মহাপ্রয়াণ পর্ব ৫৩+৫৪
নাফিসা তাবাসসুম খান
স্বপ্ন দেখে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় আনাস্তাসিয়ার। ধরফরিয়ে উঠে বসে সে। বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। মুহুর্তেই রিকার্ডোকে নিজের সামনে আবিষ্কার করে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করতে থাকে কি হয়েছে। আনাস্তাসিয়া কোনো জবাব দিতে পারে না। রিকার্ডোর কোমর জড়িয়ে ধরে মুখ গুজে রয়। সামান্য কাপছে তার শরীর। রিকার্ডো একবার বিছানায় শুয়ে থাকা ক্যামেলিয়াকে দেখে। তারপর আনাস্তাসিয়াকে আগলে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” হুশ। কিচ্ছু হয় নি। আমি আছি সাথে। ক্যামেলিয়া উঠে যাবে। শব্দ করো না। ”
আনাস্তাসিয়ার খেয়াল হয় ক্যামেলিয়ার কথা। সে রিকার্ডোকে ছেড়ে দিয়ে ক্যামেলিয়ার দিকে ফিরে তাকায়। তারপাশে একটা বালিশ রেখে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। সোজা বারান্দায় চলে যায়। রিকার্ডোও পিছু পিছু যায়। আনাস্তাসিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,
” স্বপ্ন দেখেছিলে? ”
আনাস্তাসিয়া আসলেই খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এই মুহুর্তে এটা নিয়ে কথা বলতে তার মোটেও ইচ্ছে করছে না। তাই এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,
” তুমি কখন এসেছো? ”
” বেশ অনেকক্ষণ হলো। ”
” আমায় জাগাও নি কেন? ”
” তুমি ঘুমিয়ে ছিলে। ”
” তো? ”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” ঘুমের মাঝে তোমায় ডাকার মানে আগুনে আরো ঘি ঢালা হতো। ”
আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুচকে রিকার্ডোর দিকে তাকায়। তারপর হনহনিয়ে কক্ষে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু হাতে হঠাৎ টান অনুভব করতেই সে থেমে যায়। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে রিকার্ডো তার একহাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইট পাথরের তৈরি রেলিঙে হেলান দিয়ে। আনাস্তাসিয়া সামান্য ঝাঝালো স্বরে বলে উঠে,
” সম্পূর্ণ রোমানিয়া খুঁজে কি কোনো সভ্য, সুশীল মেয়ে পাও নি? রাত বিরাতে জংলী বিড়ালের কাছে কেন এসেছো? ”
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে টেনে নিজের সামনে এনে দাঁড় করায়। দু’হাত আনাস্তাসিয়ার কোমরের পিছনে রেখে মাথা ঝুকিয়ে আনাস্তাসিয়ার নাকের সাথে নাক ঘষে বলে উঠে,
” কারণ আমি জংলী বিড়ালকে ভালোবাসি। ”
আনাস্তাসিয়া সাথে সাথে নিজের মাথা দ্বারা রিকার্ডোর নাকে আঘাত করে। রিকার্ডো নাকে হাত দিয়ে মৃদুস্বরে চিৎকার করে উঠে। আনাস্তাসিয়া দু কদম পিছিয়ে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,
” জংলী বিড়াল ডাকলে জংলী বিড়ালের মতোই আচরণ করবো৷ অসভ্য পিশাচ কোথাকার। ”
রিকার্ডো নাক ডলতে ডলতে বলে উঠে,
” আমার নাক ভেঙে দিবে তাই বলে? ”
আনাস্তাসিয়া আফসোসের সুরে বলে উঠে,
” ইশশ! রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের কাউন্ট বিখ্যাত রক্তচোষা পিশাচ রিকার্ডো আলবার্টের নাক এতটা নাজুক? ”
রিকার্ডো জোরে কিছু একটা বলতে নিলেই আনাস্তাসিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠে,
” একদম চুপ! ক্যামি ঘুমোচ্ছে ভেতরে। ও ঘুম থেকে যদি উঠে তাহলে তোমাকে কৃষ্ণ সাগরের হাঙ্গরের পেটে চালান করতে আমার এক মুহূর্ত লাগবে না। ”
রিকার্ডো হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আনাস্তাসিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই রিকার্ডো তাকে বাতাসের গতিতে বারান্দার দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। আনাস্তাসিয়া যেন কোনো কথা না বলতে পারে তাই একহাতে তার মুখ চেপে ধরে রাখে। আনাস্তাসিয়া অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। রিকার্ডো সেই দৃষ্টি পরখ করে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” একদম চুপ। আর একটাও কথা বলবে না। রাগ ভাঙানোর জন্য সব করতে রাজি আমি। কিন্তু বিয়ে করবে না বললে তা আমি মেনে নিবো না। একদম তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলবো। ”
