মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ২০
মুসতারিন মুসাররাত
ছবিটিতে হাস্যজ্জ্বল দুটো মুখ। কাছাকাছি বসে, মেয়েটির কাঁধ পুরুষালী এক হাতে জড়ানো। দু’জনের গালের এক পাশ একে অপরের স্পর্শে মিশে আছে। প্রত্যাশার বুকের ভেতর কালবৈশাখীর ঝড় ওঠে। তানিয়ার বলা কথাগুলো এখনও স্পষ্ট হয়ে বারবার কানে বাজছে–“আমার মেয়ে প্রীতি আর মেয়ের জামাই।” ইচ্ছের ঝমঝমে কণ্ঠে–“আমার মাম্মা আর পাপা!”
চোখের দেখা, কানের শ্রবণ অবিশ্বাস্য লাগছে। অদৃশ্য হাতে কান চেপে ধরতে চায় প্রত্যাশা। চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ওর ছোট্ট নরম-কোমল হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে নিঃশব্দে ছিঁড়ে পড়ছে।
বইয়ের পাতা উল্টানোর মতো আচমকা কিছু দৃশ্য মন মস্তিষ্ককে ভেসে ওঠে–বইয়ে পাওয়া ছবি, সেদিন বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে বাইকার নীরবই, নুপুরজোড়া, তারপর কাল মাঝরাতে অমন মূহুর্তে ইমার্জেন্সি বেরিয়ে যাওয়া। সব মিলে এক হচ্ছে এক মারণ সমীকরণে। মানতে মনটা নারাজ। তবুও সবকিছুই আঙুল তুলে প্রমাণ দিচ্ছে। যা দেখল আর শুনল সব সত্যি। এসব সত্যি হলে, ওকে বিয়ে করার কারন কী? আর বাড়ির লোকই বা জানে না কেনো?
উত্তর অজানা। তবে মন নিজেই উত্তর খুঁজে নেয়। আছে না কিছু খারাপ চরিত্রের মানুষ। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা, বাড়তি খাওয়া। প্রত্যাশার গা গুলিয়ে আসছে তীব্র ঘৃ’ণা’য়। উপরে ভদ্রতার লেবাস ধরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঠক, প্রতারক, চিটারের ট্যাগ নীরব মাহবুবের নামের পাশে বসে যায় আপনাআপনি। গলার চেইনটাও যেন তীব্র বিদ্রুপ করে বলছে–পি ফর মানেই প্রত্যাশা নয়, প্রীতিও হতে পারে। প্রত্যাশার মনে পৃথিবীর সমস্ত ঘৃ”ণা নীরবের প্রতি জমা হতে থাকে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
প্রাইভেটের সময় হয়ে যাওয়ায় হ্যাপি কোনোদিকে না তাকিয়ে সরাসরি প্রত্যাশাকে তাড়া দিয়ে বলল,
-” অ্যাই প্রত্যাশা, কী হলো? এভাবে সংয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”
প্রত্যাশার কোনো সাড়া না পেয়ে হ্যাপি হাত ধরে ঝাঁকি দিল। প্রত্যাশা সম্বিৎ ফিরে পেতেই অপ্রস্তুত গলায় বলল,
-” হ-হু।”
-” কী হ্যা-হু করছিস? চল তাড়াতাড়ি। লেট হলে স্যার ব’কবে।”
প্রত্যাশার হাত ধরে টান দিয়ে হ্যাপি গো করে হাটা ধরল। প্রত্যাশা এখনো অসাড়। মাথা হ্যাং। কী করবে বুঝতে পারছে না? এত বড় প্র’তারণা মেনে নেওয়া যায়? সবার সামনে লয়্যাল সেজে থাকা লোকটার মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। পা জোড়া থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল প্রত্যাশা। বলল,
-” তুই প্রাইভেটে যা। আমি বাসায় যাব।”
হ্যাপি বিরক্তি নিয়ে বলল,
-” বাসায় যাবি মানে? কেনো? হঠাৎ তোর আবার কী হলো?”
