Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১ || তুশকন্যা

মহামায়া পর্ব ১ || তুশকন্যা

মহামায়া পর্ব ১
তুশকন্যা

‘চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের ছেলে ভিভিয়ান—বানিজ্য মন্ত্রীর মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে।এমনটাই অভিযোগ উঠেছে বিদেশ ফেরত ও সদ্য রাজনীতিতে জড়ানো ভিভিয়ান এহসান এর বিরুদ্ধে।’
নিউজ মিডিয়ার এমন রংচঙে হেডলাইট দেখে নিমিষেই কপাল কুঁচকে যা এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির। পরনে সাদা পাঞ্জাবি,পায়জামা। চোখে-মুখে বার্ধক্যের ছাপ রইলেও,যে কেউ প্রথম দেখায় বলতে বাধ্য—এই লোক নিত্যন্তই সুপুরুষ। আর নিজের চেয়েও অত্যধিক গুনে সুদর্শন ছেলের নামে এমন কিছু কোনো বাবা-ই, কখনো প্রত্যাশা করবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাহিদ এহসান যেন কেনীথের নামে ছড়ানো এই তথ্য খুব সহজেই বিশ্বাস করে নেয়।
চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ক্ষি”প্ততা। যেন সে জানত—এমন কিছুই হবার ছিলো। আর এই আশংকাই সে করেছিল। মূহুর্তেই তার ঠোঁট হতে অস্ফুটস্বরে বেড়িয়ে আসে,
“শু*রের বাচ্চা! মানুষ আর হতে পারলি না।”

বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে আসা বিয়ের কনে, গোলাপে সজ্জিত বিছানায় বসে অনবরত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। জোরে কাঁদলেই কখন না যেন,জানটাও চলে যায়। এমনই হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তাকে। তবুও কোনোমতেই যেন তার কান্না থামছে না।
সে এই মূহুর্তে কোথায় রয়েছে তাও তার অজানা। সঙ্গে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে, নির্বিকারে অপলক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যাক্তিটিও তার কাছে অজানা। পুরোপুরি অজানা অচেনা বলা চলে না। হয়তো লোকটি তার পরিচিত। কিন্তু আনায়া ঠিকঠাক এই লোকটির সম্পর্কে কিছুই জানে না। অথচ অদ্ভুত হলেও এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে তার এই ব্যক্তির সঙ্গে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আনায়ার পরনে ভারী টুকটুকে লাল রঙের লেহেঙ্গা। মাথায় বড়সড় একটা ঘোমটা। তবে এখন তা এলোমেলো হয়ে মাথা থেকে প্রায় পড়ে যেতে নিয়েছে। মুখভর্তি ভারী মেক-আপও চোখের পানিতে মিলেমিশে একাকার।
তার গলা, কান, দুহাত ভরা সোনার ভারী গহনা। হবেই না বা কেনো, নামকরা মন্ত্রী তারেক এহসানের বড় মেয়ে আনায়া এহসান বলে কথা। তারেক এহসান এবং তাদের পরিবার যে কতটা আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপন করে তা মোটামুটি গ্রাম-শহরের সবারই জানা। এছাড়া তারেক এহসান যে ঠিক কতটা কঠোর মনোভাব সম্পূর্ণ—তাও সবার ধ্যানে রয়েছে। অথচ তারই বড় মেয়েকেই কিনা কেউ বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে গিয়েছে।
আনায়ার কান্নার মাঝেই সে খেয়াল করে দেখল, সোফায় বসে থাকা লোকটি একটা কালো রংএর লাইটারে অনবরত আগুন জ্বালিয়ে তা নিভিয়ে দিচ্ছে। লোকটির কাঁধ পর্যন্ত বড় বড় হালকা কোঁকড়ানো চুল। যেগুলোর কিছুটা অংশ মেসিবান করে পেছনে বেঁধে রাখা। বাদবাকি মুক্ত চুলের অংশবিশেষ এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দাঁড়ি গোঁফও একদম সুনিপুণ ভাবে ছোট ছোট করে কাঁটা। বলিষ্ঠ দেহের পরনে কালো রংএর একটা পাঞ্জাবি,হাতাটাও কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। পায়জামা কিংবা জুতোটাও কালো।

এমনিতেই রুমটা কেমন অন্ধকার। শুধু ছোট্ট একটা ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখা রয়েছে। আবার সেই লোকটিও বসে রয়েছে একদম ঘরের কোণার সোফায়। লাইটারটা বারংবার ফ্লিকিং করায়, আবছা আলতো তার মুখটা শুধু ঝাপসা হয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। সবমিলিয়ে আনায়ার কাছে খুব বেশি স্পষ্ট হলো না লোকটির ভাবগতিকের আভাস।
কিন্তু আনায়া যে অন্ধকার ভয় পায়। সে প্রচন্ড রকমের ঘৃ”ণা করে এই অন্ধকারকে। এই অন্ধকারই যেন তার মাঝে সকল অজানা ভয়কে জাগিয়ে তোলে। রুদ্ধ করে দেয় তার শ্বাস প্রশ্বাস।
এরই মাঝে আনায়া লোকটিকে পরখ করতে তাকিয়ে ছিলো বিধায়… আচমকা কি যেন ভেবে লোকটি তার নজর—আনায়া হতে সরিয়ে নেয়।

অতঃপর একটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে টান দেয়। এই নিয়ে গত কিছু সময়ের মাঝে কম করে হলেও, ছয় থেকে সাতটা সিগারেট ফুরিয়েছে সে। আর সেই সিগারেটের গন্ধে আনায়ার জান যায় যায় উপক্রম।
কোনোমতেই সে এসব গন্ধ সহ্য করতে পারে না। প্রতিবার সিগারেটের ধোঁয়া আনায়া পর্যন্ত ছড়িয়ে এলে, সে বারংবার কেশে উঠছে। তবে নিজেকে যথাসাধ্য সমানে নেবারও চেষ্টা করেছে।
কিন্তু লোকটি তো আর থেমে নেই। তার পাশে থাকা একটা কালো এবং কালচে লাল রঙের সমন্বয়ের একটি গিটার কোলে তুলে নিয়ে—টুংটাং শব্দ করেই গানের সুর তুলতে লাগে। একবার সিগারেটে টান দিয়েই নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করছে, অন্যদিকে আবার গিটার বাজাতে মনোযোগী হচ্ছে। এরপর আচমকাই মা’রা’ত্নক নিরেট-ধাঁধানো কন্ঠে গাইতে শুরু করে,

ও ভ্রমর রে_________________
কইয়ো, কইয়ো, কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া
কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া
মুই কৃষ্ণা______ মইরা যাইমু______
রাঁধা হারা হইয়ারে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া_________
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনরে কালিয়া।
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনরে কালিয়া____
নিভা ছিলো মনের আগুন
কি দিলা____জ্বালাইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।
ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রী___ রাধার বিচ্ছেদের অনলে_______
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া _________

❝ভিভিয়ান এহসান কেনীথ❞—আনায়াকে বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে আসা এই সুদর্শন বলিষ্ঠ দেহের পুরুষের নামই ভিভিয়ান এহসান কেনীথ। কেনীথের বাবা চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ❝ভাহিদ এহসান❞। এছাড়া আনায়া কিংবা আনায়ার পরিবারের সাথেও তার একটা ভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু কেনীথের পরিবার কিংবা আনায়া—দুজনের পরিবারের মাঝের সম্পর্কটা অত্যন্ত জোড়ালো। এক কথায় দু পরিবার একে অপরকে কোনো ভাবেই সহ্য করতে পারে না। যদিও এসব পারিবারিক সম্পর্কের দ্বন্দ্বের কারণটা অনেক পুরোনো।

সুর থেমে গিয়েছে। গিটারের শেষ তারের ঝংকারটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের নিস্তব্ধতায়। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটের শেষাংশটুকু জ্বলজ্বল করে উঠল একবার— তারপর নিভে গেল নিস্পৃহে ।কেনীথ তার লালচে বাদামী ঠোঁটের কোণ হতে সিগারেটের শেষ অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলল নিচে। আগুনের ক্ষীণ ছটা অন্ধকারে এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল। অবশিষ্ট আগুনের ক্ষীণ স্পন্দনটুকু নিঃশেষ হলো কেনীথের কালো জুতোয় পদপিষ্ট হয়ে। কেনীথ এক ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে রইল।
অন্যদিকে এ সব কিছুই আনায়া আড়চোখে দূর হতে খেয়াল করছে। সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়ায় কয়েকবার কেশে উঠলেও নিজেকে যথাসাধ্য সামলে নেয়। তবে তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার বেগ এখনো কমেনি। এরই মাঝে যখন কেনীথ আকস্মিক উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে অগ্রসর হলো—তখনই যেন আনায়া খানিকটা আঁতকে ওঠে। কেনীথের পদশব্দের দৃঢ়তায় আনায়ার গলা শুকিয়ে এলো। আনায়া খেয়াল করে দেখে, লোকটা কেমন যেন পাগলাটে ধরনের। কাধ পর্যন্ত এলোমেলো চুল, অদ্ভুত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে করা কাজকর্ম কিংবা ভাব-ভঙ্গি ; সবই আনায়াকে খানিকটা ভীত করল।

কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে আনায়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যার ফলে আনায়া বিছানার কোণায় নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে কেনীথের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার সাহস জোগাচ্ছে না তার। আনায়া তার ছোট বোন ইনায়ার মতো খুব বেশি সাহসী, দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন কিংবা অন্তত তেজী স্বভাবের নয়। বয়সে আনায়া বড় হলেও সে নিত্যান্তই চুপচাপ, সহজ-সরল মেয়ে। তার চোখে সবসময় যেন এক অপার্থিব ভয় বাস করে।আর পৃথিবী যেন তার কাছে অচেনা এক অরণ্য। খুব বেশি কথা বলে না সে। যেটুকুও বলে তার প্রতিটি শব্দেই এক নির্জন শান্তি,কোমলতা মিশে থাকে। আনায়া খুব বেশি সাহসী নয় বরং কিছুটা ভীতু, কিছুটা লাজুক। তবুও তার উপস্থিতিতে এক ধরণের নিরব শক্তি অনুভূত হয়।
কেনীথ আনায়ার কাছে পৌঁছে তার দিকে হাত বাড়াতে নিলে—আনায়া খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। একইসাথে ইতস্তত ঘাবড়ানো স্বরে বলতে থাকে,

