মৌটুসী পর্ব ১৬
ঋতস্বিনী মাহবিশ
আকাশের গায়ে রাতের এই শেষ প্রহর নিস্তব্ধতার মায়াজাল বুনে রেখেছে। ভোরের আলো ফুটতে এখনও কিছুটা দেরি, চারপাশটা গাঢ় নীল রঙের অস্পষ্ট আবেশে ঢাকা। আর এই নিঝুম মুহূর্তে রাতের বিদায়ী স্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে শুরু হলো বাচ্চাদের অতী কাঙ্ক্ষিত আনন্দের দিনটির সূচনা লগ্ন।
মৌটুসী খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সব গোছগাছ শুরু করে দিয়েছে। প্রথমেই তার আর চড়ুইয়ের জামাকাপড়গুলো বের করে ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখল। তারপর চলে গেল রান্নাঘরে। ভোরের আলো এখনো ফোটেনি। নাস্তার পাশাপাশি কয়েকটা প্যানকেক বানিয়ে নিল। এগুলো সাথে নিবে। রাস্তায় যদি চড়ুই খেতে চায়! বাইরের যা-তা খাবার তো দেওয়া যাবে না তাকে।
এতো ভোরে কিচেন ক্যাবিনেটের সামনে বড় ভাইকে তন্ময় হয়ে কাজ করতে দেখে ভীষণ অবাক হলো আশা। ঘুমঘুম চোখ নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
‘ভাইয়া! কি করছ?’
বোরাক হাতের কাজ অব্যাহত রেখেই বলল,
“বীরের জন্য বিরিয়ানি নিয়ে যাব। ওখানকার খাবারে ঝাল থাকবে, ও খেতে পারবে না।”
আশা এবার নিজের কপাল চাপড়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, “অহ শিট! এটা আমার মাথায় আসে নি কেন?”
বোরাক মুচকি হাসল বোনের আফসোসে। প্যানের ঢাকনা উঠিয়ে দিয়ে বোনের মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলল, “হয়ে এসেছে, কিছুক্ষণ পর নামিয়ে নিয়ে নিস। আমি উপরে গেলাম।”
বোরাক চলে গেলে আশা ফ্রিজ থেকে চিকেন কিমা আর ফ্রোজেন পরোটা বের করল। পরোটা বোরাকের নাস্তার জন্য, আর চিকেন কিমা দিয়ে বীরকে কয়েকটা মিটবল বানিয়ে দিবে।
অন্যদিকে, মৌটুসী রান্নাঘরের কাজ সেরে ঘরে এসে চড়ুইকে ঘুম থেকে তুলল। ফ্রেশ করিয়ে এনে নাস্তা করাল প্রথমে, তারপর সময় নিয়ে তাকে রেডি করতে শুরু করল সে। চড়ুইয়ের ঠোঁটের কোণ থেকে হাসি যেন সরছেই না; সে ভীষণ এক্সাইটেড। এই প্রথম এত দূরে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে, তার ওপর সঙ্গে যাচ্ছে তার বীর বন্ধু আর প্রিয় আঙ্কেল—সব মিলিয়ে সে যেন আজ মেঘের ওপর ভাসছে।
মৌটুসী চড়ুইয়ের মুখে বেবি ময়েশ্চারাইজার মাখিয়ে দিয়ে হাতে-পায়ে লোশন ম্যাসাজ করে দিল। এদিকে চড়ুই ননস্টপ এটা-ওটা বকবক করেই যাচ্ছে। কত-শত পরিকল্পনা তার!
মৌ চড়ুইয়ের পরনের পোশাকগুলো খুলে দিয়ে তাকে জিন্স প্যান্ট, অফ-হোয়াইট কালারের ফ্রক আর তার ওপর একটা ডেনিম জ্যাকেট পরিয়ে দিল। এরপর চুলগুলোতে দুইটা ফ্রেঞ্চ বেণী গেঁথে দিয়ে মেয়েকে আপাদমস্তক দেখে নিল মৌ। কেন জানি চড়ুইকে আজকে একটু অন্য রকম দেখাচ্ছে, খুব এলিগেন্ট। মেয়েকে দেখে ঠোঁট দুটো প্রসারিত হয়ে উঠল মৌয়ের। চড়ুই উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মাম্মা আমাকে সুন্দর লাগছে?”