হতাশ শ্বাস ফেলে উত্তরে বলল প্রত্যাশা,
-” আমার ভালো লাগছে না। বেশি প্রশ্ন করিস না, প্লীজ।”
পড়তে এসেও প্রত্যাশার হুটহাট না পড়ে চলে যাওয়া, আজ নতুন নয়। তাই হ্যাপি আর বেশি কিছু বলল না। তবে আজ লক্ষ্যণীয় বিষয়; প্রত্যাশার মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, স্বাভাবিক লাগছে না। হ্যাপি কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করল,
-” তুই ঠিক আছিস? না মানে প্রত্যাশা তোর কী শরীর খারাপ লাগছে? বল আমায়? আমি তোর সাথে যাই!”
বন্ধুর উদ্বেগ প্রকাশ দেখে প্রত্যাশা ম্লান মুখেও জোর করে হাসার চেষ্টা করল। ওকে চিন্তা মুক্ত করতে বলল,
-” আরে না, আমি ঠিক আছি। কিচ্ছু হয়নি। এমনি পড়তে যেতে ইচ্ছে করছে না। তুই আমার জন্য কেনো শুধু শুধু পড়া বাদ দিবি। তুই সবকিছু ঠিকঠাক বুঝে তুলে নিস, আমি পরে পাছে তোর খাতা থেকে তুলে নেব।”
-” তোর তো আবার বিদ্যুতের হলুদ বাল্বগুলোর মতোন পড়ার মুড! যখন-তখন ফুস করে ফিউজ হয়ে যায়।”
এই বলে হ্যাপি ঠোঁট চেপে হেসে এগিয়ে যায়। অন্যদিন হলে প্রত্যাশা পাল্টা দুষ্টুমি করত। আজ তা আর হয় না। ভিড়ের শহরেও ওর ভেতরটা আজ কেমন ফাঁকা, নিঃসঙ্গ। চারপাশে গাড়ি-ঘোড়া, মানুষের কোলাহল সবই যেন অনাহুত। পিচঢালা রাস্তায় নির্বাক মূর্তির মতো হাঁটছে প্রত্যাশা। রিকশার বেল, হর্ন, চিৎকার কিছুই কানে ঢুকছে না। এক রিকশাওয়ালা যেতে যেতে চিৎকার করে বলে,
-” আফা, ম’র’তে চান নাকি? নাকি চোহে দেহেন না, সাথে ঠসাও হইছেন?”
প্রত্যাশা শ্বাস ফেলে রাস্তা পার হতে যায়। হঠাৎ চারপাশে গাড়ির মাঝে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে ও। এদিক-ওদিক দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। এক বাইকার তীব্র গলায় বলে ওঠে,
-” আরে পা’গল নাকি? এভাবে রাস্তা পার হয়। এখনি তো নিজেও যেতো, সাথে আমাকে থানায় পাঠাতো। দোষ তো হতো ড্রাইভারের। যত্তসব!”
হতভম্ব প্রত্যাশা দিকভ্রান্ত। আরেক পা বাড়াতেই সিএনজি ঘেঁষে চলে যায়। পিছন থেকে আসা মাইক্রোবাসের শব্দে শরীরটা জমে যায়। কী করবে ঠাওর করার আগেই একটা বলিষ্ঠ হাত ওর বাহু চেপে ধরে রাস্তার পাশে টেনে আনে। প্রত্যাশা পড়ে যেতে যেতে সামলে নেয়। পাশে দাঁড়ানো মানুষটি আ’তঙ্কে, রাগে, উদ্বেগে চিৎকার করে বলে উঠল,
-” আর ইউ ক্রেজি? হোয়াট দ্য হেল ওয়ার ইউ থিংকিং? ডু ইউ হ্যাভ আ ডেথ উইশ অর সামথিং?”