❝আমি বাড়ি যাব।…প্লিজ আমাকে কিছু করবেন না।…আমি বাড়ি যেতে চাই।❞
আনায়া এইটুকু বলেই মাথাটা আরো বেশি নুইয়ে ফেলল।অন্যদিকে ওর এহেন প্রতিক্রিয়ায় কেনীথ কপাল কুঁচকে হাত নামিয়ে নেয়। অতঃপর বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে হালকা কুঁচকে যাওয়া কপালের পাশে, এলোমেলো চুলের মাঝে স্লাইড করতে লাগল।
তার নজর সম্পূর্ণ আনায়ার দিকে। হালকা গোলগাল চেহেরা, কেঁদে কেটে ফর্সা ত্বক পুরো লাল বানিয়ে ফেলেছে। চোখজোড়া একদম ফোলা ফোলা হয়ে গিয়েছে। চোখ গাল সহ পুরো চেহেরায় চোখের পানির সিক্ততায় পরিপূর্ণ। চুলগুলো কেমন এলোমেলো। এতসব কিছু পর্যবেক্ষণের পর কেনীথের মেজাজ আচমকাই বিগড়ে গেল। কপাল থেকে হাত নামিয়ে গাম্ভীর্যের সাথে নিরেট কন্ঠে বলে উঠল,

❝কাহিনি কি? এভাবে কাঁদছিস কেনো? তোকে মে”রেছি আমি? নাকি তোকে মে’রে ফেলতে এখানে নিয়ে এসেছি?❞
আচমকা এহেন গম্ভীর কণ্ঠে, স্তব্ধ ধমকে আনায়া কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। এই লোককে সে মোটেও ঠিকঠাক চেনে না। যদিও তার পরিবারের সাথে এবং তার সাথে অনেক পুরোনো একটা সম্পর্ক রয়েছে—তবুও সবকিছু আনায়ার কাছে পরিষ্কার নয়। লোকটি তার ভালো চায় নাকি মন্দ কিংবা আদতে চাইছে টা কি, তা নিয়েও তো আনায়া নিশ্চিত নয়। আর এটা ঠিক কোন জায়গা তাও তো আনায়ার অজানা। আনায়া কিছু না বলে উল্টো অনবরত কেঁদে চলেছে দেখে, কেনীথ আরো বেশি বিরক্ত হলো। অনেকটা জোরে ধমকে বলে উঠল,
❝হোয়াট দ্য হেল! স্টপ ক্রাইং রাইট নাও, ড্যাম ইট!❞
আনায়া পুনোরায় কেঁপে উঠে,একদম ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল। সঙ্গে ওর কান্নার আওয়াজের প্রকোপও বেড়ে গেল। কেনীথ আরো বিরক্ত হয়। এবার নুইয়ে কাঁদতে থাকা আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই, চিৎকার করে জোর গলায় ডাকতে লাগল,

❞পাভেল!পাভেল!…পাভেল!❞
কেনীথের ডাক শোনা মাত্রই ড্রইং রুম থেকে পাভেল তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো। দরজা খোলাই ছিলো বিধায় বেশি বেগ পেতে হয়নি। পাভেল রুমে ঢুকতেই কেনীথের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
❝কি হয়েছে ব্রো? সব কিছু ঠিকঠাক…❞
তড়িঘড়িতে পাভেলের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তার নজর আনায়ার উপর পড়ায় কথা থেমে গেল। কিছুটা অবাক সুরে ধীর আওয়াজে বলে উঠল,
❝ব্রো! ও তো কাঁদছে… তুমি কিছু করেছো…❞
এবারও পাভেলের কথা শেষ হবার পূর্বেই, কেনীথ গরম চোখে শক্ত মুখে পাভেলের দিকে ফিরে তাকালে—কেনীথের চাহনিতে পাভেল খানিকটা ভড়কে গিয়ে বলল,

❝সরি… কিন্তু হয়েছে টা কি?❞
কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে শক্ত গলায় বলল,
❝ওকেই জিজ্ঞেস কর। তুই না বলেছিলি ও এইচএসসি দিয়েছে। তবে এতো বড় হয়েও এমন ন্যাকা বাচ্চার মতো কাঁদছে কেনো?আমি কি ওকে মে”রেছি?❞
পাভেল কেনীথের এহেন কথায় কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। অন্যদিকে কেনীথের কথা শুনে আনায়া আরো বেশি কাঁদতে শুরু করে। মুখ তুলে আশেপাশে দেখল না ঠিকই, তবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল,
❝বাড়ি যাবো আমি। আমায় বাড়ি যেতে দিন প্লিজ।❞

এবার কেনীথ পাভেলের দিক থেকে নজর সরিয়ে, আনায়ার দিকে তাকিয়ে জোরে ধমক দিয়ে বলে,
❝চুপ!একদম চুপ! কিছু করলামই না তাতেই ন্যাকা কান্না জুড়ে দিয়েছে। আরেকবার কাঁদলে সোজা জঙ্গলের রা”স্তায় ছুঁড়ে ফেলে আসব। তবে গিয়ে তোদের বাপ মেয়ের শিক্ষা হবে,অসহ্যকর!❞
—❝ভাই এসব কি করছো? ও এমনিতেই ভয় পেয়ে বসে আছে। আর তুমিও যদি এখন এমন রাগারাগি করো তবে কিভাবে কি হবে? আমাদের সব প্ল্যান তো বিগড়ে যাবে।❞
কেনীথ ক্ষে”পে গিয়েছে বিধায় পাভেল কেনীথকে এবার থামায়। অন্যদিকে আবার আনায়ার পুরো হেঁচকি উঠে গিয়েছে। ফর্সা চেহেরা, নাকের পাটা, ঠোঁট-গাল সব ফুলে লালচে হয়ে উঠেছে । যদিও খুব বেশি জোড়ে কাঁদছে না তবুও একটু পর পর ওর হেঁচকি ওঠা দেখে কেনীথ যেন আরো বেশি বিরক্ত৷ পাভেল বিষয়টা বুঝতে পেরে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,

❝আচ্ছা তুমি কাঁদছো কেনো? ভয় নেই,আমরা তোমার কিচ্ছু করব না। ব্রো আমার অনেক ভালো।❞
—❝পাভেল!❞
আচমকা কেনীথের শান্ত গম্ভীর কন্ঠস্বরে, পাভেল নিজের কথা থামিয়ে কেনীথের দিকে তাকায়। কেনীথ অদ্ভুতভাবে আনায়ার দিকে স্তব্ধ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ভাবগতিক ঠিক পরিষ্কার নয়। পাভেল খানিকটা ইতস্ততভাবেই বলে উঠল,
❝হ্যাঁ…ভাই।❞
—❝কাজি ডাক।❞
কেনীথের স্পষ্ট কথাটাও যেন পাভেলের কাছে অস্পষ্ট লাগল। কিছুটা তব্দা খেয়ে বলল,
❝কি বললে ভাই?❞
কেনীথ এবার আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই, নিজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বলল,
❝কাজি ডাকতে বলেছি।❞
—❝কাজি? বিয়ে পড়ায় যে সেই কাজি? কিন্তু তাকে দিয়ে এখন কি হবে?❞
কেনীথ কিছুটা রাগের সাথেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অন্যদিকে আনায়ার কান্না কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। হয়তো সে পাভেল ও কেনীথের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে। কেনীথ বিষয়টা ভালোই বুঝতে পারে। কিঞ্চিৎ মুচকি বাঁকা হেসে পুনোরায় শক্ত গলায় বলে উঠল,
❝কাজি ডাক, বিয়ে করে আজই বাসর সারবো।❞

জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিউনিখের,ঐতিহাসিক হিলার প্ল্যাটজ স্কয়ার আজ রাতের আঁধারে এক রূপান্তরিত থিয়েটারে পরিণত হয়েছে। মূল চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে এক বিশাল মাল্টিলেভেল স্টেইজ—যার ব্যাকড্রপের কালো স্ক্রীনে লাল রঙের ধোঁয়াচিত্র এবং ‘BLOODEN’-এর আগুন রাঙা লোগো, আলতোভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে।

চারপাশ ঘিরে লাগানো হয়েছে সার্কুলার ট্রাস-এর সঙ্গে সংযুক্ত রেড, ম্যারুন এবং ব্ল্যাক টোনড স্টেজ লাইটিং। যা চলন্ত ফগ মেশিন থেকে বেরোনো কৃত্রিম ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দর্শক সারিতে। ছাদ বরাবর ঝুলছে মাল্টি-অ্যাক্সিস মুভিং হেড স্পটলাইট। যেগুলোর রিদম ডিজিটাল লাইটিং কনসোল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি বেজ ড্রাম বিট-এর সঙ্গে একেকটি সাইড ফায়ার জেট উঁচু করে ছুড়ছে আগুনের লালচে ঝাঁঝ।
মঞ্চের মধ্যমণিতে দাঁড়িয়ে তিনটি অস্তিত্ব, তিনটি মানব ছায়া—ভ্যাম্পয়ার কেনীথ, পাভেল হান্স ও নায়রা ইমানি। যারা একত্রে ও সংক্ষেপে এই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে ❝VPN❞ কিংবা ❝VIP❞ নামেও পরিচিত। তবে তাদের মূল ব্র্যান্ডের নাম ❝ব্লাডেন❞।

