Home মধ্য রাতের চাঁদ মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৪৮

মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৪৮

মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৪৮
মুসতারিন মুসাররাত

ভোরের আলো ফুটে নতুন দিনের সূচনা হলেও, হঠাৎ জানা চরম সত্যিটা প্রত্যাশাকে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ফেলে দিলো। আঠারোটা বছর যাদেরকে বাবা-মা জেনে এসেছে হঠাৎ করেই জানা নিষ্ঠুর সত্যিটা; সেই সম্পর্কটা র*ক্তে”র নয়। মন মানতে পারছে না। কষ্টে অন্তর আত্মা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বারবার চেষ্টা করেও স্বাভাবিক হতে পারছে না। সেই সন্ধ্যা থেকে কান্নাকাটি করতে করতে একদম দুর্বল হয়ে পড়েছে মেয়েটা।
প্রত্যাশার এমন ভেঙে পরা দশা দেখে অধরা মাহবুব সাহেব আর নীরবকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

-” আমার মনে হয় এখন প্রত্যাশাকে আমাদের সাথেই রাখা উচিত। মেয়েটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। এই মুহূর্তে ওর আমাদের দরকার। কিছুদিন আমাদের কাছে থাকুক স্বাভাবিক হলে আসবে। একটা সম্পর্ক ভাঙা খুব সহজ, কিন্তু জোড়া লাগানো কঠিন। আর বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয় যে রাগের মাথায় সবকিছু ভেঙে দেব। এসব ভাবাও বোকামি, নির্বুদ্ধিতা।”
অধরা থেমে নীরবের দিকে তাকালেন। বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-” আশা করি নীরব এ ব্যাপারে তোমার আপত্তি থাকবে না। প্রত্যাশা একটু স্বাভাবিক হলে তুমি গিয়ে নিয়ে আসবে। আমরা কোনো বাঁধা দেব না। আসলে আমরা বাঁধা দেওয়ার অধিকারও রাখি না। যেদিন মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকেই ওর ভাল-মন্দ, দায়িত্ব সব তোমার ওপর অর্পণ করা হয়েছে।”
নীরব চুপচাপ মাথা নাড়ল। বাড়িতে যে সিচুয়েশন এখন তাতে প্রত্যাশার কিছুদিন ও বাড়িতে থাকাই বেটার। এসব ভেবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে নীরব আর দ্বিরুক্তি করে না।

নীহারিকা অবশ্য সেই যে রাতে ঝিমিয়ে গেলেন আর কিচ্ছুটি বলেননি। তবে রুম থেকেও আর বেরোয়নি। সকালে নীরব প্রথমে মায়ের রুমে যায়। মা’কে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টাটুকু বাদ রাখেনি। নীরব ঠাণ্ডা গলায় বলে,
-” প্লীজ মা, এভাবে অভিমান করে থেকো না। ভেবে দেখো তো যে মেয়েটা আঠারোটা বছর ধরে যাদের বাবা-মা জেনে বড় হয়েছে। হঠাৎ জানা নিষ্ঠুর সত্যিটা তার ভেতরটাকে কতটা ভেঙে দিতে পারে। তার লাইফে এরচেয়ে নি’র্মম আ’ঘা”ত আর কীই বা হতে পারে? এমন জন্ম, এমন দৃষ্টিকটু পরিচয় কেউ কি কখনো কামনা করে? এটা প্রত্যাশার জন্য ভীষণ কষ্টের। এই মুহূর্তে ওর পাশে দাঁড়ানো, একটু সাহস যোগানোই আমাদের উচিত নয় কী? জন্ম তো কেউ নিজের ইচ্ছায় বেছে নেয় না। তবে কেনো জন্মের দোষে তাকে দণ্ড পেতে হবে?”
ছেলের প্রতিটি কথা যুক্তিক। নীহারিকা উত্তর দিতে না পেরে পাথরের মূর্তির মতোন বসে রইলেন ঠাঁই। নীরব ব্যাকুল স্বরে বলল,

