মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩২
নূরায়েশা মাহনূর
– কি করছেন আপনি এখানে?
কাঁপা গলায় প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই থমকে দাঁড়ালো সাইফ। দৃষ্টি টর্চের আলোকে চারদিকে এক চক্কর ঘুরিয়ে আবার স্থির করলো তার মুখে।
– আপনি এখানে করছেনটা কি?
সাইফের বুকের ভেতরটা দমবন্ধের মতো ভারী হয়ে উঠল। কোন শব্দে নিজেকে ব্যাখ্যা দেবে, সেই বুদ্ধিই মিলল না। দৃষ্টির সামনে মিথ্যা সাজিয়ে বলা মানে আরও বিপর্যয়, এ সে খুব ভালোই জানে।
– আসলে….
– ওই দরজার পিছনে কি আছে?
ঝাঁকুনি খেল সাইফের ভিতরটা। তার নিশ্বাস পর্যন্ত জড়োসড়ো হয়ে গেল। প্রশ্নটার মানে স্পষ্ট, দৃষ্টি সবটুকুই লক্ষ্য করেছে। তবুও সাইফ নির্বাক। তার নীরবতা বাতাসে আরও ঘন অস্বস্তি টেনে আনছে।
সাইফের নিস্তব্ধতা দৃষ্টিকে স্থির থাকতে দিল না। সে পাশ কাটিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল ঝোপঝাড়ের সামনে। দু’হাতে ব্যাকুল ভঙ্গিতে কাঁটাঝোপ সরাতে সরাতে প্রকাশ করল জংধরা, বহু বছর অচল পড়ে থাকা সেই দরজা। পরক্ষণেই চেষ্টা করল সেটাকে টেনে তুলতে। কিন্তু তার মৃণাল-দেয়া শক্তি সেই মরিচাধরা লোহার প্রতিরোধ ভেদ করতে পারল না।
তখনই সাইফ এগিয়ে এল। কথা না বলে দরজাটা খুলে দিল সে। লোহার খচমচ শব্দ স্যাঁতসেঁতে রাতটাকে দুমড়ে দিল। দৃষ্টি তার দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল। চোখে বিস্ময় আর অল্পস্বল্প আতঙ্কের রেখা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– আপনি সত্যিই যেতে চান, বউ?
সাইফের নিমগ্ন প্রশ্নে দৃষ্টি মাথা খানিক ওপর-নিচ দুলিয়ে সম্মতি জানাল। সাইফ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে টর্চটা শক্ত করে ধরল। দৃষ্টিকে সাবধানে নামিয়ে নিজেও তার ঠিক পিছন পিছন নামতে লাগল স্যাঁতসেঁতে সেই সিঁড়িতে।
নিচে নেমে আসতেই সামনে গা ঠান্ডা করে দেওয়া কালো অন্ধকার। টর্চের তীক্ষ্ণ আলোর রেখা যেখানে গিয়ে পড়ছে, শুধু সেই সংকীর্ণ অংশটাই ধরা দিচ্ছে চোখে। বাকি সব এক গহ্বরের অদৃশ্য অতল। বাতাসে একটা ভয়ানক পচা-ভেজা সাঁইসাঁই গন্ধ। দৃষ্টির শ্বাসরন্ধ্র তিরমির করে উঠল। নাক কুঁচকে ওড়নাটা ঝট করে তুলে ধরল মুখে।
ধাপে ধাপে নামতে নামতে হঠাৎ সামনে কিছুটা আলো নজরে এলো। আরও কয়েক কদম এগোতেই কমলা-হলুদ অস্থির আলোকছটায় এক কক্ষ পরিষ্কার ফুটে উঠল। ইটের পাকা ঘর তবু চারপাশে অগোছালো বিশৃঙ্খলার অস্বস্তিকর চিহ্ন। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ঘরের বাঁ দিকটায় একটা ছোট তোশক বিছানো। তার পাশেই কুৎসিত ভারী লোহার শিকল পড়ে আছে মেঝেতে। দেয়ালে কোন ফোঁকড় নেই। হাওয়া প্রবেশের সামান্যতম পথও নেই। যেন ইচ্ছে করেই শ্বাস বন্ধ করার মতো বন্দিদশা তৈরি।
দৃষ্টি বিস্ময়ে হাঁ হয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল শিকলের পাশে। সেই ধাতব শিকলের গায়ে ছোপ ছোপ শুকনো রক্ত। বহুদিনের পুরোনো নয় সেই দাগ। দৃষ্টির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আতঙ্কে মুখটা থরথর করে উঠল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল সাইফের দিকে।
– এখানে কাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল?
