মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৭
মাহা আয়মাত
ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের স্বরে ভেসে আসে,
— মিথ্যে নাটক করো না। দিব্যি তো বেঁচে আছো! সুখেও আছো!
অর্তিহা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। সে সুখে থাকুক বা না থাকুক, নতুন করে মাওলিদকে নিজের জীবনে জড়িয়ে তার কোনো ক্ষতি করতে চায় না। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, মাওলিদকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখা। না হলে আদ্রিক যদি সব জেনে যায়, বড় বিপদ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়বার সে মাওলিদকে হারাতে পারবে না।
নিজেকে সামলে নেয় অর্তিহা। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে,
— তুমি বেঁচে কীভাবে আছো?
মাওলিদ তিক্ত কন্ঠে বলে,
— আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন, দেখানোর জন্য ভালোবাসা কিভাবে বেঈমানি করে!
এই কথাটা শুনে অর্তিহার ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মাওলিদ তাকে ভুল বুঝছে কিন্তু এখন ভুল ভাঙানোর সময় না। যে কোনো সময় আদ্রিক এসে যেতে পারে। নিজেকে শক্ত করে অর্তিহা বলে,
— আল্লাহ যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, দোয়া করি তিনি যেন তোমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেন। বাঁচিয়ে রাখেন।
— তোমাকে ছাড়া?
অর্তিহা চোখ বন্ধ করে নেয়, তারপর ধীরে বলে,
— এখন তোমার আর আমার পথ আলাদা, মাওলিদ।
— ভালোবাসো না?
নিরবতা থাকে কিছু সেকেন্ড। তারপর অর্তিহা নরম ভেঁজা গলায় বলে,
— আমার মন যা বলতে চায়, কিংবা তুমি যা শুনতে চাও সেই উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আর নেই।
এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি করে না অর্তিহা। সে কল কেটে দেয়। কথা বাড়াতে চায় না। বেশি কথা বললে পুরোনো অনুভূতিগুলো আবার জেগে উঠবে, যেগুলোকে সে এত কষ্টে চেপে রেখেছে। মাওলিদ নামের সেই অনুভূতিগুলো বুকের গভীরে লুকিয়েই রাখা ভালো।
হঠাৎই অর্তিহার মনে ভয় জাগে, আদ্রিকের কথা ভেবে। কোনোভাবেই আদ্রিককে জানতে দেওয়া যাবে না যে মাওলিদ এখনো বেঁচে আছে। তাই দ্রুত ফোনটা লুকিয়ে ফেলতে হবে। এমন কোথাও রাখতে হবে, যেখানে আদ্রিকের চোখ কোনোভাবেই পৌঁছাবে না।
আদ্রিক সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনে টেবিলের ওপর খোলা ল্যাপটপ। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে তার নিজের রুমের দৃশ্য। তার দৃষ্টি স্থির ল্যাপটপের পর্দায় আর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত শীতল হাসি। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, অর্তিহা চোখের জল মুছে নেয়। তারপর বাটন ফোনটা ওড়নার নিচে লুকিয়ে রেখে ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হয়ে যায়। আদ্রিকের ঠিক ডান পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ। সেও তাকিয়ে আছে ল্যাপটপের দিকে। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। কিছুক্ষণ পর সে অবাক কণ্ঠে বলে,
— এটা কিভাবে সম্ভব, বস? মাওলিদ বেঁচে আছে?
আদ্রিক দৃষ্টি না সরিয়েই ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— তোমার কি মনে হয়?
সৌরভ কিছুটা অস্থির হয়ে পড়ে। মাথা নাড়িয়ে বলে,
— বস, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রীতিমতো মাথা ঘুরছে। কনফিউজড আমি!
আদ্রিকের ঠোঁটের হাসিটা আরও একটু গাঢ় হয়।
— এটাই তো চেয়েছে!
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— মানে?
আদ্রিক এবার উঠে দাড়ায়। পকেটে হাত গুঁজে সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলে,
— মানে খুব সোজা। কনফিউজড করার জন্যই এই কলটা এসেছে!
সৌরভ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
— আপনাকে কনফিউজড করতে?