সামনের চেনা মুখটির দিকে তাকায়। তবে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। ওকে নিরুত্তাপ দেখে জোড়াল শ্বাস ফেলে গলার স্বর নামিয়ে বলল,
-” আর ইউ ওকে? এভাবে রাস্তা পার হচ্ছিলে! একটুর জন্য কী ঘটতে পারত, ভাবতে পারছো? তোমার আরেকটু কেয়াফুল হওয়া দরকার। না হলে কবে বড়সড় দূর্ঘটনা ঘটে যায়।”
প্রত্যাশা ধাতস্থ হতে একটু সময় নেয়। ও খেয়াল করে, লোকটা এখনো ওর বাহু শক্ত করে ধরে আছে। প্রত্যাশা ঝারি মে’রে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে নিতে তেজি কণ্ঠে বলল,
-” হাত ছাড়ুন। আর দুই হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলুন। পৃথিবীর সব পুরুষই এক; লুচু, ক্যারেক্টারলেস। মেয়ে দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছে করে! যতই ভালো সাজার চেষ্টা করুক না কেন, তাদের ভেতরের রূপটা এক। খালি বাহানায় মেয়েদের স্পর্শ করার ধান্দা।”
মুখটা তেতো করে প্রত্যাশা। সার্থক শব্দ হারিয়ে ফেলে। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজেই নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে ওর। জীবনে উপকার করতে গিয়ে এমন অপমান পাবে ভাবেনি কখনও। হেল্পের বিনিময় ছোট্ট একটা ধন্যবাদ না পেয়ে উল্টো ঝারি শুনতে হচ্ছে। তাও আবার ক্যারেক্টারলেস বলে ফেলল। একটু চুপ থেকে নরম গলায় বলল সার্থক,
-” স্যরি। আমি বাসায় ফিরছিলাম হঠাৎ তোমাকে ওই অবস্থায় দেখে গাড়ি থামিয়ে দিলাম। আর তারপর যা হলো সেটা তো তুমি দেখলে। সেই মুহূর্তে তোমাকে বাঁচানো ছাড়া আর কিছু ভাবিনি, বিশ্বাস করো। আই হ্যাড নো আদার ইন্টেনশন।”
প্রত্যাশা কোনো উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সার্থক এবার একটু চিন্তিত হয়ে তাকায় ওর দিকে। তীক্ষ্ণ চাহনিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
-” তোমাকে কেমন যেনো লাগছে! না মানে তোমাকে স্বাভাবিক লাগছে না। কিছু মনে না করলে, লিফট নিতে প__”
কথার মাঝেই প্রত্যাশা ছ্যাত করে উঠে বলল,
-” আরে থামেন তো। দরকার নেই। নো নিড লিফট-টিফট।”
সার্থকের মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে এল। কী মেয়ে রে বাবা! ভালো কথায়ও ছ্যাতছ্যাত করে উঠছে। সার্থক আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইতস্তত করে বলল,
-” তোমাকে আজ একটু অন্যরকম লাগছে। তাই তোমাকে একা ছাড়া ঠিক হবে না বলেই মনে হচ্ছে। সো, ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান ড্রপ ইউ। তুমি যদি ইনসিকিউওর ফিল করো। আমি আশ্বস্ত করতে পারি; অ্যাট লিস্ট, অ্যাবাউট মাইসেলফ। বিলিভ মি।”
‘বিশ্বাস’–শব্দটাই প্রত্যাশার বুক চিরে একটা ক্ষত খোঁচা দিচ্ছে। যে বিশ্বাস একটু আগেই ওর ভেতরটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। প্রত্যাশার দৃষ্টি নেমে আসে মাটির দিকে। এবারে গলার স্বর মিইয়ে আসলো,
-” আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমার জন্য চিন্তা করারও দরকার নেই। হেল্পের প্রয়োজন নেই, আমি একাই চলে যেতে পারব।”
সার্থক নিচু গলায় বলল,
-” একটু আগে হেল্প না করলে তো… এতক্ষণে কী হতো?”
