Home মহাপ্রয়াণ মহাপ্রয়াণ পর্ব ১৩+১৪

মহাপ্রয়াণ পর্ব ১৩+১৪

মহাপ্রয়াণ পর্ব ১৩+১৪
নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রকৃতিতে মিশে আছে হিম বাতাসের ধারা। কুয়াশার কারণে জানালার বিশাল কাঁচটা অস্বচ্ছ হয়ে আছে। শীত শেষ হওয়ার আগে যেন ঢাকঢোল পিটিয়ে বিদায় নিচ্ছে। তুলতুলে কম্বল মুড়িয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে আনাস্তাসিয়া। আজকে তার হঠাৎ ঘুমের সাথে খুব ভাব হলো। অফিলিয়া এসে এপর্যন্ত বেশ কয়েকবার ডেকে গিয়েছে। সকাল পেরিয়ে বেলা হয়েছে। কিন্তু আনাস্তাসিয়ার এই নরম তুলতুলে কম্বল ও ঘুমের সাথে সখ্যতা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না মোটেও। হঠাৎ আনাস্তাসিয়ার মনে হলো ধপাস করে তার পাশে পাহাড় ধ্বসে পড়েছে। নড়েচড়ে উঠে সে। মুখশ্রীতে বিরক্তিমাখা ভাব এনে পিটপিট করে চোখ খুলে পাশে তাকায়। স্বাস্থ্যবান শরীর নিয়ে ছোট লিয়াম তার পাশে বসে আপেলে বড় বড় কামড় বসাচ্ছে ও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আনাস্তাসিয়া একটু গড়াগড়ি করে অপরপাশে ফিরে শুয়ে পড়ে। চোখ বুজে রেখেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে,

” সকাল সকাল এসে বাচ্চা বাঁদরের মতো বাঁদরামি করছিস কেন আমার পাশে? ”
” তোমার মতো কুম্ভকর্ণের কাছে যেটা সকাল মনে হচ্ছে, আমাদের মতো নিরীহ মানবসভ্যতার কাছে তা বেলা পেরিয়ে দুপুরে এসে ঠেকছে। ”
” কুম্ভকর্ণকে কি তুই মানবসভ্যতার কাতারে ফেলছিস না? নাকি তারা তোর দ্বারা বহিস্কৃত হয়ে গিয়েছে মানবসভ্যতার খাতা থেকে? ”
” দুটোই। ”
এবার আনাস্তাসিয়া ঠাট্টার সুরে বলে,
” মেসিডোনিয়ায় এসে খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস। তোর এসব কথার পিছনে গুরু কে? ”
লিয়াম দাত বের করে হেসে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” ওরিয়ন। ”
” নিকোডিমাসকে রেখে ওরিয়ন কে কবে তুই বন্ধু বানালি? ”
” ওরা দু’জনই আমার বন্ধু। ”
” উহু৷ নিকোডিমাস তোর বন্ধু। ওরিয়ন আমার বন্ধু। ”
” আচ্ছা আমি গিয়ে ওরিয়নকেই এই প্রশ্ন করে আসি। সে আমাদের বাসার নিচেই আছে এখনো। তোমার সাথে দেখা করার জন্য এসে দাঁড়িয়ে আছে। তাই তোমাকে ডাকতে এসেছিলাম আমি। ”
এটা বলেই লিয়াম এক দৌড়ে কামরা থেকে বেরিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়া আরাম করে আবার ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করে। পরক্ষণেই সে চোখ খুলে বিড়বিড়িয়ে বলে,

” ওরিয়ন। ওরিয়ন এসেছে। লিয়াম না আবার আমার ইজ্জতের নাকানিচুবানি করে দেয় তার সামনে। ”
আনাস্তাসিয়া তড়িৎ গতিতে উঠে দৌঁড়িয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে। বাড়ির মূল দরজা খোলা দেখে বুঝতে পারে লিয়াম ও ওরিয়ন হয়তো বাহিরে আছে। সে দু হাতে স্কার্টটা কিছুটা উপরে তুলে ঘরের বাহিরে দৌড় লাগায়। পিছন থেকে অফিলিয়া রান্নাঘর থেকে এই দৃশ্য দেখে চেচিয়ে বলে উঠে,
” অ্যানা! সাবধানে। ”

বাড়ির মূল দরজা থেকে উঠোনে নেমে আসার জন্য ছয় ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে নামতে হয়। এখানেই আনাস্তাসিয়া বিপত্তি বাধায়। শেষরাতে হওয়া তুষারপাতের কারণে সিঁড়ির ধাপগুলো পিচ্ছিল হয়ে ছিলো। তাড়াহুড়ো করে দৌঁড়ে নামতে নিয়ে অসাবধান বসত আনাস্তাসিয়া পা পিছলে পড়ে যায়। উঠোনের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলো ওরিয়ন ও লিয়াম। আনাস্তাসিয়াকে পড়ে যেতে দেখে ওরিয়ন দৌঁড়ে এগিয়ে আসে। লিয়াম এগিয়ে না এসে উল্টো হাসতে হাসতে বলে,
” ধপাস করে আকাশ থেকে এসে পড়েছিস তুই? ”
আনাস্তাসিয়া চোখ পাকিয়ে লিয়ামের দিকে তাকায়। লিয়াম ভয়ে হাসি বন্ধ করে বোনের কাছে এগিয়ে যায়। ওরিয়ন এসে আনাস্তাসিয়াকে হাত ধরে উঠতে সাহায্য করে। চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন করে,