আনাস্তাসিয়া এখনো রেগে তাকিয়ে আছে। রিকার্ডো এবার আনাস্তাসিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” কক্ষে যখন প্রবেশ করি তখন তুমি বেঘোরে ঘুমাচ্ছ। তোমার পাশে ক্যামেলিয়াকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য আমার হৃদয় থমকে যায়। মনে হচ্ছিলো ক্যামেলিয়া তোমারই মেয়ে। ”
এটুকু বলে রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার মুখের দিকে তাকাতেই দেখে তার চেহারা একদম শীতল হয়ে আছে। একটু আগে চেহারার রাগী ভাব আর দেখা যাচ্ছে না। আনাস্তাসিয়া ফিসফিসিয়ে বলে,
” আর কখনো আমাকে রাগালে কিন্তু ভালো হবে না। পরে আমার রাগের তাপ সইতে পারবে না। ”
রিকার্ডো ডানহাত বুকের বাম পাশে রেখে সামান্য সুর তুলে বলে,
” প্রণয় দহনে দগ্ধ প্রেমিককে সামান্য তাপের ভয় দেখাচ্ছো? ”
রিকার্ডোর কথা বলার ভঙ্গি দেখে আনাস্তাসিয়া হেসে ফেলে। রিকার্ডো মুগ্ধ দৃষ্টিতে আনাস্তাসিয়ার হাসি দেখতে থাকে।
গতকালকে সারাদিন শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে বিরক্ত ক্যাথরিন। আজ তাই উঠে বিছানায় বসে আছে। বেশি হাঁটাহাঁটি করতে মানা করেছে হান্নাহ। কিন্তু এখন বসে থাকতেও বিরক্ত লাগছে তার। চুপচাপ বসে সামনে তাকিয়ে আরোণ আর ক্যামেলিয়াকে দেখছে। আরোণ ক্যামেলিয়াকে কোলে নিয়ে হাঁটছে আর কত কথা বলছে। ক্যামেলিয়াও ফ্যালফ্যাল করে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে সেই কথা। ক্যাথরিনের দিকে তাদের খেয়ালই নেই। ক্যাথরিনের হিংসে হয় সামান্য। রাগও হয় কিছুটা। মেয়েকে পেতেই বউকে ভুলে গেলো আরোণ৷ নিষ্ঠুর স্বামী!
বিরক্ত হয়ে ক্যাথরিন বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। সাথে সাথে আরোণ বলে উঠে,
” আরে! নিচে নামছো কেন তুমি? কিছু প্রয়োজন? আমাকে বলো। ”
ক্যাথরিন কণ্ঠে কিঞ্চিৎ রাগ মিশিয়ে বলে,
” তোমাকে কেন বলবো? তুমি তোমার মেয়ের সাথে গল্প করো। আমার যা প্রয়োজন আমি নিজে নিয়ে নিবো। ”
আরোণ ভ্রু কুচকে তাকায় ক্যাথরিনের দিকে। একটু পর সন্দিহান স্বরে প্রশ্ন করে,
” তোমার ঈর্ষা হচ্ছে ক্যাথ? ”
ক্যাথরিন বলে উঠে,
” আমি কেন ঈর্ষা করবো? হু? ”
আরোণ এবার হেসে ফেলে। ক্যামেলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
” দেখেছো? তোমার মা আমাদের ঈর্ষা করছে। ”
ক্যাথরিন রেগে বলে উঠে,
” মোটেও ক্যামেলিয়ার সামনে উল্টোপাল্টা কথা বলবে না। ”
আরোণ হেসে ক্যামেলিয়াকে নিয়ে ক্যাথরিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ক্যামেলিয়াকে ক্যাথরিনের কোলে দিয়ে পিছন থেকে ক্যাথরিনকে জড়িয়ে ধরে তার কাধে মুখ রাখে৷ ক্যাথরিন কাপা স্বরে প্রশ্ন করে,
” কি করছো? ”
আরোণ জবাব দেয়,
” আমি ক্যামেলিয়াকে ভালোবাসি। কিন্তু ক্যামেলিয়ার মাকে তার থেকেও বেশি ভালোবাসি। কারণ তুমি আমার জীবনে না এলে ক্যামেলিয়াকে কখনো আমার পাওয়া হতো না৷ ”
ক্যাথরিন সামান্য হাসে। এতক্ষণের জমে থাকা রাগ গলে পানি হয়ে যায়। ধীর স্বরে বলে উঠে,
” আমিও ক্যামেলিয়ার বাবাকে খুব ভালোবাসি৷ ”
ক্যাথরিন এটুকু বলতেই ক্যামেলিয়া শব্দ করে কেদে উঠে। ক্যাথরিন আর আরোণ একে অপরের দিকে একবার তাকিয়ে সাথে সাথেই ফিক করে হেসে ফেলে। ক্যাথরিন বলে উঠে,
” এখন তোমার মেয়ে আমাকে ঈর্ষা করছে। ”
আরোণ বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,
” মা মেয়ে মিলে আমাকে নিয়ে যুদ্ধ না বাধিয়ে ফেলে আবার। ”
আজ একমাস হয়ে গিয়েছে আনাস্তাসিয়া বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলেছে৷ এই একমাস বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে রিকার্ডো বিয়ের কথা তুলে নি৷ কিন্তু দায়িত্বের বোঝা কিছুটা কমে আসতেই সমগ্র রাজ্যে ঘোষণা করা হয়েছে কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্ট বিবাহ করতে চলেছেন। মুহুর্তেই সকল প্রজাদের মনে হবু কাউন্টেসকে নিয়ে কৌতূহল জন্মায়। সকলের মুখেই এক কথা,
” কে সেই রমণী যে একজন ভ্যাম্পায়ারকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলো? ”
