Home ভিলেন ক্যান বি লাভার ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ২৯

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ২৯

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ২৯
মিথুবুড়ি

‘অমোঘ সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। মাঝে পেরিয়ে গেল আরো দু’দিন। তাকবীরের দামি গাড়িটি এবড়ো-খেবড়ো জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগোচ্ছে বাগানবাড়ির উদ্দেশ্যে। পাশে চুপচাপ বসে আছে এলিজাবেথ। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে তাকবীরের বলা কথাগুলো। গতকাল এলিজাবেথ চাচার সঙ্গে দেখা করে এসেছে। ভদ্রলোক এখন একদম ভেঙে পড়েছেন। নিজের স্ত্রী, সন্তান এবং এলিজাবেথের পরিণতির জন্য নিজেকে দায়ী করছেন। আর শুয়ে রয়েছে বিছানার সাথে মিশে। চাচার এই অবস্থা দেখে এলিজাবেথ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
‘তাকবীর অনেক চেষ্টা করেও রেশমা মা, ইবরাত, শিহাব বা চাঁচির কোনো খোঁজ পায়নি। সেই হতাশা থেকেই এলিজাবেথ জেদ ধরে বাগানবাড়িতে যাওয়ার। অন্তত দেখে আসতে চায়, তারা সুস্থ আছে কিনা বা আদৌ সেখানে আছে। কিন্তু বাগানবাড়িতে যাওয়া এখন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। রিচার্ড সেখানে অবস্থান করছে, আর তাকবীর এটাও জানে ওকে কখনোই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তাছাড়া আগের মতো হেলিকপ্টারে যাওয়ার সুযোগও নেই। কারণ রিচার্ড সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে অনেক আগেই।

‘তবুও এলিজাবেথের কান্নায় তাকবীরের দৃঢ়তা ভেঙে যায়। তাকবীর বাধ্য হয়ে আরেকটি ফন্দি আঁটে। এলিজাবেথের কানে ব্লুটুথ গুঁজে দিয়ে চুল দিয়ে ঢেকে দেয়, যাতে ভেতরের সবকিছু শুনতে পায়। এতে কোনো বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এই যাত্রায় ঝুঁকি অনেক হলেও তাকবীর জানে, আর এছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এবং সেই জন্যই তাকবীর এলিজাবেথ কে বাগানবাড়ির পেছনের গোপন রাস্তা সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিয়েছে। সেই পথেই বিপদের সময় পালানো সম্ভব। তাকবীরের ধারণা শিহাব হয়ত আর বেঁচে নেই। ওর প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তবে এই কৌশল ইবরাত আর এলিজাবেথের চাঁচিকে বাঁচাতে কাজে আসতে পারে। তাকবীর এলিজাবেথকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, যদি পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকে, তবে কোনো দ্বিধা না করে পেছনের রাস্তায় পালাতে হবে তৎক্ষনাৎ। প্রতিটি মুহূর্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ। আর এই অভিযানের ফল কী হবে তা কারোর জানা নেই।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘তাকবীর গাড়ি থামাল বাগানবাড়ি থেকে কিছু দূরে। এলিজাবেথ তাকাল তাকবীরের দিকে! চোখে ভয়ের মেঘ জমেছে। যতই সাহস দেখানোর চেষ্টা করুক, ভেতরে ভেতরে ভীত। তাকবীর তা স্পষ্টই বুঝতে পারছে। তবে নিজেকে দৃঢ় রাখল, কারণ এই মুহূর্তে নিজেকে শক্ত থাকতে হবে—এলিজাবেথকে ভরসা দেওয়ার জন্য। তাকবীর ঠোঁট চেপে মৃদু হাসল! সব ঠিক আছে বোঝায়। এলিজাবেথও জোর করে হাসি ফিরিয়ে দিল। অতঃপর তাকবীর শেষবারের মতো আবারও সতর্কবার্তাগুলো জানিয়ে দিল।
“এলোকেশী, ভালো করে শোনো। কোনো বিপদের আভাস পেলেই খুব মৃদু শব্দে টিং বলবে, বুঝলে? আমি সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে ঢুকব। তোমার কিছু হতে দেব না। ডু ইউ হিয়ার মি?”
‘তাকবীরের কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকলেও চোখে লুকানো উদ্বেগ। এলিজাবেথ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। যদিও হাতের কাঁপুনি থামেনি। গাড়ি থেকে নেমে এলিজাবেথ ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল। এলিজাবেথের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে তাকবীরের বুকের ভেতর চাপা অশান্তি আরও বেড়ে উঠছে। একদৃষ্টিতে তাকবীর চেয়ে রইল এলিজাবেথের পথচলার দিকে,প্রতিটি মুহূর্তে চোখে রাখলেই যেন নিরাপদ থাকবে এলিজাবেথ। কিছু দূর গিয়ে হঠাৎ এলিজাবেথ চকিতে পেছন ফিরে তাকাল। তাকিয়েই মুচকি হাসল। দুষ্টামি করে কাঁধ উঁচিয়ে নাচিয়ে কয়েকবার টিং, টিং শব্দ করেে। পরিবেশের অস্বস্তি ভেঙে তাকবীর ফিক করে হেসে উঠল তাকবীর। এক ঝলক হাসির আভা মুহূর্তের জন্য দু’জনের ভেতর চাপা আতঙ্কের দেয়াল ভেঙে দেয়।

‘বাগানবাড়ির প্রধান ফটকে পা রাখতেই এক দমকা হাওয়া এলিজাবেথকে ছুঁয়ে গেল। এলিজাবেথ গভীরভাবে কয়েকবার নিশ্বাস নিল, বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়কে সামলানোর চেষ্টা করে ধীর পায়ে এগোতে লাগল সামনের দিকে। আশ্চর্যজনকভাবে, কোনো গার্ড আটকানোর চেষ্টা করল না। এলিজাবেথ তেরছা দৃষ্টিতে আশপাশে নজর বুলিয়ে দেখল। ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত গার্ডগুলো মাথা নিচু করে আছ! অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মগ্ন। হঠাৎ এলিজাবেথের চোখ স্থির হয়ে গেল এক গার্ডের উপর। লোকটাকে সে চিনতেও পারল। এটাই সেই ব্যক্তি সেদিন হসপিটালে ওর দিকে বন্দুক তুলেছিল। লোকটির হাতে মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা আর কনুইয়ের পরের অংশটা পুরোপুরি নেই। দৃশ্যটা এলিজাবেথের শরীরে কাঁটা ধরিয়ে দেয়। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল সেদিকে থেকে। ভেতরের শীতল শিহরণকে উপেক্ষা করে পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চললো সামনের অনিশ্চয়তার দিকে।
‘রিচার্ড, ন্যাসো, আর লুকাস বসে তাদের কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। রিচার্ডের কাঁধের ব্যান্ডেজ খুলে ফেলা হয়েছে, যদিও ওর চলাফেরায় খানিকটা সংযত রাখতে বলেছে ডক্টর, তবে কে ধারধারে। কালো টাউজার আর ওভারসাইজ টি-শার্ট পরা রিচার্ডের মুখভঙ্গি ছিল অত্যন্ত গম্ভীর। আলোচনার এক ফাঁকে হঠাৎ লুকাসের দৃষ্টি সামনে পড়ে। মুহূর্তেই ভ্রুদ্বয় কুঁচকে যায় চোখে ভেসে ওঠে স্পষ্ট বিস্ময়।
“আরে ডাস্টবিন কুমারী।”