” ঠিক আছো আনাস্তাসিয়া? ”
” সমস্যা নেই। ঠিক আছি। ”
ওরিয়ন এক হাটুতে ভর দিয়ে আনাস্তাসিয়ার সামনে বসে। তার পায়ের গোড়ালির কাছ থেকে কিছুটা কাপড় সরিয়ে দেখতে পায় গোড়ালির পাশে বেশ খানিকটা ছিলে গিয়েছে নিচে পড়ে বরফের কণার ধারে। কিছু জায়গা থেকে রক্ত ও বেরুচ্ছে ওরিয়ন উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
” দেখতে পাচ্ছি তোমার ঠিক থাকার নমুনা। হেঁটে দেখো তো ব্যাথা অনুভব করছো কিনা। ”
আনাস্তাসিয়া ইতস্ততভাবে হাঁটার চেষ্টা করে। কিন্তু পা নাড়াতেই ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে। লিয়াম এবার নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

” বেশি ব্যাথা করছে অ্যানা? ”
আনাস্তাসিয়া কিছু বলার আগেই ওরিয়ন বলে,
” যা ভেবেছিলাম। পড়ে পা মচকে বসে আছো। এজন্যই পায়ের গোড়ালির পাশে ফুলে আছে। লিয়াম তুমি ভিতরে গিয়ে অফিলিয়া গ্র্যানিকে বলো গরম পানি করে নিয়ে আসতে। আমি আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে আসছি। ”
লিয়াম হ্যাঁ বোধক করে মাথা নাড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। ওরিয়ন আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
” তোমার আপত্তি না থাকলে আমি সাহায্য করবো? এই পা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে আরো বেশি ব্যাথা অনুভব করবে। ”
আনাস্তাসিয়া ঘুম থেকে উঠেই পায়ের ব্যাথায় এভাবেই তেতে আছে। তাই সে সম্মতি দিয়ে দেয়। ওরিয়ন আনাস্তাসিয়াকে পাজাকোলে করে উপরে তার কামরায় নিয়ে যায়। অফিলিয়া গরম পানি নিয়ে এসেই বকতে থাকে,

” তোমাকে কে বলছে সকাল সকাল উঠে এভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে? এখন পা মচকে বিছানায় বসে থাকতে খুব ভালো লাগছে? ”
” আমার কোনো দোষ নেই গ্র্যানি। লিয়াম আমাকে বিরক্ত করছিলো। ”
” নিজের দোষ এখন লিয়ামের উপর চাপিয়ে দিবে না। দু’দিন ও হয় নি ক্রুশের হারটি হারিয়েছো আর আজকেই তোমার উপর বিপদ এসে পড়লো। এজন্যই বলেছিলাম ওটা সাবধানে পড়ে থেকো সর্বক্ষণ। ”
ওরিয়ন গরম পানি দিয়ে আনাস্তাসিয়ার পায়ে কাঁটা জায়গা পরিষ্কার করে দিতে দিতে প্রশ্ন করে,

” ক্রুশের হার? ”
অফিলিয়া বলে,
” হ্যাঁ। আনাস্তাসিয়া ও লিয়ামের জন্য দুটি নিয়ে এসেছিলাম আমি চার্চ থেকে। আনাস্তাসিয়া সেদিন লেকের ওখানে নিজেরটা হারিয়ে ফেলেছে। ”
ওরিয়ন বলে,
” ওহ। আচ্ছা। ”
অফিলিয়া আর বেশি কথা না বাড়িয়ে নিচে চলে যায় রান্না করতে। কামরায় এখন আনাস্তাসিয়া ও ওরিয়ন একা বসে। ওরিয়ন বলে,
” কাঁটা জায়গাটুকু আমি গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করে সেখানে ভেষজ ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছি। অল্প কিছু দিনেই সেড়ে যাবে। আর ফোলা জায়গায় পারলে দিনে দু তিন বার কাপড়ের ভেতর বরফ নিয়ে আস্তে আস্তে লাগালে সেটাও কমে যাবে দু দিনে। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,

” যথা আজ্ঞা। ”
ওরিয়ন এবার কিছুটা গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করে,
” আমি তোমার সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলত কথা বলতে এসেছি। তোমাকে যে সেই ডায়েরিটা দিয়েছিলাম সেটা সম্পূর্ণ তোমার পড়া হয়েছে? ”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে আনাস্তাসিয়া অবাক হয়। সে আন্দাজ করেছিলো যে ওরিয়ন নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলার জন্যই এসেছে। কিন্তু সেটা যে এ বিষয়ে তা সে ধারণা করে নি। অপ্রস্তুত কণ্ঠে সে জবাব দেয়,
” হুম। পড়েছি। ”
” বিশ্বাস হয়েছে তোমার যে আমি সত্য বলছিলাম? ”
” হ্যাঁ। সব পড়ে বিশ্বাস হয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের ইতি যদি কাউন্ট লিও এবং কাউন্টেস ম্যারির সাথেই হয়ে থাকে তাহলে এখন বর্তমান কাউন্ট কে? ”

” সেটা সম্পর্কে আমিও অবগত নই। কারণ কাউন্ট লিও ও কাউন্টেস ম্যারির সন্তান সিংহাসনে বসার সুযোগ পায় নি। ধারণা করা হয় সেই ১৫১৪ সালে রোমানিয়ায় ট্রান্সিলভেনিয়াতে ছড়িয়ে পড়া প্লেগ রোগে কাউন্ট লিও সহ কাউন্টেস ম্যারিও মারা গিয়েছিল। তারপর থেকেই ট্রান্সিলভেনিয়াকে সাম্রাজ্য থেকে বিছিন্ন করা হয়েছে। ১০০ বছর পার হয়ে গিয়েছে। এই এতো বছরে রোমানিয়ার সকলেই ট্রান্সিলভেনিয়াকে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবেই মনে রেখেছে শুধু। যারা সাহসিকতা দেখিয়ে ট্রান্সিলভেনিয়াতে প্রবেশ করেছে তারা আর কখনোই সেখান থেকে ফিরে আসে নি। অনেকেই বিশ্বাস করে সেই মহামারীতে মারা যাওয়া মানুষের অতৃপ্ত আত্মা এখনো হয়তো সেখানে ঘুরে বেড়ায়। ”

