মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫২ (২)
jannatul firdaus mithila
“ বর্তমান যুগের ছেলেপেলে বলে কথা! চরিত্রে একটু-আধটু দোষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ও কোনো সাধারণ কেউ নয়। ও এখন রুশদী কিং! নারী ক্ষুধা থাকবেই। তবে মনে রেখো নিরুর মা, একটা পুরুষের হাজারটা মাশুকা থাকলেও, তার স্ত্রী হয় কেবলমাত্র একজনই! আর অধীরের স্ত্রী হবে কেবলমাত্র আমার মেয়ে — নিরুপমা। বাদবাকি তার হাজারটা মাশুকা থাকুক, হু কেয়ারস?”
মাথার ওপর অদৃশ্য বজ্রপাতে খানিক কম্পিত হলেন সুদীপা রায়ের সর্বাঙ্গ! মুখাবয়বে ছড়ালো তীব্র বিস্ময়ের ছাপ। অন্তঃকোণে হুটহাট চাপ বাড়ল কর্তাগিন্নির। কন্ঠ হলো ভঙ্গুর!
“ তাই বলে শেষমেশ এমন চরিত্রহীন একটা ছেলের সঙ্গে আমার নিরুকে….!”
পথিমধ্যে বাকরুদ্ধ হলেন সুদীপা রায়। তার কাঁপা কাঁপা কন্ঠ হতে যেন উপচে পড়ছে কান্নার দলবল। এতক্ষণে কর্তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আচমকা ঠেকল স্ত্রীর অন্ধকার মুখপানে। সহসা গম্ভীর মুখেই নড়েচড়ে বসলেন হিমাংশু রায়। ধীরলয়ে আঁকড়ে ধরলেন স্ত্রীর শীতল কব্জিসন্ধি। নরম টানে টেনে এনে বসালেন নিজ সম্মুখে। প্রস্তরখন্ডের ন্যায় নিষ্প্রাণ মানুষটার পানে সরু দৃষ্টি বজায় রেখে, হিমাংশু রায় গম্ভীর কন্ঠে আওড়ালেন,
“ এতো চাপ নিচ্ছো কেনো সুদীপা?”
মুহুর্তেই দৃষ্টি উঠালেন সুদীপা রায়। জ্বলে উঠলেন তেলে-বেগুনে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধালেন,
“ চাপ নিচ্ছি কেনো মানে? তুমি জানো না আমি কেনো চাপ নিচ্ছি? জানো না তুমি?”
কন্ঠ ক্রমশ উঁচু করছেন সুদীপা রায়। তা শুনে খানিক বিরক্ত হলেন কর্তা মহাশয়। মধ্যবয়সী কপালের চামড়ায় গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ টেনে গমগমে গলায় বলে ওঠেন,
“ আওয়াজ নামিয়ে কথা বলো সুদীপা। ভুলে যেও না, দেয়ালেরও কান আছে। তাছাড়া এরম একটা ভাব নিচ্ছো যেন আমার বলা কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়লে!”
সাপের ন্যায় অনবরত ফুঁসছেন সুদীপা রায়। কন্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে তক্ষুনি আওড়ালেন,
“ হ্যাঁ পড়লাম। ঠিক আকাশ থেকে পড়লাম। কারণ এমনটা কিন্তু হবার কথা ছিল না নিরুর বাবা। অধীর কাউকে বিয়ে করলে এই জমিদার বাড়ির সকল সহায়-সম্পত্তির ৪ ভাগের ২ ভাগ পাবে তার অর্ধাঙ্গিনী! এমনটাই তো উইলে লেখা ছিল তাই না? যদি ওর অর্ধাঙ্গিনী হয় আমার নিরু, তবে সে-ই সকল সম্পত্তির অধিকারী হবে আমার মেয়ে। তাই তো? কিন্তু তখন তো আমার জানা ছিল না নিরুর বাবা, অধীরের চরিত্র এতটা কুৎসিত! এখন সবটা জানার পর এরম একটা কুৎসিত চরিত্রের ছেলের সঙ্গে কি করে মেয়ের দু’হাত এক করব বলোতো?”