‘রিচার্ড ও ন্যাসো লুকাসের কথায় বিরক্ততা নিয়ে সামনে তাকায়। পরিবেশে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নেমে আসে৷ এলিজাবেথ কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিচার্ডের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ। চোখজোড়া কিঞ্চিৎ ছোট করে একগুঁয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এলিজাবেথের দিকে ৷ এলিজাবেথ রিচার্ডের অনড় দৃষ্টি দেখে আরও বেশি আইঁটাই করতে থাকে। এলিজাবেথের পরনে ছিল বেজ-ব্লু রঙের হুডি আর হুডটা মাথার উপর টানা ছিল গলার দু’পাশ দিয়ে লালচুলো বুকে বিছিয়ে। নিচ অংশে ছিল সাধারণ কালো লেগিংস। পোশাকের সহজ সরলতা আর এলিজাবেথের ভঙ্গিতে মিশে থাকা দ্বিধা ওকে আরও অনন্য করে তুলেছে। একরাশ ঘোর গ্রাস করে নেয় রিচার্ডের সমুদ্র নীল চোখ সকাল সকাল। দম টানলো এলিজাবেথ। লুকাসের দিকে চেয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,

“আমার চাঁচি আর বোন কোথায়?”
“আমার কোলে, এই-যে দেখো দু’জনকে নিয়েই বসে আছি।”
‘লুকাসেরও ঝাঁঝালো স্বর। পাশে ন্যাসো ঠৌঁট কামড়ে হাসল। তবে রিচার্ডের দৃষ্টি ছিল অনড়,একগুঁয়ে। এলিজাবেথ দরজার সামনে থেকে ভিতরে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। গলার তেজ বাড়িয়ে বলল,
“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।”
‘লুকাস ঠৌঁট উল্টে বলে,”উল্টাপাল্টা বললাম কখন? যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর। এমন দু’টো আস্ত ষাঁড়ের মতো মহিলাকে কি সকাল সকাল আমি কোলে নিয়ে বসে থাকব?আমাকে এসে জিজ্ঞেস করছো যে, আজব৷”
‘এলিজাবেথের চোয়াল ফাঁক হয়ে যায়। কিছু বলতে যাবে তখনই শোনা যায় পাশ থেকে ন্যাসোর চাপা স্বর,
“উমম, লোকা রেসপেক্ট।”

‘তেরছা নজরে ন্যাসোর দিকে চেয়ে লুকাস কপাল কুঁচকালো। এলিজাবেথ আবারও ঝাঁকালো স্বরে চেঁচাল,
“আমার ভাই-বোন কোথায়? কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন ওদের। রেশমা মা, রেশমা মা।”
‘এলিজাবেথ কিচেনের দিকে চেয়ে চেঁচাতে থাকে৷ এলিজাবেথের স্বরে প্রতিটা কোণে পৌঁছে যায়, পৌঁছে যায় ভিতরে, কিচেনে। সবিতা বেগম রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। এলিজাবেথ’কে দেখা মাত্র প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠে তার ভিতরে৷ তেড়ে গেল এলিজাবেথের দিকে। চাঁচিকে দেখামাত্র এলিজাবেথের চোখ ঝলঝল করে উঠল।

“চাঁচি।”
‘কতোটা আবেগে ডাকল এলিজাবেথ, তবে তার বিপরীতে সবিতা বেগমের বিশ্রি ভাষা।
“আমার জীবন নষ্ট করে তোর হয়নি, আবারও এসেছিস ডাইনি।”
“চাঁচি তুমি এসব কি বলছ?”
‘এলিজাবেথ এগিয়ে যাচ্ছিল সবিতা বেগমের কাছে। তার আগেই সবিতা বেগম হাত উঁচিয়ে বাঁধা দেয়,
“একদম আমাকে ছুঁবি না নষ্ট মেয়ে কোথাকার। এতোদিন তোর নতুন নাগরের সাথে শুয়ে এখন আবার এখানে এসেছিস আমাদের জীবন ধ্বংস করার জন্য।”
“উমহু, চাঁচি জানের মায়া করুন। এখনো নাতিনাতনির মুখ দেখেননি।”
‘রিচার্ড এতক্ষণ নীরবে এলিজাবেথের দিকে চেয়ে ছিল, দৃষ্টি ছিল ভারী, পরখ করা। অবশেষে রিচার্ডের গম্ভীর কণ্ঠে নিরব হুমকি ছুঁড়ে দিল সকলের মাঝে। কণ্ঠ আর অভিব্যক্তি এতোই গম্ভীর ছিল যে চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুলে। এলিজাবেথ থমকে দাঁড়াল। চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল! গলায় অজান্তেই বাষ্প জমল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“এসব তুমি কী বলছো, চাঁচি? আমি কী করেছি?”

‘কণ্ঠে তীব্র যন্ত্রণা থাকলেও নিজের নীরব প্রশ্নের উত্তর জানার সাহসও হারিয়ে ফেলেছে সে। সবিতা বেগম আর চাপা ক্ষোভ ধরে রাখতে পারলেন না। ক্রোধে অন্ধ হয়ে তেড়ে গেল এলিজাবেথের দিকে চুলের মুঠি ধরার জন্য। কিন্তু তার আগেই রিচার্ড ঝাঁপিয়ে পড়া বাঁশপাখির মতো এলিজাবেথের সামনে এসে ওকে আড়াল করে দাঁড়ায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে ক্ষিপ্ত সবিতাকে শক্ত ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিল।
রিচার্ডের চোখে পৈশাচিক আগুন। সাইকো মস্তিষ্ক ন্যাসোর দিকে চেয়ে ভয়ংকর হুংকার দিল,
“ন্যাসো, সামলাও তোমার শ্বাশুড়িকে! আমি কিন্তু ভুলে যাবো তিনি একজন মহিলা আর, তার বয়স।”
‘অতঃপর রিচার্ড গর্জন তুলে গ্রীবা বাঁকিয়ে নিচে পড়ে থাকা সবিতা বেগমের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত পিষে, ঠান্ডা অথচ হিংস্র স্বরে বলতে থাকে,

“চাঁচি, আমি মানুষটা কিন্তু একদমই ভালো না। আর নিজের জিনিসের ব্যাপারে খুবই অ্যাগ্রেসিভ। একটা পা তো কবরে চলেই গিয়েছে, দ্বিতীয়টাও নামানোর বন্দোবস্ত আমাকেই করতে হবে নাকি?”
‘ঘরের বাতাসে থমথমে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। এলিজাবেথ পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁপছিল। ন্যাসো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। রিচার্ডের সেই হিংস্র রূপ ওর শক্ত স্তম্ব কেও স্থবির করে দেয়। ন্যাসো দ্রুত মেড ডেকে সবিতা বেগম কে নিয়ে যেতে বলল। তাৎক্ষণিকভাবে সবিতা বেগম কে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। রিচার্ড এবার এক ঝটকায় এলিজাবেথের দিকে ঘুরল। এলিজাবেথের চোখে জল গভীর কষ্টের। হঠাৎ রিচার্ড এলিজাবেথের গালে হাত রাখল৷ এই স্পর্শে বিদ্যুৎ চমকের মতো এলিজাবেথ’কে কাঁপিয়ে দিল। রিচার্ড ধীরে ধীরে ওর মুখ একদম এলিজাবেথের কাছে নিল। হিসহিসিয়ে বলল,

