মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৩৯
মুসতারিন মুসাররাত
একে একে প্রত্যাশার সব পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ভেবেছিল — পরীক্ষা শেষে কোথায় একটু নিশ্চিন্তে আরামসে ঘুম দিবে, চিল করবে। কিন্তু হায়! সে স্বপ্নে এখন গুড়ে বালি। বেচারি এখন পড়ে আছে বিয়ের অনুষ্ঠানের হাজারটা ঝক্কি-ঝামেলায়।
পরশু শেষ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল শপিংয়ে। সাথে নীলা -নিভানও ছিলো। বিয়ের দিনের শাড়িটা কিনেছে নীরবের পছন্দে। ডিপ লাল-খয়েরি রঙের, ভারি কাজ করা। আর হলুদ, বউভাতের শাড়ি সবই প্রত্যাশার নিজের পছন্দে। নীলা তো ভেতরে ভেতরে খুব ক্ষে”পেছিল। সব যদি প্রত্যাশার পছন্দেরই হয় তাহলে ওকে আনার কী দরকার ছিলো? আর নীরব, বউ বলছে সেটাই শুনছে। অবশ্য নিভান তার বেহুদা রা”গ করা বউকে সামলে নিয়েছিল। ওদেরকে বুঝতে না দিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে বড় ভাবিকে গর্জিয়াস শাড়ি দিতে ভোলেনি নীরব। তারপর বাড়ির সবার জন্য হালকা-পাতলা কিছু নেয়া হয়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বিকেলটা মেঘে ঢাকা, সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ঘরভর্তি স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়া। প্রত্যাশার মনটাও আবহাওয়ার মতো ম্যারমেরে হয়ে আছে। বালিশ বুকের নিচে রেখে ফোন স্ক্রল করছিল। ফোন ঘাঁটতেও ভালো লাগছে না। মাথায় চলছে কেমিস্ট্রির ফার্স্ট পেপার নিয়ে টেনশন। পিরিয়ডিক টেবিল থেকে মৌল শনাক্ত করার প্রশ্নে মা”রা”ত্ম”ক ভুল করে এসেছে সে। অথচ কী যত্ন করে মৌল শনাক্ত করে চিত্র এঁকেছিল, ইলেকট্রন বিন্যাস দেখিয়ে বর্ণনা করেছিল। পাতা ভর্তি করে ‘ঘ’ নম্বরে বিশ্লেষণ করল। সবই বিফলে গেলো। বাসায় ফিরে বই খুলে দেখা মাত্রই মাথায় হাত ওঠে। ‘গ’ আর ‘ঘ’ পুরোপুরি ভুল। এক ফোঁটা নম্বরও পাওয়া যাবে না। বাকি প্রশ্নের উত্তরও যে ভালো হয়েছে এমন নয়। সেকেন্ড পেপার অবশ্য মোটামুটি হয়েছে। তবুও এক অজানা টেনশন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ভিতরটা। ফেল করবে এমন নয়। ফেল সে করে না, তবে রেজাল্ট যে ভালো হয় এমনও না। এবার শেষের দিকে এসে পড়াশোনায় একটু মনোযোগ দিয়েছিল। এসব ভুল দেখে বেচারি খুব হতাশ। এরমধ্যে ফোনটা কেঁপে উঠল। রিসিভ করে বলল,
-” হ্যাঁ, বলুন।”
ওপাশ থেকে গলার স্বর শুনেই নীরবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,
-” মন খারাপ?”
-” নাহ।”
-” গলার স্বর ভারী ভারী মনে হচ্ছে।”
-” উঁহু, তেমন কিছু নয়। অনেকক্ষণ হলো শুয়ে আছি তাই বোধহয়।”
-” ওহ্।”
-” আপনি কোথায়?”
-” অফিসে।”
-” বাসায় যাবেন কখন?”
-” দেরি হবে। রাত নটার পরে।”
-” এত দেরিতে কেনো? কাজ আছে বেশি?”
