ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬০ (২)
মিথুবুড়ি
‘দীর্ঘদিন পর শান্তিনিকেতনের মাটিতে পা রাখল এলিজাবেথ। ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে আসবাবপত্র। থমকে আছে প্রতিটি কোণ। নিস্পৃহ দৃষ্টিতে এলিজাবেথ চেয়ে রইল সেই বাড়িটার দিকে—যেখানে একসময় থালাবাসনের টুংটাং শব্দে মুখর ছিল প্রতিটা প্রহর। আজ নিঃশব্দ, নিঃজন। অথচ এই দেয়ালের ফাঁকে একদিন মানুষের কোলাহলে দুলে উঠত আকাশ। ইকবাল সাহেবের মৃত্যুর সংবাদ এলিজাবেথের এখনো অজানা। সে জানে উনাকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল থেকে সোজা চাচার বাড়িতে এসেছে এলিজাবেথ।
‘সন্ধ্যার আবছা আলোয় নিঃশব্দে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে। স্টিলের হাঁড়িকুড়িতে ঝং ধরে গেছে। এক কোণে চোখ পড়ল দুধের পাত্রে। দুধ শুকিয়ে গিয়ে পাত্রের সাথে লেপ্টে আছে কঠিন আবরণ। পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ছোট্ট একটা শিশি দৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরল। নিঃশ্বাস আটকে এলিজাবেথ কাঁপা হাতে শিশিটা তুলে নিল। ঠিক তখনই ভূপাতিত নীরবতা চূর্ণ করে বিকট এক শব্দ কানে আসতে লাগল। মনে হল যেন বাড়ির ছাদ কেউ উলটে দিচ্ছে। আতঙ্কে ছুটে গেল এলিজাবেথ বাইরে।দেখতে পেল রিচার্ডের গার্ডরা শান্তিনিকেতনের বুক চিরে বুলডোজার চালাচ্ছে। মাটি কাঁপছে, দেয়াল ভাঙছে, স্মৃতি ধূলিসাৎ হচ্ছে। এলিজাবেথ ছুটে গেল তাদের দিকে।
“কি করছেন এগুলো? কে এই সাহস দিয়েছে আপনাদের?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘একজন গার্ড মাথা নত করে চোখ না তুলে বলল, “স্যরি ম্যাম, বসের আদেশ।”
‘ক্রোধে চিবুক শক্ত হয়ে উঠল এলিজাবেথের। সে স্পষ্টতই বুঝতে পারে রিচার্ড কেন এমন করছে। ম্যানশন ছেড়ে এসে শেষ আশ্রয় হিসেবে এইটুকু জমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল এলিজাবেথ, এখন সেটাও কেড়ে নিচ্ছে লোকটা। ঠোঁট কাঁপছে রাগে শিরা টনটন করছে। তখনই কানে এল হৃদয়বিদারক আহাজারির শব্দ। সামনে তাকিয়ে দেখল আশেপাশের সব বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কালো পোশাকের গার্ডরা মানুষদের জিম্মি করে রেখেছে। নিজেদের মাথার উপর থেকে ছাদ খসে পড়ায় বিলাপ আর কান্নায় ফেটে পড়েছে সবাই। শান্তিনিকেতনের আকাশ আজ যেন কেবলই আর্তনাদ।
‘এলিজাবেথ ছুটে যেতেই কয়েকজন হিংস্র ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কথার ধারাল তীরে বিদ্ধ করতে লাগল ওকে,
“নষ্টর জাত! তুই আবার ফিরেছিস? সর্বনাশী তুই!”
“আপনারা এসব কী বলছেন?”
‘গলার স্বর কাঁপে এলিজাবেথের। মধ্যবয়সী এক নারী কুৎসিত ভঙ্গিতে বলল, “কিনে নিয়ে গিয়েছিল তো রক্ষিতা হিসেবে। এক জানোয়ারের সাথে রাত কাটিয়ে পেটে অবৈধ বাচ্চা ধরেছিলি, সেটাও হারালি! এখন আবার আমাদের ঘরছাড়া করবি? নিজের বাপ-মা, নিজের সন্তান শেষ করে তোর মন ভরেনি অপয়া?”
‘চোখ ঝাপসা হয়ে এল এলিজাবেথের। থরথর কণ্ঠে বলে,
“আমি কী করেছি, আপনারা এমন বলছেন কেন?”
“মাগির জাত! তোর জন্যই আজ আমরা পথে বসছি। তোর বাতার এসে আমাদের বাড়ি ভাঙছে!”
‘একজন ক্ষেপে গিয়ে তেড়ে আসতে চাইলে সাথে সাথে এক গার্ড তার পায়ে গুলি চালাল। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। কান্না-চিৎকারে আকাশ ফাটতে লাগল। এলিজাবেথ দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরে আতঙ্কে। তার বুঝে আসছিল না কেন রিচার্ড এদের মাথার উপর থেকে ছাদ কেড়ে নিতে চাইছে।
“দেখুন, আপনারা শান্ত হোন। আমি জানি না উনি কেন এসব করছেন৷ আমি কথা বলব ওনার সাথে। দয়া করে শান্ত হোন।”
‘এলিজাবেথের কথায় আহত মহিলা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চোখ জ্বলতে লাগল প্রতিশোধের আগুনে। গালি ছুড়ে বলল,
“তোর অভিশাপ পড়েছে সবার ওপর! তুই কালনাগিনী, সর্বনাশী! আমার স্বামীর বিটে আজ তোর জন্য মাটি ঢেকে গেল। তোকে আমি ছাড়ব না।”
‘বলেই পাশের একটা ময়লা পানির বালতি তুলে এলিজাবেথের দিকে ছুড়ে দিল। পানি গড়িয়ে পড়ল এলিজাবেথের শরীর বেয়ে। জল, কাদা আর অপমান মিশে গেল গায়ে। গার্ড সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে মহিলার মাথায় বন্দুক চেপে ধরল। এলিজাবেথ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল ভেজা শরীরে, আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল চারপাশের দিকে। সবাই হিংস্র, বিদ্বেষে পোড়া চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেন সে-ই অনন্তকাল ধরে তাদের সকল দুর্ভাগ্যের উৎস। এমতাবস্থায় আহত মহিলার ছেলে ছুটে এল। দূর থেকে সব দেখেছিল সে। মায়ের পায়ে রক্ত দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। দৌড়ে গিয়ে একটানা রট তুলে ধরল।
‘এলিজাবেথের মাথায় আঘাত করবে ঠিক তখনই একটা ছায়া এসে দাঁড়াল এলিজাবেথের সামনে। এলিজাবেথ ভয়ে চোখ মুখ কুঁচকে রেখেছিল। গালে উষ্ণ কিছু ঝরে পড়তেই ধীরে চোখ মেলে তাকালে দেখে রিচার্ড দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে রক্ষাকবচের মতো—একহাত তুলে এলিজাবেথের মাথা আড়াল করেছে । রটের তীক্ষ্ণ অংশ গিয়ে বিঁধেছে রিচার্ডের হাতে৷ রক্ত ঝরছে টগবগিয়ে। রিচার্ডের সমুদ্র-নীল চোখ থেকে যেন অগ্নিশিখা ছুটে বেরোচ্ছে। দৃষ্টিতে ঝলসে দিচ্ছে চারদিক। এলিজাবেথ ছলছলে চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিচার্ডের দিকে আকাশভাঙা বিস্ময়ে, দুর্বোধ্য আবেগে।
‘রিচার্ড এলিজাবেথ’কে আড়াল করে ধীরে পিছন ঘুরল। ইতিমধ্যে সেই ছেলেটা লুটিয়ে পড়েছে রিচার্ডের গার্ডের পায়ের নিচে। রিচার্ড একঝলক তাকাল নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে। হঠাৎ রিচার্ডের আকাশবিদারী গর্জনে কেঁপে উঠল চারপাশ,
“লোকা, মাল দে।”
‘লুকাস কোনো বাক্য না খরচ করে কোটের ভিতর থেকে এক বোতল এলকোহল এগিয়ে দিল। রিচার্ড সেটা নিয়ে সরাসরি ক্ষতের ওপর ঢেলে দিল। এলিজাবেথ শিউরে উঠে রিচার্ডের হাত আঁকড়ে ধরল। এতোক্ষণে পুরো দৃশ্যটাই রিচার্ডের আয়ত্তের নিচে যায়। চারদিকে নেমে এলো ভারী নিঃশ্বাসের দমবন্ধ নৈঃশব্দ্য। সবাই শঙ্কিত দৃষ্টিতে জমে রইল। রিচার্ড আবার গর্জে উঠল,
“ন্যাসো!”
