Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৯+৩০

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৯+৩০

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৯+৩০
শ্যামলী রহমান

দিনটি ছিলো বুধবার। ঝরঝরে নির্মল বাতাস ছড়ানো একটি দিন।চৈত্রের কড়া রোদের মধ্যেও একটুকরো সস্থির বাতাস।মাঠের পানি শুকিয়ে গিয়েছে।অনেক জায়গায় ফেঁটে চৌচির হয়েছে মাঠঘাট।জমিতে হওয়া ছোট মাছগুলো মারা গিয়েছে জলের অভাবে।কেউবা ধরে নিয়ে যাচ্ছে জমির শেষ পানিটুকু সেঁচে।বৃষ্টির অভাবে সেচ দিতে হচ্ছে।অনেক ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম।

বিয়ের তখন পাঁচদিন কেটে গেছে।এর মধ্যে বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে।মিথি আর প্রহরের শহরে জীবন শুরু পালা।প্রহর আর মিথি বিরামপুর রেলস্টেশনে বসে অপেক্ষা করছে। ট্রেন কখন আসবে এবং যাবে।সকাল দশটায় ট্রেন এখন বাজে নয়টা চল্লিশ।ওদের ছাড়তে পিয়াস আর রুহেল এসেছে।মিথি চোখের জল মুছছে আবার গড়িয়ে পড়ছে।প্রহর দেখছে তবে কিছু বলছে না। কখনো বাড়ি থেকে একা কোথাও না যাওয়া মেয়েটা শহরে থাকবে বাবা মা কে ছাড়া এটা ভাবতেও কষ্ট হবে স্বাভাবিক। সেদিন রাতে মিথির মত জানতে চেয়েছিলো।প্রথমে চমকে উঠে না করেছিলো।
সবাই কে ছেড়ে থাকবে কি করে এতোদিন?

চাইলে তো আর সেই চিরচেনা পুকুরপাড়ে একমাত্র সঙ্গী রিতিকে নিয়ে গোধূলি দেখতে পারবে না, আম-জাম বাগানে চুরি করে খাওয়া হবে না,পুরো গ্রাম চষে বেড়ানো হবে না,থাকতে হবে শহরের ইট পাথরের দালানের মধ্যে বন্ধি।
ট্রেনের হুইসিলের শব্দে প্রহর ব্যাগ নিয়ে দাঁড়ালো।মিথিকে বলল,
“ট্রেন এসেছে উঠে পড়ো।মিথি তার কথা মতো উঠে দাঁড়ালো।
ট্রেন থামতেই দুজনে উঠলো।ব্যাগ গুলো রুহেল তুলে দিলো।পিয়াস শেষ একবার মিথির দিকে তাকালো।বিদায় দিলো প্রিয় কাউকে। রুহেল আজ মিথির সাথে ভালো করে কথা বললো। ট্টেন ছেড়ে দিলে রুহেল নামলো।পিয়াস স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে।যতক্ষণ ট্রেনের অস্তিত্ব দেখা গেলো তাকিয়ে থাকলো।
পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত বোধ-হয় প্রিয় মানুষ কে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া এবং চোখের সামনে তাদেরই সুখের সংসার দেখা।

“পিয়াস ভাই এসো বাড়ি যাই।রুহলের কথা পিয়াসের কানে কথা পৌঁছালো না। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।এক বাদাম ওয়ালার চিল্লানিতে তার ধ্যান ভাঙলো।আশে পাশে তাকালো রুহেল দূরে দাঁড়িয়ে তাকেই ডাকছে।পিয়াস এলোমেলো পায়ে এগোলো। স্টেশন ত্যাগ করলো শত মানুষ।
“কান্না শেষ?নাকি বাকি আছে?আসার ইচ্ছে না থাকলে সেখানেই বলতে বাবা মায়ের কাছে রেখে আসতাম।
মিথি অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালো।হেঁচকি তুলে বলল,
“আপনি আমায় রেখে একা আসতেন?
“না।একা থাকার জন্য কি বিবাহ করেছি?
আমি কি চাই জানো?
মিথি জানার আগ্রহে চোখ মুছলো।ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো।