রহস্যময় কায়দায় বক্র হাসলেন হিমাংশু রায়। ফের মনোযোগী হলেন দাবার চাল উল্টাতে। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে কন্ঠে নামালেন একরাশ গাম্ভীর্যের ছাপ!
“ তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো সুদীপা, অধীর রায় বর্তমানে রুশদী কিং। আর রুশদী কিংয়েরা চাইলেও নিজেদের রাজত্ব্যে রাজ করাকালীন খুব বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারেনা। শেষমেশ হয় শত্রুর হাতে প্রাণ হারায়, নয়তো প্রাণ হারায় প্রিয় এবং আপন মানুষ নামক মুখোশধারীদের হাতে! এ পথেই কিন্তু ধীরলয়ে এগোচ্ছে বর্তমান রুশদী কিং ওরফে অধীর রায়। তার মৃ ত্যুতেও কিন্তু খুব বেশি দেরি নেই। তাই বলছি, একবার যদি তার সঙ্গে কোনমতে নিরুর বিয়েটা হয়ে যায়, তাহলেই ব্যস! আমাদের নিরু হবে এই পুরো রায় জমিদার বাড়ির একমাত্র মালকিন।”
থামলেন হিমাংশু রায়। মন্ত্রীর গুটিটা আচমকা দাবার কোট হতে তুলে এনে হাতের মুঠোয় পুরলেন তিনি। রুক্ষ হাতের অমসৃণ তালুতে গুটিখানা খানিক দলাই-মলাই করতে করতে রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে ফের বলতে লাগলেন,
“ জমিদার বাড়ির একমাত্র উত্তরসূরী অধীর রায়! যার ভাগ্যে মৃ ত্যু র রেখা বহু আগেই স্পষ্ট হয়েছে গিন্নী। এবার শুধু তা ফলার পালা। নিরুর সঙ্গে একবার বিয়েটা হোক তার। এরপর তার মরণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার। মেয়ে আমার স্বামীর শোকে নাহয় ক’টাদিন কাঁদবে। তা বড়জোর ১ মাস, ৪ মাস কিংবা ১ বছর! আর তারপর? তারপর আমার নিরুকে আমি আবার বিয়ে দিব তার যোগ্য পাত্রের সাথে। এরপর তোমার যা ইচ্ছে করো নাহয়। সম্পত্তি তো তখন আমাদেরই থাকবে!”
হতভম্বতার সমুদ্রে এখনো টালমাটাল সুদীপা রায়। সংশয় বাড়ল অন্তঃকোণে। শুষ্ক অধরের ডগায় সিক্ত জিভখানা খানিক ঠেলে দিয়ে শঙ্কিত বিজড়িত কন্ঠে পরপরই আওড়ালেন,
“ কিন্তু এসবে আমার নিরু কতটা কষ্ট পাবে তা ভেবে দেখেছো একবার?”
তড়াক চোখ পাকিয়ে তাকালেন হিমাংশু রায়। চোয়ালের পেশী টানটান করে নিয়ে বিকৃত করলেন মুখ। বিকৃত ভাষায় দুটো গালি আওড়ে পরক্ষণেই বললেন,
“ কষ্ট? কিসের কষ্ট? টাকার মুখ দেখলে কষ্ট থাকে নাকি? যার টাকা আছে তার হাতে দুনিয়ার সব আছে। তাই ওসব যাচ্ছেতাই কথাবার্তা দ্বিতীয়বার আওড়ানোর সাহস করো না নিরুর মা!”