‘ন্যাসো দৌড়ে গিয়ে বুলডোজারের পাশে সাদা কাপড়ে ঢাকা টেবিলের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই উন্মোচিত হলো অস্ত্রের সম্ভার ধাতুর নিকষ চকচকানি। ন্যাসো রিচার্ডের পছন্দের শটগানটি তুলে আনল। রিচার্ড গ্রীবা বাঁকিয়ে রক্তাভ চোখে একবার এলিজাবেথের দিকে তাকাল তারপর হাত ঝাড়ি মেরে ছাড়িয়ে নিল। রিচার্ড এগিয়ে গেল ছেলেটার সামনে। কথায় আগুন বর্ষিত হচ্ছিল না, বরং চোখে জ্বলছিল নিঃশব্দ প্রতিশোধের দাবানল। গলা নীচু অথচ ভেদ্য,
“আমার স্ত্রীর দিকে বাড়ানো প্রতিটা আঙুলের রগ আমি গুনে গুনে ছিঁড়ে নেব। একটি রগও ছাড়ব না। ঠোঁট পেরিয়ে বেরোনো প্রতিটা শব্দের মূল্য আমি তার জিভ টেনে আদায় করব। খোদার কসম, আমি করব।”
‘বাক্য বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগের গুলির ঝাঁজ ছুটে বেরুলো মস্তক ছিন্নভিন্ন করে। ছেলেটার মাথা মুহূর্তে উড়ে গেল। চারপাশ স্তব্ধ। কেবল ভেসে আসছিল সন্তানের শোকে ভাঙা এক মায়ের বুকচিরে ওঠা আহাজারি। এলিজাবেথ ছুটে গিয়ে রিচার্ডের হাত থেকে শটগানটা ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। কিছু বলার আগেই রিচার্ড বজ্রগর্জনের মতো ঝাঁপিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে কাছে টেনে নিল। কণ্ঠে স্ফুলিঙ্গঝরা হুংকার,
“চুপ! একদম চুপ।”
‘অতঃপর রিচার্ড চোখ ঘুরিয়ে তাকাল চারপাশের আতঙ্কিত ভীরুর দিকে। আর্ত চিৎকারে আকাশ বিদীর্ণ করল,
“সন্তান হারানোর কষ্ট এমনই হয়! আমিও টের পেয়েছিলাম। সেদিন তোরা কেউ—একজনও—আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াসনি। দেখছিলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা, কীভাবে ছোট্ট একটা ফুল ঝড়ে যাচ্ছিল। জানোয়ারের বাচ্চারা, তোমাদের মধ্যের কেউ যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসত, তাহলে আজ আমার সন্তান এই দুনিয়ায় থাকত৷”
‘চারপাশে নেমে এল জমাটবাঁধা স্তব্ধতা। সকলে পাথরচোখে দাঁড়িয়ে। এলিজাবেথ বিস্ময়ে স্থবির রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে। লোকটার চোখের শিরা ফেটে বেরোচ্ছে এখনো সন্তানের শোকের লেলিহান ক্ষত। গলা আরও গভীর করে রিচার্ড চিৎকার করল,
“কে বলেছে আমার ওয়াইফ এতিম? অপয়া? তার স্বামী এখনও বেঁচে আছে! যে নারীর স্বামী জীবিত, সে কখনও এতিম হতে পারে না। শোন—শুনে রাখ—শি ইজ দ্য কুইন অফ ড্রাগন গ্রুপ। একটা ইশারায় পুরো সাম্রাজ্য তার পায়ের নিচে আসবে। এই রিচার্ড কায়নাতও তার জান দিতেও রাজি শুধু তার একবার চাওয়ায়!”