“আমাদের ছোট একটা সংসার হবে বস্ত শহরের এক কোনো।জীবনের তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহর কে বেছে নিতে হবে।সেই শহরে আমরা না হয় ছোট একটা নিজস্ব শহর বানাবো,ক্রান্তির অফিস শেষে আসার পথে তোমার জন্য দুটো বেলি কিংবা তোমার প্রিয় শিউলি আনবো।তুমি দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে।অপেক্ষা শেষ করে আমি ফিরবো।ঘামার্থ মুখ দেখে তোমার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিবে,ঠান্ডা একগ্লাস জল সামনে ধরবে।
সবশেষে রাতে ঘুমোতে গিয়ে কিছুক্ষণ না-হয় সুখ দুঃখের গল্প করবো।ক্রান্তদিন পেরিয়ে গল্প শেষে তোমার আলিঙ্গনে ঘুমিয়ে পড়বো।
একজীবনে আমার তোমার থেকে এতটুকু চাওয়া রইলো।
মিথির কান্না বন্ধ হলো।প্রহরের এমন সুন্দর সংসার বর্ননা শুনে সে মুগ্ধ হলো।

“এতো সুন্দর কথা কিভাবে বলেন? সংসার নিয়ে আমি মেয়ে হলেও এখনো ভেবে উঠিনি।
প্রহর মিথির হাতটা ধরলো,ওর মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“আমার কথা সুন্দর?কই আমার তো মনে হয় না।
সংসার নিয়ে তুমি আমি দুজনে একসাথে ভাববো,চলতি পথে দুজনে একসাথে হাঁটবো।যদি কখনো পিছিয়ে যাই হাত ছেড়ে না দিয়ে টেনে নিও।আমি তোমার বাহুডোরে আজীবন থাকতে চাই।
যেমনটা থাকে গ্রামের মেঠোপথে ধুলোর আগমন।

মিথি মুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো। মানুষটার প্রতি মুগ্ধতা বেড়েই চলেছে। কি স্নিগ্ধ তার কথা আর অনুভূতি। অথচ এক সময় কথাই বলতো না,দূরে আড়ালে থাকতো।এখন ভাবতেও ভালো লাগে একদিন ছুঁতে না পারা ডাইরির প্রতিটা ভাঁজে তারই জন্য ভালোবাসার অনুভূতি সাঁজানো ছিলো।সেই অনুভূতি সিক্ত মানুষটা পুরোটাই তারই দখলে।
কেমন স্বপ্ন মনে হয়।সেদিনই বিয়ে ঠিক পিয়াস ভাইয়ের সাথে হুট করে প্রহর ভাইয়ের সাথে প্রণয় ঘটলো।পরে অবশ্য প্রহরের থেকে সব সত্যি শুনেছে।শার্লিন কে আসার পথে ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছে।তার জীবন সুখময় হোক এই প্রার্থনা ও করেছে।পিয়াসের জন্য একটু খারাপ ও লেগেছে।শেষ বেলায় তার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি অথচ আগে কত বায়না পিয়াস ভাইয়ের কাছেই করতো।
তার প্রতি মিথির অন্য রকম টান ছিলো সেটা ভালোবাসা ব্যতীত।প্রায় ছোট সকল আবদার পূরণ করতো,খেয়াল রাখতো হয়তো সেই কারণে।
মিথির ঘুম পাচ্ছে।আসবে বলে কাল সারারাত ঘুম হয়নি।এখন হাই তুলছে।প্রহর খেয়াল করে মিথির মাথা ওর কাঁধে রাখলো।বলল,

