মহামায়া পর্ব ২৮
তুশকন্যা
“বাইয়া… আমার হিসু পেয়্যেছে।”
ভিভিয়ান আকাশ থেকে পড়ল। সে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মানে? তুই না ডায়াপার পরে আছিস?”
আনায়া তখনো নিজের গাউন আঁকড়ে ধরে অসহায়ভাবে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না… আমি পড়ে আসতে বুলে গিয়েছি। তুমার দুষ,তুমি আমায় দাইপার পড়াওনি। আর আমি তো দাইপার পড়তে পারি না…মা পড়িয়ে দেয়।”
মুহূর্তের মধ্যে রোমান্টিক আবহাওয়া কর্পূরের মতো উবে গেল। মাওরা হাসি চেপে রাখতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। ভিভিয়ান তখন কপালে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘঁষে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“তোকে নিয়ে আসাটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
তবে সে মুখে বলল,
“আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে, ওদিকে গিয়ে কাজ সেরে ফেল।”
ভিভিয়ানের এহেন গুরুগম্ভীর কথায়, আনায়ার সাথে সাথে মাওরাও কিছুটা ভড়কে গেল। মাওরা কিছু বলবে, তার আগেই আনায়া বলে উঠল,
“আমি একানে হিছু করববো না। সবাই দেকবে… ”
ভিভিয়ান দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“আমি বলছি, কেউ দেখবে না! তুই চুপচাপ ঐদিকে যা!”
তার ভারিক্কি কন্ঠস্বরে আনায়া ঠোঁটে ঠোঁটে চেপে, অন্যদিকে এগিয়ে যেতে ধরে। যাওয়ার পূর্বে ইতস্তত ভঙ্গিতে আওড়ায়,
“তোমরা ওদিকে তাকাও! দেকবা না কিন্তু।”
—“হ্যা,যা তুই। তোকে দেখার জন্য কেউ বসে নেই।”,ভিভিয়ান দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল। আনায়া দু’পা সরতেই সে ভারী শ্বাস ফেলল।
কিন্তু কিছু কিছুদূর যেতে না যেতেই আনায়া পুনরায় অবিন্যস্ত পায়ে দৌড়ে ফিরে এলো।
—“বাইয়া,বাইয়া…”
—“আবার কি হলো?”
—“পুকা,পুকা! ইয়াআআ ইত্তো বড় পুকা।”
—“পোকা? কোথায়?”
—“উযে উখানে…আমি মা’ কাসে যাবো। বারি যাবো আনি।”
আনায়া অস্থির ভঙ্গিতে পা নাড়াচ্ছে। চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছে। মাওরা-ভিভিয়ান দুজনেই বাকরুদ্ধ। নিমিষেই ভিভিয়ান তার সেই গুরুগম্ভীর ভাবমূর্তি হারিয়ে ফেলল। সে মাওরাকে এক নজর দেখে নিয়ে দ্রুত আনায়াকে নিজের সহজাত ভঙ্গিতে থাবা মে’রে কোলে তুলে নিল।
—“মাওরা,এক্সট্রিমলি সরি এভাবে সবকিছু বিগড়ে দেওয়া জন্য। তবে এখানে আর একমুহূর্তও থাকা সম্ভব না।…এই বিচ্ছু আমাকে শান্তিতে মরতেও দেবে না। আমি আসছি!”
ভিভিয়ান মাওরাকে কিছু বলার মতো আর সুযোগও দিল না। দ্রুত আনায়াকে নিয়ে বাইকের দিকে ছুটল, আর পেছনে দাঁড়িয়ে মাওরা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং অদ্ভুত এই জন্মদিনের সকালটির কথা ভেবে অচিরেই শব্দ করে হেসে উঠল। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ভাই-বোন দুটোই একরকম। হাউ সুইট!”