এসকল গুঞ্জন রিকার্ডোর কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হয় নি। কিন্তু সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে বিয়ের আগে কেউ যেন আনাস্তাসিয়ার পরিচয় সম্পর্কে না জানতে পারে। এই আদেশ মেনে নিয়েই বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে সকলে। বেশ জমকালো করে বিয়ের আয়োজন হচ্ছে। সম্পূর্ণ প্রাসাদ আলোকসজ্জায় পরিপূর্ণ।
নিজের কক্ষের বারান্দার ডিভানে বসে আছে রিকার্ডো। তার পাশেই আরেকটা গদিতে বসে আছে ম্যাথিউ। নিকষকালো আকাশকে আলোকিত করে রেখেছে আতশবাজি। সেদিকে তাকিয়েই হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসে চুমুক বসায় রিকার্ডো। ম্যাথিউ সামান্য রসিকতা করে বলে,
” আজকেই তোমার স্বাধীন জীবনের শেষ রাত। কাল থেকে তুমি বন্দী হয়ে যাবে৷ তখন শুধু আনাস্তাসিয়ার হুকুম অনুযায়ী চলতে হবে। ”
রিকার্ডো হেসে বলে,
” এখনো তো সব কিছু তার হুকুমেই চলছে। আজ কত মাস ধরে মানব রক্তের স্বাদ পাই না৷ এই পশুর রক্ত দিয়ে পেট চালাচ্ছি৷ ”
ম্যাথিউ বলে উঠে,
” হুকুম না মেনে উপায় আছে তোমার? উঠতে বসতে তোমাকে কৃষ্ণ সাগর নিয়ে হুমকি দেয় সে। আমার তো ভয় করে কবে না জানি সত্যি তোমাকে কৃষ্ণ সাগরে ফেলে দেয়৷ ”
” নাসিয়ার দ্বারা এটাও অসম্ভব নয়। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডো ডিভানে হেলান দিয়ে মাথা এলিয়ে দেয় পিছনের দিকে। চোখ বুজে বলে উঠে,
” এজন্যই হয়তো ওকে আমি এতো ভালোবাসি। ওর নির্ভীকতা আমার হৃদয়কে কাবু করে ফেলেছে। আমাকে জব্দ করার কৌশল ও ভালো করে জানে। ”
ম্যাথিউ ভাইয়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ তার কথা শুনে। মনে মনে বলে উঠে,
” ভালো তো আমিও বাসি৷ কিন্তু আমার কাছে আমার ভালোবাসার থেকে নাসিয়ার ভালো থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নাসিয়া একমাত্র তোমার সাথে খুশি থাকবে। তাই তো ওকে এতো সহজে যেতে দিচ্ছি। ”
ম্যাথিউ এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলে উঠে,
” তোমাকে একটা বিষয় জানানোরও ছিলো। ”
রিকার্ডো চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে প্রশ্ন করে,
” কি? ”
” সিউসেয়েভা শহরে কিছু প্রজাদের মধ্যে বিদ্রোহের মনোভাব দেখা যাচ্ছে। ”
” কি বিষয়ে? ”
” সিংহাসনে একজন ভ্যাম্পায়ার বসেছে এটা তারা মেনে নিতে পারছে না। তারা নাকি বলে বেড়াচ্ছে সিংহাসন কি এখন ভ্যাম্পায়ারদের বংশধররা পরিচালনা করবে? ”
রিকার্ডো ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” এটা কি তারা নিজ থেকে বলছে নাকি তাদের কেউ উস্কে দিচ্ছে? ”
” তা নিয়ে নিশ্চিত নই। আমি শুধু এতটুকুই খবর পেয়েছি। ”
রিকার্ডোর কপালের ভাজ গভীর হয়। সে কিছু একটা ভাবতে মগ্ন হয়ে পড়ে। ম্যাথিউ তা দেখে বলে উঠে,
” আমি কেবল তোমাকে জানানো প্রয়োজন মনে করে জানিয়েছি। কিন্তু তুমি এখন এই বিষয়ে চিন্তা করো না। কাল তোমার বিয়ে। সেদিকে মনোযোগ দাও। ওইদিকটা আমি সামলে নিবো। ”
রিকার্ডো হেসে ম্যাথিউর হাতের উপর হাত রেখে বলে উঠে,
” আমি জানি তুই আমার পাশে থাকতে আমার চিন্তার কোনো কারণ নেই। ”
রাত বাড়ছে। আনাস্তাসিয়ার ঘুম আসছে না। কাল বিয়ে ভাবতেই অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে তার মাঝে। তার এখানো বিশ্বাস হচ্ছে না আর একদিন পরেই সে রিকার্ডোর হয়ে যাবে চিরজীবনের জন্য।
প্রথম যখন সে ট্রান্সিলভেনিয়ায় এসেছিলো তখন সে কখনো কল্পনাও করে নি যে একদিন এই রিকার্ডোর সাথেই তার বিয়ে হবে। কিন্তু ভাগ্য এবং ভালোবাসার জোরে আজ আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোকে পেতে চলেছে। কিন্তু তার জন্য সবথেকে অপ্রত্যাশিত বিষয় হচ্ছে যে সে কেবল রিকার্ডোর স্ত্রী নয় বরং রোমানিয়ান কাউন্টেসও হতে চলেছে।
কাভালা দ্বীপের তীরে বেড়ে উঠা আনাস্তাসিয়া মুক্ত পাখির মতো স্বাধীনতা পেয়ে বড় হয়েছে। নিজেকে সেই দ্বীপের রাজকন্যাই মনে হতো তার। কিন্তু সেই ছোট্ট দ্বীপের রাজকন্যা একদিন সম্পূর্ণ রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের রাণী হয়ে যাবে এটা সে কখনোই কল্পনা করে নি। একজন কাউন্টেসের নিশ্চয়ই অনেক দায়িত্ব? আনাস্তাসিয়া মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে,