“ডোন্ট প্লে উইথ মি, ডার্লিং, কজ ইউ ওয়ন্ট লাইক দ্য ওয়ে প্লে ব্যাক।”
‘এমন বলেই এলিজাবেথের কান থেকে ব্লুটুথটি খুলে এক ঝটকায় পায়ের নিচে ফেলে পিষে দিল। এলিজাবেথ হতবাক রিচার্ডের কৌশল আর কূটবুদ্ধিত দেখে। অন্যদিকে তাকবীর ক্রোধে ভেঙে পড়ে স্টিয়ারিংয়ে বারবার আঘাত করতে করতে থাকে ওপাশ থেকে কোনো কিছু শুনতে না পেয়ে। এলিজাবেথ কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিচার্ডের দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। এবার রিচার্ডের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন নজরে পড়ল। বাম ভ্রুর পাশে একটি ফুঁটো, তাতে আইব্রো পিয়ার্সিং,চুলের রঙ ও কালো থেকে ব্রাউন হয়ে গেছে। এতে যেন সৌন্দর্য আরো রহস্যময়, আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে রিচার্ডের। কিন্তু এলিজাবেথের কিছুটা অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো। কি যেন সাদৃশ্য রয়েছে এই পরিবর্তনে। এলিজাবেথ ভাবতে থাকে এই পরিবর্তন কি তবে সেদিন রাতের গাড়ির ঘটনার রেশ ধরেই ? ভাবতেই গাঁ শিউরে উঠল। কাঁপা কাঁপা শ্বাস নিয়ে এলিজাবেথ মনে মনে ফাঁকা ঢোক গিলল।

“এলিজাবেথ।”
‘চিৎকার চেঁচামেচিতে ইবরাত রুম থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ রিচার্ডের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে চুপসে গেলেও এলিজাবেথকে দেখে চোখ ঝলঝল করে উঠল। ন্যাসো আগেই ইবরাতকে রিচার্ড থাকলে রুম থেকে বেরোতে নিষেধ করেছিল। তবে ইবরাত তা কানে তোলেনি আজ। এলিজাবেথের চোখ মুহূর্তের জন্য সামনে তাকাতেই ভেতরটা শান্ত হয়ে যায়। ইবরাতের মুখ দেখে জানান পায়,সব কিছু ঠিক আছে। এলিজাবেথের চোখে অজানা এক প্রশান্তি ফিরে এল। দ্রুত গিয়ে ইবরাতের মুখে হাত বুলিয়ে আদরের স্বরে বলল,
“বোন তুই ঠিক আছিস তো?”
‘ইবরাতের মধ্যে এক ধাক্কা অনুভব হলো। এলিজাবেথের এই কোমলতা এত কিছু হওয়ার পরও, ইবরাতের মনকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলল। কাঁপতে কাঁপতে ইবরাত এলিজাবেথের হাত ধরল। ওর গলা কাঁপছিল! সেই কাঁপনে একপ্রকার মিনতি ছিল,
“আমি ঠিক আছি। তুই ফিরে এসেছিস এলিজাবেথ? দেখ আমি কতবার বলেছি উনাকে তোর কাছে নিয়ে যেতে আমি তোর কাছে মাফ চাইবো। কিন্তু উনি আমাকে নেয়নি। আমাকে ক্ষমা করে দে এলিজাবেথ। আমি অনেক অন্যায় করেছি তোর সঙ্গে।”
‘এলিজাবেথ ইবরাতের দিকে বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে বলল,”উনাকে মানে?”
‘এলিজাবেথের চোখে অবিশ্বাস এবং ইবরাতের মধ্যে এক অদ্ভুত লজ্জার ছাপ দেখা দেয়। ইবরাতের চেহারা লাল হয়ে উঠে! আড় চোখে ন্যাসোর দিকে তাকাল। এলিজাবেথ চমকে উঠে ওর চোখ যখন পড়ল ইবরাতের হাতের সোনালি চুড়ি দু’টোতে। সমস্ত শরীর কেঁপে উঠে দু’কদম পিছিয়ে গেল সে। হতভম্ব এলিজাবেথ আবারও এক পা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“বোন আমার কাছে পরিষ্কার করে বল, এখানে কি হচ্ছে?”
‘ইবরাত লাজুক হেসে অযথা কপালের চুল কানে গুঁজে দিয়ে বলল, “আমি বিয়ে করেছি এলিজাবেথ।”
‘আঁতকে উঠে এলিজাবেথ। গলায় মুহূর্তেই যেন দলা পাকিয়ে এল। আধভাঙা স্বরে প্রশ্ন করল,”কাকে?”
‘ইবরাত নিশপিশ করতে থাকে! কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল নত দৃষ্টি নিবিষ্ট করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার ন্যাসো গম্ভীর, শান্ত স্বরে বলল,
“আমরা বিয়ে করেছি ম্যাম।”
‘এলিজাবেথের চোখে বিস্ময়ের ছায়া। ঠোঁট থেকে ছিটকে এলো, “আমরা মানে?”
“আমি আর ইবরাত।”
‘এলিজাবেথের মাথা ঘূর্ণায়মান হয়ে গেল। ইবরাতের কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “এটা তুই কি করলি বোন?”
‘ইবরাত কেঁপে উঠে। ভীত চোখে তাকাল ন্যাসোর দিকে। ন্যাসো শান্ত দৃষ্টিতে ওকে আশ্বাস দিল। এলিজাবেথ সেই দৃশ্য দেখে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে রিচার্ডের দিকে ছুটে গেল। রিচার্ডের বুকের উপর ধাক্কা মেরে চিৎকার করে বলল, “আমার জীবন ধ্বংস করে তৃপ্তি পাননি? এখন নিজের লোক দিয়ে আমার বোনের জীবনও নষ্ট করে দিলেন? জানো°য়ার একটা!”

‘রিচার্ডের ভেতর ক্রোধ তিরতির করে ফুঁসছে মাথা ঠাণ্ডা রাখার সিদ্ধান্ত নিল আজ। কারণ এই মুহূর্তে ইবরাত ন্যাসোর স্ত্রী। আর স্বামী হিসেবে ন্যাসোই তার দায়িত্ব পালন করবে। রিচার্ড কখনোই অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক না। এদিকে এলিজাবেথ ব্যথা আর ক্ষোভে আহাজারি করতে থাকে। তখনই শোনা গেল ন্যাসোর দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ,
“ধ্বংস করিনি ম্যাম। তিন কবুল পাঠের মাধ্যমে ওকে আমার অর্ধাঙ্গিনী করেছি। আমার স্ত্রীই আমার সব।”
‘এলিজাবেথের ক্রোধ এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। রিচার্ডের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল ন্যাসোর শক্ত বাঁধনে থাকা ইবরাতের দিকে। ইবরাত একদম ন্যাসোর বাহুতেই মিশে রয়েছে। এলিজাবেথ এবার ন্যাসোর উপর চিৎকার করল,
“ঠঁকিয়ে বিয়ে করেছেন আপনি আমার বোনকে! ভুলে গেছেন আমাদের ধর্ম আলাদা?”

“উনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এলিজাবেথ। আর রিদ ভাইয়া নিজে দাঁড়িয়ে আমাদের বিয়ে পড়িয়েছে মসজিদে।”
‘ইবরাতের কথায় এলিজাবেথের তীব্র ক্রোধ আর তেজ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। সে স্তব্ধতায় গেয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু রিচার্ডের ক্রোধ অন্য উচ্চতায় পৌঁছাল। তীক্ষ্ণ, আগুনে মাখা চোখ ন্যাসোর দিকে গেল। ন্যাসো থতমত খেয়ে যায়। ইবরাত রিচার্ডের পুরো নাম বলতে পারে না, ওর কাছে খুব কঠিন লাগে। তাই ন্যাসো “রিদ” নামটা ব্যবহার করতে বলেছিল ইবরাতকে। কিন্তু ইবরাত যে আজ ময়দানে গুপ্ত খবর এভাবে ফাঁস করে দিবে তা কে জানত? এদিকে এতক্ষণ নীরব দর্শক লুকাস পরিস্থিতি সামান্য শান্ত হতে দেখে সুযোগ কাজে লাগাল। রিচার্ডের কানের পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বস আমার কিন্তু একটু ভালোই হলো। নিজ দেশে মেয়ে পছন্দ করে। বাঙালি মেয়েরা খুব ঝগড়াটে। আপনার আর ন্যাসোর জন্য আমার এক বুক সমবেদনা।”

‘রিচার্ড ক্রোধে অগ্নিমুখ হয়ে তাকাতেই লুকাসের সাহসী ভান মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। রিচার্ড এবার ন্যাসোর দিকে চেয়ে ইবরাতের উদ্দেশ্য বলল,
“ইবরাত ওকে উপরে নিয়ে যাও৷ আমরা খয়রাতী না! না খাইয়ে কাউকে যেতে দিই না।”
‘সকলে হতভম্ব। লুকাস তৎক্ষনাৎ সোফায় গিয়ে দু’হাতে মুখে চেপে বসল। এখন হাসা মানেই ওর পিঠে ঢোল বাজা। ইবরাত ঠৌঁট কামড়ে হেসে এলিজাবেথের দিকে এলিয়ে গেলে ছিটকে দূরে সরে যায় এলিজাবেথ।
“কোথায়ও যাবো না আমি।”
“এলিজাবেথ বোন প্লিজ চল। কতোদিন পর তোর সাথে দেখা হলো।”
“আমি যাবো না বললাম তো। ইবরাত ছাড় আমাকে।”

‘এলিজাবেথ মোচড়ামুচড়ি করে দরজার দিকে যেতে চাইলে শোনা গেল রিচার্ডের ভারিক্কি কণ্ঠস্বর,
“আর এক পা এগোলে সোজা উপরের রুমে নিয়ে দরজা আটকাব আমি। আর তারপর এমন কিছু হবে, যে মেঝেতে পা রাখার শক্তি অব্ধি থাকবে না তোমার শরীরে৷”
‘রিচার্ডের চাপা হুমকি শুনে এলিজাবেথ ভিতরে ভেতরে চুপসে যায়। ওর নিজেরও অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার আছে। তাই আর কিছু না বলে ইবরাতের হাত ধরে উপরের দিকে যেতে থাকল। ন্যাসো বরাবরই চতুর। রিচার্ডের কথার রেশ ধরে ইবরাতের দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে এক ধরনের ইঙ্গিত দিল। সঙ্গে সঙ্গে ইবরাতের পেটের ভেতর একঝাঁক প্রজাপতি উড়াল দিল। মেকি রাগ দেখিয়ে ইবরাত চোখ রাঙিয়ে ন্যাসোর দিকে তাকাল! কিন্তু সেই চাহনি খুব বেশি সময় ধরে রাখতে পারল না ইবরাত। লাজুক ভান করে এলিজাবেথের পিছু পিছু উপরে চলে গেল। সেই লাজুক ভানের মানে এটাই বুঝানো হলো_”যা দুষ্টু, বাকি কথা রাতে।”

“তুই আমাকে এই রুমে নিয়ে এসেছিস কেন?”
‘এলিজাবেথ রিচার্ডের রুমে যেতেই ঝাড়া মেরে ইবরাতের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। ইবরাত বাচ্চাদের মতো বোলা ভালা মুখ বানিয়ে বলল,
“ভাইয়ার জিনিস ওনার রুম ব্যতিত অন্য কোথাও নিলে রাগ করে।”
“কিহ! তুই কি আমাকে ঐ অসভ্য লোকটার জিনিস ভেবেছিস?”
‘এলিজাবেথ রাগে উন্মত্ত হয়ে রিচার্ডের রুমের জিনিসপত্র তছনছ করতে লাগল। কেবিনেটে রাখা সব জামাকাপড় ছুড়ে ছুড়ে মেঝেতে ফেলে দিতে থাকে। ইবরাত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে দেখছিল শুধু। এলিজাবেথের এই রূপ আগে কখনও দেখেনি। অবশেষে ইবরাত এগিয়ে এসে এলিজাবেথের হাত চেপে ধরল। অবাক স্বরে বলল,
“এলিজাবেথ তোর এই রাগ এতদিন কোথায় ছিল?”
‘এলিজাবেথ ঘনঘন নিশ্বাস নিতে নিতে বলল,
“পরিস্থিতি বাধ্য করছে ইবরাত। দিন দিন ভিতরের সব চাপা তেজগুলো জেগে উঠছে। আর চুপ থাকতে পারছি না আমি।”

‘ইবরাত এলিজাবেথের উত্তেজনা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “বোন শান্ত হো। আয় এখানে বস।”
‘এলিজাবেথকে টেনে বেডে বসাল ইবরাত। বসতেই এলিজাবেথ ইবরাতের মুখ দু’হাতের আজলায় আলতো করে চেপে ধরে উত্তেজিত হয়ে বলল,“বোন সত্যি করে বল ওরা তোকে জোর করেনি তো?”
‘ইবরাত হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল, “আরে না উল্টো আমি ওনাকে জোর করেছি।”
“মানে?”
“মানে, লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ছিল আমার। অনেক সাধনার পর পটাতে পেরেছি।”
‘এলিজাবেথ চোখ কুঁচকে বলল, “ওনাকে পেলি কোথায়?”
‘ইবরাত গর্বিত হাসি হেসে বলে, “শখের বেডারা সহজে ধরা দেয় না বুঝলি। কথায় আছে না শখের বেডার হে’ডাম বেশি। তবে আমি ঠিক ওনাকে আমার করে নিতে পেরেছি! আলহামদুলিল্লাহ !”
“মানে কি আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
‘ইবরাত হেসে শুরু থেকে সব বলতে শুরু করল এলিজাবেথকে।