সাইফ এক মুহূর্ত থেমে নরম স্বরে বলল,
– আমি জানি না। কাল রাতে আপনি বলার পর এখানে প্রথমই নেমেছি আমি। সবকিছু তখনও এমনভাবেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।
দৃষ্টির চোখ দুটো অসহায়ের মতো বড় হয়ে উঠল। এই জায়গাটা বহু পুরোনো। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ, বাতাসের খামচে ধরা গন্ধ, সবই সাক্ষী বহু অজানা সময়ের।জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতির দিকে তাকালে মনে হয় বছর বছর ধরে এখানে কেউ অচল হয়ে পড়ে ছিল।কতদিন? কে? কেন? তার মাথা নিরাবরণ অচল শূন্যতায় ডুবে গেল।
– এটা কে করেছে?… আপনার বাবা?
এক মুহূর্ত স্তব্ধতা ভেদ করে সাইফের সংক্ষিপ্ত উত্তর,
– হতে পারে।
দৃষ্টির হাঁটুতে কাঁপন ধরে গেল। একজন মানুষ কতটা অমানবিক হলে এমন কুকর্ম করতে পারে? ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ল তার কপাল বেয়ে। সাইফ চারদিকে আরও একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
– আমি এখান থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়েছি, দেখে বোঝার চেষ্টা করব কার। এখন এখান থেকে বের হয়ে যাই চলুন । এই জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো নিরাপদ নয়।
অভিশপ্ত গন্ধে দৃষ্টির মাথা এমনিতেই ঝিম ধরে আছে। কোনোকিছু দেখার শক্তি বা ইচ্ছা কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই সে আর তর্ক না বাড়িয়ে সাইফের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে দৃষ্টিকে ওপরে তুলে এনে সাইফ আগের মতো সবকিছু গুছিয়ে দিল। তারপর হাত ধরে নিয়ে এল ঘরের ভিতরে । ঘরে ঢুকতেই দৃষ্টি হঠাৎ ধপ করে কাউচে বসে পড়ল। মাথায় ঝিমুনি দিচ্ছে, চাহনি ঝাপসা। বুকের ভেতরটা ভয়ে জমাট।
– ওখানে… কোনো মেয়ে ছিল।
ফিসফিস করে উচ্চারণ মাত্র, তবু সেই স্বর ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিল। সাইফ চুপচাপ এসে বসল তার পাশে।দৃষ্টির চোখ জ্বলজ্বল করছে আতঙ্কে।
– আমি কাপড় দেখেছি… ওটা মেয়ের কাপড়ই, তাই না?
সাইফের দিকে তাকিয়ে আবারো কথাটা বলে উঠলো দৃষ্টি। সাইফ কিছু না বলে তাকে ধীরে টেনে নিল নিজের কাছে। দৃষ্টির শরীর কাঁপছে, ভেতরের তীব্র ভয় তার কাঁধে কাঁপুনি তুলে দিয়েছে।
– শান্ত হন… এত ভেঙে পড়বেন না।
– এই জন্যই আপনার বাবা আমাকে এত আদিখ্যেতা দেখিয়েছিলো ! এই জন্যই! মানুষটা কতটা নিচে নামলে এমন কাজ করে বলতে পারে? কত পাপ জমালে এমন সাহস আসে?