প্রত্যাশা হালকা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
-” সেটাই বোধহয় ভালো হতো।”
-” হোয়াট?”
-” নাথিং।”
আর বাড়তি কথা না বলে হাঁটতে শুরু করে প্রত্যাশা। সার্থক তাকিয়ে থাকে পিছন দিকে সরে যাওয়া ছায়ার দিকে। এমন সময় একটা খালি রিকশা চোখে পড়ে। রিকশাওয়ালাকে ডাকে, তারপর প্রত্যাশাকে,
-” প্রত্যাশা? ওয়েট।”
প্রত্যাশা বিবর্ণ, বিরস মুখে থামে। সার্থক এগিয়ে এসে বলে,
-” আমার গাড়িতে যেতে হবে না। এই রিকশাটাই নাও। অন মাই রিকুয়েস্ট, এবার অন্তত না বলো না…. প্লীজ।”
প্রত্যাশা একপল চুপচাপ তাকিয়ে পরপর রিকশায় চেপে বসল। রিকশা গতি নেয়, সার্থক চেয়ে রয়। যতদূর দেখা গেল সার্থক চেয়ে থাকল। প্রত্যাশাকে আজ একটু অন্যরকম লাগল। এই নিয়ে ভাবতে লাগল সার্থক।
পড়ার টেবিলে বই সামনে নিয়ে বসে আছে প্রত্যাশা। দৃষ্টিজোড়া বইয়ের পাতায় থাকলেও মন-মস্তিষ্ক উদাস। ভেবেছিল প্রথমে মা’কে জানাবে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে কিছু বলার আগেই যা শুনল, তাতে আর জানাতে ইচ্ছে করল না। মা আপুর সাথে ফোনকলে ব্যস্ত। শুনল–মাহবুব সাহেব নাকি অসুস্থ। ক’বছর আগে হার্টে রিং পড়ানো হয়। তারপর বয়স বাড়ার সাথেসাথে কিছু রোগ জেঁকে ধরেছে, হাই প্রেশার, ডায়াবেটিস। হঠাৎ বিকেলে হালকা বুকে ব্যথার সাথে প্রেশার বাড়ায় ডক্টরের কাছে চেকাপ করতে নিয়ে যায়।
ও বাড়ির সবাই আন্তরিক। তারপর এই লোকটার ব্যবহার, আদর প্রত্যাশার প্রতি খুব বেশিই ছিলো। উনি অসুস্থ। এখন এসব খবর শুনলে আরো অসুস্থ হতে পারেন ভেবে প্রত্যাশা আর কাউকে জানাল না।
বাবার টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে ডক্টরকে দেখিয়ে ফিরতে ফিরতে নীরবের রাত সাড়ে নয়টা বেজে যায়। শাওয়ার নিয়ে কাবার্ড খুলে টিশার্ট বের করতে গিয়ে হঠাৎ সাদা শার্টটায় নজর পড়ল। সাদা শার্টের কলারে লাল লিপস্টিকের একজোড়া ঠোঁটের ছাপ। সাথে সাথে প্রত্যাশার সেদিনের পাগলামির দৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠল নীরবের। অধর কোণে একফালি হাসি ফুটল ওর। আঙুল ছুঁয়ে দিল রঙিন জায়গাটায়।
এইযে বিয়ের পর দু’বার এসেছে, প্রতিবারই এটাসেটা ফেলে যায়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে হেয়ার ব্যান্ড, ক্লিপ আরো ছোটছোট সাজগোজের জিনিস। নীরব সেগুলো সযত্নে গুছিয়ে রেখেছে। পরপর গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে পরিপাটি হয়ে কাংখিত নম্বরে ডায়াল করল নীরব।
