মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৪৪
নওরিন কবির তিশা
—”এই আপনার ভালোবাসা ছিল! এই আপনি আমার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করতে পারবেন! এজন্য আমি বলি সব পুরুষই সমান! আপনিও তাদের অন্তর্গত! আপনিও আলাদা নন! বলুন সেদিন কেন আমাকে এতগুলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলেন, কেন আমাকে নতুন করে ভালবাসতে শেখালেন, কি হলো কথা বলছেন না কেন বলুন বলুন!
হৃদগহিনে চলা হাজারটা প্রশ্ন ব্যক্ত করেই রিদিতের কলার ধরে জোরে ঝাঁকুনি দিল আনায়া, অন্যদিকে আনায়ার এমন ব্যবহারে হতভম্ব রিদিত! চারিপাশে একবার চোখ বুলালো সে, আশেপাশের লোকজন তাদের দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তা দেখে রিদিত বলল,,
—”ক্লাম ডাউন আয়নিন! শান্ত হও এটা পাবলিক প্লেস! সবাই তাকিয়ে আছে!”
কিন্তু কে শোনে কার কথা, লাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছে আনায়া, আশেপাশে কে কি ভাবলো কে কি বলল সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার! সে ফের সজোরে রিদিতের কলার ঝাঁকিয়ে বলল,,
—”দেখুক দেখতে দিন সবাইকে!”
রিদিত অবাক নয়নে চেয়ে রইলো আনায়ার পানে! এ কোন আনায়াকে দেখছে সে, এটা কি আসলেও তার আয়নিন, যে মেয়েটা তুলে কারো সাথে কথাও বলে না, ভদ্রতায় নুইয়ে থাকে সর্বক্ষণ সেই আজ এতটা ডিস্পারেট! কিন্তু কেন!
কিছুক্ষণ আগে….
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাথার উপর সদ্যজাগা রোদের স্বর্ণাভ ছায়া,ঘড়ির কাঁটায় সবে সকাল আটটা, তাই সূর্যের কিরণ তখনো রূঢ় হয়ে পারেনি,মোলায়েম আলোর মতো গায়ে পড়ছে। এক হাটখোলা রিক্সার মাঝে বসে আছে আনায়া, আজ ভার্সিটি যাবে না সে, মস্তিষ্ক বিষন্ন,হৃদয়ে বিরহের নিরব যুদ্ধ, এ অবস্থাতে কোনমতেই ক্লাস করা সম্ভব নয় তার পক্ষে! আর যখনই তার মন খারাপ থাকে তখনই সে শিশিরের সাথে কথা বলে নয়তো ইনায়াদের বাসায় যায়।
তবে আজকের বিষন্নতা সবচেয়ে ভিন্ন, এ বিষন্নতা শিশিরের সাথে ভাগ করা যাবে না তাই সে যাচ্ছে ইনায়াদের বাসায়, হঠাৎই দূরের একটা ক্যাফে দৃষ্টিগত হলো তার, প্রথমে চোখ সরিয়ে নিলেও কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মাঝেই অজ্ঞাত এক শিহরণ বেয়ে ওঠে তার পিঠ বেয়ে সেখানে বসে আছে তার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি, এক মুহূর্তেই চিনে ফেলে সে!