“ঘুমোয় আমি পাশে আছি।
এই কথাটুকু কতটা শান্তির কেবল সেই বুঝলো। মুঁচকি হেঁসে মিথি চোখ বুজলো।ভরসায় সাগরে প্রহর কেই প্রথমে রাখলো।
ট্রেন কমলাপুর পৌঁছালে ওরা দুজনে নেমে পড়ে।
আসিফ আর পাভেল তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো।ওরা দুজনে চারদিন আগেই এসেছে।
এদিকে সব ঠিকঠাক তারাই করেছে।বাসা দেখা শেষ এখন শুধু গিয়ে উঠবে।পাভেল আর আসিফ
মিথিকে জিজ্ঞেস করলো,
“গ্রাম ছেড়ে আসতে ভালো লাগলো?
মিথির আগে প্রহর উত্তর দিলো,
“সারা রাস্তা কেঁদেছে,ছিসকাদুনে।
মিথি মুখ ফুলালো।অন্যপাশে মুখ ঘুরে রইলো।পাভেল আর আসিফ থাকাতে কিছু বললো না।

“অভ্যাস হয়ে যাবে।তুমি আমাদের অনেক ছোট তাই তোমাকে বোন ভেবে তুুমি কিংবা নাম ধরে ডাকলে অসুবিধা হবে?
পাভেলের কথায় মিথি মাথা নাড়ালো।
পাভেল সন্তুষ্টি হাঁসি দিলো। মিথি তাদের চিনেছে এবং জানে প্রহর ভাইয়ের বন্ধু খারাপ হতে পারে না।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে আটো নিলো।গন্তব্যে ছুঁটলো পিচঢালা রাস্তায়।মিথি আটোর ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মেরে ঢাকা শহর দেখছে।এর আগে তো কখনো ঢাকা শহরে আসেনি।চারদিকে শুধু উঁচু দালান নজরে আসছে।মিথির কাছে তার গ্রামের মাটির বাড়ির সৌন্দর্য দালান বাড়ির থেকে বেশি সুন্দর লাগে। যদিও তাদেরও ইটের বাড়ি।
শহরের বাতাসে কেমন দমবন্ধ লাগছে,বমি বমি পাচ্ছে।
“ঠিক আছো?
প্রহরের কথায় মিথি শুধু হুম বললো।
চলন্ত রাস্তায় হুট করে সামনের গাড়ির সাথে একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিলো।চোখের সামনে ধুমড়ে গেলো বাসের অর্ধেকটা।মিথি ভয়ে প্রহরের শার্ট আঁকড়ে ধরলো।মানুষের আনাগোনা বাড়লো। কয়েকজন আহত হয়েছে। জ্যাম বাড়ার আগে আঁটো ওয়ালা সাইট কেটে চললো।মিথি ভয়ে সিটিয়ে আছে।প্রহর আগলে নিলো,বলল,

“এসব শহরে ঘন্টায় ঘন্টায় ঘটে। সময়ের সাথে দেখবে,অভস্ত্য হয়ে যাবে।
মিথির গা গুলাচ্ছে তাই চুপ করে রইলো।পাভেল প্রহর কে বলল,
“ওখানে গিয়ে কি আজ থাকবি?নাকি ওখান থেকে বেরিয়ে রাতেই নতুন বাড়িতে উঠবি?
“রাত হয়ে গেছে ওখানে থাকতে হবে। কাল সকালে নতুন বাড়িতে যাবো।তোরাও আসবি সবকিছু ঠিক করা লাগবে।
কথা বলতে বলতে আটো থামলো। রাত নেমেছে কিছুসময় আগে।পাভেল আর আসিফ নামলো। প্রহর মিথি কে আলতো করে ডাকলো,
“মিথি উঠে পড়ো আমরা এসে গেছি।
মিথি চোখ খুললো।নেমে পড়লো ওর সাথে।
আশেপাশে তাকালো কত মানুষ,গাড়ির সারি।
“চলো।
চারজনে সামনের বিল্ডিংয়ে গেলো।দুইতলা তারা থাকে।দরজায় নক করতেই ছোট পরী দরজা খুলে দিলো। প্রহর কে দেখে হেঁসে ফেললো, বলল,