মৌটুসী হেসে মেয়ের নাক টেনে দিয়ে বলল, “আমার কিউটি পাইকে একেবারে ওভার লোডেট কিউটের ডিব্বা দেখতে লাগছে।”
মায়ের মুখে প্রশংসা শুনে চড়ুইয়ের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। চঞ্চল পায়ে দৌড়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল সে।
মৌটুসী মেয়ের দিকে চেয়ে থেকে কিছু একটা ভেবে উঠে গিয়ে আলমারি খুলে একটা ছোট ক্যাপ বের করল। এটা অনেক আগে একবার চড়ুইয়ের জন্য কিনেছিল, তখন একটু বড় হতো। এখন নিশ্চয়ই ঠিক হবে! ক্যাপটা নিয়ে এসে চড়ুইয়ের ছোট্ট মাথায় বসিয়ে দিল সে। এবার যেন লুকটা একেবারে পারফেক্ট রূপ পেল।
পেছন থেকে লালবানু বেগম তাড়া দিলেন, “মৌ তুই তৈরি হবি কখন? ছয়টা বাইজা আইল।”
চড়ুই এবার মৌটুসীর বের করে রাখা জামাগুলো নিয়ে এসে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“মাম্মা তুমি রেডি হও তাড়াতাড়ি। নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
মৌটুসী মেয়ের হাত থেকে জামাগুলো নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।
প্রতিদিনের মতো আজও বাথ টাওয়াল পরে বিছানার ওপর বীরকে দাঁড় করিয়ে তাকে রেডি করিয়ে দিচ্ছে বোরাক। এই ভোরবেলাতেও শাওয়ার নিয়েছে সে। অমোঘ অভ্যাস, কোথাও যাওয়ার পূর্বে আর ফিরে এসে শাওয়ার তাকে নিতেই হবে। বীরের চোখে এখনো হালকা ঘুমঘুম ভাব, ঘুম পূর্ণ হয়নি, এত সকালে ওঠার অভ্যাস নেই তার। তবুও আজকে অন্যদিনের মতো সময় নিয়ে ডাকতে হয়নি। এবার ডেকে পিকনিকের কথা মনে করিয়ে দিতেই এক্সাইটমেন্টে চট করে উঠে পড়েছে। তারপর ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে এসে এখন বোরাক কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে ওকে। আর বীর মুখ চালিয়ে এটা-ওটা বলে চলছে, প্রশ্ন করছে বাবাকে। এই যেমন বীরকে প্যান্ট পরিবর্তন করিয়ে দিচ্ছে বোরাক। আর সে বাবার কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “পাপা সাফান চাচ্চুকেও পিকনিকে যাবে?”
”না পাপা।”
”কেন যাবে না? সাফান চাচ্চুকেও নিয়ে যাব!”
”চাচ্চুর পরীক্ষা বাবা।”
”ও, পলীক্ষা? ভাল্সিটিতে?”
”হ্যাঁ। ভার্সিটিতে।”
বীর এবার কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে বলল, “সাফান চাচ্চু গেলে অনেক মজা হতো। আমি, তুমি, সাফান চাচ্চু, চলুইই পাখি, আর চলুই পাখিল মাম্মা আন্টি!”
বোরাক মৃদু হেসে ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কতজন হচ্ছি, কাউন্ট করো তো পাপা?”
বীর তার ছোট্ট হাতের আঙুলগুলো গুনে গুনে পাঁচ আঙুল দেখিয়ে বলল, “ফাইভ, পাপা!”
বোরাক হেসে ছেলের কপালে চুমু একে বলল, “ব্রাভো, মাই সানশাইন!”