তক্ষুনি শক্ত হলেন সুদীপা রায়। ঠোঁটের ডগায় আঁটলেন কুলুপ। নতদৃষ্টে একমনে তাকিয়ে রইলেন দাবার কোটের পানে। হিমাংশু রায় দক্ষ কায়দায় গুটি নাড়ছেন। উল্টোপথে পয়েন্ট উল্টে আচমকা গ্রাস করলেন রাজার গুটি। মুহুর্তেই হিমাংশু রায়ের রুক্ষ আঙুলের তিরস্কৃত আঘাতে কোট হতে ছিটকে পড়ল রাজার গুটিটা। ঠোঁটের কোণে তৎক্ষনাৎ ক্রুর হাসি লেপ্টে গেল মধ্যবয়স্ক বিচক্ষণের। রাজার গুটির স্থানে নিজ গুটিটা রাখতে রাখতে আচমকা রহস্যময় কন্ঠে শুধালেন,
“ খেলা তবে এতদিনে শুরু হলো সুদীপা! তুমি শুধু খেয়াল রেখো — এ খেলার কোনোপ্রকার চাল সম্বন্ধে নিরু যেন অবগত নাহয়।”
বাধ্যের ন্যায় মাথা কাত করলেন সুদীপা রায়। বুক চিঁড়ে বার করলেন একফালি দীর্ঘ নিঃশ্বাস। স্বামীর দক্ষ খেলার গতি দেখে অন্যমনস্ক হলেন তিনি। হুট করেই বলে উঠলেন,
“ তখন থেকে আমি শুধু একটা কথাই ভেবে যাচ্ছি!”
“ কোন কথা?”
খেলায় মনোযোগী হিমাংশু রায়ের পরপর জিজ্ঞাসু প্রতুত্তর। যার পিঠে হতবিহ্বল বাক্যবাণ ছুঁড়লেন সুদীপা রায়
“ এই যে, যার বাপ কোনোদিন একটামাত্র নারী ছাড়া দ্বিতীয় কারোর দিকে ফিরেও তাকায়নি, তার-ই ঔরসজাত সন্তান হয়ে এহেন কুৎসিত চরিত্র কি করে পেলো অধীর? অথচ ওর বাপ মৃ…… ”
বাকিটা আওড়ানোর ফুরসত পেলেন না অন্যমনস্ক সুদীপা রায়। তার পূর্বেই তার ক্ষুদ্র চোয়ালখানায় আক্রমণ বসল শক্তপোক্ত হিং স্র থাবার। এহেন অতর্কিত কান্ডে যারপরনাই ভড়কান কর্তাগিন্নি। ত্বরিত বিস্ময়াবহ দৃষ্টে হকচকিয়ে তাকালেন সম্মুখে। আর ওমনি স্বামীর ওমন জ্বলজ্বল করতে থাকা ভয় মিশেলের রাগান্বিত দৃষ্টিজোড়া পরোখ করে ভীত হলেন রমণী। বহুকষ্টে গিললেন ঢোক। চোয়ালের পেশী নাড়াতে গেলেই ব্যথায় কুঁচকে এলো তার মুখ। কুঁচকে গেল চোখজোড়াও। তন্মধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে এলো হিমাংশু রায়ের ভয়ার্ত বাজখাঁই কন্ঠ!
“ খবরদার! মরণের ভয় থাকলে ঐ নাম মুখে আনবে না সুদীপা। নয়তো এর পরিণতি ঠিক কতটা ভয়ানক হতে পারে, তা আশা করি তুমি এখনো ভুলোনি।”
পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে থাকা কামরাটিতে মাঝেমধ্যে গুঞ্জে উঠছে সপ্তদশীর উচ্চ গোঙানির শব্দ! মৃ ত্যু যন্ত্রণায় কাতর পাখির ন্যায় ছটফটিয়ে যাচ্ছে রমণীর ক্ষুদ্র তনু। চোখদুটো ভেঙেছে বাঁধ! ঝরাচ্ছে বুকভাঙা আর্তনাদের ব্যথাতুর ছাপ। যুবকের ঘর্মাক্ত বলিষ্ঠ দেহের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে থাকা নিজ ক্ষুদ্র বদনটা সরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত মাহি। তার ধনুকের ন্যায় বাঁকানো মেরুদণ্ডটা কেমন সেঁটে আছে অমসৃণ দেয়ালের সঙ্গে। পাদু’টো এখনো জোরপূর্বক ছড়িয়ে আছে রূঢ় মানবেরর ভি-শেইপড মেদহীন কোমর অঞ্চলে। মানবী পরাস্ত হচ্ছে না কিছুতেই! ঘাড়ের পেশী শক্ত করে মুখ সরাতে চাইছে অন্যত্র। কিন্তু রূঢ় মানব আজ যেন বড্ড বেপরোয়া! একমুহূর্তের জন্যও মুক্ত করছে না চঞ্চলা চড়ুইকে। উল্টো জোর বাড়িয়েছে নিজ পেশিবহুল ইস্পাত-দৃঢ় হাতদুটোর। তার ডানহাতের রুক্ষ তালুর রুষ্ট পরশে কুপোকাত মাহি’র নরম তুলতুলে ঘাড়। বাহাতের দানবীয় মুঠোয় দেয়ালের সনে একত্রে চেপে রাখা রমণীর তুলোর ন্যায় হাতদুটোর কব্জিসন্ধি। দক্ষ শাসকের ন্যায় রমণীর তুলতুলে অধরযুগলে নিজ আধিপত্য বিস্তারে মত্ত ছন্নছাড়া বেপরোয়া পুরুষ। রুক্ষ অধরযুগলের কার্য চালাচ্ছে রুষ্টতার সঙ্গে। মাহি গোঙাচ্ছে এখনো! ওষ্ঠপুট আর সে-ই চিরচেনা দশায় নেই। তাদের হাল হয়েছে করুণ। রূঢ় মানবের তীক্ষ্ম দাতেঁর চাপায় পড়ে, সেথায় ক্ষত হয়ে ঘা দেখা দিয়েছে বেশ কয়েক স্থানে। উষ্ণ ক্ষারীয় তরলে মাখামাখি অবস্থা বেচারির মুখগহ্বর। তবুও নিস্তার পাচ্ছে না কিছুতেই। তার অধরযুগলের উষ্ণ ক্ষারীয় স্বাদ পেয়ে রূঢ় মানব বোধহয় উম্মাদ হয়েছে বেশ। ভাগ্যিস নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র পথ এখনো উম্মুক্ত! নয়তো ওতো দীর্ঘ, গভীর চুম্বনে মৃ ত্যু সুনিশ্চিত ছিল বেচারির।
মাহি বড্ড দূর্বল! ভঙ্গুর কায়ায় ছটফটাচ্ছে কোনরকম। এরইমধ্যে মেয়েটাকে একফালি স্বস্তির নিশ্বাস টানবার সুযোগ দিলো মুগ্ধ। অগোছালো ভঙ্গিতে আচমকা কপালে কপাল ছোঁয়াল মাহি’র। সপ্তদশী নাজুক বড্ড। কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। নিশ্বাসও বোধহয় টানছে বহুকষ্টে। সিক্ত চোখদুটো বুঁজে রাখা দূর্বল মানবীর। ঠিক তখনি মুগ্ধ কেমন হাঁপরের ন্যায় নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালিয়ে হুট করেই ঝংকার তোলা কন্ঠে শুধালো,
“ লেট’স গেট ই*/ন্টিমেট চাশমিস!”
মুহুর্তেই মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল সপ্তদশীর। চোখদুটো তক্ষুনি খুলে গেল বিস্ফোরিত আকার ধারণ করে। মুখাবয়বে ছড়িয়ে গেল মারাত্মক ভয়ের ছাপ। কন্ঠ জুড়িয়ে আসতে চাইল ভীতসন্ত্রস্ততায়!
“ আ-আপনি.এসব..না..!”
