাড়া আমার এই রাজকীয় জীবনটাও কতটা অর্থহীন।
ইলা ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আমি জানতাম না ভয়েজ কিং আপনার ওই একটা ভয়েজ শুনেই এতটা পাগল হয়ে যাব। আমার সবটা হারিয়ে ফেলবো।আমি ভেবেছিলাম আপনাকে হয়তো পাবো না। কিন্তু আজ আপনাকে পেয়ে মনে হচ্ছে আমি পুরো পৃথিবীটা জিতে নিয়েছি।
আরিয়ান ইলার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে তার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে গেল। দুজনের উত্তপ্ত নিশ্বাস এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫১
আরিয়ানঃ- চলো মালদ্বীপের আগে আমাদের এই ছোট স্বর্গে কিছুক্ষণ হারিয়ে যাই।
আরিয়ান ইলাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ইলা লজ্জায় তার বুকে মুখ লুকাল। ভালোবাসা যেন আজ তার পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে এই এক চিলতে সুখের ঘরে।
