Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ২৬ (২)

মৌটুসী পর্ব ২৬ (২)

মৌটুসী পর্ব ২৬ (২)
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​বনলতার ফাঁক চুইয়ে একফালি সূর্যের আলো এসে পড়ছে নীলমণি লতার কুঞ্জতলে। সেখানেই এক আকাশ সমান মায়াবী সৌন্দর্য নীরবে আশ্রয় নিয়েছে রমণীর অবয়বে। মাথাভর্তি প্রস্ফুটিত নীলমণি লতার অজস্র ফুল তার ঊর্ধ্ববদন জুড়ে চুমু খেয়ে লেপ্টে রেখেছে। আঁখি, ললাট পুষ্প চাদরে আবৃত থাকলেও নাকের কোমল রেখা আর পাপড়ি-ছোঁয়া অধরের নিঃশব্দ সৌন্দর্য বলে দিচ্ছে—প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকেছে তাকে।
​রমণীর দীর্ঘ বেণী বেয়ে নেমে এসেছে নীলমণি লতার সরু ডাল। প্রকৃতির সবুজ সমাহার তার মেঘবরণ কেশরাশির সাথে মিলেমিশে একাকার। তার মাঝে ফুটে থাকা অসংখ্য বেগুনি রঙা ফুল বাতাসের মৃদু দোলায় কেঁপে কেঁপে উঠছে।
​মঞ্জুরির বোঁটা ছিঁড়ে ঝুরঝুর করে খসে পড়ছে পুষ্পরাজি। তবে তারা মহাকর্ষের টানে মাটিতে পড়ার আগেই বুনন ধরেছে রমণীর পরনের একটুকরো বস্ত্রে। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে রমণীর কাঁধে এসে আলতো করে বসেছে এক চঞ্চল নীল মৌটুসী। নীলাভ পালকের দীপ্তি ছড়িয়ে সে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার সখীর মুখপানে।

​সামনের কার্টেন ওয়ালের বাইরে তখন সূর্যোদয় শুরু হয়ে গেছে। পূর্ব আকাশে নবউন্মেষের তেজ নিয়ে ভেসে উঠছে নতুন দিনের রক্তিম সূর্য। তবে দেয়ালের এপাশটা ঘুটঘুটে ঘরটা অন্ধকার। কেবল ক্যানভাসের দুই পাশে দুইটা মোমবাতি জ্বলছে। সেই আলোতেই দক্ষ হাতে ধীরে ধীরে নিজের কল্পনাকে হুবহু ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছে যুবক। ভেতরের কোন এক গভীর উষ্ণতা ছেয়ে রেখেছে তার শরীরকে। তাই তো এই শীতের ভোরেও তার পরনে কেবল একখানা পাতলা কালো স্যান্ডো গেঞ্জি; বুকের বাঁ পাশে নাইকির লোগোটা এই অন্ধকারের মাঝেও নিজস্ব দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। মোমের আলোয় যুবকের উজ্জ্বল সুঠাম দেহের পেশিবহুল খাঁজগুলো জ্বলজ্বল করছে। এ যেন আরেক দুর্লভ সৌন্দর্য। চারদিকে শুধু সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি।
​পাশেই টেবিলটার ওপর খাড়া করে রাখা ফোনের স্ক্রিনে বেডরুমের সিসিটিভি ফুটেজ। বিছানায় বীরের ঘুমন্ত নিস্তেজ দেহটা ভেসে আছে তাতে। তুলির আঁচড় কাটার ফাঁকে ফাঁকে যুবক সচেতন দৃষ্টিতে ছেলেকেও পর্যবেক্ষণ করে নিচ্ছে।