” আমি কি আদৌ এই রাজ্যের কাউন্টেস হওয়ার যোগ্য? ”
আনাস্তাসিয়ার এসব ভাবনার মাঝেই কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। আনাস্তাসিয়া ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে। মনে মনে ভাবে এতো রাতে কে আসতে পারে? রিকার্ডো না তো? আনাস্তাসিয়া সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে আয়নায় দেখে নেয়। তারপর ভেতরে আসার অনুমতি দেয়। দরজা খুলে কক্ষে প্রবেশ করে আরোণ এবং ক্যাথরিন। ক্যাথরিনের কোলে ক্যামেলিয়া। তাদের দেখে আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” তোমরা এতো রাতে এখানে? ”
ক্যাথরিন বলে উঠে,
” আমি জানতাম তুই জেগে আছিস। তাই আমরা চলে এলাম। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে তুই অন্য কারো অপেক্ষায় ছিলি। ”
শেষের কথাটুকু ক্যাথরিন ঠাট্টা করে বলে। আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” আমি কার অপেক্ষায় থাকবো? ঘুম আসছিলো না দেখে জেগে ছিলাম। তোমরা এসে বসো। ”
আরোণ আর ক্যাথরিন বিছানায় বসে পড়ে। আরোণ বলে উঠে,
” অপেক্ষায় থাকলেও লাভ নেই। তোমার হবু স্বামীকে কাল বিয়ের আগে আর দেখতে পারবে না তুমি। ”
ক্যাথরিন বলে,
” তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয় আমাদের সাথে বস। ”
আনাস্তাসিয়া এগিয়ে গিয়ে আরোণ এবং ক্যাথরিনের মাঝে বসে পড়ে। ক্যাথরিন নিজেই বলে উঠে,
” তুই কিছু নিয়ে চিন্তা করছিস? ”
আনাস্তাসিয়া লুকায় না। সে নিজের মনের দ্বিধা সম্পর্কে জানায় আরোণ এবং ক্যাথরিনকে। আরোণ বলে,
” তুমি রিকার্ডোর মা কাউন্টেস ম্যারি সম্পর্কে জানো? ”
আনাস্তাসিয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। আরোণ বলে উঠে,
” কাউন্টেস ম্যারিও একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে ছিলেন। কিন্তু উনি অসাধারণ মনের মানুষ ছিলেন। হয়তো এজন্যই কাউন্ট লিও উনায় ভালোবেসেছিলেন। আমি কেবল তোমায় এতটুকুই বুঝাতে চাইছি যে কাউন্টেস হওয়ার জন্য তোমার মনে সাহস এবং শক্ত মানবিক বলের প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস আমার বোন তার দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন করবে। ”
আরোণের কথা শুনে কিছুটা সাহস পায় আনাস্তাসিয়া। ক্যাথরিন পাশ থেকে বলে উঠে,
” আর কখনো ভুলে যাবি না তোর পরিবার সবসময় তোর পাশে আছে। আর এই প্রাসাদাও তোর আপন। তাই যখনই তোর আমাদের প্রয়োজন পড়বে আমাদের তোর পাশে পাবি তুই। ”
আনাস্তাসিয়ার চোখ অশ্রুসিক্ত। ক্যাথরিন একপাশ থেকে বোনকে জড়িয়ে ধরে। আরোণও আনাস্তাসিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” আমি অনেক ভাগ্যবতী তাই এতো সুন্দর একটা পরিবার পেয়েছি। আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। বুখারেস্ট প্রাসাদে তোমাদের কথা অনেক মনে পড়বে। ”
ক্যাথরিনের কোলে থাকা ক্যামেলিয়া এই দৃশ্য দেখে আদো আদো স্বরে শব্দ করে উঠে। আনাস্তাসিয়া হেসে দিয়ে ক্যামেলিয়াকে ক্যাথরিনের কোল থেকে নিয়ে তার গালে চুমু খেয়ে বলে উঠে,
” আর সবথেকে বেশি আমার ক্যামিকে মনে পড়বে। ”
আনাস্তাসিয়ার কথায় যেন ক্যামেলিয়া খুশি হয়। সে হেসে আলতো হাত বাড়িয়ে আনাস্তাসিয়ার গালে আদর দিতে থাকে। ক্যাথরিন এই দৃশ্য দেখে বলে,
” এই মেয়ে যেন সব বুঝার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। কখন হাসতে হবে, কখন রাগ দেখাতে হবে, কখন কাদতে হবে সব তার জানা। ”
আরোণ সামান্য ভাব নিয়ে বলে,
” দেখতে হবে না কার মেয়ে? ”
সাথে সাথেই আনাস্তাসিয়া আর ক্যাথরিন হেসে দেয়। তাদের এই মিষ্টি মুহুর্তের মাঝেই পেরিয়ে যায় রাত। ভোরের আলো ফুটার মাধ্যমে আগমন হয় এক নতুন দিনের। আনাস্তাসিয়ার জীবনের এক নতুন যাত্রার।
