Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৮

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৮

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৮
Tahmina Akhter

রিনিদের বাড়ির বাগানে মেঘালয় চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। আলো মেঘালয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই কখন থেকে। বাড়ির ভেতরে পার্টি চলছে যদিও। কিন্তু ওরা দু’জন নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত।
— আপনি কি রেগে আছেন আমার ওপর?
— রেগে থাকার মত যদি কিছু করে থাকো তাহলে অবশ্যই রাগ করেছি।
আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
— জটিলতা কি কম ছিল? এখন নতুন করে আরেকটা ঝামেলা! জীবনে একটা প্রেম করিনি। অথচ প্রেমে অসফল হবার মত কঠিন ঘটনা আমাদের বিয়েতে তৈরি হলো! এবার তো সবকিছু ঠিক করে দিন আল্লাহ!
মেঘালয় ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। আলো নিজের মধ্যে কোত্থেকে যেন সাহস সঞ্চয় করল! মেঘালয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে মেঘালয়কে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। খুব পরিচিত সুভাস আর স্পর্শ পেয়ে মেঘালয়ের হৃদয়ে প্রশান্তির জোয়ার বয়ে যায়। চোখ দুটো বন্ধ করে আলোর স্পর্শ গায়ে মাখছে। আবারও এক হবার আনন্দে দুটো হৃদয়ের স্পন্দন যেন সমানতালে স্পন্দিত হয়ে জানান দিচ্ছে।
আকাশভর্তি তাঁরা আর এক টুকরা চাঁদ। মৃদু হাওয়া, নামজানা ফুলের সুভাস, ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক জোড়া অভিমানী মানুষের মিলন মূহুর্ত যেন ঐশ্বরিক মূহুর্ত তৈরি হয়েছে। আলো মেঘালয়ের পিঠে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ধরা কন্ঠে বলল,

— বিশ্বাস করুন, আমি ভালো নেই। মানে একদমই ভালো নেই।
— তুমি ঢের ভালো আছ। মোটেও মিথ্যা বলবে না।
মেঘালয় জবাব দিয়ে আলো’র হাত সরিয়ে দিয়ে আলো’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
— তুমি সবসময় মনমর্জি মত চলাফেরা করা মেয়ে। যখন যা মনে আসে তাই কর। তোমাকে জড়িয়ে থাকা মানুষ গুলো কি চায় তা নিয়ে তোমার সামান্য মাথাব্যথা নেই।
মেঘালয়ের আরও কিছু কঠিন কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু, আলোকে সে কষ্ট দিতে চায় না। কাকে কষ্ট দেবে? আলোকে? যেই আলো’র বসবাস তার হৃদয়ে। আলোকে কষ্ট দেয়া মানে নিজের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা।
আলো আজ মেঘালয়ের কথা গায়ে মাখছে না। মানুষটা আজ যা বলতে চায় বলুক। কিন্তু, আজ যাই হোক না কেন হেরে যাওয়া যাবে না। ভালবাসার এই খেলায় জিততে হবে।
— ফিওনাকে যা বললাম তা নিয়ে আপনি আপসেট?
আলো’র কথা শুনে মেঘালয় খানিকটা বিস্মিত হয়ে তাকায়। আলো সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আপনি বলুন না, আমি যা বলেছি তা কি মিথ্যা? আপনি একজন শক্তিশালী, সামর্থ্যবান পুরুষ। আপনার এতবছর সিঙ্গেল থাকার ব্যাপারটা আমার কাছে দৃষ্টিকটু লাগে।
আলো’র কথাগুলো শুনে মেঘালয়ের মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। মানে কি বলবে কিংবা কি বলা উচিত সব গুলিয়ে ফেলেছে। তার এত ভদ্র বউ বেয়াদব হলো কবে থেকে? মেঘালয় কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই আলো এগিয়ে এসে মেঘালয়ের ঠোটের ওপর আঙুল রেখে বলল,,
— তর্ক করবেন না। আপনি নিশ্চয়ই সুপুরুষ নন। যে স্ত্রী’র অবর্তমানে নিজেকে কঠোর ভাবে সামলে রাখবেন৷ ধরে নিলাম আপনি কারো কাছে যাননি। তবে কি দাঁড়াল? আপনি…..
আলো বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগে মেঘালয় আলোর কোমড় টেনে ধরে কাছে টানল। আলো মেঘালয়ের সঙ্গে মিশে যায়। আলো হকচকিয়ে মাথা নীচু করে ফেলেছে। যাক অবশেষে জায়গা মতো ঢিল ছুড়ছে আলো। মেঘালয় একহাত দিয়ে আলোর থুতনি উঁচু করে বলল,