রিক্সা আমার আগেই আনায়ার হৃদয়ের গতি যেন কয়েক সেকেন্ড থমকে গিয়েছিল তবুও দ্রুত রিক্সা থেকে নেমে সেদিকে পা বাড়ায় সে! কিন্তু ক্যাফের কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ পদচারণা থমকে যায় তার!কাচঘেরা জানালার ওপারে বসে আছে রিদিত।তবে সে একা নয়।তার বিপরীতে বসে আছে এক অষ্টাদশী।সতেজ, মসৃণ, আভিজাত্য ছোঁয়ানো তার মুখশ্রী। হঠাৎই কয়েক গুচ্ছ চুল এলোমেলো হয়ে পড়ল তার কপালের ওপর।রিদিত নিঃসংকোচে হাত বাড়িয়ে সেই চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল।
কিন্তু এই চুপচাপ দৃশ্য যেন আনায়ার বুকে আগুনের ফুলকি ছুঁড়ে দেয়।তার হৃদয়ে জমে থাকা সব ধৈর্য, সব আশাবাদ ঠিক সেখানেই ভেঙে পড়ে কাঁচের মতো, শব্দহীন কিন্তু তীব্রভাবে।তার চোখে জমে যায় একরাশ মেঘলা রোদ্দুর,আর পায়ে জমে ওঠে প্রতিটি পদক্ষেপের ভার, ধুপধাপ পা ফেলে সে এগিয়ে যায় সেদিকে।
বর্তমান…
রিদিত বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনায়ার দিকে। আর তার এমন বোকা বোকা দৃষ্টিতে মেজাজ আরো বিগড়ে যায় আনায়ার। কলারে চেপে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে সে বলে,,
—”কি হলো কথা বলছেন না কেন কথা বলুন! সব কথা শেষ হয়ে গেছে!”
রিদিত:”শান্ত হও আয়নিন!তুমি যা ভাবছো সেরকম কিছুই নয়!আসলে..”
তাকে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে আনায়া বলে,,
—”আসলে,আসলে কি? এখন এই বলবেন তাই তো যে আমি কেন আপনাকে পাত্তা দেইনি! আপনি আমার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছেন! কিন্তু আপনি কি জানেন আমি আপনার জন্য কতটা পুড়েছি!প্রত্যেকটা মুহূর্ত কিভাবে মরিয়া হয়ে আপনাকে খুঁজেছি!হাহ!”
মলিন হেসে আনায়া ফের বলতে শুরু করল,,
—”কিন্তু না! আপনি যেটা মনে করবেন সেটাই তো সবসময় সঠিক তাই না! আমি আপনাকে সেদিন কতবার, কত কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম আপনি শুনেছিলেন আমার কথা? আপনার কাছে যেটা ঠিক মনে হয়েছে আপনি সেটাই আমার মুখে বসিয়ে দিয়েছেন! একবারও বোঝার চেষ্টা করেছেন আমার মনের কথা! একবারও জানতে চেয়েছেন আমি কি চাই?”
রিদিত অবাক নয়নের চেয়ে আছে আনায়ার পানে, যেন মনে হচ্ছে সবকিছুই তার ভ্রম, এক অলীক কল্পনায় ভেসে গেছে সে, এসবকিছুই সত্যি নয়! কিন্তু না এই সবই সত্যি! আসলেও তার আয়নিন তাকে ভালবাসে! সত্যিই ভালোবাসে! তার হৃদয়ে দোলা দিচ্ছে এক প্রেম নামক এক স্নিগ্ধ পরশ!
আনায়া:”কি হলো কথা বলছেন না কেন?”
রিদিত:”ভালোবাসো আমায়!”
আনায়া:”না! যে আমাকে ছেড়ে অন্য মেয়েকে নিয়ে সংসার করার স্বপ্ন দেখে তাকে কখনোই আমি ভালবাসতে পারি না!”
রিদিত এবার অবাক এর চূড়ান্ত সীমায়। সে আবার কবে অন্য মেয়েকে নিয়ে সংসার বাধার স্বপ্ন দেখলো! আনায়াকে দেখার আগ পর্যন্ত তার তো কোনো মেয়েকে পছন্দই হয়নি!এমনকি নাহিয়ান সাজিদ তো তাকে এই কারণে গ্রে উপাধিও দিয়েছিল! শুধুমাত্র আনায়াকে দেখেই তার হৃদ গহীনে অন্যরকম এক শিহরণ জেগেছিল! বলা যায় লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট! কিন্তু আনায়া এইসব উল্টোপাল্টা কি বলছে! সে অবাক কন্ঠে শুধালো,,
—”কি বলছ এসব? আর তোমার মাথায় এইসব উল্টাপাল্টা চিন্তা কে ঢুকালো?”
