Home মেহেরজান মেহেরজান পর্ব ২১

মেহেরজান পর্ব ২১

মেহেরজান পর্ব ২১
লেখনীতে- সোহা

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ভীষণ ভালো লাগলো রাউশির।কি সুন্দর বাড়ির ভেতরটা। নাকে ভেসে এলো একটি সুঘ্রাণ।এখন আপাতত অন্দরমহলে কেউ নেই।রাউশিকে গাড়িতে আটকে রেখেছিলো মেহরান। তাইতো দেরিতে প্রবেশ করায় কাউকে পেলো না রাউশি।হেঁটে সামনে এগিয়ে যেতেই একটি মেয়ের দেখা পেলো।একটি ব্যাগ নিয়ে মেয়েটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে।রাউশির সামনে আসতেই মেয়েটি সুন্দর হেসে বিনয়ীভাবে বলল,

“আপনি রাউশি আপু তাই না?”
রাউশি মাথা নাড়ালো।মেয়েটি আবারও হেসে বলল,
“আমি বিপাশা।আসুন আমার সাথে আসুন।আপনার রুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি।”
রাউশিও পেছন পেছন চললো মেয়েটার।সিড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময়ই বিপাশা মেয়েটা আবারও বলল,
“আপনার ব্যাপারে মায়ের কাছে অনেকবার শুনেছি আপনি নাকি অনেক সুন্দর।আজ সামনাসামনি দেখে বুঝলাম আসলেই মুখে বলার চেয়েও বেশি সুন্দর।”
“আমার যে, সুন্দর তো হওয়ারই কথা।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

পুরুষালী আওয়াজ শুনতেই বিপাশা পেছনে ফিরে তাকালো।রাউশি বুঝলো এটা মেহরান।চোখ ছোট ছোট করে পেছনে দেখলো মেহরান পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে।বিপাশা মুচকি হাসলো।আর বলল,
“হ্যা তাইতো।আমাদের মেহরান ভাইয়ের যে।”
রাউশি লজ্জা পেলো।মাথা নামিয়ে নিলো। তবে মেহরানকে গালি দিতে ভুললো না। মেহরান রাউশিকে পাশ কাটিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ করা রুমটিতে চলে যায়।বিপাশা পুনরায় হাঁটা শুরু করে আর পেছন পেছন রাউশিও।রাউশি এবার জিজ্ঞাসা করে,

“তোমায় ঠিক চিনতে পারলাম না।”
“আমি এ বাড়ির সবার ছোট মেয়ে।মেহরান ভাইয়ের মামাতো বোন।অর্থাৎ উর্মিলা খালার ছোট ভাই উর্ভর হাওলাদারের বড় মেয়ে।”
রাউশি এবার চিনতে পারলো।হাওলাদার বাড়ির কর্তা হলেন অনিমেশ হাওলাদার। উনার চার ছেলে মেয়ে।তিন ছেলে এক মেয়ে।বড় ছেলে অরুন হাওলাদার,এরপর আমিন হাওলাদার এরপরেই হলেন উর্মিলা হাওলাদার আর সবার ছোট উর্ভর হাওলাদার।রাউশিদের মতোই উনাদেরও যৌথ পরিবার।অরুন হাওলাদারের তিন ছেলে,আমিন হাওলাদারের এক ছেলে এক মেয়ে আর সবার ছোট উর্ভর হাওলাদারের দুই মেয়ে এক ছেলে। বাড়ির কর্তা অনিমেশ হাওলাদারের মৃত্যুর পর এখন সবার বড় হিসেবে বাড়ির কর্ত্রী খাদেজা বেগমকেই মান্য করা হয়।এইযে ঢাকা থেকে একমাত্র মেয়ের পরিবারের সবাই ঘুরতে আসবে শুনে ভীষণ খুশি হন তিনি।

সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন তাদের জন্য।অরুন হাওলাদারের স্ত্রী নাজিয়া বেগম আর আমিন হাওলাদারের স্ত্রী সাইফা বেগম কত করে বলছেন যে বিশ্রাম নিতে তবুও খোদেজা বেগম সেই সকাল থেকে বসার ঘরে অপেক্ষা করছেন ছেলের বউদের কথাও শুনছেন না। বাড়ির ছোট বউ হালিমা বেগম গিয়েছেন নিজের বাপের বাড়ি।উনাকেও বাড়িতে আসার জন্য হুকুম করেছেন খোদেজা বেগম।বিকেলের ভেতর এসে পড়বেন বলে জানিয়েছেন হালিমা।বিপাশা উর্ভর হাওলাদার আর হালিমা হাওলাদারের মেয়ে এটা রাউশি বুঝতে পারলো।উনাদের ফ্যামিলির কাহিনী উর্মিলা বেগমই শুনিয়েছিলেন একদিন। হাটতে হাটতে রাউশির চোখ গেলো সামনে বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেইন্টিং করা অবস্থায় এক যুবকের দিকে।উৎসুক হলো দৃষ্টি।পরক্ষণেই মেহরানের কথা মনে পড়লো।এদিকে বিপাশা সামনে শিহাবকে দেখে ডেকে উঠলো,