-” এভাবে চুপ করে থেকো না মা। প্লীজ কিছু তো বলো।”
নীহারিকা ঝিম ধরে থেকে পরোক্ষণেই প্রসঙ্গ বদলাতে বললেন,
-” তোর শ্বশুড় শাশুড়িকে নাস্তা দেয়া হয়েছে? ছোটোকে বল নাস্তা দিতে। না খেয়ে যেন না যায়। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। আমাকে একটু একা ছাড় বাবা। বাকিটা তোর যা ভালো মনেহয় কর। আমি আর এ ব্যাপারে কিছুই বলতে চাই না।”

প্রত্যাশা ব্যাগ গোছাচ্ছে। চোখের কোণে টলমল করছে অশ্রু। নীরব এগিয়ে এসে বাহু ধরে আলতো টান দিয়ে প্রত্যাশাকে ঘুরিয়ে নেয়। প্রত্যাশা মাথা নত করে ফেলল। নীরব গম্ভীর গলায় বলল,
-” প্রত্যাশা, আমার দিকে তাকাও।”
প্রত্যাশার চিবুক বুকের সাথে লেগে আছে। ওর সাহস হলো না মুখ তুলে তাকাতে। নীরব এবার কড়া সুরে পুনরায় বলল,
-” তাকাও বলছি। প্রত্যাশা আমার চোখের দিকে তাকাও।”
ধীরেধীরে মুখ তুলে তাকাল প্রত্যাশা। চোখ ভিজে গেছে। চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। নীরব আলতো করে গালে হাত রেখে আঙুলের স্পর্শে চোখের পানি মুছে দিল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-” যেতে চাইছো যাও। তবে মনে রেখো আমার বাচ্চার যেন একচুলও ক্ষ*তি না হয়। তোমার অবহেলা, নিজের অযত্নের কারণে যদি ওর কিছু হয়। আমি সেটা টলারেট করব না। নিজের যত্ন নেবে, যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে সামলে নেবে।”
প্রত্যাশা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। নীরব ফের বলল,

-” আর একটা কথা শুনে নাও র*ক্তের সম্পর্ক না থাকলেই কী? তোমার আব্বু-আম্মুর ভালোবাসায়, স্নেহে, তাদের যত্নে কি কখনো একফোঁটা কমতি পেয়েছো? তুমি জানো, উত্তরটা ‘না’। শোনো, একদম মন খারাপ করে কান্নাকাটি করবে না। ভুলেও মাথায় উল্টাপাল্টা চিন্তার জায়গা দেবে না। সো বি কেয়ারফুল।”
প্রত্যাশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঠোঁট কামড়ে আটকে রাখা কান্না ঝরে পড়ল। আকস্মিক ঝাঁপিয়ে পড়ল নীরবের বুকে। ঝরঝরিয়ে কাঁদতে লাগল। প্রত্যাশাকে একহাতে আগলে নিয়ে বলল,
-” আমি তোমার আসার অপেক্ষায় প্রহর গুণব। আশাকরি অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ করবে না।”

প্রত্যাশাকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নীহারিকার মনটা খচখচ করতে থাকে। সময় গড়াল রাগ-ক্ষোভও যেন একটু একটু করে মিইয়ে আসলো। নীরবের বলা কিছু কথা বারবার মনে উঠল। অবচেতনে ভাবেন— আসলেই তো এমন জন্ম কেউ কী নিজ থেকে চায়? জন্ম, মৃ*ত্যু এসব তো কারো হাতে থাকে না। আর সমস্যা বংশের হলে তাতে নিষ্পাপ মেয়েটার দো*ষ কীসে?
এসব ভেবে অনুতপ্ত অনুশোচনায় নীহারিকার ভেতরটা কেমন করে উঠল। অন্যদিকে ছেলের বিষণ্ণ, কষ্টেভরা মুখের দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে উঠছে।‌ তিনদিনের দিন সকালে নাস্তার টেবিলে নীরবকে উদ্দেশ্য করে জড়তা নিয়ে নিম্নস্বরে শুধালেন,
-” প্রত্যাশার শরীর কেমন আছে?”
পরোটা ছিঁড়তে গিয়ে নীরবের হাত থেমে গেল। মায়ের মুখের দিকে একপল তাকিয়ে ফের খাবারে মনোযোগ দিয়ে বলল,