‘ইতালি থেকে ফেরার পরপরই ন্যাসো ধর্ম ত্যাগ করে ইবরাতকে বিয়ে করে। সেই আজাব থেকে ইবরাত মুক্তি পায়, কারণ ইবরাত নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছিল। নিজে গিয়ে রিচার্ডের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল। তবে সবিতা বেগম নিজের সিদ্ধান্তে এখনও অটল। শিহাবের মৃত্যুর খবর এখনো কেউ জানে না, কিন্তু সবিতা বেগম মনে করেন রিচার্ড শিহাবকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে এলিজাবেথের জন্য। এই ভুল ধারণার কারণে সবিতা বেগমের রাগ এখনো এলিজাবেথের উপর। তার ফলস্বরূপই সবিতা বেগম এই বাসায় কাজের বুয়ার মতো জীবন কাটাচ্ছে। আপাতত সবিতা বেগম ছাড়া বাড়িতে কোনো গৃহপরিচারিকা নেই। রিচার্ড ইচ্ছাকৃতভাবেই তাকে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করাচ্ছে এবং অপমান করে যাচ্ছে।

‘সবিতা বেগম এখনো ইবরাতের বিয়ে মেনে নেয়নি। অভিমানে মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ইবরাত মায়ের অভিমান ভাঙানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, নানান ভাবে তার ভুল ধরিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু কোনোভাবেই তাকে বুঝাতে পারেনি। মায়ের কষ্ট দেখে ইবরাতের বুক ফেটে যায়, তবু কিছুই করার ক্ষমতা নেই ওর। রিচার্ডের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারোর নেই, এমনকি ন্যাসোও ইবরাতকে কোনো সমর্থন দেয় না এই ব্যাপারে। শেষমেশ মায়ের কথা বলতে গিয়ে ইবরাত অঝোরে কেঁদে ফেলল। এলিজাবেথ ওকে বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়।
“শান্ত হো বোন। আমার তোদের কারোর উপর কোনো রাগ নেই। তুই যে তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস সেটাই অনেক। চাঁচিও একদিন বুঝতে পারবে।”

_থেমে, এলিজাবেথ ইবরাতকে বুক থেকে তুলে সর্দপে প্রশ্ন ছুড়ল,”সত্যি করে বল তো তুই কি সুখি?”
‘ইবরাত চোখে পানি সমেত হাসল, “হ্যাঁ, আমি অনেক সুখি রে। অনেক সাধনার পর ওনাকে পেলেও অনেক ভাগ্য করে পেয়েছি। আমার অনেক যত্ন নেয়। বাইরের উনি আর ঘরের উনির সাথে অনেক পার্থক্য আছে এলিজাবেথ।”
‘স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এলিজাবেথ, পরপর আবারও অস্থির হয়ে উঠল। ইবরাতে হাত ধরে উৎকণ্ঠা ঠাঁসা কণ্ঠে বলল,
“রেশমা মা কোথায় জানিস?ওনাকে তো দেখলাম না।”
“কে উনি? আমি তো ওনাকে চিনি না।”
“তুই এ বাড়িতে আসার পর উনাকে দেখিসনি?”
‘ইবরাত মাথা নাড়িয়ে বলল,”না।”
‘এলিজাবেথের মন বিষন্নতায় চুপসে গেল। চোখবুঁজে সৃষ্টিকর্তার কাছে পার্থনা করতে থাকল,” আল্লাহ এই শয়তান যেন রেশমা মার কোনো ক্ষতি না করে।”
“এলিজাবেথ ভাইয়া কিন্তু তোকে মন থেকেই চাই।”
‘চোখ খুলল এলিজাবেথ। ইবরাতের কথার বিপরীতে তাচ্ছিল্যের স্বরে হাসি দিয়ে বলল,”তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস বোন?”

‘ইবরাত এলিজাবেথের একহাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“আমি সত্যি বলছি বিশ্বাস কর। দেখ সবার ভালোবাসার ধরন এক রকম হয় না। কেউ হয়তো সহজে প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভালোবাসা নেই। ভাইয়া আসলেই তোকে চায়। এখানে আমি পাঁচদিন ধরে আছি। এর মধ্যে একবারও ভাইয়া আমার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। তুই নিজেই দেখ ভাইয়া তার রুমে কাউকে আসতে দেয় না, তার জিনিস ধরতে দেয় না। শুধু তোকে এলাউ করে। এলিজাবেথ একটু বুঝতে চেষ্টা কর। মানুষ তার প্রিয় জিনিসের ভাগ কেবল প্রিয়জনের সঙ্গেই করে।”
‘এলিজাবেথ উঠে দাঁড়াল! অধর এলিয়ে বাঁকা হাসল, বিদ্রুপ করে বলে,” প্রিয় জিনিসের ভাগাভাগি নাহ? হাহহ!!
‘এলিজাবেথ আশেপাশে কিছু খুঁজে বের করার জন্য চোখ ঘোরাল। হঠাৎ নজর গেল রিচার্ডের বেডের পাশের মদের বোতলে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সেটি হাতে তুলে নিল সে। ইবরাত কপাল কুঁচকে এলিজাবেথের অদ্ভুত গতিবিধি লক্ষ করছিল। কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল তাতে সে হতবাক। এলিজাবেথ মদের বোতলটি তুলে সোজা ছুড়ে মারল দেয়ালে ঝোলানো ড্রাগনের পেইন্টিংয়ে। প্রচণ্ড শব্দে কাচ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ইবরাত ভয় পেয়ে দু’হাতে কান চেপে ধরে। নীচ থেকে রিচার্ড, ন্যাসো, আর লুকাস দৌঁড়ে উপরে আসে। পেইন্টিংয়ের ভাঙা কাচ দেখে রিচার্ড থমকে দাঁড়ায়। শিরদাঁড়া সোজা হয়ে দু’চোখে ঝলসে উঠল লেলিহান আগুন। রিচার্ড পুরো রুম কাঁপিয়ে গর্জে উঠে,
“আমার রুচির বাইরে একটা টিস্যুও আমার আবাস্থলে আসে না। অন্য কাউকে ছোঁয়ার অনুমতি দেওয়া তো দূরের কথা! কে ভেঙেছে এই পেইন্টিং?”

‘ইবরাত ভয়ে একদম চুপসে গেল। মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল,”এলিজাবেথ।”
‘রিচার্ডের চোখ মুহূর্তেই বাঁকিয়ে গেল এলিজাবেথের দিকে। চোখের আগুনে দৃষ্টি ধীরে ধীরে নরম হলো। খানিকটা থেমে গলা খাঁকারি দিয়ে কাইকুই করে ধরাশায়ী আওয়াজে বলল,
“ঠিক আছে। আরেকটা আনিয়ে নেব।”
‘সকলের সাথে সাথে এলিজাবেথও অবাক। একটু আগে ইবরাতের বলা কথাগুলো মনের মাঝে পাক খেতেই বুক শুকিয়ে এল। ন্যাসো, লুকাস আড়াআড়িভাবে একে-অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে। রিচার্ড ইবরাতের উদ্দেশ্য জলদগম্ভীর গলায় বলল,
“আই নীড সাম প্রাইভেট স্পেস।”
‘ইবরাত ন্যাসোর দিকে তাকালে ন্যাসো চোখে ইশারা করল বেরিয়ে আসতে। ইবরাত একপলক এলিজাবেথের দিকে তাকাল। এলিজাবেথ স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। ইবরাত দৃঢ় পায়ে রিচার্ডের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে যেতেই রিচার্ড এলিজাবেথের উপর দৃষ্টি রেখেই নিরেট ঠান্ডা স্বরে বলল,
“ইবরাত দরজাটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিয়ে যাও। এখন কিছু অপ্রীতিকর সাউন্ড হতে পারে, যা বাইরে যাওয়া একদমই ঠিক হবে না।”