কিন্তু সবচেয়ে সামনে ও মধ্যেস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি যেন দর্শকের কাছে একটু বেশিই আকর্ষণীয়। বাঙালি হয়েও,বিদেশি কোনো এক মা”রাত্মক এ্যাকশন ফিল্মের হিরোর ন্যায় বলিষ্ঠ দেহের গড়ন,চওড়া চেস্ট, থেমে থেমে ওঠা শ্বাসে কাঁপতে থাকা অ্যাবস, আর উঁচু বাইসেপস—সবই যেন দর্শকের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছয় ফুট উচ্চতার বলিষ্ঠ দেহের ব্যক্তির দুই বাহু…বিশেষ করে মাইক্রোফোন ধরা হাতটা যখন, উপরের দিকে তোলে—তখন তার ট্রাইসেপস আর বাইসেপস আলোর ছায়ায় আরো প্রকট হয়ে ওঠে।
বাম হাতের কব্জিতে দৃশ্যমান—কালো রঙের ব্রেইডেড লেদার ব্রেসলেট।এবং কবজির ওপর ফর্সা ত্বক ভেদ করে দৃশ্যমানভাবে ছড়িয়ে থাকা, হালকা নীলচে রঙের ভেইন ম্যাপিং…তার শরীরের ভেতরের উত্তাপের সুনামকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।চালচলনে তার কন্ট্রোলড রিদম। না বেশি ধীর, না অতিরিক্ত জোরালো। পায়ের পেশিগুলো স্কিন টাইট ডেনিমএর নিচেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ক্যাফ মাসল, থাই মাসল, এমনকি হাঁটুর পাশেও থাকা শক্ত খাঁজগুলোও স্পষ্ট। পায়ের পরনে কালো রঙের হেভি হাই গ্রিপড বুট। যা স্টেজে ট্যাক করে হাঁটলে লোহা ঠুকার ন্যায় শব্দ করছে।

এছাড়াও গায়ে ব্ল্যাক স্কিনি টিশার্ট। তার ওপর জড়ানো লাল-কালোর মিশ্রনে লেদারের স্টাডেড রকার জ্যাকেট। যার হাতার মাথায় রিভেট লাগানো। পিঠের পাশটায় স্পষ্ট লাল রাঙা র*ক্ত ও কালো রঙের ভ্যাম্পায়ার উইং এ ডিজাইন করা। এবং উপরের দিকটায় স্পষ্ট ভাবে বড় আকারে লেখা ❝V.K.❞। এবং কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত কালো রঙের স্লিম কাট ওয়াশড ডেনিম ট্রাউজার।
মাথার ডার্ক কফি ব্রাউন কালারের চুলগুলো হালকা কার্লি—পেছনের অর্ধেকটা এলোমেলোভাবে টাইট বান করে বাঁধা। সামনের চুলগুলো ফ্রন্টফলেন। খোলা রাখায় একপাশের কপাল ঢেকে চোখ ছুঁয়ে আছে। ঘামের ছোঁয়ায় আরও নরম হয়ে, গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে।তার এক হাতে শক্তভাবে ধরা কার্ডিওয়েড মাইক্রোফোন। অন্য হাতে গিটার নেই, কারণ আজ সে শুধুই লিড ভোকাল। চোখে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চাহনি। আছে শুধু অদৃশ্য অগ্নি উত্তাপ, ঠোঁটে জমে থাকা এক দীর্ঘ অপ্রকাশিত হুং*কার।

ভিকের বাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপার্থিব সৌন্দর্যের এক রমণী—নাম তার নায়রা ইমানি। ফর্সা রঙের গায়ের ত্বক,দৃঢ় চোয়াল,তীক্ষ্ণ চাহনি—কোনো সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী রাণীর ন্যায় তার অভিব্যক্তি। গায়ে ফিটেড ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট। কোমর থেকে সোজা নেমে যাওয়া হাই ওয়েইস্ট স্কিনি জিন্স, আর পায়ে কালো রঙের হিলড অ্যানকেল বুট। তার ফ্লাফি-সিল্কি ডার্ক ব্রাউন-গোল্ড কালারের দীর্ঘ চুল কোমর পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। ঝড়ের তালে এলোমেলো হয়ে ছুটছে বাতাসে।
হাতে ব্যাকআপ ভোকাল মাইক্রোফোন—তবে সে আজকে শুধুই ব্যাকআপ নয়, ভিকের সুরে সুর মেলানোর অঙ্গীকারে তার চোখেও রয়েছে কণ্ঠের দৃঢ়তা।

এছাড়া ভিকের ডানপাশে রয়েছে কোঁকড়ানো এক ঝাক চুল বিশিষ্ট, বিদেশিদের ন্যায় ফর্সা গড়নের, উঁচু-লম্বা বলিষ্ঠ দেহের পাভেল হান্স। হাতে তার ডুয়াল-পিক ইলেকট্রিক গিটার। গায়ে স্লিভলেস নেভি টোনের টিশার্ট। স্টেইজের উপরে,পেছনের দিকে এক কোণায় তার জ্যাকেট পড়ে রয়েছে । সে প্রধানত রিদম গিটারিস্ট,তবে বিশেষ মুহূর্তে তার হাতে ফিঙ্গার পিকিং স্টাইলের গিটার সোলো শ্রোতাদের অস্থি কাঁপিয়ে দেয়।
এবং যখন তিনজনের সম্মিলিত লাইভ সেশন ট্র্যাক শুরু হয়, চারপাশের হাই-পাওয়ার্ড অ্যামপ্লিফায়ার সিস্টেম থেকে যে ড্রাম কিক, গিটার রিফ আর লিড ভোকাল রিভার্ব প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে.. তখন দর্শকসারির মধ্যে একে একে নিঃশ্বাস আটকে আসার ন্যায় উত্তেজনার সমাহার মেলে। যথারীতি আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
হাজারো মানুষ লাইভ মিক্সিং টাওয়ার ঘিরে উত্তেজনায় চিৎকার করছে—”VPN!, VK!, VIP, Blooden, V.K.!!” চারদিকে ফোন ফ্ল্যাশ, লেজার বিম, আর কনফেটি ক্যারেন—সব মিলিয়ে যেন ধ্বংস ও সৃষ্টির সন্ধিক্ষণে গড়ে উঠছে এক সংগীত-সাম্রাজ্য।

তবে দৃশ্যত, নায়রার চোখে কিছুটা অস্থিরতা।তাদের কনসার্ট প্রায় শেষের দিকে। রাতটাও অনেক হয়েছে। হাতে বেশি সময় নেই।তাদের আজ রাতের এক বিশেষ ও নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা—তার মনে পড়ে যাচ্ছে বারংবার। তাই নির্ধারিত তিনটি ট্র্যাক শেষ হতেই, সে পাভেলকে চোখের ইশারায় ইঙ্গিত করে। তারা দুজন একসঙ্গে শ্রোতাদের দিকে স্টেজ বো করে, সাইড র‍্যাম্প হয়ে নিজেদের পার্কিং করা কারের দিকে এগিয়ে যায়।
মঞ্চ তখন নিঃশব্দ, আলো ক্রমশই নিভে আসে। শুধুমাত্র স্টেজের মধ্যেস্থানের এক কোণে রক্তবর্ণের স্পটলাইট জ্বলে ওঠে। আর সেই অন্ধকারের নিচে, দাঁড়িয়ে থাকে সবার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ভ্যাম্পায়ার কেনীথ। রক্ত*পিপাসু রাক্ষস না হয়েও, সে সকলের জন্য এক মা’রাত্মক উন্মা’দনার নাম। নিঃশব্দে স্থির হয়ে, মাথা নিচু করে মাইক ধরে রয়েছে। সময় যে বেশি একটা নেই—তা তারও জানা।একটানা এতোক্ষণ কনসার্ট শেষে বাকিদের মতো সেও ক্লান্ত। তবে তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে বোঝার কোনো উপায় নেই। কেনীথের নিশ্বাস বারংবার থেমে আসছে। একই সাথে দর্শক-শ্রোতার মাঝেও যেন উত্তে”জনা, উচ্ছ্বাসের উত্তাল ঢেউ ততই বেড়ে চলেছে।

পাভেল আর নায়রা চলে যেতেই তারা বুঝে গিয়েছে কনসার্ট শেষ।তবে ব্লাডেনের কনসার্ট শেষ তথা পুরোপুরি সম্পূর্ণ তখনই হবে, যখন ভিকে তার বিশেষ ও সিগনেচার গানটা গাইবে। জার্মানির এই নগরে কম বেশি সকলেই বিদেশি ও ভিন্নভাষী হলেও — ভিকের এই সিগনেচার বাংলা গানের প্রতি তাদের আকর্ষণ আকাশচুম্বী। যে কারণে কখনো কখনো কেনীথকে একপ্রকার বাধ্য হয়ে হলেও, কনসার্টের শেষপ্রান্তে তাকে এই গান গাইতে হয়।
চারপাশ জুরে সকলের তীব্র উচ্ছ্বাসিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে।কেনীথের চুলগুলো আলতোভাবে সামনের দিকে হেলে পড়েছে। হালকা লালচে বর্নের চোখের মণিজোড়া, অদ্ভুত রহস্যে উজ্জীবিত। একটা সময় পর, সেও গভীরভাবে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নেয়। চোখজোড়া বুঁজে নেয় নিঃশেষে। অতঃপর আচমকাই সকলের অনুভূতিকে তীব্র ঝড়ে পরিণত করতে, হঠাৎ তার বলিষ্ঠ শরীরটাকে ক্রমশই পেছনে হেলিয়ে, ঘাড়টাকেও পেছনের দিকে বাকিয়ে, দীর্ঘ নিশ্বাসের টানে গেয়ে ওঠে,

