মৌটুসী পর্ব ২২
ঋতস্বিনী মাহবিশ
দুপুরের পরপরই সব গুছগাছ করে রেডি হতে শুরু করল আশা। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের নাইওর শেষে স্বামীর ঘরে ফিরে যাচ্ছে। চার দিন আগে সাফওয়ান একটা নতুন পরিচিকা ঠিক করে নিয়ে এসেছিল। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা মেয়ে, রাবেয়া। এই কয়দিনে আশা যতটুকু বুঝল, মেয়েটা ভালোই চটপটে। বীরের সাথেও স্নেহপূর্ণ আচরণ করছে। যদিও নিশ্চিত নয় তার এই রূপের আড়ালে অন্য কোনো রূপ লুকায়িত আছে কিনা। তবে আশা করা যায়, আগের মতো কিছু হবে না। মেয়েটা বন্ধ্যা। বাচ্চা না হওয়ার জন্য স্বামী তালাক দিয়েছে। এখন পেটের দায়ে মানুষের বাড়ি কাজ করতে হচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতার মেয়েরা সাধারণত যেকোনো বাচ্চাকেই খুব স্নেহ করে থাকে। হয়তো বীরকেও করবে।
আশা রাবেয়াকে সব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল। মেয়েটা অবশ্য রাতে এখানে থাকতে পারবে না। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে নিজের বাড়িতে চলে যাবে।
ব্যাগ-ব্যাডিং গাড়িতে তোলা হচ্ছে। বোরাকের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে বীর। আশা ভাইপোর মুখের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। বাচ্চাটাকে কথা দিয়েছিল সে, এবার আর ঢাকাতে ফিরবে না, এখানেই রয়ে যাবে। কিন্তু ফিরে যাচ্ছে ঠিকই। এ ছাড়া তো উপায় নেই। কিন্তু সে সেটা এই নিষ্পাপ অবুঝ বাচ্চাটাকে বোঝাবে কী করে? গাড়িতে ওঠার আগমুহূর্তে বীরের সামনে বসে ওর মুখটা নিজের আজলায় তুলে নিল আশা। “আমার সোনা বাবা! মন খারাপ করেছ ফুপুমনির ওপর?”
বীর ডানে-বামে মাথা নাড়াল। কিন্তু ওর চেহারা বলছে ঠিকই বিপরীত ইঙ্গিত করছে। আশার ডান চোখ দিয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল। বীর হাত দিয়ে তা মুছে দিয়ে বলল, “ফুপুমনি কান্না কলো না। বীল লাভস ইউ।”
আশা ওর নরম হাতটা ধরে তালুতে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল, “আমিও বাবা। খুব ভালোবাসি তোমাকে।”
বীর প্রশ্ন করল, “আবাল কখন আসবে ফুপুমনি?”
”আসিব সোনা, খুব শীঘ্রই আসব। তুমি লক্ষ্মী বাচ্চা হয়ে থেকো। রাবেয়া খালামনি আছে, তোমাকে অনেক আদর করবে। খালামনির কথা শুনবে, বেশি বেশি করে খাবার খাবে, কেমন?”
বীর একদিকে মাথা কাত করে সায় দিল, “আচ্ছা।”
আশা উঠে দাঁড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ভাইয়ের বুকে মাথা এলিয়ে দিল। বোরাকও দুই হাত তুলে বোনকে স্নেহের আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিল।
“ভাইয়া, বিষয়টা একটু ভেবে দেখো ভাইয়া। বীরের এই একাকিত্ব দূর করো। নিজেকেও এই চাপা কষ্ট থেকে বের করে আনো প্লিজ।”
বোরাক বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আশ্বস্ত করল বোনকে, “আমি ভাবছি আশা। চিন্তা করিস না। সব ভালো হবে ইনশাআল্লাহ।”
”ইনশাআল্লাহ।”
এবার আশা আরোয়ার কোল থেকে ভুবনকে নিজের কোলে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে কাটকাট গলায় নির্দেশ দিল, “আরওয়া, আমি যেন না শুনি সন্ধ্যার পর তুই বাইরে গিয়েছিস বা আছিস। পাঁচটার মধ্যে বাসায় চলে আসবি, বোঝা গেল?”
”হুম।” আরোয়া জড়িয়ে নিল বড় বোনকে। আশা বোনের কপালে চুমু এঁকে আদুরে গলায় বলল, “নিজের খেয়াল রাখবি। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করবি।”
”তুমি-ও। আর বুড়োকে চোখেচোখে রাখবে, দুষ্টুমি করতে শিখে গেছে সে।”
হাসান এগিয়ে এসে বলল, “শুধু বোনকে বিদায় জানালেই হবে? অসহায় জামাইটার দিকেও একটু তো তাকাও!”
