Home মহাপ্রয়াণ মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪৯+৫০

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪৯+৫০

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪৯+৫০
নাফিসা তাবাসসুম খান

ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে ড্যানিয়েল। মুখে তার ক্রুর হাসি৷ পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে সে। যেন এইমাত্র তীর সে আনাস্তাসিয়ার পিঠে নয় রিকার্ডো বুকে ছুড়েছে। আনাস্তাসিয়াকে বুকে আকড়ে ধরে রিকার্ডো সামনের দিকে তাকায়। ড্যানিয়েলকে দেখতে পেয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে৷ সাথে সাথে ড্যানিয়েলকে খুন করার ইচ্ছা পুষে সে মনে। রিকার্ডো কিছু বলবে তার আগেই ম্যাথিউ বাতাসের বেগে গিয়ে ড্যানিয়েলের গলা চেপে ধরে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠে,

” তোকে আমি খুন করে ফেলবো। ”
রিকার্ডো সাথে সাথে হুংকার দিয়ে উঠে,
” ম্যাথিউ। তুই এই জানোয়ারকে কিছু করবি না। ও কেবল আমার শিকার। ওকে খুন করার একমাত্র অধিকার আমার। ”
ম্যাথিউ হুংকার দিয়ে উঠে,
” ভাই! ”
” আমি যা বলছি তা শুন। ”
এতটুকু বলেই রিকার্ডো আরোণের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
” এই জানোয়ারকে তোমার প্রাসাদের কারাগারে বন্দী করার ব্যবস্থা করো। আমি আসার আগ পর্যন্ত একে খুন করা ছাড়া যা ইচ্ছে এর সাথে করতে পারো৷ ”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আরোণ সাথে সাথে নিজের নেকড়ে পালকে হুকুম দেয় ড্যানিয়েলকে বন্দী করার জন্য। সকলে ড্যানিয়েলকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর আরোণ বিচলিত কণ্ঠে বলে উঠে,
” অ্যানাকে প্রাসাদে নিয়ে চলো তাড়াতাড়ি। ”
রিকার্ডো চেহারা শক্ত করে। আনাস্তাসিয়ার পিঠে বিধে থাকা তীর একহাতে টেনে বের করে। সাথে সাথে আনাস্তাসিয়া দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উউউ জাতীয় শব্দ করে চোখ মেলে। যেন তীর পিঠ থেকে বের করার সাথে সাথেই তার আটকে থাকা দম ফিরে এসেছে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে পাজাকোলে তুলে নেয়। মুহুর্তের মধ্যে তীব্র বেগে প্রাসাদের দিকে রওনা হয় সে। আরোণ এবং ম্যাথিউও তার সাথে যায়।

আনাস্তাসিয়াকে তার কক্ষে নিয়ে আসে রিকার্ডো। রিকার্ডোর সাথে ম্যাথিউ, আরোণ এবং ক্রিনাও এসে কক্ষে উপস্থিত হয়। রিকার্ডো নিজে বসে আনাস্তাসিয়াকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে আঁকড়ে রাখে। আধখোলা চোখে আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর দিকে তাকায়। কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার আগেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার কপালে সন্তপর্ণে অধর ছোঁয়ায়। পরপরই ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” কিছু হবে না নাসিয়া। একটু ধৈর্য ধরো। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডোর চেহারা হিংস্র রূপ ধারণ করে। নিজের পিশাচ স্বত্তায় ফিরে যায় সে। সূচালো দাঁত দুটি বেরিয়ে আসে। সেই দাঁত দিয়ে নিজেই নিজের ডান হাতের কব্জির সামান্য নিচে কামড় বসায়। সাথে সাথে চামড়া ভেদ করে রক্ত বেরিয়ে আসে। রিকার্ডো নিজের ডান হাত আনাস্তাসিয়ার মুখের কাছে নিয়ে বলে উঠে,
” পান করো। ”

কক্ষে উপস্থিত সকলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরোণ আর ক্রিনা বিশ্বাস করতে পারছে না যে ভ্যাম্পায়ারদের কাউন্ট কাউকে ভালোবাসে তার জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের রক্ত তাকে পান করাচ্ছে। ম্যাথিউ বিস্মিত দৃষ্টিতে রিকার্ডোর কার্যকলাপ এবং তার বুকে করুণ মুখশ্রীর আনাস্তাসিয়াকে দেখে নেয়। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে,
” ভাই আর আনাস্তাসিয়া একে অপরকে ভালোবাসে? ”
আনাস্তাসিয়া করুণ স্বরে কিছু বলতে চায়। রিকার্ডো বাধা দিয়ে বলে,
” কথা বলার চেষ্টা করো না কষ্ট হবে। আমার উপর ভরসা রেখে পান করো। কিছু হবে না। ”

আনাস্তাসিয়া এবার রিকার্ডোর বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ঠোঁট ছোঁয়ায়। শুষে নেয় রিকার্ডোর হাত থেকে বের হওয়া রক্ত। এতটুকু দৃশ্য দেখেই ম্যাথিউ কক্ষ হতে বেরিয়ে আসে। আশেপাশে তাকিয়ে একটা খালি কক্ষে প্রবেশ করে সে। ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে সে মেঝেতে দু হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে। চোখ ছাপিয়ে নামে অঝর জল ধারা। তার কষ্ট হচ্ছে। অদ্ভুত কষ্ট। এই কষ্টের সাথে সে পূর্ব পরিচিত নয়।
এটা কেমন নিয়তি? সে যাকে ভালোবাসলো সেই মেয়েই কিনা তার ভাইকে ভালোবাসে। তার ভাইও আনাস্তাসিয়াকে ভালোবাসে। এই সম্পূর্ণ গল্পে ম্যাথিউর চরিত্র কেবল একজন তৃতীয় ব্যক্তির ন্যায়? পুরুষ মানুষ কখনোই কাদে না এটা জেনেই বড় হয়েছে ম্যাথিউ। কিন্তু এই উক্তিটা ভুল তা সে আজ উপলব্ধি করলো। পুরুষ মানুষও কাদে। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর বেদনা তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। ম্যাথিউ অন্তরের রক্তক্ষরণের উপর পাথর রেখে এবং চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায়। মুহুর্তেই তার চেহারার ভাবমূর্তি পরিবর্তন হয়। সে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে কারাগারের উদ্দেশ্যে।