​ততক্ষণে ধরনী আলোকিত। সকালের প্রথম আলো গ্লাস ঠিকরে ঘরের ভেতরে জায়গা করে দিয়েছে। এদিকে রঙের তুলিটি এখন বোরাকের বাঁ আঙুলের ভাঁজে। কপালের কাছে নেমে আসা কিছু চুলের মাঝে সবুজ রং লেপ্টে আছে। আর যুবক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্যানভাসের দিকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোনো অপূর্ণতা রয়ে গেছে কি না। না! চোখে পড়ল না। যদিও বা কোনো অপূর্ণতা রয়েও যায়, রমণীর সৌন্দর্যের কাছে তা লক্ষ্যগোচর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
​তৃপ্তির তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠল যুবকের বাদামী ঠোঁটের কোণে। মন ঠিক যেমন বর্ণনা দিয়েছিল, সংবেদনশীল দক্ষ হাত তা অক্ষরে অক্ষরে ফুটিয়ে তুলেছে সাদা ক্যানভাসে।
​তাকে এমন বিমোহিত হতে দেখে তার পুরান এক সত্তা উপহাস করে বলে উঠল,
“কী সংকল্প করেছিলিস না, দ্বিতীয়বার কোনো নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়বি না? হা হা হা.. নাদান তুই বোরাক, সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে সৌন্দর্যের অস্তিত্ব দিয়েছেন প্রেমে পড়বার জন্যেই!”
​বোরাক নিঃশব্দে মাথা নুইয়ে হার মেনে নিল। ঠোঁটের কোণের অতিমাত্রায় সূক্ষ্ম লাজুক হাসিটা তার সাক্ষী।
​তার লাজ দেখে পুরান সত্তাটিও ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে বলল,
“এখন তুই বারবার, বহুবার সেই সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে নিজেকে কোরবানি করতে বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা করবি না, আরহাম বোরাক শিকদার। বলে দিলাম তোকে, প্রয়োজনে কথাটা লিখে রাখ।”

​দুপুরের খাবার সেরে বাটিগুলো গুছিয়ে রেখে গোডাউন থেকে বের হয়ে এল মৌ আর রুমু। আজ এক কাস্টমারকে সময় দিতে গিয়ে খাওয়া শেষ করতে করতেই প্রায় তিনটা বেজে গেছে। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে সবেমাত্র চেয়ারে বসেছে মৌটুসী, অমনি তার হাতে থাকা ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। অগত্যা পানি খাওয়ার ইচ্ছা স্থগিত রেখে সে স্ক্রিনটা চোখের সামনে ধরল। আলিফের কল। রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ বল, কেমন আছিস?”
​ওপাশ থেকে আলিফ যেন মৌটুসীর কথা শুনতেই পেল না, বরং নিজেই বেশ বীতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “হ্যালো! মৌ, রেজাল্ট দেখছস?”
​মৌটুসী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিসের রেজাল্ট?”
​”কিসের মানে? আজকে নিবন্ধনের রেজাল্ট দিয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকের দেখাও শেষ, আর তুই এখনো জানসই না?”

​কথাটা শোনা মাত্রই মৌয়ের হৃৎস্পন্দন দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠল। পানির বোতল ধরা হাতটা মৃদু কাঁপতে শুরু করেছে। ওর এমন আচমকা ভাবান্তর দেখে রুমুও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
​মৌ শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, “তোরটা দেখেছিস?”
​”নাহ্, আমি ওয়েবসাইটেই ঢুকতে পারছি না। আচ্ছা থাক, পরে কথা হচ্ছে। বেশি টেনশন করিস না, হয়ে যাবে তোর, আমি নিশ্চিত”—বলেই আলিফ লাইন কেটে দিল।
​রুমু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে মৌ?”
​”নিবন্ধনের রেজাল্ট দিয়েছে, রুমু।” বলেই মৌ শোরুমের নিরিবিলি কোণটায় চলে গেল। উত্তেজনায় ওর হাত-পা কাঁপছে, স্থির হয়ে দাঁড়ানোই দায়। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার সময় যে অস্বস্তিকর অনুভূতি হতো, ঠিক তেমনই অনুভব করছে সে। ওয়েবসাইটে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না কিছুতেই। যদি না হয়? এতদিন যে আশা নিয়ে সে বেঁচে ছিল, তা-ও কি তবে ফুরিয়ে যাবে? যদিও মনে তার নব্বই ভাগই ইতিবাচক আত্মবিশ্বাস আছে নিজের ওপর। ভাইভা তো বেশ ভালোই দিয়েছে—তবুও আশঙ্কা যেন পিছু ছাড়ছে না।
​প্রায় পাঁচ মিনিট পার হওয়ার পর, ধরফড় বুকে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে শেষমেশ ওয়েবসাইটে ঢুকল মৌ। প্রথমবার ঢোকা গেল না, সার্ভারের চাপ থাকায় লোড নিতে পারছে না। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সফল হলো। পোর্টালে গিয়ে রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ইনপুট দিল।