”দুলাভাই!” আরোয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল হাসানের আদুরে বুকে।
হাসানও ওকে আগলে নিয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরু বউ, শীঘ্রই বড় একটা ধমাকার জন্য প্রস্তুত হও।”
আরোয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার দুলাভাইয়ের ধমাকা মানেই ধামাকা। আবেগ সামলাতে না পেরে উচ্চস্বরে বলে উঠল সে, “ধামাকা! কী ধামাকা?”
হাসান দ্রুত সাবধান করে দিয়ে বলল, “আরে আস্তে, আস্তে বউ, তোমার আপু শুনলে সমস্যা। সুইজারল্যান্ড তোমার পায়ের ধুলি নেওয়ার অপেক্ষায়। লিক যেন না হয়!”
আরোয়াও এবার ফিসফিসিয়েই বলল, “ওয়েট, আপুর বার্থডে সারপ্রাইজ?”
”হুম।”
”ওয়াও! সো সুইট, লাভ ইউ ভাইয়া।”
”মাম্মা, পাপাকে না খুব মিস করছি।” বিছানায় বসা মৌটুসীর পেছন থেকে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কণ্ঠে কথাটি বলল চড়ুই।
মৌটুসী চোখ বাঁকিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করল, “তো?”
চড়ুই এবার বালিশের ওপর থেকে ফোনটা তুলে মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “পাপাকে একটু ফোন করো!”
মৌটুসী গলার স্বর শক্ত করে বলল, “পাপার সাথে একটু আগেই কথা বলেছ তুমি, চড়ুই পাখি!”
”হুম, এখন আরেকবার দাও। আরেকটু কথা বলি!”
”এখন কটা বাজে দেখেছ? দশটা। এত রাতে আমি তোমার পাপাকে কল দেব? মাথা খারাপ?”
”কিছু হবে না, পাপা ঘুমায়নি এখনো। দাও একটু!” চোখ পিটপিট করে আবদার জুড়ে বসল চড়ুই।
মৌটুসী কিছুক্ষণ মেয়ের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে এবার ওর ছোট্ট হাতের কব্জি আলতো করে চেপে ধরে বলল, “আচ্ছা চলো তোমাকে একেবারে তোমার পাপার কাছে রেখে আসি। এত যখন মিস করছ তখন পাপার কাছেই থাকো তুমি। আর বীরকে আমার কাছে নিয়ে আসব।”
চড়ুই চট করে বাধা সাধল, “না! আমি যাব না। তুমি বীর বন্ধুকে নিয়ে এসো তাহলেই হবে।”
মৌটুসী চোখ ছোট ছোট করে বলল, “কেন? তুমি যাবে না কেন? পাপার জন্য তো দম যাচ্ছে তোমার।”
ছোট্ট চড়ুই এবার ঠোঁট উল্টে অভিমান ও আদরের মিশেলে বলল, “উমম! তোমাকে ছাড়া ঘুম আসে না তো!”
ব্যস! এই এক লাইন কথাতেই প্রখর রোদের উত্তাপে বরফ গলার মতো গলে গেল মৌটুসী। প্রচণ্ড ভালোলাগার আবেগে আপ্লুত হয়ে মেয়েকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল সে। মেয়ের সারা মুখে ছোট ছোট চুমু এঁকে আদুরে স্বরে বলল, “আমারও আসে না, মাম্মা!”
মায়ের নরম হওয়ার এই সুযোগটাই চড়ুই আবার লুফে নিল। টুপ করে তার আবদার পেশ করল, “এখন পাপার সাথে একটু কথা বলিয়ে দাও? কথা বলেই ঘুমাব, প্রমিজ!”
মেয়ের এই জেদ সাংঘাতিক। একে কোনোভাবেই দমানো যাবে না। অগত্যা কপাল কুঁচকে মৌটুসী ফোনটা হাতে নিল। ‘মি. জেন্টলম্যান’ নামে সেভ করা নাম্বারে ডায়াল করল সে—নামটা ঘণ্টাখানেক আগেই সেভ করা হয়েছে। রিং হতেই ফোনটা চড়ুইয়ের কানে ধরিয়ে দিল মৌ। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই চড়ুই বিরক্ত হয়ে কান থেকে ফোন নামিয়ে বলল, “মাম্মা দেখো, একটা মেয়ে ইংলিশ কথা বলছে!”