”ইয়ে! আমি পেলেছি!”
বীরকে হাইনেক মোটা সোয়েটারের ওপর ডেনিম জাম্পস্যুট পরিয়ে দিল বোরাক। সঙ্গে জাম্পস্যুটের সাথে ম্যাচিং করে মাথায় পরিয়ে দিল একটি বাকেট হ্যাট টুপি। পিকনিকের জন্য পুরোদস্তুর তৈরি বীর। টাইটান অভিমানে পায়ের কাছে এসে উল্টো ঘুরে লেজ নাড়াচ্ছে। বীরের পিকনিক সম্পর্কে সেও অবগত। গত দুই-তিন বছর যাবৎ এই বাড়ির কোনো ট্যুরই তাকে ছাড়া হয় না, এবারই বুঝি প্রথম হচ্ছে। বীরের স্কুলে বিড়াল এলাও করবে না। আর টাইটান সেই শর্তে নারাজ। তাকে ছেড়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বীর আর বোরাকের ওপর অভিমান করে আছে সে।
বীর এবার টাইটানের কাছে বসে ওর পিঠের কোমল পশমে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মুখের কাছে নিজের আদুরে মুখ নিয়ে বলল, “টাইটান লাগ কলো না, তোমাকে পলে নিয়ে যাব। আমলা আবাল পলে বেলাতে যাব। তখন তোমাকে চুলুই পাখিল সাথে দেখা কলিয়ে দেব, ঠিক আছে?”
”উমম-মেওওওও” বীরের একটুখানি আহ্লাদে সকল টাইটানের অভিমান মাটি হয়ে গেল যেন। জিহ্বা বের করে বীরের গালটা আদুরে ভঙ্গিতে চেটে দিল সে।
ছেলেকে রেডি করিয়ে দিয়ে বোরাক নিজেও ব্ল্যাক প্যান্টের সাথে সাদা টি-শার্ট ও তার ওপর কফি কালারের লেদার জ্যাকেট পরে নিল। ড্রয়ার খুলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘড়ির কালেকশন থেকে সিকো ফাইভ মডেলের একটা সিলভার চেইন ঘড়ি তুলে তা বাঁ কব্জিতে পরে নিল। তারপর তার সহজাত ব্ল্যাক কফি বেসড অ্যাক্রো অ্যাওয়েক (Akro Awake) পারফিউমটা বুকের দুইপাশে হালকা স্প্রে করে দিল। সবশেষে বোরাক ছোট একটা মেসেঞ্জার ব্যাগে পানির ফ্লাস্ক, বীরের দুধের ফিডার, বাড়তি এক সেট জামা, টিস্যুসহ প্রয়োজনীয় আরও কিছু জিনিস ভরে নিয়ে একেবারে নিচে চলে এল সে।
বাথরুম থেকে জামা বদলে এমব্রয়ডারি করা সাদা স্কার্ট আর শর্ট কুর্তি পরে বেরিয়ে এল মৌটুসী। চড়ুই বিছানার ওপর মৌটুসীর ময়েশ্চারাইজার, লোশন, ভেসলিন, চিরুনিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সামনে গুছিয়ে নিয়ে বসে আছে। সে জানে এখন তার মাম্মার কি কি প্রয়োজন। মেয়ের এমন দায়িত্বসুলভ কাণ্ড দেখে প্রশান্তির আভা ফুটে উঠল মৌটুসীর সারা মুখ জুড়ে। চড়ুইয়ের হাত থেকে একটা একটা করে জিনিস নিয়ে তৈরি হতে লাগল সে। মাঝারি সাইজের সিল্কি চুলগুলো আজ আর বাঁধল না, সাইড সিঁথি করে পিঠে ছেড়ে রাখল। কুর্তির ওপর হালকা জলপাই রংয়ের ক্রপ কাট কার্ডিগানটা পরে শিফনের সাদা ওড়নাটা গলায় প্যাঁচিয়ে নিল মৌ। এরপর ভ্যানিটি ব্যাগের জিনিসপত্রগুলো শেষবারের মতো একবার চেক করে নিল, সব ঠিকই আছে। ছামেদ আলীর ঘরে গিয়ে বাবার সাথে দেখা করে এবার চড়ুইয়ের হাত ধরে বেরিয়ে এল সে।
লালবানু বেগম রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। একেবারে ওদের রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে তারপর বাড়ি ফেরত গেলেন ভদ্রমহিলা।