​শোরুমে কাস্টমার এসেছে। ম্যানেজার খলিলের উচ্চস্বরের ডাক পড়তেই রুমু বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না। সারাদিন শেষে সবেমাত্র একটু বসেছিল। কিন্তু কাস্টমারের আগমনে সেই সুযোগটুকুও নেই। রাগে নিজের মনেই দাঁতে দাঁত চেপে, চেয়ার ছেড়ে প্রচণ্ড বিরক্ত মুখে কাস্টমারের দিকে এগিয়ে গেল সে।
​ঠিক তখনই মৌটুসী একপ্রকার দৌড়েই রুমুর পাশ কাটিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়াল। চোখে-মুখে কেমন একটা অস্থিরতা। পেছন থেকে রুমু চিৎকার করে ডাকল, “মৌ! কী হলো? রেজাল্ট পেলে?”
​কিন্তু মৌটুসী থামল না। ম্যানেজার খলিল মিয়া ক্যাশ কাউন্টারে বসে পুরো ব্যাপারটা দেখছিলেন। মৌকে এভাবে ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখে তিনি গর্জে উঠলেন, “এই মৌ! কাস্টমার এসেছে, দেখছ না? কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
​ম্যানেজারের কথা কানে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা মৌয়ের নেই। সে ম্যানেজারকে তোয়াক্কা না করে এক দৌড়ে শোরুম থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ম্যানেজার রাগে গজগজ করতে করতে রুমুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাস্টমার দেখলেই এক একজনের নাটক শুরু হয়ে যায়! এদের নিয়ে কি আর ব্যবসা চলে?”
​ম্যানেজারের কথার কোনো উত্তর দিল না রুমু। সে মৌয়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফের মন দিল কাস্টমারের দিকে।

​ব্যক্তিগত বিলাসবহুল ক্যাবিনের ডেস্কে বসে একের পর এক মোটা মোটা ফাইলে চোখ বুলিয়ে সেগুলোতে সাইন করছে বোরাক শিকদার। একটানা এক ঘণ্টা কাজ করার পর অবশেষে সব ফাইল গুছিয়ে সে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে বসল। দুই হাত ওপরে তুলে শরীরটা টানটান করে আড়মোড়া ভাঙল সে। হাত বাড়িয়ে ডেস্ক বেলে চাপ দেওয়ার এক মিনিটের মাথায় অল্প বয়সী একটা ছেলে প্রায় দৌড়ে এল। কুর্নিশ করে বলল, “স্যার!”
বোরাক ফাইলগুলো ইশারা করে বলল, “এগুলো হাকিম সাহেবের ডেস্কে দিয়ে এসো।”
ছেলেটি ফাইলগুলো তুলে নিয়ে চলে যেতে ধরলে বোরাক বলল, “রিয়াদ, ফাইলগুলো পৌছে দিয়ে আমার জন্য একমগ কড়া কফি এনো তো।”
ছেলেটি অল্প দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সম্মতি দিল,
“ঠিক আছে স্যার।”
ছেলেটি চলে গেলে বোরাক এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে ​ক্যাবিনের সাথে লাগোয়া বারান্দাটিতে এসে দাঁড়াল। সাততলার এই উচ্চতা থেকে শহরের অনেকটা অংশই চোখে পড়ে। পকেটে দুই হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে রইল সে, এবার হঠাৎ নিচের ফুটপাতের দিকে চোখ পড়তেই তার ভ্রূযুগল কিঞ্চিত কেঁপে উঠল। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল বোরাক। খুব ভালো করে লক্ষ্য করল—না, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ!