‘রিচার্ড ঘুরে দাঁড়াল। নিজের গা থেকে কোট খুলে এলিজাবেথের ভেজা, কাঁপতে থাকা শরীর ঢেকে দিল। চারপাশের চোখে জল, অসহায় নিঃশ্বাস। সবাইয়ের সামনে রিচার্ড এগিয়ে এলিজাবেথের কপালে দীর্ঘ চুমু খেল। গলায় বজ্র নামিয়ে বলল,
“সে কারো রক্ষিতা না, সে আমার দুনিয়া।”
‘একজন গার্ড নীরবে এগিয়ে এল, হাতে একটি চেয়ার আর স্বর্ণখচিত পানিভরা বালতি। রিচার্ড সন্তর্পণে এলিজাবেথকে চেয়ারে বসাল। নিজেও হাঁটু গেঁড়ে বসল ওর সামনে। এলিজাবেথ স্তব্ধ, বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকল অচেনা, অজানা রিচার্ডের দিকে। রিচার্ড নত হয়ে এলিজাবেথের পা দুটো নিজ হাতে তুলে স্বর্ণপানিতে চুবাল। অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে সেই পানিভরা মুষ্টি ছুড়ে দিল সামনে দাঁড়ানো ভীরুর দিকে। জলরাশি ঝরে পড়ল সকলের গায়ে।
“এটাই তার যোগ্যতা।”
‘চারদিক স্তব্ধ, নিঃশ্বাসবন্ধ হতচকিত দৃষ্টি। ন্যাসো আর লুকাস একগুঁয়ে দৃষ্টিতে দেখল এই অনুপম দৃশ্য। রিচার্ড এগিয়ে এলিজাবেথকে উঠিয়ে ধরল। গাড়ির দিকে যেতে চাইলে এলিজাবেথ নিরুপায় সায় দিল। হঠাৎ থামল রিচার্ড। পিছনে ঘুরে চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“বউকে বেশি উড়তে দেওয়া কাপুরুষের লক্ষণ। রিচার্ড কায়নাত জানে তার খাঁচার পাখিকে ঠিক কতটা স্বাধীনতা দেওয়া দরকার। তুই নিজের সীমা পেরিয়ে গিয়েছিস। এখন তোকে ফের খাঁচায় ফিরিয়ে আনার পালা।”
‘কথা শেষ হতেই একটানে কাঁধে তুলে নিল এলিজাবেথকে। হনহনিয়ে হাঁটা দিল গাড়ির দিকে। ন্যাসো পিছু নিল। লুকাস ছুটে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল। পেছনে পড়ে রইল সন্তানের শোকে বিদীর্ণ হাহাকার আর আশ্রয় হারানোর অস্ফুট কান্না।
“মাম্মা, ভিতর থেকে ওসব কিসের শব্দ আসছে?”
‘আনমনে বসে থাকা মিস প্রিমার কানে ছেলের কণ্ঠস্বর বাজল ধাক্কার মতো। কী করে বুঝাবে এই নিষ্পাপ শিশুকে যে তার বাবার আনা মেয়েদের নিয়ে ভিতরে চলেছে বিকৃত ফুর্তির আসর? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন তিনি। নিরবে গেমিং সেটের সামনে বসিয়ে কানে হেডফোন পরিয়ে নিচে নেমে এলেন মিস প্রিমা। ঠিক তখনই দোতলার গমগমে ঘরে প্রবেশ করল একদল কালো পোশাকধারী পুরুষ। মুহূর্তেই তারা ঘিরে ফেলল পুরো বাড়ি। দু’পাশে সরে দাঁড়িয়ে মাঝখানে তৈরি করল পথ। সেই পথ বেয়ে এগিয়ে এলেন তিনজন—রিচার্ড, ন্যাসো আর লুকাস।
মিস প্রিমা আঁতকে উঠলেন। রিচার্ডের শীতল দৃষ্টি ঘুরল চারপাশে। ঝলকে ঝলকে জরিপ করল প্রতিটি কোণ। চোখের ইশারায় আদেশ দিল গার্ডের৷ গার্ডরা ভিতর থেকে টেনে আনল তথ্য মন্ত্রী নাসির মোড়লকে ও তার সঙ্গিনীকে। দু’জনেই অর্ধনগ্ন। মেয়েটির ক্লান্ত, ক্ষত-বিক্ষত শরীরে স্পষ্ট ছিল নোংরামির ছাপ। স্বামীট আদরের চিহ্ন অন্য মেয়ের শরীর দেখে মিস প্রিমার চোখ থেকে নীরব দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। রিচার্ড তা লক্ষ করল। নির্বিকার ইশারায় আদেশ দিতেই গার্ডরা মেয়েটিকে গুলি করে নিস্তব্ধ করল।
গর্জে উঠল নাসির মোড়ল,
“কুত্তার বাচ্চা, কে তুই?”
“তোর বাপ।”
‘রিচার্ডের বজ্রকণ্ঠ ছিন্ন করল চারপাশ। লুকাস এগিয়ে গিয়ে পাকড়াও করল নাসির মোড়লের গলা। হিঁচড়ে টেনে নিতে থাকল বাইরে অপেক্ষমান গাড়ির দিকে। চোখের সামনে স্বামীকে অপমানিত, বন্দী হতে দেখেও মিস প্রিমার অন্তর কাঁপল না। এই সংসারে কোনোদিন শান্তি পাননি তিনি।প্রতারণা, অত্যাচার আর অবহেলার পরতে পরতে দগ্ধ হয়েছেন সারাজীবন। আজ হৃদয়ে নেমেছে এক নির্মম প্রশান্তি। রিচার্ড এগিয়ে এলেন তাঁর সামনে। ঠিক তখনই ছুটে এল ছোট্ট ছেলেটি। এসেই মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল। মিস প্রিমা ছেলেকে বুকে চেপে ধরে চোখ বুজলেন। ঝরে পড়ল নীরব অশ্রু। রিচার্ডের কণ্ঠ নেমে এল গম্ভীরতায় ঢাকা আশ্বাস হয়ে,
“আজ থেকে আপনাদের দায়িত্ব আমি নিলাম। ফরগেট এবাউট হিম।”বলেই হনহনিয়ে চলে গেল রিচার্ড। পিছনে রইল এক নিঃশব্দ নিঃশ্বাস ফেলা মুক্তি।
‘মেঘনা নদীর বুকের গভীরে, জলরাশির বুকে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি জাহাজ। মাঝখানে আটকে রাখা হয়েছে একটি পর্যটকবাহী জাহাজ। জাহাজের আলোকছায়ায় নদীর জল ঝলমল করে উঠছে। নিস্তব্ধতার মধ্যেই বিদ্যুৎ খেলে যায় যেন। ডেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে নাসির মোড়ল। সামনে দাঁড়িয়ে রিচার্ড, বরাবরের মতোই দু’পাশে তার অচলিত দুই রক্ষাকবচ—ন্যাসো আর লুকাস। তাদের ওভারকোট হাওয়ায় সশব্দে উড়ছে। চারদিক জুড়ে গার্ডদের হাতে প্রস্তুত আঁচড়ানো অস্ত্র ক্লান্তিহীন আর নির্ভুল। রিচার্ডের বজ্রকণ্ঠ ভেদ করল নীরবতা,
“বল, হাসপাতালের বিস্ফোরণের নির্দেশ তোকে কে দিয়েছে?”
‘বাতাসে প্রতিধ্বনিত হল সেই শব্দ মাঝনদীর নির্জনতায় তীব্র প্রতাপ নিয়ে। নাসির মোড়লের শরীর থেকে টুপটাপ করে পড়ছে র–ক্ত। এবার আর দেরি করল না সে। ক্লান্ত, ক্ষীণস্বরে গোঙাতে গোঙাতে বলল,
“তাকবীরের দেওয়ানের বডিগার্ড রেয়ানের কথায়।”
‘রিচার্ডের চিবুক মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠল। আজ সকালেই খবর এসেছে রেয়ান কারাগার থেকে পালিয়েছে। রিচার্ড আর সময় নষ্ট করল না। শিকারের মতো নিখুঁতভাবে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নাসির মোড়লের সামনে। দৃষ্টি বিদ্ধ করে প্রশ্ন করল,
“মিস এলিসা কোথায়?”