“ও ভ্রমর রে___________”
বিশাল স্টেজের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে শরীর পেছন বরাবর বাকিয়ে—একটানা সুর তুলে গিয়েছে কেনীথ।পুরো সময়টাই যেন মানুষের মাঝে, ঘোর লাগানো এক অনুভবের উত্তাল ঢেউয়ে ভাসিয়েছে। প্রায় মিনিট খানেক পর ধীরে ধীরে সে পুনোরায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গানের পরবর্তী অংশ গাইতে শুরু করে।
❝কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া,
কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া,
মুই কৃষ্ণ মইরা যাইমু, রাঁধা হারা হইয়ারে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া।❞

চারপাশে ভক্তদের পাগলামি, হাজার হাজার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, আর নিঃশব্দে মোড়ানো শহর—সবমিলিয়ে চারপাশের আবহ শহরের আর পাঁচটা রাতের মতো নয়৷ আজ রাত, নিত্যান্তই বিশেষ।এদিকে কনসার্টের বাহিরে, নিজেদের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাভেল আর নায়রা।
কনসার্ট হতে মানুষের তীব্র উচ্ছ্বাসের আওয়াজ আর ভিকের কন্ঠে তারা দুজনেই মুচকি হাসে।এছাড়া তাদের ঘিরে খানিকটা দূরে দূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, সারি সারি নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কালো পোশাক পরিধানরত বডিগার্ড। কিন্তু তাদের পরিচয়টা মূলত রকস্টার কিংবা ❝ব্লাডেন❞ মিউজিক ব্র্যান্ডের সদস্যতেই সীমাবদ্ধ নয়৷ তাদের এই ❝ব্লাডেন❞ নামেই নিজস্ব এক বিশাল কোম্পানি রয়েছে। যার পুরোটাই কেনীথ, নায়রা ও পাভেলের। অর্থাৎ তিনজেই একে অন্যের বিজনেস পার্টনার হয়ে কোম্পানি পরিচালনা করে।

কিন্তু শুধু জার্মানির বড় বিজনেস পিপলস ব্যতীতও তাদের আরো কিছু পরিচয় হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম পরিচয়—❝কার রেসার❞। তবে এই পরিচয়টা কেবলমাত্র সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়, বরং জার্মানির অন্ধকার ও বিলাসবহুল আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং ক্লাবগুলোর জন্য তাদের আলাদা এক নাম, আলাদা এক ভীতি রয়েছে। যা কখনো কখনো “VPN”,”VIP” কিংবা “ব্লাডেন গ্যাং” নামেও পরিচিত।
এই “VPN” কিংবা “VIP” নাম দুটি এসেছে তাদের নামের আদ্যাক্ষর থেকে—(V)ampire Kenneth, (P)avel Hans, (N)ayra (I)mani । বাইরের জগতে যেখানে তারা একেকজন সফল ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা ও জনপ্রিয় মিউজিশায়ন—সেখানেই এই সিক্রেট ওয়ার্ডে তারা ভয়ং’ক’র প্রতিদ্ব’ন্দ্বী, গতির রক্তমদে ভেজা এক ত্রিমূর্তি।

জার্মানির মিউনিখ শহরের অন্ধকার ও জৌলুসের দ্বৈতধর্মী প্রান্তরে গড়ে ওঠা এক রহস্যময়, উচ্চবুদ্ধিসম্পন্ন এবং বহুমাত্রিক ব্যক্তি হিসেবেই পরিচয় গড়ে এই ভ্যাম্পায়ার কেনীথ। উচ্চমেধাসম্পন্ন এক বাংলাদেশি যুবক হিসেবে সে এসেছিল মিউনিখ টেকনিকাল ইউনিভার্সিটিতে, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার প্রতিভা বিস্ফোরিত হয় নানা ক্ষেত্রে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টের মাধ্যমে তার প্রথম পরিচয় ঘটে মার্সিডিজ বেঞ্জ-এর সঙ্গে। যেখানে তার রিসার্চ আর ডিজাইন স্কিল দেখে মুগ্ধ হয়েছিল মার্সিডিজ ব্রান্ড। এক্ষেত্রে তার অনেক বেশি সাহায্য করেছিল, ভার্সিটির কিছু প্রফেসরও।

তার স্পেশাল পারফরম্যান্স কনসেপ্ট ডিজাইন…যেটা ছিল উচ্চ গতির গাড়ির স্ট্যাবিলিটি, অ্যারোডাইনামিক ও টর্ক কন্ট্রোল নিয়ে — সেটাই মার্সিডিজ এর প্রোটোটাইপ টিমে সিলেক্ট হয়।
এরপর কেনীথকে তারা প্রোজেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে ডেভেলপমেন্ট রোল এ নিয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে তার উপর তারা ভরসা করতে শুরু করে। এখান থেকেই কেনীথের জন্য খুলে যায় স্পেশাল স্পনসর রেসার প্রজেক্ট। মার্সিডিজ তাকে তাদের এক্সট্রিম পারফরম্যান্স লিমিটেড (EPL) সিরিজে ট্রেনিং দেয়। যেখানে কেবলমাত্র স্পনসরড পেশাদার রেসারদের নিয়ে বিশেষ প্রস্তুতি হয়। এবং বর্তমানে সে একজন মার্সিডিজের সফল ও প্রোফেশনাল স্পনসর রেসার। দেশের সবচেয়ে বড় রেসিং ইভেন্টে যেন তাকে থাকতেই হবে।

আর এভাবেই…প্রথমে গবেষণা সহকারী, পরে ডিজাইন কনসালটেন্ট, রেসার এবং এক পর্যায়ে ব্র্যান্ডের স্পেশাল এক্সটেনশন সিরিজের যৌথ নির্মাতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা ঘটে। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় তার রেসিং লাইফ। মার্সিডিজের অনুমোদিত “V-Kore” নামক এক কাস্টম বিল্ট সিরিজে কেনীথ নিজেই গঠন করেন সীমিতসংখ্যক হাই-পারফরম্যান্স এর সকল গাড়ি। যার মাঝে জি-ক্লাস সহ নানান ব্লাক এন্ড রেড ইন্টরিয়র সম্পূর্ণ SUV উল্লেখযোগ্য। অবশ্য এই V-kore নামটাও তার নামের প্রেক্ষিতে গঠিত।
VK হলো তার নামের সংক্ষিপ্ত রূপ আর সেটাকেই আরেকটু সাজিয়ে সে… Core(আত্না) এর C এর পরবর্তীতে K ব্যবহার করে তৈরি করে V-Kore সিরিজ। যেগুলোর রঙ, ফিচার এবং নেমিং পুরোপুরি তার ব্যক্তিত্ব বহন করে। তার আরো একটি নিজস্ব সিরিজ—Vampire Series। কালো ও রক্তরাঙা লাল রঙের অভ্যন্তরের এক নান্দনিক মিশেল।এক্সক্লুসিভ ব্ল্যাক-রেড কম্বিনেশন কার কালেকশন, যার প্রত্যেকটি ডিজাইনে তার সর্ট নেইম ‘VK’ ও ভ্যাম্পায়ার উইংসের অনুপ্রেরণা রয়েছে।

প্রথমে প্রোজেক্ট এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করলেও, পরে তার এই উদ্ভাবনী এক্সপেরিমেন্ট—❝V-Kore❞ ও “Vampire Series” এর ধারণা, তাকে সরাসরি সংযুক্ত করে ব্র্যান্ডের স্পেশাল ভেইকেল ইউনিটে। এখান থেকেই শক্তপোক্ত ভাবে শুরু হয় ভ্যাম্পায়ার কেনীথ তথা ভিকের যান্ত্রিক জীবনের প্রফেশনাল যাত্রা।
রাতের অন্ধকারে সে নিজের ডিজাইন করা ব্ল্যাক-রেড কাস্টম মার্সিডিজ জি-ক্লাস SUV চালিয়ে অংশ নেয় জনসম্মুখ ও গোপন সকল রেসিং ইভেন্টে।এই দুনিয়াটা ঠিক যেন অলিগলি দিয়ে গঠিত এক রাজ্য। তার রেস হয় শহরের প্রান্তে, কখনো কোনো বিশাল ক্লাবে কিংবা পরিত্যক্ত বিমানবন্দরে, আলপস পর্বতমালার নিচে টানেলের ন্যায় কোনো পথে। আর এসবের মাঝেই আলো-আঁধারের খেলায় ছুটে চলেছে সে ও তার দৈত্যাকার যন্ত্রগুলো।

নায়রা ইমানিও এই জগতের বাইরে ছিল না।নায়রা লিড ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে।তার হাতে কালার, কাঠামো, এবং স্পিড ফ্লো-ভিত্তিক আইডিয়া দিয়ে গাড়িগুলোর এরোডায়নামিক্স ও লুক চূড়ান্ত রূপ পায়। সে নিজেও মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্টুডেন্ট এবং কেনীথের ভার্সিটি লাইফের ব্যাচমেট। তবে একজন সফল ইন্জিনিয়ার হবার ও কেনীথের ন্যায় রেসার হবার পাশাপাশি, সে এখন ব্লাডেন কোম্পানির জন্য বিউটি ব্রাঞ্চে স্কিন-কমপ্যাটিবল প্রোডাক্টস নিয়েও কাজ করে চলছে। তবে কেনীথ আর নায়রার বয়সে অবশ্য বেশ খানিকটা তফাৎ-ও রয়েছে।
এছাড়া বহু আগেই নায়রা প্রথম ড্রাইভিং শিখেছিল প্যারিসে। কেনীথের মতো ছোট থেকেই তার গাড়ির প্রতি প্যাশন রয়েছে। এবং তখন থেকেই সে পরিচিত ছিল ❝রেসিং প্রিন্সেস❞ নামে। আর সে রেসিং কুইন। কেনীথের মতো তারও রয়েছে নিজের ডিজাইন করা মডিফায়েড গাড়ি ব্লাড ফ্লেম (Blood Flame)। যা এক মারাত্মক সুন্দর ও দ্রুতগামী গাড়ি। যার ভিতরে বসেই সে মেকানিক, মডার্ন আর মিউটিনাস নারীত্বের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। কেনীথের পার্টনার হিসেবে তার অবস্থান সর্বদা শীর্ষে।