— আমার দিকে তাকাও। নয়ত আমি কথা বলতে ইন্টারেস্ট খুঁজে পাই না ; জানো না তুমি?
আলো এই কথাটি বহুবার এই মানুষটার মুখ থেকে শুনেছে। আলো না পারতে ওই কৃষ্ণাভ চোখ দুটোর দিকে তাকায়৷ চোখ দুটোর দিকে তাকাতে গিয়ে আলো খেই হারিয়ে যায়। চোখ দুটোতে তার দৃষ্টির তুষ্টি হয় না। অবাধ্য চোখ দুটো মেঘালয়ের পুরো চেহারা জুড়ে বিচরণ করছে। শেষমেশ দৃষ্টি এসে ডাক্তার সাহেবের অধরের কাছে এসে থমকে যায়। এরই মধ্যে ভয়বাহ একটা কান্ড করে আলো মেঘালয়কে চমকে দেয়। মেঘালয়ের অবাকের রেশ কাটার আগেই আলো তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে চাইলে মেঘালয় আলোর হাত টেনে ধরে আবারও বুকের মাঝে এনে বন্দি করে। আলো ভীষণ লজ্জা পেয়ে মাথা লুকায় ডাক্তার সাহেবের বুকের মাঝে। আলো’র কান্ড দেখে মেঘালয় মুচকি হেসে আলোকে দুইহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
— আমি দূর্বল মানুষ। আমাকে এসব চুমুটুমু দিয়ে তুমি কি পাবে বলো তো?আবার আমার বুকে এসে লুকাচ্ছ কেন?
আলো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মেঘালয়ের বুকের মধ্যে আরও শক্ত করে চেপে রইল। এই জায়গাটাতে এত শান্তি! শেষ কবে এই শান্তির জায়গা মাথা রাখার সৌভাগ্য হয়েছিল?
সময় কতটুকু গড়িয়েছে কে জানে? মেঘালয় আবিস্কার করল তার বুকের কাছের পাঞ্জাবির অংশটা স্যাতস্যাতে লাগছে। মেঘালয় মাথা নীচু করে আলোর মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে বলল,

— কান্না করছো কেন?
— আমি আজ সুখে কাঁদছি, ডাক্তার সাহেব।
এই জবাবের প্রেক্ষিতে আর কি বলা যায়? মেঘালয় আলোর মাথায় চুমু দিয়ে আদুরে সুরে বলল,
— আজ যত ইচ্ছা কাঁদতে পার আমি বাঁধা দেব না। জানোই তো আমার আশেপাশে থাকলে তোমাকে কান্না করার সুযোগ দেব না।
— আমাকে মাফ করে দিয়েছেন?
— তোমাকে মাফ করে দিয়েছি বহুবছর হলো। কারণটাও আমার মা। আজ বাড়িতে ফেরার পর তুমি জানতে পারবে, আমার মা মৃত্যুর আগে তোমাকে কি বলে গেছেন? তোমার ওপর আমার কেবল অভিমান জমেছে। সেদিন তোমাকে আমি সঠিক সময়ে আনতে যাবার প্রতিশ্রতি দিয়ে ফিরিয়ে আনতে যেতে পারিনি। এটা আমার বর্থ্যতা আলো। আমি জানতাম, তুমি আমার অপেক্ষায় ছিলে। আমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তুমি একসময় ভেঙে পরলে। তারপর, আমার ওপর অভিমান করে তুমি চলে গেলে আমাকে শাস্তি দেবার জন্য। তবে তুমি চাইলে আমাকে অন্যভাবে শাস্তি দিতে পারতে! তোমার আর আমার বিচ্ছেদ না চেয়ে তুমি আমার মৃত্যু চাইতে আমি হয়তো তোমার হাতে আমার মৃত্যুর পরোয়ানা তুলে দিতে
পারতাম। কিন্তু, তুমি আমাকে মৃত্যুর চাইতে কঠিন শাস্তি দিলে।