সাইফ তার চুলে ধীরে ধীরে হাত বোলাতে লাগল। দৃষ্টির বুকের ভিতর যন্ত্রণা পাক খেয়ে উঠছে। অতীতের পুরোনো ভয়েরা আবার মাথা তুলছে। আবারো কথা বলতে যাবে হঠাৎ সাইফ তার ঠোঁটে আলতো আঙুল রেখে থামিয়ে দিল। মাথা নেড়ে ইশারায় বোঝাল এখন নয়।
দৃষ্টির চোখের পাতা হালকা কেঁপে উঠল। সাইফ গভীর মনোযোগে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে কাছে এলো। তার স্পর্শে দৃষ্টির কাঁপন একটু একটু করে থিতিয়ে গেল। দৃষ্টি অসাড় হয়ে সাইফের টিশার্ট চেপে ধরল শক্ত করে; আশ্রয় খুঁজে পাওয়া মেয়েটার সে কি মরিয়া আকুলতা।
সাইফ তাকে কোলে তুলে নিল । মাপা পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে দৃষ্টিকে শুইয়ে দিল বিছানায়। ঘরের আলো নিভে গেলো । দৃষ্টির বুকের সমস্ত ব্যথা, সমস্ত দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে গলে এল সাইফের নীরব আশ্বাসে।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে ঘরের নিস্তব্ধতায় ঢুকে সুভাসিত পরত ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। সেই আবছা আলোকরেখায় নীলিমার দেহ কেঁপে উঠল হালকা শিহরণে। অর্ধচেতন ঘুমের তরঙ্গে সে স্পষ্ট অনুভব করল কেউ একজন তাকে গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে। ভিতরের গূঢ় ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ সংকেতে সেটাই জানিয়ে দিলেও চোখের পাতা তুলতে তার প্রবল যুদ্ধ করতে হচ্ছিল। জ্বরের নিঃসহায় ভারে শরীর নিস্তেজ, ক্লান্ত, কাহিলতায় ডুবে আছে।
চোখের কারুকাজ খুলতেই আলোর লোমশ রেখা এসে বিঁধল তার দৃষ্টিতে। ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাতেই বিস্ময়ের ঢেউ ছড়িয়ে গেল। ঘর শূন্য! দরজার কোণটায় চোখ পড়তেই বোঝা গেল, দরজা সামান্য খোলা। মাথার ভার সামলাতে সামলাতে সে ব্ল্যাংকেট সরিয়ে উঠে বসল। পা নামিয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্তেই মাথা দুলে উঠল, মেরুদণ্ডে তীব্র টান ঢুকে চোখের দৃষ্টি গাঢ় কুয়াশায় ঢেকে গেল। পরমুহূর্তে ধপ করে আবারো বিছানার উপর বসে পড়ল সে।
– সাবধা…
কোনো এক অগোচর কণ্ঠস্বর তার কানে এসে থেমে গেল মাঝপথেই। নীলিমা মাথা কাত করে দরজার দিকে তাকাল। আশ্চর্য! সেখানে কেউই নেই।
কিন্তু তার দৃষ্টির অগোচরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইমন। দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলায় তার শ্বাস পর্যন্ত ধরা যায়নি। অল্পের জন্য দৃশ্যমান হয়ে যাওয়ার বিপদ থেকে বেঁচে গেছে সে। এরপর নীলিমা তাকানোর আগেই সরে গেছে সেখান থেকে।
নিজের ভুল ভেবে নীলিমা আর কিছু অনুসন্ধান না করে, ধীরে ওঠে নিজেকে সামলে টলমল পায়ে চলে গেল ওয়াশরুমের অভিমুখে।
মাঝখানে কেটে গেলো আরও ছয় দিন। দিন-রাতের পালাবদল গণনার বাইরে। উজানের জীবনে সময় শুধু কাজের চাপের নদীতে ভাসতে থাকা এক গতিহীন স্রোত। নতুন ব্যবসার জোয়ারে সে এতটাই নিমগ্ন যে নিজের পায়ের শব্দটুকুও শুনে ওঠার অবকাশ নেই তার । সেই ব্যস্ততার উথলে ওঠা মুহূর্তেই দরজায় নরম ধাক্কা দিয়ে ইশিতার মা প্রবেশ করলেন তার কামরায়।
– উজান বাবা, একটা কাজ করতে পারবে?
উজান ল্যাপটপের নীল আলো থেকে দৃষ্টি তুলে তাকালেন তাঁর দিকে।
– বলো ছোট মা।
মহিলা দ্বিধাহীন স্বরে বললেন,
– দৃষ্টিকে একটু আসতে বলবে এই বাড়িতে?