‘নাসির মোড়ল যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। তবু বরাবরের মতো অসহায় স্বরে একই কথা বলল,
“আমি জানি না। ওই মিনিস্টার জানে সবকিছু।”
“তার আস্তানায় নেই। কোথাও নেই। সব জায়গায় খুঁজেছি আমি। বল কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস তোরা?”
‘রিচার্ডের বজ্রনিনাদে কেঁপে উঠল নাসির মোড়ল।
কাঁপা কণ্ঠে আমতা-আমতা করে বলল,”সত্যি আমি কিচ্ছু জানি না।”
‘এক মুহূর্তের দেরিও করল না লুকাস। ছুটে গিয়ে পা দিয়ে পিষে ধরল নাসির মোড়লের লিঙ্গ। আকাশ কেঁপে উঠল নাসির মোড়লের বিভীষিকাময় আর্তচিৎকারে। গার্ডরা নিঃশব্দে এগিয়ে এল তার আত্মার স্থায়ী প্রশান্তির আয়োজন সম্পন্ন করতে। রিচার্ড ধীরে দাঁড়াল৷ তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল দেখল, কীভাবে গার্ডরা নাসির মোড়লকে গুঁজে দিচ্ছে একটা ড্রামের ভিতর। কীভাবে পুরু সিমেন্টের স্তর ঢালা হচ্ছে ড্রামের মুখে। কীভাবে ছটফট করছে নাসির মোড়ল শ্বাসরুদ্ধ যন্ত্রণায়, মৃত্যুর প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হয়ে।
শেষ মুহূর্তে ড্রামের অন্ধকার থেকে ভেসে এল দু’টি খণ্ডিত শব্দ,
“ফাদ….
‘কিন্তু তার আগেই ঢেলে দেওয়া হল আরেক স্তর সিমেন্ট। সব শব্দ, সব চিৎকার নেমে গেল চিরস্থায়ী নীরবতায়। তারপরই নব্বই কেজির লুকাস একাই দু’শ কেজির সিমেন্ট ভর্তি ড্রামটা তুলল কাঁধে। নিস্তব্ধ জলরাশিতে ঠাস করে ফেলে দিল নিচে।মেঘনার গভীরে ডুব দিল পাপ, নিরুদ্দেশ চিরতরে।
‘নিশুতি রাত। খোলা আকাশের নিচে ঝিম ধরা নৈঃশব্দ্য। ট্যারেসের এককোণে লতানো গাছে মোড়ানো দোলনায় পাশাপাশি বসে আছে ইবরাত আর এলিজাবেথ। রিচার্ড তখন ম্যানশন থেকে কোথায় যেন গেছে খুব বিক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে। এখনও ফেরেনি।
‘এক সময় ইবরাতের কণ্ঠ ভেসে এল তীক্ষ্ণ সুরে,
“তুই কি সত্যি ভাইয়াকে ডির্ভোস দিতি, এলিজাবেথ?”
‘এলিজাবেথ আকাশের দিকে তাকিয়েই থাকল। মুখের কোণে ফিচলে হাসি খেলে গেল। বলল,
“এই লোককে ডির্ভোস দেওয়া আমার মতো সাধারণ মেয়ের পক্ষে সম্ভব কখনো?”
‘ইবরাতের ভ্রুদ্বয়ের মধ্যভাগ দ্বিখণ্ডিত হলো। গভীর কৌতূহল ফুটে উঠল চোখে। এলিজাবেথ পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল,”একটা কাহিনি শুনবি?”
‘ইবরাত তড়িঘড়ি মাথা নাড়ল। চোখ দুটোতে অনাবিল কৌতূহল ঝলমল করলে। এলিজাবেথ হালকা তুষ্টির হাসি ছড়িয়ে বলতে শুরু করল সেদিনের গল্প,
‘সেদিন, হঠাৎ কোনো এক কারণে তাদের মধ্যে দুঃসহ ঝামেলা বাধল। কথার রেষারেষির এক পর্যায়ে এলিজাবেথের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল সেই শব্দ “ডিভোর্স চাই।”রাতটা কাটল স্বাভাবিক। কিন্তু সকাল… সকালে এলিজাবেথ চোখ মেলে দেখল সে বন্দী। লোহা দিয়ে গড়া, পাখির খাঁচার মতো এক খাঁচায়। দম আটকে এল বুকের ভেতর। চোখ ফেরাতেই দেখল রিচার্ড আয়েশী ভঙ্গিতে, কাউচের গা এলিয়ে বসে আছে। হাতে চকচকে রিভলভার। ঠোঁটের কোণে বিকৃত, পৈশাচিক হাসি। চোখদুটো হিমশীতল অথচ জ্বলন্ত। নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল,
“ডিভোর্স চাই?”
‘এলিজাবেথ স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল রিচার্ডের দিকে। তার দৃষ্টিতে ভয় আর অভিমান গলাগলি করছিল। এলিজাবেথের নিঃশব্দতা সহ্য হলো না রিচার্ডের। হঠাৎই সে রিভলভার তোলে শুট করল খাঁচার দিকে। বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। এলিজাবেথ আঁতকে উঠল। শিরা-উপশিরা থরথর করে কেঁপে উঠল দেহে। রিচার্ড উঠে দাঁড়াল। ডগডগে পায়ে এগিয়ে এল খাঁচার কাছে। ঝুঁকে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“দ্বিতীয়বার ডিভোর্সের নাম মুখে আনলে তোর স্থায়ী ঠিকানা হবে এই খাঁচা।”
‘সবটা শুনে চমকে উঠল ইবরাত। শুষ্ক গলায় ঢোক গিলে নরম সুরে বলল,”তারপরও তুই আবার ডিভোর্স চেয়েছিলি কোনো সাহসে, এলিজাবেথ?”
‘এলিজাবেথ ঠোঁটে এক টুকরো দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“গ্যাংস্টারের বউ, একটু সাহস না হলে চলে? আর আমি জানি ডিভোর্স সে কোনোদিন দেবে না। এটাই আমার সাহস।”বলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল এলিজাবেথ। সাথে হেসে উঠল ইবরাতও। চারপাশে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ইবরাত হঠাৎ করে বলল,”ভাইয়া তোকে খুব ভালোবাসে রে।”
‘এলিজাবেথের কণ্ঠ টইটম্বুর আত্মবিশ্বাসে ভরা,”পাগলের মতো ভালোবাসে আমাকে লোকটা। মুখ ফুটে এখনো ভালোবাসি বলেনি ঠিকই, তবু আমি বুঝি। ভয়ংকর সুন্দর তার ভালোবাসা।”
‘ইবরাত চুপচাপ তাকিয়ে থাকল। তারপর প্রশ্ন রাখল,”আর তুই?”