-” ভালো।”
অতঃপর বলে উঠলেন নীহারিকা,
-” নীরব বলছি যে, যা হওয়ার হয়েছে প্রত্যাশাকে গিয়ে নিয়ে আয় বাবা।”
নীরব একটুও অবাক হয় না। সে জানে তার মায়ের মন মোমের মতন। মোম যেমন কঠিন হলেও, আগুনের আঁচে আসতেই গলতে শুরু করে। ঠিক তেমনি তার মায়ের কঠিন হৃদয়ও সন্তানের ভালো থাকার জন্য গলে যায় নিমিষেই। নীবিড় ফিরে আসেনি, মা’কে এভাবে বোঝানোর চেষ্টাটুকু অবধি করেনি। পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুড়তে পুড়তে বলল নীরব,

-” থাক আরো কিছুদিন। এমনিতে বলেও লাভ হবে না। মনেহয় না ও সহজে আসবে। আর এটা অস্বাভাবিক বা বাড়াবাড়ি নয়। ওর দিক দিয়ে ও ঠিকই আছে।”
নীহারিকা চুপ করে গেলেন। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অবশেষে সবাইকে একদফা অবাক করে বিকেলে স্বামীর সাথে প্রত্যাশাকে আনতে যান। বাড়িটা কেমন মরামরা লাগছিল। অথচ ক’দিন আগেই সবাই কত হাসিখুশি প্রফুল্ল ছিলো। আর মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা। সব ভেবেচিন্তে নীহারিকা যান। অনুশোচনা অনুতপ্ত প্রকাশ করে প্রত্যাশাকে সাথে আসার জন্য অনুরোধের সুরেই বলেন। অধরা মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয়।

সাঁঝের অন্ধকারে ব্যস্ত নগরী ডুবে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। ড্রয়িংরুমে পায়ের উপর পা তুলে বসে কফির পেয়ালায় ছোট্ট করে চুমুক দেয় প্রীতি। গতকালকেই ফিরেছে সে। ইচ্ছে ওদিকটায় বসে টেডি নিয়ে খেলছে। ফের ধোঁয়া ওঠা কফিতে ঠোঁট ছোঁয়াতেই তানিয়া আসলেন। অসন্তুষ্ট গলায় বললেন,
-” তোমাকে দিয়ে আজ অবধি একটা কাজও ঠিকঠাক হলো না প্রীতি। এতগুলো দিন ওখানে থেকে করলে টা কী শুনি? শুরু থেকেই তুমি সেই এক নীরবেই আঁটকে আছো। নিশ্চয় নিজের রাগ-জিদ, ইগো নিয়ে থাকায় আসল কাজটাই করার চেষ্টাটুকুই করোনি।”
পায়ের উপর থেকে পা নামাল প্রীতি। কাঁধ নাড়িয়ে বলল,

-” মা কী করে করব বলো তো? ওখানে গেলেও আমি নীরবকে এড়িয়ে চলি। ওর সাথে কথা বলা তো দূর এক টেবিলে বসে পর্যন্ত খাইনি। সেইচ্ছায় ওর সামনে পড়তে চাইনি।”
তানিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন,
-” যে কাজ দিয়েছিলাম সেটা নীরবের অগচোরেই করতে, নট ওর সামনে।”
-” মা ওটা জয়েন ফ্যামেলি। রুম থেকে বেরোলেই একজন না একজনের সাথে দেখা হয়ই। সবার ভিড়ে আমি কী করতাম শুনি?”