-” উঁহু। বাসায় বউ নেই তাই তাড়াতাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই।”
-” অফিসে সুন্দরী মেয়ে কলিগ আছে টাছে? এমনিতেও আপনাদের প্রফেশনের মেয়েদের ফিগার চোখে লাগার মতো হয়। ছুঁকছুঁকানি স্বভাব আছে নাকি?”
-” আসতাগফিরুল্লাহ।”
প্রত্যাশা ঠোঁট টিপে হাসল। নীরব হঠাৎ শুধাল,
-” গতকাল কেনাকাটার সময় তোমাকে অন্যমনস্ক লাগলো। ভাইয়া-ভাবী সাথে ছিলো বলে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তুমি কী কিছু নিয়ে টেনস?”
-” আসলে পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে একটু-আকটু চিন্তিত। এর আগে কখনো এরকম হয়নি, এবারেই প্রথম হচ্ছে। রেজাল্ট খারাপ হলে…”
নীরব সাথে সাথেই বলল,
-” ডোন্ট ওয়ারি। এটা নিয়ে আর টেনশন করবে না। তুমি মন থেকে চেষ্টা করেছো, সেটাই অনেক বড় বিষয়। জীবনে যে জিততে চায়, তার আগে কিছু হেরে শেখা দরকার। রেজাল্ট কোনো ব্যাপার না। সামনে আরো সময় পড়ে আছে।”
প্রত্যাশা হতাশ স্বরে বলল,
-” জানেন, মানুষের দেখি ভুল করেও ঠিক হয়। আর আমার ক্ষেত্রে? পারা জিনিসটাও ভুল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, কী দিয়ে ঘষেঘষে যে এই ফাটা কপালটা বানানো হয়েছে। শুধু কি পরীক্ষায়? উঁহু! লাইফের প্রতিটা জায়গায় বাঁশ খাই আমি। দু’দিন ভালো গেলেই, তৃতীয় দিনে কোথা থেকে কোন প্রব্লেম এসে হাজির হয়। কে কাকে খোঁজে বুঝি না! আমি সমস্যা খুঁজি, না সমস্যা আমায় খুঁজে বেড়ায়?”
-” মাঝেমাঝে জীবনে একটু সমস্যা থাকাটা দরকার। যাতে করে আমরা শিখতে পারি, বুঝতে পারি; ভালো থাকাটা আসলে কতটা মূল্যবান। সবকিছু যদি সবসময় ঠিকঠাক চলত তাহলে সুখের আসল মূল্যটা কেউ বুঝত না। যাইহোক সবকিছুর জন্য ধৈর্য্য ধারণ করতে হয়। উপরওয়ালার প্রতি বিশ্বাস রেখে চলতে হয়। অন্যায় না করলে তিনি নিশ্চয়ই উত্তম কিছুই দেবেন।”
-” হুম, সেটাই।”
-” আচ্ছা সব দুশ্চিন্তা দূর করে আনন্দ করো। পাছে আবার আমাকে দোষারোপ করে বসবে, এসব টেনশনে বিয়েতে মজা করতে পারোনি।”
প্রত্যাশা গমগমে স্বরে বলল,
-” পরে কী আমি তো এক্ষুনি বলছি; আমি পারছি না মন থেকে এসব টেনশন দূর করতে, আর এরমধ্যে ওদিকে আপনার বউকে ঘরে তোলার তাড়া লেগেছে। যেন এখনই বউ তুলে না আনলে মহাবিপদ হয়ে যাবে। অনুষ্ঠান ছাড়া কী যাইনি আমি? চারমাসে চৌদ্দবার আসা-যাওয়া হয়ে গেল ও বাড়ি। আর ক”টা দিন দেরি করলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো শুনি! উফ্!”