” কি ভয়ংকর। কিন্তু এই ডায়েরির ভাষ্যমতে ১৫১৪ সালে ট্রান্সিলভেনিয়াতে শুধু প্লেগ না ভ্যাম্পায়ার দেরও দেখা মিলেছিল। হয়তো তাদের অস্তিত্ব এখনো আছে সেখানে। কিন্তু যেখানে রোমানিয়া হতেই আজ এতো বছর ধরে ট্রান্সিলভেনিয়া বিচ্ছিন্ন সেখানে ভ্যাম্পায়ারদের আনাগোনা গ্রীকে কি করে সম্ভব? ”

” সম্ভব আনাস্তাসিয়া। ট্রান্সিলভেনিয়া শহর গ্রীকের সীমান্ত অঞ্চলের ঠিক পাশেই। বুখারেস্ট সহ রোমানিয়ার বাকি সকল শহর ঠিকই ট্রান্সিলভেনিয়ার সীমান্তের চারিদিকে উঁচু দেয়াল তুলে দিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা কঠোর করেছে। কিন্তু গ্রীক ও ট্রান্সিলভেনিয়ার মাঝে দূরত্ব কেবল কৃষ্ণ সাগরের একাংশ সমান। এদিকে চলাচলে ওদের কোনো বাধা নেই। আর তাদের এদিকে চলাচল যে অব্যাহত তার সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে তোমরা এখানে আসার সপ্তাহখানেক আগ থেকেই পরপর কাস্টোরিয়ায় জঙ্গল হতে চারটি লাশ পাওয়া যায়। চারটি লাশের শরীরেই সূক্ষ্ম দু দাতের কামড়ের দাগ ছিলো। যেটাকে সকলে কোনো বিষধর সাপের কামড় হিসেবে ধরে নিয়েছে। কিন্তু আমি এবং কাস্টোরিয়ার প্রধান চিকিৎসক জেসন এন্ডিনো তাদের শরীরে কোনো বিষের অস্তিত্ব খুঁজে পাই নি। এমনকি তাদের শরীরে রক্তের পরিমাণ খুবই সামান্য ছিলো। যেন মৃত্যুর আগে কেউ তাদের শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। ঠিক ইভির মৃত্যুর মতো। ”

আনাস্তাসিয়া কাপা কাপা স্বরে প্রশ্ন করে,
” আমার মা বাবা তাদের মৃত্যুও কি একইভাবে হয়েছে বলে তোমার মনে হয়? ”
ওরিয়ন এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার কাছে বসে বলে,
” আনাস্তাসিয়া তোমার মা বাবার মৃত্যু আরো অধিক বিভৎস ছিল। তাদের লাশ দেখে কোনো অংশেই মনে হয়নি কোনো ভ্যাম্পায়ারের কাজ এটা। হয়তো কোনো বন্য পশু ছিল। ”
আনাস্তাসিয়া আর কোনো প্রশ্ন করে না। সে চুপচাপ ভাবনায় মগ্ন হয়ে পড়ে। ওরিয়ন নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটি হার বের করে আনাস্তাসিয়ার সামনে ধরে। আনাস্তাসিয়া খানিকটা অবাক হয়। বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
” এটা তো আমার সেই ক্রুশের হারটি। তুমি কোথায় পেলে এটা? ”
” লেকের কাছেই পেয়েছি। একটি পাথরের পাশে পড়ে ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো এটা আগে কোথাও দেখেছি। পরে খেয়াল হয় যে তোমার গলায় এটা দেখেছিলাম। তাই নিজের কাছে রেখেছিলাম। কিন্তু দেয়ার সুযোগ করতে পারি নি। ”

আনাস্তাসিয়া হাত বাড়িয়ে হারটি হাতে নিয়ে ওরিয়নকে ধন্যবাদ জানায়। ওরিয়ন আনাস্তাসিয়াকে নিজের খেয়াল রাখতে বলে উঠে দাঁড়ায়। তার থেকে বিদায় নিয়ে দরজার কাছে যেতেই আনাস্তাসিয়া পিছন থেকে ডাকে,
” ওরিয়ন? ”
ওরিয়ন পিছনে ঘুরে প্রতুত্তর করলে আনাস্তাসিয়া তাকে প্রশ্ন করে,
” এই ডায়েরিটা তুমি কিভাবে পেলে? ”
ওরিয়ন এক দন্ড আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
” এটি আমার পারিবারিক পূর্বপুরুষের ডায়েরি। রোমানিয়ান ছিলাম আমরা। এই ডায়েরি যে লিখেছেন তিনি কাউন্ট লিওর রাজ জোতিষ্যি ছিলেন। ”
হতভম্ব আনাস্তাসিয়াকে সেখানে রেখেই ওরিয়ন কামরা থেকে প্রস্থান করে।