অন্যদিকে পাভেল একটু তাদের চেয়ে আলাদা। পাভেল একজন টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারি হলেও—সে মূলত একজন বাইকার। KTM Super Duke বা Ducati Monster-এর মতো হিংস্র বাইকের পেছনে তার হাত মানেই, মৃত্যু আর মুক্তির মাঝখানে এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ। অথচ এই জগতে সে এক বিধ্বংসী ঝড়ের ন্যায় বাজপাখির রূপে পরিচিত হলেও—অন্যান্য সময়ে তার পাগলামি চালচলন, বোকা-সোকা কথা কিংবা অভিব্যক্তিতে তা বোঝার কোনো উপায় নেই।

তাদের রেসগুলো কখনো একসাথে হয়, আবার কখনো একে অন্যের বিরুদ্ধে।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ভিডিও, তাদের মুভমেন্ট, সবকিছু থাকে গোপন। শুধুমাত্র নির্বাচিত কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড মিলিয়নিয়ার রেসিং স্পনসর ক্লাব এবং ইউরোপের হাই-প্রোফাইল ব্ল্যাকমার্কেট ক্লায়েন্টস্ই বেশিরভাগ সময় তাদের রেস দেখতে পায়। এর অন্যতম একটি কারণ হলো,এসব বিষয়ে তারা নিজেদের যতটা পারে মিডিয়ার জগৎ হতে দূরে রাখতে চায়।
কেননা এসবের বাহিরেও তাদের প্রফেশনের শেষ নেই। যেন একেকজন একেকটা সফল বহুরূপী। এই তিনজনের বন্ডিং, জ্ঞান, আর স্বপ্ন একত্র হয়ে জন্ম দিয়েছে এক রহস্যঘেরা অথচ পরিশীলিত ইন্ডাস্ট্রির—ব্লাডেন(Bløoden) এর। নামটি এসেছে কেনীথের ও তাদের পছন্দ অনুযায়ী ‘ব্লাড’ ফেটিশ, ডার্ক রোম্যান্টিক ফ্যান্টাসি এবং প্রতিশোধস্পৃহা থেকে।

ব্লাডেন কোনো সাধারণ কোম্পানি নয়। এটি একাধিক শাখায় বিভক্ত, যার প্রতিটি ব্রাঞ্চে VPN নামক এই তিন ট্রিও-র নিজস্ব ছাপ রয়েছে। তথা এটাকে ইন্ডাস্ট্রি বললেও ভুল হয় না। কোম্পানির মূল শাখা শুরু হয় অটোমোটিভ কাস্টম ডিভিশন দিয়ে। যেখানে কেনীথের ডিজাইন করা মার্সিডিজ কাস্টম রেসিং কারগুলো সীমিত সংখ্যক বিল্ড হয়ে ব্লাডেনের লাইনআপে অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই গাড়িগুলো শুধুমাত্র জার্মানির অভিজাত ও ব্যয়বহুল সকল সিক্রেট রেসিং ক্লাবগুলোর জন্য নির্মিত হয়।আর কিছু সিগনেচার স্পেশাল কাস্টমাইজড কার তৈরি হয় তার জন্য। যার ফলে V.K. তথা Vampire Kenneth–এর নাম মিউনিখের আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং সোসাইটিতে আজ এক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। অবশ্য এইজন্য তাকে দ্য কিং অব ব্লাডেনও বলা হয়।

অন্যদিকে পাভেল গঠন করে Bløoden Textile Lab, যেখানে প্রিমিয়াম ও স্মার্ট ফেব্রিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তারা কয়েকটি সিগনেচার কালেকশন তৈরি করে।যেমন, ফায়ার-প্রুফ রেসিং স্যুট, বা ব্লাড-মার্কড হুডিজ যার ডিজাইন ভিন্নধর্মী ও সাংকেতিক।এবং যা পরবর্তীতে ক্রিপটেড মেসেজের মতো কাজ করে VPN গ্রুপের জন্য। এছাড়া কোম্পানির সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার প্রয়োজনীয় সবচেয়ে বেশি। কারণ তাকে বলা হয়, দ্য মাইন্ড অব ব্লাডেন।অর্থাৎ তার চিন্তাভাবনাকেই এখানে বেশি গ্রাহ্য করা হয়েছে, এবং এতে ব্লাডেন আজ সফল প্রতিষ্ঠানে হয়ে উঠতে পেরেছে।

অন্যদিকে নায়রা গড়ে তোলে ব্লাডেন বিউটি এন্ড স্কিন কেয়ার—নামের একটি উপশাখা। যেখানে হাই-এন্ড, স্কিন-সেফ মেকআপ এবং পারফিউম তৈরি হয়। তার সবচেয়ে সফল প্রজেক্ট, ব্লাডেন পারফিউম। যা মূলত তৈরি হয়েছিল কেনীথের কনসেপ্টেই। অনেকটা তাজা র’ক্ত জাতীয় তরলের ন্যায় এর সুগন্ধি। একইসাথে এটি অত্যধিক পরিমানে এক্সপেন্সিভ ও চাহিদাসম্পন্ন হলেও, এর উৎপাদন হয়েছে আজ অব্দি খুব অল্প পরিসরে।
অথচ তবুও এটা তাদের প্রজেক্টের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পন্য।এর অন্যতম একটি কারণ—এটি ভিকের নিজস্ব ব্যবহৃত। ফলাফল—ইউনিক কনসেপ্টের প্রোডাক্ট, ভিকের অত্যধিক উম্মাদ সকল ভ’ক্ত আর হাই স্ট্যাটেজিতেই আজ এটির অবস্থান শীর্ষে। এছাড়া কোম্পানির টেকনলোজি সহ বিভিন্ন সেক্টরে নায়রার প্রভাব বিস্তৃত বিধায়,সে আজ দ্য কুইন অব ব্লাডেন নামে অভিহিত।

তিনজনের এই যৌথ উদ্যোগেই ব্লাডেন আজ জার্মানির একটি সীমিত-গোষ্ঠীগত…অথচ উচ্চতর নামকরা প্রতিষ্ঠান।যাকে একাধারে কোম্পানি এবং কালচারাল সাবভারসিভ ইন্ডাস্ট্রিও বলা চলে। এটি বাস্তবিকভাবেই সম্ভব হয়েছে, কারণ জার্মানি নতুন স্টার্টআপ ও এক্সপেরিমেন্টাল ডিজাইন সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক। বিশেষ করে যদি তাতে রিসার্চ ও বিলাসবহুল প্রোডাক্টের সম্ভাবনা থাকে। তাদের প্রতিষ্ঠান আইনি অনুমোদন নিয়ে ছোট ছোট বিশেষায়িত ইউনিটে ভাগ হয়ে কাজ করছে—প্রতিটি ইউনিটে সীমিত কাস্টমার, উচ্চমূল্যের পণ্য এবং এক ধরনের কাল্ট ব্র্যান্ডিং–যা কোম্পানিটিকে এক্সক্লুসিভ অথরিটি তে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।
সারাংশে, ব্লাডেন হচ্ছে এমন একটি বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান। যা রেসিং, ফ্যাশন, অভিজাত , প্রযুক্তি, রোমাঞ্চ, এবং আত্মবিরোধী ডার্ক সাইকোলজি…এর মিশেলে গড়ে উঠেছে। এবং এর প্রতিটি শাখা এই তিনটি চরিত্রের আত্মপরিচয়েরই প্রতিফলন।ব্লাডেনের কিং,কুইন এন্ড মাইন্ড—তিনটি বিশেষ প্রতীকেই তাদের অস্তিত্ব বিরাজমান। আর এটাই হলো কেনীথের জগৎ। যেখানে নায়রা আর পাভেল তার বিশেষ সহযাত্রী।

স্টেজের আলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে। মিউজিকের গর্জন স্তিমিত হলে, শেষ মুহূর্তে দুই বাহু ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কেনীথ—দর্শকদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়।তার ঠোঁটে হালকা এক প্রশান্তির হাসি। হাজারো দর্শকের হাত তালি আর চিৎকারে উগ্র হয় রাতের আবহ। কণ্ঠে কিছুই না বললেও, নিঃশব্দ বিদায়ে সে রেখে যায় এক তীব্র উপস্থিতি। স্পটলাইট নিভে গেলে সেও সরে যায়।
স্টেজ থেকে বেরিয়ে কেনীথ সোজা পেছনের গ্যারেজে চলে আসে। কেননা সামনে এখন দর্শক আর মিডিয়ার রমরমার উত্তেজনা। মেইন গেইট দিয়ে বের হতে চাওয়া মানে, গৃহযুদ্ধের ডাক দেওয়া। আর এইসময় এসবে টাইমওয়েস্ট করার মতো তাদের নূন্যতম সময় নেই।
কেনীথকে দেখেই বডিগার্ডগুলো সারিবদ্ধ হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। কেনীথ আশেপাশে না তাকিয়েই সোজা তাদের পার্কিং করা গাড়িতে চলে আসে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে Boolden V-Kore Blackfire AMG এর ভ্যাম্পায়ার এডিশন। মার্সিডিজের স্নিগ্ধ অথচ হিংস্র চেহারার এক রেসার কার। যেটার বাইরের অংশ পুরো কালো হলেও ভেতরের লেদার ফিনিশিং রক্তের মতো লাল। স্টিয়ারিং-এ পাশাপাশি দুটো লোগো।একটা মার্সিডিজের আরেকটা V-Kore এর ভ্যাম্পায়ার উইং।