ভোরবেলার বাতাস তখনো ভারী, চারপাশটা হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কিন্ডারগার্টেনের সামনের রাস্তাটা বেশ সরগরম; সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি বড় বাস। বাসের চারপাশে বাচ্চা আর অভিভাবকদের বেশ ভিড়, হইচই আর আনন্দের আওয়াজে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশটাও যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মৌটুসীদের রিকশাটা এসে রাস্তার ধারে দাঁড়াল। সেখান থেকে কয়েক হাত দূরেই গাড়ির পাশে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে বীর। বারবার উৎসুক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চড়ুইকে খুঁজছে সে। এবার দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাটার দিকে নজর পড়তেই চোখ চকচক করে উঠল তার। রিকশা থেকে চড়ুইকে কোলে করে নামাচ্ছে মৌটুসী। তা দেখে বীর বোরাকের হাত ঝাঁকিয়ে বলল, “পাপা! চুলুই পাখি চলে এসেছে! এসো!”
বোরাক দাঁড়িয়ে তাদের ড্রাইভারের সাথে কথা বলছিল। বীরের প্রবল টানাটানিতে দ্রুত কথা শেষ করে ছেলেকে অনুসরণ করেই রিকশাটার দিকে চলল সে। হাঁটতে হাঁটতেই অদূরে চোখ গেল তার। ধোঁয়াচ্ছন্ন কুয়াশার মাঝে দাঁড়িয়ে এক রমণী ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে ব্যস্ত। পিঠের ওপর থেকে আলগা খোলা চুলগুলো এসে তার মুখের ডান পাশটা ঢেকে দিয়েছে। তবুও যেন সেই রমণীকে চিনতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না বোরাকের। অবশ্য তাকে চেনায় একটি বড় ওয়ে হলো তার সহজাত জাতীয় পোশাক।
বীর আর চড়ুই হাত ধরে একে অপরের সাথে কুশলাদি বিনিময় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক রাতের মাঝেই তাদের অফুরন্ত গল্পকথা জমে গেছে যেন।
মৌটুসী রিকশা ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঠিকঠাক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তন্মধ্যেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বীরের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বোরাকের ওপর। দুই হাত জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে লোকটা। সেই তীক্ষ্ণ বাদামী চোখের দৃষ্টিতে সরাসরি দৃষ্টি পড়তেই মৌটুসী অপ্রস্তুত হয়ে নিজের চোখ সরিয়ে নিল। অথচ বোরাক সরাল না। সে এক প্রকার বেহায়ার মতো তাকিয়ে আছে। তবে আজ সে ওই নারীর মাঝে বিশেষ কোনো নারীত্ব নয়, বরং তার নিজেরই এক অভিন্ন সত্তাকে দেখছে। দেখছে, একজন অদম্য মাকে।
লটারির মাধ্যমে সিট নির্বাচন করা হয়েছে। মৌটুসীদের সিট পড়েছে সি ওয়ান-টু। আর বোরাকের ই থ্রি-ফোর। আপাতত মৌটুসী বীর আর চড়ুই দুইজনকে নিয়েই তাদের সিটে বসে আছে। চড়ুই আর বীর মৌটুসীর ফোনে ক্যান্ডি ক্রাশ গেম খেলছে। বাস ছাড়ার আগমুহূর্তে বোরাক বাসে উঠে বীরের কাছে এসে বলল, “পাপা, এসো। আমাদের সিটে যেতে হবে।”
বীর মাথা তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “পাপা আমি তো খেলা কলছি। খেলা শেষ হয়নি এখনো।”
”আচ্ছা তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে চলে এসো। আমি বসছি।”
বোরাক তাদের সিটে গিয়ে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। হুট করেই কোত্থেকে নীতি এসে দাঁড়াল বোরাকের সিটের কাছে।
”হাই বোরাক!”