“মামা।আম্মু মামা এসেছে।
প্রহর ওকে কোলে তুলে নিলো। তখনই প্রীতি ও ঘর থেকে এলো।প্রহর পাশে মিথি কে দেখে বলল,
“মিথি?চিনতে পেরেছিস?
মিথি ভালো করে দেখছে।চেনা চেনা লাগছে আর নাম যেহেতু শুনলো তাই বলল,
“জ্বী আপনি তো প্রীতি আপা।বড় আম্মার মেয়ে,পিয়াস ভাইয়ের বোন।আপনি যখন বাড়ি ছেড়ে আসেন তখন আমার বয়স ছিলো নয় বছর এখন সতেরো।কগ আগের কথা এজন্য চেহারা মনে রাখা কঠিন ছিলো।
মা ভাইয়ের কথা শুনতেই প্রীতির মুখটা আঁধারে ঢেকে গেলো।পুরোনো স্মৃতি এখনো মতিষ্কে হানা দেয়।কতদিন দেখেনি তাদের।সামনে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি পেয়েও সে যায়নি। সে ভুল নয়,সঠিক মানুষ কে বেছে নিয়েছিলো তাই আজ সুখের সংসার করছে।কিছু অভিমান, অভিযোগ সবাই কে সবার কাছ থেকে দূরে রেখেছে।

“আপা দুলাভাই আসেনি?”
“হুম না। আসবে একটু পরই।তোরা ভেতরে আয় আমি কেমন পাগলের মতো দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
সকলে ভেতরে গেলো।আসিফ আর পাভেল চলে যেতে চাইলো কিন্তু প্রীতি না খাইয়ে যেতে দিবে না বিধায় থাকলো।প্রহর আর মিথির জন্য প্রীতি ঘর গুছিয়ে রেখেছিলো। বাসায় তিনটে মানুষ তাই দুটো ঘর নিয়ে থাকে। প্রহর প্রথমে মিথিকে পাঠালো ফ্রেশ হতে।মিথির গরম লাগছিলো বিধায় একবারে গোসল করে নিলো।প্রহর অপেক্ষা না করে প্রীতি ওয়াশ রুমে গেলো গোসল করতে।পাঁচ মিনিটে তার গোসল শেষ।ঘরে এসে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে শার্ট পরছিলো ঠিক সেই সময় ওয়াশ রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।প্রহর না চাইতেও তাকালো।মিথি বেরিয়ে গামছা চুল থেকে খুলে ঝেরে দিলো।তার খেয়াল নেই একপাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে আছে। মিথি হুট করে অনুভব করলো তার পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়েছে। সে তড়িৎ গতিতে পিছনে তাকালো।প্রহর নেশাক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।পলক ফেলছে না দেখে মিথি আমতাআমতা করে কিছু বলতে চাইলো।প্রহর ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ করতে বলল। কিছুটা কাছে এসে মিথিকে আবার আগের ন্যায় ঘুরিয়ে দিলো।ভেজা চুলের ঘ্রান নিতে,নিতে মাতাল কন্ঠে বলল,

“তোমায় ভেঁজা চুলে বেশি মোহনীয় লাগে। দৃষ্টি ফেরানো দায় হয়ে যায়।এতো সুন্দর কি তুমি?নাকি আমার পাগল মন ও দৃষ্টি?”
মিথি জড়ানো কন্ঠে উত্তর দিলো,
“আপনি পুরো মানুষটাই সুন্দর তাই সবকিছু সুন্দর লাগে।
মিথির কন্ঠ থমকে আসছে।প্রহর মিথির পরিস্থিতি বুঝে সরে এলো।বাহির থেকে প্রীতির ডাক এলো।প্রহর বেরিয়ে যেতেই মিথি ও কোনো মতো চুল আঁচড়ে বেরিয়ে গেলো।

পরেরদিন সকাল হতেই প্রহর আর মিথি প্রীতিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে।পাভেল আর আসিফ নতুন বাড়ির জন্য কিছু জিনিস আগেই কিনেছিলো যেমন তোশক,বালিশ আরো কিছু কিনার বসকি আছে।হাঁড়ি-পাতিল রান্নার জিনিস সব কিনতে বেরিয়েছে প্রহর আর আসিফ।পাভেল থেকে গেছে।
আজ হিমিকেও সাথে নিয়ে এসেছে মিথির সঙ্গে দেখা করাবে বলে।হিমি প্রহর কে আগে থেকে চিনে প্রেমিকের বন্ধু কে না চিনবে।পাভেলের থেকে ওদের প্রেমের কাহিনি শুনে দেখতে চেয়েছিলো সেই মিথিকে।এখন ওরা তিনজনে বাড়িতে রয়েছে।