আনাস্তাসিয়া বেশ খানিকটা রক্ত শুষে নিলে রিকার্ডো তার কপালে একটা চুমু দিয়ে উঠে দাঁড়ায়৷ ক্রিনাকে বলে,
” ওর পিঠের ক্ষত পরিষ্কার করে রক্ত পড়া বন্ধ করার ব্যবস্থা করো আর কাপড়ও বদলে দাও। ”
আরোণ মাথা নেড়ে বলে উঠে,
” ক্রিনা তুমি থাকো আমি সাহায্যের জন্য হান্নাহকে পাঠাচ্ছি। ”
এতটুকু বলে রিকার্ডো আর আরোণ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আরোণ হান্নাহকে ডাকতে ক্যাথরিনের কক্ষে চলে যায়। আর রিকার্ডো যায় কারাগারের উদ্দেশ্যে।

কারাগারে প্রবেশ করতেই রিকার্ডো দেখতে পায় ড্যানিয়েলকে বেশ শক্ত শিকল দিয়ে হাত পা বেধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। নাক মুখ বেয়ে রক্ত বের হচ্ছে তার। নিস্তেজ দেহ টলমল করছে খানিকটা। তবুও মুখে ক্রুর হাসি লেপ্টে আছে। তার সামনে ম্যাথিউ দাঁড়ানো। হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ড্যানিয়েলের দিকে। দেখে বুঝাই যাচ্ছে এতক্ষণ ড্যানিয়েলকে বেধড়ক পিটিয়ে এই হাল তার। ম্যাথিউ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নেকড়ে পালদের একজনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করে। সাথে সাথে সেই নেকড়েটি পবিত্র পানি ছুড়ে মারে ড্যানিয়েলের উপর৷ ড্যানিয়েল জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে। পবিত্র পানির সংস্পর্শে আসতেই যেন তার শরীরের প্রতিটি রগে কাটা বিধে উঠছে। অসহ্যকর যন্ত্রণায় কাতর সে। শরীর দপদপ করে কাপছে।
রিকার্ডো এগিয়ে আসে। দাঁড়ায় ড্যানিয়েলের সামনে। সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” আমাদের একা ছেড়ে দাও। ”

সাথে সাথে সকলেই বেরিয়ে যায় ম্যাথিউ ছাড়া। ম্যাথিউ এখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ড্যানিয়েলের দিকে। রিকার্ডো ড্যানিয়েলের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত করে তার চুলের মুঠি ধরে মুখ উঁচু করে। সাথে সাথে আরেক হাত দিয়ে একটি কাপড়ের টুকরোর ভেতর থেকে কিছু রসুনের কোয়া ড্যানিয়েলের মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে তার মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখে৷ ড্যানিয়েলের চোখ উপচে পানি বেরিয়ে আসে। সে অনবরত মাথা নাড়তে থাকে যন্ত্রণায়। মুখ থেকে এই বিষ ছুড়ে ফেলে দিতে চায়। কিন্তু রিকার্ডো এতো শক্ত করে মুখ চেপে ধরে আছে যে সেই সুযোগ পাচ্ছে না সে। রিকার্ডোর চোখের দৃষ্টি একদম শীতল। তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। খুব স্বাভাবিক এবং ঠান্ডা স্বরে সে প্রশ্ন করে,

” কষ্ট হচ্ছে? ”
ড্যানিয়েল হ্যাঁবোধক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়। রিকার্ডো একইভাবে বলে উঠে,
” আমারও কষ্ট হচ্ছে। আমার নাসিয়াকে যন্ত্রণায় কাতর দেখে আমার বুকও পুড়ছে। তীর নাসিয়ার পিঠে নয় আমার বুকে ছুড়েছিস তুই। ”
ম্যাথিউ তাকায় রিকার্ডোর দিকে। নাসিয়ার প্রতি রিকার্ডোর ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে সে৷ রিকার্ডো আবার বলে উঠে,
” এতো নির্বোধ তুই? এই চিনলি আমাকে? রিকার্ডো কতটা ভয়ংকর সেই সম্পর্কে হয়তো তোর ধারণা আছে কিন্তু নাসিয়ার ভালোবাসায় বিভোর রিকার্ডো কতটা ভয়ংকর তা তুই আজ হাড়ে হাড়ে টের পাবি। ”

এটা বলেই রিকার্ডো বাহির হতে একজন প্রহরীকে স্ব শব্দে ডেকে উঠে। প্রহরীটা হাতে একটা বাক্স নিয়ে প্রবেশ করে। বাক্সটা খুলতেই সেটাতে অসংখ্য পেড়েক, কিছু কাপড়ের টুকরো, একটা কাচের বোতল এবং একটি কাঠের সরু টুকরো দেখা যায়। ড্যানিয়েল মাথা নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করে কিন্তু তার আগেই রিকার্ডো ওই বাক্সটা থেকে কিছু কাপড়ের টুকরো নিয়ে ড্যানিয়েলের মুখে গুজে দেয় এবং আরেকটা লম্বা কাপড়ের টুকরো নিয়ে তার মুখটা ভালো করে বেধে দেয় যেন কোনোমতেই ড্যানিয়েল মুখ থেকে রসুনের কোয়া গুলো বের করার সুযোগ না পায়। তারপর পেরেক গুলো হাতে নিয়ে ড্যানিয়েলের সম্পূর্ণ শরীরে গেথে দিতে থাকে। একসাথে এতো যন্ত্রণা ড্যানিয়েল সহ্য করতে পারে না। কিন্তু চাইলেও কিছু করতে পারছে না সে। এতক্ষণ পবিত্র পানি ছিটানোর ফলে এবং মুখে থাকা রসুনের ফলে বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছে সে। সকল পেরেক গাথা হলে রিকার্ডো চোখের ইশারায় সেই প্রহরীকে কিছু একটা বলে। সাথে সাথে প্রহরীটা বাক্সে থাকা সেই বোতল থেকে পবিত্র পানি নিয়ে ড্যানিয়েলের শরীরে ছিটিয়ে দেওয়া শুরু করে। ড্যানিয়েল গোঙানো শুরু করে যন্ত্রণায়।
রিকার্ডো উপহাসের সুরে বলতে থাকে,