— আমি তো জানতাম না আপনার হৃদয়ের কথাখানি জুড়ে আমি আছি! যদি একটিবার টের পেতাম আমি কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেতাম না।
মেঘালয়ের গলা ঝাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল আলো। মেঘালয় আলোর মাথার ওপর চুমু দিয়ে বলল,
— আমাকে ছাড়া খুব ভালো ছিলে?
— মোটেও না।
— আমাকে ছাড়া ঘুম হতো তোমার? নিশুতি রাতে আমাকে খুঁজতে না? আমার বুকটা ছাড়া তো তোমার ঘুম হতো না?
— না।
— একবারও ইচ্ছে করেনি আমার কাছে ফিরে আসতে?
— বহুবার ইচ্ছে করেছে। এমনও হয়েছে আমি চট্টগ্রামের বাসের টিকিট কেটেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে টিকিট ক্যান্সেল করে দিতাম।

—আমার মেসেজ এবং কলের জবাব দাওনি কেন?
— উত্তর আছে। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করছে না। জানতে পারলে আপনি আমাকে ঘৃনা করবেন।
কথাটি বলে আলো সোজা হয়ে বসলো। মেঘালয়ের গালে একহাত রেখে নরমসুরে বলল,
— আপনার মতো করে কে আমাকে ভালোবাসবে, ডাক্তার সাহেব? আপনাকে কে বলেছে আমাকে এমন করে ভালোবাসতে? আপনার ভালোবাসার সামনে আমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ যেন লজ্জা পেয়ে পিছু হটে যায়।
— তুমি মেনে নিলে “আমি তোমাকে ভালোবাসি?”
— মানতে চেয়েছি বহুবার। কিন্তু বোকা আমি করুনা এবং ভালোবাসার মধ্যে আপনার প্রকাশ করা অনুভূতি,আদর, ভালোবাসা, যত্নকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম।
কথাগুলো বলার সময় আলোর চোখের জল অনবরত গড়িয়ে পরল। মেঘালয়ের ইচ্ছে করলো চিৎকার করে পুরো শহরের মানুষদের তার ভালোবাসার পূর্ণতার গল্প জানিয়ে দিতে।
আলো চোখের পানি মুছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেঘালয়ের পায়ের সামনে বসলো। মেঘালয়ের দুই পায়ের পাতায় দুই হাত রেখে বলল,

— আমাকে মাফ করে দিন, ডাক্তার সাহেব। নয়তে আমি মরে গেলেও আমার অনুশোচনা রয়ে যাবে।
আলোর চোখের জল মেঘালয়ের পায়ের পাতায় পরতেই মেঘালয় ভ্রম দূর হলো। আলোর নমনীয়তা দেখে মেঘালয়ের বিশ্বাস হচ্ছে না তার সামনে মাথা নত করে রাখা মেয়েটা তার স্ত্রী আলো। যাকে পুরো দুনিয়া চেনে কাঠখোট্টা, একরোখা, ভীষণ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মেয়ে হিসেবে। কিন্তু আজ যেই মেয়েটা মেঘালয়ের সামনে মাথা নত করে বসে আছে সে মেয়েটার অন্য একটা পরিচয় আছে। অন্য পরিচয়ের মেয়েটা তার ডাক্তার সাহেবকে প্রচন্ড ভালোবাসে। এই মেয়েটা আজ, এই মূহুর্তে বুঝিয়ে দিলো, সে যদি তার স্বামীর মাথার মহা তাজ হতে পারে তাহলে সে তার স্বামীর পায়ের পাতায় হাত রেখে নিজের করা ভুলকে স্বীকার করার সাহস রাখে।