আদ্রিক মাথা নেড়ে বলে,
— উহু। আমাকে কনফিউজড করা সম্ভব না, এটা ওরা ভালো করেই জানে। অর্তি ওদের টার্গেট। ওরা অর্তির ইমোশনকে হাতিয়ার বানাচ্ছে!
সৌরভ কিছুটা থেমে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি এই বিষয়ে আগে থেকেই জানতেন?
আদ্রিক পেছন ফিরে কাঁচের দেয়ালের দিকে এগিয়ে যায়। কাঁচের কাছে এসে দাঁড়িয়ে, এগারো তলার উঁচু থেকে নিচের বিশাল শহরটাকে একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ধীর স্বরে বলে,
— আমি জানতাম, অর্তি হানিনের টার্গেট হবে। আমাদের বিয়ের পরের দিনই ও অর্তির গলার চেইনটা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিল। মানে, আমার নজর থেকে অর্তিকে আড়াল করতে চাচ্ছিল। তাই সেদিনই অর্তির ইয়ার রিংস, রিং, আমার রুম, এমনকি অর্তির টেডিবিয়ারেও হিডেন ক্যামেরা বসিয়েছি। ও একটা চোখ বন্ধ করবে, আমি দশটা চোখ খুলব। আমার নজর থেকে অর্তিকে আড়াল করা অসম্ভব।
সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে,
— কিন্তু বস, মাওলিদের ব্যাপারটা? ও কি সত্যিই বেঁচে আছে?
আদ্রিক এবার ঘাড় ফিরায়। ঠান্ডা হেসে বলে,
— আমি নিশ্চিত, এটা মাওলিদ না। এপার-ওপার করে ঢুকেছিলো ছুড়িটা হৃদপিণ্ডে।
সৌরভ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
— তারপরও যদি ওকে কেউ বাঁচিয়ে নিয়ে থাকে?
— তুমি আর মিরাজ নিজে ওকে কবর দিয়েছিলে। ও কীভাবে বেঁচে থাকবে?
সৌরভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তবে তার মুখের অভিব্যক্তিতে স্পষ্টই ধরা পড়ছিল মাওলিদের বেঁচে থাকা নিয়ে দ্বিধা। চোখেমুখের সেই অস্পষ্ট ভাবটাই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কোথাও না কোথাও সে বিশ্বাস করছে, হয়ত মাওলিদ সেদিন বেঁচে গিয়েছিলো।
হঠাৎই আদ্রিকের চোখে ভয়ংকর এক কঠোরতা নেমে আসে। ঠাণ্ডা গলায় বলে,
— যদি বেঁচে থাকে…. আই সোয়ার, এবার আমি ওকে এমন ভয়ংকরভাবে মারব, যে তুমি আমার এত খুন করা দেখেও কোনোদিন ভয় পাওনি, সেই তুমিই মাওলিদের ভয়ংকর মৃত্যু দেখে ভয় পাবে!
সৌরভ কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
— কিন্তু বস, এই মাওলিদকে ধরবটা কীভাবে? এই নাম্বারটা তো লন্ডনের! আর লন্ডনের একজন ব্যক্তির ফোন নাম্বার থেকে ইনফরমেশন পাওয়া সহজ না।
— কুল। ওরা নিজেরাই ধরা দেবে।
সৌরভ একটু থেমে আবার বলে,
— আচ্ছা। তাহলে এই হানিন মাওলিদের লোক? এটাই আপনার সাথে শত্রুতার কারণ?
আদ্রিক হালকা ভেবে বলে,
— হয়তো… অন্য কিছু কারণও আছে।
সৌরভ কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসে।
— অন্য কিছু বলতে?
আদ্রিক কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বলে,
— শুধু মাওলিদই শত্রুতার কারণ না। এটা আমার মনে হয়।
সৌরভ আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
— তাহলে আর কী কারণ থাকতে পারে? আপনি কি কিছু টের পেয়েছেন?
আদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— হানিনের কথা-বার্তা শুনে মনে হয় না, ওর শত্রুতা শুধু আমার বা অর্তির সাথেই। ও আরভিদকেও ইনডিরেক্টলি খোঁচাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ওর শত্রুতা পুরো পরিবারের সাথে।
সৌরভ অনুমান করে বলে,
— হয়তো আপনার ওপর ক্ষোভ থেকেই পুরো পরিবারকে ধ্বংস করতে চাইছে।
আদ্রিক আর কিছু বলে না। সে চুপ করে যায়, গভীরভাবে হানিনকে নিয়ে ভাবতে থাকে। নীরবতার মাঝেই সৌরভ আবার ডাকে,
— বস?
— হুম?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
আদ্রিক চোখ ঘুরিয়ে সৌরভের দিকে তাকায়।
— করো।
সৌরভ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে প্রশ্নটা করে,
— আপনি কি ম্যামের ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন? আজ ম্যামের কথাগুলো শুনে মনে হলো, ম্যাম এখনো ইমোশনালি মাওলিদের সাথে অ্যাট্যাচড আছেন।
কথাটা শোনামাত্র আদ্রিকের চোখে কঠিন এক শীতলতা ভর করে। ভারী ও নির্মম কন্ঠে বলে,
— যদি অর্তি দ্বিতীয়বার আমাকে না চুজ নিয়ে ওই বাস্টার্ডকে চুজ করে, আমাকে হার্ট করে, তাহলে অর্তিও হার্ট হবে। আমি কাউকে ছাড় দিই না। শাস্তি অর্তি সবকিছুরই পাবে। বউ বলে কোনো ছাড় পাবে না। তবে আপাতত আমার অনাগত সন্তানের জন্য শাস্তিটা তুলে রাখলাম।
অর্তিহা দ্রুত নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। বুক ধড়ফড় করছে। সে তাড়াতাড়ি বেডের কাছে গিয়ে বসে পড়ে। তারপর ম্যাট্রেসটা একটু তুলে নিচ থেকে একটা ছোট চাবি বের করে। এই চাবিটাই তার বেডের শেষ প্রান্তের গোপন লকারের। কাঁপা হাতে লকার খুলে ভেতর থেকে একটা ছোট বক্স বের করে নেয়। এই বক্সেই রাখা মাওলিদের সব স্মৃতি। বক্সটা হাতে নিতেই অর্তিহার চোখ ভিজে ওঠে। তবুও বুকের ভেতর কোথাও এক অদ্ভুত স্বস্তি, মাওলিদ বেঁচে আছে। মাওলিদ হয়তো তার না, কিন্তু বেঁচে আছে, এটাই অর্তিহার জন্য অনেক।
অর্তিহা ওড়নার নিচে লুকিয়ে রাখা বাটন ফোনটা বের করে। এটাও এখানেই লুকিয়ে রাখবে, যাতে আদ্রিক কিছু জানতে না পারে। কিন্তু বক্সটা খুলতেই অর্তিহা থমকে যায়।
তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ভেতরে রাখা মাওলিদের ছবিটা টুকরো টুকরো করে ছেঁড়া। পাশে পড়ে আছে মাওলিদের দেওয়া ব্রেসলেট। ছিঁড়ে যাওয়া, ভাঙা অবস্থায়। মুহূর্তেই অর্তিহার ভেতরটা ভেঙে যায়। সে কাঁপতে কাঁপতে জিনিসগুলো হাতে নেয়, আর অঝোরে কেঁদে ওঠে। এটাই ছিল তার কাছে মাওলিদের শেষ স্মৃতি।
বোঝার বাকি থাকে না, এটা কার কাজ। অর্তিহার কান্না থেমে যায়। চেহারাটা শক্ত হয়ে ওঠে। চোখে জ্বলে ওঠে দহন।
অর্তিহা ফোনটা বেডে রেখে বক্সটা বন্ধ করে আবার লকারে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর লকার লক করে চাবিটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। ফোনটাও সেই চাবির সাথে রেখে দেয়। সবকিছু ঠিকঠাক করে সে আদ্রিকের রুমে এসে বসে। অপেক্ষা করতে থাকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। তবুও সে একইভাবে বসে থাকে, বেডের পায়ের দিকটায়, দরজার দিকে মুখ করে। অর্তিহার চোখে এখনো সেই জ্বলন্ত রাগ। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হয়। রুমের দরজা খুলে, আদ্রিক ভেতরে ঢুকে। আদ্রিককে দেখে অর্তিহা দাঁড়িয়ে যায়। দু কদম এগিয়ে এসে আদ্রিকের চোখে চোখ রেখে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— আপনি আমার রুমে গিয়েছিলেন?