মৌটুসী এবার ফোনটা নিজের কানে ধরল। ওপাশে ওয়েটিং টিউন। ফোন নামিয়ে বলল, “তোমার পাপা অন্য কোথাও কথা বলছে, এখন কথা হবে না।”
”ওওও…” মলিন মুখে শব্দটা উচ্চারণ করল চড়ুই। তারপর বিছানা থেকে নেমে ছোট ছোট চঞ্চল পায়ে নানা-নানির ঘরের দিকে দৌড় দিল সে। মৌটুসী আবার বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই চড়ুই ফিরে এল, “পাপার কথা বলা শেষ হয়নি এখনো মাম্মা? আরেকবার ফোন করো না!”
মেয়ের কাণ্ড দেখে কপাল চাপড়াল মৌটুসী। এ কেমন জাদু করে রেখেছে লোকটা তার মেয়েকে! ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে সেই একই নাম। মৌটুসী ফোনটা রিসিভ করে মেয়ের কানে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে নাও, যত ইচ্ছে কথা বলো। আমাকে আর বিরক্ত করবে না।”
ওপাশ থেকে ভেসে এল চড়ুইয়ের প্রিয় একটা কণ্ঠস্বর, “বলুন মিস!”
”পাপা, আমি চড়ুই পাখি।”
”ও, আমার মা?”
”হুম।”
”তো আমার মা কী করে?”
”আমি তো মাম্মার কাছে বসে আছি। আমার বীর বন্ধু কী করছে?”
”এই যে তোমার বীর বন্ধু! কথা বলো।” বোরাক ফোনটা বীরের কানে ধরল। “বাবা চড়ুই পাখি, কথা বলো।”
বীর মুখ থেকে ফিডার নামিয়ে আলতো করে ডেকে উঠল, “চুলুই পাখি?”
”বীর বন্ধু, তুমি কী করছ?”
”আমি পাপাল সাথে বসে আছি আল মিল্কি খাচ্ছি, ঘুমাব তো তাই। তুমি কি কলছ?”
”আমি মাম্মার সাথে বসে বসে তোমার সাথে কথা বলছি। তুমি মিসের হোমওয়ার্ক শেষ করেছ?”
”কলেছি। তুমি শেষ কলেছ?”
”আমি হোমওয়ার্ক অনেক দিন আগে করেছি। আজকে আমি নতুন পড়ালেখা করছি। আচ্ছা এখন পাপাকে দাও।”
বীর এবার বোরাকের দিকে তাকিয়ে বলল, “পাপা, চুলুই পাখি তোমাল সাথে কথা বলবে।”
বোরাক ফোন নিজের কাছে উঠিয়ে নিল। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল “চড়ুই সোনা, রাতে কী খেয়েছে?”
”পাপা, আমি ডাল-ভাত খেয়েছি।”
মৌটুসীর দৃষ্টি খোলা বইয়ের পাতায় আবদ্ধ থাকলেও কান খাড়া হয়ে আছে এদিকেই। মেয়ের মুখে কেবল ডাল-ভাতের কথা শুনে কপাল কুঁচকাল সে। শুধু ডাল-ভাত খাইয়েছে সে তাকে? জেন্টলম্যানের সামনে তাকে ছোট করা হচ্ছে! এবার কপট রাগ দেখিয়ে সে মেয়ের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে শুধু ডাল-ভাত খাইয়েছি চড়ুই পাখি? ডিমের অমলেট করে দিইনি? ওটার কথা কে বলবে, হ্যাঁ?”
মৌটুসীর দেখাদেখি ফোন কানে রেখেই চড়ুইও ফিসফিস করে বলল, “মাম্মা কী বলছ? শুনতে পাচ্ছি না। আরেকটু জোরে বলো।”
এই পর্যায়ে মৌটুসী হতাশায় নিজের কপাল চাপড়াল।
ওপাশে বোরাক মা-মেয়ের ফুসুরফুসুর শুনে নিঃশব্দে হাসছে। এবারে বলল, “আচ্ছা, স্পেরোর মাম্মা কী করছে?”