নীরব কণ্ঠে ফাজলামো নামাল,
-” অপেক্ষা করার ধৈর্য্য নেই। অনেকদিন কষ্ট করে ধৈর্য্য ধরেছি। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার জন্য হলেও আমার বিয়ে করা বউ আমার বাসায় চাই। রোজ বাসায় ফিরে সারাদিনের ক্লান্তি, অবসাদ দূর করতে বউয়ের মিষ্টি মুখ দেখা জরুরী।”
এরমধ্যে অধরার গলা কানে আসতেই প্রত্যাশা বলল ঝটপট,
-” আম্মু ডাকছে। এখন রাখছি। রাতে কথা বলব।”
-” ওকে। আল্লাহ হাফেজ।”
-” আল্লাহ হাফেজ।”
ড্রয়িংরুমে বেশ শোরগোল হচ্ছে। কথাশুনেই বোঝা যাচ্ছে কোনো আত্মীয় এসেছে। প্রত্যাশা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে অকস্মাৎ বিড়বিড় করল,
-” বাসা ভর্তি মেহমানের হৈচৈ একদন্ড শান্তিতে নিরিবিলি থাকার জো তো নেইই। আবার তাদের সাথে দেখা হলে প্রথম কথাই থাকে— ‘হ্যাঁ রে প্রত্যাশা পরীক্ষা কেমন দিলি?’ যদি বলি; ভালো হয়েছে। তাদের সেকেন্ড কথা; ‘কেমন ভালো দিলি রেজাল্টেই দেখা যাবে। জামাই অনেক শিক্ষিত, শ্বশুরবাড়ির মানসম্মান নৌকা ডোবানোর মতো ডুবাস না আবার।’ এমনিতেই রেজাল্টের চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছি। তারউপর আত্মীয় স্বজনের এসব কথা শুনে বুকের ভেতর এমন ছ্যাঁকা লাগে। মনেহয় গরম চায়ের কাপটা হাতে না উঠে সরাসরি কলিজার ওপর পড়ে গেছে।”
স্লিপারে পা গলিয়ে এগোতে এগোতে ভাবল— কোন এলার্জি আত্মীয় যে এবার এল।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ। পরশু শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠান কমিউনিটি সেন্টারে করা হবে।
টেবিলের উপর নারিকেল কুড়ানো ছিলো। আম্মু বোধহয় তেলে ভাজা পিঠা বানাবে। প্রত্যাশা ছোট বোলে নারিকেলের কুঁড়া, চিনি আর কিছু মুড়ি নিয়ে সোজা ব্যালকনিতে আসে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর দমকা হাওয়া বইছে। মনটা ফুরফুরে করতে চামচ দিয়ে মিক্সড করতে করতে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল প্রত্যাশা,
-” পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে
পাগল আমার মন জেগে উঠে॥
চেনাশোনার কোন্ বাইরে,যেখানে পথ নাই নাই রে সেখানে অকারণে যায় ছুটে॥
……………………….
পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে
পা’গ’ল আমার মন জেগে উঠে।
চামচে তুলে মাত্র মুখে পুড়েছে প্রত্যাশা আর ঠিক তক্ষুনি নীলাশার গলা এল। হাতের ফোনটা প্রত্যাশার সামনে ধরে বেশ নম্র স্বরে,
-” এইযে প্রত্যাশা, নিন ওর সঙ্গে কথা বলুন।”
পরপর প্রত্যাশার দিকে ভ্রু নাড়িয়ে ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলল,
-” নে ধর ফোন। কথা বল।”
প্রত্যাশার গালভর্তি খাবার। ফোনের স্ক্রিনে একগাদা অপরিচিত মুখ। এখন খাবারই গিলবে নাকি কথা বলবে? অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করে উঠল। কোনো রকমে ফোনটা হাতে নিয়ে ফ্রন্ট ক্যামেরা পাল্টে ব্যাক ক্যামেরা অন করল। গালের খাবার দ্রুত গলাধঃকরণ করে নীলার দিকে রাগত চাউনি ছুঁ’ড়’ল। ফোনের স্পিকারে হাত চেপে রেখে ঠোঁট চেপে বলল,
-” আপু তোমার আক্কেল দাঁত উঠেনি?”
নীলাশার মেজাজ বিগড়ে গেল। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
-” মানে? কী বলতে চাইছিস?”