বুখারেস্ট প্রাসাদকে ঘিরে আজ উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দুপুরের দিকে প্রাসাদে এসে পৌঁছেছে আনাস্তাসিয়া, ক্যাথরিন, আরোণ, ক্যামেলিয়া সহ সকল নেকড়েরা। আনাস্তাসিয়াকে ফিটনে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে আনা হয়েছে। তাই প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে ভিড় করে থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রজাই তাদের হবু কাউন্টেসকে দেখতে পারে নি। প্রাসাদে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারো রিকার্ডোর সাথে দেখা হয়নি আনাস্তাসিয়ার। সবার মুখেই একটাই কথা বিয়ের লগ্নের আগে কেউ কাউকে দেখতে পারবে না। এদিকে আনাস্তাসিয়ার চোখ জোড়া যে ব্যকুল হয়ে কেবল তার প্রেমিক পুরুষকেই খুঁজে চলেছে এটা সকলের অজানা। গোধূলি লগ্নে আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডোর বিয়ে পড়ানো হবে।
আনাস্তাসিয়া এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই দাসীরা এসে তাকে গোছলের জন্য নিয়ে যায়। এই প্রাসাদেও তুষ দূর্গের মতো গোছল করার জন্য বিশেষ জায়গা রয়েছে। এক বৃহৎ কক্ষের মধ্যিখানে বিশাল পুকুরের ন্যায়। সেই ধবধবে পানির উপর ভেসে আছে বিভিন্ন ধরনের ফুল। কক্ষের চারিদিকেই রয়েছে অসংখ্য সাদা পর্দা। তবে এই গোছলখানা কেবল কাউন্ট এবং কাউন্টেসের ব্যবহারের জন্যই। দাসীরা খুব যত্ন নিয়ে গোছল করায় নববধূকে।
শুভ্র রঙের গাউন পড়ে আয়নায় নিজেকে বারবার ঘুরেফিরে দেখছে আনাস্তাসিয়া। গাউনের হাতার দিকটা কেবল চিকন একটি ফিতা দ্বারা তৈরি করা। যার ফলে আনাস্তাসিয়ার দু’হাতই সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার সোনালী চুলের বাহার। সেই চুলে সাদা হীরের পাথরের অলংকার দ্বারা সজ্জিত। কোমরে চিকন হীরের কোমরবন্দ পড়েছে। গাউনের পিছনের নিচের অংশ বেশ লম্বা। কক্ষের অর্ধেক মেঝে জুড়ে তা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে তাকে অপ্সরার ন্যায় দেখাচ্ছে৷ তবুও আনাস্তাসিয়ার মনে হচ্ছে কিছু একটা বাকি এখনো। আয়নায় নিজেকে দেখে তাই মনে করার চেষ্টা করছে সে। তখনই দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। আনাস্তাসিয়া অনুমতি দিতেই কক্ষে প্রবেশ করে ম্যাথিউ৷
কক্ষে প্রবেশ করতেই ম্যাথিউর চোখ আটকে যায় আনাস্তাসিয়ার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস থমকে যায়। ম্যাথিউকে দেখতেই আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” ভাগ্যিস অন্তত তুমি এসেছো ম্যাথিউ। কেমন দেখাচ্ছে আমাকে? ”
ম্যাথিউ রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে জবাব দেয়,
” অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। ”
আনাস্তাসিয়া যেন ম্যাথিউর উত্তরে সন্তুষ্ট হয় না। সে আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,
” উহু। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা বাকি। ”
ম্যাথিউ এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার পাশে দাঁড়ায়। হাতে থাকা গয়নার বাক্সটা খুলে বলে উঠে,
” কেবল এটাই বাকি। ”
আনাস্তাসিয়া তাকিয়ে দেখে বাক্সে একটি সাদা হীরের হার আর এক জোড়া দুল। ম্যাথিউ বলে উঠে,
” ভাই তোমার জন্য পাঠিয়েছে। ”
আনাস্তাসিয়া সেই হারের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কি সুন্দর! ”
ম্যাথিউর দৃষ্টি আনাস্তাসিয়ার দিকেই নিবদ্ধ। সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বলে উঠে,
” অপরূপ সুন্দর! ”
আনাস্তাসিয়া চোখ তুলে ম্যাথিউর দিকে তাকায়। একবার ম্যাথিউকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলে উঠে,
” বাহ। তোমাকেও দেখতে সুন্দর লাগছে। ”
ম্যাথিউ হেসে ফেলে আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে। প্রশ্ন করে,
” সুন্দর নাকি সুদর্শন? ”
আনাস্তাসিয়া জিভ কেটে বলে,
” উফ! ভুল বলে ফেললাম। সুন্দর নয় সুদর্শন। ”
ম্যাথিউ বলে উঠে,
” আমাকে যতই সুন্দর লাগুক না কেন আজ সকলের দৃষ্টি কেবল তোমার দিকেই থাকবে। আমার ভাই খুব ভাগ্যবান। তাই সে তোমাকে পাচ্ছে। ”
আনাস্তাসিয়া উত্তর দেয়,
” ভাগ্যবতী তো আমিও যে আমি তোমার ওই জাদরেল ভাইটার মন পেয়েছি। ”
” আমার সামনে আমার ভাইয়েরই বদনাম করছো? তাও তোমাদের বিয়ের দিন? ”
আনাস্তাসিয়া হার এবং কানের দুল পড়তে পড়তে উত্তর দেয়,
” বদনাম নয় সত্যি বলছি কেবল। ”
ম্যাথিউ হেসে বলে উঠে,
” তুমি তৈরি হও। আমি আসছি। ”