” নির্বোধ ড্রাগোসকে দিয়ে তুই আমাকে মারাতে চেয়েছিলি? তাও ক্রুশ ব্যবহার করে? অথচ তুই এটাই জানিস না যে ক্রুশের প্রভাব আমার উপর ফেলার জন্য আগে ক্রুশ ধারণকারীর ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস মজবুত হতে হবে। নাহয় সেই ক্রুশের কোনো প্রভাব আমার উপর পড়বে না। এজন্যই আমি তোদের থেকে আলাদা। আমাকে হারানোর জন্য আগে তোদের ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস মজবুত করতে হবে। ”
এতটুকু বলে রিকার্ডো থামে। বাক্স থেকে সরু মাথার কাঠের টুকরোটা তুলে হাতে নেয়। প্রহরীকে ইশারায় থামতে বলে। তারপর ড্যানিয়েলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলে উঠে,
” তোর মৃত্যু আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলো ড্যানিয়েল। কিন্তু আমার নাসিয়াকে আঘাত করার ফলস্বরূপ তোর মৃত্যু হবে এখন মহা যন্ত্রণাদায়ক। ”

এটুকু বলেই রিকার্ডো হাতের সেই কাঠের সরু টুকরোটা ড্যানিয়েলের বুকের বা পাশে ঢুকিয়ে দেয়। গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে বুক হতে। রিকার্ডো থামে না। সেই কাঠের টুকরোটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভেতরের হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ড্যানিয়েল দম ছেড়ে দিতেই রিকার্ডো ড্যানিয়েলের মাথা ঘাড় থেকে একটানে ছিড়ে দূরে নিয়ে ফেলে। পরপরই সে কারাগার থেকে বেরিয়ে পড়ে।
ম্যাথিউ ড্যানিয়েলের বিখন্ড দেহের দিকে তাকিয়ে রয়। তার মনে না আছে কোনো আফসোস আর না কাজ করছে কোনো খারাপ লাগা। বরং রিকার্ডো যদি ড্যানিয়েলকে না মারতো ম্যাথিউ নিজেই তাকে খুন করতো।

আনাস্তাসিয়ার পড়নের গাউন বদলে দিয়ে একটা ঢিলে ঢালা সাদা ব্লাউজ এবং স্কার্ট পড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে ক্রিনা। তার পিঠের ক্ষতের জায়গাটুকু পরিষ্কার করে সেখানে ভেষজ ঔষধ লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে হান্নাহ। আপাতত সে অজ্ঞান অবস্থায় বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। বিছানার পাশেই মেঝেতে শান্ত হয়ে বসে আছে রিকার্ডো। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনাস্তাসিয়ার দিকে। আলতো হাতে আনাস্তাসিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মৃত্যু যন্ত্রণার অনুভূতির সাথে কখনোই পরিচিত ছিলো না রিকার্ডো। কিন্তু এখন সে এই যন্ত্রণা হারে হারে টের পাচ্ছে। নিজের সাধ্যের মধ্যে সবকিছু করেছে। তবুও তার মনে শান্তি পাচ্ছেনা সে। যতক্ষণ না আনাস্তাসিয়া চোখ মেলে তাকাবে ততক্ষণ তার বুকের এই উত্তাল ঢেউর আছড়ে পড়া থামবে না।

ঠিক এই দিনটার ভয়েই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে নিজের থেকে দূরে রাখতো। আনাস্তাসিয়ার ঘৃণা হয়তো তাকে এতটা যন্ত্রণা দিতো না যতটা আনাস্তাসিয়াকে হারানোর ভয় তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। রিকার্ডোর কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে। হৃদয়ের সুপ্ত ভয় অশ্রু রূপে তার দু চোখ ফেটে বের হতে চাইছে। রিকার্ডো কাপা কাপা স্বরে বলে উঠে,
” কেন আমায় ভালোবাসলে নাসিয়া? আমার শত উপেক্ষার পরেও কেন আমার কাছে আসলে? এখন তো আমি তোমাকে কখনোই মৃত্যুর অনুমতি দিবো না। আজীবনের জন্য চাই আমি তোমাকে। মরণের পরও কেবল তোমায় চাইবো। ”
রিকার্ডো থামে। একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। আনাস্তাসিয়ার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে সেই হাতের পিঠে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর চাতক পাখির ন্যায় আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে সম্মোহনী স্বরে বলে উঠে,
” নিঃস্ব আমি তোমায় ছাড়া,
গতিহীন আমার জীবন।
তোমায় পাবার ব্যাকুল তৃষ্ণা,
বুকভাঙা আকুলতা। ”

আধো আধো চোখ মেলে মৃদু আর্তনাদ করে উঠে আনাস্তাসিয়া। উঠে বসতে পারছে না সে। উঠে বসার জন্য উবুড় হওয়া থেকে সোজা হয়ে শুতে নিলেই পিঠে যন্ত্রণা অনুভব করে সে। এবার মোটামুটি জোরেই আর্তনাদ করে বসে সে। বিছানার পাশে মেঝেতে বসে থাকা রিকার্ডো মুহূর্তেই উঠে আসে। আনাস্তাসিয়ার পাশে বসে তাকে ধীরে ধীরে বসতে সাহায্য করে। আনাস্তাসিয়ার মাথা এখনো ঝিমঝিম করছে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার গালে হাত রেখে প্রশ্ন করে,

” নাসিয়া? এখনো ব্যথা করছে? ”
আনাস্তাসিয়া ফোলা চোখ নিয়ে রিকার্ডোর দিকে তাকায়। সাথে সাথে সে রিকার্ডোর প্রশ্ন উপেক্ষা করে তার বুকে গুটিসুটি মেরে আশ্রয় নেয়। যেন বিড়াল ছানা কোনো। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পিঠে হাত রাখে না আগলে ধরার জন্য। পাছে ব্যথা করে যদি। সে আলতো করে আনাস্তাসিয়ার মাথায় হাত রাখে। থমথমে গলায় বলে,
” আমায় পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছো আবার। গত এক রাত আমার কাছে এক সহস্র রাতের সমান ছিলো। মুহূর্তে মুহুর্তে মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করেছি। নতুন সকালের মতো আমার এই দীর্ঘ ঘন অন্ধকার রাতের ইতি কেটেছে তোমার জ্ঞান ফেরার মাধ্যমে। ”