-” দেখোছো খাচ্ছি, হাতে খাবারের বোল। এরমধ্যে বলা নেই, কওয়া নেই দুম করে ফোন সামনে ধরলে। ভিডিও কল, তাও আবার শ্বশুরবাড়ির অপরিচিত লোকজন। গালে আমার খাবার, দেখেও বলে; কথা বল।”
-” আমি খেয়াল করিনি তোর মুখে খাবার। আর এখন বল।”
প্রত্যাশা আইগুই করে বলল,
-” ধূর, এদের চিনি না। কী বলব?”
-” তোকে কিছু বলতে হবে না। চুপচাপ হেসে হেসে হ্যা, হুঁ করিস। তাহলেই চলবে। আবার কী বলতে কী বলে ফেলবি উল্টাপাল্টা। তখন আমার সম্মানও যাবে।”
ওড়নাটা ভালো করে মাথায় টেনে মুখে হালকা হাসি নিয়ে প্রত্যাশা সালাম দিলো। ওপাশে আবিরের নানু জয়নব আরা সহ আরো বেশকজন আত্মীয়। ওনারা সব বায়না ধরেছে নতুন বউকে দেখবে। একজন অল্প বয়সী ভাবী টাইপের মহিলা হেসে হেসে দু চারটে কথা বলল। নীহারিকা এসে ফোন ধরলেন। কথা বলার এক পর্যায়ে বললেন,
-” তোমার আম্মু কোথায়? কথা ছিলো একটু।”
-” একটু অপেক্ষা করুন, আমি আম্মুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
প্রত্যাশা যেতে যেতে আরো দু একটা কথা বলল। জয়নব আরা হঠাৎ মশকরা করে পাশ থেকে বলে উঠলেন,
-” নিভানের মা তোমার বেয়াইনকে জিজ্ঞেস করো, মেয়েকে কী পাতিলের তলার পোড়া ভাত খাওয়াইছিলো নাকি? তাই এমন বৃষ্টি-বাদল দিনে বিয়া হইতাছে। বৃষ্টি থামনের নামই নিচ্ছে না।”
নীহারিকা কিছুই না বলে চুপ রইলেন। প্রত্যাশা ফট করে বলে উঠল,
-” বিয়ে কিন্তু শুধু মেয়ের মায়ের মেয়েরই হচ্ছে না। ছেলের মায়ের ছেলেরও হচ্ছে। তাহলে কেনো শুধু মেয়ের মায়েরই দোষ?”
এতক্ষণে প্রত্যাশা অধরার কাছে চলে এসেছে। অধরা চোখ রাঙালেন মেয়ের দিকে। ফিসফিসিয়ে বললেন,
-” তোকে নিয়ে আর পারি না। প্রতিটা কথারই উত্তর দিতে হবে? সেটাও পা”গলের মতো। কবে যে একটু বুদ্ধি শুদ্ধি হবে তোর।”
প্রত্যাশা ফোন দিয়ে গাল ফুলিয়ে রাখল। কী ভুল বলল? বুঝে আসছে না ওর। সব সময় দেখে আসছে, ভালোটা হলে ছেলের মায়ের দিকে প্রশংসার ঝুলি। আর ম’ন্দে’র বেলায় অযাচিতভাবে মেয়ের মা দোষী।
নারিকেল দিয়ে মুড়ি খেয়ে প্রত্যাশার অ্যাসিডিটি বেড়ে বদহজম হয়েছে। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত তিনবার গলগলিয়ে বমি করে ভাসিয়েছে। অধরা গ্লাসে স্যালাইনের পানি এনে মেয়ের সামনে ধরলেন। রাগ-ক্ষোভ মিশিয়ে চেঁচালেন,
-” ধর, স্যালাইন পানিটা খেয়ে নে। কিছু বললি তো শুনবি না। একটা না একটা অঘটন ঘটিয়ে ছাড়িস। কে বলেছিলো ওসব খেতে? রাতভর বমি করে ভাসালি। বেলা বারোটা বাজতে চলল কিছুই খাচ্ছিস না। পেট ফুলে আছে। এদিকে সন্ধ্যায় হলুদ, ও বাড়ি থেকে লোকজন আসবে। এখন এভাবে বিছানায় পরে থাকবি। আমার হয়েছে যত জ্বালা। এখন তোর পিছনেই সময় দেবো, নাকি বাড়িভর্তি মেহমানদের দিকে নজর দিবো। আরো কাজ আছে আমার।”
দূর্বল হাতে স্যালাইনের গ্লাস হাতে নিয়ে চোখ বুজে এক ঢোক গিলে প্রত্যাশা। অধরা শুধালেন,
-” ঔষধ রেখে গিয়েছিলাম, খেয়েছিস?”