হিমি আর মিথি গল্প করছে।কিছু মুহূর্তে যেন একে অপরের পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাদের গল্পের মাঝে হাঁসির শব্দে ঘর বাজছে।পাভেল এক দৃষ্টিতে হিমির দিকে চেয়ে আছে। ভাবছে, এই মেয়েটাকে কি সে পাবে?আর যদিও পেয়েও যায় সুখি রাখতে পারবে তো?হিমির মতো মেয়ে খুব কম পাওয়া যায়। মেয়েটা বেশ মিশুক এবং বুঝদার তবে মাঝে মধ্যে অবুঝের ন্যায় করে।
প্রহর আর পাভেল প্রায় সংসারে সব জিনিস নিয়ে এসেছে।বিকেল হতে সব গোছগাছ শেষ।দুপুরে সবাই বাহিরে খেয়েছে।রাত থেকে রান্না করবে।বিকেলের আড্ডা হিসাবে ছাঁদ বেছে নিয়েছে।
হিমি আর মিথি গল্প করছিলো।আর ওরা তিনজন মিলে কথা বলছে।একটু পর আসিফ মিথি আর হিমি কে নিচে পাঠালো একটা কাজ দিয়ে এবং তারা আসছে বলে জানালো।
ওরা দুজন যেতেই আসিফ লাইটার বাহির করে সিগারেট জ্বালালো।একটা পাভেল কেও দিলো।তারা নিত্যদিন ধূমপান করে না তবে মাঝে মধ্যে সখে টানে।আসিফ এবার প্রহরের দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলো।

“ধর নে।”
“আমি সিগারেট পছন্দ করি না জেনেও নাটক করছিস?
এই পাভেল হিমি কে ডাক দিবো?”
“এই না ভাই ডাকিস না।এই আসিফ ও ভদ্র ছেলে ওকে ডাকিস না।
ও শুধু প্রেয়সীর নেশায় আসক্ত থাকুক।”
“আপনার ক…….
মিথি থেমে গেলো।ছাঁদের দরোজায় দাঁড়িয়ে রইলো।মিথি কন্ঠ শোনা মাত্র ওরা দুজনল হাত লুকালো।তার পর ধীরে ধীরে ছাঁদের উপর থেকে ফেলে দিলো।প্রহর ওদের কাহিনি দেখে হাসছে।
আসিফ দাঁত বাহির করে বলল,
“মিথি যে প্রহর কে ডাকতে এসেছো?”
“না পাভেল ভাই কে হিমি আপা ডাকছে।তার বাসায় নাকি জুরুরি প্রয়োজন এখনই যাবে।”
পাভেল হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলো।পিছু পিছু আসিফ ও ছুঁটলো।
মিথি ছাঁদের দরজা মাড়িয়ে প্রহরের পাশে এসে দাঁড়ালো।প্রহরের দৃষ্টি তারই পানে।

“আপনি সিগারেট ফুকেননি?”
“না।”
“কেন?”
“আমার ভালো লাগে না তাই।”
“কি ভালো লাগে?’
“তোকে।”
“সিগারেটের প্রতি আসক্তি জাগেনা?”
প্রহর দুকদম এগিয়ে আসলো।হাতদুটো প্যান্টের পকেট থেকে বাহির করে ছাঁদের কিনারায় রাখলো।অতঃপর মিথির টানা মুগ্ধতায় ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি পৃথিবির সমস্ত নেশা তোমার ওই দুচোখে খুজে পাই।”
“আমার নিকোটিনের প্রতি কোনো আসক্তি নেই,
আমি শুধু তোমার চোখের নেশায় আসক্ত থাকতে চাই।”