বোরাক বুকে দুই হাত গুঁজে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েলী কণ্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে নীতির দিকে তাকাল। মৃদু হেসে বলল, “হ্যালো! কি খবর?”
নীতি মিষ্টি হেসে বলল, “এই তো চলছে আরকি।” তারপর বোরাকের পাশের সিটটা ইশারা করে বলল, “বসতে পারি?”
”ছেলে আছে এখানে, নীতি। আপাতত সামনে ওর বন্ধুর সাথে বসেছে।”
”অহ আচ্ছা। তোমাদের সাথে আর কেউ সাথে আসেনি?”
”না। তুমি কি বসার জন্য সিট পাওনি?”
”পেয়েছি, আমাদের টিচারদের সিট একেবারে সামনে। আচ্ছা থাকো। নেমে কথা হবে।”
”হুম।”
গেম ওভার হতেই চড়ুই বলল, “বীর বন্ধু তুমি এখানেই বসে থাকো। আর আমি তোমার সিটে যাই।”
তারপর মৌটুসীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চট করে সিট থেকে নেমে পিছনের দিকে হাঁটা দিল সে। মৌটুসী কেবল ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের কাণ্ড দেখল। চড়ুই চলন্ত বাসে সিটের হাতল ধরে টালমাটাল পায়ে দুই ধাপ এগিয়ে যেতেই বোরাকের চোখ পড়ল তার ওপর। বোরাক দ্রুত উঠে গিয়ে চড়ুইয়ের হাত ধরল। “স্পেরো! কোথায় যাচ্ছ?”
”আঙ্কেল আমি তোমার সাথে বসব!”
”আচ্ছা মামনি। এসো।”
বোরাক বীরকে একবার দেখে চড়ুইকে নিয়ে নিজের সিটে চলে এল। সে জানালার পাশের সিটটাতে চড়ুইকে বসিয়ে দিল। চড়ুই আরাম করে বসল সিটে। দুই হাত কোলের ওপর ফেলে রেখে বোরাকের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, “বীর বন্ধুকে মাম্মার কাছে রেখে এসেছি।”
বোরাকও পাল্টা হেসে বলল,
“আচ্ছা। তোমার বীর বন্ধু ওখানেই থাক। আর তুমি আমি এখানে গল্প করি!”
চড়ুই চলে গেলে বীর মনমরা হয়ে বলল, “চুলুই পাখি তো চলে গেল!”
মৌটুসী এবার বীরের পিঠ দিয়ে হাত পার করিয়ে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। আদর করে বলল, “চড়ুই পাখি পঁচা বাবা, এইজন্য বীর বন্ধুকে একা রেখে চলে গেছে।”
বীর এবার দুই দিকে আলতো মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আন্টি, চুলুই পাখি পঁচা না তো!”
বীরের এই সরলতা দেখে মৌটুসী না হেসে পারল না। বলল, “আচ্ছা, চড়ুই পাখি পঁচা না, ভালো সে। এখন চলো আমরা আবার মজা করে গেম খেলি। চড়ুই পাখি ফাঁকা পড়ুক।”
মৌটুসী ফোনে আবার ক্যান্ডি ক্রাশ ওপেন করল। তারপর দুজন মিলে খেলতে লাগল। মৌটুসী ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে, আর বীর খুব মনোযোগ দিয়ে খেলছে।
মৌটুসী এক হাতে বীরকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে অন্য হাতে ফোন ধরে আছে। বীরের এতটা কাছে থাকায় ওর শরীর থেকে ভেসে আসা সেদিনের সেই পরিচিত কফি আর ভ্যানিলার সংমিশ্রণের মতো অদ্ভুত নেশালো ঘ্রাণটা তার নাক বেশ ভালোই অনুভব করতে পারছে। মৌটুসী মনে মনে ভাবল, এটা নিশ্চিতভাবেই মারাত্মক একটা পারফিউম! এর ঘোর লাগা ঘ্রাণ যে কাউকেই বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। একজন পুরুষের এই ধরনের পারফিউম ইউজ করে পাবলিক প্লেসে আসার কোনো মানে হয়?
