Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৩১

মৌটুসী পর্ব ৩১

মৌটুসী পর্ব ৩১
ঋতস্বিনী মাহবিশ

ছামেদ আলীর মেয়েটা, দুর্বার, দুর্ধর্ষ, মুক্তচেতা, অনেকটা উগ্র ম্যাজাজী। সমাজের ভয় নেই তার, উল্টো সমাজই যেন তাকে ভয় পায়, তার উগ্রতাকে ভয় পায়। সমাজের গোপন তথ্য এক তুড়িতে টেনে বের করতে সক্ষম এমন একটা দাপুটে মেয়ে সে। সাবান পানি ছাড়াই নিজের জাদুকরী ক্যারিশমাতে সমাজকে ধুয়ে দিতে সক্ষম। তাকে সহজে চেনা মুশকিল, বোঝা দায়।
​এই কারণে স্থানীয় সমাজের একটা পিঁপড়াও তার পেছনে লাগার পূর্বে অন্তত দশবার ভাবে। তার ভুলত্রুটি নিয়ে ফিসফাস হয়, ঘরের আড়ালে চায়ের কাপে সমালোচনা হয়, কিন্তু সামনাসামনি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।

​মৌটুসী ও তার মেয়ের অতীত নিয়ে মুখ খোলার হিম্মত নেই পাড়ার কারোর। দরকারই বা কী, শুধু শুধু তার পেছনে লেগে নিজেদের গোপন কিছু কথা লোকসমক্ষে টেনে বের করে আনবার? কিংবা সুখে থাকতে আলগা কোনো ঝামেলা বয়ে আনবার? তাই প্রত্যেকের জবানে চড়ুই মৌটুসীর গর্ভে থেকেই জন্ম নেওয়া সন্তান।
​বোরাক শিকদারের সঙ্গে মৌটুসীর চলাফেরা, বাড়ির গলি পর্যন্ত মানুষটার প্রায় যাতায়াত, বোরাকের সন্তানের মুখে মৌটুসীকে “মা” সম্বোধন—এত কিছু লোকচক্ষুর অগোচরে নেই আর। বিষয়টা নিয়ে প্রতিবেশী মহলে সকাল-সন্ধ্যা চর্চা চলছে। আর তা রসাক্ত করতে নিয়মিত রস ঢালছে মৌয়ের ঘরের শত্রু মেহেরুন নেছা ও নীতি কবিরাজ। যদিও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৌটুসীকে কিছু বলার সাহস তাদেরও নেই। পূর্বে কয়েকবার সেই সাহস দেখাতে গিয়ে প্রাণ ও ইজ্জতের গোপন কাহিনি হারাতে বসেছিল কি-না!
​এসব নিয়ে সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে ওঠেন লাল বানু বেগম। সন্তানের নামে অপবাদ—কোনো মায়ের পক্ষেই তা সহজে সহ্য করা সম্ভব নয়, সে হোক গোপনে বা প্রকাশ্যে। ভদ্রমহিলা একদিন মৌটুসীর কাছে বিষাদ মনে তা তুলে ধরলেন। মৌটুসী সেদিন মায়ের হাত ধরে দৃঢ়তার সাথে বলেছিল, “তুমি জানো না আম্মা তোমার মেয়েকে? বিশ্বাস করো তো আমাকে? তোমার মেয়ে নিজের সম্মান বেঁচে কোনো অনৈতিক কাজে জড়াবে না, এই বিশ্বাস ধারণ করো তো?”

​লালবানু বেগম কী বলবেন? তিনি চোখ বন্ধ করে মেয়েকে বিশ্বাস করেন। গোটা পৃথিবী যদি তার এই মেয়ের বিরুদ্ধে হাজারটা অভিযোগ তোলে, শত শত প্রমাণও এনে হাজির করে, তবুও তার বিশ্বাসের চোখে মৌটুসী সবসময় স্বচ্ছ, নির্মল, পবিত্র। তিনি সকল অপবাদ নিসন্দেহে এড়িয়ে যাবেন।
​”সমাজ তোমাকে-আমাকে কী দিয়েছে আম্মা? আমাদের দুঃসময়ে তো তাদের পাওয়া যায়নি! আমাদের কান্না মুছে দিতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাহলে কেন তাদের ধার ধারো? আমি একটা ভরসার হাত পেয়েছি আম্মা, কেবল সমালোচকদের কথায় তা ছাড়ছি না। ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছি না আমি, শুধু বর্তমানকে শান্তিতে উপভোগ করতে চাই। তোমাকেও বলব মানুষের ফিসফাসনিতে কান না দিতে, এ নিয়ে ভেতর ভেতর কষ্ট না পেতে। তবে কেউ কখনো তোমার মুখের ওপর কিছু বলার দুঃসাহস করলে মুখ বুজে সহ্য করবে না। নিজে না পারলে আমাকে বলবে, আমিও মৌ, নিন্দুকের কলিজা মেপে ছেড়ে দেব।”

