Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩১ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩১ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩১ (২)
jannatul firdaus mithila

স্বয়ং দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে শ্যাডো মনস্টার হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে! এহেন অকল্পনীয় দৃশ্যে হতভম্ব সবাই। এতক্ষণ যাবত বোবার ন্যায় মেঝেতে লুটিয়ে থেকে মা’র খেতে থাকা লোকগুলোও কেমন হা হয়ে করে তাকিয়ে আছে দেখো! তাদের চোখেমুখে সে-কি অবিশ্বাস্য ছাপ! এদিকে এডউইন কেমন হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। এক-আধবার নিজ চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে সহসা দু’হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখদুটো ডলে নিয়েছে বেশ। তবে বালাইষাট! এতে সম্মুখের দৃশ্য থোড়াই পাল্টালো। এডউইন কেমন অস্থির হচ্ছে ক্রমশ! রুশদী কিংয়ের এহেন কান্ডকে এখন অব্ধি বিশ্বাস করতে পারছেনা সে। নিজ অক্ষিপুটকেই ধিক্কার জানাচ্ছে বারংবার। এতেও যদি স্বস্তি মিলতো বেচারার! এডউইনের অবচেতন মন ধরেই নিলো সে স্বপ্ন দেখছে। তাইতো নিজেকে এহেন ভয়ংকর স্বপ্নের ডোর থেকে জাগ্রত করতে তড়িঘড়ি করে নিজ গালেই সপাটে বসাল দু-থাপ্পড়। কিন্তু ওমাহ! নিজ শক্তপোক্ত হাতের থাপ্পড় খেয়ে মুহূর্তেই গালটা কেমন আপনা-আপনি বেঁকে গেল এডউইনের। বেচারা হকচকিয়ে ফের তাকায় সম্মুখে। এবারেও দৃশ্যমান হলো একই দৃশ্য। এডউইন ফাঁপা ঢোক গিলল পরক্ষণে। তক্ষুনি মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল মেঝেতে। পরমুহুর্তেই গ্রাউন্ড ফ্লোরের সকল গার্ডস নিজেদের অস্ত্র নামিয়ে একইভাবে বসে পড়ল হাঁটু গেঁড়ে। স্বয়ং রুশদী কিং যেখানে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে সেখানে তারা দাঁড়িয়ে থাকবে কোন সাহসে? তাছাড়া এহেন দুঃসাধ্য দেখিয়ে কেউ থোড়াই অকালে প্রাণ দেবে!

স্বচ্ছ কাঁচের তৈরী মেঝের চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোট ছোট কাঁচের টুকরো। স্বচ্ছ তীক্ষ্ণ টুকরোগুলোর গায়ে হলদেটে মৃদু আলো পড়ায় তা কেমন হিরার ন্যায় চিকচিক করছে। অথচ এরূপ ধারালো কাঁচের টুকরোর ওপর ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে হাটুঁ গেঁড়ে বসে আছে মুগ্ধ। হাঁটু থেকে নির্বিকারে গড়িয়ে যাচ্ছে তাজা তাজা লহু। একটু সামনেই কাঁচের তৈরী শেষ সিড়িঁটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মাহি। ডানপা তার এখনো মুগ্ধ নামক নির্দয় মানবের হাতের শক্তপোক্ত তালুতে দাঁড়িয়ে আছে। যুবকের ডানহাতের পিঠ গিয়ে ঠেকেছে কাঁচের টুকরোগুলোর ওপর। ফর্সা হাতখানার চামড়া ফেটে বেরুচ্ছে উষ্ণ লহু। ভীত সপ্তদশীর ক্ষুদ্র কায়া কাঁপছে ভীষণ। পায়ের নরম হাড় টলমল তার। সর্বাঙ্গে এক অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূত হচ্ছে কেন যেন। সুশ্রী মুখখানা লেপ্টে গেছে ভয়। সপ্তদশী নড়েচড়ে পা সরাতে গেলেই সম্মুখের যুবক এবার মুখ তুলে তাকাল। মুহুর্তেই ভড়কায় মাহি। যুবকের দৃঢ় চোয়াল কেমন শক্ত হয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চাপার ভয়ানক আওয়াজ স্পষ্ট কানে যাচ্ছে মাহির। ফর্সা কপালের রগগুলো বেশ স্পষ্টতর আজ। তার বাদামী চোখদুটো যেন আগুন ঝরাচ্ছে এমুহূর্তে। সেই অগ্নিদৃষ্টিযুগলের সনে চোখাচোখি হতেই বুক মোচড়ে ওঠে মাহি’র। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে নেয় বারকয়েক। নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে কানদুটোকে বকা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতেই যাবে ওমনি এক ঝটকায় তার পা সরিয়ে দেয় মুগ্ধ। এহেন অতর্কিত কান্ডে টলমল মাহি! ক্ষুদ্র দেহটা এক পায়ে খুব একটা ভর দিয়ে থাকতে না পেরে যেইনা হেলে পড়বে ঠিক তখনি এক হিং স্র থাবা এসে আচমকা চাপ বসালো তার কন্ঠায়। হকচকায় সপ্তদশী! ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে ব্যথাতুর শব্দ তুলে পরক্ষণেই কন্ঠদেশের ব্যথায় কুঁচকে নেয় মুখ। এদিকে সামনে থাকা রূঢ় মানব কেমন কটমট করছে। জখম হওয়া হাতখানা দিয়ে সপ্তদশীর কোমল কন্ঠা চেপে ধরায়, মেয়েটার মোমের ন্যায় মোলায়েম ত্বকে লেপ্টে আছে তার উষ্ণ লহু। মাহি কাতরাচ্ছে ব্যথায়। তা দেখে থোড়াই মন গললো যুবকের। সে কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস শব্দ তুলে, হাতের জোর বাড়িয়ে বজ্রধ্বনিতে আওড়াল,