-” সবাই নিশ্চয় নীরবের রুমে থাকে না। আর প্রত্যাশা বো*কা, তাকেও যদি সামলে কাজটা করতে না পারো। তাহলে তো আমার বলতে হচ্ছে, তুমি প্রত্যাশার থেকেও বো*কা।”
প্রীতির মুখটা কালো হয়ে এল। কফির মগ টেবিলে নামিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
-” প্রত্যাশাকে আমার সহ্য হয় না। ওর জন্য নীরব আমাকে অপমান করছে, ইভেন গায়ে হাত তুলেছে। এত কিছুর পরে প্রত্যাশার সাথে অভিনয়টাও ঠিকঠাক আসে না।”
তানিয়া ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলবেন সেই মূহূর্তে সার্থকের গলা পেয়ে থেমে গেলেন। সার্থক ঢুকেই ইচ্ছেকে দেখে স্নিগ্ধ হেসে বলল,

-” মামা কখন এসেছো?”
ইচ্ছে ফ্লোর থেকে উঠে টেডিটা একহাতের ভাঁজে কোলের সাথে নিয়ে ঝটপট মামার সামনে দাঁড়াল। ঘনঘন চোখের পাতা নেড়ে বলল,
-” কাল এসেছি, মামা তুমি রাতে বাসায় আসোনি কেনো?”
সার্থক হেসে হাঁটু গেড়ে বসল। ইচ্ছের গালে চুমু খেয়ে বলল,
-” মামা আমার একটা সেমিনার ছিলো। সেখানে দু’দিন থাকতে হয়েছিল। বাই দ্য ওয়ে তোমাদেরকে খুব মিস করছিলাম। কিন্তু তুমি তো মামাকে ভুলে গিয়েছো। দাদু বাসায় থাকলে মামার কথা তো আর মনে থাকে না।”
-” থাকে তো। অল্প অল্প মনে থাকে।”
সার্থক মিছেমিছে মন খারাপ করার ভান ধরে বলল,

-” ভেরি ব্যাড। অল্প মনে থাকার জন্য আমি মন খারাপ করেছি। বেশি মনে রাখো না কেনো কিউটিপাই?”
-” পাপাকে বেশি মনে থাকে। তুমি মন খারাপ করো না। দিদুনকে, বড় পাপাকেও অল্প মনে থাকে।”
সার্থক গাল টিপে দিয়ে বলল,
-” ওকে সোনামণি।”
ইচ্ছে হঠাৎ হাতের টেডি দেখিয়ে বলল,
-” মামা এটা পাপা গিফট করেছে। কিউট না? দ্যাখো দ্যাখো কেমন বড়বড় আইস…ওয়াও!”
টেডির চোখদুটোয় তাকাতেই সার্থকের কপালে ভাঁজ পড়ল। নিচের অধরে দাঁত চেপে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। কিছু মনে হলো, তন্মধ্যে ইচ্ছে সার্থকের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

-” মামা আমার চকলেট।”
সার্থক কপাল চুলকিয়ে বলল,
-” ওহ্, শিট! ভুল হয়ে গেল তো। তোমরা যে আসছো জানতাম না। স্যরি লিটল প্রিন্সেস, যাও কালকে ডাবল চকলেট বক্স পাবে। সাথে নিউ টয়।”
টুপ করে মামার গালে চুমু খেয়ে বলল ইচ্ছে,
-” থ্যাংকিউ মামা।”
তানিয়া ছেলেকে ডেকে কোমরের ব্যথার কথা তুলতেই সার্থক সেদিকে এগিয়ে গেল।