​বোর্ডরুমে ঢোকার আগমুহূর্তেই পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা হালকা কেঁপে উঠল। বোরাক একটু থেমে ফোনটা পকেট থেকে বের করল। স্ক্রিন ওপেন করতেই ভেসে উঠল একটা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ:
“মিস্টার বোরাক, আপনি কি ফ্রী আছেন?”
​ব্যস, বোরাক ভুলেই বসল মিটিংয়ের কথা। অবচেতনেই আঙুল চালিয়ে মিথ্যেটা লিখল,
“হ্যাঁ ফ্রী, বলো।”
​”তাহলে আধ ঘণ্টার মধ্যে পদ্মার পাড়ে আসুন… আই অ্যাম ওয়েটিং।”
​মাত্র একটি লাইন, আর কাটকাট নির্দেশ। পড়তেই বোরাকের ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটা হাসি ফুটে উঠল।
“আই অ্যাম ওয়েটিং”—কথাটা আওড়ে নিয়ে সে মোবাইলটা পকেটে রেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে তাকাল।

— “রহমান সাহেব, মিটিংটা হচ্ছে না। আমাকে বেরুতে হবে। সন্ধ্যায় শিডিউল করুন। সবাইকে জানিয়ে দিন, আমি সন্ধ্যায় উপস্থিত থাকব।”
​ম্যানেজার খানিকটা বিস্মিত হয়ে বললেন,
— “কিন্তু স্যার, ক্লায়েন্ট যদি বিরক্ত হন? দুপুর থেকে বোর্ডরুমে অপেক্ষা করছেন তারা।”
​— “দুই ঘণ্টা, আরও দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলুন তাদের। আর বিরক্ত মনে করলে চলে যেতে পারে, আই হ্যাভ প্রবলেম। ইট’স টাইম ফর সামওয়ান মোর ইম্পর্ট্যান্ট।”
​ম্যানেজার আর পাল্টা কিছু বললেন না। অনুচিত তা। বরং সায় দিয়ে বললেন,
— “ওকে, স্যার। আমি উনাদের জানিয়ে দিচ্ছি।”
​বোরাক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দীর্ঘ পায়ে হেঁটে অফিস বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এল। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসেই কব্জির ঘড়ির দিকে একবার তাকাল।
আমারও মনে পড়ে গেল, “আই অ্যাম ওয়েটিং।”

​গাড়ি চলতে শুরু করল। স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে নিজের অজান্তেই মৃদু হাসল বোরাক।
​নিহাতই চুনোপুঁটি একটা মেয়ে! যার নির্দেশে কোটি টাকার ডিলের মিটিং শিডিউল বদলে ছুটছে বোরাক শিকদার। বলতেই হয়, রমণী ভালো রকম মাথা খেয়েছে তার।
​হঠাৎ সামনের যানজট দেখে গাড়ির গতি থেমে গেল। বোরাক বিরক্ত চোখে সামনে তাকাল। লাল ব্রেকলাইটের দীর্ঘ সারি। একের পর এক গাড়ি স্থির হয়ে আছে। সে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পাশের গলি ধরে অন্য রাস্তায় ঢুকে পড়ল। পথটা খানিকটা দীর্ঘ, কিন্তু চলন্ত। দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে সেটাই ভালো। গাড়ির গতি বাড়তে থাকল।
​মাঝপথে আবারও একবার ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সময়ের কাঁটা আজ ইচ্ছে করেই একটু দ্রুত ছুটছে যেন, কিন্তু পথ ফুরোচ্ছে না।
​অবশেষে পদ্মা গার্ডেনের পার্কিংয়ে এসে গাড়ি থামাল বোরাক। নেমে এসে দরজা বন্ধ করে দ্বিতীয় গেট দিয়ে নদীর পাড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে।