”আঙ্কেল তোমার বাড়িতে কে কে থাকে?”
চড়ুইয়ের প্রশ্নের বোরাক মৃদু হেসে উত্তর করল,
“আমার বাড়িতে? আমার বাড়িতে থাকে তোমার বীর বন্ধু, বীর বন্ধুর দুটো ফুপুমনি, ভুবন ভাই, সাফওয়ান চাচ্চু আর দাদুন।”
”অহ! অনেক মানুষ। আর আমাদের বাড়িতে আমার মাম্মা, নানিমনি, নানুভাই, মামা, মামিমা আর পঁচা মাসুম।”
বোরাক ভ্রূ কুঁচকে বলল, “পঁচা মাসুম?”
”হুম! সে পঁচা পঁচা করে সবসময়। স্কুলে যায় না। শুধু সারাদিন খায়। এইইই মোটা!”
চড়ুই দুই হাত দিয়ে মাসুমের স্থূলতার ভঙ্গিমা করে দেখাল।
চড়ুইয়ের কাণ্ড দেখে বোরাক এবার একটু শব্দ করেই হাসল। তার হাসি দেখে চড়ুইও খিলখিল করে হেসে উঠল। বোরাক এবার বুঝল, চড়ুইরা তার নানি বাড়িতে থাকে। তারপর হঠাৎ ওর মনে হলো রমণীর নামটা তার জানা নেই, কেন যেন নামটা জানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল সে। চড়ুইকেই জিজ্ঞেস করবে ভাবল। কিন্তু এর আগেই চোখ গেল চড়ুইয়ের গলায় ঝুলিয়ে থাকা আইডি কার্ডটার দিকে। বোরাক আরেকটু ভালো করে লক্ষ্যপাত করল সেখানে।
স্টুডেন্ট নেম: চড়ুই।
তার নিচেই লেখা, মাদার’স নেম: মৌটুসী।
লেখাটা পড়েই বোরাক ভ্রূ কুঁচকে মনেমনে একবার আওড়াল, “সানবার্ড?”
এরপরই সে মাথা ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকাল। মৌটুসীর সিটটা তার থেকে কোনাকুনি হয়ে এক সিট সামনে। সেখান থেকে রমণীর বাঁ হাতের বাহু আর তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা একগুচ্ছ কালো চুলের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সিটের হাতলের ওপর কনুই তুলে নির্ভার ভঙ্গিতে বসে আছে সে। মসৃণ চুলগুলো কানের পেছনে আলতো করে গুঁজে রাখা। বাসের জানালা দিয়ে আসা একফালি মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে তার কানের লতিতে। সেখানে দুলতে থাকা ছোট্ট সোনালী দুলটা সেই রোদের স্পর্শে হঠাৎই ঝিলমিল করে উঠল।
মৌটুসী পর্ব ১৫
তখনই মৌটুসী অন্যমনস্কভাবে তার মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য ডানদিকে ঘুরিয়ে নিল। এক লহমায় সেই মায়াবী অবয়বের ডান পাশটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল বোরাকের চোখে। আর এই এক ঝলক দর্শনেই বোরাক যেন সম্পূর্ণ নিশ্চিত। অজান্তেই তার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে মৃদু স্বরে বেরিয়ে এল— “হোয়াট আ পারফেক্ট সিমিলারিটি, ম্যান! জাস্ট লাইক আ ভেরি আইডিয়ালি স্যুটেড নেম— সানবার্ড।”