আনায়া:”আয়মান কে?”
রিদিত:”সেটা আমি কি করে বলবো?”
আনায়া:”বাহ যার কারণে আপনি দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুর পাড়ি জমাবেন তাকেই চিনছেন না এখন?”
রিদিত:”কি সব উল্টাপাল্টা বলছো? আমি আবার কবে সিঙ্গাপুর গেলাম? তোমাকে এসব উল্টোপাল্টা কথা কে বলেছে?”
আনায়া:”তাহলে কি এখন আপনি শিশিরকেও মিথ্যাবাদী বলবেন?”
রিদিত:”এসব কথা শিশির বলেছে?”
আনায়া:”হ্যাঁ!”
রিদিত এবার বুঝতে পারল শিশির আনায়াকে জেলাস করার জন্য এসব বলেছে! কিন্তু এটা তো তাদের প্ল্যানের মধ্যে ছিল না! যাই হোক কাজটা করে ভালোই করেছে শিশির! তার এমন মিথ্যা কথার জোরেই তো আজকে রিদিত নিজের প্রিয়সীর মনের অভিব্যক্তি নিজ কানে শুনতে পাচ্ছে! মনে মনে সে শিশিরকে হাজারবার ধন্যবাদ জানালো! তারপর আনায়ার থেকে ফিরে মুখটা কিছুটা গম্ভীর করে বলল,,
—”শিশির যখন বলছে তখন অবশ্যই সত্যি কথা! আর হ্যাঁ আগামী মাসেই আমি আর আয়মানকে নিজের সহধর্মিনী করছি! আর কোন প্রশ্ন?”
আনায়া এবার রাগে ফুঁসে উঠলো তার চোখে যেন উদগীরণ হলো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের রক্তিম বর্ণ, ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সে বলল,,
—”আগামী মাসে তুই আয়মানকে সহধর্মিনী করছিস মানে! তাহলে আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলি কেন?বল কেন দিয়েছিলি? কেন আবার আমার মন নিয়ে ছিনিবিনি খেললি বল! কি হলো!”
চিৎকার করে উঠল সে, রিদিত আশেপাশে তাকিয়ে বলল,,
—”কি হচ্ছেটা কি আয়নিন? এটা পাবলিক প্লেস!”
আনায়া:”তোর পাবলিক প্লেসের গুষ্টি কিলাই! আগে বল কেন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলি আমায়?”
রিদিত:”প্রতিশ্রুতিটা মিথ্যা নাকি সত্য সেটা কি করে বলছো তুমি! এটা বলো যে প্রতিশ্রুতিটা শুধু আমার দিক থেকে ছিল,একপাক্ষিক! তোমার দিক থেকে আমি কোনোদিন কোনো সাড়া পাইনি!”
আনায়া:”তাই বলে তুই সরাসরি বিয়ে করে নিবি!”
আনায়া আবার চিৎকার করে উঠলো, রাগে যেন হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে তার।রিদিত তা দেখে মুচকি হেসে বলল,,
—”যদি কখনো তোমার দিক থেকে কোনো সাড়া পেতাম তাহলে হয়তো এই সিদ্ধান্তটা নিতাম না! কিন্তু তুমি যেহেতু আমাকে ভালোবাসো না…. আচ্ছা বাই এনে চান্স তুমি কি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো?”
আনায়া এবার তার কলার ছেড়ে দিয়ে বলল,,
—”না!”
রিদিত মনে মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,,
—”হায়রে বেডি মানুষ এত কিছু করার পরেও সে নাকি আমায় ভালোবাসে না! বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না!”
তারপর সে আনায়ার দিকে ফিরে ফের বলল,,
—”সত্যি ভালোবাসো না আমায়?”
আনায়ার এক এবং অনড় অবস্থান।
—”না!”
রিদিত:”সত্যিই না!”
আনায়া:”বললাম তো না!”
রিদিত:”ভেবে বলছো তো? ভালোবাসো না আমায়!”
আনায়া:”না না না!”