কেনীথ গাড়ির দরজা খুলতেই দেখে, নায়রা সামনের ডান সিটে বসে রয়েছে। চুলগুলো পেছনের দিকে শক্ত ঝুঁটি করে বেঁধে ফেলেছে। বাম হাতে ছোট্ট একটা মিরর মুখের সামনে ধরে—ডান হাত দিয়ে খুব সতর্কের সাথে কড়া ডার্ক রেড শেডের লিপস্টিক লাগাচ্ছে।
এটা তার সবচেয়ে প্রিয় লিপস্টিক শেড। সে যত রকমের ড্রেসই পড়ুক না কেনো, তার ঠোঁটজোড়ায় এই ব্লাডেন বিউটির ডার্ক শেডের লিপস্টিক থাকাটা যেন বাধ্যতামূলক। এটা যেমন তার নিজস্ব সৌন্দর্য ও স্টাইলকে চিহ্নিত করে, তেমনি বিভিন্ন হাই-সোসাইটির মিডিয়া ইভেন্টে গিয়ে, ফ্রিতে ব্রান্ডের প্রমোশনও হয়ে যায়। মূলত এসব ছোটখাটো বিজনেস ট্রাটেজি তারা সর্বক্ষেত্রেই ব্যবহার করে থাকে।

নায়রা হতে চোখ সরাতেই, কেনীথের নজরে পড়ে ব্যাকসিটে বসে থাকা পাভেল উপর। জ্যাকেটের পরিবর্তে এ্যাশ কালারের হুডি পড়ে বসে রয়েছে। এক হাতে মোবাইল স্ক্রল করছে, অন্য হাতে বড় এক প্যাকেট চিপস।
কেনীথ নজর সরিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে, ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। দুহাতে V.K. ও ব্লাডেনের ভাম্পায়ার উইং বিশিষ্ট কালো ও লাল রঙের লেদার গ্লাভস পড়ে নিতে লাগে। এরইমাঝে পেছন হতে পাভেল তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে,চিপসের প্যাকেটটা সমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

—❝বিগ ব্রো! খাবে নাকি?❞
কেনীথ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে নিরেট স্বরে বলে,
❝নাহ।❞
এদিকে গাড়ির স্টার্ট হচ্ছে দেখে, পাশ থেকে নায়রা কিঞ্চিৎ চোখ রাঙিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। তবে বিশেষ কিছু না বলেই, ভারী শ্বাস ফেলে তার লিপস্টিক দেওয়ায় সমাপ্তি ঘটায়। ওমনি পাশে না তাকিয়েই কেনীথ বলে,
❝সুইঠি!❞
নায়রা কিছুটা বিরক্ত হয়ে, বুকে হাত গুঁজে, গম্ভীর্যের সহিত সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। কেনীথের ডাক শুনে, সে আবারও ভারী শ্বাস ফেলে। আলতোস্বরে নিস্পৃহে বলে,

❝হুম।❞
—❝কিছু না।❞
আচমকা ডেকেও, কেনীথের “কিছু না” বলা ব্যাপারটা, নায়রায় কাছে কিছুটা সন্দেহের। সে কিঞ্চিৎ পরিমানে ভ্রু কুঁচকে খানিকটা কাঁধ বাঁকিয়ে পাশে ফিরে একপলক কেনীথকে দেখে। পরক্ষণেই মনে মনে সন্দেহের সাথে আওড়ায়,
❝ব্যাপারটা কি হলো? ডেকেও কিছু বলল না? এই ভি আবার আমাকে না জানিয়েই, কোথায় কি করে এসেছে?❞
নায়রার এমন সন্দেহজনক চিন্তাভাবনার মাঝেই কেনীথ নিঃশব্দে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ির ইঞ্জিন এমনভাবে গর্জে ওঠে যেন, চারপাশের আবহকে নিমিষেই কাঁপিয়ে তুলছে। প্রচন্ড তীব্র গতিতে রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে, গাড়ি ছুটে চলে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে পাভেল বলে ওঠে,
❝ব্রো! ফাস্ট চালাতে হবে। নয়তো ঐ ডাফার সাইকেল জ্যাক আবার হাঁসের মতো প্যাক প্যাক শুরু করবে।❞

রাত এখন বেশ গভীর। মিউনিখ শহরের মূল কেন্দ্র থেকে খানিক উত্তরে অবস্থিত Freimann(ফ্রিম্যান) এর এক পুরনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল শেড এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কার কালচার ক্লাব।দিনের আলোয় এটি হয়তো একটি পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি এলাকা। কিন্তু রাতে এখানে জমে উঠে ভিন্ন এক জগত—জার্মানির বৈধ অথচ ডার্ক এলিট রেসিং কালচার।
এই ❝ব্লাকসার্কেল গ্রাউন্ড❞ হলো একটি পুরনো ফ্যাক্টরির বিশাল খোলা স্পেস। রাত নামলেই যা রূপ নেয় এক রহস্যময় রেসিং ও কার-স্টান্ট এর মেলায়। এখানে একসাথে লাল-সাদা ধোঁয়া, হালকা মিউজিক, কৃত্রিম লাইটস আর তীব্র গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন মিলে তৈরি করে এক আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড বাস্তবতা।

চারদিকে আগুনের ন্যায় লাল নীয়ন লাইট। সারি সারি স্ট্যান্ডিং রিং স্পট-এ গোল করে দাঁড়িয়ে আছে দর্শক। তাদের মাঝে মাঝে স্পটলাইটের মতো একেকটা স্পোর্টস কার ঘুরছে। তার রিম ঝলমল করছে সাউন্ড বিটে, কখনো পেছনের এক্সজস্ট থেকে বেরোচ্ছে লালচে আগুনের ঝাঁঝ।মাঝখানে একটা ওভাল রেসিং স্পেস ঘিরে সারি সারি মানুষের উন্মাদনা। কেউ কার হুডের ওপর বসে, কেউ হুইল স্পিন ঘুরাচ্ছে, আবার কেউ স্মোক তুলে রেসিং স্টান্ট দেখাচ্ছে।আর এখানেই আজকের স্পেশাল নাইট—❝ব্যাটল অফ থ্রোনস❞।

আর এসবের মাঝে, স্কয়ারের এক কোণায় দাঁড়িয়ে মাইকেল জ্যাক, চোখে সানগ্লাস, হাতে হুইস্কি গ্লাস। বেশভূষায় রেসিং সুট। দেখতেও খাঁটি বিদেশী। চুলগুলো ব্রাউন কালার, চোখের মণি খানিকটা সবুজ প্রকৃতির।
জ্যাকের আশেপাশে ঘিরে রয়েছে তার টিম। সকলের মতো তারাও VPN এর অপেক্ষায়। কেননা এই রেসিং দুনিয়ায় কেনীথদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এই জ্যাক ও তার টিম।ফলাফলস্বরূপ মাইকেল জ্যাক কিংবা MJ টিমের একমাত্র চোখের কাটা এই VPN। যেখানে তারা সুযোগ পেলেই এদের নিয়ে ইস্যু ক্রিয়েট করে সমালোচনা করতে বেশ পছন্দ করে।
যথারীতি আজও জ্যাক হাসতে হাসতে, জার্মান ও ইংরেজির মিশেলে বলে উঠল,

❝লুক এরাউন্ড,যাস্ট লুক…এতো নয়েস,এতো ক্রাউড অথচ আমাদের ব্যাটমেন আর তার টিম
কোথায়? দ্য গ্রেট ভিপিএন স্কোয়াড এখন কোথায়?❞
তার হাসিতে, আরো এক বিদেশী এবং তার টিম মেম্বার হেনরিক হেসে বলে,
❝ভিকে এখন রকস্টার—নট রেসার। ওদের আজকের ইভেন্টের কথা মনে থাকবে?… রিডিকিউলাস!❞
—❝অফকোর্স! কেনো মনে থাকবে না? তোমরা শুধু শুধু হাসাহাসি করছো। দেখবে ভিকে স্ট্যান্ট শুরু হবার আগেই চলে এসেছে।❞
আচমকা দুজনের হাসাহাসির মাঝে,তার নিজের বোনের এমন কথায় যেন জ্যাক কিছুটা ক্ষুব্ধ হলো। দেখতে, শুনতে যথেষ্ট স্টাইলিশ এই মেয়েটা। তবে তার ভাইয়ের টিমে থেকেও, সে বরাবরের মতো কেনীথের প্রতি অনেকটাই আকৃষ্ট। ফলাফলস্বরূপ ভিকে কিংবা তার টিমের টপিকে কোনো কথা হলে, জ্যাকের নিজ বোনের সাথেই তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
জ্যাক তার বোন স্টেলা ডিসুজার উদ্দেশ্যে রুক্ষ স্বরে বলে,
❝স্টেলা,ইউ আর মাই সিস্টার। বাট হোয়াই আর ইউ অলওয়েজ ডিফেন্ডিং ভিকে?❞

—❝সরি,আই’ম নট ডিফেন্ডিং ভিকে। আমি শুধু সত্যটা বললাম।❞
—❝সো, ইউর ব্লাডস্টকার ইজ কামিং টু নাইট,হা? স্টেলা, যাস্ট লুক এরাউন্ড…দ্য সাইলেন্স সে ইট অল। ভিকে’স্ নট কামিং। গিয়ে দেখো ঐ রিসিকিউলাসটা কনসার্ট শেষে নিজের বাড়িতে গিয়ে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।❞
—❝মেবি! বাট ক্যান্ট ইউ হিয়ার দেম, জ্যাক? দ্য ক্রাউড’স স্ক্রিমিং ফর হিম।সবার অপেক্ষা শুধু তার জন্যই। লাইক ইট অর নট—ভিকে ওউন্‌স দিজ স্ট্রিটস।❞
—❝স্টেলা, ডোন্ট স্টার্ট এগেইন। তুমি সবসময় ওর হয়ে কথা বলো। ইট’স গেটিং অ্যানওয়িং।
—❝হি ডাজেন্ট নিড মাই ডিফেন্স, জ্যাক।ওর অস্থিত্বই যথেষ্ট উত্তর।❞
স্টেলা খানিকটা সময়ের জন্য থেমে, আবারও বুকে হাত গুঁজে বলে,
❝বি কেয়ারফুল। ভিকে ইজে’ন্ট যাস্ট এ্যা রকস্টার—হি ইজ এ্যা মনস্টার।❞
—❝হোয়াট ডু ইউ মিন? তোমার উদ্দেশ্য কি বলো তো? তুমি কি নিজের ভাইকেই ওই ডাফারটার কাছে হেরে যেতে দেখতে চাও?❞