শুনল না মুগ্ধ! উল্টো ফিক করে বাঁকা হেসে অধর কামড়ে ধরল নিজের। ধীরে ধীরে মাহি’র মসৃণ ললাট হতে নিজ ললাটতটের দুরত্ব বাড়িয়ে মুখ নামালো সপ্তদশীর মসৃণ গ্রীবাদেশে। সেথায় আচানক নিজ রাক্ষুসে ধারালো দাঁতের তীক্ষ্ণ ছোঁয়া বসাতেই বেচারীর কন্ঠফুড়েঁ বেরিয়ে এলো আত্মচিৎকার। যুবক সময় নিয়ে দাঁত বসিয়ে রাখল মানবীর মসৃণ গ্রীবাদেশে। ধীরলয়ে দাঁত সরিয়ে সদ্য পরিস্ফুটিত ক্ষততে সিক্ত অধর ছুঁইয়ে এক অদ্ভুত অধিকারবোধে শুধালো,
“ ওসব চোখাচোখি বুলশিট কাইন্ডা লাভ, তুলতুলে আদর – সোহাগ, এন্ড অল দোস রেসপেক্টেড ফা’কিং টাইপ ই*ন্টিমেসি, আর নট ইন মা’ই ক্রাইটেরিয়া সিগনোরা! আ’ম আ ব্লা’ডি বিস্ট, এন্ড আ’ই হেভ আ টাফ এন্ড রাফ সাইন’স ইন মা’ই টেস্ট। সো আমি যখন তোকে ছোঁবো, তখন ঠিক এভাবেই ক্ষত করে ছাড়ব। তাই এখন থেকে এসবে অভ্যস্ত হয়ে যা সিগনোরা! আ’ই কান্ট স্টপ মা’ইসেল্ফ এনিমোর।”
আঁতকে উঠে মাহি’র নারীসত্তা! কেঁপে ওঠে ক্ষুদ্র তনু। তীব্র ব্যথায় জর্জরিত অধরযুগল খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে যেই না কিছু আওড়াবে, তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের ভয়ার্ত কন্ঠস্বর!
“ আ’ই ডোন্ট লাভ দ্যাট ফা’কিং টাইপ অফ সো-কলড ডার্ক রোম্যান্স বেইব…!”
একমুহূর্ত ব্যয়ে কন্ঠে ভাটি পড়ল রূঢ় মানবের। পরক্ষণেই তার ব্যস্ত অধরযুগল শিরশিরে পরশের ন্যায় ধীরলয়ে উঠে এলো রমনীর র*ক্তিম কর্ণলতিতে। সেথায় ফের তীক্ষ্ণ দাঁতের রুষ্ট চাপ বসিয়ে একই কন্ঠে আওড়াল,
“ বাট আ’ই হেভ আ গ্রেট ইন্টারেস্ট ইন এক্সট্রিম ডার্ক রোম্যান্স সিগনোরা!”
ভিন্ন কিছু শব্দ! যার সঙ্গে পূর্বপরিচিতি নেই বোকা মানবীর। ফলাফল স্বরুপ ভয় পাবে না-কি স্বস্তি পোহাবে তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান সে। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে, ফুপিয়ে ফুপিয়ে প্রসঙ্গ ধরল উল্টো!
“ আপনি আমার সঙ্গে এসব উল্টাপাল্টা কাজ করতে পারেন না বিস্ট!”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। মোহাবিষ্টের ন্যায় নাক ঘষতে লাগল মানবীর মসৃণ গালে। আচ্ছন্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ ওহ ফা’ক অফ বান্দীর মেয়ে! আমি কি কি করতে পারি তা তোর ধারণারও বাইরে। হয়তো আরেকটুপর একটু-আধটু টের পাবি তা।”
কথায় লোকটাকে দমাতে পারছেনা মাহি। অদম্য মনোবলে দূর্বল কন্ঠে ফের বলে উঠল,
“ আপনি বলেছিলেন আমার বার্থডে…. না আসার আগে..!”
“ ৮/৯ দিনে দেহে কোনো বড় পরিবর্তন চলে আসেনা পিচ্চি! এমুহূর্তে জাস্ট ভুলে যা ওসব এন্ড ফিল মি!”
“ আপনি… আপনি… এসব করতে পারেন না। আমি…না আপনি.. আমার সঙ্গে.. সামান্য একটা কাগজের টুকরোর ভিত্তিতে এসব করার অধিকার রাখেন না বিস্ট।”
তক্ষুনি মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিযুগলে আগুন ছড়ালো মুগ্ধের। নাক সরে গেল মাহি’র কোমল গাল হতে। শক্ত চোয়ালের কটমট শব্দ বাড়ল তার। রমণীর তুলতুলে ঘাড়ের পিঠে আঁকড়ে রাখা রুক্ষ হাতের মুঠোটা তক্ষুনি টেনে আনলো মেয়েটার চোয়াল বরাবর। সেথায় একপ্রকার হিং স্র থাবা বসিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ সামান্য কাগজ? মা’ই ফা’কিং বি’চ, দ্যাটস নট এন অরডিনিয়ারি পিস অফ পেপার। দ্যাট’স আ’র ম্যারেজ কন্ট্র্যাক্ট পেপার। যেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, তুই আমার আর আমি…. হোয়াটএভার!”