”মাম্মা তো বসে বসে পড়ালেখা করছে।”
”বাহ্! জ্ঞান আহরণ? ভালোই!” কথাটা বোরাক মনে মনে বললেও, মুখে বলল, “স্পেরো! তোমার জ্ঞানী মাম্মাকে বলো, তুমি অনেক পড়াশোনা করেছ, আর লাগবে না, এত বেশি পড়লে মাথা পাগলা হয়ে যাবে। এখন আমাকে বেশি বেশি পড়াও।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বীর তাড়াতাড়ি করে ঘাড় ঘুরিয়ে বোরাকের দিকে তাকাল, অধৈর্য গলায় বলে উঠল, “পাপা, পাপা, আমি একটু মাম্মাল সাথে কথা বলব!”
”হ্যাঁ বাবা, নাও।”
বোরাক ফের ফোন নামিয়ে বীরের কানে ধরল। বীর ডেকে উঠল, “মাম্মা!”
ওপাশে মৌটুসীও ততক্ষণে নিজের কানে ফোন নিয়েছে, “হ্যাঁ আমার বীর সোনা!”
”মাম্মা, জানো, আমাল আশা ফুপুমনি আজকে ঢাকা চলে গেছে!” খানিক মলিন মুখে বলল বীর।
”ওওও! তাই বীরের মন খারাপ বুঝি?”
”হুম, বীলেল খুব মন খালাপ।”
”মন খারাপ করে না সোনাবাচ্চা। আচ্ছা তুমি কী খাবে বলো তো, মাম্মা কালকে বানিয়ে নিয়ে যাবে!”
বীর বাবার মুখের দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভাবল। ভেবে ভেবে এবার চট করে বলল, “মাম্মা, আমি খিচুলি খাব! ওই যে ওইদিনের মতো।”
”সানসাইন, ডু ইউ ওয়ান্ট হার এজ ইউর রিয়াল মাম্মা, হু?” ঘুমন্ত বীরের তরফ থেকে কোনো উত্তর আসে না। বোরাক আবারও বলে উঠল, “আমার যদি ভুল না হয়, তুমি চাও। তবে এখন আমার কী করা উচিত কলিজা? কনফার্ম দিস ডিসিশন? কনফেস টু হার? বাট, ইফ শি রিজেক্ট আস!”
বোরাক চোখ বুঁজে, স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে দুইটা নিষ্পাপ ছোট্ট মুখ, একটা মোহনীয় রূপ। বোরাক তড়িৎ চোখ মেলে দেয়।
মোহনীয় রূপ? কিন্তু সে তো নারীদের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে ঘৃণা করে!
একসময় যুবক বিছানা ছাড়ে। হেঁটে হেঁটে পৌঁছায় বারান্দায়। কাঁচের রেলিং ধরে তাকিয়ে থাকে শূন্যে।
আজ এই নিস্তব্ধ প্রহরে চরমভাবে দ্বিধান্বিত বোরাক শিকদার। তার অবচেতন মন আর মস্তিষ্কের আলাদা দুটো সত্তা নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত। তার পিতৃসত্তা ও পুরুষসত্তা এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষপাতী হলেও, অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে—ভবিষ্যৎ না ভেবে কেবল বাহ্যিক কিছু খুশি আর সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে একই ভুল দ্বিতীয়বার করবার সাহস দেখাচ্ছিস বোরাক? কী জানিস, কতটুকু জানিস তাকে নিয়ে? পরিচয়ই বা কতদিনের? হিতে যদি সব বিপরীত হয়? ভুলে যাস না, একবার ভুলের জন্য ক্ষমা, দ্বিতীয়বার ভুল হলো চরম। তবে…..
”তবে?” একটুকরো আশার আলো খুঁজে পেল যেন সে।
সাথে সাথেই অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক জানান দিল, তবে রমনীকে তালিকার প্রথমেই রাখা যায় নির্দ্বিধায়। বাকিটা নিশ্চয়ই তোকে বিস্তারিত খুলে বলতে হবে না!
রহস্যময় এক তির্যক হাসি ফুটে উঠল বোরাকের ঠোঁটে। মৃদু স্বরে বিড়বিড় করল সে “না, হবে না।”
শিকদার ম্যানশনের ব্রেকফাস্ট টেবিলে খাবার সার্ভ করতে করতে এক পরিচিকা বলল, “ভাইজান, ডিপ ফ্রিজ লোড নিতাছে না। মাছ-মাংসগুলা তো নষ্ট হইয়া যাইব।”
বোরাক ডাইনিং চেয়ারে বসে বীরের ফ্রুটস স্লাইস করছিল, উত্তরে বলল, “আচ্ছা, আমি মেকানিককে ফোন করে আসতে বলছি। আপনারা ফ্রিজটা খালি করুন।”
”আইচ্ছা।”
”আরোয়া খেয়ে বেরিয়েছে?”