সবে মাত্র শিকার থেকে ফিরেছে আরোণ। প্রাসাদে ফিরেই প্রথমে সে গোসল সেড়ে নিয়েছে। সারা শরীরে ও কাপড়ে তার রক্ত লেপ্টে ছিলো। মাঝেমধ্যে মানুষের এই প্রেতাত্মার গল্প শুনে তার হাসি পায় বড্ড। এইযে সকলের ধারণা সিবিউর গভীর অরণ্যের গহীনে শুধু হিংস্র পশু নয় বরং এই বাসকোভ প্রাসাদে অতৃপ্ত আত্মার আনাগোনাও আছে। এই রহস্য উদঘাটনের জন্যই তারা ছুটে আসে এই অরণ্যে। পরে তাদের পরিণতি হয় আরোণের শিকার হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। মন্দ তো নয়। যেদিন তারা অরণ্যে আসে না সেদিন আরোণের যেতে হয় ছদ্মবেশে এই অরণ্যের বাহিরে। সেটাতেও অবশ্য আরোণের কোনো সমস্যা নেই। শতাব্দী ধরে তো এভাবেই চলে আসছে।
আরোণের এসব ভাবনার মাঝেই কক্ষের কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে আসে। আরোণ ভিতর থেকে অনুমতি দিতেই একজন মানবরূপী নেকড়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মাথা নত করে কুশল জানায় আরোণকে। আরোণ বলে,

” সবাই নিচে উপস্থিত হয়েছে মিলোস? ”
” জ্বি আলফা। আপনার অপেক্ষায় আছে সবাই। ”
” তুমি নিচে যাও। আমি আসছি তৈরি হয়ে। ”
” যা হুকুম আলফা। ”
মিলোস চলে যাওয়ার পর আরোণ তৈরি হয়ে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে নেয়। সাদা ম্যাডিভাল টিউনিক শার্ট, কালো ব্রীচেস প্যান্ট তার ওপর কালো হুডযুক্ত ক্লক পড়েছে সে। কক্ষ থেকে বেরিয়ে সোজা নিচে অন্ধকারচ্ছন্ন সেই হলরুমে প্রবেশ করে ক্লকের হুড টেনে হলের মাঝ দিয়ে সে হাটা শুরু করে। দু পাশে সকল মানবরূপী নেকড়েরা এক হাটুতে ভর করে মাথা নত করে বসে কুশল জানায় তাকে। আরোণ সোজা হেটে গিয়ে তার আসনে বসে হাতের ইশারা করতেই সকলে উঠে দাঁড়ায়। নেকড়েদের মাঝ হতে শ্যামবর্ণের এপোলো বলে উঠে,

” আলফা, কৌতুহল মার্জনা করবেন। এখানে আমরা সবাই উপস্থিত আছি কিন্তু ক্রিয়াস নেই। সে কোথায় তা কি জানতে পারি? ”
” সে আমার দেওয়া দায়িত্ব পালনেই গিয়েছে। তোমার এ নিয়ে মাথাব্যথা না করলেও চলবে। ”
এপোলো চুপসে যায়। ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছে বুঝতে পারে সে। আরোণ একবার সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। কিছুটা ভ্রু কুচকে মিলোসকে প্রশ্ন করে,
” সোফিয়া কোথায় মিলোস? তুমি বলেছিলে সকলেই নিচে উপস্থিত আছে। ”
মিলোস সহ উপস্থিত সকলের মুখের ভাবমূর্তি বদলে যায়। সকলেই মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। আরোণ এবার রেগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,

” আমি একটা প্রশ্ন করেছি সকলকে। উত্তর দাও। ”
মিলোস সহ আরো দুজন মাথা নত করে হলরুম থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরে আসে। তাদের হাতে একটি বস্তা। আরোণ সেদিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। মিলোস বস্তাটির মাথা খুলে উপর করে ধরতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি মেয়ের মাথা। দেহ ছাড়া শুধু এই রক্তাক্ত মাথার দৃশ্যটি দেখতে খুব বিভৎস লাগছে। সাধারণ মানুষ দেখলে ভয়ে নিশ্চিত জ্ঞান হারাতো। কিন্তু এখানে উপস্থিত কারো চেহারায় ভয়ের লেশমাত্র নেই। যেন এই দৃশ্য তাদের জন্য খুব সাধারণ বিষয়। আরোণের চেহারায় রাগের আভা ফুটে উঠে। সে প্রশ্ন করে,

” কে করেছে এমন? ”
মিলোস কাপাস্বরে উত্তর দেয়,
” সোফিয়া নিয়ম ভঙ্গ করেছে। সে এক ভ্যাম্পায়ারের প্রেমে মত্ত হয়ে তার সাথে দেখা করতে ট্রান্সিলভেনিয়াতে প্রবেশ করে। সেই ভ্যাম্পায়ার তার বোকামির সুযোগ নিয়ে তাকে মেরে শুধু তার মাথা বাসকোভ অরণ্যে ফেলে গিয়েছে। ”
আরোণ মুহূর্তে রাগে গর্জন করে উঠে। উপস্থিত সকলেই কেপে উঠে ভয়ে। আরোণ চিৎকার করে বলে উঠে,
” ভালোবাসা! তাও নিজেদের জাত শত্রুকে। দেখে নাও সকলে ভালোবাসার পরিণাম। শত্রুকে বিশ্বাস করার পরিণাম। এতো দূর্বল হয়ে পড়েছে নেকড়ে পাল? সামান্য অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না? এভাবে চললে তো দুদিন পর সকলেই সেই ভ্যাম্পায়ারদের ইশারায় নাচাও শুরু করে দিবে। ”
উপস্থিত একজন নেকড়ে বলে উঠে,

” এখন আমরা কি করবো আলফা? আমাদের পালের একজন হত্যা হয়েছে তাদের হাতে? এভাবেই ছেড়ে দিবো? প্রতিশোধ নিবো না? ”
” সেই চিন্তা তোমরা আমার উপর ছেড়ে দাও। আর আমার হুকুমের বাহিরে কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সাহস করবে না। ”
এই বলে হনহনিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় আরোণ। বিশাল হলরুমের একপাশে থাকা তিনটি জানালা দিয়ে ভেসে আসা চাঁদের আলোয় সকলে নিচে পড়ে থাকা সোফিয়ার মাথার দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে ভালোবেসে প্রতারিত হওয়া এক শক্তিশালী নেকড়ে মানবীর পরিণতি।