‘ইবরাত অবাক হয়ে যায়, তবে বিপরীতে কিছু বলার সাহস তার নেই। রিচার্ড যা বলল তাই করল। দরজা লাগানোর শব্দে এলিজাবেথ হতচেতন হয়ে ফিরে। রিচার্ডের ঘোর লাগা দৃষ্টি দেখামাত্র বুকের ভিতর তীব্র চাপ অনুভব হল। রিচার্ড ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে এক পা এক পা করে এলিজাবেথের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এলিজাবেথ ভয়ে আশপাশে তাকাতে থাকে। ট্যারেসের দিকে চোখ যেতেই দেখতে পেল গ্লাসটি খোলা। এলিজাবেথ দ্রুত সেদিকে ছুটে যায়।ওপাশে গিয়ে ট্যারেসের গ্লাস বন্ধ করে গ্লাসটি লক করে দেয়। এলিজাবেথের এই আচরণে রিচার্ডের ঠৌঁটে বক্র হাসি খেলে গেল। বোকা এলিজাবেথ জানেও না চাবি রিচার্ডের কাছেই আছে। তবুও রিচার্ড তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। তর্জনী আর মধ্যমা আঙুল ভেঙে গ্লাসে টকটক শব্দ তুলে, ভারী হাস্কি স্বরে ডাকল,
“কম অন ডার্লিং, ওপেন দ্য ডোর বেবিগার্ল”

‘এলিজাবেথ দরজা খুলে না। বরং ভয়ে আরো পিছিয়ে যেতে থাকে। রিচার্ড রাগ প্রকাশ না করে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বেডসাইড কেবিনেট থেকে চাবি নিয়ে আসে। রিচার্ডের হাতে চাবি দেখতেই এলিজাবেথের অবয়ব অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আরো পিছিয়ে যেতে থাকে। রিচার্ড লক খুলে ট্যারেসে পা রাl। ওর পদধূলি এলিজাবেথের বুকের ভিতর ঝড় তুলল। পিছাতে পিছাতে পিঠ গিয়ে রেলিঙের সাথে ঠেকলে আরও ভয় পেয়ে যায় এলিজাবেথ। নিচ থেকে কিছু বডিগার্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে এলিজাবেথের ঝুলে থাকা লাল চুলের দিকে তাকিয়ে ছিল অবাক চোখে। রিচার্ড এগিয়ে গিয়ে এলিজাবেথের গা ঘেষে দাঁড়াল। ওর শরীরের মাতাল করা পারফিউমের ঘ্রাণ এলিজাবেথকে দুর্বল করে ফেলে মুহুর্তেই। আকস্মিক রিচার্ড দু’হাতে এলিজাবেথের কোমর শক্ত করে চেপে ধরে পা শূন্যে তুলে রেলিঙে বসিয়ে দিল ওকে। রিচার্ড কে দেখামাত্র গার্ডদের কানের পাশ দিয়ে যেন ঠান্ডা এক হাওয়া বয়ে গেল। সকলে দ্রুত তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।

‘রিচার্ডের ঘোরলাগা দৃষ্টিতে এলিজাবেথের গড়নে জবুথবু কাঁপন উঠে। রিচার্ড ওর ভয়ের মাত্রাকে দ্বিগুণ করে দেওয়ার জন্য ওর অর্ধেক শরীর ছেড়ে দিল রেলিঙের বাইরে। শিউরে উঠে অভ্যন্তর। নিচে তাকানোর সাহস পায়না এলিজাবেথ। চোখমুখ কুঁচকে বন্ধ করে রেখেছে। শরীরের ভার নিচের দিকে বেশি থাকার কারণে এলিজাবেথের পেটের উপর অংশের কাপড় সরে যায়। রিচার্ডের দৃষ্টি পরিবর্তন হয়ে শরীরে অদৃশ্য এক ঝাঁক অস্থিরতা ভর করে। ঘন শুকনো ঢোক গিলতে থাকে। হালকা ঝুঁকে ঠোঁট ছোঁয়ালো এলিজাবেথের পেটের মধ্যস্থলে। সাদা দগদগে পাতলা চামড়ার খসখসে ওষ্ঠের ছোঁয়া লাগতেই শরীর জুড়ে বৈদুত্যিক তরঙ্গ খেলে গেল এলিজাবেথের। শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলে খামচে ধরল রিচার্ডের চুল। রিচার্ড দম আঁটকে অধর চেপে ধরে রাখল সেই গভীরতায়। এলিজাবেথ কুঁকড়ে যেতে থাকে। অস্থির ভঙ্গিতে এলোমেলো করে দেয় রিচার্ডের চুল।
‘রিচার্ড সোজা হয়ে দাঁড়াল! এলিজাবেকে সাবধানে কোলে তুলে নিল। এলিজাবেথ এখনও চোখমুখ খিঁচে রেখেছে, নিঃশ্বাস চলছে না ওর। নিচে পড়ে থাকা অযত্নে শুকিয়ে যাওয়া একটি ফুলের টোবের টহনিতে চমকিত হয়ে লুকাস উপরে তাকায় এবং সরাসরি রিচার্ডের চোখে চোখ রাখল। রিচার্ড আগে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিল লুকাসের চোখ কোথাও অন্যদিকে ভ্রষ্ট হয়েছে কিনা। সন্তুষ্টি অনুভব করে রিচার্ড অধক এক কোণে নিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বুঝিয়ে দিল লুকাস কে। অতঃপর এলিজাবেকে কোলে নিয়ে দ্রুত রুমে চলে গেল। রিমোট চেপে সমস্ত পর্দা নামিয়ে নিল। রুমের নিয়ন আলোতে এলিজাবের ভয়াবহ কাঁপানো চোখ দুটি আরও বেশি জ্বলজ্বলে হয়ে উঠে। ঠিক তখনই বিকট শব্দ হলো। কেঁপে উঠে রিচার্ডের শার্ট খামচে ধরে এলিজাবেথ।

“এটা কিসের শব্দ ছিল?”
‘রিচার্ড এলিজাবেথের দিকে নিস্প্রভ দ্বিধাহীন নজরে চেয়ে থেকে নিরেট ঠান্ডা স্বরে বলল,”গুলির।”
”কার উপর গুলি করা হয়েছে?”
‘রিচার্ডের দৃষ্টি ভঙ্গ হয় না। ঘোরলাগা দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নিরুদ্বেগ ভাব নিয়ে বলল,” কিছু গার্ডদের।”
‘কাঁপছে এলিজাবেথের গলা,”কে-কেন?”
‘ রিচার্ড ভণিতাহীন বলে,”আমার জিনিসে চোখ তুলে তাকিয়েছিল।”
‘রিচার্ড আর কিছু না বলে এলিজাবেথকে বেডে শুইয়ে দিয়ে ওর উপর ঝুঁকল খানিকটা। এলিজাবেথ কনুই দিয়ে ঠেলে পিছনে যেতে চাইল। রিচার্ড ওর পা টেনে ওকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। এলিজাবেথের চোখ ঝাঁপিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। রিচার্ড ওর হাত শার্টের বোতামে রাখতেই চোখের কোণে লুকানো এক সূক্ষ্ম আলো, যা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।এই অস্থিরতার মাঝে এলিজাবেথের অনুভূতিটা মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেল শূন্যের অতলে। ক্ষীণ স্বরে বলল,