​বিকেলের পদ্মাপাড় তখন প্রাণবন্ত। নদীর বুক চিরে আসা তরুণ-তরুণীদের হাসি-ঠাট্টা, ভুট্টা-বাদামওয়ালার হাঁক, প্রেমিক-প্রেমিকাদের চাপা গল্প আর সূর্যাস্ত দেখতে আসা মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ।
​এই কোলাহলের মাঝেও বোরাকের চোখ ঠিক তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে খুঁজে নিল।
একটা কুলফির দোকানের পাশে ​নদীর দিকে মুখ করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে রমণী। পদ্মার দমকা বাতাসে তার আসমানী স্কার্ট আর ওড়নাটা পেছনের দিকে উড়ছে। এলোমেলো চুলগুলো কখনো গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে, কখনো বাতাসে ভেসে উঠছে।
বোরাক ধীর পায়ে গিয়ে রমণীর পাশে দাঁড়াল। কিছু বলল না। কব্জির ঘড়িটা চোখের সামনে তুলে ধরে হালকা হাসল।

— “মি. বোরাক রিপোর্টিং অন টাইম, ম্যাডাম।”
মৌটুসী ধীরেসুস্থে বোরাকের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। দৃষ্টি রাখল তার বাদামী নেত্র যুগলে।
​বোরাক ভ্রু নাচিয়ে, চোখের ইশারায় জানতে চাইল,
— “এত জরুরি তলবের কারণটা কী?”
মৌটুসী কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
— “সানশাইন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি… আপনার বন্ধুর, তাই না?”
বোরাকের স্বাভাবিক ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। মুহূর্তেই বুঝে ফেলল, তার রহস্যের পর্দা আর বুঝি টিকল না।
মৌটুসী আবার বলল,
— “আচ্ছা, আপনার সেই বন্ধুর নামটা কী? চাকরিতে যোগ দেওয়ার দুই সপ্তাহ হয়ে গেল। অথচ কোম্পানির মালিককে একদিনের জন্যও দেখলাম না। ব্যাপারটা একটু বেশিই আশ্চর্য না?”
​বোরাক ধরা পড়া চোরের মতো ঘাড় চুলকে কাশল।

— “উমম… জেনে গেছ, তাই না?”
মৌটুসী ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল।
— “আপনি একটা মিথ্যুক, মি. বোরাক। আমাকে মিথ্যে বলেছেন। মিথ্যে বলে চাকরি দেওয়াকে কী বলে জানেন? প্রতারণা।”
বোরাক হেসে ফেলল।
— “আরে রেগে যাচ্ছ কেন, মৌটুসী মা পাখি? আমি আবার কী প্রতারণা করলাম?”
বোরাকের এমন খামখেয়ালী কথায় মৌয়ের রাগ বাড়ল।
— “করেছেন। বন্ধুর কোম্পানি বলে নিজের কোম্পানিতে চাকরি দিয়েছেন। এটা প্রতারণা না তো কী?”
বোরাক সিরিয়াস হলো এবার।
​— “আমি ভয় পেয়েছিলাম মৌ। যদি শুনতে কোম্পানিটা আমার—তাহলে যদি চাকরিটাই না করতে?”
​— “আপনার কি মনে হয়নি, এই দিনটা একদিন আসারই ছিল? এটা কি আজীবন লুকিয়ে রাখার মতো কোনো বিষয়?”

​— “তাহলে শোনো, কয়েকদিন কাজ করার পর এমনিতেই কর্মসংস্থানের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। তখন কোম্পানির মালিকানা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। মানুষ যখন কোনো জায়গায় নিজের একটা পরিচয় গড়ে তোলে, তখন এসব ছোটখাটো তথ্য আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ থাকে না, আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম।”
মৌটুসী তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— “বাহ! কী চমৎকার ভাবনা! তাই বুঝি গত দুই সপ্তাহ নিজের অফিসেও যাননি?”
— “ভুল ভাবছ। আমি এমনিতেও ওখানে নিয়মিত যাই না। ম্যানেজার মকবুল সাহেবই পুরো অফিস সামলান। আমি সপ্তাহে দু-এক দিন শুধু দরকারি কাগজপত্র সাইন করতে যাই। আমার মূল অফিস তো ভদ্রায়। সেদিন তোমাকে দেখিয়েছিলামও।”
মৌটুসী মাথা কাত করল।