বইয়ের উপর মাথা রেখে চোখবুঁজে আছে প্রত্যাশা। চোখের পাশে শুকনো দাগ, নিঃশব্দে, নীরবে কান্নার সাক্ষী। নিস্তব্ধ কক্ষে ভাইব্রেট থাকা ফোনটা বুমবুম শব্দ তুলে কাঁপছে। প্রত্যাশা ধীরেধীরে চোখ মেলে তাকায়। প্রথম বার কল কে’টে দ্বিতীয় বার ফের বাজতে লাগল। প্রত্যাশার ফোন তুললে রুচিতে বাঁধল। ও জানে ওই মানুষটার সাথে ওর আর স্বাভাবিক কথা কখনোই হবে না। আংকেল সুস্থ হলেই ও সবাইকে সবটা জানাবে। তারপর এই সম্পর্কটা থেকে মুক্তি চাইবে।
তৃতীয় বার কলের পর প্রত্যাশা ফোনের পাওয়ার অফ করে ফোনটা শব্দ করে নামিয়ে রাখল। ওই লোকের দেওয়া সবকিছু যেদিন মুখের উপর এভাবে ছুঁড়ে ফেলবে সেদিন ওর একটু হলেও শান্তি মিলবে। যে স্পর্শগুলো স্বর্গীয় সুখানুভূতি দিয়েছিল, এখন সেটা ওর গা ঘিনঘিনের কারন মনে হচ্ছে। মনে পড়লেই সমস্ত শরীর বি’ষে নীল হয়ে যাওয়ার মতো বিষিয়ে উঠছে।
ফোন বন্ধ শুনে নীরবের মেজাজটাই তেতো হলো। ভাবল- প্রত্যাশা যে কেয়ারলেস নিশ্চয় চার্জ নেই, তাই একাই ফোন অফ হয়ে গিয়েছে।
পরেরদিন…
লাঞ্চ শেষে অফিসে ফিরে নিজের কক্ষে বসে একগুচ্ছ ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল নীরব। হালকা বিরক্ত চোখে হাতঘড়ির দিকে তাকাল; তিনটা বেজে সাত মিনিট। ফাইলটা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখল। তারপর প্রত্যাশার নম্বরে কল দিতেই সুইচড অফ আছে শুনে ভ্রু কুঁচকে গেল নীরবের। আজ প্রায় দুদিন হতে চলল প্রত্যাশার সাথে কথা হয় না। অস্থিরতা, একরকম শুন্যতা মনকে আঁকড়ে ধরেছে। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না ও। একরকম নিরুপায় হয়েই ফোন করল অধরাকে। সালাম দিয়ে ভদ্রভাবে সৌজন্যতা মেইনটেইন করে। তারপর লজ্জা ইতস্তত বোধকে একপাশে ঠেসে রেখে বলল,
-” আন্টি, প্রত্যাশার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। ও কি বাসাতে আছে?”
অধরা কিঞ্চিৎ অবাক সুরে বলেন,
-” ফোন বন্ধ?”
একটু থেমে বললেন,
-” হ্যাঁ বাবা, ও তো রুমেই আছে। আমি ডেকে দিচ্ছি, একমিনিট।”
ঘরটা আধো অন্ধকার, পর্দা টানা। বাইরে দুপুর হলেও ঘরের ভেতরটা যেন বিষণ্ন অন্ধকারে ঢাকা। অধরা ডেকে উঠলেন,
-” প্রত্যাশা, তোর ফোন বন্ধ কেন? নীরব ফোন করেছে।”
প্রত্যাশা বালিশে মুখ গুঁজে ছিল। ঝিম ধরা গলায় বলল,
-” চার্জ শেষ হয়ে গেছে বোধহয়।”
নীরব লাইনেই আছে।
-” এই নাও, কথা বলো।”
অধরা ফোনটা প্রত্যাশার হাতে দিয়ে প্রস্থান করে। মায়ের সামনে কিছু বলতে না পেরে অনিচ্ছা নিয়ে ফোনটা কানে তুলল প্রত্যাশা। ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠে ডাক এল,
-” প্রত্যাশা?”