—❝মোটেও না, আমি চাই তোমরা ওদের নিয়ে হাসাহাসি না করো।❞
—❝সিরিয়াসলি? স্টেলা, ইউ নো হোয়াট? ভিকে তোমার দিকে কখনো ফিরেও তাকায় না! আই নো, এটা তোমার জন্য কষ্টদায়ক। কিন্তু তোমার কি একটুও লজ্জা করে না, দিনের পর দিন ঐ বাস্টা-র্ডটার জন্য ছেঁছড়ামি করতে? যাস্ট বিলিভ মি,তুমি যদি আমার বোন না হতে তাহলে… এতোদিনে তোমাকে আমি নিজের হাতে শেষ করে দিতাম।❞
—❝ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট হিম, জ্যাক। ভিকে নেভার প্লেজ আনলেস হি’জ শিউর টু উইন।❞
—❝যাস্ট শাট আপ। হি ডাজেন্ট নিড ইয়োর ভয়েস। ভিকে! ভিকে! ভিকে! মাথাটা পুরো খেয়ে দিচ্ছে। ❞
—❝হেই গাইস,কি শুরু করলে তোমরা। নিজেদের মধ্যে রাগারাগি করে কি হবে? আমাদের উদ্দেশ্য ওদের শেষ করে, নিজেদের জিত হাসিল করা, দ্যাটস্ ইট। আর স্টেলা প্লিজ, অন্তত ম্যাচ শেষ না হওয়া অব্দি নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।”
হেনরিকের কথা শেষ হতে না হতেই, আচমকা গাড়ি ও লোকসমাগমের আওয়াজে চারপাশে গর্জে ওঠে। এবং তৎক্ষনাৎ জ্যাক বিস্ময়ের সহিত বলে ওঠে,

❝হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন?❞
জ্যাকের অভিব্যক্তিতে স্টেলা মুচকি হাসে। বাদামি রঙের চুল ও চোখ বিশিষ্ট ফর্সা ত্বকে চমৎকার সুন্দরী মেয়েটি, প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলে,
❝মাই ব্যাডম্যান ইজ হিয়ার…❞
বেশ কিছুক্ষণ ধরে মাইকেল জ্যাক ও তার টিম স্টেজ দখল করে আছে। তাদের হাস্যকর ঠাট্টা ভিকে অর্থাৎ ভ্যাম্পায়ার কেনীথ আজ আর আসতে সাহস পাবে না। চারপাশেও ঠিক একই রকমের কানাঘুঁষা চলছে। VPN আজ আর আসবে না। আর ঠিক সেই মূহুর্তেই….
❝ভ্রুউউউউউমমমম!❞

এক তীব্র গর্জনে চারপাশের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। লাল-কালো রঙের বিশেষ মার্সিডিজ হঠাৎ করেই বিশাল স্কয়ার এরিয়াতে ঢুকে পড়তেই সবাই যেন বুঝে যায়, এখন কি হতে চলেছে।
গাড়ির ফ্রন্ট হুডে কালো রঙের মাঝে রক্তরাঙা ভিকে-কোর লোগো, যার পাশে মার্সিডিজের নিজস্ব থ্রি-পয়েন্টেড স্টার। এক ঝটকায় গাড়িটি স্লাইড করে স্ট্যান্ড করে, তার বিশাল চাকা ঘুরিয়ে চারপাশে ধোঁয়ার ঝড় তোলে। সেই ধোঁয়া সোজা এসে গিয়ে জ্যাকের দলের মুখে ঝাপিয়ে পড়ে।তারা হঠাৎ চুপসে যায়। ওদিকে দর্শকদের চিৎকারে একে একে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস উন্মাদনার তীব্র প্রতিক্রিয়া।
—❝ভিকে!!!❞
—❝ভ্যাম্পায়ার ড্রাইভার!!!❞
—❝Bladen is here!!❞

গাড়িটি এসে স্কয়ারের ঠিক মাঝবরাবর থামে। দরজাগুলো একে একে খুলে যায় ততক্ষণেই। এবং শুরুতেই বেড়িয়ে আসে ভিকে। কেনীথের পরনে তখনোও কালো রাইডিং জ্যাকেট। চোখমুখের ভাবগতিক গাম্ভীর্যপূর্ণ।
হাতে স্লো মোশনে পড়ে নিচ্ছে সেই কালো রাইডার গ্লাভস। তাঁর মুখে প্রশান্ত, শীতল অথচ আগুনঝরা এক দৃষ্টি। কেনীথের পর একপাশ দিয়ে বের হয় নায়রা ইামনি। তার অভিব্যক্তি নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। কারণ আপোষহীন রুক্ষ স্বভাবের এই মেয়েটি নিত্যন্তই বিশেষ। তার তুলনা বাকিদের সাথে করাটা বোকামি। কেনীথের জীবনে সে এক বিশেষ ব্যক্তি। একইসাথে পাভেলের ক্ষেত্রেও তাই।

এদিকে পাভেলও অনায়াস ভঙ্গিতে চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়েই বেড়িয়ে আসে৷ এবার অবশ্য হুডির টুপিটা তার মাথা দিয়ে রাখা। তবে তার চেহারায় কোনল ব্যস্ততা নেই, বরং এই ক্লাসিক বাইকার এখন চিল অ্যাটিটিউডে রয়েছে।
তাদের তিনজনে একই গতিতে হাঁটা শুরু হয়। সবার সামনে ভিকে, এবং তার বাম পাশে নায়রা এবং ডান পাশে পাভেল। তাদের এগিয়ে আসতে দেখলে,চারপাশের ভিড় দু’দিকে সরে যায়। কোনো কথাবার্তা নয়,শুধু দৃঢ় পা, নিঃশব্দ পদচারণা, আর গাড়ির এক্সজস্ট থেকে ঝলসানো আগুনের ন্যায় তাদের বিশেষ এক উপস্থিতি।
তারা তিনজন এসে সোজাসুজি জ্যাক ও তার টিমের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ জ্যাক ঠোঁট কামড়ে কেবল একটাই শব্দ উচ্চারণ করল,

“শি*ট…”
জ্যাকের বিরক্তিবোধ যেন তিনজনের কাছে একদম স্পষ্ট। কেনীথ বিষয়টা না দেখার ভান করেই, রুক্ষ ভাবে মুচকি হাসে। ওদিকে নায়রা দেখছে ভিন্ন কিছু। সে জ্যাকের বোন স্টেলার দিকে তাকিয়ে।
স্টেলা জ্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে, অপলক চাহনিতে কেনীথকে দেখছে। চোখ-মুখে যেন মারাত্মক নেশার ছায়া। স্টেলার এমন ভাবগতিকে নায়রা মনে মনেই মুচকি হাসে। সে খানিকটা এগিয়ে, কেনীথের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
“হেই ডুড!”
নায়রার কথা শুনে কেনীথ আঁড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
“হু!”

—“একটু ওদিকে দেখ! বেচারী স্টেলা তো পারলে তোকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে।”
আচমকা এহেন কথা শুনে নিমিষেই কেনীথের মেজাজ বিগড়ে যায়। সে আর নায়রার কথা মতো সামনের দিকে তাকায় না, বরং চোখ গরম করে নায়রার দিকে তাকাতেই সে ফিক করে মুচকি হেসে ফেলে।
কেনীথ আর এসব বিষয়ে মাথা ঘামায় না। কেননা ততক্ষণে জ্যাক এগিয়ে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কিছুটা কটাক্ষের স্বরে জ্যাক কেনীথের উদ্দেশ্যে বলে,
❝মিস্টার ভ্যাম্পায়ার! সো,লেট’স্ গেট স্টার্ড।❞
—“ইয়াহ্!”
কেনীথ নিস্পৃহে শুধু এইটুকু বলেই, রুক্ষ হাসে। জ্যাকের তীক্ষ্ণ নজরের দিকে তাকাতেই জ্যাকের চোখমুখ শক্ত হয়। যা দেখে কেনীথ নিমিষেই কিঞ্চিৎ মুচকি হেসে ফেলে।

সময় যত যাচ্ছে, রাত ততই গভীর হচ্ছে। গোলাকার এরিনার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য দর্শক। কেউ হাতে হুইস্কির বতোল,আবার কেউ বন্ধুদের সাথে বাজি ধরছে, আজ টিম জ্যাক জিতবেই। কিংবা জিতবে টিম ভি.পি.এন৷
শুরুতেই সব গাড়ি একসাথে সারিবদ্ধ হয়। কেনীথের লাল-কালো মার্সিডিজ AMG ই যেন সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে। কেনীথ বরাবরের মতোই ড্রাইভিং সিটে বসে রয়েছে। তার পাশে বসা নায়রা—হাতে রেসিং গ্লাভস পরে স্টার্ট সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে আছে। এবং ব্যাকসিটে পাভেল। যদিও সে ড্রাইভ করছেন না, তবুও টিমের টেকনিকাল ব্রেন অর্থাৎ ল্যাপ টাইম, দূরত্ব আর টাস্কের ক্যালকুলেশন চালিয়ে যাচ্ছে হাতে থাকা ছোট্ট ডিজিটাল স্ক্রিনে।
সিগন্যাল জ্বলে উঠতেই ইঞ্জিনের গর্জন ছিন্ন করে ফেলে নীরবতা। প্রথম ধাপে স্টান্ট লুপ। গাড়িগুলো গোল গোল ঘুরতে থাকে এরিনার ভেতর। এমন নিখুঁত ড্রিফট আর ৩৬০ ডিগ্রি স্পিন যে…দর্শকেরা মাঝে মাঝেই আবেশে ❝উহ্!❞ বলে উঠছে। ধোঁয়ার মাঝে ঝলসে ওঠা লাইটে প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে…একবার জ্যাক এগিয়ে তো পরবর্তী মুহূর্তেই কেনীথ সমান তালে ধরা দিচ্ছে।