“ ইউ্য বি’চ! হাউ ডেয়ার ইউ কাম আউটসাইড উইদাউট মাই পারমিশন? এটা তোর বাপের বাড়ি পেয়েছিস বান্দীর মেয়ে, যে যখন-তখন এদিক-ওদিক ঘুরোঘুরি করবি? নিচে নামলি কেনো? জাস্ট আন্সার মি ইউ্য ব্লা’ডি বি’চ, হোয়ায় ডিড ইউ্য কাম কাম আউটসাইড?”
হিং স্র যুবকের এহেন গর্জন ধ্বনিতে জড়সড় সবাই। কেউ আর সাহস করল না চোখ তুলে তাকাতে। এদিকে মাহি কাতরাচ্ছে। অব্যর্থ চেষ্টায় দূর্বল কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াচ্ছে —
“ আমি..আসলে..কিউটি!”
তক্ষুনি ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল যুবকের। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে আলগোছে কামড়ে ধরল নিচের ঠোঁট। দাঁতের কটমটানো বাড়ল তার। ডানহাতে মাহি’র কন্ঠা চেপে রেখে, বাহাত উঁচিয়ে শক্তভাবে ডলতে লাগল নিজ ঘাড়। অতঃপর কটমট কন্ঠে শুধালো,
“ আবার কিউটি… ঐ মাদা’রফা’কারের নাম আমার সামনে তুলবিনা জানোয়ারের বাচ্চা।”
বলতে বলতেই হাতের চাপ আলগা হলো যুবকের। একটুখানি ছাড়া পেতেই সপ্তদশী কেমন হাঁপাতে হাঁপাতে নিশ্বাস টানতে তৎপর হলো। মুগ্ধ তখন চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে গমগমে গলায় হুংকার ছুঁড়ল,

“ এডউইন!”
ত্বরিত হাঁটু উঁচিয়ে, দৌড়ে আসে এডউইন। নতমস্তকে দু’হাত পেটের কাছে ভাঁজ করে বিনয়ী ভাবভঙ্গিমা ধরতেই মুগ্ধ কেমন দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে ওঠে,
“ এই বান্দীর মেয়েকে এক্ষুণি প্যালেসে দিয়ে আয়।”
আদেশ পেয়ে আলতো করে ঘাড় কাত করল এডউইন। পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। মুগ্ধ এবার কঠিন চোয়ালে স্থান ত্যাগ করতে উদ্যোত হতেই বেচারি সপ্তদশী কেমন মিনমিনিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে আওড়ায়,
“ যেখানে বলবেন সেখানেই যাব তবুও আমার সাথে আমার কিউটিকে দিয়ে দিন প্লিজ! ওকে ছাড়া আমার ভালো লাগবেনা।”