“শিহাব ভাই! দেখো একটা জলজ্যান্ত পুতুল এসেছে।”
শিহাব পেইন্টিং করছিলো বিপাশার কণ্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো রাউশিদের দিকে।বিপাশা আর পাশে অচেনা মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো।রাউশি বিপাকে পড়লেও বিপাশা টেনে নিয়ে গেলো রাউশিকে শিহাবের সামনে।রাউশির অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেতে হলো সামনে।

শিহাব শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে এইতো কয়েক মাস আগে।এখন আপাতত বেকার আছে তবে চাকরির খোঁজে আছে। বাড়িতে থাকলে পেইন্টিং করেই দিন পার করিয়ে দেয়।এবাড়ির একটা ছেলেও এখনও বিয়ে করে নি।শিহাব বাড়ির মেজো কর্তা আমিন হাওলাদারের বড় ছেলে।আর বাড়ির সমস্ত ছেলেদের মাঝে সেজো ছেলে। খান পরিবারেও মেহরান যেমন সবার বড় ঠিক মায়ের পরিবারের দিকেও মেহরানই সবার বড় ছেলে।খুবই ভদ্র একজন ছেলে শিহাব।সাথে ভীষণ বুঝদার আর সরল প্রকৃতির।বিপাশা আর রাউশি সেখানে যেতেই শিহাব জিজ্ঞাসা করলো,

“কে ও?”
বিপাশা বলল,
“মেহরান ভাইয়ের মেজো চাচার মেয়ে মৌরিন খান রাউশি।”
শিহাব এবার সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বলল,
“হাই রাউশি।আমি শিহাব।”
রাউশি সৌজন্য হাসলো শুধু আর বলল,
“হ্যালো।”
পেছন থেকে আবার একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেলো।
“এই বিপাশা কে ও?”

বিপাশা সহ রাউশিও পেছনে ফিরে তাকালো।মডার্ন ড্রেস পড়া একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তীক্ষ্ণ তার চাহনী রাউশির ওপরই নিক্ষিপ্ত।শিহাব আবারও নিজের কাজে মন দিলো।বিপাশা হেসে বলল,
“শায়মা আপু এ হলো রাউশি।তোমারই সমবয়সী।মেহরান ভাইয়ার মেজো চাচার মেয়ে।ওইযে বড় মা সবসময়ই যার প্রসংশা করে।এই তো রাউশি।”
শায়মা শিহাবের ছোট বোন।শায়মা এগিয়ে আসলো।উপর নিচ রাউশিকে একবার দেখলো।রাউশি বিব্রতবোধ করলো।শায়মা ঘাড় হেলিয়ে বলে,
“প্রসংশনীয় এমন কিছুই তো চোখে পড়লো না।”
রাউশি চোখ তুলে তাকালো।মেয়েটার কথায় স্পষ্ট অন্যকিছু আছে।বিপাশাসহ শিহাব তারা কিছুটা ইতস্ততবোধ করলো রাউশির সামনে শায়মার এমন আচরণে।শিহাব গম্ভীর আওয়াজে বলল,

“শায়মা রুমে যা।”
শায়মা আবারও তীক্ষ্ণ চাহনীতে দেখলো রাউশিকে।আর বলল,
“পরেরবার যাতে আমার সাথে তোমার দেখা না হয় রাউশি।”
রাউশি বিরক্ত হলো।এই মেয়ে শুরুতেই এমন ফালতু কথাবার্তা বলছে কেন?সমস্যা কি এর?রাউশিও পালটা জবাবে বলল,
“আমারও ইচ্ছে নেই।ধন্যবাদ।”

কথাটা শুনে পেছনে থাকা শিহাব আড়ালে মুচকি হাসলো।তার বোন যে কি পরিমাণ হিংসুটে সেটা বাড়ির সবাই জানে।বিপাশার হাসি পেলেও হাসতে পারলো না।পাছে শায়মা আবার মেরে না বসে।শায়মা গলা উঁচিয়ে বলে,
“এটা আমার বা_”
বাকি কথাটা বলার আগেই সেখানে উপস্থিতি ঘটে মেহরানের,
“আসতে না আসতে অতিথির সাথে এমন ব্যবহার? আমার জানা মতে মেজো মামা একজন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। কিন্তু উনার মেয়ের স্বভাব যে এমন সেটা প্রত্যাশার বাইরে ছিলো।”

শিহাব মেহরানের কণ্ঠ শুনে এগিয়ে এলো আর মেহরানের সাথে হ্যান্ডশেক করে কোলাকুলি করলো।শায়মা মেহরানের দিকে একবার ভালোভাবে তাকালো।চোখ কোনোভাবে সড়িয়ে ঝামটা মেরে সেই স্থান ত্যাগ করলো।মেহরান রাউশির দিকে এমনভাবে তাকালো যেন কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে এখন।এদিকে রাউশি ভড়কে গিয়ে বিপাশাকে বলল,
“চলো আমার রুমটা দেখিয়ে দাও।টায়ার্ড লাগছে।”