আনাস্তাসিয়া অস্পষ্ট স্বরে বলে,
” ড্যানিয়েল যখন আমায় নিয়ে যাচ্ছিলো আমি ভেবেছিলাম আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলবো। আর কখনো তোমার কাছে ফিরতে পারবো না। ”
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার কপালে গাঢ় করে একটা চুমু খায়। তারপর হালকা হেসে বলে উঠে,
” তুমি ফিরেছো নাসিয়া। সবকিছুর সাথে লড়াই করে আমার বুকে ফিরেছো। ভ্যাম্পায়ার, নেকড়ে এবং মৃত্যু সবকিছুকে হারিয়েছো তুমি। ”
আনাস্তাসিয়া কোনো কথা বলে না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রয় রিকার্ডোকে। আপাতত এটাই তার জন্য সবথেকে নিরাপদ আশ্রয় অনুভব করে।

ক্যাথরিন ঘুম থেকে উঠতেই আনাস্তাসিয়ার খোঁজ করা শুরু করে। আরোণ তাকে জানায় আনাস্তাসিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এখন। আনাস্তাসিয়ার জ্ঞান ফিরতেই তার সাথে দেখা করতে নিয়ে যাবে। এতে ক্যাথরিন কিছুটা শান্ত হলেও গতরাতের ঘটনা শুনতেই ক্যাথরিন আঁতকে উঠে। আরোণ হেসে তাকে বলে,
” অ্যানা নিজের জন্য একদম সঠিক মানুষকে পছন্দ করেছে ক্যাথ। ভ্যাম্পায়ারদের কাউন্ট রিকার্ডো নিজের রক্ত পান করিয়ে অ্যানার জীবন বাঁচিয়েছে। ”
ক্যাথরিন ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” নিজের রক্ত পান করিয়ে মানে? ”
” রিকার্ডোর অন্যতম শক্তি হলো সে চাইলে কোনো আহত মানুষকে নিজের রক্ত পান করিয়ে তার জীবন বাঁচাতে পারে। বাকি ভ্যাম্পায়ারদের কাছে এই শক্তি নেই। ”

দরজায় করাঘাতের শব্দ পেয়ে আরোণ কথা থামায়৷ অনুমতি দেয় ভিতরে প্রবেশ করার। একজন প্রহরী এসে জানিয়ে যায় আনাস্তাসিয়ার জ্ঞান ফিরেছে। ক্যাথরিন দেখা করতে যেতে চায়। আরোণ রাজি হয়৷ দুজন একসাথে আনাস্তাসিয়ার কক্ষে যায়৷ কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় রিকার্ডো এবং ম্যাথিউ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত।
বোনকে দেখেই ক্যাথরিন এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। আবেগে কেদে বসে। আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” কান্নাকাটি করবি না একদম। আমার পুঁচকে পরে বলবে কি এক ছিঁচেকাদুনি মা আমার। ”
আরোণ সামান্য হাসে। এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার মাথায় হাত রেখে প্রশ্ন করে সে কেমন আছে। আনাস্তাসিয়া প্রতুত্তর করতেই ম্যাথিউ বলে উঠে,

” এখন আমাকে সবাই বুঝাও এখানে কি চলছে? আনাস্তাসিয়া তুমি বাসকোভ প্রাসাদে কি করছিলে আর ওদের সাথে তোমার কি সম্পর্ক? ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
” ক্যাথরিন আমার বড় বোন এবং আলফা আরোণের স্ত্রী। ”
ম্যাথিউ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
” কিভাবে সম্ভব? ”
আনাস্তাসিয়া সব খুলে বলে ম্যাথিউকে। সব শুনে ম্যাথিউ গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়। তারপর বলে উঠে,
” এতো মানুষ থাকতে তোমার আমাদের শত্রুর প্রেমেই পড়তে হলো ক্যাথরিন? ”
ক্যাথরিন হেসে জবাব দেয়,

” প্রেম কি বলে কয়ে হয়? কি বলো রিকার্ডো? ”
শেষের প্রশ্নটা রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে ক্যাথরিন। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় জবাব দেয়,
” প্রেম বলে কয়ে হয় না। কেবল হয়ে যায় আমাদের অজান্তেই। ”
ম্যাথিউ গলা খাকড়ি দিয়ে উঠে। মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে উঠে,
” প্রেমিক যুগলেরা নিজেদের প্রেম আপনারা একান্তে চালিয়ে যেয়েন। আপাতত এখানে আমি উপস্থিত আছি। ”
সবাই হেসে উঠে। রিকার্ডো থমথমে গলায় বলে উঠে,
” যেহেতু সবাই উপস্থিত আছে এই মুহুর্তে আমি একটা ব্যাপারে কথা বলতে চাই। ”

সকলেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় রিকার্ডোর দিকে। রিকার্ডো সত্যিটা জানায় নিজের পরিচয় সম্পর্কে। আনাস্তাসিয়া এবং ম্যাথিউ আগে থেকেই জানতো তাই তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কিন্তু আরোণ এবং ক্যাথরিন বেশ অবাক হয়। এতোটাই অবাক হয় যে কথা বলতে ভুলে যায়। রিকার্ডো নিজেই বলে উঠে,
” আমি ড্রাগোসকে খুন করে এসেছি এবং প্রধান সেনাপতি স্টেফেনকে বলে এসেছি যেন ঘোষণা করে প্রিন্স রিকার্ডো ফিরে এসেছে। ”
আনাস্তাসিয়া মুখে হাত রেখে প্রশ্ন করে,