আনাস্তাসিয়া তাড়াতাড়ি কানের দুল পড়া শেষ করে ম্যাথিউকে পিছু ডাকে। ম্যাথিউ দরজার কাছে চলে গিয়েছিলো। আনাস্তাসিয়ার ডাক শুনতেই পিছু ফিরে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। আনাস্তাসিয়া দু’হাতে গাউন কিছুটা উঁচু করে ধরে দৌঁড়ে এসে ম্যাথিউকে জড়িয়ে ধরে। আচমকা আনাস্তাসিয়ার এহেন কান্ডে ম্যাথিউ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। বক্ষস্থল শীতলও হয় বোধহয়। আনাস্তাসিয়া নিজেই বলে উঠে,
” তুমি আমার থেকে ধন্যবাদ প্রাপ্য ছিলে। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না ধন্যবাদ জানানোর। ”
ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,
” কিসের জন্য? ”
” আমার চিঠি পেয়ে সেদিন আমার রিকের কাছে পৌঁছানোর জন্য। নিজেদের মধ্যের সকল মান অভিমান মিটিয়ে ফেলার জন্য। ”
ম্যাথিউ মলিন হাসে। কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল একহাত আনাস্তাসিয়ার পিঠে রেখে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রয়। কে জানে আনাস্তাসিয়া আর কখনো নিজ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরবে নাকি? তাই এই কিছু মুহুর্তটুকু সে নিজের প্রাপ্তির খাতায় তুলে নেয়। আনাস্তাসিয়ার সান্নিধ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। সে ম্যাথিউকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাথিউ হেসে বলে,
” তৈরি হয়ে নাও এখন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমায় নিতে আসবে। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে আয়নার সামনে চলে যায়। ম্যাথিউও আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে।
প্রাসাদের পিছনের দিকে খোলা জায়গায় বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সাদা অর্কিড এবং লিলি ফুল দিয়ে সম্পূর্ণ বাগান সুসজ্জিত। অতিথিদের বসার জন্য বাগানের দুদিকে ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতিথির তালিকায় রয়েছে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়ার সকল কাছের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজ্যের উচ্চপদস্থ সেনা এবং মন্ত্রীরা। আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বেগুনি আভা। গোধূলি লগ্ন শুরু হয়ে গিয়েছে।
সাদা কালো রাজকীয় পোশাকে সুদর্শন রিকার্ডো অপেক্ষমান তার প্রেয়সীর জন্য। তার সবুজ নেত্রপল্লব আনাস্তাসিয়ার আগমনের অপেক্ষায় কাতর প্রায়। অবশেষে রিকার্ডোর অপেক্ষার অবসান হয়। সাদা জেসমিন ফুলের তোড়া হাতে আনাস্তাসিয়া এগিয়ে আসছে রিকার্ডোর দিকে। আনাস্তাসিয়াকে আসতে দেখে সকল অতিথি উঠে দাঁড়ায়। সকলেই বিমুগ্ধ হয়ে দেখছে আনাস্তাসিয়াকে। সাদা পাতলা পর্দার আড়ালে আনাস্তাসিয়ার মুখশ্রী স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। রিকার্ডোর মনে হলো সন্ধ্যা আকাশের তারার মেলা থেকে একটি জ্বলন্ত শুভ্র তারা পৃথিবীতে খসে পড়েছে। আনাস্তাসিয়া যতই তার দিকে এগিয়ে আসছে ততই রিকার্ডোর বুকের হৃদপিণ্ডের উঠানামার গতি বেড়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে আনাস্তাসিয়াও রিকার্ডোর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। তার স্বপ্নের রাজপুত্রকে আজ স্বপ্নের মতোই সুদর্শন দেখাচ্ছে। আনাস্তাসিয়ার চোখে যেন ঘোর লেগে গিয়েছে। রিকার্ডোর কাছাকাছি আসতেই রিকার্ডো একহাত বাড়িয়ে দেয় আনাস্তাসিয়ার দিকে। নিঃসংকোচে আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর বাড়িয়ে দেওয়া হাত গ্রহণ করে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাতের পিঠে অধর ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” খুন হয়ে গেলাম। ”
আনাস্তাসিয়া সামান্য লজ্জা পায় বোধহয়। সাথে সাথে দৃষ্টি নত করে ফেলে সে। তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা ফাদার রিকার্ডোর থেকে অনুমতি নিয়ে বিয়ের কার্যক্রম শুরু করে। শপথ বাক্য পাঠের পালা এলে রিকার্ডো প্রথম বলা শুরু করে।