কক্ষে ফিরে এসেই শরীর থেকে ক্লকটি খুলে ছুড়ে ফেলে আরোণ। রাগ সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে তার জন্য। বারান্দায় গিয়ে প্রাণ ভরে কয়েকবার শ্বাস নেয় সে। চলমান পরিস্থিতি যেন তাকে চোখে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে যে একজন নেকড়ে হয়ে কাউকে ভালোবাসার ফল কতটা ভয়াবহ। নিচে সবাইকে এতো কিছু বলে আসলো কিন্তু নিজে ঠিকই একজন মানবীকে ভালোবেসে বসে আছে। কি করবে সে? মন ও মস্তিষ্কের মাঝে চলমান যুদ্ধে কাকে বেছে নিবে সে? ক্যাথরিনকে কিভাবে বাঁচাবে নিজের অনুভূতির বিষাক্ত পরিণাম থেকে?

হাতে একটি বই নিয়ে বসে আছে ক্যাথরিন। নিজের বাসায় থাকলে হয়তো সে খুব মন দিয়ে এই মুহুর্তে এই বইটি পড়তো। কিন্তু এখানে সবকিছুই তার বিষাক্ত লাগছে। এই বইটিকেও তার ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। দরজা খোলার শব্দে সে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে। মার্থা কক্ষে প্রবেশ করেছে খাবারের ট্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তার চেহারায় থমথমে ভাব দেখে ক্যাথরিন প্রশ্ন করে,
” কি হয়েছে মার্থা? ”
মার্থা কোনো কথা না বলে চুপচাপ নিজের কাজ করে বেরিয়ে যেতে নেয়। ক্যাথরিন আবার বলে,
” আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি মার্থা। কি হয়েছে? ”
মার্থা করুণ কণ্ঠে বলে,

” আমাদের পালের একজন সোফিয়া। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কি বিভৎস সেই দৃশ্য। তুমি দেখলে তোমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। ”
ক্যাথরিন হেসে বলে,
” তুমি ভুল বলছো। কোনো মৃত জানোয়ারকে দেখে আমার গায়ে কখনোই কাঁটা দিয়ে উঠতো না মার্থা। ”
মার্থা কিছু বলার পূর্বেই কক্ষে প্রবেশ করে আরোণ। এসে মার্থাকে আদেশ দেয় বেরিয়ে যেতে। মার্থা যাওয়ার সাথে সাথেই ক্যাথরিন হাতে থাকা বই বন্ধ করে বিছানায় রেখে নেমে আরোণের চারিদিকে একবার চক্কর মারে। আরোণ সেটা দেখে বলে,

” আমায় খুব মনে পড়ছিলো নাকি সারাদিন? ”
ক্যাথরিন হেসে বলে,
” এখানে আসার পর আজ প্রথম আমার মন খুব ভালো। সেই আনন্দ প্রকাশ করছি তোমার সামনে। ”
আরোণ কিছুটা খুশি হয়। মুখে হাসির রেখা টেনে প্রশ্ন করে,
” তোমার আনন্দের কারণ কি? ”
” শুনলাম কেউ একজন তোমার পালের এক নেকড়েকে হত্যা করেছে। খুশি হলাম শুনে। ”
আরোণের মুখের হাসি উধাও হয়ে যায়। ক্যাথরিন আবার হেসে বলে,
” যে এই মহৎ কাজ করেছে সে আমার থেকে ধন্যবাদ প্রাপ্য। ”
আরোণ চোয়াল শক্ত করে বলে,

” যাকে তুমি ধন্যবাদ দিতে চাচ্ছো সে ও একজন পিশাচ। জানোয়ারদের ঘৃণা করা মেয়ের কি একজন পিশাচের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা শোভা পায়? ”
ক্যাথরিন কিছুটা অবাক হলেও তা দমে গিয়ে জোড়ালো গলায় বলে,
” আমি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে একটা জিনিসই চাই জানো? তিনি যেন তোমাকে অন্য কারো হাতে মরতে না দেয়। কারণ তোমার মৃত্যুর কারণ হওয়ার একমাত্র অধিকার আমার। আমি চাইনা আমার অধিকারে অন্য কেউ ভাগ বসাক। তোমার বিনাশীনি হিসেবে একমাত্র আমাকেই শোভা পায়। ”
আরোণ হেসে বলে,
” তোমার ঈশ্বরের কথা জানিনা কিন্তু এই মুহুর্তে আমি তোমাকে এই অধিকার দিলাম। ক্ষমতা থাকলে হয়ে দেখাও আমার বিনাশীনি। ”
মুখে এই কথা বললেও মনে মনে আরোণ বলে,
” বিনাশীনি হিসেবে হলেও অন্ততঃ তুমি আমার তো হবে। ”