‘এলিজাবেথ হাসল, চোখ দুটো দীপ্ত হলো,”আমি ভয়ংকর ভাবে আসক্ত তার প্রেমে।”
“তাহলে এই দুরত্ব কেন?”
“আমাদের মাঝে কোনো দুরত্ব নেই। আলাদা থেকেও আমরা একসাথে। আমরা একে-অপরের মন থেকে কখনও আলাদা হইনি। লোকের চোখে দূরত্ব থাকলেও আমাদের অস্তিত্বে নেই। আমরা এখনো একই বিছানায় ঘুমাই, একই প্লেট ভাগ করি, একসাথে ভালোবাসি— সমানে সমান। হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন, তাই প্রকাশও ভিন্ন। তবু আমরা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ। অভিযোগ নেই। তবে এটুকু ঠিক ওনাকে জ্বালাতে খুব ভালো লাগে আমার।”
‘ইবরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”কিন্তু এভাবে আর কতদিন? তোর সংসার তুই সাজিয়ে নে নিজের মতো করে।”
‘এলিজাবেথের ঠোঁটের কোণ নরম হাসিতে বেঁধে ফুঁসল,
“সংসার সাজানোর আগে জীবন সাজানো জরুরি।”
‘ইবরাত চুপ রইল। সে জানে এলিজাবেথ যেদিন থেকে জেনেছে তার মা বেঁচে আছেন, সেদিন থেকে সে ছটফট করছে মায়ের স্পর্শ পাওয়ার জন্য। ঘড়ির কাটায় তখন প্রায় বারোটা। বিরক্ত হয়ে ইবরাত ফোন করল ন্যাসোকে। সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ হলো।।
“কয়টা বাজে? কোথায় আপনি?”
“কোথায় আবার, তোমার মনে।”
“স্ফটিক অগ্নির মতো শীতল ক্রোধে হুট করে নেমে এলো বর্ষণ। ইবরাত মিইয়ে গেল। রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল তার গালে।
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে রুমে দেখা হচ্ছে।”বলে ন্যাসো ফোন কেটে দিল।এলিজাবেথ বোনের লাজুক লাবণ্য দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। দু’জনে কথা বলে কেটে দিল আরও কিছু মুহূর্ত। ঠিক তখনই ম্যানশনের গেট দিয়ে প্রবেশ করল পরপর ছয়টা গাড়ি। সবার আগে নামল ন্যাসো, লুকাস, রিচার্ড। তিনজনই হনহন করে এগিয়ে চলল ম্যানশনের ভেতরের দিকে। এলিজাবেথের দৃষ্টি আটকে গেল রিচার্ডের ওপর।বহুদিন পর লোকটা ওভারকোট পরেছে। কালো ওভারকোটের নিচে যেন তার “গ্যাংস্টার” নামটার পূর্ণতা ঝলসে উঠছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, চওড়া চোয়াল, ঢেউ খেলানো বুক, সুঠাম উচ্চতা সবকিছুই চুম্বকের মতো টানছে এলিজাবেথকে। ইবরাত কনুই দিয়ে গুঁতো মারল এলিজাবেথের বাহুতে। হাসি চেপে বলল,
“তোর চোখ ভরা প্রেমে এলিজাবেথ।”
‘এলিজাবেথ মৃদু হাসল। দৃষ্টি সরাল না মানুষটা থেকে। ঠোঁটের কোণে খেলা করা শব্দে বলল,
“ভিলেন দেখতেই যদি এতো হ্যান্ডসাম হয়, তাহলে মানুষ হিরোর প্রেমে পড়বে কী করে।”
‘নিশব্দ পায়ে ম্যানশনে ঢুকে রিচার্ড ওভারকোটটা খুলে সোফার ওপর ছুড়ে দিল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই হঠাৎ একটা তোয়ালে মুখে এসে পড়ল। মুহূর্তেই মুখ আঁধার হয়ে গেল রিচার্ডের । তোয়ালেটা ঝাঁকিয়ে ফেলে সপাটে এগিয়ে এলিজাবেথের দিকে গিয়ে দাঁড়াল।
“বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? একটু প্রশ্রয় দিয়েছি বলেই নিজেকে যা খুশি ভাবতে শুরু করেছ? মনে করো না সবাই তোমার পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়বে।”
‘এলিজাবেথ নির্ভীক। চোখে অবচল দৃষ্টি, ঠোঁটে ক্ষীণ তাচ্ছিল্য।
“শুধু আপনি।”
‘রিচার্ড থমকে গেল। কথার ওজন বোঝার আগেই দৃষ্টিতে ধাক্কা খেল। এলিজাবেথ দুই হাত বুকের সামনে বাঁধল। কণ্ঠেও নীরব তাগিদ,
“আমি চাই, শুধু আপনিই আমার পায়ের নিচে থাকুন।”
‘এলিজাবেথের অবাক করে দিয়ে রাগের বদলে রিচার্ডের চোখে জ্বলল অন্য আগুন। আচমকা ঝুঁকে এলিজাবেথের উন্মুক্ত কোমর আঁকড়ে ধরল। গা ঘেঁষে হিসহিস শব্দে বলল,
“পায়ের নিচে থাকতে রাজি আমি, যদি ধীরে ধীরে উপরে উঠার অনুমতি পাই।”
‘এলিজাবেথ সেঁটে গেল দেয়ালে। তৎক্ষণাৎ ধাক্কা দিল রিচার্ডকে।
“বের হন, বের হন! অসভ্য লোক।”
‘রিচার্ড’কে দরজার বাইরে ঠেলে দিয়ে চট করে ভেতর থেকে লক ঘুরিয়ে দিল এলিজাবেথ। হতভম্ব রিচার্ড দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“আরে, করলাম টা কী?”
‘ভিতর থেকে কড়া স্বরে এলিজাবেথের উত্তর,
“ভালো স্বামী কখনও এতো রাতে বাড়ি ফেরে না।”
‘কথা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল রিচার্ড। রাতের এই নীরবতায় ঝামেলা টানতে মন চাইল না। শরীরটাও ক্লান্ত, মনও ভারী। নিঃশ্বাস ফেলে পা বাড়াল সুইমিং পুলের দিকে। গিয়ে দেখল ন্যাসো আর লুকাস পুলের ধারে পা ডুবিয়ে সোডা চুমুক দিচ্ছে। ন্যাসোকেও তার বউ ঘরছাড়া করেছে; সঙ্গ খুঁজতে লুকাসকেও ঘুম থেকে তুলে এনেছে। পেছনে কারও পায়ের শব্দে দুজনের ঘাড় ফিরল। দেখল বিরক্ত মুখে রিচার্ড দাঁড়িয়ে আছে। ন্যাসো মুহূর্তেই বুঝে গেল গল্পটা। চতুর হাসি ছুঁয়ে মুখে বলল,
“কি দিন পড়ল দেখো! গ্যাংস্টার বস রিচার্ড কায়নাত, যার ভয়েই তেলাপোকা পটি করে,তাকেও নাকি বউ ঘর থেকে বের করে দিল!”