” আমি রিকার্ডো আলবার্ট আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি জীবনের এপার এবং ওপার উভয় পারেই আমি কেবল তোমাকেই ভালোবাসবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি মরণের আগ পর্যন্ত আমার হৃদয় কেবল তোমার জন্যই স্পন্দিত হবে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভালো খারাপ সকল পরিস্থিতিতে তোমার ঢাল হয়ে তোমায় রক্ষা করবো। আমি রিকার্ডো আলবার্ট নিজের বাকি জীবন আজ তোমার নামে লিখে দিলাম নাসিয়া। ”
রিকার্ডো এতোটুকু বলে একটা প্রশান্তির হাসি দেয়। আনাস্তাসিয়ার ঠোঁটের কোণেও লেপ্টে আছে হাসি। হাসিমুখেই সে নিজের শপথ বাক্য পাঠ করা শুরু করে,
” আমি আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজ রিকার্ডো আলবার্টকে নিজের স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সকল পরিস্থিতিতে তোমার শক্তি হয়ে দেখাবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তোমার ক্লান্ত দিনের শেষের একটুকরো প্রশান্তির ছায়া হয়ে থাকবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি কেবল তোমারই থাকবো। আমি আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজ আজ এই মুহুর্তে স্বীকারোক্তি দিচ্ছি পুণর্জন্ম যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে প্রতিটি জনমে আমি কেবল তোমাকেই ভালোবাসবো। ”
রিকার্ডো ঠোঁটের কোণের হাসি দীর্ঘ হয়। তার কাছে মনে হচ্ছে সে সমগ্র পৃথিবী হাসিল করে ফেলেছে। ফাদার আংটিবদল করতে বললে জেনি এবং জুন আংটির থালা হাতে এগিয়ে আসে। রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া হেসে থালার উপর থাকা আংটির বাক্স হতে আংটি দুটো তুলে নেয়। দুজন দুজনের অনামিকা আঙুলে আংটি পড়িয়ে পুরো জীবনের জন্য নিজেদের এক নতুন বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার মুখের উপর পড়ে থাকা পর্দাটা তুলতেই তাদের স্বামী স্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো সরাসরি নয়নমিলন হয়। আজও সেই প্রথম দিনের মতো মুগ্ধতা দুজনের চোখে। রিকার্ডো দু’হাত আনাস্তাসিয়ার গালে রেখে তার কপালে সন্তপর্ণে অধর ছোঁয়ায়। আবেশে আনাস্তাসিয়া চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলে। মুহুর্তেই চারিদিকে করতালিতে মুখরিত হয়। প্রায় আধার নেমে আসা আকাশ মুহুর্তেই আতশবাজির আলোয় ভরে উঠে জানান দেয় সকলকে যে বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে।
ক্যাথরিন আরোণ মুগ্ধ নয়নে দেখে আরেক জোড়া অসম্ভব প্রেমিক যুগলের পবিত্র মিলন। স্মৃতিচারণ করে নেয় নিজেদের বিয়ের সেই মুহুর্ত। আরোণ ক্যাথরিনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” অন্ধকারের অতলে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতার ওষুধ কেবল ভালোবাসা তা আবার প্রমাণ হলো। ”
আরোণের কথা শুনে ক্যাথরিন মৃদু হেসে তার কাধে মাথা রাখে।
ম্যাথিউর অন্তর ভালোবাসার অনল দহনে দগ্ধ হচ্ছে। অদ্ভুতভাবে চোখ ফেটে অশ্রুও বেরিয়ে আসতে চাইছে। সবার দৃষ্টির আড়ালে সে তাড়াতাড়ি নিজের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে নেয়। আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে তাদের ভালো থাকার জন্য প্রার্থনা করে।
ক্যামিলো এগিয়ে গিয়ে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে। তাদের শুভকামনা জানিয়ে আনাস্তাসিয়ার কানে কানে বলে উঠে,
” যে জীবন থেকে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছো সেই জীবনে আর কখনো ফিরতে দিও না তুমি। আমার বিশ্বাসের মান রেখো। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে ক্যামিলোকে। ক্যামিলো শুভকামনা জানিয়ে চলে যেতেই ক্যাথরিন এবং আরোণ এগিয়ে আসে তাদের শুভকামনা জানাতে। ক্যাথরিন তাদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” জীবনের সকল অবস্থায় এভাবেই একে অপরের পাশে থেকো। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন খুব শীঘ্রই তোমাদের পরিবারও পরিপূর্ণ করে দেন। ”
ক্যাথরিনের কথার অর্থ বুঝতে পেরে রিকার্ডো হাসি হাসি মুখখানা মলিন হয়ে আসে। আনাস্তাসিয়ার চোখ এড়ায় না সেটা। তবুও সে এই বিষয়ে এখন কিছুই বলে না। একে একে সকলেই তাদের শুভকামনা জানিয়ে যাওয়ার পর শেষের দিকে আসে জোসেফ তার পরিবার সহ। যাওয়ার আগে জোসেফ রিকার্ডোকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