মারাত্মক হুড়োহুড়ি ড্রাইভিং এর মাঝেই দুজনের চোখে চোখ পড়ছে। কিন্তু কেনীথ কিংবা জ্যাক, কেউই কোনো কথা বলছে না কিংবা বলার সুযোগও হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি বাঁকে যেন একেকজন নিঃশব্দের যুদ্ধের ঘোষণা করে চলেছে।
তৃতীয় লুপের পর দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে স্প্রিন্ট রেস শুরু হয়। এরিনা থেকে সোজা বেরিয়ে পড়ে গাড়িগুলো নির্দিষ্ট রেসিং ট্র্যাকের দিকে। সরু রাস্তা, উঁচু-নীচু ঢাল, আর মাঝে মাঝে টানেল পেরোনো—সব জায়গায় কেনীথ আর জ্যাকের লড়াই চলছেই।একসময় একটা হেয়ারপিন বাঁকে(১৮০° কিংবা তার কাছাকাছি হেলে পড়া রাস্তার তীব্র বাঁক) দুজনই প্রায় সমান তালে ঢুকে পড়ে। কিন্তু কেনীথ হঠাৎ গিয়ার কমিয়ে ড্রিফট মারতেই, ভেতরের লেন কেটে এগিয়ে যায়। একইসাথে দর্শকেরাও ট্র্যাকসাইডে চিৎকার করে ওঠে।
ট্র্যাকের শেষে আসে টাস্ক পয়েন্ট। এখানে গাড়ি থামিয়ে দ্রুত একটা নির্দিষ্ট অবজেক্ট তথা স্পেশাল রেড ফ্ল্যাগ তুলে গাড়িতে লাগিয়ে আবার ছুটতে হবে। নায়রা বিদ্যুৎগতিতে দরজা খুলে ফ্ল্যাগ তুলে লাগিয়ে দেয়। আর পাভেলও সাথে সাথেই সময় চেক করে বলে ওঠে,

❝উই’আর স্টিল অ্যাহেড!❞
ফাইনাল রিটার্নে রাস্তা একদম সোজা, কিন্তু গতির লড়াই তুঙ্গে। বাতাসে টায়ারের ঘর্ষণের গন্ধ, ইঞ্জিনের গর্জন আর দর্শকের শোরগোল মিলেমিশে এক অদ্ভুত থ্রিলিং ভাইব তৈরি করেছে। শেষ মুহূর্তে এসে কেনীথের গাড়ি জ্যাককে অর্ধেক গাড়ির ব্যবধানে পেছনে ফেলে ফিনিশ লাইন ক্রস করে।
আর তৎক্ষনাৎ ঘোষক চিৎকার করে বলে ওঠে,
❝দ্য ইউনার ইজ ভি.পি.এন—ভ্যাম্পায়ার কেনীথ,পাভেল হান্স এন্ড নায়রা ইমানি ফ্রম টিম ব্লাডেন।❞
নিমিষেই চারপাশ তীব্র উচ্ছ্বাসের আদলে ঢেকে যায়। জ্যাক নীরবে হালকা হাসে। কিন্তু চোখে স্পষ্ট হার মানার তীব্র ক্ষো”ভ। কেনীথ, নায়রা আর পাভেল শুধু নীরবে তাচ্ছিল্যের সহিত রুক্ষ বাঁকা হাসে।কেননা জিত যে তাদেরই হবে, এটা তাদের আগে থেকেই জানা ছিল।

আজকের স্ট্যান্ট শো মোটামুটি শেষ প্রায়। ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত তিনটার চেয়েও বেশি। যার যার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এসেছে। এসব স্ট্যান্ট শো-তে মোটামুটি অনেক আয়োজন হয় বিধায়, বিজয়ীদের জন্য আলাদা ভাবে বিশেষ ট্রফিও থাকে। যথারীতি একটি গোল্ডেন কালারে ফায়ার বার্ড শেইপের ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে নায়রা। তার পাশেই কেনীথ আবার চেরি ভর্তি কাঁচের বোল হাতে নিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে বসে রয়েছে। একটা করে আস্ত চেরি মুখে দিচ্ছে আর তার বীজ গুলো একপাশে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। এমন জায়গায় এতোগুলা চেরির ব্যবস্তা মূলত বিশেষ ভাবে শুধু তার জন্যই করে রাখা হয়েছে। সে যেথায় যাক না কেনো, তার জন্য বিশেষভাবে এই চেরির ব্যবস্তা করে রাখাটা যেন বাধ্যতামূলক।

কেনীথের পাশেই পাভেল বসে থেকে, ফোনে একের পর এক কোম্পানির কোনো বিশেষ বিষয়বস্তু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। এখন বাড়ি গিয়ে সোজা একটা ঘুম দেবে। এরপর আগামীকাল সোজা দুপুর নাকি বিকেলে উঠবে তার পরের বিষয়। কিন্তু এইমুহূর্তে যতটুকু কাজ করে রাখা সম্ভব, সে করে ফেলছে।
তারা মূলত চলে যাবার জন্য বসে রয়েছে। আর মোটামুটিভাবে সবকিছু শেষ হলে সবার আগে তারা এখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু এরইমাঝে আচমকা জ্যাক ও তার টিম সামনে এলো। জ্যাকের সাথে হেনরিক আর তার বোন স্টেলাও রয়েছে। স্টেলার নজর বরাবরের মতোই কেনীথের দিকে। মেয়েটা সবসময় তার দিকে চাতকের ন্যায় চেয়ে থাকলেও, কেনীথ তার দিকে যেন ইচ্ছে করেই ফিরেও তাকায় না। এসব ব্যাপার নিয়ে অবশ্য নায়রা বেশ মজা নেয়৷
জ্যাক কেনীথের সম্মূখে এসে দাঁড়ালে, কেনীথ তখনও নিরুদ্বেগ। সে একই ভঙ্গিতে একটা করে চেরি মুখে পুরছে এবং খানিকটা সময় চিবিয়ে খাওয়ার পর বীজগুলো নিচে ফেলছে। এমন সময় এটা বীজ এসে সোজা জ্যাকের পায়ের কাছে এসে পড়লো। নিমিষেই তার চোখমুখ চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তবুও সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে চাপা স্বরে বলে,
❝ভিকে!…ইউ ওন দিস টাইম। বাট ডোন্ট ওয়ারি—নেক্সট টাইম, দ্য ভিক্টরি উইল বি আওয়ার্স।❞

জ্যাকের কথায় নায়রা আর পাভেলের পাশাপাশি কেনীথও কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সহিত মুচকি হাসে। পরক্ষণেই মাথা উঁচিয়ে জ্যাকের দিকে তাকায়। আবার একটা চেরি মুখে পুরে,বোলটা নায়রার দিকে এগিয়ে দেয়৷ সে তা পাশেই এক ফাঁকা চেয়ারে রেখে দেয় অনায়াসে।
এদিকে কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে, জ্যাকের মুখোমুখি হয়। একপলক তার টিমের সব মেম্বাদের দেখে, পরক্ষণেই বিস্তৃত মুচকি হেসে আওড়ায়,
❝অলরাইট! লেট’স সি…❞
এইটুকু বলেই সে,তার মুখে থাকা চেরির বীজটা সরাসরি জ্যাকের মুখের সামনে ছুঁড়ে ফেলে। যা সোজাসুজি গিয়ে তার জ্যাকেটের কাঁধে পাশে লেগে নিচে পড়ে যায়। নিমিষেই জ্যাক আক্রোশে হাত মুঠো করলেও, পাশ থেকে স্টেলা তার হাতটা আড়ালেই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। ফলাফলস্বরূপ, জ্যাক রাগের বশে কিছু করতেও চেয়েও যেন আর কিছু করার মতো সুযোগ পায়না।

এদিকে কেনীথ আবার, জ্যাকের দিকে তাচ্ছিল্যের সহিতে বাঁকা হেসে, নায়রার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
❝সুইঠি! গাড়ি স্টার্ট দে…।❞
কেনীথের কথামতো নায়রা একটুও সময় নষ্ট না করে, পেছনে ঘুরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। একইসাথে কেনীথ আর পাভেলও নিঃশব্দে পেছনে ফিরে, একপ্রকার জ্যাকদের তাচ্ছিল্য করে চলে যেতে লাগল।
প্রায় গাড়ির কাছে আসার পর, কেনীথের পেছন হতে আচমকা পাভেল বলে ওঠে,
❝ব্রো! বিডি(বাংলাদেশ) থেকে তোমার জন্য স্পেশাল কল এসেছে।❞
পাভেলের কথা শুনে কেনীথ এবং নায়রা একইসাথে পেছনে ঘুরে তাকায়। কেনীথের ফোনটা পাভেলের কাছেই ছিল। আর আচমকা এইসময় বাংলাদেশ থেকে এক বিশেষ ব্যক্তির ফোন আসায়, পাভেলের চোখমুখ চকচক করে ওঠে। তবে তার এমন হাস্যজ্জ্বল অভিব্যক্তিতে কেনীথের কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে যায়। এবং পরক্ষণেই সে খানিকটা গম্ভীর স্বরে বলে,

“কে?”
কেনীথের মতো নায়রাও অভিব্যক্তিও সন্দিহান। তবে সেও হয়তো আন্দাজ করে ফেলেছে, কলটা কার৷ ইতিমধ্যেই আবার কেনীথের অভিব্যক্তিতে পাভেল গা দুলিয়ে হেসে বলে ওঠে,
❝তোমার নুর বেবি।❞

মহামায়া পর্ব ২