‘রিচার্ড কপাল কুঁচকাল। ওরা এখানে আছে জানলে সে কখনোই আসতো না। একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
“এটা বেশি বেশি হয়ে গেল না?”
‘লুকাস লাফিয়ে উঠে বলল,”একদম বাড়াবাড়ি, বস। আপনাদের সাথে এসব মানায়?”
‘রিচার্ডের ভ্রু ফুলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“বউ হবার পর চুনোপুঁটিরাও নিজেকে বনের রাজা ভাবে! এখন কী করা উচিত বলো তো?”
‘লুকাস চোখ টিপে হাসল,”দরজা ভেঙে ঢোকা উচিত। ঢুকেই দ্বিতীয় বাচ্চার প্রস্তুতি শুরু করা দরকার।”
‘রিচার্ড মাথা নাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ আপত্তি তুলল,”না! না। আমার রেড এখনো উইক । এন্ড গাইজ ডোন্ট নো অ্যাবাউট মাই…”
‘ন্যাসো ভ্রু নাচাল,”হোয়াইট?”
‘রিচার্ড মুখ শক্ত করে কিছু বলল না। গম্ভীর গলায় কাটল,”নাথিং।”
‘একটু থেমে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা, ওসব বাদ দিই। আমি তো দরজা ভেঙে ঢুকতেই পারি, তাই না?”
‘দু’জন একসাথে সায় দিল,”অবশ্যই, বস। সেটাই মানায় আপনাকে।”
‘রিচার্ড দম নিল,”এখন আমার উচিত দরজা ভাঙা, তাই তো?”
“হুম হুম।”
“ওকে।” হনহনিয়ে আবার ম্যানশনের দিকে রওনা দিল রিচার্ড। পিছনে দু’জন ফিকফিক করে হেসে হাত মেলাল। মুহূর্ত পরেই ন্যাসোও উঠে দৌড় দিল। তারও তো একই পথ অনুসরণ করা চাই! এই ঠান্ডার রাতে, বউ ছাড়া চলে নাকি?
‘রিচার্ড গমগমে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বন্ধ দরজার সামনে। ঠোঁট চেপে গলা ছেড়ে ডাকল, “রেড, দরজাটা খুলো।”
‘ওপাশ থেকে ঝাঁঝালো উত্তর ছুটে এল,”এই দরজার মতোই আমার মনের দরজাও আপনার জন্য বন্ধ। খুলবো না আমি।”
‘রিচার্ড চোখ সঙ্কুচিত করল,”খুলবে না তো?”
“না।”
“ওকে।”
‘আর কিছু না বলে ঘুরে চলে গেল নিচের বাঙ্কারের দিকে। এলিজাবেথ বেশ অবাক হল। রিচার্ড এত সহজে হার মেনে নেবে? অস্বস্তি গা বেয়ে উঠল। কাঁপা পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে মাথা ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক তখনই কুড়ালের এক কোপে ধাতব অংশ চিৎকার করে ছিঁড়ে এপাশে এসে পড়ল। শিউরে উঠে দু’কদম পেছাল এলিজাবেথ। ওদিকে শুরু হয়ে গেছে রিচার্ডের রণক্ষেত্র। একের পর এক দমবন্ধ কোপ দরজায়। থামছে না, দম ছাড়ছে না। এলিজাবেথ আতঙ্কিত হয়ে দেয়ালের কোণে সেঁটে দাঁড়াল। শেষমেশ দরজাটা পুরোপুরি ভেঙে ফেলে রিচার্ড। কুড়াল হাতে, ধুলোমাখা দাঁড়িয়ে পড়ল দরজার ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি।
“ঠিক এভাবেই বন্ধ করে দেওয়া সব দরজা ভেঙে আমি প্রবেশ করব তোমার মনে।”
‘এলিজাবেথ এবার বিস্ফোরিত হলো,”আমি বিষ খাবো বলে দিলাম!”
‘রিচার্ড কুড়াল ছুড়ে ফেলে দাঁত খিঁচিয়ে গর্জাল, “আমাকে খাবে সেটা মুখ দিয়ে বের হয় না?”
‘এলিজাবেথ ঠোঁট বাঁকিয়ে ছুঁড়ে দিল,”না, হয় না বাঁদরমুখো!”
“কীহ?”
“কীহ মানে? বয়ড়া নাকি? আল্লাহ, কাকে বিয়ে করেছিলাম আমি? মাবুদ, বিয়ে দিলে তো দিলে, তাই বলে বয়ড়ার সাথে?”
‘বিরক্ত হয়ে ধমকালো রিচার্ড,”স্টেট আপ স্টুপিড! ষাঁড়ের মতো চেঁচানো শুরু করেছিস!”
“বিয়ে করার আগে দেখে করতে পারনি? কে আপনার পায়ে পড়েছিল?”
“বিয়ে না করলে পায়ের নিচেই পড়তে। পিষে দিতাম মাটির সাথে!”
“এই রকবাজ চেংড়া, মুখ সামলা। আমার শর্তের কথা ভুলে গেছেন নাকি? এক্ষুনি রাশিয়া চলে যাবো।”
‘রিচার্ড হাতঘড়ি খুলতে খুলতে বাঁকা হেসে বলল,
“পাসপোর্ট নিজের কাছে আছে?”
‘এলিজাবেথের মুখ ফিকে হয়ে গেল। ম্যানশনে ফিরেই দেখে রিচার্ড তার পাসপোর্ট লুকিয়ে রেখেছে। তবু গলার তেজ কমাল না,
“রাশিয়া যেতে না পারি। এই ম্যানশন ছেড়ে তো যাবই। নিজের লিমিট ভুলে যাবেন না।”
“শর্তে এসব উদ্ভট গালির কথা ছিল না।”
“আমি একশোবার, একশো রকম গালি দেবো আমার বরকে। তাতে আপনার কী? বাঁদরমুখো, তেদর ছেলে, বালটুস, আবুল, বকলন, চেংড়া, ফেংড়া—মুখ থেকে যা আসে, তাই বলব!”
‘শার্ট খুলতে গিয়ে পিঠের পুরোনো ক্ষতে টান পড়ল। মুখ কুঁচকে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল রিচার্ড।
“আহ!”