উজানের ভ্রু কুঁচকে উঠল।
– এত তাড়াহুড়ো কেনো? কিছু হয়েছে কি?
মহিলার মুখে লুকোনো আনন্দের ঝিলিক। তিনি হাসি মুখেই উজানের পাশে বসে পড়লেন।
– আজকে আমার মেজো বোন আর তার বাসুরের ছেলেসহ কয়েকজন মেহমান আসবে ইশিতাকে দেখতে…
শব্দগুলো উজানের কানে পৌঁছাতেই অদৃশ্য আকাশ বিদীর্ণ হয়ে ঝটকা মেরে পড়ল তার মাথায়। মেঘহীন বজ্রপাত! গলার ভেতর কোথাও স্বর আটকে গেল। কপালের রগগুলো বিচ্ছিন্ন উত্তেজনায় তীব্র হয়ে উঠল আচমকা।
– দেখতে আসবে মানে?
তার সেই দৃঢ় স্বর শুনে মহিলা সামান্য কেঁপে উঠলেন। চুপ হয়ে থাকা অবস্থাতেই উজানের কণ্ঠ আবার তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল,
– ইশুকে বিয়ে দেওয়ার পায়তারা করছো নাকি?
– আসলে ছেলেটা খুব ভা…
– ভালো মানে? এখনো বিয়ের বয়স হয়েছে ইশিতার? এত তাড়াতাড়ি কেনো উথালপাথাল হয়ে উঠলে? ওকে তাড়িয়ে দিতে এত অস্থিরতা কেনো তোমার?
উজানের স্বর হঠাৎই চড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সে দাঁড়িয়ে পড়ল তীব্র উত্তেজনায়। ভদ্রমহিলা দিশেহারা। কী ব্যাখ্যা দেবেন, কোন শব্দে পরিস্থিতি সামলাবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।
– এখন কোনো দেখাদেখি হবে না।
– কিন্তু… ওদের তো বলেই ফেলেছি। রান্নাবান্না প্রায় হয়ে গেছে। তারা রওনা হয়েও গেছে। এখন কীভাবে ফেরত পাঠাবো? আর তারা তো বলেছে পছন্দ হলে শুধু আকদ করে রাখবে, পরে তুলে নেবে…
– মা জানে?
উজানের এবার গলা ঠান্ডা রেখে কথাটা বললো।
– সবাই জানে। বড় ভাবিও আসতে বলেছেন।
উজানের মুখে রক্তের উত্তাপ চড়তে লাগল। চোখের পেছনে রাগের তাণ্ডব।
– সবার মাঝে কি আমি পড়ি না? তোমাদের এ কেমন আদর? মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নিলে আর আমাকে জানানোর সামান্য সৌজন্যটুকুও মনে হলে না?
– আসলে…
– হয়ে গেছে। আর শুনতে চাই না। যারা আসছে, তাদের খাইয়ে দাইয়ে বিদায় করবে। ইশুকে কোথাও দেখাতে হবে না। বিয়ের বয়স ওর শেষ হয়ে যাচ্ছে না। ওর জন্য ওই ছেলের থেকেও হাজারগুণ ভালো মানুষ পাওয়া যাবে।
– কিন্তু…
উজান ধীরে ঘাড় কাত করে তাকাতেই ভদ্রমহিলার বাকিটুকু গিলে ফেলার মতো অবস্থা হলো। নিজের ভয়টুকু সামলে তিনি চুপচাপ চলে গেলেন সেখান থেকে।
দরজা বন্ধ হতেই চারদিকে এক ধরনের গুমোট ভার জমে উঠল। উজানের মাথা টনটন করছে। রাগ, অপমান আর দুশ্চিন্তার ঝড় একসাথে আছড়ে পড়ছে তার মস্তিষ্কে। চারপাশের বাতাস পর্যন্ত তার কাছে এখন অসহ্য, ভারী, শ্বাসরুদ্ধকর লাগছে।
আয়নার সামনে বসে বসে চুল বুলিয়ে বুলিয়ে আঁচড়াচ্ছিল ইশিতা। গুনগুন করে গাওয়া তার সুরে এক অদ্ভুত নিষ্পাপ আনন্দ। অগোচর বাতাসে ভেসে আসা সেই প্রফুল্লতার রেশ দরজার কাছে আসা উজানের পা থামিয়ে দিলো । সেই গুনগুন তার কানে সুর হয়ে নয় হিংস্র বিষধারার মত দপদপ করে রক্তে ছড়িয়ে যেতে লাগলো । “এত সুখ আসে কোথা থেকে ওর!” উজানের ভেতরে তীব্র এক প্রতিক্রিয়া দপদপ করে উঠল।
সজোরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। ধপ করে চমকে উঠল ইশিতা, চিরুনি হাত থেকে ছিটকে পড়ে মেঝেতে লুটিয়ে গেল। দুহাত বুকের উপর তুলে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। উজানের এমন অগ্নিমূর্তি সে আগে দেখেনি।
উজান তড়িঘড়ি পায়ে এগিয়ে এসে একেবারে তার সামনে থামল। এক ঝটকায় ঝুঁকে এল। এত কাছে যে তার উত্তপ্ত শ্বাস ইশিতার চোখ-মুখ পুড়িয়ে দিতে লাগল। ভয় পেয়ে সে চোখ দুটো সঙ্কুচিত করে ফেলল। পরের মুহূর্তেই, থ্যাম! ড্রেসিং টেবিলের উপর উজান সজোরে থাবা বসিয়ে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
– খুব শখ না বিয়ে করে ফেলার? এত শখ আসে কোথা থেকে তোমার?
ইশিতা গলা শুকনো হয়ে চোখের পাতা পিটপিট করে খুলল। চোখাচোখি হতেই অবাক বিস্ময়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। মাথা খানিকটা পেছনে সরিয়ে সে কাঁপা গলায় বলল,
– বিয়ে? কার বিয়ে?
এত ভান করছে কেনো ইশিতা? উজানের রাগ আবার স্ফুলিঙ্গের মত মাথা তুলে জ্বলে উঠল। ইশিতার মুখের সামনে আরও একটু ঝুঁকে এল সে।
– এমন ভাব ধরেছিস যেন কিছুই জানিস না। অথচ এখানে বসে মুখে পাউডার ঘষে ল্যাজে-গোবরে সাজছিস!
ইশিতা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
– কি বলছ তুমি? আমি তো এমনি চুল আঁচড়াচ্ছি। আর আজকে মেহমান আসবে তুমি জানো না? তোমার ইচ্ছে আমি কি জরিনার মত নোংরা কাপড় পরে বসে থাকবো?
উজান ঠোঁট কামড়ে ধরে রাগ সামলাতে লাগল। সেই অল্পের নিয়ন্ত্রণে চোখের রং প্রায় লালচে হয়ে উঠেছে। তার ওই দহনময় মুখ দেখে ইশিতা একবার ঢোক গিলে নিল। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তিটুকু বদলালো না। উজানের ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আর এই মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে তার রাগটাকে খাঁটি উপহাস বানিয়ে ফেলছে। হঠাৎ দুহাতে উজানের বুক ঠেলে নিজেকে সরিয়ে নিল ইশিতা। দৃঢ় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সে।
– সরো তো! আমাকে তৈরি হতে দাও। আজকে আমার খালামনি আসছে এটা তুমি জানো না নাকি? আর তার সাথে পিয়াস ভাইয়াও আসছে। ইশ… কত বছর পর পিয়াস ভাইয়ার সাথে দেখা হবে ভাবতেই কী খুশি লাগছে আমার!
বলার শেষ শব্দটুকু ফসকে বেরোতেই আয়নার সামনে গিয়ে আরও খুশিমাখা ভঙ্গিতে পোনিটেল বাঁধতে লাগল ইশিতা। সামনে থেকে দু’গুচ্ছ চুল বের করবে ঠিক তখনই তার রাবারটা টেনে খুলে ফেলল উজান। চুল ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইশিতাকে দেয়ালে চেপে ধরল সে ।
ইশিতা মুহূর্তের মধ্যে জমে গেল একদম বরফের খণ্ডের মতো। উজান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– আমাকে জ্বালাতে খুব ভালো লাগছে তাই না? আমাকে পুড়তে দেখে বেশ শান্তি পাচ্ছিস তুই?