থামল রূঢ় মানব। হাতদুটো তৎক্ষনাৎ মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে চোখ বুজেঁ ঠোঁট কামড়ে ধরল মাত্রাতিরিক্ত রাগে। এমনিতেই কিউটির কথা শুনতে পারেনা সে, তারওপর মেয়েটা বারবার তার সামনে আমার কিউটি, আমার কিউটি উচ্চারণ করে যাচ্ছে। এতে যে রাগের পারদ তরতর করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে যুবকের, সে খবর কি আর রাখছে সপ্তদশী? রাখলে থোড়াই বলত এসব! মুগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। শক্ত চোয়ালে কটমট করছে দাঁত। ওদিকে এডউইন ভুলবশত মুখ খুলে মাহি’কে অগ্রসর হতে বলতে গিয়েও আচানক স্থবির হয়ে গেল বিচক্ষণের ন্যায়। ঢোক গিলে মুখের কথাটুকু মারাত্মক দক্ষতায় হজম করে নিয়ে কেবল বিনয়ী ভঙ্গিতে ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে ইশারায় বোঝাল অগ্রসর হতে। মাহি কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। হেঁচকি তুলে ঘাড় বাকিয়ে আলগোছে চাইলো বাঁদিকে। অদূরের সোফা-কাউচে গা গুটিয়ে বসে আছে পশমি বোবা প্রাণীটা। রীতিমতো কাঁপছে ভয়ে। সামনে এগোতে পারছেনা কাঁচের টুকরোর উপস্থিতিতে। মাহি’র পরাণ পুরলো বেচারার জন্য। সে ফের হেঁচকি তুলে তুলে আওড়াল,
“ আমার কিউটিকে দিয়ে দিন না মিঃ বিস্ট! আই প্রমিস, আমি আর অবাধ্য হবো না আপনার।”

সপ্তদশীর দেওয়া মনস্টারকে এহেন নতুন সম্বোধনে মুখাবয়বে গম্ভীর ছাপ ফুটলো এডউইনের। চোখেমুখে লেপ্টে গেল অসন্তোষের ছাপ! এদিকে যার উদ্দেশ্যে সপ্তদশী কথাটা বলল সে কেমন ফোঁস ফোঁস করছে। মুখখানা আগের চেয়ে দ্বিগুণ শক্ত করে আচমকা তেড়ে এলো মাহি’র পানে। অতঃপর কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই সপ্তদশীর মাখনের ন্যায় নরম গালটায় বসালো এক চপেটাঘাত! তৎক্ষনাৎ গাল বাকিয়ে কান্নার বেগ বাড়াল মাহি। চপেটাঘাতের জোরে চোখ থেকে চশমাটা খুলে পড়েছে ফ্লোরে। সেদিকে অবশ্য তেম একটা পাত্তা দেয়নি মেয়ে। উল্টো জ্বলতে থাকা গালটায় হাত বুলিয়ে কাঁদছে অনবরত। নির্দয় মানব ওটুকুতে থামেনি। তক্ষুনি তেড়ে এসে একহাতে সপ্তদশীর নরম-সরম ঘাড়টা শক্ত হাতে চেপে ধরে, অন্যহাতে থাবা বসালো মেয়েটার গ্রীবায়। হুটহাট আক্রমণে হতভম্ব মাহি! কান্না ভুলে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। রূঢ় মানব কেমন কটমট করতে করতে এক অদ্ভুত অধিকারবোধে বলে ওঠে,

“ এ্যাই জানোয়ারের বাচ্চা তোর মানে? যেটা না সেটাকেই কথায় কথায় তোর বলতে হবে কেনো? এতোকিছু করার পরও তোর শিক্ষা হয়না বান্দীর মেয়ে? তোর ঐ মুখ দিয়ে “ আমার ” বাক্যটুকু কেবলমাত্র আমার জন্য বেরুবে, এ পৃথিবীর অন্য কিছুর জন্য নয়! আই রিপিট, কোনো মানুষ, বস্তু কিংবা সামান্য একটা খরগোশের জন্যও নয়। হেন্সফোর্থ আমি যদি দেখেছি তুই আমার কথার অবাধ্যতা করেছিস দ্যান আই সয়্যার, সবার আগে যাকে তোর বলবি তাকে নিজ হাতে জ’বাই করব এন্ড দ্যান তোকে জ’ বাই করব। জাস্ট মার্ক মা’ই ওয়ার্ডস বি’চ!”
মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেল সপ্তদশীর। আজ রূঢ় মানবের এহেন অদ্ভুত আদেশে বুক কাঁপছে তার। ছলছল চোখজোড়া একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নির্দয় মানবের আগুন চোখে। আশ্চর্য্য! যুবকের চোখে আজ ভিন্ন এক অধিকারবোধ। বরাবরের ন্যায় আজ সেথায় ঘৃণার লেশমাত্রও নেই। মাহি থমকেছে। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। কানে কি শুনল না শুনল তাতে কিচ্ছু যায় আসছেনা তার, সে শুধু দেখছে যুবকের বাদামী চোখদুটো। রূঢ় মানব ফোঁস ফোঁস করছে। ভীষণ রাগে গজগজ করতে করতে আচমকা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিলো মাহি’র ঘাড়, গ্রীবা। অতঃপর হিং স্র বিকট ধ্বনিতে এডউইনকে ফের আদেশ ছুড়েঁ,