ভিভিয়ান দ্রুত আনায়াকে নিয়ে বাইকের কাছে এল। মাওরা তখনো হাসছে, কিন্তু ভিভিয়ানের অবস্থা তখন শোচনীয়। সে কোনোমতে এক হাতে আনায়াকে ধরে অন্য হাতে স্টার্ট দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
“লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, এবার বাড়িতে আসা। তুই বড় না হওয়া পর্যন্ত, এহসান মঞ্জিলে পা রাখব না আমি।”
বাইক যখন মেইন রোডে, ভিভিয়ানের নজর পড়ল জ্যামের লম্বা সারিতে। রাস্তার মাঝখানে বাইক থামিয়ে সে পেছনে ফিরে চাইল। আনায়া তখনও তার ফ্রকটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ককিয়ে উঠছে,
“বাইয়া… আর পাতছি না! পড়ে যাবে তো…”
ভিভিয়ানের কপালে ঘাম জমে উঠেছে। এতো বিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে সে আগে কখনো পড়েছে কিনা তা অজানা। ভিভিয়ান ডানে-বামে তাকিয়ে কোনো রেস্টুরেন্ট বা পাবলিক টয়লেট খুঁজল, কিন্তু আশেপাশে শুধু বিশাল বিশাল শোরুম আর জনাকীর্ণ ফুটপাত। আনায়ার মুখ তখন লাল হয়ে উঠেছে, সে যেকোনো মূহুর্তে বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসবে—সেটা ভিভিয়ান স্পষ্টত বুঝতে পারল।
হঠাৎ কোনো উপায় না পেয়ে ভিভিয়ান রাস্তার একপাশে বাইক থামাল। ফুটপাতে তখন প্রচুর মানুষ। সে আনায়াকে কোলে নিয়ে দ্রুত একটা অন্ধকারের ন্যায় গলির মুখে ঢুকল। কিন্তু সেখানেও ড্রেন আর ময়লার স্তূপ। ভিভিয়ান অস্থির হয়ে বলল,
“তারা! একটু ধৈর্য ধর, একদম ছাড়বি না কিন্তু! তুই না আমার জানবাচ্ছা! আমরা বাড়িতে গিয়েই সব করব।”
তড়িঘড়িতে ভিভিয়ানের হুঁশ নেই সে কি বলছে। অন্যদিকে আনায়ার তখন প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো অবস্থায়। সে ভিভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাইয়া… আমার ভিজে যাচছে তো!”
ভিভিয়ান বুঝল, পরিস্থিতি হাতের বাইরে। সে নিরুপায় হয়ে গলির ভেতর একটা বড় দেওয়ালের আড়ালে আনায়াকে দাঁড় করিয়ে দিল। সে তার সেই গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে চারপাশ পাহারা দিতে দিতে চাপা স্বরে বলল,
“দ্রুত যা করার কর। আমি আছি, কেউ দেখবে না।”
কিন্তু আসল বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটল তখন, যখন ভিভিয়ান দেখল আনায়ার সেই ফুলোফোলা গাউনের অনেকগুলো চেন-বোতাম—যা খোলা এই মূহুর্তে তার একার পক্ষে দুঃসাধ্য।কেননা বেছে বেছে জামা সে নিজে পছন্দ করে আনলেও, পড়ানোর সময়ও পড়িয়েছিল প্যাচবিহীন একটানে সহজভাবে। তখন তো আর এসব খেয়াল ছিল না, এই জামা খুলতে এতো কাহিনি করতে হবে!
ভিভিয়ান এক হাতে আনায়াকে ধরে অন্য হাতে সেই জটিল বুনন খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তার মতো একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তি, যার হাতে কম করে হলেও এখন অব্দি অর্ধশত মানুষ মা’র খেয়েছে—সে কিনা আজ একটা ছোট মেয়ের জামার বোতাম খুলতে গিয়ে রীতিমতো ঘামছে।
এরিমধ্যে পাশের একটা বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি গার্ড এদিকে এগিয়ে এল। লোকটা কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“কে ওখানে? গলির ভেতর কী করা হচ্ছে?”
ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরল। তার মেজাজ তখন তুঙ্গে। সে লোকটার দিকে তাকাতেই সিকিউরিটি গার্ড ভিভিয়ানের সেই খুনে চাউনি আর সুঠাম দেহ দেখে থমকে গেল। ভিভিয়ান দাঁতে দাঁত পিষে হুট করেই মেজাজ দেখিয়ে বলে উঠল,
“নিজের কাজে যান! বাচ্চার প্রবলেম, দেখতে পাচ্ছেন না?”