বিপাশা আর রাউশি চলে গেলো।শিহাব কিছুক্ষণ মেহরানের সাথে কথা বললো। বিপাশা রাউশিকে তার রুমটা দেখিয়ে দিয়ে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিলো তখনই তার হাতে টান দিয়ে কেউ অন্যপাশে নিয়ে যায় বিপাশাকে।বিপাশা দেখলো এটা উজান। বিপাশা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“ভয় পাইলে দিয়েছিকে ভাইয়া।”
“একটু আধটু ভয় পেতে হয় মাঝেমধ্যে।”
বলে বিপাশার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

“বড় হয়ে গেছিস দেখছি।মোটাও হয়ে গেছিস।গালগুলো ফুলে গেছে তোর।”
বিপাশা রেগে গেলো।মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে চলে যেতে নিলেই আবারও হাত টেনে ধরলো উজান।বলল,
“এই দাঁড়া দাঁড়া।এতো রেগে যাস কেন? তুই তো আগে রাগী ছিলি না? এমন রাগী হলি কবে থেকে?”
বিপাশা দাত কিড়মিড় করে বলল,
“বড় হয়েছি,মোটা হয়েছি তাই রাগীও হয়েছি।”
উজান গালে হাত দিয়ে বলল,

“হ্যা এটা ঠিক বলেছিস।তবে চিন্তা করিস না।এবার তোকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে জিমে ভর্তি করিয়ে দেবো।কি বলিস?”
আরও বেশি ক্ষেপে গেলো বিপাশা।চোখ রাঙিয়ে হাত ছাড়িয়ে চলে গেলো অন্যদিকে।উজান ভাবলো রাগের কি আছে?তখনই সেখানে তানজিম এসে উজানের পিঠ চাপড়ে বলল,
“শালা আসতে না আসতেই টাংকি মারা শুরু?তুই আর জীবনেও ভালো হইতি না।”
“আমি তো রাস্তায় টেম্পু চালায় সবার সামনে।কিন্তু তুই তো অলি গলি দিয়া টেম্পু চালাস শালা।আমি কি বুঝি না মনে করো? ”

মেহরান সেদিক দিয়েই রাউশির রুমের দিকে যাচ্ছিলো এই দুইজনের কথা শুনে থেমে গিয়ে গম্ভীর আওয়াজে বলল,
“বাবা আর ছোট চাচা কি জানে? তোরা টেম্পু চালাচ্ছিস?এমনিতেও তো বেকারই আছিস, কবে কবে টেম্পু কিনলি?”
মেহরানকে দেখে তানজিম উজান সোজা হয়ে দাড়ালো।দুজনে একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি ঢোক গিললো।উজান আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে তুমি তো গহীন জলের মাছ।তাই আমরাও টেম্পু চালিয়ে আনাচে কানাচে বিভিন্ন এক্সপার্টদের কাছে গিয়ে শিখছিলাম কিভাবে গহীন জলের মাছ হওয়া যায়?”
মেহরান ধমকে বলল,

“চুপ কর।এখান থেকে যা।”
তানজিম বলল,
“হ্যা এইতো যাচ্ছি।”
বলেই দুজনে চলে গেলো বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে।মেহরান সোজা রাউশির রুমের সামনে যেতেই আবার দেখতে পেলো নুজাইশকে।ফোনে কথা বলে বলে নিচের দিকে যাচ্ছে।মেহরান ভাবলো আগে রাউশিকে একটু হুমকি ধমকি দিয়ে তারপর নুজাইশের কাছে যাবে।যেই ভাবা সেই কাজ। রাউশির রুমের সামনে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো।রাউশি ভাবলো বিপাশা এসেছে হয়তো তাই দরজা খুলতেই মেহরানকে দেখে আবারও দরজা লাগাতে যাবে তার আগেই মেহরান দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো।ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দিয়ে রাউশির দিকে এগিয়ে গেলো।রাউশি পেছাতে পেছাতে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকলো।মেহরানের সাথে রাউশির দূরত্ব খুব বেশি নয়।মেহরান কিছুক্ষণ চুপ করে রাউশিকে দেখলো।রাউশিও তারই দিকে তাকিয়ে।চোখ নামালো না মেয়েটা।সেও তাকিয়ে দেখলো আজ মেহরানকে।মেহরান বলল,

মেহেরজান পর্ব ২০ (২)

“নিষেধ করেছিলাম।”
“আমার কোনো দোষ নেই।বিপাশাই তো।”
রাউশির ঠোঁটে নিজের তর্জনী রাখলো মেহরান।এবার রাউশি কিছুটা হলেও কেঁপে উঠলো।অবাধ্য অনুভুতিগুলো আবারও ধড়ফড় করে উঠলো।ঠোঁটজোড়া কাঁপছে রাউশির।মেহরান আরেকটু এগিয়ে গিয়ে রাউশির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“চল আজই বিয়ে করে ফেলি।তাহলে আর কোনো চিন্তা থাকবে না।”

মেহেরজান পর্ব ২২