প্রত্যাশা ঘাড় কাত করে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়। অধরা ফের বললেন,
-” দেখো দেখি, এক বেলায়ই চোখমুখের কী হাল হয়েছে। চোখ ডেবে গর্তে ঢুকেছে।”
হা হুতাশ করে অধরা বেরিয়ে গেল। হ্যাপি, কোয়েল আজ সকালেই এসেছে। কোয়েল দুষ্টু হেসে বলল,
-” আমার তো তোর বরের জন্য মায়া হচ্ছে রে প্রত্যাশা।”
প্রত্যাশা প্রশ্নবোধক চাউনিতে তাকাল। কোয়েল কানের পাশে মুখ টেনে ফিসফিসিয়ে বলে,
-” প্রথমবার বিয়ের চারমাস গেলেও বাসর অসম্পূর্ণ। এখন দ্বিতীয়বারের বাসরটাও না তার মাটি হয়। বউয়ের অসুস্থতার জন্য। তাড়াতাড়ি মেডিসিন খেয়ে সুস্থ হয়ে যা তো।”
-” তুই আসলেই লুচু মহিলা। আর দ্বিতীয়বার বিয়ে কী? এবারে শুধু রেজিঃ হবে। ধর্মীয়ভাবে তো বিয়ে হয়েছেই।”
আরো ক-ঢোক স্যালাইন পানি গিলে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল প্রত্যাশা। মাথার উপর ঘূর্ণীয়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত ভঙিতে বলে,
-” ধূর! কাল শুধু শুধু কতগুলো টাকা খরচা করে ফেসিয়াল করে আসা হলো। একদিনেই চোখের নিচে কালি জমেছে। টাকাগুলো সব জলে গেল।”
হ্যাপি বলল,
-” ঠিকমতো খাবার খা, এখন একটু ঘুমা দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।”
কোয়েল বলল,
-” ব্যাপার না, আজ দুপুরে আবার ফেসিয়াল করতে যাবি। খরচ দিবে তোর বর, তোর এত চিন্তা কিসের? নাকি খুব হিসেবি বউ হবি তুই?”