​সে দ্রুত পকেট থেকে ফোনটা বের করে কল লিস্ট থেকে মৌটুসীর নাম্বারে ডায়াল করল। রিং হচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। লাইন কেটে যাওয়ার পর আবারও কল করল, এবারও রিসিভ হলো না। বোরাক এবার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দ্রুত ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এল। লিফটে চড়ে সোজা গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এল সে। ভবন থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপাশে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হলো।
​রাস্তার ধারের পাবলিক বেঞ্চে মৌটুসী বসে আছে। দু-কনুই ভাঁজ করে উরুর ওপর ঠেকিয়ে, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কুঁকড়ে বসে আছে রমণী। বোরাক সোজা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে ডাকল, “মিস মৌ?”
​মৌটুসী সেই অবস্থাতেই চোখ মেলল। এই কণ্ঠ তার খুব চেনা, সেই সাথে পরিচিত একটা সুগন্ধ এসে ধাক্কা দিল তার নাকে। মনের দ্বিধা নিয়েই মৌ মুখ থেকে হাত সরিয়ে আস্তে আস্তে মাথা উঁচু করল।
​ওর বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে বোরাক হতবাক হয়ে গেল। ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো ফুলে একাকার, চোখের কোণে অশ্রুর ধারা স্পষ্ট। মুহূর্তেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল বোরাকের চিত্ত। ডান হাতটা অবশভাবেই উঠে এল মৌয়ের মাথায়। কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করল, ” মৌ, কী হয়েছে আপনার? এখানে রাস্তায় এভাবে… ঠিক আছেন আপনি?”

​বোরাকের এই একটুখানি আহ্লাদ পেতেই মৌটুসী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। আবারও সে ডুকরে কেঁদে উঠল। বোরাক অস্থির হয়ে ওর পাশে বসে পড়ল। হাতটা মৌয়ের মাথার ওপর থেকে সরলো না, বরং আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল। আস্থার সুরে বলল, “মিস, সমস্যাটা বড় মনে হলে আমাকে বলতে পারেন। এতে মনের ভার কিছুটা হলেও কম মনে হবে। বন্ধু ভেবেই বলুন।”
​মৌটুসী কথা বলতে চাইল। কিন্তু পারল না। গলা দিয়ে শব্দ নামছে না তার।
​বোরাকও জোর করল না। বুঝল পরিস্থিতি জটিল! তাই সময় দিল ওকে। পকেট থেকে টিস্যু বের করে এগিয়ে দিল। মৌ টিস্যু নিয়ে চোখ-নাক মুছে নিল।
​কান্না যেন থামবার নামই নেই। যার ফলে একটু পর পুনরায় নাকে পানি চলে এল মৌটুসীর। বারবার নাক টানাই তার প্রমাণ। বোরাকের পকেটে আর কোনো টিস্যু নেই। অগত্যা সে উঠে গিয়ে পাশের একটা দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট পকেট টিস্যু নিয়ে এল।
​মৌটুসী টিস্যু নিয়ে একেবারে বাচ্চাদের মতো ফোঁস করে নাক ঝেড়ে টিস্যুটা ফেলে দিল, তারপর বোরাকের হাত থেকে আবার একটা নিল; নাকের পানি যেন শেষই হচ্ছে না ওর। দৃশ্যটা এতো আদুরে ছিল যে এমন একটা পরিস্থিতিতেও বোরাকের ঠোঁট দুটো হালকা হাসিতে প্রসারিত হয়ে গেল।
​মৌটুসী এবারে নাক-চোখ ভালো করে মুছে তাকাল বোরাকের দিকে।