আদ্রিক একদম শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
— হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।
— কেন?
আদ্রিক অর্তিহাকে পাশ কাটিয়ে এগোতে এগোতে নির্লিপ্তভাবে বলে,
— ইচ্ছে হয়েছিল।
অর্তিহা ঘুরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— ইচ্ছে হলেই আপনি আমার অনুমতি ছাড়া যাবেন কেন? আর আমার জিনিসে হাত দেওয়ার সাহস কে দিয়েছে?
আদ্রিক কোনো উত্তর দেয় না। ঘুরে কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ অর্তিহার কাছে এসে অর্তিহার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয়। তারপর অর্তিহার গাল আর গলায় স্লাইড করতে করতে শান্ত গলায় বলে,
— তোর জিনিস ছোঁয়ার পারমিশন? যেখানে আমি তোকেই অবাধে ছুঁই!
এইবার অর্তিহা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। সে ঝট করে আদ্রিকের শার্টের কলার চেপে ধরে বলে ওঠে,
— সাহস কীভাবে হয় আপনার, মাওলিদের দেওয়া শেষ জিনিস ভাঙচুর করার?
আদ্রিক একবার নিচে তাকিয়ে নিজের কলারটা দেখে, যেটা অর্তিহা শক্ত করে ধরে আছে। পরের মুহূর্তেই সে অর্তিহার বাম হাতটা চেপে ধরে মুচড়ে পেছনে নিয়ে যায়।
ব্যথায় অর্তিহা কুঁকড়ে ওঠে। ডান হাত দিয়ে কলার ধরা ছেড়ে দেয়।
আদ্রিক হিমশীতল স্বরে বলে,
— এখন হাতটা ভেঙে ফেলি?
বলেই সে হাতটা আরও জোরে মুচড়ে ধরে। অর্তিহার মুখ থেকে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ বের হয়।
— আআহ্! ব্যথা পাচ্ছি! ছাড়ুন!
কিন্তু আদ্রিক ছাড়ে না। সে স্থির চোখে অর্তিহার ছটফটানি দেখতে থাকে। হঠাৎই ঝড়ের মতো কেউ এসে আদ্রিকের হাত থেকে অর্তিহাকে ছাড়িয়ে নেয়। টেনে অর্তিহাকে আদ্রিকের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়। আদ্রিক তাকিয়ে দেখে মানুষটা আরভিদ।
আরভিদ অর্তিহাকে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে রেগে বলে ওঠে,
— তুই অর্তিকে মারছিস?
আদ্রিক জিজ্ঞেস করে,
— তুই এখানে কেন?
আরভিদ দাঁত চেপে বলে,
— আমি যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দে!
আদ্রিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
— হাসবেন্ড-ওয়াইফের মধ্যে ইন্টারফেয়ার না করার ভদ্রতা রেখে এখান থেকে যা।
আরভিদ আগের মতোই বলে,
— আমি আমার বোনকে ছেড়ে যাব না। ও ভয় পাচ্ছে!
আদ্রিক এবার অর্তিহার দিকে তাকায়। সে আরভিদের পেছনে লুকিয়ে আছে, একদম চুপসে। যেন আদ্রিকের চোখের আড়ালেই থাকতে চায়। মাথা নিচু, শরীর কাঁপছে।
আদ্রিক ঠাণ্ডা গলায় বলে,
— এত সাহস দেখাস কেন? যদি পরে সামনে আসতেও বুক কাঁপে?
এই কথা কানে যেতেই অর্তিহা ভয়ে আরভিদের পিঠ আঁকড়ে ধরে আরও শক্ত করে লুকিয়ে পড়ে। আরভিদ এবার কিছুটা নরম হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, আদ্রিকের কথা বদলানো সম্ভব না। তাই গলার স্বর শান্ত করে বলে,
— আচ্ছা, আমি তোদের হাসবেন্ড-ওয়াইফের মাঝে কথা বলব না। আর থাকবও না। তুই একটু আমার সাথে বাইরে আয়।
আদ্রিক একবার অর্তিহার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর কিছু না বলে রুম থেকে বের হয়ে যায়। আরভিদ হাত পেছনে নিয়ে অর্তিহাকে সামনে আনে। অর্তিহা এখনো ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট। আরভিদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কী হয়েছে? আদ্রিক এমন করল কেন?