এরমধ্যে নীলার স্বর আসে। রুমে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল,
-” প্রত্যাশা, মেঝো মামার নম্বর আছে তোর কাছে? মামা বাজারে গিয়েছে। আম্মু বলল ফর্দে কয়েকটা জিনিস বাদ পড়েছে। মামাকে বলতে হবে।”
প্রত্যাশা ফোন দেখিয়ে বলল,
-” বালিশের পাশে ফোন দেখো সেভ করা আছে।”
-” লক খুলে দে।”
প্রত্যাশা লক খুলতে থাকে। নীলা বলে উঠল,
-” এ বাড়িতে এসে এক দন্ড স্বস্তি পাচ্ছি না। আসার পর থেকেই একটা না একটা কাজের উপরই আছি। আম্মুর আদরের মেয়ের বিয়েতে আমাকে দিয়ে খাটিয়ে নিচ্ছে।”
-” তুমি বরং তোমার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাও। সেখানে গিয়ে শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে দেবরের বিয়ের কাজে লেগে পড়ো। একমাত্র বোনের বিয়েতে একটু কাজ করতেই তোমার হাজারটা অভিযোগ। দেবরেরটা মনের আনন্দে করো গিয়ে।”
নীলাশা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
-” শুয়ে শুয়ে ফটর-ফটর কথা আসছে। ফোন দে। আম্মু ডাকছে।”
মেয়ের বাড়ি থেকে হলুদের ডালা নিয়ে অল্প কজন এসেছিল সকালের দিকে। তাদের আপ্যায়ন তারপর অতিথিদের দেখভাল করতে গিয়ে নীহারিকার একটু জিরানোর ফুরসত নেই। সবসময় দৌড়ের উপর আছেন। ডায়নিংয়ে বসে গ্লাসের পানিতে ঠোঁট ভিজিয়েছেন মাত্র। অমনি একজন প্রতিবেশীর গলা এলো। পান চিবোতে চিবোতে বলল,
-” কী গো নিভানের মা, বাড়িভর্তি মেহমান। এত লোকজন। তা তোমার মেঝো বউমাকে আনোনি? কই তোমার নাতনি? ইদানিং মাঝেমধ্যে তাকে তো দেখি। শুনলাম হাসপাতালে তোমার অসুস্থ ছেলেকে তুমিও দেখতে যাও। ছেলে, নাতনিকে মেনে নিলে, পরের বাড়ির মেয়েটাকে মানতে পারলে না।”
আত্মীয়-স্বজন সহ পাড়া প্রতিবেশী এদের খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই। শুধু খোঁচাতে আসে। আত্মীয়রাও এই একই প্রশ্নে মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছে। নীহারিকা উত্তর না দিয়ে বললেন,
-” বসুন।”
পরপর উঠে শর্মিলাকে বললেন,
-” ছোটো, মিষ্টি আর পান এনে দে।”
নীহারিকা কিচেনে। শর্মিলা ভয়ে ভয়ে বললেন,
-” ভাবী তুমি একবার ফোন করে বলবে। না মানে বাড়িতে এতবড় অনুষ্ঠান হচ্ছে। ওরা থাকলে বাড়িটা একদম পরিপূর্ণ হতো।”
ইচ্ছে মাঝে মাঝেই আসে। শর্মিলা আরো দুএকজনের বলায় প্রীতিদের ওখানেও কার্ড দেয়া হয়। নিভান গিয়েছিল। প্রীতি স্রেফ জানায়— ইচ্ছের দিদুন একদিন আমাকে দেখেই উঠে গিয়েছিল। আমার বাড়ির পানিটুকু না ছুঁয়ে। এ-ও বলেছিলেন, আমাকে ও বাড়ির বউ হিসেবে মানবেন না। সেই বাড়িতে শুধু একটা কার্ডের মাধ্যমে প্রীতির পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। ইচ্ছের দিদুনকেই এসে আমাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে নিতে হবে।
এ কথা শুনে নীহারিকার মেজাজ গরম হয়। নিভানের উপর রাগঢাক করেন— ওখানে কার্ড দিতে হবে কেনো? কে বলেছে দিতে?