হাতে থাকা চিঠিটা আরেকবার খুলে পড়ে নিচ্ছে আনাস্তাসিয়া।
” চিঠির শুরুতে প্রিয় বলে সম্বোধন নাহয় না করলাম। তোমাকে প্রিয়দের তালিকাভুক্ত করা যায় নাকি তা নিয়ে বেশ সংশয় কাজ করছে মনে। কারণ আমার প্রিয়দের খাতার পৃষ্ঠা সম্পূর্ণ ফাঁকা। তোমাকে বলা হয়েছিল যে আমি মেসিডোনিয়ায় এসেছি নিজের ব্যক্তিগত কাজে। যে উদ্দেশ্যে এসেছিলাম সেটা সফল হয় নি যদিও। কিন্তু যাত্রা পথে তোমার সাথে পরিচয় ঠিকই হয়ে গেলো। তুমি হয়তো ভাবছো তোমাকে এসব কেন লিখছি আমি বা আদৌ আমার তোমাকে চিঠি দেওয়ার মতো কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো যাওয়ার আগে তোমাকে একবার জানালে মন্দ হয় না। যখন তুমি এই চিঠি হাতে পাবে ততক্ষণে আমি নিজের ঠিকানায় যাত্রা শুরু করে দিবো। আর কখনো হয়তো দেখা হবে না আমাদের সেই লেকের পারে। তাই মনে যদি কখনো তোমার অপেক্ষার ইচ্ছে জাগে তা পুষে ফেলো৷ কারণ সেই অপেক্ষা তোমার কোনদিনও শেষ হবে না। আশা করছি গ্রীক তুষার দেবী খিওনে সমতুল্য কিশোরী যেন মেসিডোনিয়ার বুকে চিরহরিৎ হয়ে বেঁচে থাকে।
ইতি – রিকার্ডো। ”

বিকেল থেকে এই পর্যন্ত অসংখ্যবার চিঠিটা পড়া হয়ে গিয়েছে আনাস্তাসিয়ার। বিকেলে কামরায় শুয়ে যখন সে অলস সময় পার করছিলো তখনই হঠাৎ লিয়াম এসে এই চিঠিটা দিয়ে বলে একজন আগুন্তকঃ আনাস্তাসিয়ার জন্য পাঠিয়েছে এটি। হঠাৎ নিজের জন্য চিঠি আসাটা আনাস্তাসিয়ার জন্য বেশ অপ্রত্যাশিত বিষয় ছিল বটে। কিন্তু রিকার্ডোর থেকে পাওয়া চিঠি জানতে পেরে সে আরো বেশি অবাক হয়েছে। মিথ্যে তো লিখে নি রিকার্ডো। হয়তো সে এই চিঠি না লিখলে সত্যি সত্যিই আনাস্তাসিয়া অপেক্ষা করতো প্রতিদিন লেকের পাশে বসে তার জন্য।
ধীরে ধীরে বিছিনা ছেড়ে নেমে কামরার সবগুলো মোমবাতি নিভিয়ে দেয় আনাস্তাসিয়া। রূপালী চাঁদের আলোয় এই নিশুতিরাতের অন্ধকার ঘুচে কামরা আলোকিত হয়ে আছে। মন খারাপ হয় আনাস্তাসিয়ার। মন খারাপের কারণ তার অজানা। হয়তো সে রিকার্ডোর সান্নিধ্য আশা করেছিলো। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে মন কেমনের প্রহর গুনতে শুরু করে আনাস্তাসিয়া।

আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে ক্যাথরিন। ঘুম ভাঙ্গার পর বেশ কিছুক্ষণ কক্ষে পায়চারি করে বিরক্ত হয়ে যায় সে। মার্থার নাস্তা নিয়ে আসতে এখনো বেশ সময় আছে। তাই সে শরীরে একটা ধূসর রঙের চাদর জড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়ানোর সাথে সাথেই একদল হীম বাতাসের প্রবাহে তার শরীর কেঁপে উঠে। ক্যাথরিন গায়ের চাদর টেনে মাথায় দিয়ে কান ও গলা ঢেকে ফেলে ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য। কুয়াশাভেজা সকালে এই জনমানবহীন অরণ্যের দৃশ্য মোটেও উপভোগ করতে পারছে না সে। এই অরণ্য এবং এই প্রাসাদ তার কাছে জেল সমতুল্য। এই প্রাসাদে সে কয়েদিদের মতো এক অদৃশ্য শিকল দ্বারা বন্দি হয়ে আছে। রাগে বিড়বিড় করে ক্যাথরিন বলে,

” ধ্বংস হোক এই প্রাসাদ এবং সেই জানোয়ার। ”
” জানোয়ার কি তোমার আমাকে ভালোবেসে দেওয়া নাম? ”
হঠাৎ অন্য কারো কণ্ঠ শুনে পাশ ফিরে তাকাতেই আরোণকে দেখতে পায় ক্যাথরিন। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য ঘুম থেকে উঠে এসেছে সে। সকাল সকাল যে কেউ এই সোনালী এলোমেলো চুলের পুরুষকে দেখে নেহাৎই সাধারণ একজন মানুষ মনে করবে যদি না সে তার ভয়ংকর রক্তিম চোখজোড়া লক্ষ্য করে। ক্যাথরিন আবার সামনে তাকিয়ে সাবলীল গলায় বলে,
” জানোয়ার নয় শুধু পুরোদস্তুর এক অভদ্র এবং অসভ্যও তুমি। সভ্যতার আলো এখনো তোমায় স্পর্শ করতে পারে নি। ”
আরোণ কিছু মনে করার ভান করে ঠাট্টার স্বরে বলে,

” সকাল সকাল তোমার সাথে আবার কোন ধরনের অভদ্রতা বা অসভ্যতা করে বসলাম আমি? আমার তো মনে পড়ছে না। ”
” যখন তখন যে কারো কক্ষে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা অভদ্রতার কাতারেই পড়ে। কিন্তু তোমাকে এসব বলে লাভ নেই। ভদ্রতা ও সভ্যতা মানব জাতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অংশ। তোমার মতো মানবরূপী জানোয়ারের থেকে এসব আশা করা আমার বোকামি হবে। ”
” ঠিক ধরেছ৷ তাই আমার থেকে এধরণের কোনো আশা তুমি রেখও না। আশাহত হবে দিনশেষে। ”
বিরক্তমাখা কণ্ঠে ক্যাথরিন আরোণকে প্রশ্ন করে,
” সকাল সকাল এখানে কি কাজ তোমার? কেন এসেছ? ”