‘সব রাগ ঝরে গিয়ে অস্থির হয়ে এলিজাবেথ ছুটে গেল রিচার্ডের দিকে,”আমি হেল্প করছি।”
‘শার্ট খুলতেই পুরোনো ক্ষতের উপর নতুন রক্তক্ষরণ। চোখের কোণ অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এল এলিজাবেথের।
“ড্রেসিং তো লাগবে।”
“কোনো দরকার নেই।”
‘রিচার্ড উদাস গলায় উঠে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিল। এলিজাবেথ তৎক্ষণাৎ হাত টেনে বিছানায় বসাল। তারপর ছুটে গেল নিচে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো কুসুম গরম পানি আর নরম মখমলের কাপড় হাতে। দেখল রিচার্ড আগের জায়গাতেই নিশ্চল। স্নিগ্ধ হাতে ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিল এলিজাবেথ। চোখের দুধারে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল নীরবে। রিচার্ড উঠে গিয়ে ফ্রেশ হলো। আজ কোনো কথা নেই,সরাসরি গিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। চোখ ছোট করে তাকাল এলিজাবেথ, বলল,
“কি ব্যাপার? এখানে শুচ্ছেন কেন?”
“আমার ঘর, আমার টাকায় কেনা খাট। আমি কেন আড়ালে মাঝরাতে চুপিচুপি শুবো? আজ থেকে এখানেই থাকব।”
“ওকে, তাহলে আমি চলে যাচ্ছি।”
‘বালিশ তুলে বেরোতে নিলে হঠাৎ পিছন থেকে রিচার্ডের হেঁচকা টান। ঝটকা দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। অতঃপর এক চড়ে ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। এলিজাবেথ উঠে বসার আগেই রিচার্ড শুয়ে পড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ভিতরটা কেঁপে গেল এলিজাবেথের। চোখ ঝাপসা। শরীর নড়াতে লাগল। রিচার্ড কানের কাছে ফিসফিসাল,
“নড়ানড়ি করে না বউ, অনেক কিছু করতে মন চাই।”
‘এলিজাবেথ নিঃশ্বাস চেপে মিইয়ে গেল। বিশ্বাস নেই এই লোকটার। অস্পষ্ট স্বরে বলল,”এই ভাঙা দরজার ঘরে আপনার সাথে এক বিছানায় থাকব কিভাবে?”
“কেন? কিছু করতে চাইছো? ওকে বেবি, চল রুম চেঞ্জ করি।”
‘উঠতে চাইলে এলিজাবেথ তড়িঘড়ি করে টেনে আবার শুইয়ে দিল। ঠোঁট কামড়ে হাসল রিচার্ড। ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে চাপা হাসল এলিজাবেথও। রিচার্ড দু’হাতে জড়িয়ে নিল ওকে গলাগলি করে একদম।
‘এলিজাবেথ ছটফট করে বলল, “হাত সরান।”
‘রিচার্ড ঘুমের ভান ধরে রইল। অথচ শরীরজুড়ে হাতের বেপরোয়া আগ্রাসন। শেষমেশ এলিজাবেথও হার মানল রিচার্ডের কৌশলে। উল্টে ঘুরে সেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রিচার্ড’কে। দীর্ঘদিন পর সমস্ত মান–অভিমান ধুয়ে গিয়ে দুটো শরীর মিশে থাকল একে-অপরের গভীরে। এলিজাবেথের মাথাটা নেমে ছিল রিচার্ডের গলার ঠিক নিচে। নিঃশব্দে, খুব আস্তে, রিচার্ডের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল আগুনরাঙা কেশরাশিতে। মেয়েটাকে বুকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে ফিসফিস করল,
“ঘুমাচ্ছ না কেন?”
‘এলিজাবেথ ব্যস্ত ছিল স্বামীর শরীরের গাঢ় ঘ্রাণ শুষে নিতে। মিনমিনে গলায় বলল,”ঘুম আসছে না।”
‘হঠাৎ, যেন ভেতর থেকে কিছু জেগে উঠল। মাথা তুলল সে। নিচু, কাঁপা গলায় বলল, “সে তো আপনার ভাই। আপনার রক্ত। একটুও কি পুড়ে না আপনার, তার জন্য?”
‘রিচার্ডের কণ্ঠ পাথরচাপা ঠাণ্ডা,”না।”
‘এলিজাবেথ কঠিন ঢোঁক গিলে সাহস সঞ্চয় করল। আস্তে করে বলল,”কেমন আছে আপনার ভাই?”
‘রিচার্ড সঙ্গে সঙ্গে চিবুক শক্ত করে চেপে ধরল। চোখ জ্বলছিল, কণ্ঠও ছিল তীক্ষ্ণ, “আমার কোনো ভাই নেই বুঝেছিস? আমি এতিম। আমার বলতে শুধু তুই আছিস।”
‘এলিজাবেথ শক্ত করে চোখ বুজে ফেলল। ভিতর থেকে শুধু দীর্ঘশ্বাসটা বেরোতে পারল, আর কিছু নয়।রিচার্ড আবারো এলিজাবেথের মাথাটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। ভিতর থেকে একটা দীর্ঘ, করুণ নিঃশ্বাস বেরোল।সেই নিঃশ্বাসে কতটা ত্যাগ, কতটা রক্তাক্ত স্মৃতি লুকিয়ে ছিল তা কেবল সে আর সৃষ্টিকর্তাই জানে৷ রিচার্ড ধীরে বলল,
“একটা গল্প শুনবে, রেড?”