“আপনি এমনটা করতে পারেন না।”
‘রিচার্ড শার্টের একটা বোতাম খুলেই নিল। অতঃপর আরেকটু ঝুঁকে ওর ঘামে ভেজা নাকের ডগায় নাক ঘষে হিসহিস করে বলল,”আমি সব পারি রেড।”
“আপনি এতো নিকৃষ্ট ছিঃ।”
‘বাঁকা হাসল রিচার্ড। ওর চিবুকে আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে থাকে আর বলল,
“আই’ম ব্যাড বয় মাই ফা’কিং ডার্ক রেড।”
‘আকষ্মিক এলিজাবেথ রিচার্ডকে ধাক্কা দিয়ে বেডে ফেলে ওর পেটের উপর উঠে বসল, হাঁটু ভেঙে রিচার্ডের বাহুর দু’পাশে দিয়ে। রিচার্ড অবাক হলো বটে, তবে তা ওর চেহারায় প্রকাশ পেল না। বাঁকা হেসে দেখতে থাকল এলিজাবেথের কার্যক্রম। এলিজাবেথ হাতের পিঠ দিয়ে ওর চোখের জল মুছে নিল। অতঃপর চঞ্চল হেসে ঝুঁকল রিচার্ডের উপর। মুহূর্তে বদলে গেল কণ্ঠস্বর। নরম তুলতুলে হাত নিয়ে রাখল রিচার্ডের শার্টের বোতামে। ফিসফিস করে বলল,

“লেট মি আনবাটন ফর ইউ।”
‘রিচার্ডের চোখ হাসল এলিজাবেথের কথা। এলিজাবেথ রিচার্ডের শার্টের বোতাম খুলার আগেই রিচার্ড শক্ত হাতে চেপে ধরল এলিজাবেথের কোমর। সুঠাম শক্তপোক্ত হাতে এলিজাবেথের শরীর কিছুটা উপরে তুলে নিয়ে বসাল আরেকটু পিছনে। সঙ্গে সঙ্গে শরীর জমে যায় এলিজাবেথের দন্ডায়মান কিছু অনুভূত হতেই । রিচার্ড এলিজাবেথের অবয়বের হালাত দেখে ঠৌঁট বাঁকিয়ে হাসল। এলিজাবেথের মতোই হিসহিসিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
“দ্যাটস ইউর পজিশন রেড।”
‘সঙ্গে সঙ্গে এলিজাবেথ রিচার্ডের কোমরে গুঁজে রাখা গান বের করে ছিটকে দূরে সরে আসল রিচার্ডের উপর থেকে। গান পয়েন্ট নিয়ে নিল রিচার্ডকে যদিও কাঁপছে হাত। রিচার্ড শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে উঠে সোজা হল। ঠোঁটের আগায় জড়ো হয়েছে রহস্যের ঘনঘটা। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
“রেড কিছু দেখতে পাচ্ছো আমার চোখে?”
‘এলিজাবেথ দুঃসাহসী একটা কাজ করে ফেললেও ভিতরে ভিতরে তটস্থ। রিচার্ডের ঠান্ডা স্বর ওর ভিতরের ভয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাঁপা গলায় বলে,”মানে?”
“কোনো ভয় দেখতে পাচ্ছো আমার চোখে?”
‘এলিজাবেথ নিশ্চুপ। রিচার্ড এবার দাপুটে গলায় চেঁচিয়ে বলল,”আমি মৃত্যুকে ভয় পায় না রেড।”
‘এলিজাবেথের গলা আবারো ভিজে আসল। ওর প্রকম্পিত তর্জনী ট্রিগারে বসিয়ে চিৎকার করে,
“আমার ভাই আর রেশমা মা কোথায়?”
‘রিচার্ডের লাপাত্তা জবাব,”আমি কি করে জানব?”
“মিথ্যা কথা বলবেন না। সত্যি করে বলুন ওরা কোথায়।”
‘রিচার্ড এবার ওর মুখটাকে দুঃখী বানিয়ে বলল,”ছলনা করলে রেড? ছ্যাৎ, মুডটাই নষ্ট হয়ে গেল।”
‘এলিজাবেথ আবারও চেঁচাল, “চালাকি করবেন না আমার সাথে। বলুন ওরা কোথায়।”
‘রিচার্ড এলিজাবেথের প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিচ্ছে না। বরংচ নিজের মতো করে কথা বলে যাচ্ছে,
“আজ ছলনা করলে। একদিন নিজে থেকে এসে বলবে F.M.L.T.W.I.A আই প্রমিজ।”
“মানে?”
“মানে তোমার নাম মাত্র স্বামীর বাড়ি গিয়ে গুগল করে নিও।”
‘ক্রোধে ঠৌঁট কাঁপতে থাকে এলিজাবেথের। বিষাদে ভরা কণ্ঠে বলে,”এসব করে কখনোই আপনি আমাকে পাবেন না। ইউ উইল নেভার ওন মি।”
‘এলিজাবেথের বাক্য শেষ হবার সাথে সাথে রিচার্ড ওর হাত নিচে নামিয়ে কৌশলে হাত থেকে উড়িয়ে এক ঝটকা দিয়ে এলিজাবেথের কনুইতে ধাক্কা লাগাল। সঙ্গে সঙ্গেই গানটি এলিজাবেথের হাত থেকে পড়ে যেতে যাচ্ছিল। তবে রিচার্ড দক্ষতার সঙ্গে সেটা ধরতে সক্ষম হয়। তৎক্ষনাৎ এলিজাবেথকে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে উল্টো করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল শক্ত করে। অতঃপর ওর বাঁকানো কোমরে খামচে ধরে কানের লতিতে ঠৌঁট লাগিয়ে ধরাশায়ী কণ্ঠে শুধালো,
“ড্রেস ডাউন, অ্যাস আপ বেবি”
‘এলিজাবেথের চোয়াল দেয়ালের সাথে চাপ লেগে আছে। কথা স্পষ্ট হয়ে আসসে না। রুষ্ট গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ছা-ছাড়ুন আমাকে।”