রিদিত:”তাহলে আর কি? থাকো তুমি আমিও যাই আমার…”
কথা শেষ করতে পারে না সে তার আগেই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আনায়া, ঠোঁট উল্টে বাচ্চাদের মত কান্না শুরু করে দেয়, তা দেখে অবাক হয়ে রিদিত বলে,,
—”এই আয়নিন এই ! পাগল হইছো এভাবে কান্না করছো কেন! এই পাগলি এই!”
আনায়া:”ভালোবাসি!ভালোবাসি!ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে!”
কান্না তোপে আর কিছু বলতে পারল না সে!রিদিত এক প্রশান্তির হাসি হাসলো! তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত বুঝি এটি! কোন কিছুর বিনিময়ে যদি সময়কে ধরে রাখা যেত তাহলে এই সময়টিকেই সে সারা জীবন ধরে ধরে রাখত! বুকে আঁকড়ে যত্ন করে!
অতিবাহিত হলো মুহূর্ত খানেক….
রিদিতের ইশারায় ক্যাফে তখন সম্পূর্ণ ফাঁকা, একটা স্টাফ ও নেই সেখানে! শুধু জানালার কাচ গলিয়ে স্নিগ্ধ রৌদ্র কিরণ এসে পড়ছে একজোড়া কপতো-কপতির উপর।রিদিতের শার্টের একপাশ যখন আনায়ার অশ্রু জলে সিক্ত তখন রিদিত দু হাতে আলতো করে আনায়ার মুখশ্রী তুলে নিজের সম্মুখে নিয়ে আসে!
তার নয়নজোড়া সদ্য ফোটা কমলের ন্যায়,ফুলে উঠেছে মৃদু নাসাপুট দুটি আলগোছে ফুলে উঠেছে, ছড়াচ্ছে লালচে আভা,আর চিবুকের কোণে জমে আছে শুকনো অশ্রুর রেখা। তার এই অবস্থা দেখে রিদিত মুচকি হেসে গেয়ে ওঠে,,
🎶 Ho Gaya hai tujhko to pyaar sajnaa…
Lakh Karle Tu inkaar sajnaa….
Dildar sajnaa hai ye pyaar sajnaa..🎶
রিদিত গান থামিয়ে বলে,,
—”এইবার কি হবে আপনার মিস যাকে দেখলেই আপনার রাগ উঠত এখন তার প্রেমেই হাবুডুবু খাচ্ছেন! ইস রে!”
আনায়া আলতো হাতে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে গেলেই রিদিত আরো শক্ত করে তাকে জাপটে ধরে বলল,,
—”উহু! এত সহজে তো তোমাকে ছাড়ছি না! জড়িয়ে ধরেছ নিজ ইচ্ছায় কিন্তু ছাড়তে হবে এই রিদিত খানের ইচ্ছায়!”
আনায়া লজ্জায়,পরম আবেশে মুখ গুঁজে দিল রিদিতের বক্ষদেশে আর অনুভব করল তার শরীর থেকে ভেসে আসা এক তীব্র মাদকীয় সুগন্ধ!
আজ সারাদিন আনায়া আর রিদিতের কেটেছে এক নিবিড় ভালো লাগার আবেশে। ঢাকার চেনা পথঘাট আজ ওদের কাছে নতুন রূপে ধরা দিয়েছিল, প্রতিটি মোড় যেন সূচনা করছিল এক প্রেম কাব্যের!