” আমি জানি এটা কঠিন তবে আনাস্তাসিয়ার মতো জংলী বিড়ালকে কেবল আপনিই কাবু করতে পারবেন। ”
জোসেফের কথা শুনে রিকার্ডো হেসে দেয়। আনাস্তাসিয়া চোখ গরম করে তাকাতেই জোসেফ তাড়াতাড়ি সেখান থেকে কেটে পড়ে। রাগের বসে যদি আবার তাকে কৃষ্ণ সাগরে ভাসানোর হুমকি দেয়? তার চেয়ে ভালোয় ভালোয় কেটে পড়াই উত্তম।
বিয়ে শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে হলরুমে এসে উপস্থিত হয়। আনাস্তাসিয়াকে সকল বিধি মেনে কাউন্টেসের মুকুট পড়ানো হবে। সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রিকার্ডোর সামনে এসে আনাস্তাসিয়া দু হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে। সবুজ হীরার পাথরের কাজ করা কাউন্টেসের মুকুট রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে পড়িয়ে দিতেই আনাস্তাসিয়া উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বেশ অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে তার মধ্যে। তবুও সে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সহিত কাউন্টেস হিসেবে নিজের শপথ বাক্য পাঠ করে সকলের সামনে। আনাস্তাসিয়া শপথ বাক্য পাঠ করার সময় রিকার্ডো নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলো তার হৃদয়ের রাণীর দিকে। তার হৃদয়ের রাণী আজ কেবল তার নয় সমগ্র রোমানিয়ার রাণী হিসেবে শপথ গ্রহণ করছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে?
শপথ বাক্য পাঠ শেষে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া প্রাসাদের সব থেকে উঁচু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় প্রজাদের দেখা দেওয়ার জন্য। বারান্দায় প্রবেশের আগে আনাস্তাসিয়া কিছুটা ঘাবড়ে যায়। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাত নিজের হাতে আবদ্ধ করে তাকে বলে উঠে,
” আমার তোমার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থা আছে যে তুমি নিজেকে একজন যোগ্য কাউন্টেস হিসেবে সকলের সামনে প্রমাণ করবে। তোমার মধ্যে সেই সাহস, সেই আত্মবিশ্বাস এবং সেই মনোবল আছে। যেই নারীর ভ্যাম্পায়ারদের বিনাশ করার সময় হাত কাপে না, যেই নারীর তলোয়ারের ধারে প্রতিপক্ষকে হারানোর ক্ষমতা রাখে সে নারী অবশ্যই এই সাম্রাজ্যের জন্য উত্তম কাউন্টেস হিসেবেই প্রমাণিত হবে। এই রাজ্য কেবল আর আমার নয় তোমারও এখন থেকে। আর আমি জানি আমি কখনো থাকি অথবা না থাকি তুমি এই সাম্রাজ্য একা হাতে সামলে নেওয়ারও ক্ষমতা রাখো। ”
রিকার্ডোর কথা আনাস্তাসিয়ার মনে সাহস যোগায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রিকার্ডোর হাত ধরে বারান্দায় প্রবেশ করে। সাথে সাথে প্রধান সেনাপতি স্টেফেন স্ব শব্দে ঘোষণা করেন,
” সাবধান! কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্ট এবং কাউন্টেস আনাস্তাসিয়া আলবার্ট আসছেন। ”
প্রাসাদের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজারা সকলেই দর্শন করে সদ্য বিবাহিত কাউন্ট এবং কাউন্টেসের। দুজনকে একসাথে দেখে সকলেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈশ্বরের সৃষ্টি দুই অপরূপ মানব মানবীকে একসাথে দেখে যে কেউ বলতে বাধ্য এরা কেবল একে অপরের জন্য তৈরি। প্রজারা সকলেই কাউন্ট এবং কাউন্টেসকে সম্মান জানাতে বুকে একহাত রেখে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সকলে একসাথে বলে উঠে,
” কাউন্ট রিকার্ডো এবং কাউন্টেস আনাস্তাসিয়া দীর্ঘজীবী হোক। ”
আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডো হেসে একে অপরের দিকে তাকায়। রিকার্ডো শীতল কণ্ঠে বলে,
” আজ নতুন করে আবার তোমার নীলকান্তমণির প্রেমে পড়ে গেলাম। ”
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর দিকে দৃষ্টিস্থির করে বলে,
” প্রথমদিনের মতো আজকেও নতুন করে তোমার সবুজ নেত্রের প্রেমে পড়ে গেলাম। ”
রিকার্ডো হাসে মৃদু। তারপর বলে উঠে,
মহাপ্রয়াণ পর্ব ৫১+৫২
” আকাশের বিশালতার সমান ভালোবাসি। ”
আনাস্তাসিয়া ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়,
” কৃষ্ণ সাগরের গভীরতার সমান ভালোবাসি। ”