অর্তিহা মাথা নিচু করে ইতস্তত করে বলে,
— আমি রেগে শার্টের কলার চেপে ধরেছি।
আরভিদ একটু অবাক হয়।
— আদ্রিক বেয়াদবি পছন্দ করে না। সে অন্যরকম। এটা তুই জানিস না? যাক, আর এমন করবি না।
অর্তিহা কোনো উত্তর দেয় না। তার বুক এখনো ধড়ফড় করছে। এখন তো আরভিদের জন্য বেঁচে গেছে, কিন্তু এরপর? আদ্রিকের কাছ থেকে তো সে পালাতে পারবে না। রাগের মাথায় আদ্রিককে বিগড়ে ফেলেছে। এখন আদ্রিককে সামলাবে কিভাবে?
অর্তিহার নীরবতা দেখে আরভিদ বলে,
— থাক এখানে। আমি যাচ্ছি।
এই কথা শুনেই অর্তিহা ভয় পেয়ে আরভিদের হাত ধরে ফেলে।
— না, যেও না। আমার ভয় করছে।
আরভিদ অর্তিহাকে আশ্বস্ত করে বলে,
— কিছু করবে না আদ্রিক। আর তুইও আর কখনো এমন করবি না। আদ্রিক যেটা অপছন্দ করে, সেটা করবি না।
বলেই আরভিদ বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে দেখে, আদ্রিক করিডরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। আরভিদকে দেখেই সে বলে ওঠে,
— কী বলার, তাড়াতাড়ি বলে যা।
আরভিদ একটু থেমে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে,
— শোন, জোর করে আমিও মেহুকে বিয়ে করেছি। কিন্তু জোরটা শুধু বিয়ে পর্যন্তই ছিল। এরপর আমি মেহজাকে ভালোবেসে জয় করেছি। আমি চাই তুইও অর্তিকে ভালোবেসে…
আদ্রিক তার কথা কেটে দিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
— ওসব ভালোবেসে সামনের মানুষের সামনে কুকুরের মতো ব্যক্তিত্বহীন হয়ে যাওয়ার স্বভাব আমার নেই। যা আমার, সেটা আমারই হবে। আমি জোর করেই তাকে আমার করব, আর জোর করেই নিজের কাছে রাখব। এখন সামনে থাকা মানুষটা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও আমার হয়েই থাকবে। কারণ, আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কোনো অপশন নেই।
আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
— জোর কতদিন করবি?
আদ্রিক একদম নির্লিপ্ত গলায় বলে,
— যদি অর্তিকে জোর খাটিয়ে সারাজীবন নিজের করে রাখতে হয়, তাহলে আমি সারাজীবনই জোর খাটাবো।
আরভিদ ক্লান্ত গলায় বলে,
— যা ইচ্ছে কর, কিন্তু আমার বোনকে মারবি না।
আদ্রিক ঠোঁটের কোণে অভ্যাসগত হাসিটা টেনে বলে,
— জানিস, তোদের ভাই-বোনের একটা স্পেশাল ডোজ লাগে?
আরভিদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কী ডোজ?
— যেটা তোর বউ তোকে দেয়, একটু এদিক-সেদিক হলেই! সেই ডোজটার কথাই বলছি। এটা তোদের বেসিক নিড। না হলে তোরা বেলাইন হয়ে যাস। আর এখন এই ডোজটা আমার বউকে দিতে হবে।
কথাটা শেষ করেই আদ্রিক হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দেয়। পা দিয়ে চেপে ধরে আগুন নিভিয়ে, ধীর পায়ে এগিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
আরভিদ দাঁড়িয়ে থাকে, পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে। আদ্রিক তাকে ঠান্ডা মাথায় বাঁশ মেরে চলে গেছে!