ডাকটার ভেতরে কী ছিল জানে না প্রত্যাশা, কিন্তু বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে হাহাকার করে উঠল। প্রত্যাশা নিরুত্তর রইল। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো। নীরব আবার জিজ্ঞেস করল,
-” প্রত্যাশা, তুমি শুনতে পাচ্ছো?”
নিস্তেজ উত্তর দিল,
-” হুঁ।”
-” কী হয়েছে তোমার? ফোন দাও না, আমি দিলে ধরো না, আর এখন তো কথাও বলছো না। তুমি আজকাল বড্ড জ্বা’লাচ্ছো আমায়।”
প্রত্যাশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃ’ণা ওকে ভেতর থেকে জর্জরিত করে দিচ্ছে। একটা মানুষ এত নিখুঁত অভিনয় কী করে করতে পারে? সেদিন রাতে নীরবের বলা সব কথাই মিথ্যে ছিলো? সবই অভিনয়? প্রত্যাশা তাচ্ছিল্য হেসে ত্যাড়া সুরে বলল,
-” সমস্যা নেই….আপনার তো কথা বলার লোকের অভাব নেই, তাই না?”
নীরব কপাল কুঁচকে বলল,
-” মানে?”
প্রত্যাশা হঠাৎ আচমকা জিজ্ঞেস করল,
-” নীরব আপনার লাইফে, ভালোবাসি কথাটা সর্ব প্রথম কাকে বলেছেন?”
মেয়েটা ইমম্যাচিউর। তাই ওর এহেন প্রশ্নে অবাক না হয়ে নীরব হাসল। নিঃশব্দে হেসে বলল,
-” আমার বউকে?”
-” আমাকে নয়। রাইট?”
-” ও প্রত্যাশা হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বন্ধ করো। তুমি ছাড়া আমার আর কটা বউ আছে শুনি?”
-” সেটার সঠিক হিসাব আপনি জানেন। আমি জানি না। ভবিষ্যতে সংখ্যা বাড়লেও অবাক হবো না।”
-” তুমি নিশ্চয়ই কিছু একটা নিয়ে অভিমান করেছো। প্লিজ স্পষ্ট করে বলো। না বললে আমি বুঝব কী করে?”
প্রত্যাশা নিরুত্তাপ থাকল। নীরব ভাবল বন্ধুরা বলে– মেয়েরা বিয়ের প্রথম প্রথম বরের সাথে একান্তে থাকতে চায়, বরের সাথে সময় কাটাতে চায়। সত্যিই তো ব্যস্ততা, কাজ, ঝামেলা সবমিলিয়ে প্রত্যাশাকে একদমই সময় দেওয়া হয়নি। নীরব হালকা কেশে বলল,
-” প্রত্যাশা সন্ধ্যায় রেডি হয়ে থেকো। আমরা লং ড্রাইভে যাব। তারপর ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে। আমি তোমার বাসায় ফোন করে বলে রাখব। সো ঠিক সন্ধ্যে সাতটার আগেই রেডি হয়ে থেকো। বাই।”
রাগে আর অদ্ভুত এক হতাশায় প্রত্যাশার শরীর কাঁপছিল। একদম নিঃশব্দে ফোনটা নামিয়ে রাখে ও।
নীহারিকা কিচেন থেকে পায়েশের বাটি এনে টেবিলে নামিয়ে রাখতেই দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল। পরী ছুটিতে, শর্মিলা আনিশাকে নিয়ে পার্কে, মাহবুব সাহেব হাঁটতে গেছেন, ছেলেরা বাইরে, বাড়িতে শুধু তিনি আর নীলা। শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছে দরজা খুলতেই চোখ কপালে উঠল। একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলেন,
-” তুমি?”
উত্তর আসার আগেই আরেক দফা চমকালেন। প্রত্যাশার পাশে গোলাপি রঙের ফ্রক পড়ে একটা আদুরে পুতুলের মতো দেখতে বাচ্চা মেয়েকে দেখে। নীহারিকা ইশারা করে বললেন,
-” বাচ্চা মেয়েটাকে কে? আর তুমি এই সময় হঠাৎ?”