রাত প্রায় দশটা। পুরো বিল্ডিং জুড়ে গা ছমছম ভাব। করিডোর শুনশান, সব রুম তালাবদ্ধ। একমাত্র আলো জ্বলা রুমটার সামনে এসে দাঁড়াল তানভীর। হাতে একটা ফাইল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো। নীরবের দৃষ্টিজোড়া ল্যাপটপে। আঙুলগুলো ত্রস্ত চলছে কীবোর্ডে। তানভীর হালকা গলা খাঁকারি দিল। চাহনি ল্যাপটপের স্ক্রিনে রেখেই নীরব বলল,
-” কাম ইন”
তানভীর এগিয়ে হালকা স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
-” স্যার বাসায় যাবেন না?”
-” একটু দেরি হবে।”
হাতের ফাইলটা সামনের টেবিলে নামাতে নামাতে চাপা আওয়াজে বলল তানভীর,
-” স্যার ওই মা*দক পাচারকারী ডিলারটা যাকে যে ছদ্মবেশে ধরলেন। ওইযে স্যার দুই মাস খানেক আগে। ওইযে বৃষ্টির মধ্যে ম্যাডামের সাথে দেখা হলো না…”
নীরব এবারে চোখ তুলে তাকাল। আর তাকাতেই তানভীর শুকনো ঢোক গিলল। নীরব গম্ভীর মুখে সোজাসাপ্টা বলল,

-” এত কাহিনী, দৃশ্যপট না টেনে সোজাসুজি বলো। আমার এত ভুলো মন নয়। ক্লিয়ার?”
তানভীর মাথা নাড়ল। জিভের ডগায় ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে বলল,
-” সেই কেস নিয়ে তো এখন উপর থেকে প্রচন্ড চাপ আসছে। এবার কি আসল গডফাদার ধরা পড়বে নাকি আগের মতো সব ধামাচাপা হবে? আসল অপরাধী আড়ালেই থেকে যাবে।”
-” লেট’স সি হাউ লং দে ক্যান কিপ হাইডিং বিহাইন্ড দেয়ার মাস্কস।”
তানভীর মাথা নেড়ে বলল,
-” যাদের দিয়ে এই গ্যাং তৈরি হয়েছিল, তারা তো বেঁচে নেই। তাদের পরিবারের একজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল। তবে নজরদারিতে রেখেও তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাহলে স্যার বাইরের কেউ কি এটা চালাচ্ছে? নতুন করে শুরু করেছে।’
ল্যাপটপের শাটার নামাল নীরব। ধীরে ধীরে পেনড্রাইভটা হাতে তুলে নিতে নিতে বলল,
-” যাদের আমরা সাধারণত সন্দেহের বাইরে রাখি, তারাই আসলে মুখোশের আড়ালে ধ্বং*স করে বেড়ায়। এবার দেখা যাক শেষটা কী হয়! শুধু প্রমাণটুকু জোগাড় করা বাকি। আশারাখি সেটাও দ্রুতই পেয়ে যাব।”

ঘড়ির কাঁ’টা রাত্রি একটার ঘরে। এক্সট্রা চাবি দিয়ে মেইন দরজা খুলে ঢুকে নীরব। নিস্তব্ধ বাড়ি, সবাই হয়তো ঘুমে ডুবে আছে। রুমে ঢুকে লাইট অন করতেই চমকে গেল। বিছানায় প্রত্যাশা ঘুমোচ্ছে। দু’বার চোখের পলক ফেলল নীরব। ভেবেছিল হ্যালুসিনেশন, কিন্তু না। এগিয়ে গিয়ে শিওর হয়। ফ্যানের হাওয়ায় প্রত্যাশার মুখের ওপর ছোটছোট চুল উড়ছিল। নীরব হাত বাড়িয়ে কানের পাশে সরিয়ে দিল। নিচের অধরের ডানপাশে দাঁত বসিয়ে ভাবল—প্রত্যাশা তো আসার কথা বলেনি!
ফ্রেশ হয়ে মৃদু আলোটা জ্বালিয়ে নিঃশব্দে শুয়ে পরে নীরব। কিছুক্ষণ একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত প্রত্যাশার মুখের দিকে। ডেকে তোলার ইচ্ছে করল না। তবে বুকের ভেতরের শূন্যতা দূর করতে একহাতে জড়িয়ে নিল। ধীরে ধীরে গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। এ কদিন রুমটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। বুকটা হাহাকার করছিল। আজ যেন মুহূর্তেই মনটা হালকা হয়ে গেল।
গরম নিঃশ্বাস গলায় আছড়ে পড়ছে। পেটে উষ্ণ হাতের স্পর্শ। এবারে প্রত্যাশার ঘুম ভেঙে গেল। চোখবুঁজেই অনুভব করে চেনা স্পর্শ। নাসারন্ধ্রে বারি খাচ্ছে পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ। প্রত্যাশা একটু নড়ার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,