“ ওকে এক্ষুণি আমার দু-চোখের সামনে থেকে সরা এডউইন।”
সহসা এগোতে তৎপর হলো এডউইন। গুনে গুনে মাত্র দু-কদম এগোতেই পেছন থেকে ধেয়ে এলো মনস্টারের হুংকার!
“ টেক দ্যাট ফা’কিং রেবিট এজ ওয়েল!”
থামল এডউইন। গম্ভীর মুখে মাথা নুইয়ে পা ঘোরালো উল্টোপথে। কাঁচের টুকরোর ওপর ব্যুট জুতাের মর্মর শব্দ তুলে এগোয় সোফা কাউচের দিকে। একহাতে আলতো করে খরগোশ ছানাকে তুলে নিয়ে, তার গায়ে হাত বোলায় এডউইন। কিয়তক্ষন চোখা দৃষ্টিতে প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে থেকে যুবক মনে মনে আওড়াল,
“ ড্যাম বাডি! ইউ্য আর সো লাকি!”

কথাটা মনে মনে আওড়াতেই ঠোঁটের কোণে আচমকা বাঁকা হাসির রেশ দেখা গেল এডউইনের। তবে সময় পেরুতে না পেরুতেই তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কেমন। মুখাবয়বে টানলো কপট গম্ভীর ভাব। এডউইন পিঠ ঘুরিয়ে ফের চলে এলো সম্মুখে। পায়ের গতি সিঁড়ি থেকে দু’হাত দুরত্বে থামিয়ে নতমস্তকে খরগোশ ছানাকে এগিয়ে দিলো মাহি’র দিকে। পছন্দের আদুরে ছানাকে ফের কাছে পেয়ে এতক্ষণের কষ্ট বেমালুম ভুলে গেল মাহি। ঠোঁটের কোণে ভেজা হাসির রেশ টেনে যেইনা কিউটিকে কোলে নিবে ওমনি একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে তড়াক চেপে ধরে তার নরম কব্জি! ভড়কায় মাহি। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দৃশ্যমান হয় মুগ্ধের কটমট চাহনি। থতমত খেয়ে বসল মাহি! আবার কি ভুল করল তা যাচাই-বাছাইয়ের পর্বে গেল না সে। কেননা গেলেও যা, না গেলেও তা। সবশেষে দোষ থাকুক বা না থাকুক, নির্দয় মানবের থাপ্পড় যে খেতেই হবে। মাহি মাথা নুইয়ে নিজেকে শক্ত করতে লাগল। চোখমুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। এদিকে মুগ্ধ তখন ছো মেরে এডউইনের হাত থেকে খরগোশটা নিয়ে নিলো নিজ হাতে। অতঃপর কঠিন মুখাবয়বে একপল খরগোশের পানে তাকিয়ে রইলো কেমন। সেকেন্ড পেরুতে না পেরুতেই পশমি ছানাকে আলগোছে তুলে দিলো মাহি’র হাতে। চোখমুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। হাতে নরম পশমি প্রাণীর পরশ পেতেই তড়াক চোখ খুলল সপ্তদশী। অক্ষিপুটের সম্মুখে কিউটিকে দেখে ভেজা চোখে হাসল কেমন। আলগোছে কিউটিকে দু’হাতের আঁজলায় নিয়ে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে সে। ওদিকে আড়দৃষ্টে এহেন দৃশ্য দেখল মুগ্ধ। নাকের পাটা ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেললো বারকয়েক। চোয়ালের পেশী টানটান করে তক্ষুনি গটগট পায়ে ত্যাগ করল স্থান। এডউইন এগোয় খানিক। নিরবে সম্মুখে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে ইশারায় বোঝালো এগোতে। তবে এমুহূর্তে বিড়ম্বনায় পড়ল মাহি। ফ্লোরে বিছিয়ে আছে কাঁচের টুকরো, সবার পায়ে জুতো থাকলেও তার পা উম্মুক্ত! হাঁটতে গেলে কাচঁ ঢুকবেনা? মাহি খানিক দোনোমোনো করে মিনমিনে স্বরে আওড়াল,