শর্মিলার কথার জবাবে নীহারিকা বললেন,
-” দ্যাখ ছোটো এখন কাজের সময় মাথা খারাপ করে দিস না। ওই মেয়ের বাড়ি কার্ড গেছে এই তো ঢের বেশি। আবার বলে কী না আমাকে গিয়ে তাকে মাথায় করে আনতে হবে।”
শর্মিলা সহসাই বলে উঠলেন,
-” ভাবি শুধু রাগ করলেই হবে না। এর আগে একবার ইচ্ছের জন্য আসলেও, ধরতে গেলে এবারই প্রথম স্বাভাবিক আসা হবে। সেখানে তুমি বাড়ির কর্ত্রী। তুমি যদি না বলো, ওই বা কীভাবে আসে? যাওয়ার কথা বাদ দাও, একবার ফোনেই না হয় বলো। ইচ্ছে আসলে কত খুশি হবে। ইচ্ছের জন্য হলেও না হয়।”
সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা থাকলেও আর বৃষ্টি নামেনি। প্রত্যাশা এখন মোটামুটি সুস্থ। আর বমিটমি হয়নি। বিকেলে পুরোদমে মেহেন্দির আয়োজন চলছে। প্রত্যাশার গায়ে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। হাত দু’টো টানটান করে রেখেছে ও। কোয়েল দক্ষহাতে সুনিপুণতার সহিত দারুণ করে হেনা আর্ট করছে। প্রত্যাশার হাতের মাঝে ইংরেজী ফন্টে নীরব-প্রত্যাশা নামটা জ্বলজ্বল করছে। প্রত্যাশার ফোনে ছবি তুলে ঝপটপ বলে হ্যাপি,
-” ছবিগুলো তোর বরের কাছে পাঠিয়ে দিলাম।”
প্রত্যাশা সবেগে মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। হ্যাপি থোড়াই কেয়ার করে পিক গুলো একেএকে হোয়াটসঅ্যাপ পাঠিয়ে দেয়।”
হ্যাপি বলল,
-” এবার দেখি রং কতটা গাঢ় হয়। মেহেদির রঙ যত গাঢ় হয় বরের ভালোবাসাও নাকি তত গাঢ়, গভীর হয়।”
প্রত্যাশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-” ধূর, তাই আবার হয় নাকি। যতসব, আজগুবি কথাবার্তা। আমার তো কোনোকালেই রং গাঢ় হয় না।”
ছাদের চতুর্দিকে বিভিন্ন রঙের লাইট। যার আলোয় ঝিকমিক করছে চারপাশ। হলুদের স্টেজটা ঠিক মাঝ বরাবর। ফুলে আর মরিচবাতিতে সাজানো। ছোটবড় প্রায় সব মেয়েদের গায়েই হলুদ শাড়ি। হলুদে মুখরিত চারপাশটা। প্রত্যাশা হলুদ জামদানিতে মোড়া। বাঙালি স্টাইলে পড়ানো শাড়ি। বাম কাঁধের উপর দিয়ে আঁচলটা পিছুন হয়ে সামনে দিয়ে ডান কাধ দিয়ে তোলা। ফেসিয়াল আর প্রসাধনীর জাদুতে প্রত্যাশা একদম ঝলমল করছে। গাভর্তি কাঁচা ফুলের গহনা। হলুদ গোলাপ, রজনীগন্ধা, আর লাল গোলাপ দিয়ে বানানো গয়না হাতে, গলায়, মাথায় টিকলিতে। ঠোঁটজোড়া রক্ত জবার ন্যায় টকটকে। লাল লিপিষ্টিক গাঢ় করে দেয়া। পায়ে লাল আলতা।
গায়ের হলুদ শাড়ি, হলুদ ফুলের সমাহারে প্রত্যাশাকে একদম জীবন্ত হলুদ গোলাপের মত লাগছে। হলুদ সাজে ভারী মিষ্টি লাগছে।
বড়দের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাচ্চা পার্টিরা ছাদে ডিজে মিউজিক বাজাচ্ছে। প্রত্যাশার ফ্রেন্ডরা তো আছেই সাথে কাজিনরাও অ্যাড হয়েছে। বাচ্চা বাচ্চা কাজিনরা হৈ হুল্লোড়ে মেতেছে, নাচছে। প্রত্যাশা বান্ধবীদের সাথে দেখছে আর হেসে হেসে গল্প করছে।
রোহান আর নাহিদ একের পর এক গান পাল্টাচ্ছে। একটা গানের দুইটা লিরিক্স হতে না হতেই আরেকটা। খোলা হাটের বালুচর থেকে শুরু করে, নোরা ফাতেহীর দিলবার পর্যন্ত বাদ পড়েনি। নাহিদ বলল,
-” এই ব্যাটা এখানে বসে আছিস ক্যান। যা তোর গার্লফ্রেন্ডের সাথে একটু কোমড় দুলিয়ে আয়।”
রোহান মশা তাড়ানোর ভঙিতে বলল,
-” ধূর।”
নাহিদ একপ্রকার জোড় করে নিজ থেকে গলা ফাটিয়ে বলল,
-” এটেনশন প্লিজ, একটা কপাল ডান্স হলে ভালো হয়। কোয়েল আর রোহান।”
সাথে সাথে সবাই সিটি বাজিয়ে উৎসাহ দিল। কোয়েল না না করলেও পরে যায়। বেজে উঠল,
-” Tere vaaste falak se main chaandi launga
Salah satrah sitaare sang baandh launga….”