পাভেল হিমি কে পৌঁছে দিতে চলে গেলো। হিমি যাওয়ার আগে মিথিকে বলে গেছে তোমার সাথে মাঝে মধ্যে দেখা করতে আসবো আর তোমার পাতানো ভাই কে বলিও একটু আমাকে যেন ঘরে তোলে।মিথি শুধু হেঁসেছিলো পাভেল শুধু শুনেছে।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মনে মনে বলেছে,
“ইচ্ছেরা মরে যায় বাস্তবতার কাছে।তাই তো অনেককিছু চেয়েও করতে পারিনা।”
আসিফ ওরা যাওয়ার একটু পর বেরোলো।প্রহর দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে মিথির কোলে মাথা রাখলো।চোখ বন্ধ করে বলল,
“ক্রান্ত লাগছে খুব।ছোটাছুটি করতে গিয়ে মাথা ব্যথা বেড়েছে।

এতটুকু শুনতেই মিথির হাত গেলো প্রহরের কপালে।শীতল হাতের স্পর্শে প্রহর আরো জেঁকে ধরলো।মিথি মাথা টিপে দিচ্ছে আবার কখনো চুল বুলিয়ে দিচ্ছে।এক সময় প্রহরের চোখ লেগে আসলো। প্রায় ঘন্টা পেরোলেও উঠলো না।এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কিছু কাজ আছে তাই মিথি আলতো করে প্রহরের মাথা বালিশে রেখে উঠে পড়লো।সোজা রান্না ঘরে গেলো।চাল,ডাল,সবজি যা আছে সব দেখে ভাবলো কি রান্না করবে। দুপুরে আনা মাছগুলো অল্প ভেজে রাখা আছে। সেগুলো দিয়ে কচুর লতি রান্না করবে।এটা তার খুবই পছন্দের।ভাবা মতো কাজ শুরু করলো। কাটাকাটি শেষে ধুয়ে নিয়ে ঝাল মসলা দিয়ে চড়িয়ে দিলো।

রান্না তেমন করা হয়না এজন্য একটু ভয় লাগছিলো ঝাল লবন কম বেশি হবে কিনা। ভাত পরে চড়াবে। রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে গেলো। তাদের ফ্লাট হচ্ছে নিচতলায়।দুটো ঘর একটা রান্না ঘর,ওয়াশরুম আছে।এই মিলিয়ে আট হাজার টাকা ভাড়া এই বাড়িতে। পাশের ঘরটা একটু ছোট আছে। তাদের ছোট সংসার এইখানে গড়ে উঠবে।সামর্থ্য হলে একদিন নিজেদের বাড়িও হবে।সেই বাড়ি গ্রামেই করবে।শেষ বয়সে তো সেখানেই থাকতে হবে।
প্রহর ঘুমঘুম চোখে তাকালো। আশে পাশে মিথি কে না দেখে উঠে পড়লো। কোথাই গেলো মেয়েটা?
ওকে খুঁজতে ঘরে থেকে বেরোলো।রান্না ঘর থেকে শব্দ আসছে দেখে সেখানে গেলো।

“কি করছো এখানে?
আচমকা কন্ঠে মিথি চমকে উঠলো। প্রহর কে দেখে শান্ত হলো বুকে থু থু দিয়ে বলল,
“এমন কে কেউ আচমকা ডাকে?ভয় পেয়ে গেছিলাম তো। রান্না করছি দেখছেন না?তারকাি রান্না শেষ ভাত ও হয়ে এলো বলে।
“তা তো দেখছি কিন্তু একা মতববরি করতে কে বলেছে?আমাকে ডাকতে।
“আপনি ক্রান্ত ছিলেন ঘুম দরকার ছিলো।
আমি রান্না তেমন ভালো পারিনা দেখুন কেমন হয়েছে।
প্রহর একটুখানি তরকারি চেখে দেখলো।
মিথি তাকিয়ে আছে ওর দিকে উত্তর শোনার আশায়।
“হুম ভালো হয়েছে।
হঠাৎ নজর পড়লো হাতের দিকে।