”হ ভাইজান। খাইছে।”
”ঠিক আছে।”
পরিচিকাটি খাবার সাজিয়ে দিয়ে ফের রান্নাঘরে চলে এল। রাবেয়া সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে নোংরা থালাবাসন পরিষ্কার করছিল। সহকর্মীকে দেখে নিচু স্বরে বলল, “দুপুরে কী রানতাম, ভাইজানরে জিগাইলা না?”
”লাভ নাই। ভাইজান এসব বিষয়ে নাক গলায় না। আমগোরেই কইব যা ইচ্ছা রান্ধেন। খালি আশা আফামনি আইলে হের ইচ্ছা মতন রান্নাবাড়ি হয়। এ ছাড়া সব আমগো হাতে, বুইঝলে? সারাদিন কেউ দেখবার-কইবার নাই।”
রাবেয়া হাতের কাজ অব্যাহত রেখেই কিছুটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, “বাড়ির কর্তি না থাকলে এমনই হয়। এত বড় বাড়ি, সংসার কিন্তু দেইখা রাখবার কেউ নাই। আইচ্ছা ভাইজানের বউ কি মইরা গেছে?”
”না, পরকীয়া প্রেমিকের লগে পলায় গেছে। বীর আব্বাজানের বয়স তখন মাত্র চার মাস চলে।”
”হায় হায়! এত ছুডু ছাওয়াল রাইখা গেছে গা? তার ওপরে এমন তয়লা স্বামী-সংসার!”
”হ! সুখে খাইতে বেডিরে ভূতে কিলাইছে।”
ঠিক দুপুরের পরপর এই সময়টাতে শোরুমে তেমন কোনো কাস্টমারের আনাগোনা থাকে না। যেমন, আপাতত শোরুম পুরো ফাঁকা। ম্যানেজার খলিল মিয়া তার ডেস্কের আরামদায়ক চেয়ারে মাথা লাগিয়ে চোখ বুঁজেছেন।
রুমু আর মৌটুসী ভেতরের দিকে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে আছে। দুজনের হাতেই ফোন। রুমু টেনে টেনে রিলস ভিডিও দেখে সময় পার করছে। অন্যদিকে মৌটুসীর স্ক্রিনে সবসময়ের মতোই ইংরেজি কিছু প্রশ্ন ভাসছে। সেগুলোতেই মনোযোগ সহকারে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে সে। সম্প্রতি তার সাবজেক্টের নিবন্ধন ভাইভার ডেট দেওয়া হয়েছে।
ফোনে ফানি কিছু একটা দেখে রুমু হাসতে হাসতে মৌটুসীর দিকে তাকাল। কিন্তু মৌটুসীকে ফোনের স্ক্রিনে পুরোপুরি মগ্ন দেখে রুমু তার মাথাটা একটু এগিয়ে এনে স্ক্রিনের দিকে উঁকি দিল। মৌটুসীকে পড়তে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল সে, “এত পড়ে কী করবে মৌ? দিনশেষে তো টাকা ছাড়া এই দেশে চাকরি পাওয়া অসম্ভব। তাই পড়াশোনায় মাথা না খাটিয়ে ওই মাথাটা কার্যকর কোনো জায়গায় খাটাও।”
মৌটুসী এবার শান্তভাবে মাথা তুলে রুমুর দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “যেমন?”
রুমু একটা হাই তুলে বলল, “বিজনেস! ব্যবসায় মাথা খাটাও, দেখবে দুইদিনেই বড়লোক হয়ে গেছ।”
মৌটুসী মৃদু হাসল, বলল, “বিজনেস করতে গেলেও তো পুঁজি লাগবে, তাই না?”
রুমু দুই হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল, “তাও ঠিক। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যেহেতু আমাদের হাতে টাকা নেই, তাই বড়লোক হওয়ার স্বপ্নটাও আমাদের জন্য নয়।”
কথাটা বলতেই দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিল।
তখনই ম্যানেজার খলিল মিয়া সেখানে এসে রুক্ষ গলায় তাদেরকে ধমকে উঠলেন, “দেখো! কাজ ফেলে বসে হাসাহাসি করা হইতেছে এখানে! বলছি, কাস্টমার এসেছে, সেই খেয়াল আছে কোনো?”