“ ইয়ে মানে…আমিতো জুতো পরিনি! আমি জুতো পরে আসি?”
এডউইন স্থির থাকলেও তক্ষুনি দাঁতে দাঁত চাপলেন মনস্টার। কোমরের দু’পাশে হাত চেপে কটমটিয়ে বলল,
“ হাঁটার জন্য জুতোও লাগবে বান্দীর মেয়ে? তাহলে খালি পায়ে নিচে নামলি কেনো? এখন এসবের ওপর দিয়েই খালি পায়ে হাঁটবি! আমার অবাধ্যতা করার সময় তো মনে থাকে না কোনোকিছু! তাহলে বোঝ এবার। যা হাটঁ!”
সপ্তদশীর চিবুক নামল গলার কাছে। কিছুক্ষণ আগে এই লোকটাই তাকে কাঁচের ওপর পা রাখা থেকে বাঁচিয়েছিল, আর এখন? সে নিজেই বলছে এসবের ওপর দিয়ে হাঁটতে? নাক টানলো মাহি! কপালে থাকলে আর কি’বা করার আছে তার? সপ্তদশী নিজেকে শক্ত করল মনে মনে। কাঁপা কাঁপা বদনে সামনে বাড়ালো পা। চোখমুখ খিঁচে নিলো আগেভাগে। তার বাম পা-টা যখন প্রায় ছুঁই ছুঁই ফ্লোরের সঙ্গে ঠিক তখনি একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এসে আচানক শক্ত করে চেপে ধরল মাহি’র কোমর। ভড়কায় মাহি! তড়িঘড়ি করে চোখের পর্দা সরিয়ে হতচকিত দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখে রূঢ় মানব কেমন শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে তার পানে। মাহি চোখ খুলতেই নির্দয় মানব দিলো এক জোরালো ধমক! চাপা স্বরে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,

“ বড্ড জ্বালাচ্ছিস আমায় বান্দীর মেয়ে! এখনো সময় আছে আমাকে জ্বালাতন করা ছেড়ে দে, নাহলে এর ফল কিন্তু মোটেও সুখকর হবে না! মাইন্ড ইট।”
হতবুদ্ধির ন্যায় চেয়ে আছে মাহি। লোকটা ওসব কি বলছে কে জানে! সে আবার তাকে কবে জ্বালাতন করল? উল্টো লোকটাই না তাকে যখন-তখন জ্বালিয়ে মা’রছে! মাহি চোখ নামিয়েছে। যুবকের হাতের বাঁধনে বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে তার। মেয়েটা অস্বস্তিতে মোচড়াচ্ছে কেমন। তা দেখে দাঁত খিঁচে মুগ্ধ। তক্ষুনি কোনরূপ কালবিলম্ব না করে মেয়েটার হাত থেকে খরগোশ ছানাকে ছো মে’রে নিয়ে নিলো কেমন। এহেন কান্ডে হকচকায় মাহি। আদুরে ছানার জন্য অসহায় কন্ঠে মুখ খুলতেই যাবে ওমন মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষ এক ঝটকায় তাকে তুলে নিলো কাঁধে। মাহি হাত-পা ছুড়ছে বেশ! আতঙ্কিত কন্ঠে আওড়াচ্ছে,