-” বাচ্চা মেয়েটা আপনার ছেলের খুব পরিচিত।”
-” নীরবের পরিচিত?”
-” জ্বী।”
প্রত্যাশার হেঁয়ালিপূর্ণ কথা শুনে নীহারিকার বদনে বিরক্তির ছায়া গাঢ় হয়। বলা নেই কওয়া নেই! প্রত্যাশার হঠাৎ আগমনে মনেমনে অসন্তুষ্ট হোন নীহারিকা। কিছু বলতে গিয়েও চুপ রইলেন। শেষে শোনা যাবে, নীরবই এনেছে। প্রত্যাশার ছোঁয়া নীরবের মধ্যেও লেগেছে। নীরবও আজকাল কান্ড জ্ঞানহীন হয়ে পড়েছে। ইচ্ছে গোলগোল চোখ করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকিছু দেখছে। নীহারিকা বাচ্চা মেয়েটার রাজ্যের মায়ামাখা মুখটায় চেয়ে থাকলেন। ইচ্ছে প্রশ্ন করল,
-” তুমি বললে, পাপার কাছে আনবে। কই পাপা?”
-” একটু অপেক্ষা করো। চলে আসবে এক্ষুনি।”
নীহারিকা জিজ্ঞেস করলেন,
-” নীরবের কোনো বন্ধুর মেয়ে? নীরব তোমাদের নামিয়ে দিয়ে গেছে? কোথায় ও এখন?”
-” চলে আসবে এক্ষুনি। এতক্ষণে রাস্তায় আছে হয়তো। আপনার ছেলে আসলেই মেয়েটার আসল পরিচয় জানতে পারবেন।”
উত্তর শুনে মেজাজ চটল নীহারিকার। ইচ্ছে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
-” পানি….পানি কাবো।”
নীহারিকা পানির গ্লাস এনে ধরে খাওয়িয়ে দিলেন। মেয়েটার জোড়া ভ্রু, সরু নাক, চোখদুটো কেমন চেনাচেনা মনে হচ্ছে। আর অদৃশ্য একটা আত্মার টান কাজ করছে নীহারিকার মধ্যে। আদুরে স্বরে বললেন,
-” পায়েস খাও? আনবো? খাবে তুমি?”
ইচ্ছে ঘাড় কাত করে বলল,
-” হুম।”
বাটিতে পায়েস এনে চামুচে তুলে খাওয়িয়ে দিতে থাকে। এরমধ্যে নীলা এসে প্রত্যাশাকে দেখে থমকায়। জিজ্ঞেস করেও প্রত্যাশা নিরুত্তাপ থাকে। হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে আছে ও। শাশুড়িকে আদর করে বাচ্চাটাকে খাওয়িয়ে দিতে দেখে নীলা ঠোঁট উল্টে ভাবল– এটা আবার কে? প্রত্যাশা কই থেকে আমদানি করল? ও যেমন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, এটাও তেমন হবে না তো!