‘রিচার্ড আরও শক্ত করে খামচে ধরল এলিজাবেথের কোমর। ওর ঘাড়ে নাক ঘষতে ঘষতে চাপা স্বরে বলে,
“কেয়ারফুল ম্যাডাম। আমি কিন্তু কন্টোল হারাচ্ছি। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কিন্তু আপনি এখনই জ্বলসে যাবেন আমার হাতের প্রতিটি গভীর ছোঁয়ায়।”
‘এলিজাবেথ দমে না, একইভাবে বলে,”আমার লাগছে ছাড়ুন। অমা’নুষ একটা।”
‘রিচার্ড এক মুহূর্তের জন্য এলিজাবেথকে ছেড়ে দিল, কিন্তু পুরোপুরি নয়। পরক্ষণেই ওর কোমরে জড়িয়ে ভ্যানিটির উপর বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চটজলদি ভ্যানিটির উপর থাকা সব জিনিসপত্র কনুই দিয়ে এক ঝটকায় ফেলে দিল রিচার্ড। এলিজাবেথ হতভম্ব হয়ে রিচার্ডের আচরণ লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। রিচার্ডের চোখের গভীর দৃষ্টি তা আবেগ নাকি কিছু অন্যরকম, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না সে। হঠাৎ অতর্কিত কাজে চমকে গেল। রিচার্ড ওকে ভ্যানিটির উপর এক চাপে শুইয়ে দিল। তাৎক্ষনিকভাবে ওর দু-হাত নিজের একহাতে মুষ্টিবদ্ধ করে মাথার উপর চেপে ধরল। রিচার্ড তন্নতন্ন করে ওর পকেটে কিছু খুঁজতে থাকে। একটু খিঁজলানোর পরই পকেট থেকে বেরিয়ে এলো দু’টো ছোট সাইজের ছু’রি।

‘চমকে যায় এলিজাবেথ ছু’রি দেখে। এতোক্ষণের তেজ নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। এলিজাবেথ কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিচার্ড ছু’রি দু’টো ভ্যানিটির উপর রেখে ভ্যানিটির ড্রয়ার থেকে কস্টিপ বের করে খুবই ফোর্সলি এলিজাবেথের মুখে লাগিয়ে দিল। ছটফট করতে থাকে এলিজাবেথ গোঙানির স্বরে। রিচার্ডের সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। সে এলিজাবেথের উপর অনড়ভাবে ঝুঁকে থাকা অবস্থায়ই ছু’রি দু’টো এলিজাবেথের মাথার দু’পাশে ভ্যানিটিতে শক্তি প্রয়োগ করে বসিয়ে দিল। ভ্যানিটির উপরের অংশ ছিল চন্দন কাঠের। তাই একদম এটেঁ বসে যায় ছু’রি দু’টো। এবার রিচার্ড করল সবথেকে ভয়ংকর কাজ। এলিজাবেথের হাত ছেড়ে দিয়ে রাখল ছু’রির সামনে। এলিজাবেথ যদি ছটফট করে বা নড়াচড়া করে উঠতে চায় তবে ছু’রিটি সরাসরি এলিজাবেথের হাতের র’গ কেটে বেরুবে। এলিজাবেথ ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেই আতঙ্কে ছেয়ে যায় ওর চোখজোড়া। নড়াচোড়া বন্ধ হয়ে গেল আপনাআপনি। আর্তনাদ করতে থাকে শুধু। রিচার্ডের মাঝে যেন এক পশুরি আত্মা ভর করছে। সোজা হয়ে একটানে খুলে ফেলল এলিজাবেথের হুডির চেইন পুরোটা। উন্মুক্ত করে দিল ওর সম্পূর্ণ। বুক ফেঁটে কান্না আসছে এলিজাবেথের পূর্বের কথা মনে হতেই। রিচার্ড আবারও একগুঁয়ে দৃষ্টিতে চেয়ে ঝুঁকল ক্রন্দরত এলিজাবেথের উপর। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল,

“এখন দেখবে আমি মানুষ না অমা’নুষ। কারণ এখন আমি যা করব তা কোনো অমা’নুষ করতে পারে না।”
‘এলিজাবেথ অনবরত মাথা নাড়াতে থাকে। তবে কোনো কিছু পাত্তা দেয় না রিচার্ড। গলায় মুখ গুঁজে ছোট একটা চুমু একেঁ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এমন করে কিছুক্ষণ মুখ গুঁজে রাখল ওর লাল কেশে। শ্বাস টানার স্বরে টেনে আওড়ায়,
“উই আর সো মাইন! সুইটহার্ট।”
‘দীর্ঘ সময় চুলের অন্তরাল থেকপ মুখ তুলে এলিজাবেথের টলমলে চোখে চেয়ে তুষ্ট হাসল রিচার্ড। হঠাৎই ওর কস্টিপ মোড়া ঠৌঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে আচমকা হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়ল রিচার্ড। বিস্ময়ে চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল এলিজাবেথের শেষ রক্ষা হলো না বুঝে।
বুকের ভিতর তোলপাড় ঝড় উঠে। ভয়াল নিস্তব্ধতায় মোড়ানো কক্ষে শুধু ভাসছিল ওর চাপা গোঙানি।
রিচার্ডের আচরণ ছিল অদ্ভুত। ও আলতো করে এলিজাবেথের ঝুলে থাকা একটি পা নিজের হাতে তুলে নিল। এক লাস্যময়ী, শীর্ণকায় নারীর স্পর্শে স্তব্ধ হয়ে গেল সেই দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার বস খৈ হারিয়ে খানিকক্ষণ নিঃশব্দে চেয়ে থাকল ওর নরম, তুলতুলে পায়ের দিকে নিমেষহীন।

‘সব বিস্ময় ছাপিয়ে রিচার্ড এলিজাবেথের পা নিজের হাঁটুর উপর রাখল। তারপর এক নিরবতায় ঠোঁট ছোঁয়াল পায়ের উপরিভাগে। স্পর্শ পেল নাকের ডগাও। হিম শীতল স্পর্শে বৈদ্যুতিক এক শিহরণ দেহজুড়ে খেলে গেল এলিজাবেথের, প্রতিটি লোমকূপ একে একে দাঁড়িয়ে উঠল। পায়ের নিচটা শিরশির করে উঠল। তবু এলিজাবেথ নড়ল না একটুও। এমন উত্তাল মুহূর্তেও নিজেকে কঠিন রাখার অদ্ভুত ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। যেন শীতল এক রাজকীয় অভিজাত্য মিশে আছে ওর অস্তিত্বে। রিচার্ড উঠে দাঁড়াল। ওর মুখের কস্টিপ খুলে দিতে দিতে কোনোরকম ক্ষুব্ধতা, হিংস্রতা ছাড়া ডাকল,
“এলি জান।”
“হুমম।”

‘এলিজাবেথ অবাক চোখে ওর উপর ঝুঁকে থাকা রিচার্ডের দিকে চেয়ে থাকা অবস্থায় ই প্রত্যুত্তর করল। রিচার্ড এলিজাবেথের হাতের পাশ থেকে ছু’রি দু’টো তুলে ফেলে দিল। পরপরই সোজা হয়ে পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে দৃঢ় গলায় বলল,
“ঠিক এভাবেই উত্তেজনাকর যেকোনো মুহূর্তে নিজেকে স্থির রাখতে হবে। আবেগের বশে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না৷ কারণ ক্ষণিকের দুর্বলতা জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।”
‘শীতল কণ্ঠে কথাগুলো শেষ করে ফোন কানে তুলল,
“ন্যাসো, দরজা খুলে দাও।”

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ২৮

‘এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সোজা চলে গেল রিচার্ড। পেছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না।
এলিজাবেথ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিচার্ডের এই রহস্যময় আচরণ, তার অনির্ধারিত পথচলা—সবকিছু যেন এক জটিল গোলকধাঁধা। যার প্রতিটি মোড়েই অদ্ভুত ধাঁধার মতো লুকিয়ে আছে উত্তর, অথচ সেই উত্তর আজও অধরা এলিজাবেথের কাছে।

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ২৯ (২)