ইশ! চেহারার কী অবস্থা করেছে! তাদের সম্পর্কটা যদি অন্যরকম হতো, এই মুহূর্তে সে নির্দ্বিধায় মেয়েটাকে একেবারে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিত। ওই লালটুকটুকে আদুরে মুখজুড়ে অজস্র চুমু এঁকে দিয়ে বলত, “এভাবে কাঁদবেন না, মৌটুসী পাখি। আপনার নাজুক চেহারায় শুধু লাজের আভা মানায়, বিষাদের নয়। আমি থাকতে বিরহের গান গাইবেন কেন আপনি? চলুন যত কষ্ট আছে সব এক করে দিই। এরপর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আধো আধো বহন করি।”
​বোরাকের ভাবনার ছেদ ঘটে মৌটুসীর কথায়। ভাঙা গলায় বলল সে,
“মনে আছে, আপনাকে একদিন বলেছিলাম এবারের কলেজ শিক্ষক নিবন্ধনের ক্যান্ডিডেট আমি?”
​”হুম, কেন থাকবে না।”
​মৌটুসী নাক টেনে বলল, “আজকে ভাইভার রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমার স্বপ্ন…. আমার স্বপ্ন শেষ। আমার পরিশ্রম বৃথা।”
আবারও কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরঝরিয়ে ঝরিয়ে পড়ল ওর চোখ দিয়ে।
​বোরাক যেন এবার বুঝল পুরো ব্যাপারটা। সাথে মন বুঝি একটু স্বস্তিও পেল ওর! বলল, “এটা আপনার কত নাম্বার নিবন্ধন ছিল?”

​”ফার্স্ট।”
বোরাক আস্বস্ত করতে মৃদু হেঁসে কোমল স্বরে বলল,
​”এই টুকুতেই এভাবে ভেঙে পরলে হবে? প্রথমবারে তো মানুষ প্রিলিই পাস করতে পারে না। সেই আপনি ভাইভা বোর্ডেও পৌঁছাতে পেরেছেন। হয়তো কোনো ল্যাগিংস ছিল, পরের বার ঠিকই হয়ে যাবে। এটা না হলেও বরো কত অপশন আছে। তাই বলে এভাবে নাকের জল চোখের জল এক করতে হবে, বোকা মেয়ে!” ” নিন, চোখ মুছুন।” বোরাক আরেকটা টিস্যু এগিয়ে দিল।
মৌটুসী টিস্যুটা নিয়ে চোখের পানি মুছে বলল,
​”প্রথমবার হলেও আমি সেই ভাবেই প্রিপারেশন নিয়েছিলাম মি. বোরাক। কত রাত আমি ঠিকভাবে ঘুমাইনি। এত পরিশ্রম করেও যদি এভাবে বৃথা যায়, তাহলে একটা শিক্ষকতার চাকরির জন্য আর কী করব? আরও কত পরিশ্রম করতে হবে? এত ভালো পরীক্ষা দিয়েও আমরা পাচ্ছি না, তাহলে আসনগুলো দিচ্ছে কাদের?”
​বোরাক একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বর্তমানে দেশের ঘুষ-দুর্নীতি সিস্টেমের জন্য মেধার একটা বড় অংশ যে বঞ্চিত হচ্ছে, তা নতুন করে বলার বাকি থাকে না। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। মেনে নিয়েই বাঁচতে হবে।”
​দুইজনেই চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। মাঝ দুপুর রাস্তায় হওয়ায় পথচারীদের সংখ্যা খুব কম। মাঝে মাঝে অটো রিক্সার হর্ণের টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসছে কেবল।
মৌটুসী একদৃষ্টিতে সামনের কোনো শূন্যে তাকিয়ে। চোখ দুটোর নিষ্পাপ, চেহারাটা মলিন। এদিকে বোরাকের অভিব্যক্তিও নির্লিপ্ত। গভীর ভাবে কিছু একটা ভাবনার ফলে তার কপালের শক্ত চামড়া কিছুটা কুঞ্চিত হয়ে আছে।
এক পর্যায়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে বোরাক বলল, “আচ্ছা, প্রাইভেট সেক্টরের জব কেমন লাগে আপনার?”
মৌটুসী একইভাবে থেকেই উত্তর দিল,