— “এখন তো সব জেনে গেছি। যদি কালই রিজাইন দিয়ে দিই?”
​বোরাক বিন্দুমাত্র বিচলিত না হওয়ার ভান করে ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
— “দিতেই পারো। এর চেয়েও ভালো চাকরি পেলে অবশ্যই দেবে। আমিও অবশ্যই কনগ্রাচুলেট করব!”
​মৌটুসী ভ্রু উঁচু করল।
— “আচ্ছা, তাহলে যাই। রিজাইন লেটার লিখতে হবে।”
কথাটা বলেই ঘুরে গিয়ে গটগট পায়ে পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করল মৌ।
​বোরাকও হেসে ঘাড় ঘোড়াল। মৌয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
​— “এই মৌটুসী পাখি! যেও না, কুলফি কিনে দেব তোমায়।”
​মৌটুসী হাঁটা থামাল। চোখ সরু করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বোরাকের দিকে।
— “আমাকে কুলফির লোভ দেখানো হচ্ছে?”
​বোরাক দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেসে বলল,
— “তাহলে বলো, কিসের লোভ দেখালে তুমি থেকে যাবে?”

​দুপুরের তীব্র রোদটা ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ঢলে পড়েছে, তার সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছে গাছের ডালপালা, মাঝে মাঝে ভেসে আসছে বকুল ফুলের মিষ্টি সুবাস। দূরে কোথাও পাখিরা নীড়ে ফেরার আগে শেষবারের মতো কিচিরমিচির করে উঠছে। সারাদিনের তাপের পর বিকেলের এই নরম হাওয়ায় যেন প্রকৃতি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
​দুই কানে ব্লুটুথ হেডফোন গুঁজে নিল আরোয়া। ভেসে আসা গানের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অজান্তেই ঠোঁট নড়ছে তার। গুনগুন করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এল সে।
​গানের তালে তালে মাথা দুলিয়ে শুকনো কাপড় দড়ি থেকে টেনে নামাতে লাগল। নামানোর সময় একটা ভাঁজ দিয়ে বাঁ হাতের ওপর জড়ো করে রাখছে। সবগুলো নামানো শেষ হলে অভ্যাসমতো এবার আঙুল চালিয়ে গুনতে শুরু করল—এক, দুই, তিন… সাত। থামল সে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে তো আটটা কাপড় মেলে দিয়ে গিয়েছিল। একটা কম কেন?
​সে আবার গুনে দেখল—সাতটাই। এবার তার মনে পড়ল, কমলা রঙের টপটা! ওটা তো এই দড়িতেই ছিল। আরোয়া দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে এপাশ থেকে ওপাশ চক্কর দিল। কোথাও পড়ে নেই। রেলিংয়ের কাছে গিয়ে নিচে বাগানের দিকে ঝুঁকে তাকাল সে।

​হঠাৎই আরোয়ার চোখ আটকে গেল বকুলফুল গাছটার ওপর। গাছের উঁচু একটা ডালে আটকে আছে তার পছন্দের কমলা রঙের টপ। বাতাসে আলতো করে দুলছে সেটি। আরোয়া নিচের ঠোঁটটা উল্টে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত সপ্তাহেই টপটা কিনেছিল, ভীষণ পছন্দের। নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল তার। কেন যে আলসেমি করে ক্লিপ দিয়ে কাপড়গুলো আটকে দেয়নি! কিন্তু পছন্দের এই টপটাকে তো আর ওই গাছের কাছে বিসর্জন দেওয়া যায় না!
​আরোয়া আর দেরি করল না। ছাদ থেকে দ্রুত নেমে ঘরে এসে কাপড়গুলো বিছানায় রাখল। হেডফোনটা খুলে টেবিলের ওপর রেখেই দ্রুত নিচে বাগানের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
​ড্রয়িংরুমের মাঝবরাবর আসতেই দোতলার করিডোর থেকে বীর ডেকে উঠল, “আলোয়া ফুপুমনি, কোথায় যাচ্ছ?”

​আরোয়া থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে হাসিমুখে তাকাল, “ফুপুমনি বাগানে যাচ্ছি সোনা।”
​”আমাকে নিয়ে যাবে?”
​আরোয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, “হ্যাঁ বাবা, এসো।”
​বীর খুশি হলো বেজায়। দৌড়ে সিঁড়ির কাছে এসে একপা একপা করে সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে নেমে এল সে। হাতে একটা স্পাইডার টয়। ওটা নিয়েই আরোয়ার কাছে এসে দাঁড়াল বীর। “ফুপুমনি চলো।”
​আরোয়া ওর হাত ধরে বাগানের দিকে হাঁটা দিল। এসে দাঁড়াল বকুলফুল গাছটার গোড়ায়। টপটা দেখা যাচ্ছে, বেশ ওপরের একটা ডালের খাঁজে আটকে ঝুলে আছে সেটি। কিন্তু তা নাগালে পাওয়া আরোয়ার সাধ্যের একেবারেই বাইরে। বীর সেই দিকে আঙুল তাক করে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ফুপুমনি ওখানে অলেঞ্জ কালাল ওটা কি?”