গানের তালে তালে ওরা নাচছিলো। আবার যখন এই লাইনটা বেজে উঠল, রোহান প্রত্যাশার হাত ধরে টান দিয়ে আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,
-” Tere vaaste falak se main chaandi launga
Salah satrah sitaare sang baandh launga..”
পরের লাইন চললো। প্রত্যাশা মুচকি হেসে কোমড় দুলিয়ে রোহানের ঘাড় ধরে আকাশের দিকে তুলে বলল,
-” যা যা আগে নিয়ে আয় কতো পারিস।”
বলতে বলতে পরের লাইনে রোহান একগাল হেসে বলল,
-” Pehle Ishq Lada loon, Uske baaad launga।”
প্রত্যাশা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। রোহানের গরম লেগে যায়। ও চলে যায়। এরপর এক পর্যায়ে হ্যাপি কোয়েল দু’জনেই নাচতে থাকে কালা চশমা গানে। ওদের চোখে কালো সানগ্লাস। প্রত্যাশার চোখেও পড়িয়ে দিল। একপর্যায়ে প্রত্যাশা ফ্রেন্ডদের সাথে যোগ দিয়ে উরাধূরা নাচতে থাকে।
ওদিকে মামী গিয়ে অধরাকে নালিশ করে,
-” দ্যাখো তোমার মেয়ে উপরে কী শুরু করেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন নতুন বউকে অমন নাচতে দেখলে কী ভাববে!”
অধরা ছাদে এসে দেখার সাথে সাথেই মেয়েকে টেনে একপাশে নিয়ে, চোখ রাঙিয়ে শাসন করল।
-” এই প্রত্যাশা এমনিতেই তুই অসুস্থ। আবার এরকম লম্ফঝম্প শুরু করেছিস। আর এই, ও বাড়ি থেকে লোকজন চলে এলো বলে। ওনারা দেখলে কী বলবে?”
প্রত্যাশা টমেটোর মতো গাল ফুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ফ্রেন্ডদের বলল,
-” অ্যাই তোরা শোন, কিছুক্ষণ পর এএসপি সাহেব আসবে ফটোশুটের জন্যে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন থাকবে, সবার সামনে নিজে থেকে পোজ দিলে, তারা আবার ভাববে নতুন বউয়ের লজ্জা শরম কম। তাই তোরা বিভিন্ন স্টাইলে পোজ দেয়ার জন্য শুধু একটু বলবি। আর আমি অমনি…বুঝেছিস?”
উচ্চ ভলিউমে ‘একা একা গুগল গাটি’ গান বাজতে লাগলো। হ্যাপি চেঁচিয়ে উঠলো,
-” ওই টারে ওখান থেকে সরা তো কেউ। রুচি নাই কি সব গান বাজাচ্ছে। একটা গানও তো দু লাইন হতে না হতেই বদলাচ্ছে।”
কোয়েল বলল,
মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৩৮ (২)
-” ওই নাহিদের বাচ্চা গান পাল্টা। একাএকা গুগল না ঘেঁটে বিয়ে করে কম্বলের তলায় বউ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কর।”
এরমধ্যে গান পাল্টে যায়। হঠাৎ প্রত্যাশার নজর পরে সিঁড়ির দরজার দিকে। চোখের কালো চশমা খুলে তাকায়। নীরব একহাত পকেটে গুঁজে অন্যহাতে চুলে ব্যাক ব্রাশ করে ঠোঁটে হাসি টেনে এগোল।
বাজতে থাকল…
-” আইলোরে নয়া দামান…..!!”