​”চাকরি তো চাকরিই মি. বোরাক। জীবিকা নির্বাহে সক্ষম হালাল সবকিছুই আমার কাছে সমান। কিন্তু আজকাল তো প্রাইভেট সেক্টরেও মামা-খালু-ফুপার রেফারেন্স না থাকলে হয় না।”
​”আর যদি আমি রেফারেন্স দিই?”
​”মানে?” মৌটুসী এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বোরাকের দিকে তাকাল।
​”আমার ফ্রেন্ডের কোম্পানিতে কিছু পদ নিয়োগ হচ্ছে। আপনি চাইলে আমি সেখানে আপনার জন্য কথা বলতে পারি।”
​”দয়া দেখাচ্ছেন?” ভ্রূ কুঁচকে বলল মৌ।
​বোরাক মৃদু হেসে বলল,
“ভুল ভাবছেন ম্যাডাম। দয়া দেখাতে চাইলে সরাসরি অর্থ অফার করতাম। কিন্তু আমি আপনাকে উপার্জনের একটি পথ দেখিয়ে দিচ্ছি, এই যা। সেখানে কাজের বিনিময়ে আপনাকে বেতন দেওয়া হবে। তবুও যদি আপত্তি থাকে, তবে বাদ দিন।”
​মৌটুসী নিজের বাড়াবাড়িটা বুঝতে পারল। তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আরে না না। আমি তো এমনই বললাম। আপনি একটু দেখুন, যদি হয়! মানে আমার সত্যিই একটা বেটার চাকরি প্রয়োজন।”
​বোরাক বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “তাহলে এই অধমের দয়া গ্রহণ করছেন, হু?”
​মৌটুসীর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। সরু চোখে চেয়ে বলল, “খোঁটা দিচ্ছেন?”
​বোরাক এবারে হেসে দিল। “আচ্ছা, আচ্ছা সরি। খোঁটা দিচ্ছি না। আমি কথা বলে দিব। ধরে নিন আপনার চাকরি প্রায় কনফার্ম।”