” তুমি সিংহাসনে বসবে রিক? প্রজারা কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে এই বিষয়ে? ”
ম্যাথিউ জবাব দেয়,
” সেই সিংহাসনের উপর কেবল ভাইয়ের অধিকার আছে। আলবাদ ভাই সিংহাসনে বসবে। আর প্রজারা মানতে বাধ্য। ”
রিকার্ডো বলে উঠে,
” গতকাল আমার দূর্গের সকল কোভেনদের ড্যানিয়েল হত্যা করে। আপাতত কেবল আমি, মা এবং ম্যাথিউই একমাত্র জীবিত ভ্যাম্পায়ার। ”
আরোণ এগিয়ে আসে৷ রিকার্ডোর কাধে হাত রেখে বলে উঠে,
” আমার পক্ষ হতে এই শত্রুতার সম্পর্কের ইতি টানছি। আমাকে এবং আমার নেকড়ে পালকে তুমি নিজের পাশে পাবে যেকোনো সময়। ”

রিকার্ডো কল্পনা করে নি আরোণ এতো সহজে নিজ থেকে এই শত্রুতার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। রিকার্ডো বলে উঠে,
” ধন্যবাদ তোমাকে। আজ থেকে আমার পক্ষ হতেও এই শত্রুতা শেষ হলো। ”
এটুকু বলতেই আরোণ হাত মেলে দেয়৷ রিকার্ডো চমকায়। পরমুহূর্তেই এগিয়ে গিয়ে আরোণের সাথে গলা মিলায়৷ এই দৃশ্য দেখে ক্যাথরিন এবং আনাস্তাসিয়ার চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠে। অবশেষে এই জাত শত্রুতার ইতি ঘটলো। তাদের মনের সংশয় দূর হলো।
গলা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রিকার্ডো বলে উঠে,
” আমার বুখারেস্ট প্রাসাদে ফিরতে হবে। এখনো অনেক কাজ বাকি সেখানে। ”
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” আমিও যাবো তোমার সাথে। ”

রিকার্ডো এগিয়ে আসে আনাস্তাসিয়ার কাছে৷ তার দিকে ঝুকে কপালে আলতো চুমু খেয়ে বলে,
” তোমাকে রাণী করে একেবারে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবো আমি। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডো আরোণের দিকে ফিরে বলে,
” ততদিন আমার নাসিয়া তোমার কাছে এবং তোমার প্রাসাদে আমানত থাকলো৷ ”
আরোণ মাথা নেড়ে বলে,
” অবশ্যই। ”
ম্যাথিউ করুণ হাসি হেসে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে এটাই আনাস্তাসিয়ার প্রাপ্য। রিকার্ডোর থেকে ভালো জীবনসঙ্গী আনাস্তাসিয়ার জন্য হয় না।
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
” জোসেফ? ”
” আমি ওকে সব জানিয়ে দিবো। চিন্তা করো না শুধু শুধু। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডো ম্যাথিউকে বলে উঠে,
” আমাদের এখন যাওয়া উচিত৷ মা অপেক্ষা করছে। ”
সবার থেকে বিদায় নিয়ে ম্যাথিউ আর রিকার্ডো একসাথে বেরিয়ে পড়ে।

বুখারেস্ট প্রাসাদের সামনে প্রজাদের ভীড় জমেছে। সকলের চোখেই বিস্ময় এবং আতংক। প্রাসাদের একদম চূড়ায় ঝুলন্ত ড্রাগোসের মাথা দেখে সকলের শিরাদরা শীতল হয়ে গিয়েছে। এরকম দৃশ্য ইতিহাসে প্রথম দেখছে সবাই। অনেক প্রজাতো ক্ষোভেও ফেটে পড়েছে। প্রিন্স ড্রাগোসকে কে হত্যা করেছে তা জানতে চায় সকলে। রাজ বংশই বা এখন কিভাবে চলবে তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই। রোমানিয়ান সিংহাসন কি মুকুটহীন রাজার মতো পড়ে রইবে?
সকলের কৌতূহল মেটাতে প্রাসাদের সবথেকে উঁচু কক্ষের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় প্রধান সেনাপতি স্টেফেন। সাথে সাথে প্রজাদের শোরগোলের রোল আরো কয়েক গুন বেড়ে যায়। স্টেফেন নিজেও জানে না সে কিসের ভিত্তিতে কি ঘোষণা করবে কিন্তু এই মুহুর্তে সে যতটা নীরব থাকবে প্রজাদের প্রশ্নের পাহাড়ও ততটাই উঁচু হবে। হয়তো খালি সিংহাসন হাতিয়ে নেওয়ার জন্য লোলাপু ব্যক্তিরা প্রজাদের বিদ্রোহ করার জন্যও উস্কে দিতে পারে। এই সুযোগ দিতে চায়না স্টেফেন। প্রজারা একসাথে জোরে প্রশ্ন করে উঠে প্রিন্স ড্রাগোসের খুনী কে তারা জানতে চায়। স্টেফেন কিছু বলার প্রস্তুতি নেয় ঠিক তখনই ঝংকার তুলে কেউ একজন প্রজাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়,

” আমি। ”
স্টেফেন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রিকার্ডো। তার দু’পাশে ক্যামিলো এবং ম্যাথিউ দাঁড়িয়ে আছে। রিকার্ডোকে দেখতেই স্টেফেন আপনাআপনি সরে বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রিকার্ডো এগিয়ে এসে বারান্দার একদম মধ্যিখানে দাঁড়ায়। এক মুহূর্ত রিকার্ডোকে দেখে সকল প্রজাদের শোরগোল থেমে যায়। তাদের সামনে যেন যুবতীদের তাজা রক্তে গোছল করা অবিশ্বাস্যকর সৌন্দর্যের অধিকারী এক যুবক এসে দাঁড়িয়েছে। রিকার্ডো নিজেই বলে উঠে,
” প্রিন্স ড্রাগোস হেনরিকসকে আমি খুন করেছি। আর এর জন্য আমার কারো কাছে প্রশ্নবিদ্ধ নই। ”
ভীড় ঠেলে একজন প্রজা বলে উঠে,
” কে তুমি? রোমানিয়ান প্রিন্স খুন করে আবার প্রজাদের সামনে তা স্বীকার করছো? কেন প্রশ্নবিদ্ধ নও তুমি? ”
রিকার্ডো থামে। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঝংকার তুলে বলে উঠে,
” আমি রিকার্ডো। প্রিন্স রিকার্ডো আলবার্ট। কাউন্ট লিও এবং কাউন্টেস ম্যারির একমাত্র সন্তান। এই সাম্রাজ্যের আসল উত্তরাধিকারী। ”