প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক একটি সোনালি স্মৃতি,এখন গোধূলি লগ্ন। পশ্চিম আকাশে সূর্য মহাশয় বিদায় বেলার রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছেন,মেঘের গায়ে লেগেছে সোনাঝরা রঙ। এমন এক মুহূর্তে রিদিত আনায়াকে নিয়ে এসেছে এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রান্তরে।
স্থানটি শহরের কোলাহল থেকে বেশ খানিকটা দূরে, যেন প্রকৃতির এক গোপন অভয়ারণ্য। চারপাশে সবুজের মায়াবী ছায়া। পথ চলে গেছে আঁকাবাঁকা হয়ে, দু’পাশে নাম না জানা বনফুলের মেলা।
এখানকার বাতাস যেন আরও স্নিগ্ধ, আরও পবিত্র। দূরে তাকালে দেখা যায় দিগন্তরেখা, যেখানে আকাশ আর পৃথিবী একে অপরের সাথে মিশে গেছে। এই গোধূলি লগ্নে পুরো জায়গাটা এক অলৌকিক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে। পাখির কলকাকলি মৃদু সুরে ভেসে আসছে দূর থেকে, যেন দিনের শেষ গান গাইছে তারা।
মৃদু সমীরণ রাস্তা পাড়ের ছোট ছোট রং বেরঙের বন ফুল গুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলছে মনে। এখানে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন নীরব প্রেমের সাক্ষী।মাথার ওপর মাধবীলতার ঘন ঝোপ, অজস্র ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। স্নিগ্ধ সাদা আর হালকা গোলাপী রঙের মাধবীলতাগুলো যেন এক মায়াবী চাঁদোয়া তৈরি করেছে,যার ফাঁক দিয়ে গোধূলির নরম আলো এসে পড়ছে আনায়া আর রিদিতের মুখে।
মাধবীলতার মিষ্টি সুবাসে চারপাশ ম ম করছে, এ যেন প্রেমেরই সুগন্ধ। রিদিত আনায়াকে সেই মাধবীলতার ছায়ার নিচে নিয়ে এলো। আনায়া মুগ্ধ নয়নে চারপাশ দেখছিল, ওর মুখে ছিল এক অদ্ভুতম সুন্দর হাসি।
রিদিত ধীরে ধীরে আনায়ার হাত ধরল। ওর চোখে ছিল গভীর ভালোবাসা আর একরাশ স্বপ্ন। কোনো কথা না বলে রিদিত একটি মাধবীলতার ডাল তার হাতের কাছে টেনে নিল। আনায়া অবাক হয়ে দেখল, রিদিত অত্যন্ত নিপুণ হাতে ডাল থেকে একটি তাজা মাধবীলতা ফুল আলতো করে ছিঁড়ে নিল। তারপর ফুলের নরম ডগাটিকে সাবধানে তার ছোট আঙুলে পেঁচিয়ে গোল করে আংটির মতো বানাল। মাধবীলতার সাদা পাপড়িগুলো যেন একটি ছোট্ট হীরের মতো ঝলমল করছিল গোধূলির মায়াবী আলোয়।
তারপর রিদিত আনায়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে, আলতো করে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর চোখে ছিল অপার মুগ্ধতা আর হৃদয়ে ছিল না বলা ভালোবাসার সবটুকু আকুতি। সেই মাধবীলতার আংটিটা আনায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে রিদিত বলল,
— “আয়নিন, তুমি আমার জীবনে সেই ফুল, যা আমার শূন্য বাগানকে পূর্ণ করেছে।তাই আজই আকাশকে স্নিগ্ধতম পবিত্র প্রান্তরকে সাক্ষী রেখে আমি তোমাকে কাছে নিজের প্রেমানুভূতি ব্যক্ত করতে চাই! জানতে চাই Will you be my lifetime”
মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৪৩
রিদিতের কথায় আনায়ার চোখ ছলছল করে উঠল। ওর ঠোঁটে ছিল এক মায়াবী হাসি। সে কোনো কথা বলতে পারছিল না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রিদিত মৃদু হেসে, পরম ভালোবাসায় সেই মাধবীলতার আংটিটা আনায়ার অনামিকায় পরিয়ে দিল। এ যেন শুধু একটি আংটি ছিল না, এ ছিল দুই হৃদয়ের অটুট বন্ধন, দুই আত্মার নীরব শপথ। গোধূলির শেষ আলোয় মাধবীলতার ঘ্রাণে দুই ভালোবাসা একাকার হয়ে গেল, প্রকৃতিও যেন নীরব সাক্ষী হয়ে রইল এই প্রেমময় মুহূর্তের।