-” কখন এসেছেন?”
নীরব মৃদু হেসে বলল,
-” আগে বলো তুমি কখন এসেছো? না বলে চলে এলে? এটা কি আমার জন্য সারপ্রাইজ ছিলো? যাইহোক আমি কিন্তু সত্যিই সারপ্রাইজড!”
প্রত্যাশা আগের মতো হাসিখুশি নেই। কথাও কম বলে, চেহারায় সারাক্ষণ একটা বিষণ্ণ ছাপ। আগে হলে ঝটপট রেলগাড়ির মতো মুখ চলত। তবে আজ তা আর হলো না। ধীরেধীরে বলল,
-” মা-বাবা গিয়েছিলেন আনতে। সন্ধ্যার একটু আগে এসেছি। শুনলাম আপনি খুব ব্যস্ত। ক’দিন রাত করে ফিরছেন। বেশি বিজি আছেন ভেবে আর ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করিনি।”
-” আমি ব্যস্ত ছিলাম তোমার অভাবে। তোমাকে ছাড়া সবকিছুই ফাঁকা। অফিস, কাজের চাপে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা। ব্যস্ততার ভিড়েও তোমাকে প্রচন্ড মিস করেছি।”
প্রত্যাশা প্রত্যুত্তরে নিশ্চুপ রইল। নীরব মাথাটা তুলে প্রত্যাশার মুখের দিকে চাইল। বলল হিমশীতল স্বরে,
-” তুমি জানো তোমাকে ছাড়া, তোমার গায়ের মিষ্টি গন্ধ ছাড়া আমার ঘুম হয় না। তোমাকে ছাড়া মনে হচ্ছিল আমি শ্বাস নিচ্ছি, কিন্তু বেঁচে নেই। আজ তোমাকে বুকে নিয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। উফ্! এতক্ষণে নিজেকে জীবিত ঠেকছে।”

কথা বলতে বলতে প্রত্যাশাকে ফের বুকে টেনে নিলো নীরব। হঠাৎ নীরবের ঠোঁটের স্পর্শে শরীর শিউরে উঠল প্রত্যাশার। প্রত্যাশার গলায় ঠোঁট ছোঁয়ায় নীরব। প্রত্যাশা নিজেকে ছাড়াতে নড়েচড়ে উঠল। নীরব ওভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে প্রগাঢ় কণ্ঠস্বরে স্রেফ বলল,
-” শোনো আমি ভীষণ টায়ার্ড। সারাদিনের স্ট্রেস, দৌড়ঝাঁপের পর প্রশান্তি চাই। আর আমার শান্তি মানে তুমি। তিন রাত একটুও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। আজ একটাই অনুরোধ ডিস্টার্ব করো না। এভাবেই জড়িয়ে ঘুমাতে দাও, প্লীজ।”
প্রত্যাশার ঠোঁটে এবার হালকা হাসি ফুটল। অবশ্য সে হাসি নীরবের দৃষ্টির অগোচরে রয়ে গেল।