উপস্থিত জনতার মাঝে আরেকদফা বিস্ময় পরিলক্ষিত হলো। সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। এতো বছর পর কাউন্ট লিও এবং কাউন্টেস ম্যারির নাম শুনে সকলেই হতবিহ্বল। সকলের মনের প্রশ্নের সমাধান হওয়ার বদলে যেন তা আরো কয়েক গুন বেড়ে গিয়েছে। রিকার্ডোর চেহারার দিকে তাকিয়ে সকলেই তার কথার সত্যতা যাচাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, বলিষ্ঠ দেহ, রাজকীয় এবং স্পষ্ট কথার ভঙ্গি, সহজ স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতন বুক ভরা এমন অদম সাহস তো কেবল একজন রাজ পরিবারের সদস্যেরই থাকতে পারে। অনেকে আবার লক্ষ্য করে রিকার্ডোর গভীর সবুজ নেত্রপল্লবকে। লোকমুখে সকলেই জানে কাউন্টেস ম্যারি ছিলো অত্যন্ত মায়াবী রূপের সবুজ নেত্রের অধিকারী। কিন্তু কাউন্ট লিও এবং কাউন্টেস ম্যারি মারা গিয়েছে এক শতক পূর্বে। তাহলে রিকার্ডো কিভাবে তাদের ছেলে হবে? সকলের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেখে রিকার্ডো নিজেই বলে উঠে,

” আমি জানি আপনাদের সকলের মনে কৌতূহল এবং প্রশ্নের শেষ নেই। আপনাদের সকল কৌতূহল এবং প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য আজ আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত। ট্রান্সিলভেনিয়ার এতো বছরের রহস্য আজ আমি উন্মোচন করবো। ”
রিকার্ডো নিজের জন্ম থেকে শুরু করে ভ্যাম্পায়ার হওয়ার গল্প এবং ভ্যাম্পায়ার হিসেবে তার জীবনের সকল ঘটনা প্রজাদের সামনে তুলে ধরে। সাক্ষী হিসেবে ক্যামিলোও সাক্ষ দেয় এই সত্যতার। প্রজারা ভীত দৃষ্টিতে দেখছে রিকার্ডোকে। এরকম কথা শুনে অনেকে তাকে গালমন্দ করাও শুরু করে দিয়েছে। ভীড়ের মধ্য হতে একটি কণ্ঠ চেচিয়ে বলে উঠলো,

” এই ছেলে মানসিক বিকারগ্রস্ত। এর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। এ একজন খুনী। এর দিকে পাথর ছুড়ে মারো। ”
সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও একই সুর বলে উঠে যে যা পায় হাতের কাছে তা রাজপ্রাসাদের দিকে ছুড়ে মারা শুরু করে। প্রহরী এবং সেনারা মিলে প্রজাদের সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এতো উঁচুতে রিকার্ডোর গায়ে একটি পাথরও না লাগলেও সেনা এবং প্রহরী বেশ কয়েকজন আহত হয় পাথরের আঘাতে। রিকার্ডো নীরব দৃষ্টিতে এই দৃশ্য দেখতে থাকে। তার বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তাকে নিজের সাম্রাজ্যের মানুষের কাছেই নিজের পরিচয়ের প্রমাণ দিতে হচ্ছে৷ অবশ্য এতে প্রজাদের কোনো দোষও নেই। কেই বা এমন নির্মম রূপকথার গল্পের ন্যায় বাস্তবতাকে এতো সহজে মেনে নিবে? তবে তাদের মানতে হবে। তারা মানতে বাধ্য৷
স্টেফেন এরকম পরিস্থিতি দেখে ভীত হয়ে পড়ে। তার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। এরকম চলতে থাকলে যেকোনো সময় প্রজারা প্রাসাদের ভেতর প্রবেশ করে বসবে। তখন তাদের আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্টেফেন কিছু বলার জন্য এগিয়ে আসতে নেয়। সাথে সাথেই রিকার্ডো একহাত তুলে স্টেফেনকে থামতে ইশারা করে। ইশারা পেতেই স্টেফেন থেমে যায়। এইমাত্র রিকার্ডোর বলা কথাগুলো তার কাছে সত্যি মনে হলেও এগুলো অবিশ্বাস্যকর গল্পও মনে হচ্ছে বটে। আদৌ সম্ভব এমনটা?

রিকার্ডো একহাত তুলে জোরে সবাইকে চুপ থাকার আদেশ দেয়। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ শোরগোল থেমে যায়। সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় তার উপর। রিকার্ডো এই মুহুর্তে একটা অকল্পনীয় কাজ করে বসে। গায়ের ক্লকটা খুলে দু’হাত মেলে দাঁড়ায় সে। চোখ খিচে বন্ধ করে কর্কশ স্বরে আকাশ পাতাল কাপিয়ে হুংকার করে উঠে। প্রজাসহ সকল সেনাদের অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেপে উঠে সেই হুংকারে। কিন্তু পরবর্তী দৃশ্য দেখে সেই কেপে উঠা আত্মায় কাটা দিয়ে উঠে। রিকার্ডো চোখ মেলে তাকাতেই সকলে দেখে একটু আগের চোখের তীক্ষ্ণতা এবং গাম্ভীর্যতা এখন হিংস্রতায় পরিণত হয়েছে। দু’পাশের চোয়ালে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে দুটি সূচালো ভয়ংকর দাঁত।
সকল প্রজাদের এরকম ভীত প্রতিক্রিয়া দেখে রিকার্ডো নিজের স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসে। প্রশ্ন ছুড়ে সকলের উদ্দেশ্যে,