ওদিকে, অর্তিহা বেডের ওপর বসে দুহাত কচলাচ্ছে। হঠাৎই দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আদ্রিককে দেখতেই তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায় ভয়ে।
আদ্রিক দরজা বন্ধ করে অর্তিহার দিকে এগিয়ে আসে। অর্তিহা কাঁপা গলায় ঢোক গিলে আদ্রিকের দিকে তাকায়।আদ্রিকের মুখ আগের মতোই স্বাভাবিক, চোখ দুটো ঠাণ্ডা।
আদ্রিক অর্তিহার মুখোমুখি এসে দাড়াতেই হঠাৎই অর্তিহা উঠে দাড়িয়ে আদ্রিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাথাটা আদ্রিকের বুকে চেপে ধরে নিচু স্বরে বলে,
— হয়েছে থামুন। আমার ভয় করছে। আর করব না এমন।
বলেই অর্তিহা চুপচাপ আদ্রিকের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও আদ্রিকের কোনো উত্তর তার কানে আসে না। এবার অর্তিহা মাথা তুলে আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিকও তাকিয়ে আছে অর্তিহার দিকে। আদ্রিকের চোখে এখন আগের মতো কোনো ঝড় নেই, বরং শান্ত। অর্তিহা আদ্রিককে ছেড়ে দিয়ে আদ্রিকের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে বলে,
— এই যে, কলার ঠিক করে দিচ্ছি। আর ধরব না।
এবারও অর্তিহা আদ্রিকের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে আদ্রিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, উত্তরের অপেক্ষায়। মনে মনে সে খুব করে চাইছে, আদ্রিক যেন আর কথা না বাড়ায়, তার কথাটা মেনে নেয়। কারণ এখন যদি আদ্রিক তাকে ক্ষমা না করে, তাহলে আজকে অর্তিহা শেষ। তাকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। ভয়ার্ত চোখে সে আদ্রিকের দিকে চেয়ে থাকে, উত্তরের আশায়। বুকটা এখনো ভয়ে ধুকপুক করছে।
আদ্রিক হাতটা উঠিয়ে অর্তিহার পেছনের চুলের ভাঁজে হাত ঢুকিয়ে অর্তিহাকে কাছে টেনে আনে। চোখে চোখ রেখে নরম স্বরে বলে,
— মনে যেন থাকে। যদি দ্বিতীয়বার এমন ভুল হয়, তাহলে…..
কথা শেষ না করেই সে অর্তিহার থুতনি ধরে আলতো করে ঠোঁটে চুমু খায়। তারপর নিচু গলায় বলে,
— শাস্তি পাবি। আর শাস্তি কিন্তু আদর না….শাস্তিই।
তখনি দরজায় জোরে জোরে ধাক্কার শব্দ হয়। বাইরে দাঁড়িয়ে আরভিদ দরজা পেটাচ্ছে। আরভিদের কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ,
— আদ্রিক, দরজা খোল! তোকে বলে দিচ্ছি, অর্তিকে মারবি না!
আদ্রিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— আমাদের সব মিটমাট হয়ে গেছে। তুই এখন চলে যা।
কিন্তু আরভিদ বিশ্বাস করে না। সে আবারও দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলে,
— দরজা খোল! আমার বোনকে আমি নিয়ে যাব!
আদ্রিকের মুখ শান্ত থাকলেও অর্তিহা বুঝতে পারে, আদ্রিক ভেতরে ভেতরে হয়ত বিরক্ত। তাই অর্তিহা নিজেই দরজার দিকে মুখ করে একটু জোরে বলে,
মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৬
— ভাইয়া, সত্যিই সব ঠিক হয়ে গেছে। আমি আর ভয় পাচ্ছি না।
বাইরে থেকে একটু থেমে আরভিদের কণ্ঠ শোনা যায়,
— সত্যি?
অর্তিহা আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
কিছুক্ষণ পর পায়ের শব্দ দূরে সরে যায়। বুঝতে পারে আরভিদ চলে গেছে।
আদ্রিক হালকা করে অর্তিহার নাক ছুঁয়ে মৃদু স্বরে সুর টেনে বলে,
— হুমমমমমমমমমমমমমম।