“কি হয়েছে এখানে?
মিথির হাতটা টেনে সামনে আনলো।মিথি কিছুটা ভয়ে ঠোক গিলে বলল,
“ওই ঘর মুঝতে গিয়ে এক সাইডে একটা পেরেক ছিলো আমি দেখিনি সেটা লেগে কেটে গেছে।
প্রহর চোখ পাকালো।বলল,
“বাহ্ ভালো কাজ পারো।জায়গাটা বাধোনি কেন?ঝাল ধরেনি?
“একটু ধরেছিলো সমস্যা হবে না।
আপনি যান আমি ভাত নামিয়ে আসছি।
প্রহর গেলো।মিথি ভাতের মাড় পিষিয়ে ঘরে গেলো।
দেখলো প্রহর চুল আঁচড়াচ্ছে। ওকে আসতে দেখে বলল,

“চলো আজ রাতের শহর ঘুরতে বেরেবো।তোমায় নিয়ে হুড খোলা রিকশায় ঘুরবো।তোমার পছন্দের ঝাল মুড়ি খাওয়াবো।ফেরার পথে একটা লাল গোলাপ উপরহার দেবো।
দুজনে নির্জন এক রাস্তায় হাঁটছে।তাদের বাসা থেকে একটু দূরে।মিথির নাকি হাঁটতেই ভালো লাগছে তাই তো হাঁটছে।প্রহর ওর বাম হাতটা শক্ত করে আঙুলের ভাঁজে রেখে দিয়েছে।মিথি প্রহরের আবদারে একটা সাদা লাল পাড়ের শাড়ি পরেছে।আলতা চুড়ি না থাকাতে পরেনি কিছু। তবুও অপরুপা লাগছে।ক্ষণে,ক্ষণে প্রহর তাকাচ্ছে মিথির দিকে।শহরে আজ মেঘময় দিন ছিলো।এদিকে কোলাহল কিছুটা কম।কোলাহল শূন্য রাস্তা পেরিয়ে কোলাহলে পূর্ণ রাস্তায় উঠলো।দূরে রাস্তার পাশে ফুলের দোকান প্রহরের নজরে এলো।মিথিকে দাঁড় করিয়ে প্রহর ছুঁটলো।
হাজার ফুলের মধ্যে একটি লাল গোলাপ আর একটি হলুদ সূর্যমুখী ফুল নিলো। রাস্তা পার হতে গিয়ে আবারো নজরে পড়লো আরেকটি দোকান।প্রহর সেদিকে ছুটলো।মিথি শুধু তাকিয়ে তার পাগলামো দেখছে।
প্রহর দৌঁড়ে আসলো।ফুলদুটো মিথির একহাতে দিয়ে দিলো।আরেক হাতে থাকা লাল কাঁচের চুড়িগুলো নিজ হাতে পরিয়ে দিলো।

“এবার সুন্দর লাগছে।
মিথি কাঁচের চুড়ি পেয়ে যেন আরো বেশি খুশি হলো।ঠোঁটের কোনোর হাঁসির রেখা দেখা দিলো।
প্রহর আবার সেই হাঁসিতে মুগ্ধ হলো।
“আলতাও এনেছি কিন্তু কিভাবে দিবো?
প্রহর আশে পাশে তাকালো।কাঙ্ক্ষিত জায়গা পেতেই মিথিকে টেনে নিয়ে গেলো একপাশে। একটি বেঞ্চ আছে ওখানে মিথিকে বসিয়ে দিলো।
প্রহর নিচে বসে পড়লো। মিথির ডান পা ‘খানা হাঁটুর উপর রাখলো।আলতার গাঢ় প্রলেপ লাগিয়ে দিলো মিথির শ্যাম বরণ পায়ে।মিথি কেবল মুগ্ধ চোখে দেখছে।তার কপালে এতো ভালোবাসা,সুখ লেখা ছিলো তা কিভাবে বুঝতো যদি প্রহর জীবনে না আসতো?

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৮

“শেষ। এবার পারফেক্ট ম্যাচিং। একদম অপরুপা লাগছে।
“শুকতারা নাম কি তবে বাদ গেলো?
প্রহর কিছুটা চিৎকার করে বলল,
“তোমায় আমি শত নামে ডাকবো,
সন্ধ্যে নামলে শুকতারা,শাড়িতে অপরুপা,
হৃদয় ভরে ডাক পাঠাবো,
শোনো শহর,সে ডাক তোমরাও শোনো।”

মন পিঞ্জিরা শেষ পর্ব