আরোণ সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকায় ক্যাথরিনের দিকে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ছে তার মুখের উপর। ফিনফিনে বাতাসে ক্যাথরিনের মাথায় পেঁচানো চাদর এবং তার বাদামী চুল দুটোই মৃদু দুলছে৷ সদ্য ঘুম থেকে উঠায় চোখ খানিকটা ফুলে আছে তার৷ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যাথরিনকে এক নজর দেখার জন্যই নিশব্দে এই কক্ষে আসে আরোণ। অন্যান্য দিন এই সময় ক্যাথরিন ঘুমিয়ে থাকে। আরোণ এক ঝলক দেখে ক্যাথরিন জেগে উঠার পূর্বেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। আজ এতো সকাল সকাল ক্যাথরিনকে জেগে থাকতে দেখে অবাক হয়েছে বটে সে।
ক্যাথরিনের মুখে দুটো আঁচড়ের দাগ এখনো রয়ে গিয়েছে। এ দুটো আঁচড় বেশি গভীর হওয়ায় এর দাগ যেতেও সময় নিচ্ছে খুব৷ আরোণ এক হাত বাড়িয়ে ক্যাথরিনের গালে হাত রাখে। ক্যাথরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় আরোণের দিকে। আরোণ সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাথরিনের গালের আঁচড়ের উপর বৃদ্ধাঙ্গুল বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করে,

” এখনো ব্যথা আছে? ”
ক্যাথরিন শক্ত গলায় জবাব দেয়,
” ব্যথা ক্ষণস্থায়ী, তবে কলঙ্ক চিরস্থায়ী।
আঁচড়ের দাগ চলে যাবে, কলঙ্কের ছাপ রয়ে যাবে। ”
” তুমি আকাশের চাঁদ নও যে তোমার গায়ে কলঙ্ক থাকবে। তুমি সূর্যের প্রতিমার ন্যায়। সূর্য যেমন নিজের আলোয় কলঙ্কিত চাঁদকে আলোকিত করে তুলে তেমনই তুমি নিজের পবিত্রতায় পাপে কুলষিত হৃদয়কে পুনরুদ্ভূত করে তুলো। ”

ক্যাথরিন এক মুহূর্তের জন্য মুগ্ধ হয়ে আরোণের কথা শুনে। কিন্তু পরক্ষণেই তার ধ্যান ফিরে আসে। আরোণের বুকে দু হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
” সকাল সকাল মিষ্টি কথা বলে আমার মন ভুলানোর জন্য এসেছো? দূর হও আমার সামনে থেকে। ”
আরোণ হেসে কৌতুক করে বলে,
” আলফাকে ধাক্কা দিয়েছ তুমি নির্বোধ মেয়ে। এর শাস্তি কি জানো? গর্দান নিয়ে নিতে পারি আমি তোমার এই অপরাধের দন্ড হিসেবে। ”
ক্যাথরিন দু হাত আড়াআড়ি ভাজ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

” আর তুমি আমার মা বাবাকে মেরেছ এবং আমাকে বন্দী করে রেখেছ। এর শাস্তি কি জানো?
জীবন নিয়ে নিতে পারি আমি তোমার এই অপরাধের জন্য। ”
আরোণের চেহারা মুহূর্তেই মলিন হয়ে আসে। ক্যাথরিনের মা বাবাকে সে মারেনি এটা সত্য। কিন্তু ঘুরেফিরে তাদের মৃত্যুর জন্য কোনো না কোনো ভাবে আরোণই দায়ী। ক্যাথরিন যে বন্দী জীবন পার করছে তার জন্যও আরোণই দায়ী। এতো এতো দায়ের বোঝা বয়ে বেড়াতে দমবন্ধ হয়ে আসে তার৷
আরোণ আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে প্রস্থান করে। ক্যাথরিন মনে মনে নিজেকে শাসিয়ে বলে,
” এই জানোয়ারের কথায় মুগ্ধ হওয়া যাবে না। এসব কিছু শুধুমাত্র একটা ফাদ ছাড়া আর কিছু নয়৷ কোনমতেই এই ফাদে পা ফেলা যাবে না। ”

মার্থা আসে আরো ঘন্টাখানেক পরে। হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে দেখে ক্যাথরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে বিনুনি করছে। মার্থা কক্ষে প্রবেশ করতেই বলে,
” আজ হঠাৎ বিনুনি করছো যে? ”
” মা কে মনে পড়ছে হঠাৎ। মা প্রায়ই আমার ও আনাস্তাসিয়ার চুলে বিনুনি করে দিতেন। ”
” ওহ আচ্ছা। ”
মার্থা বিছানার উপর খাবারের ট্রে রেখে বলে,

” খেয়ে নাও তুমি। আমি এসে পড়ে ট্রে নিয়ে যাবো। ”
এই বলেই মার্থা চলে যেতে নেয়। ক্যাথরিন দৌড়ে এসে মার্থার হাত ধরে বলে,
” তুমি আমার সাথে বসো না আজ। আমার খাওয়া শেষ হলে যেয়ো। ”
মার্থা আর দ্বিমত জানায় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ক্যাথরিন বিছানায় বসে স্যুপের বাটি হাতে নিয়ে মার্থাকে ইশারা করে বসার জন্য। মার্থা চুপচাপ সামনে বসে পড়ে। ক্যাথরিন খেতে খেতে প্রশ্ন করে,
” কালকে রাতে তুমি যার কথা বলছিলে তাকে কে মেরেছে? ”
মার্থা অবাক হয় খানিকটা। উত্তর দেয়,
” সেটা তোমার জানার বিষয় না। ”
” তুমি আমাকে না বললে আমি তোমার আলফাকে প্রশ্ন করবো। আমার ধারণা আছে যে এর পিছনে যে আছে সে একজন পিশাচ। ”
মার্থা এবার আরেকটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