কন্ঠে মলিনতা বাড়ল মাহি’র। মাথাটা আপনাআপনি হেলে গেল দেয়ালের সনে। চোখদুটো ক্রন্দনের ভারে বুঁজে এসেছে মেয়েটার। অস্ফুট কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো —
“ সেটা একটা কনট্র্যাক্ট মেরেজ মাত্র। যা বাস্তবিক জীবনে বিন্দুমাত্র মূল্য রাখে না বিস্ট। বাস্তব হলো — আপনি এবং আমি, আমরা সম্পূর্ণ দুই মেরুর মানুষ। আপনার সঙ্গে আমার সমাজ, জাত এবং ধর্ম কিচ্ছু মিলেনা। না মিলে মন! তবে কিসের ভিত্তিতে আমি আপনার হলাম? কিসের ভিত্তিতে বিয়ে হলো আমাদের? কাগজে-কলমে থোড়াই বিয়ে হয়। বিয়ে হয় ধর্মীয় মতে!”
মুহুর্তেই রাগের পারদ তরতর করে আকাশ ছুঁলো রূঢ় মানবের। মাহি’র চোয়াল বরাবর চেপে রাখা হাতটা তার শক্ত হলো ফের। সহসা ঘর কাপিয়ে হিং স্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে শুধালো,
“ কিসের জাত? কিসের সমাজ বান্দীর মেয়ে? কার ধর্ম? আমি কোনো সমাজ-জাত-ধর্ম কিচ্ছু মানিনা বান্দীর মেয়ে! আর না মানি এ পৃথিবীর কাউকে। তোর যা ইচ্ছে মান, যে সমাজ মানতে ইচ্ছে করছে মান, যে ধর্ম মানতে ইচ্ছে করছে মান। আই ওন্ট স্টপ ইউ্য! বাট আমি যা মানিনা তা নিয়ে আমায় কিংবা আমার অর্ধাঙ্গিনীকে কেউ জাজ করতে এলে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি। যে সমাজ আমার বান্দীর মেয়ের দিকে আঙুল তুলবে, সে সমাজকে ধ্বংস করে ফেলব আমি! যে জাত-পাতের দোহাই আমার বান্দীর মেয়েকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে চাইবে, সে জাত-পাতকে নির্বিশেষে মাটিতে পিষে ফেলব আমি। আমি যা মেনেছি, তা-ই আমার জন্য যথেষ্ট বান্দীর মেয়ে। এতে অন্য কারোর কি আসে-যায়, তা নিয়ে লিটারেলি আই ডোন্ট ফা’কিং কেয়ার এবাউট দ্যাট!”
গলার স্বরে শুষ্কতা বাড়ল মাহি’র। হতভম্বতায় ছেয়ে গিয়েছে মুখভঙ্গি। আর কি বলবে সে? কাকে বলবে? যে-ই লোক ওতোটা বেপরোয়া, তাকে বলবে? যে-ই লোক কোনো সমাজ-জাত-ধর্ম মানে না, তাকে বলবে? রমণী কুন্ঠিত। ব্যথিত নয়নে রূঢ় মানবের পানে তাকিয়ে থাকতেই আচানক তার চোয়াল ছাড়ল মুগ্ধ। ফের আলগোছে কপালে কপাল ছোঁয়াল মাহি’র। ভরাট কন্ঠে আওড়াল,
“ আমাকে কোনোদিন উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাস না বান্দীর মেয়ে! বিশ্বাস কর, তোকে মা’রতে গেলে একমুহূর্ত হাত কাঁপলেও, যে সমাজ-জাত-পাত এবং পরিবারের দোহাইয়ে আমায় ছেড়ে যাবার দুঃসাহস করবি, তাদের ধ্বংস করতে ন্যানো-সেকেন্ডও নিব না আমি। মাইন্ড ইট!”