” এখন বিশ্বাস হয়েছে? ”
প্রজাদের মধ্যে একজন ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে উঠে,
” সব বিশ্বাস করে নিলাম আমরা। কিন্তু একজন রক্ত চোষা পিশাচকে কেন আমরা নিজেদের কাউন্ট মেনে নিবো? ”
বাকিরাও একই সুরে কেন বলে উঠে। রিকার্ডো জবাব দেয়,
” এতবছর আলবার্টদের সিংহাসনে নারী এবং খুনের নেশায় মত্ত হেনরিকসদের কিভাবে মেনে নিয়েছেন সকলে? ”
রিকার্ডোর প্রশ্নের পিঠে কেউ আর জবাব দিতে পারে না। আসলেই তো! হেনরিকসরাও তো এতবছরের শাসনামলে কেবল শাসনের নামে শোষণই করে গিয়েছে। তাদের মেনে নিতে সমস্যা না হলে এখন যখন আসল আলবার্ট ফিরে এসেছে তখন তাকে মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু এখন যে আলবার্ট ফিরেছে সে কোনো মানুষ নয় বরং একজন ভ্যাম্পায়ার। এই জায়গায়ই তাদের মনে খটকা লাগছে। প্রজাদের এতো ভাবনা চিন্তার মধ্যে ভীড় ঠেলে একজন যুবক এগিয়ে এসে বলে উঠে,

” ইনিই হবেন রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের কাউন্ট। রাজ জোতিষ্যী ভারতানের ভাষ্যমতে এটাই তো হওয়ার ছিলো। প্রিন্স রিকার্ডো আলবার্টের ফিরে আসার ভবিষ্যৎ বাণী রাজ জোতিষ্যী ভারতান আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বেই করে গিয়েছেন। ”
সকলের দৃষ্টি আপাতত সেই যুবকের উপর নিবদ্ধ। রিকার্ডো ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে এই যুবক আর কেউ নয় বরং ওরিয়ন। প্রজারা অনেকেই ওরিয়নকে ঘিরে ধরে। প্রশ্ন করা শুরু করে যে সে কিভাবে জানে এতোকিছু। সকলের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ওরিয়ন বলে উঠে,

” রাজ জোতিষ্যী ভারতান আমার পূর্ব পুরুষ ছিলেন। উনার ভাষ্যমতে প্রিন্স রিকার্ডোর ফিরে আসা এবং তার সিংহাসনে বসা দ্বারাই এই সাম্রাজ্য আবার অভিশাপ মুক্ত হবে। আর আপনারা কার জন্য প্রতিবাদ করছেন? ড্রাগোস? যে কিনা নিজেই একজন মাতাল এবং অযোগ্য প্রিন্স ছিলো? ”
প্রজারা চুপ করে রয়। তাদের মনে এখনো দ্বিধা কাজ করছে। রিকার্ডো সকলকে আশ্বস্ত করে বলে উঠে,
” আমি রিকার্ডো আলবার্ট আজ কথা দিচ্ছি আমি কাউন্ট লিও আলবার্টের ন্যায় একজন যোগ্য কাউন্ট হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবো। আপনাদেরকে কখনোই কোনো অভিযোগের সুযোগ দিবো না। আর আমার জন্মের সাথে শুরু হওয়া এই অভিশাপকে রোমানিয়ান সাম্রাজ্য থেকে নিশ্চিহ্ন করেই দম নিবো। ”
প্রজাদের মধ্যে একজন হাত তুলে বলে উঠে,

” কাউন্ট রিকার্ডো দীর্ঘজীবি হোক। ”
তাকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে বাকিরাও একই কথা বলা শুরু করে। মুহুর্তেই প্রাসাদের সামনে কেবল রিকার্ডোর জয়ধ্বনি বাজতে থাকে। আকাশ, বাতাস, প্রতিধ্বনি সব জায়গায় মিশে আছে কেবল একটিই নাম। রিকার্ডো।
রিকার্ডোর চোখ অশ্রুসিক্ত। এই যাত্রা এতটা সহজ ছিলো না। তবে যাত্রা শেষে গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দে যাত্রাটাকে সহজ মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে। ম্যাথিউর এবং ক্যামিলোর চেহারায়ও হাসি বিদ্যমান। অবশেষে রিকার্ডোকে নিজের আসল পরিচয় ফিরে পেতে দেখার আনন্দে আনন্দিত তারা।

দিনকাল ঠিক করা হয়। আগামীকালই রিকার্ডোর রাজ্য অভিষেক হবে। কাউন্টের হীরা খচিত মুকুট মাথায় আরোহণের মধ্য দিয়ে কাধে তুলে নিবে রাজ্যের দায়িত্ব সে। প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে রিকার্ডো স্টেফেনের উদ্দেশ্যে আদেশ দেয় যেন সম্পূর্ণ প্রাসাদ কালকের আগেই পরিষ্কার করা হয়। একবিন্দু রক্তের ছাপ যেন কোথাও না থাকে। সকল আদেশ মেনে নিয়ে স্টেফেন বেরিয়ে পড়ে। সাথে সাথেই কক্ষে প্রবেশ করে ম্যাথিউ। রিকার্ডোকে উদ্দেশ্য করে বলে,

” সব সত্যিটা জানালে তাহলে বাসকোভ প্রাসাদ এবং নেকড়েদের সত্যিটা কেন জানালে না ভাই? ”
রিকার্ডো স্বাভাবিক স্বরে জবাব দেয়,
” বাসকোভ প্রাসাদ এবং আরোণের সত্যিটা কেউই কোনোদিন জানবে না ম্যাথিউ। আজ সকালে আমি কেবল সকল শত্রুতার বন্ধন ছিন্ন করি নি বরং একটি নতুন সম্পর্ক জুড়ে এসেছি। সেটা হলো পরিবার। আরোণ এবং ক্যাথরিন নাসিয়ার পরিবারের অংশ। তাই তারা এখন থেকে আমার পরিবারেও অংশ। আর এজন্যই আমি চাইনা তাদের সত্যিটা সকলের সামনে এনে তাদের নিরাপত্তা ক্ষুন্ন করতে। আমি আশা করছি তুইও আমার সাথে একমত থাকবি। ”
ম্যাথিউ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। রিকার্ডো মুখে একটা কালো কাপড় পেচিয়ে অর্ধেক চেহারা ঢেকে ফেলে নিজের। তারপর ক্লকের হুড টেনে মাথায় দেয়৷ ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,

” কোথাও যাচ্ছো তুমি? ”
” নাসিয়ার কাছে। কাল সকাল হওয়ার আগেই ফিরে আসবো। তুই যাবি? ”
ম্যাথিউ সামান্য থেমে মজার ছলে হেসে উত্তর দেয়,
” উহু। তুমি যাও। আমি এখানে থেকে কাল তোমার রাজ্য অভিষেকের প্রস্তুতি দেখবো। আমার ভাই কাউন্ট হচ্ছে আমার একটা তদারকির ব্যাপার আছে না? ”