​”ওটা আমার জামা সোনা। আটকে গেছে।”
​”তাহলে নামাও।”
​”হুম।” আরোয়া কোমরে হাত দিয়ে ভাবতে লাগল। দারোয়ান চাচাকে কাউকে ডাক দেবে কি? কিন্তু উনিও তো নাগালে পাবেন না। বয়স্ক মানুষ, গাছেও উঠতে পারবেন না।
​একটু পর বীর আবার বলল,
​”ফুপুমনি তুমি গাছে উঠে জামাটা নামাও।”
​”আমি গাছে উঠতে পারি না বীর।”
​”ওও। আমিও তো পালি না।” আশাহত হয়ে মলিন মুখে বলল বীর।
​আরোয়া আশপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে লম্বা-শক্ত লাঠি জাতীয় ডাল খুঁজতে লাগল। কিন্তু আশানুরূপ কিছুই চোখে পড়ল না তার। বীর ওর অস্থিরতা লক্ষ করে বলল, “ফুপুমনি কি খোঁজো?”
​”লাঠি বাবা।” আরোয়া ব্যস্ত চোখেই বলল।
​বীরের কৌতূহল আর প্রশ্নের শেষই নেই।
​”লাঠি দিয়ে জামা নামাবে?”

​আরোয়া কিছু বলতে যাবে, তার আগেই মেন গেটের দিকে চোখ গেল তার। গেট পেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছে সাফওয়ান। ওকে দেখা মাত্রই যেন আরোয়ার সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে গেল। গলা উঁচিয়ে ডাকল, “সাফওয়ান! সাফওয়ান, এদিকে একটু এসো!”
​সাফওয়ান সবসময়ের মতো নিবিষ্ট হয়ে মাটির দিকে চোখ রেখে হাঁটছিল। এবার আরোয়ার কণ্ঠ শুনে পা থামিয়ে দিল সে। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
​আরোয়া হাত নেড়ে আবারও ডেকে উঠল, “এই যে এখানে, একটু আসো!”
​এগিয়ে এল সাফওয়ান। আরোয়া তড়িঘড়ি করে আঙুল উঁচিয়ে ডালের কাপড়টা ইশারা করে বলল, “ওটা একটু পেড়ে দাও।”

​”কী ওটা?” শান্ত স্বর সাফওয়ানের।
​”আমার জামা।”
​বীরও বলল,
​”চাচ্চু ফুপুমনির জামা গাছেল ডালে আটকে গেছে, তুমি পেলে দাও।”
​সাফওয়ান এবার একটু অবাক হয়েই আরোয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার জামা ওখানে গেল কীভাবে?”
​সাফওয়ানের এত প্রশ্ন করা পছন্দ হলো না আরোয়ার। বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমাকে এত কিছু বলতে হবে?”
​”সরি।” আস্তে করে কথাটা উচ্চারণ করেই গাছের একদম গোড়ায় চলে গেল সাফওয়ান। এরপর খুব সাবলীলভাবেই গাছের শরীর বেয়ে উঠে গেল উঁচু একটা ডালে। সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে জামাটা হাতে তুলে নিল। আরোয়া নিচে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, “ফেলে দাও।”
​সাফওয়ান তাই করল। জামাটা নিচে ফেলে দিতেই আরোয়া টুপ করে ক্যাচ ধরে নিল। তা দেখে খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল বীর, “ইয়ে! সাফান চাচ্চু জামা নামিয়ে দিয়েছে।” এরপর গাছে থাকা সাফওয়ানকে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল, “ব্লাভো চাচ্চু!”
​সাফওয়ান মুচকি হাসল।
​নিচে নামার জন্য পা বাড়াতেই আরোয়া বলে উঠল, “সাফওয়ান, উঠেছ যখন—তোমার হাতের কাছের ডালটা একটু ঝাঁকুনি দাও তো।”