আঁতকে উঠে মাহি। অধর কামড়ে ফোপাঁতে গেলেই ওষ্ঠপুটের ব্যথায় আপনাআপনি কুঁচকে গেল তার মুখ। পরক্ষণেই মুগ্ধের হেঁচকা টানে সপ্তদশীর ক্ষুদ্র কায়া দোদুল্যমান ভঙ্গি ধরল। টলতে টলতে মুগ্ধের পানে চোখ তুলে তাকাতেই রূঢ় মানব শক্ত চোয়ালে শুধালো,
“ বেডে যাবি না-কি এভাবেই শুরু করব? স্টাইলটা যদিও খারাপ না। বাট ইট’স ইউ্যর ফার্স্ট টাইম নাহ! সো… ”
দৃষ্টিজোড়া কুঁচকে গেল মাহি’র। বোধগম্যহীনের ন্যায় তাকিয়ে রইল অপলক। মুগ্ধ একমুহূর্ত স্থবির বনে চেয়ে রইল মেয়েটার পানে। মুহুর্ত পার হতেই জোর বাড়াল হাতের। সপ্তদশীর লতানো কোমর বরাবর টান বসালো হেঁচকা। তুলতুলে হাতদুটো ছেড়ে দিলো পরপরই। উম্মুক্ত বাহাতখানা তড়িঘড়ি করে নিজ প্যান্টের অগ্রভাগে ছুঁইয়ে ফের মাহি’র ক্ষত ওষ্ঠপুট আঁকড়ে ধরে রূঢ় মানব। এবারে বোধহয় মেয়েটার অধরযুগল না ছিঁড়ে শান্ত হবে না। মাহি কাঁদল আবারও। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে বেশ। মস্তিষ্কের সজাগ নার্ভগুলো ধীরে ধীরে স্লো হচ্ছে তার। অতিরিক্ত ভয়, কষ্টে আবারও অচেতন হবার পথে মেয়েটা। ওদিকে যুবক অগোছালো। নিয়ন্ত্রণহীনের ন্যায় মেয়েটাকে নিজের করে নিতে অগ্রসর সে। ভি-শেইপের ঝাঁক হতে প্যান্টের আগা খানিকটা সরতেই আচমকা মুগ্ধ টের পেলো — মাহি ঢুলছে! তক্ষুনি স্তম্ভিত হলো রূঢ় মানব। অধর ছেড়ে আৎকা সম্মুখে তাকাতেই অচেতন বোকা মানবী সদ্য কর্তিত কলমি ডগার ন্যায় ঢুলে পড়ল তার রুক্ষভাঁজে। মুহুর্তেই চোয়ালের পেশি কটমট করে উঠে রূঢ় মানবের। মাথাভর্তি অদৃশ্য মোহাচ্ছন্নতায় হুট করেই ভাটি পড়ে যাওয়ায় নিয়ন্ত্রণহীন সে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজের। শক্ত হাতের রুক্ষ তালু দিয়ে অনবরত নিজ বলিষ্ঠ ঘাড়টা ডলতে ডলতে চাপা ক্ষোভে হুংকার দিয়ে শুধালো,
“ কু****চ্চা!!! আবারও? আবারও জানোয়ারের বাচ্চা? হলি ফাআআআক!”