প্রত্যাশাকে ঝিম মে’রে বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখে নীহারিকা পানসে মুখে বললেন,
-” শরীর খারাপ লাগছে কী তোমার? খারাপ লাগলে রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
মিহি স্বরে জবাব দেয়,
-” ঠিক আছি আমি।”
ইচ্ছের মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর নিজের আঁচল দিয়ে যত্ন করে মুছে দিলেন নীহারিকা। ইচ্ছে থেকে থেকে দু একটা কথা বলছে, এটা-ওটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছে। নীলা প্রত্যাশার হাবভাব কিছুই ঠাওর করতে পারছে না। প্রত্যাশা এত চুপচাপ? ও তো এত চুপচাপ থাকার মেয়ে নয়।
তখন নীরবের সাথে কথা বলার পর প্রত্যাশা সিদ্ধান্ত নেয়; ও আর টাইম ওয়েস্ট করবে না। আর নীরবের সাথে ঘুরতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যদি মুখে বলি, কেউ বিশ্বাস করবে না। নীলার মতো সবাই বলবে, প্রত্যাশাই রং। নীরব লয়্যাল, এরকম কিছু হতেই পারে না। তারপর প্রীতিকেও জানাতে হবে। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার দিন শেষ করতে হবে। তাই প্রত্যাশা প্রাইভেটে যাওয়ার নাম করে ইচ্ছেদের বাসায় যায়। ইচ্ছে গার্ডেনে মনার সাথে খেলছিল। প্রত্যাশা ইচ্ছেকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে নিজের সাথে আনে। মনা দিবে না। ম্যাডাম, স্যার রক্ষে রাখবে না। প্রত্যাশা নিজের ফোনে নীরবের ছবি দেখিয়ে বলে–উনি নিতে বলেছে। আরো হ্যানোত্যানো বুঝ দিয়ে ইচ্ছেকে নিয়ে আসে। তারপর সেকেন্ড কাজ ছিলো নীরবকে মেসেজ দেওয়া। প্রত্যাশার বিশ্বাস নীরব সন্ধ্যার আগেই আসবে। ইচ্ছে বারবার জিজ্ঞেস করছে,
-” অ্যাই….পাপা কই? আমি বাসায় যাব। মাম্মা ব’ক’বে।”
-” একটু অপেক্ষা করো সোনা। তোমার পাপা আসবে, মাম্মাও আসবে।”
ইচ্ছের মা আসবে। মেয়েকে খুঁজতে নিশ্চয় আসবে। মনার কাছে এএসপি নীরবের ঠিকানা দিয়ে আসছে প্রত্যাশা। আজ সবাইকে মুখোমুখি হতে হবে। ইচ্ছে, প্রীতি; এদের সামনে নীরবকে সত্যিটা বলতে হবে। প্রত্যাশার কথা তখন আর কেউ হেসে উড়িয়ে দিতে পারবে না। যেমন বিয়ের দিন ছবিটার কথা বলেও কোনো লাভ হয়নি। আজ ছবি নয়, জলজ্যান্ত প্রমাণ সামনে থাকবে।
কিছুক্ষণ পর বেল বাজতেই নীলা দরজা খুলে দেয়। নীরব সৌজন্যমূলক কথা বলে ভেতরে আসতে থাকে। ইচ্ছে নীহারিকার সাথে গল্প করছে। নীহারিকা কথার ফাঁকে প্রত্যাশাকে পর্যবেক্ষণ করছে। নীরব এগিয়ে আসতেই ইচ্ছে লাফিয়ে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল,
-” ওই তো পাপা এসেছে!”
এক গাল হেসে ইচ্ছে এলোমেলো পা ফেলে দৌড়ে গেল। নীরব অবাক! ইচ্ছে দুই হাতে নীরবের কোমড় জড়িয়ে ধরল। মাথাটা উঁচিয়ে বলল,
-” পাপা….”
নীরব ঝুঁকে দুই হাতে ইচ্ছের গাল আজলে ধরল। অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল,
-” ইচ্ছে! তুমি এখানে…”
বলতে বলতে দৃষ্টি গেল সোফায় বসা প্রত্যাশার দিকে। দুই হাতে কপাল চেপে ধরে আছে। ইচ্ছের এরুপ সম্বোধনে নীহারিকা, নীলা দু’জনেই তা’জ্জব বনে যায়। নীলা বিড়বিড় করে আওড়ায়,
মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ১৯
-” লে বাবা! আমার পরে বিয়ে হয়ে নীরব-প্রত্যাশা এত বড় বাচ্চা পেল কই থেকে?”
পরপর জিভ কা’মড়ে ফের বিড়বিড় করে বলল,
-” ধূরু! আমিও না কী যা তা বো’কার মতো ভাবছি। বাই দ্য ওয়ে বাচ্চা মেয়েটা নীরবকে পাপা ডাকছে কেনো? হুয়াই?”