ইশিতা ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু উজান তার দু’হাত কব্জি থেকে চেপে তুলে রাখল মাথার পাশে, দেয়ালে ঠেসে। অন্য হাতটা তার কোমর ঘিরে তাকে এত কাছে টেনে আনল যে দু’জনের শ্বাস একে অপরকে ছুঁতে লাগল।
– ভালো হচ্ছে না কিন্তু, ইশুপাখি… আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিস না।
ইশিতা বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে পলক ফেলে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– আমাকে ভালোবাসো?
প্রশ্নটা শোনামাত্র উজানের চোখের তেজ গলে নরম হয়ে এল। হাতে থাকা বাঁধনটাও শিথিল হলো। সে কিছু বলল না চেয়ে রইল শুধু ইশিতার চোখের গভীর খাতে।
– বলো? শেষবারের মতো সুযোগ দিচ্ছি। না বলতে পারলে সরো আমাকে তৈরি হতে হবে। সবাই চলে আসবে।
উজান এখনও নীরব। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে ইশিতার কব্জি থেকে সরে গেল। ইশিতা সেইসব দেখল একটু আহত দৃষ্টিতে। উজান সম্পূর্ণ হাত ছেড়ে দিতেই সে অল্প নড়ে উঠল। তারপর কোনো কথা না বলে, কোনো অভিযোগ না রেখে পাশ কাটিয়ে সরে গেল।
আবারও এক বিরতিহীন টানে ইশিতার কব্জি আবার নিজের দখলে নিয়ে নিল উজান। একি মুহূর্ত, সে ঘুরে এসে সরাসরি উজানের বুকে ধাক্কা খেল। বুকটা যেন ইটের দেওয়াল। ধাক্কার অভিঘাতে ইশিতার মাথা হালকা নড়ে উঠল। উজান দুহাতে তার কোমর জড়িয়ে একেবারে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। চোখে চোখ রেখে তীক্ষ্ণ, গম্ভীর স্বরে বলল,
– তোকে আমার চাই…
ইশিতা গিলল, তারপর নরম স্বরে বললো,
– আর?
– আমার তো-কেই লাগবে।
– আর?
– তুই শুধু আমার।
– আর?
উজানের গলা থমকে গেল। চোখের দৃষ্টিটা ঘনীভূত হলো। ভাবল, আরেকটু ভাবল… তারপর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে হঠাৎই ঝুঁকে এল। আলতো করে চেপে ধরল ইশিতার অধর। এমন স্পর্শে আগে কখনো পড়েনি ইশিতা। মনে হলো পুরো সত্তাটা গভীর জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। হাত থরথর করছে, চোখের পাতা শক্ত করে বন্ধ হয়ে গেলো। আঙুলগুলো খামচে ধরেছে উজানের টি-শার্ট। মুহূর্ত কয়েক পরে উজান সরে এল, তবে চোখ সরাল না ।
– যে কথাটার জন্য তোর এত ছটফটানি… সেটা তোকে আমি খুব আয়োজন করে বলব। জোর করবি না। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে এই ধরনের শাস্তি পাবি সহ্য হবে কিনা ভাবিস।
ইশিতা লাজুক হেসে তার বুকে দুটো কিল মারল। চুল টেনে ঠিক করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
– এমনিতেও আমি আম্মুকে বারণ করে দিয়েছি। তুমি শুধু শুধু রাগ দেখাচ্ছিলে।
উজান ভ্রু উঁচু করল।
– মানে তুই সব জেনে মজা নিয়েছিস? আমাকে বাধ্য করেছিস এমন কাজ করার জন্য?
ইশিতা এবার ঘুরে তাকাল।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩১
– তুমি যে এমন বেহায়া তা কি আমি জানতাম?
উজান এগিয়ে এল এক পা,
– এইদিকে আয়। আরেকটু আদর করি। কম হয়ে গেছে।
– উজানের বাচ্চা!
বলেই ঘুরে দৌড় দিল ইশিতা। উজান সেদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে মুচকি হেসে ফেলল। একটা পরম তৃপ্তির হাসি, যা শুধুই ইশিতার জন্য।