রুমু আর মৌটুসী দুজনেই সাথে সাথে হাসি থামিয়ে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দুই পা এগিয়ে গেল রুমু, কিন্তু মৌটুসী খলিল মিয়ার পেছনেই এক পরিচিত মুখ দেখে সেখানেই স্থবির হয়ে রইল।
না, সে ভুল দেখছে না। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন বোরাক শিকদার। একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে সে। চোখেমুখে বিস্ময়, তবে তার চেয়েও বেশি অবিশ্বাস—যেন কোনো কল্পনার বাইরে থাকা কোনো দৃশ্য দেখছে সে।
কিছু সময় রমনীর চোখে চোখ স্থির রেখে, এবার দৃষ্টি নামিয়ে আনল তার পরনের টি-শার্টটির ওপর। সিঙ্গার কোম্পানির লোগো সংবলিত নীল-কমলা রঙের মিশেলে একটি টি-শার্ট। গলায় ঝুলানো শিফনের ওড়নাটার দুই প্রান্তের মাঝে তার পরিচিতি কার্ডটি নির্বিঘ্নে ঝুলে আছে। সেখানে বড় অক্ষরে লেখা—’সেলস পারসন অব সিঙ্গার গ্রুপ’। বোরাক লেখাটার দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, যেন বিষয়টির সঙ্গে নিজের জানাশোনা রমনীকে মেলাতে পারছে না সে।
ম্যানেজার খলিল সাহেবের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর মৌটুসীর ঘোর ভাঙাল। তিনি আবারো মেয়েটার ওপর খেঁকিয়ে উঠলেন, “তুমি আবার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলে কেন? স্যার ফ্রিজ দেখতে এসেছেন, উনাকে আমাদের লেটেস্ট কালেকশনগুলো দেখাও, যাও!”
মৌটুসী বোরাকের দিকে এক পা এগিয়ে গেল। খুব সাবধানে নিজের অস্বস্তিটুকু আড়াল করে মাথাটা সামান্য নুইয়ে বলল, “আমার সাথে আসুন প্লিজ!”
এরপর সে কোনোদিকে না তাকিয়েই ডিসপ্লে করে রাখা ফ্রিজ কাউন্টারের দিকে হেঁটে চলল। নির্বিকার বোরাকও এবার তার পিছু পিছু এগিয়ে গেল।
মৌটুসী পেশাদার ভঙ্গিতে একের পর এক মডেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিটি ফ্রিজের স্পেসিফিকেশন, কুলিং সিস্টেম আর ওয়ারেন্টি সুবিধাগুলো একজন সেলসওম্যানের মতোই গুছিয়ে বর্ণনা করছে। পেশাদারিত্বের আড়ালে ব্যক্তিগত আবেগ বা জড়তা কোথাও নেই। অথচ বোরাকের মনোযোগ ফ্রিজের দিকে নয়, বরং রমনীর দিকেই। সে একদৃষ্টিতে রমনীর এই নতুন রূপ দেখছে, অথচ মৌ একবারের জন্যও বোরাকের দিকে তাকাচ্ছে না। ভুল করেও না।
বোরাকের সাথে আসা তার ম্যানেজার রাকিব সাহেব দুইশ লিটারের একটা ফ্রিজ দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, আমার মনে হয় এটা ভালো হবে। গত কুরবানিতে আমি নিজেও একটা নিয়ে গিয়েছি। খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে, স্পেসটাও বড়। শুধু আমারটার কালারটা একটু আলাদা ছিল।”
মৌটুসী এবার মৃদু হেসে বলল, “এই কালারটা কোম্পানি সম্প্রতি নতুন লঞ্চ করেছে। এটা এশ কালারেরই অথেন্টিক একটা শেড। আপনারা নির্দ্বিধায় এটা চুজ করতে পারেন, শোরুমে বর্তমানে এটাই সবচেয়ে প্রিমিয়াম লুকের ফ্রিজ।”
মৌটুসী পর্ব ২১
বোরাক এবারে মুখ খুলল, “আচ্ছা, তাহলে এইটাই কনফার্ম।” তারপর তার ম্যানেজারের উদ্দেশ্যে বলল, “রাকিব সাহেব আপনি বিলটা পেমেন্ট করে ফ্রিজটা বাসায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমি আর এদিকে সময় দিতে পারছি না।”
রাকিব সাহেব আশ্বস্ত করলেন বোরাককে, “ওকে স্যার, চিন্তা করবেন না। আমি সব সামলে নেব।”
বোরাক প্রস্থান করার আগে আবারও মৌ-এর দিকে তাকাল। যে কিনা ফ্রিজের সাথে লেগে মেঝের দিকে নিস্পৃহ তাকিয়ে।