ফিওনা পার্টি থেকে চলে গেছে। মেঘালয় আর আলোকে দেখে রিনি এগিয়ে এসে ওদের জিজ্ঞেস করল,
—Everything ok?
— All is well.
রিনির প্রশ্নের জবাব দিয়ে মেঘালয় মুচকি হাসে। আলো রিনির হাত ধরে বলল,
— ভালোবাসা’র এই খেলায় ডাক্তার সাহেব হেরে গিয়ে জিতে গেছে, রিনি।
ব্যস রিনি উত্তর পেয়ে গেছে। আলোকে জড়িয়ে ধরে কান্নামাখা সুরে বলল,
— এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
পার্টি শেষ হবার পর আলো, মেঘালয় রওনা হলো বাড়ির উদ্দেশ্য। তৌহিদ সাহেব মেয়ের বাড়িতে রয়ে গেলেন। আগামীকাল মেয়ে এবং জামাইকে নিয়ে বাড়িতে ফিরবেন।

বাড়িতে ফেরার পর আলো এবং মেঘালয় দুজনেই ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তারপর, আলোর হাত ধরে বাগানে নিয়ে গেল মেঘালয়। আজ শুল্ক পক্ষের রাত। আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বাগানের দোলনায় আলোকে বসিয়ে রেখে মেঘালয় চলে গেল বাড়ির ভেতরে। সেখান থেকে তার ল্যাপটপ এনে একটা ভিডিও অন করে আলোর কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে চলে গেল বাগানের অন্যপাশে। আলো ল্যাপটপের স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখল, তার শ্বাশুড়ির চেহারা ভেসে উঠেছে। পেছনের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে হসপিটালে থাকাকালীন অবস্থায় ভিডিওটি রেকর্ড করা। আলোর মনে হলো যেন সত্যি সত্যি তার শ্বাশুড়ি তার সামনে বসে আছে। ভিডিওর প্রথম থেকে শেষ অব্দি কথাগুলো শুনে শেষ করার পর মাহরীনের হু হু করা কান্নার শব্দ আলোর চোখে পানি এনে দিলো। আলোর ইচ্ছে করলো স্ক্রীণের ওপর ভেসে থাকা তার শ্বাশুড়ির চোখের জল মুছে দিতে। ভিডিও শেষ। আলো ল্যাপটপ বন্ধ করতে গিয়ে টের পেলো তার হাত কাঁপছে। দোলনায় গা এলিয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে রইল। তার শ্বাশুড়ির সঙ্গে প্রথমদিনের সাক্ষাৎের কথা মনে পরল। এই একজন মানুষ যদি তার জীবনে না আসতো তাহলে কি সে মেঘালয়ের মতো জীবনসঙ্গীকে পেত? নাকি মাহরীন জামানের মতো নারীকে শ্বাশুড়ি হিসেবে পেত?
নিজের পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেতেই আলো চোখ খুলে তাকালো। মেঘালয় পাশে এসে বসেছে। আলোর কোলের ওপর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে সামনের ছোট টি-টেবিলের ওপরে রেখে দিলো। আলো দোলনার ওপরে পা গুটিয়ে বসল। তারপর মেঘালয়ের কাঁধে মাথা রাখল। মেঘালয় ধীরে ধীরে দোলনা দোলায়। চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,