​”এত নিশ্চিত কীভাবে? ক্লোজ ফ্রেন্ড আপনার?”
​”হুম, একদম।”
​”আচ্ছা, কোন কোম্পানি ওটা?”
​”আমি নাম, লোকেশন সব সেন্ড করে দিব আপনাকে। ও হ্যাঁ, আপনার ফোন কোথায়?”
​”শো-রুমে।”
​বোরাক এবার লক্ষ্য করল মৌয়ের কাছে কোনো ব্যাগও নেই। সব যদি শোরুমে থাকে তাহলে সে এত দূর এল কীভাবে? হেঁটে হেঁটে? কৌতূহলী হয়ে বোরাক জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আপনি সাহেব বাজার থেকে এই অব্দি হেঁটে আসেননি তো?”
​মৌ নত হয়ে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল।
​”জাত পাগলি একটা আপনি! এই রোদের মধ্যে আপনি এতদূর হেঁটে এসেছেন? সাহেব বাজার থেকে এখানকার দূরত্ব কত জানেন? পুরো দেড় কিলো।”
বোরাকের ধমক খেয়ে ​মৌটুসী ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“তখন মাথা ঠিক ছিল না তো! বুঝতেই পারিনি কখন এতদূর চলে এসেছি।”
​”আচ্ছা, চলুন এখন।” বলেই দাঁড়িয়ে গেল বোরাক।
​মৌটুসীও দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু….. আপনি আমাকে পেলেন কীভাবে?”
​বোরাক আঙুল উঁচিয়ে ওর বিশালাকার অফিস বিল্ডিং দেখিয়ে দিয়ে বলল, “ঐ যে আমার অফিস। ব্যালকনি থেকে এখানে একটা পাগলিকে বসে থাকতে দেখেছিলাম। তাই দয়া দেখাতে চলে এলাম।”
​মৌ মেকি রাগ দেখিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আপনি…. আপনি একটা যা ইচ্ছে তা।”
​বোরাক শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতেই হাসতেই হাত উঁচিয়ে একটা খালি রিকশাকে দাঁড়াতে ইশারা করল। রিকশাটি তাদের সামনে ব্রেক নিলে সে বলল, “মামা সাহেব বাজার?”
​রিকশাওয়ালা পান খাওয়া মুখ খুলে বললেন,
“যামু মামা। উডেন।”
​বোরাক ইশারা করল মৌকে। “উঠুন।”
​মৌটুসী উঠে বসল। মৃদু হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে বোরাককে বিদায় দিতে যাবে তখনই দেখল, বোরাকও উঠে তার পাশে বসছে। সে মৌটুসীর হতবিহ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“একা ছাড়ছি না, ম্যাডাম। আবারও যদি মন ভুলে কোথাও চলে যান!” তারপর বলল, “মামা চলুন।”
​রিকশা চলতে শুরু করল।
​এদিকে মৌটুসীর এতক্ষণের সব দুঃখ-কষ্ট-বিষাদ-বেদনা সব হাওয়া। তার জায়গায় ভর করেছে অন্য কিছু। নাম না জানা বিশেষ্য। এই প্রথম মানুষটার এত কাছাকাছি সে। মাতাল করা ঘ্রাণটা খুব কাছ থেকে নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। ওর তনু বাহুর সাথে লোকটার বলিষ্ঠ বাহু স্পর্শ হওয়ার যোগাড়। মৌটুসী আরও খানিকটা ধারের দিকে চেপে বসল। তা লক্ষ্য করে বোরাক বলল, “বসতে সমস্যা হচ্ছে কি?”
​মৌটুসী ঘনঘন দুই দিকে মাথা নেড়ে না বুঝাল। দুজনেই চুপচাপ। রিকশা চলছে তার নিজ গতিতে। বাতাসে মৌয়ের চুলের ঝুটিটা এলোমেলো হয়ে উড়ছে। উত্তেজনায় কোলের ওপর ফেলে রাখা হাত দুটোর তালু ঘেমে ভিজে উঠেছে।
​মৌটুসী নিজের এই অস্বস্তি আর অযাচিত অনুভূতি আড়াল করতে বলল, “আচ্ছা, আপনার ফ্রেন্ডের অফিসে কী কাজের জন্য লোক নেওয়া হচ্ছে? মানে… আমি কি তা করতে পারব? বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন হবে না তো?”
​বোরাক সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল, “কম্পিউটার অন-অফ করতে পারেন না?”
​মৌটুসীর মনে মুহূর্তেই অভিমান দানা বাঁধল। এমন একটা অদ্ভুত প্রশ্ন! মানুষটা কি বোঝাতে চাইছে, মৌ কোনোদিন কম্পিউটার হাতেই নেয়নি? মৌ এবার কিছুটা অভিমানী গলায় ছোট করে বলল, “পারি।”
​বোরাক আবার জিজ্ঞেস করল, “এক্সেলের কাজ টুকটাক জানা আছে?”