সিকিউরিটি গার্ড বিড়বিড় করতে করতে পিছিয়ে গেল। ভিভিয়ান কোনোমতে কাজ শেষ করে আনায়াকে আবার কোলে তুলে নিল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে—আনায়ার গাউনের নিচের দিকটা সামান্য ভিজে গিয়েছে। আনায়া এখন শান্ত, কিন্তু ভিভিয়ানের মেজাজ তখন সপ্তম আকাশে।
সে বাইকে ফিরে এসে আনায়াকে সামনে বসাল। আনায়া তখন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“বাইয়া, আমি একন ছান্তি।”
ভিভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকাল। রাগে তার ইচ্ছে করছিল আনায়াকে ওখানেই ফেলে রেখে চলে যেতে, কিন্তু মেয়েটার ওই তৃপ্ত মুখ দেখে সে আর কিছু বলতে পারল না। তবে মনে মনে এ-ও ঠিক করে নিল, যতদিন না পর্যন্ত এই মেয়ে ঠিকমতো বড় হচ্ছে ততদিন অব্দি সে আর বাড়ি ফিরবে না।
ভিভিয়ান বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো। এহসান মঞ্জিলের গেটে পৌঁছে ভিভিয়ান পাভেলকে দেখতে পেল। পাভেল বড় ভাইয়ের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে ভাই? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
ভিভিয়ান বাইক থেকে নেমে আনায়াকে পাভেলের কোলে একপ্রকার ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“এই উটকো ঝামেলাটাকে ওর মা আর বড় মায়ের কাছে দিয়ে আয়। আর শোন, আজ থেকে আগামী এক সপ্তাহ যেন ওকে আমার রুমের আশেপাশেও না দেখি!…না,ওতোদিন আমার এখানে থাকা সম্ভব না। ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নিস, পরশুই আমরা এখান থেকে চলে যাবো। আর তোর থাকতে ইচ্ছে হলে থাকতে পারিস!”
একনাগাড়ে এতোসব কথা বলেই,সে গটগট করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনে আনায়া আর পাভেল ফ্যালফ্যাল করে তার যাওয়ার পানে চেয়ে রইল। অন্যদিকে ভিভিয়ান নিজের ঘরে ঢুকে সোজা শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। রাগে-ক্ষোভে ইচ্ছে করছে নিজের মাথা সুদ্ধ সবকিছু আছড়ে ফেলতে। কিন্তু রাগ’টা সে করছেই বা কার জন্য? ঐটুকু এক অবুঝ বাচ্চার জন্য? ধূর! এখান থেকে চলে না যাওয়া অব্দি তার স্বস্তি মিলবে না।
পার্কের ঘটে যাওয়া বিচিকিচ্ছি ঘটনার পর প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা ভিভিয়ান আনায়ার ছায়াও মাড়ায়নি। নিজের ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকে সে যেন এক অঘোষিত নির্বাসনে ছিল। কিন্তু এহসান মঞ্জিলের দেয়ালে দেয়ালে যে ছোট পায়ের চঞ্চলতা ছড়িয়ে আছে, তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ভিভিয়ানের নেই। দ্বিতীয় দিন বিকেলে যখন সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল,ঠিক তখনই দেখল দরজার আড়ালে আকাশী রঙের ফ্রকের এক চিলতে কোণা উঁকি দিচ্ছে।
ভিভিয়ান দরাজ গলায় ধমক দেওয়ার ভান করে বলল,
“উঁকিঝুঁকি মারা হচ্ছে কেন? সাহস থাকলে সামনে আয়।”
আনায়া গুটিগুটি পায়ে সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে ভিভিয়ানের দেওয়া সেই প্রিয় খরগোশটা। ভিভিয়ানকে দেখে সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“বাইয়া… তুমি কি একনো রাগ আছো?”