রিকার্ডো চোখ তুলে তাকায় ম্যাথিউর দিকে। সে অনুভব করতে পারে ম্যাথিউর মনের অবস্থা। ম্যাথিউর মনের গোপন খবর আর কেউ না জানলেও সে জানে। কিন্তু তার যে করার কিছু নেই। আনাস্তাসিয়া যদি তাকে না ভালোবেসে ম্যাথিউকে ভালোবাসতো তাহলে হয়তো ভাইয়ের জন্য সে আনাস্তাসিয়াকে ত্যাগ করতো। কিন্তু আনাস্তাসিয়া তাকে গভীরভাবে ভালোবাসে। আর ম্যাথিউও। এজন্যই তো ভাইয়ের খাতিরে মুখ ফুটে একবারও নিজের অনুভূতি জাহির করছে না। রিকার্ডো এগিয়ে যায় ম্যাথিউর সামনে। ম্যাথিউকে অবাক করে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠে,
” ধন্যবাদ তোকে। যেই মুহুর্তে আমার তোকে সবথেকে প্রয়োজন সেই মুহুর্তে আমার পাশে থাকার জন্য। ”
ম্যাথিউ হেসে বলে,
” ভাইদের কাজই বিপদে একে অপরের পাশে থাকা। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে পর করে দিও না তো। ”
” আমার জীবনে গুটি কয়েক আপন মানুষের তালিকায় তুই সবসময় শীর্ষে থাকবি। ”

রিকার্ডো যখন বাসকোভ প্রাসাদে পৌঁছায় তখন গোধূলি লগ্ন প্রায়। রিকার্ডো সাবধানে ধীর গতিতে আনাস্তাসিয়ার কক্ষে প্রবেশ করে। উপরে আসার সময় সে খবর পায় আনাস্তাসিয়া তার কক্ষে ঘুমোচ্ছে। রিকার্ডো শুধু শুধু এই মুহুর্তে আনাস্তাসিয়ার ঘুম ভাঙাতে চায়না বলেই এতো নীরবতা বজায় কক্ষে প্রবেশ করে। আনাস্তাসিয়া বিছানায় গুটিসুটি মেরে এক পাশ ফিরে শুয়ে আছে। রিকার্ডো গায়ের ক্লক এবং মুখের কাপড়টা খুলে রেখে এগিয়ে গিয়ে আনাস্তাসিয়ার পাশে বসে সাবধানে। ঘুমন্ত আনাস্তাসিয়াকে কিছুক্ষণ দেখে তার কপালে আলতো করে ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। আনাস্তাসিয়া হয়তো রিকার্ডোর প্রতিক্ষায়ই ছিলো। তাইতো রিকার্ডোর ছোঁয়া পেতেই চোখ মেলে তাকায় সে। রিকার্ডো অবাক সুরে প্রশ্ন করে,

” তুমি ঘুমাও নি? ”
আনাস্তাসিয়া চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থেকে বলে,
” আমার মনে হচ্ছিলো তুমি আসবে। ”
” তাই বলে তুমি বিশ্রাম না নিয়ে জেগে থাকবে? ”
আনাস্তাসিয়া অধৈর্য স্বরে প্রশ্ন করে উঠে,
” প্রাসাদে কি হলো? ”
রিকার্ডোর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। সে একগাল হেসে জবাব দেয়,
” প্রজারা আমার কথায় বিশ্বাস করেছে নাসিয়া। কাল আমার রাজ্য অভিষেক। ”
আনাস্তাসিয়া খুশিতে শোয়া থেকে উঠে বসে। হঠাৎ উঠে বসতে গিয়ে পিঠে সামান্য ব্যথা অনুভব করলেও সেটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে রিকার্ডোকে জড়িয়ে ধরে উল্লাসে৷ খুশিতে আচ্ছন্ন হয়ে বলে উঠে,
” অভিনন্দন তোমাকে। আমার তোমার জন্য অনেক খুশি লাগছে। অবশেষে তুমি নিজের হারানো সব ফিরে পেতে চলেছো। ”

রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার খুশি দেখে আরো বেশি খুশি হয়। তাকে জড়িয়ে ধরে বসে রয়। আনাস্তাসিয়া হঠাৎ রিকার্ডোর বুক থেকে মুখ তুলে বলে উঠে,
” এইযে কাউন্ট শুনুন। কাল থেকে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব তো কাধে তুলে নিবেন। তার আগে বাধ্য প্রেমিকের মতো আমায় একটু কোলে তুলে নিন তো। ”
আনাস্তাসিয়ার কথার ভঙ্গিতে হেসে উঠে রিকার্ডো। দাঁড়িয়ে বাধ্য প্রেমিকের মতো আনাস্তাসিয়াকে কোলে তুলে নেয়। তারপর আনাস্তাসিয়ার মতো একই সুরে বলে উঠে,
” কোথায় যেতে চান রাজকন্যা? আদেশ দিন। ”
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর গলা দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কিছু একটা ভেবে বলে উঠে,
” আপাততর জন্য আমায় বারান্দায় নিয়ে চলুন। আপনার সাথে গোধূলি বিলাসের ইচ্ছে পোষণ করছি। কাল থেকে তো আপনার দেখা পাওয়াই দুষ্কর হয়ে যাবে। ”

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪৭+৪৮

রিকার্ডো চুপচাপ আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। কুয়াশার কারণে চারিদিক দেখতে বেশ আবছা লাগছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেই ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে থাকে। বারান্দায় এসে রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে কোলে নিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর আনাস্তাসিয়ার চোখে চোখ রেখে সম্মোহনী স্বরে বলে উঠে,
” আমার জীবনের সকল ভোরের শুরু তোমার সঙ্গে এবং সকল নিশুতিরাতের ইতি তোমার সঙ্গেই কেবল নাসিয়া। তুমি আমার সেই অসম্পূর্ণ অংশ যা আমাকে সম্পূর্ণ করে তুলে। আমার কালো অন্ধকার জীবনের রংধনু তুমি। ”

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৫১+৫২