​”আছে।”
​”তাহলেই আপনি পাসড। বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন নেই। আসলে তারা ক্যাশ ইনচার্জ হিসেবে কিছু লোক নিচ্ছে, আশা করি আপনি অনায়াসেই মানিয়ে নিতে পারবেন। আর না পারলে বসের ঝাড়ি খাবেন, এই তো!”
​এমনভাবে টুকটাক কথা বলার মাঝেই রিকশা সাহেব বাজার আরডি মার্কেটের সামনে চলে এল। মৌ নামতে যাবে তখন বোরাক বলল, “রিক্সা এখানেই দাঁড়াচ্ছে, আপনি আপনার ফোন-ব্যাগ সব নিয়ে আসুন।”
​মৌটুসী একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, “কিন্তু আমার ডিউটি তো এখনো শেষ হয়নি।”
​”কিসের ডিউটি? এই চাকরিকে একেবারে ইস্তফা দিয়ে আসুন। কাল থেকেই নতুন চাকরিতে জয়েন করছেন আপনি।”
​মৌ শোরুমে ঢুকতেই রুমু প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে এল, “মৌ, তখন ওইভাবে কোথায় গিয়েছিলে? তোমার চোখ-মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন?”
​মৌটুসী রুমুর বাহুতে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল, “তেমন কিছু না রুমু, চিন্তা কোরো না।”
​”বললে যে, তোমার রেজাল্ট দিয়েছে ওটার কী হলো?”
​”চাকরিটা হয়নি। মানে ভাইভায় পাস করতে পারিনি।”
​রুমুর মুখটাও এবার কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। মৌয়ের হাত ধরে সান্ত্বনার সুরে বলল,
“আচ্ছা, মন খারাপ কোরো না। পরের বার হয়ে যাবে। অথবা তার আগেই অন্য ভালো চাকরিও পেয়ে যেতে পারো।”
​মৌ মুচকি হেসে বলল,

“তোমার সাথে অনেক কথা আছে রুমু, রাতে ফোন দিব, এখন হাতে সময় নেই। যেতে হবে।”
​দ্রুত পায়ে গোডাউনে গিয়ে ফোন আর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসতেই ক্যাশ কাউন্টারের সামনে ম্যানেজার খলিল মিয়ার মুখোমুখি হলো মৌটুসী। মৌকে দেখে কপট রাগ দেখিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলেন তিনি, “এই মেয়েছেলে, কাস্টমার রেখে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলে তুমি?”
​মৌটুসী হাতের ব্যাগটা উঁচিয়ে ধরে বলল, “এখনও যাচ্ছি খলিল ভাই। এটা নিতেই এসেছিলাম।”
​মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক আরও চেতে উঠলেন।
“যাচ্ছ মানে? মগের মুল্লুক? এই মাসে কয়দিন ছুটি কাটিয়েছ সেই হিসেব আছে?”
​”হিসেব রাখার সময় নেই খলিল ভাই। অনেক ব্যস্ত মানুষ আমি।”
বলেই ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে হেলেদুলে বাইরের দিকে হাঁটা দিল মৌটুসী।
​পেছন থেকে খলিল মিয়ার রাগান্বিত চিৎকার ভেসে এল,

মৌটুসী পর্ব ২৬

“বেয়ারা মেয়েছেলে! তোমার চাকরি খাব আমি।”
​মৌটুসী ততক্ষণে শোরুমের দরজার প্রায় বাইরে। কিন্তু খলিল মিয়ার চিৎকার শুনে সে দরজার ফাঁক দিয়ে মাথাটা একবার ঢুকিয়ে দিল, দাঁত বের করে হেঁসে চেঁচিয়ে বলল,
“কালকে আপনাকে এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে দিয়ে যাব খলিল ভাই। আমার চাকরির সাথে মিশিয়ে খাবেন, হেব্বি টেস্টি টেস্টি কম্বিনেশন!”

মৌটুসী পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here