“ ছাড়ুন আমায়। কি করছেন! আমার..আমার..”
বাকিটুকু বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ পূর্বের ঘটনাটা হুট করে মনে পড়ে গেল সপ্তদশীর। যুবকের সামনে ❝ আমার, আমার❞ করে আর মা’র খাওয়ার মতো সাধ্যি হলোনা তার। সে কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে লাগল। এদিকে মুগ্ধ তখন শক্ত চোয়ালে খরগোশটাকে এগিয়ে দিলো এডউইনের দিকে। পরক্ষণে আর কোনো কৈফিয়ত দেবার প্রয়োজনবোধ না করে এগোয় মনস্টার। মাহি’কে কাঁধে নিয়ে হাঁটছে সে, না হাত রেখেছে মেয়েটার গায়ে। মাহি ভয়ে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। এডউইন পিছুপিছু আসছে। তার কোলে কিউটি, গুটিসুটি মেরে বসে আছে কেমন। পেন্টহাউজের সম্মুখের বিশালকার দুয়ারের দ্বারে পড়ে আছে গোলাকার কিছু একটা। নির্দয় মানব এগিয়ে এসে আলগোছে ফুটবলের মতো কিক বসালো গোলাকার বস্তুটির গায়ে। আর ওমনি বস্তুটি গিয়ে আছড়ে পড়ল পেন্টহাউজের বাইরে। গোলাকার হওয়ায় তা গড়াচ্ছে ভীষণ। গড়াতে গড়াতে গিয়ে অবশেষে থেমেছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা রেলিঙের দ্বারে।

যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’হাত পকেটে গুঁজে এগোচ্ছে। পেন্টহাউজের বাইরে সবটা কেমন আবছা আলোয় বুদঁ হয়ে আছে। এহেন আবছা আলো-আঁধারিতেই এগোয় মনস্টার। মাহি’কে কাঁধে নিয়ে পা বাড়াল দূর্গম পাহাড়ি রাস্তায়। ওদিকে কোত্থেকে যেন কয়েকটা নেকড়ে এসে জুটলো পাহাড়ের রেলিঙের দ্বারে। গোলাকার বস্তুটির জন্য তারা একে অপরের সাথে কেমন হাঁকাচ্ছে দেখো! হিং স্র দাঁতের ধারালো কামড়ে ছিড়েখুঁড়ে যাচ্ছে গোলকাকার বস্তুটিকে। এডউইন বাইরে পা রাখতেই চোখ ফেলল নেকড়েদের দিকে। হিং স্র প্রাণীদের ওমন কার্যক্রম দেখে গা ছমছম করে উঠল তার। আহারে! সামান্য একটা মাথা নিয়ে নেকড়েদের কত কামড়াকামড়ি! এডউইন কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থেকে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে এগোয় পাহাড়ি রাস্তার দিকে।
পাহাড়ের উঁচু নিচু পাথুরে পথ! যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটলেও মাহি’র হয়েছে বেহাল দশা! একে-তো যুবকের প্রশস্ত কাঁধের ওপর পড়ে আছে বেচারি, তার ওপর ওমন উঁচু নিচু হাঁটা। লোকটা তো তাকে আগলেও ধরছেনা। না যেন কখন পড়ে যায় বেচারি! মাহি ভয়ে ভয়ে চোখ খিঁচে আওড়াল,

“ আ-আমার ভয় লাগছে।”
শুনল মুগ্ধ। কঠিন মুখাবয়বে তখনও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি তার। সে উল্টো গমগমে গলায় প্রতিত্তোর করল,
“ ম’রবি না এতো সহজে। সো চি’ল!”
ভ্রু গোটায় মাহি। সে বেশ জানত লোকটা তাকে এমন কিছুই বলবে। সপ্তদশী ভয়ে চোখমুখ কুঁচকে পড়ে রইল কাঁধে। তবে এরইমধ্যে যুবক ঢালু পথে পা রাখতেই কাঁধ থেকে হালকা গড়িয়ে পড়তে নেয় মাহি। কিন্তু সময় মতো নিজেকে সামলাতে মেয়েটা তড়িঘড়ি করে আচমকা খামচে ধরল যুবকের পিঠ! ফলে যুবকের ফর্সা উদোম পিঠের চামড়ায় মুহুর্তেই দেবে গেল মাহির নখ। তৎক্ষনাৎ থেমে গেল মুগ্ধ! চোয়াল শক্ত করে দাঁত খিঁচে হিসহিসিয়ে বলল,
“ তুই কি জানিস বান্দীর মেয়ে? তোকে এমুহূর্তে মে’রে ফেলাটা আমার জন্য আবশ্যক হয়ে যাচ্ছে!”
শুকনো ঢোক গিলল মাহি। তড়িঘড়ি করে যুবকের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে, অপরাধী কন্ঠে আওড়াল,
“ সরি!”
“ তোর সরি মা’ই ফুট বান্দীর মেয়ে! আরেকবার আমার গায়ে টাচ লাগলে এই পাহাড় থেকে নিচে ছুড়ে ফেলব, মাইন্ড ইট! রাতের দিকে আশেপাশে অনেক ক্ষুধার্ত পশু ঘোরে, আজ নাহয় তোর মতো কাকলাস ওদের খাবার হবে।”
হকচকিয়ে ওঠে মাহি। মুখটায় কেমন কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে হড়বড়িয়ে বলে ওঠে,
“ এই না না! আর ছোঁব না প্রমিস।”