‘এলিজাবেথ ঠোঁট নড়াল আস্তে,”হুঁ।”
“এক ছিল দেশি রাজা আর ভিনদেশি রানী। তাদের ঘর আলো করে এক প্রিন্সেস জন্মেছিল। খুবই আদরের, শখের। প্রিন্সেসের হৃদয় ছিল তুলোর মতো কোমল। তার রূপ ছিল বিষের মতো দগ্ধকারী। সেই রূপ একদিন কাল হলো তার নিজের জন্য আর রাজার লোভের জন্যও। রাজা লোভী ছিল ঠিকই, কিন্তু প্রিন্সেসকে ভালোবাসত নিঃশর্তভাবে। সে ভিলেন ছিল গল্পে, কিন্তু বাবা হিসেবে ছিল সুপারম্যান। নিজের সমস্তকিছু ত্যাগ করল শুধু পাপের ছায়া থেকে প্রিন্সেসকে মুক্ত করতে। কিন্তু পাপ তো সহজে ছাড়ে না। পাপ ঘ্রাস করে নেয় নিষ্কলুষতাকেও। রাজার আত্মত্যাগ হৃদয়বিদারক হলেও তার কর্মকাণ্ড ছিল জঘন্য। প্রিন্সেস জানলে সে ভেঙেচুরে যেত। তাই তো সেই গল্পের ভিলেন কখনো তা জানতে দেয়নি প্রিন্সেস কে। সে চাইনা সুপারম্যান রাজার ছায়া একদিন ব্যাডম্যান হয়ে ভেঙে পড়ুক তার চোখে।”
‘এটুকু বলতেই রিচার্ড টের পেল এলিজাবেথ ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোঁস ফোঁস নরম নিশ্বাসে হারিয়ে গেল গল্পের বাকিটুকু। রিচার্ড থেমে গেল। তাকিয়ে দেখল গালে চেপে ধরা আঙুলের ছাপ বসে আছে এলিজাবেথের গালে। সে আস্তে ছুঁয়ে দিল লাল হয়ে থাকা জায়গাটায়। তারপর পুরো মুখশ্রীতে হাত বুলিয়ে দিল। ঝুঁকে গিয়ে একগুঁয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করল,
“আমার থেকে বেশি কেউ তোকে ভালোবাসতে পারবে না। কেউ আমার থেকে বেশি তোকে আগলে রাখতে পারবে না। আমার কাছে তোকে ছাড়া দামি আর কিছুই নেই। তোমার জীবনের সেরা উপহার আমি তোমাকে দিবো এবারের জন্মদিনে, জান।”
‘আজ খুব ভোরে উঠেছে রিচার্ড। সাথে লুকাস। চুপচাপ, নির্ভুল পায়ে তারা সোজা গেল সবিতা বেগমের ঘরের সামনে। ঘরটা ছোট। আসবাবহীন নীরবতা। দরজাটা আধাভেজানো। রিচার্ড সামান্য ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। লুকাস আলো জ্বালালো। চোখে পড়ল সবিতা বেগম কম্বলের নিচে নির্বাক শুয়ে আছে। রিচার্ড গভীর, পাথরকঠিন কণ্ঠে বলল,
“শুনলাম, আমার স্ত্রী আবারও আপনার জন্য কষ্ট পেয়েছে? আপনাকে তো এবার মরতেই হবে।”
‘সবিতা বেগমের দিক থেকে নীরব, স্থির প্রশান্তি। রিচার্ড ঠাণ্ডা আঙুলে কপাল ঘষে বলল,
“আপনি জেমসের সাথে হাত মিলিয়ে পেনড্রাইভ আমার স্ত্রীর হাতে দিয়েছেন। সেটা দেখে সে আমার উপর ছুরি চালিয়েছে। আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে, অনেক রক্ত। তা দেখে আমার স্ত্রী কষ্ট পেয়েছে, প্রচণ্ড। খুব কেঁদেছে, তার চোখের পানি আমার সহ্য হয় না।”
‘এবারও কোনো সাড়া নেই। রিচার্ডের চোখে ক্ষীণ সন্দেহ। সে লুকাসকে ইশারা করল। লুকাস ধীরে কম্বল সরাতেই দেহদু’জনের শিরদাঁড়া জমে গেল। সবিতা বেগমের নিথর দেহ, ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। রিচার্ডের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। সে ধীর দৃষ্টিতে ঘর চাইল। হঠাৎ চোখে পড়ল খাটের নিচে ঝকঝকে একটা পার্ল। রিচার্ড সেটা তুলে আনল। নিঃশ্বাস আঁটকে রেখে দেখল এটা এলিজাবেথের পায়েলের অংশ।চোখে ঝলসে উঠল এক নতুন রহস্যের আগুন। পরপরই মস্তিষ্কে খেলে গেল পুরো ছক৷
‘দুইদিন আগের ঘটনা—
রিচার্ড অফিস থেকে ফিরে সোজা উপরে গিয়েছিল। তখন এলিজাবেথ ছিল বাগানে। ম্যানশনে ফিরেই সে দেখতে পেল সবিতা বেগম কফির ট্রে হাতে সিঁড়ি ভাঙছে। কেন জানি এলিজাবেথের মনে সন্দেহ জাগল। সে গেল রান্নাঘরে। ময়লার ঝুড়ির নিচে চোখে পড়ল এক ছোট শিশি—বিশেষ পরিচিত সেই বিষের শিশি। সবটা বুঝে গেল এলিজাবেথ। সবিতা বেগম যখন নিচে নামছিলেন, এলিজাবেথ ছুটে গেল উপরে। ঠিক মুহূর্তে রিচার্ড কফির কাপ ঠোঁটে তুলতে যাচ্ছিল। এলিজাবেথ দৌড়ে এসে কফির মগটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। রিচার্ড অবাক। কিছু না বললেও এলিজাবেথের মুখের আতঙ্ক অনেক কিছু বলে দিয়েছিল। পরে সিসিটিভিতে সবটা দেখে রিচার্ড সত্যি বুঝেছিল। সব জেনেও এলিজাবেথের মতই সে একবার ক্ষমা করেছিল সবিতা বেগমকে— ইবরাতের কথা ভেবে। কিন্তু ভুল হয়েছিল। সবিতা বেগম আবারও একই খেলায় মেতেছিলেন। জেমসের দেওয়া পেনড্রাইভ এবার সরাসরি এলিজাবেথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। জেমস প্রতিশোধস্পৃহায় এতো জ্বলছিল যে, রিচার্ড’কে বিষ দিয়ে মারতে না পেরে তিলে তিলে মারতে চেয়েছিল। জেমস আগেই রিচার্ডের একজন গার্ড’স কিনে নিয়েছিল। তার মাধ্যমেই সবিতা বেগমের কাছে বিষ আর পেইনড্রাইব দিয়েছিল।
‘এবারের ঘটনার পর রিচার্ড আর দয়া দেখাতে চায়নি।
কিন্তু তার আগেই প্রতিশোধ নিয়ে নিল সহধর্মিণী।
শান্ত, নির্ভুল, চূড়ান্ত। সবটা বুঝতে পেরে তপ্ত শ্বাস ফেলল রিচার্ড। গার্ডদের দিকে খুনের সকল আলামত সরিয়ে ফেলল। মুহুর্তেই গায়েব করে দিল সবিতা বেগমের লাশ।
‘লুকাস পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে বলল,”বস, ন্যাসোকে জানানো উচিত?”
‘রিচার্ড হনহনিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,”নাহ! ওকে অনেক মিথ্যে বলতে হবে তার স্ত্রীর কাছে। তার চেয়ে বরং সবাই জানুক মহিলা পালিয়েছে।”
‘দু’জনে গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই চমকে উঠল। ন্যাসো ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। তবে,কেউ কিছু বলল না। ন্যাসোও না। রিচার্ড চুপচাপ উঠে বসল। ন্যাসো সামনের আয়নায় চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,”বস, কোথায় যাবেন?”
ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬০
“পাবনা পাগলাগারদ।”
‘লুকাস গলা ভেজাতে শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
“বস, আপনি কি সত্যি নিজের ভাইকে মারতে যাচ্ছেন?”
‘রিচার্ডের গলা কর্কশ হয়ে উঠল। বলল,
“ইয়েস।”