তিন চারদিন পর। ঝলমলে বিকেল বেলা। শর্মিলার শরীরটা খারাপ। এদিকে আনিশা বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে। মায়ের সাথে সে প্রায়ই বিকেলে পার্কে ঘোরে, বিভিন্ন ইভেন্টে চড়ে। মেয়ের ঘ্যানঘ্যানিতে শর্মিলা রেগে পিঠের উপর দিলো দু’টো। আর তাতেই আহ্লাদী মেয়ে কেঁদে পুরো বাড়ির মানুষ জড় করল। ছেলেরা সবাই অবশ্য কর্মক্ষেত্রে। নীহারিকা এগিয়ে এসে আনিশাকে আগলে নিয়ে বললেন,
-” মেয়েটাকে এভাবে মারছিস কেনো ছোটো? বুঝিয়ে বললেই তো হয়।”
-” বলছি আমার মাথা ধরেছে কাল নিয়ে যাব। না কিচ্ছুতেই শুনতে চাইছে না। ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান করেই যাচ্ছে। অসহ্য ঠেকছে।”
প্রত্যাশা আগের মতো প্রফুল্ল না থাকলেও এখন অনেকটাই স্বাভাবিক আছে। প্রত্যাশা এগিয়ে এসে বলল,

-” আনিশা কাঁদে না। আমার রুমে চকলেট আছে চলো খাবে। গেইমস খেলতে আমার ফোন দিবো। চলো ইচ্ছে আছে ওর সাথে খেলবে। এবার তো কান্না থামাও।”
ইচ্ছে দুপুরে এসেছে। ড্রাইভার রেখে গিয়েছে। আনিশা কোনোদিকে না তাকিয়ে গোঁ ধরে বলে,
-” নাহ আমার কিচ্ছু চাই না। না চকলেট না ফোন। কোনো কিছুই লাগবে না।”
শর্মিলা চেঁচিয়ে উঠলেন,
-” শুনেছো মেয়ের কথা। দ্যাখো তোমাদের আস্কারায় মেয়েটা দিনদিন বেশি বে’য়াদব, বে”য়াড়া হচ্ছে।”
নীহারিকা বললেন,

-” আহ্, থাম তুই। রাগিস না। আমি বুঝিয়ে বলছি।”
আনিশার কান্না থামছিল না দেখে প্রত্যাশা বলল,
-” পার্কে নয়, চলো আমরা বাসার সামনে থেকে ঘুরে আসি। একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি।”
আনিশার কান্না একটু কমল। ইচ্ছে এসে ঝটপট বলল,
-” মামণি আমিও যাবো।”
প্রত্যাশা ঘাড় নেড়ে বলে – আচ্ছা। নীহারিকা বললেন,
-” প্রত্যাশা বেশি দূর কিন্তু যেয়ো না।”
-” ঠিক আছে মা।”

হাঁটতে হাঁটতে ওরা রাস্তার উপর আসে। আনিশা বলল,
-” নতুন ভাবী চলো সামনে যাই।”
মোড় ছাড়িয়ে ডানদিকে আসতেই একটা খোলা পাবলিক পার্ক। লোকজনের ভিড় মোটামুটি। শান বাঁধানো বসার জায়গায় প্রত্যাশা বসে রইল ওরা দুজন দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। ইচ্ছে হঠাৎ বলল,
-” মামণি আইসক্রিম খাব।”

মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৪৭

ওইতো ওপাশেই একজন আইসক্রিম বিক্রি করছে। ওখানে বেশ ভিড় জমেছে। প্রত্যাশা দেখে বলল,
-” তোমরা এখানে বসো। আমি আইসক্রিম আনছি।এখান থেকে একটুও নড়বে না, ঠিক আছে?”
দু’জনই একসাথে বলে উঠল,
-” আচ্ছা।”

মধ্য রাতের চাঁদ পর্ব ৪৯