মাথায় আগুন জ্বলছে মুগ্ধের। পুরুষালী অদম্য চিন্তাভাবনা অনিয়ন্ত্রিত! তক্ষুনি মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে সম্মুখে হেঁটে এলো দু-কদম। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই অচেতন মাহি’কে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলল মখমলি বিছানার নরম কোলে। কিন্তু কান্ড দেখো! অচেতন মানবী তখনো বুঁজে আছে দুচোখ। ওদিকে যুবক উন্মত্ত! ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে মাহি’র পানে তাকিয়ে থেকে, ব্যস্ত হাতে গা থেকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুলছে শার্ট। একে একে বোতাম খোলার ধৈর্য নেই রূঢ় মানবের। ফলে মুহুর্তেই বেচারা শার্টের সবগুলো বোতাম অবহেলায় ছিঁড়ে গিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল এদিক-ওদিক। উম্মুক্ত হলো ফর্সা বলিষ্ঠ পেটানো দেহখানা। পাইথন ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলগুলো রয়েসয়ে বাঁধনমুক্ত হলো শার্টের আবরণ হতে। এক ঝটকায় গা থেকে শার্টটা খুলে এনে অদূরে ছুঁড়ে ফেলল মুগ্ধ। পরক্ষণে হাত রাখল প্যান্টের ডগায়। ধীরলয়ে এগোলো অচেতন মেয়েটার পানে। নিজ পাহাড়সম দেহটার সামান্য ভর ছাড়ল মানবীর গায়ে। অনিয়ন্ত্রিত কামনায় বুদ মানব, অচেতন সপ্তদশীতে ডুব দিতেই যাবে ওমনি মস্তিষ্ক তড়াক করে বেজে উঠল তার। গভীর দৃষ্টিজোড়া একত্রে তাক হলো বোকা মানবীর ক্ষুদ্র পেলব মুখপানে। মেয়েটার হুঁশ নেই! তার ছোঁয়াগুলো আদৌও অনুভব করতে পারবে সে? পরে যদি হুঁশ ফিরলে বলে বসে — তার ঘুমের সুযোগ নেওয়া হয়েছে তখন?
এহেন ভাবনায় আত্মসম্মানে খানিক চোট লাগল দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের। সে যা করবে মেয়েটাকে দেখিয়ে করবে, হুঁশে রেখে করবে! রেপিস্টের মতো সুযোগ বুঝে থোড়াই করবে! চটজলদি মাহি’র ওপর থেকে উঠে বসে মুগ্ধ। শক্ত দু’হাতে বিছানার দুপাশ আঁকড়ে ধরে বসে রইল একপল। চোয়াল শক্ত তার! মুখটা হয়েছে ভীষণ লাল। দৈবাৎ শক্তিতে বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য কাত হলো রূঢ় মানবের। রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার পানে। কটমট করতে করতে শুধালো,
“ আমার এই ভরা যৌবনে করা প্রথম ভুল হলো — তোর মতো একটা বান্দীর মেয়ের সাথে হ্যাংকি- প্যাংকি করতে চাওয়া! ঠিক কতবড় বেয়াদবের বাচ্চা হলে একটু ১৯-২০ করতে গেলেই টাল হয়ে পড়িস জানোয়ার! একমাত্র তোর জন্য আমার এই যৌবনপোড়া মরাকাঠ দেহে এখন পর্যন্ত ভার্জিনিটির দাগ নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে কু***চ্চা!”
থামল মুগ্ধ। ত্বরিত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অন্যত্র। ঠোঁট কামড়ে বিছানার দুপাশ খামচে ধরল জোর করে। নিজেকে নিযন্ত্রণ করবার সর্বোচ্চ প্রয়াসে চোখদুটো বুঁজে রেখে ফের বিড়বিড়ালো,
“ বান্দীর মেয়ে এখনো বড়োও হচ্ছে না!”
নিঃশ্বাসের অগোছালো ভাবভঙ্গিমা বাড়ছে মুগ্ধের। দেহের সবগুলো দৃশ্যমান পেশী হচ্ছে টানটান! কন্ঠায় বাড়ছে শুষ্কতা। মানব তক্ষুনি ঘাড়ের মাংসল পেশী কুঁচকে সিলিংয়ের পানে মুখ তুললো। অস্ফুট গোঙানির স্বরে আওড়াল,
“ ওহ… ওহ…ফা’ক!”
ত্বরিত বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। অবিচ্ছিন্ন পায়ের গতিতে ছুটে বেরোয় কক্ষ ছেড়ে। কাঠের প্রশস্ত করিডরের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আচমকা হুংকার ছুঁড়ল রূঢ় মানব!
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫২
“ গার্ডস!!!!!”
তক্ষুনি বাজপাখির ন্যায় অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে ছুটে এলো গোটাকতক কালো পোশাক পরিহিত গার্ডস। যারা এসেছেন মনস্টারের সঙ্গে! তাদের দেখেই ফের হুংকার ছুঁড়ে মুগ্ধ!
“ এক্ষুনি আমার জন্য আইস বাথের ব্যবস্থা কর! ওহ…ফা’ক তারাতাড়ি!!!!!”