প্রায় মিনিট চল্লিশেক পেরুলো! পাহাড়ের দূর্গম রাস্তা দিয়ে অবশেষে নেমে আসেন মনস্টার। বেচারি মাহি কেমন চুপসে গিয়েছে এতক্ষণে। মুগ্ধ এতক্ষণে পাঁচটে সিগার শেষ করেছে। ছ’নম্বরটা এখনো ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলছে। সিগারের ধোঁয়া সহ্য হয়না বেচারির। সে-ই কখন থেকে নাকমুখে হাত দিয়ে চেপে রেখেছে সে! এবার তো মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাবে বেচারি। মুগ্ধ বিরতিহীন কদমে এগোচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তা পার করে এবার তার ব্যস্ত কদম ঢুকল চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে। চোখ কুঁচকে রাখা মাহি এতক্ষণে পিটপিট করে চোখ খুলল। সম্মুখে প্রিয় জায়গার আবহ দেখে বুকটায় বোধহয় খানিকটা স্বস্তি মিললো। গার্ডেনের মাঝপথে এসেই থেমে গেল মুগ্ধের পাদু’টো। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে রেখে, সে কেমন হুট করে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলো মেয়েটাকে। এতক্ষণ পর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ভনভন করতে লাগল সপ্তদশীর মাথা। শরীরটা কেমন দুলছে দেখো! মুগ্ধ সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। একহাতে ঠোঁট থেকে সিগার নামিয়ে, অসভ্যের ন্যায় ধোঁয়া ছাড়ল মেয়েটার মুখের ওপর। তক্ষুনি নাকমুখ কুঁচকে নিলো মাহি। এহেন উটকো গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে বেচারির, ব’মি আসবে আসবে ভাব! যুবক বাঁকা হাসল বোধহয়। ঠোঁটটা দাতেঁর সঙ্গে খানিক পিষে নিয়ে বলল,

“ চুপচাপ ঘরে যাবি! এবার কোনো বা’লপাকনামি করতে গেলে চিরদিনের জন্য গর্দান হারাবি! মনে থাকবে বান্দীর মেয়ে?”
বাধ্যের ন্যায় ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। যুবক ফের ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজল সিগার। শরীর বাঁকিয়ে উল্টো পথে পা বাড়িয়ে হাঁটতে লাগল ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে। সামনে থেকে হেঁটে আসছে এডউইন। মনস্টারকে দেখেই মাথা ঝুঁকিয়েছে গম্ভীর মানব। ছোট ছোট কদমে কোনরকমে এগোচ্ছে এবার। মনস্টার তার গটগট পায়ে এগিয়ে এসে যেইনা এডউইনকে পাশ কাটাবে ওমনি সে বেশ দক্ষতায় নিজের ডানহাত দিয়ে এডউইনের ঘাড় আঁকড়ে তাকে ঘুরিয়ে নেয় একপ্রকার!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩১

হাতের শক্ত বাঁধনে এডউইনের ঘাড় চেপে রেখে, সিগারে টান বসাচ্ছে মনস্টার। এদিকে এডউইন হতভম্ব! নিজেকে ছাড়ানোর কোনরূপ পায়তারা করছেনা সে। কারণ জানে তো! মনস্টারের হাত থেকে বাঁচা এতো সহজ নয়। কিয়তক্ষন নিরব রইল চারপাশ। তবে মিনিট খানেক বাদেই এডউইনের কর্ণকুহরে ভেসে এলো মনস্টারের চাপা স্বরের কঠিন আলটিমেটাম!
“ চোখ যেন ওপরে না ওঠে এডউইন! উঠলেও সমস্যা নেই, সাইকি অনেকদিন ধরে চর্বিযুক্ত মানুষ খায় না!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২

1 COMMENT

  1. আপু পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖💖🌹🌹👏

Comments are closed.