— বিষন্ন রাতে আমি প্রায়ই মায়ের শেষ ভিডিওটি দেখি। তোমার জন্য মা যতগুলো কথা রেখে গেছে তার অর্ধেক অংশ আমার জন্য রেখে যায়নি! যেদিন মা শেষবারের মতো আমার সঙ্গে কথা বলল তখন আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল,
“আলো ফিরে না আসা পর্যন্ত তুই অপেক্ষা করবি। খবরদার অন্যকাউকে বিয়ে করবি না! ওয়াদা কর! মেয়েটা ফিরে এলে তোকে ওভাবে দেখলে সহ্য করতে পারবে না!”
সেদিন মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম,
“তোমার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করে দেব মা। সেখানে আলোর জন্য অপেক্ষা করতে বলছো! আমি নির্দ্বিধায় আলোর জন্য পুরো একজনম অপেক্ষা করতে পারব”।
মায়ের মুখে সেদিন আমি বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠতে দেখেছি। মা সেদিন অবেলায় ঘুমিয়ে গেল। মা’র সেই ঘুম আর ভাঙল না। মা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। তুমি জানো না আলো সেদিন আমার যে কি কষ্ট হচ্ছিল! বারবার মনে হচ্ছিল কোনো একটা ম্যাজিক হোক আমার মৃত বাবা-মা, আমার মৃত সন্তান আর তুমি ফিরে এসো আমার কাছে। পরক্ষণেই নিজেকে বোঝালাম পৃথিবীতে এমন কোনো ম্যাজিক তৈরি হয়নি। যেই ম্যাজিকের প্রভাবে আমার মৃত বাবা-মা, আমার মৃত সন্তান ফিরে আসবে। তবে তোমার ফিরে আসার সম্ভাবনা আমাকে ভাঙতে পারল না। আমি অপেক্ষায় রইলাম তোমার ফিরে আসার।
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে আলো’র নিজের ওপর বড্ড রাগ হয়। কি হতো সেদিন যদি এই মানুষগুলোকে একবার সুযোগ দিত। কি হতো যদি সাহস করে সবকিছুর সম্মুখীন হতো? কিন্তু না। সে সাহসী না। তাই রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়েছিল নিজেকে জেতানোর জন্য। আচ্ছা জিততে পেরেছে কি?
মেঘালয়ের কাঁধে মাথা রেখে আলো দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

— আম্মু, তোমাকে আমি বড্ড মিস করছি জানো? তুমি তো আমায় ঋনী বানিয়ে চলে গেলে। তোমাকে একবার সাহায্যের বদলে তুমি আমায় কত কি উপহার দিলে? তোমার ওমন সোনার টুকরো ছেলে আমার মতো অযোগ্য মেয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলে। আমি যখন তোমার ছেলের পাহাড়সম ভালোবাসাকে পা ঠেলে দূরে সরিয়ে পালিয়ে গেলাম। ঠিক তখনও তুমি তোমার ছেলেকে বললে, আমার জন্য অপেক্ষা করতে। কেন বললে? একবারও ভাবলে না তোমার ছেলের কষ্ট হবে একা একা বসবাস করতে গেলে। আজ আমি আবারও প্রমান পেলাম, ডাক্তার সাহেব সত্যি সত্যি তার মায়ের নেওটা। নয়ত মায়ের সব কথা কেন সে মেনে নেবে?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭

চাঁদের আলোতে মেঘালয়ের মুখটার দিকে অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে আলো। তার চোখদুটোতে বিষাদের ছায়া৷ আলো মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরে। মেঘালয় আলোর মুখে দিকে তাকায়৷ শ্যাম চেহারার এই নারীটাকে দেখে রোজই নতুন করে প্রেমে পরছে। আলো আচমকা
মেঘালয়কে চমকে দিয়ে মেঘালয়ের গলায় মুখ ডুবিয়ে স্ব শব্দে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
— আপনার দুই চোখের বিষাদের ভাগ চাই, ডাক্তার সাহেব। ভাগ দেবেন তো আমায়?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শেষ পর্ব