” তুমি কিভাবে জানো এই বিষয়ে? ”
” সেটা তোমার জানার বিষয় না। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও শুধু। ”
” সোফিয়া অন্য সত্ত্বার কাউকে ভালোবেসেছে। ভ্যাম্পায়ার বলা হয় তাদের। নেকড়েদের জাত শত্রু তারা। মানুষ বা পশুর রক্ত তাদের প্রধান ও একমাত্র খাবার। মানবরূপী রক্তচোষা পিশাচ যাকে বলা হয়। বহুকাল ধরে নেকড়ে ও ভ্যাম্পায়ারদের মধ্যে দন্দ চলে আসছে। তাদের একজন সোফিয়াকে ভালোবাসার ফাদে ফেলে নিজের আস্তানায় নিয়ে মেরে ফেলে দিয়েছে। ”

” ঈশ্বর! কি বলছো? আরো একজাত অমানুষের অস্তিত্ব ও আছে? ”
” হ্যাঁ। ”
” তারা কোথায় থাকে? ”
” ট্রান্সিলভেনিয়া। ”
” এটা তো সেই শহর না যেটাকে শতবছর আগে রোমানিয়া পরিত্যাগ করেছে? ”
” হ্যাঁ। ”
ক্যাথরিন আর কোনো কথা বলে না। গভীর ভাবনায় মগ্ন হয় সে। আর কতো অবাক হওয়া বাকি তার? তার মনে হচ্ছে সে কোনো ভয়ংকর রূপকথার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে কেবলমাত্র সে একা মানুষ। আশেপাশে সব হিংস্র পিশাচ ও জানোয়ারদের আনাগোনা। ক্যাথরিন হাত থেকে স্যুপের বাটি রেখে পানি খেয়ে নেয়। মার্থাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

” আমার দমবন্ধ লাগছে মার্থা। আমি বাহিরে যেতে চাই। ”
” আলফা কখনো অনুমতি দিবে না। ”
” তোমার আলফা দিবে এমনকি নিজে আমাকে নিয়ে যাবে। তুমি আমার সাথে চলো। ”
এই বলে ক্যাথরিন উঠে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয়। লাল রঙের ম্যাডিভাল স্কার্ট, সাদা রঙের ব্লাউজ এবং তার উপর কালো কোমরবন্ধ গির্ডেলস পড়ে আছে সে। ক্যাবিনেট থেকে একটি ক্লক হাতে নিয়ে মার্থার হাত ধরে দরজা খুলে বেরোতে নেয়। তখনই দরজার সামনে দাঁড়ানো দুজন রক্ষী তাদের বাঁধা দেয়। ক্যাথরিন চোখ রাঙিয়ে বলে,

” পালিয়ে যাচ্ছি না আমি। তোমাদের আলফার কাছেই যাচ্ছি। বিশ্বাস না হলে আমার সাথে চলো। ”
প্রহরী দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ক্যাথরিনের পিছনে হাঁটা ধরে। ক্যাথরিন আরোণের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাহিরে থাকা প্রহরীদের বলে,
” তোমাদের আলফাকে বলো আমি এসেছি। ”
প্রহরীরা কিছু বলার আগেই ভিতর থেকে আরোণের কণ্ঠ ভেসে আসে,
” এসো। ”
প্রহরীরা দরজা খুলে দিতেই ক্যাথরিন ভিতরে প্রবেশ করে। আরোণ পরিহিত কালো টিউনিক শার্টের উপরের দুটি বোতাম লাগাতে লাগাতে ক্যাথরিনকে বলে,

” আজ হঠাৎ আমার কক্ষে? ঘন্টাখানেক আগেই তো দেখা করে আসলাম। খুব মনে পড়ছিলো আমায়? ”
ক্যাথরিন চাপা রাগ দেখিয়ে বলে,
” বাজে বকো না। আমার এই প্রাসাদের ভিতর দমবন্ধ লাগছে। বাহিরে যেতে চাই আমি। ”
আরোণ কপট জবাব দেয়,
” ঠিক আছে। ”
ক্যাথরিনের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠে। সে জানতো আরোণ তাকে মানা করবে না। বরং সাথে সাথেই অনুমতি দিয়ে দিবে। আরোণের এই ভালোবাসার ফলে ভালোই সুযোগ হয়েছে ক্যাথরিনের।
অপরদিকে আরোণ ক্যাথরিনের মুখে হাসি দেখে মনে মনে বলে,

মহাপ্রয়াণ পর্ব ১১+১২

” তোমার এই হাসি দেখার জন্য হলেও আমি সব বাজি রাখতে রাজি। ”
ক্যাথরিন হেসে বলে,
” কখন যাবো আমরা? ”
” তুমি চাইলে কক্ষে অথবা বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে পারো আমি তৈরী হয়ে নিচ্ছি। ”
ক্যাথরিন চুপচাপ হেঁটে বারান্দায় এসে আসনে বসে। আজ এতদিন পর বের হতে পারবে ভেবেই খুশি লাগছে তার। কিছু সময়ের জন্য হলেও তো এই প্রাসাদ নামক বদ্ধ নরক থেকে মুক্তি পাবে সে।

মহাপ্রয়াণ পর্ব ১৫+১৬