ভিভিয়ান সিগারেটটা আড়াল করে প্যান্টের পকেটে রেখে দিল। গম্ভীর মুখে বলল,
“রাগ কেনো করব? যা যা ঘটানো বাদ ছিল,তার সবটাই তো ঘটিয়ে ফেলেছিস।”
আনায়া তার কথার গূঢ় অর্থ না বুঝলেও, এটা বুঝল যে ভাইয়া এখন তার সাথে কথা বলছে। অর্থাৎ সে আর রেগে নেই। যথারীতি আনায়া সবভুলে নিজের ভাবনামতো একছুটে বারান্দার সেই কোণাটায় চলে গেল—যেখানে চেরি বীজের টবটা রাখা ছিল। হঠাৎ তার তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল,
“বাইয়া! বাইয়া! দেকো!”
ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল। দেখল, শুকনো মাটির বুক চিরে একটা কালচে-সবুজ রঙের ক্ষুদ্র কুঁড়ি উঁকি দিচ্ছে। চেরির দুটি বীজের মধ্যে একটিতে প্রাণ জেগেছে। ভিভিয়ান নিজেও কিছুটা অবাক হলো। সে নিচু হয়ে সেই ক্ষুদ্র চারাটির দিকে তাকাল। আনায়ার চোখে তখন সীমাহীন বিস্ময় আর আনন্দ। সে আঙুল দিয়ে চারাটা ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল, যদি ব্যথা পায়!
সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“এতা অনেক বড় হবে? অনেক চেলি হবে?”
ভিভিয়ান আলতো করে মাথা নেড়ে বলল,
“হুঁ, হবে কিন্তু এই টবে থাকলে হবে না, এটাকে বাগানে লাগিয়ে দিয়ে আসতে হবে। তবে আরো কিছুটা বড় হলে ভালো যদি…যাই হোক,যেহেতু আমি থাকছি না সেক্ষেত্রে… উম, এখনই এটাকে লাগিয়ে দিয়ে আসি। হলে হবে, না হলে নেই। আর তোর ওই বেলি ফুলের চারাটাও বোধহয় বাইকের ব্যাগে পচে মরছে, ওটারও আজ ব্যবস্থা করতে হবে।”
ভিভিয়ান নিজের গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে নিচে নেমে এল। আনায়া তার পেছন পেছন লাফাতে লাফাতে বাগানে গেল। ভিভিয়ান একটা ছোট কোদাল নিয়ে বাগানের উত্তর কোণে, যেখানে ঠিকমতো রোদ পড়ে, সেখানে গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। আনায়া পাশে বসে গভীর মনোযোগে তার কাজ দেখছিল। ভিভিয়ান গর্ত খুঁড়ে বেলি ফুলের গাছটা সযত্নে বসিয়ে দিতেই আনায়া তার ছোট দুই হাত দিয়ে মাটি চাপা দিতে শুরু করল।
মাটি নিয়ে কাজ করতে গিয়েই শুরু হলো বিপত্তি। আনায়া মাটি চাপ দিতে গিয়ে এক খাবলা কাদা তুলে সরাসরি ভিভিয়ানের পরিষ্কা টিশার্টে লাগিয়ে দিল। ভিভিয়ান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ভারিক্কি স্বরে বলল,
—“তারা! এসব কি?”
আনায়া ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। বিজ্ঞের ন্যায় আওড়াল,
“বাইয়া জানোওওও… মাতি অন্নেক ভালো জিনিচ, মা বলেচে মাটি দিলে গাস তাদাতাড়ি বড় হয়।”
ভিভিয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“গাছ বড় করার জন্য মাটি গাছে দিতে হয়, আমার গায়ে নয়,ইডিয়ট!…ফাজলামি করার জায়গা পাস না? জানিস আমি তো কত বড়?”
ভিভিয়ানের কথাকে নূন্যতম গুরুত্ব না দিয়েই, আনায়া বলে উঠল,
“তাতে কি! আমিও একদিন বড়ো হবো। তোমার বওউউয়ের মতো বড়ো হবো। তখন আর তুমি আমায় বকতে পাববে না।”
ভিভিয়ান আর এর সাথে কথা বাড়াতে চাইল না। এইজন্যই বোধহয় বলে, বাচ্চাদের বেশি প্রশ্রয় দিতে নেই—নয়তো সোজা মাথায় চড়ে বসে!
বাগানের কাদা-মাটি মাখামাখি অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ভিভিয়ান এবার আর কোনো ঝুঁকি নিল না। আনায়াকে এক প্রকার পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে সোজা নিজের ঘরের শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দিল।
এবার আর আনায়ার মধ্যে সেই আগের দিনের লজ্জা বা জড়তা ছিল না; বরং পানির ঝাপটা গায়ে লাগতেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। ভিভিয়ান নিজেও সিক্ত শরীরে, অত্যন্ত কোমল হাতে আনায়ার গায়ের কাদা ধুয়ে দিল।
দুজনেই সকাল সকাল গোসল সেরে ঘরে এলো। ভিভিয়ান নিজের চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে, আনায়ার জন্য একটা সাদা রঙের সুতি ফ্রক নিয়ে এলো। মেয়েটা তখন বিছানায় বসে বসে নিজের ছোট্ট পা দুটো দোলাচ্ছে। ভিভিয়ান দ্রুততর তাকে জামাটা পরিয়ে দিল।
গোসলের সিক্ততা তখনও দুজনের শরীর থেকে পুরোপুরি মোছেনি। ভিভিয়ান সোফায় বসে এক হাতে তোয়ালে নিয়ে অন্য হাতে আনায়ার ভেজা চুলগুলো আলতো করে মুছে দিচ্ছে। আনায়া তার সামনে দু-পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, মাথাটা কিছুটা ঝুঁকে আছে। সে আপনমনেই কী যেন ভাবছে আর নিজের ছোট ছোট আঙুল কামড়াচ্ছে।
ভিভিয়ান যখন তোয়ালে দিয়ে আনায়ার ঘাড়ের কাছের চুলগুলো একটু জোরে ঘষে দিচ্ছিল, তখন আনায়া ভারসাম্য সামলাতে না পেরে অজান্তেই আরও ঝুঁকে পড়ল। তার ছোট্ট মাথাটা এখন ভিভিয়ানের উরুর একদম মাঝবরাবর গভীরে গিয়ে ঠেকল। আনমনা আনায়া তখন এক বিচিত্র খেলায় মেতেছে—সে দাঁত দিয়ে ভিভিয়ানের টিশার্টের কোণা আর প্যান্টের শক্ত কাপড় কুটকুট করে কামড়াতে শুরু করল।
হঠাৎ, কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে আনায়ার ধারালো দুধদাঁতগুলো কাপড়ের আবরণ ভেদ করে ভিভিয়ানের শরীরের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে সজোরে চেপে বসল।মুহূর্তের মধ্যে ভিভিয়ানের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল।
সে যন্ত্রণায় আর চরম বিস্ময়ে একপ্রকার ছিটকে সোফার পেছনের দিকে সরে গেল। তার চোখ-মুখ কুঁচকে একাকার, কপালে যন্ত্রণার ভাঁজ। সে কয়েক সেকেন্ড নিথর হয়ে বসে রইল, নিশ্বাস আটকে গেছে যেন। হতভম্ব ভিভিয়ান যখন অস্ফুট কোনো শব্দ করতে যাবে, ঠিক তখনই সে দেখল আনায়া তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি যেন টেরই পায়নি সে কী ঘটিয়ে ফেলেছে।
—“ঐগুলো তোর দাঁত নাকি অন্যকিছু? আমার…”
মহামায়া পর্ব ২৭
ভিভিয়ান আরো কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল। তার গলার কাছে একরাশ অপ্রস্তুত ভাষা দলা পাকিয়ে এল। কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আনায়া নিজের সবকটি দাঁত বের করে এক গাল চওড়া হাসি হাসল। সে খুব গর্বের সাথে নিজের আঙুল দিয়ে দাঁতগুলো দেখিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
”বাইয়া দেকো , আমার অনেক গুলো দাঁত হয়েসে! আমি এখন সবকিসু কুট্টুস কুট্টুস করে কামড়াতে পারি,হি হি।”