​সাফওয়ান দ্বিমত করল না। হাতের নাগালের ডালটা ধরে হালকা একটা ঝাঁকুনি দিল সে। সাথে সাথে গাছের পাতাগুলো ঝুমঝুম একটা শব্দ তুলল, ঝুরঝুর করে ঝরে পড়তে লাগল অসংখ্য ছোট ছোট বকুলফুল। যেন গাছের শরীর থেকে বৃষ্টি হয়ে নামছে সুবাসিত ফুলগুলো।
​আরোয়া এবার হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে ফুল কুড়াতে লাগল। তার দেখাদেখি বীরও বসে ছোট ছোট হাতে ফুল কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেল। কুড়ে কুড়ে আরোয়ার হাতে দিচ্ছে সে।
​আরোয়ার হাতের মুঠোটা ফুলে ভরে গেলে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। ততক্ষণে সাফওয়ানও গাছ থেকে নেমে পায়ে জুতো পরছে। আরোয়া বলল, “বীর, হয়েছে বাবা চলো।”
​বীর ঘাড় ঘুরিয়ে ফুপুর দিকে তাকিয়ে বলল,

​”না, ফুপুমনি হয় নি তো! এখনো অনেকগুলো ফুল পলে আছে কুলাও কুলাও। সাফান চাচ্চু তুমিও কুলাও।”
​”আমার আর লাগবে না বীর। তুমি তোমার সাফওয়ান চাচ্চুর সাথে কুড়াও, আমি বাসায় যাই।” বলেই আরোয়া চলে গেল। এবার সাফওয়ান বসে বীরের সাথে ফুল কুড়াতে যোগ দিল।
​বীর জিজ্ঞেস করল, “সাফান চাচ্চু, ফুল দিয়ে আলোয়া ফুপুমনি কী করবে?”
​”জানি না বাবা।”
​”তাহলে তুমি কী করবে?”
​”আমি? আমি কিছুই করব না। কিন্তু তোমাকে একটা মজার জিনিস করে দেব।”

​ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সুচ-সুতো দিয়ে বকুলফুলের মালা গাঁথছে সাফওয়ান। তার পাশে বীর উৎসাহ নিয়ে বসে মালা গাঁথা দেখছে। তখনই আরোয়া কোল্ড ড্রিংকস নেওয়ার জন্য ওপরে নেমে এল। সাফওয়ানদের দিকে বিশেষ খেয়াল না করেই রান্নাঘরের ফ্রিজের কাছে চলে গেল সে। ক্যাবিনেটের উল্টো দিকে রান্নায় ব্যস্ত দুই পরিচারিকা। ফ্রিজের দরজা খুলতেই আরোয়া জিজ্ঞেস করল, “রাবেয়া আপা কী রান্না করো?”
​”ফুলকপি দিয়া মাছ, ঢেঁড়স ভাজা আর ডাউল, আপামনি।”
​”ওয়াও ঢেঁড়স ভাজা! করো করো, ইয়াম্মি করে রান্না করো।”
​আরোয়া ফ্রিজ থেকে স্প্রাইটের বোতলটা নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল একবার। সাফওয়ান আর বীরকে খুব মন দিয়ে কিছু করতে দেখে কৌতূহল হলো ওর। আরও দুই ধাপ সামনে এগিয়ে দেখার চেষ্টা করল। বলল, “কী করো তোমরা?”
​বীর চট করে মাথা তুলে তাকাল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আরোয়াকে ডেকে বলল, “ফুপুমনি দেখো, সাফান চাচ্চু কী বানাচ্ছে! বকুল ফুলেল মালা। অনেক সুন্দল।”
​আরোয়া এবার একেবারে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সাফওয়ানের হাতের কাজ অব্যাহত। খুব মন দিয়ে সুই দিয়ে সুতোয় ফুল গাঁথছে সে। আরোয়া বলল,

​”ওয়াও, ইন্টারেস্টিং তো! আমার মাথাতেই আসে নি এটা।”
​”অনেক সুন্দল মালা, এটা আমি কালকে চুলুই পাখিকে উপহাল দিব।”
​”আমিও মালা গাঁথব!” বলেই আরোয়া দৌড় দিল দোতলায়। দুই মিনিটের মাথায় নিজের ফুলগুলোও নিয়ে হাজির হলো। ততক্ষণে সাফওয়ান মালা গাঁথা শেষ। আরোয়া ওর থেকে সুই-সুতো নিয়ে নিজেও কাজ শুরু করে দিল।
সুই-সুতোর মাঝে সম্পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দিয়ে মালা গাঁথছে আরোয়া। এদিকে সাফওয়ান বীরের থেকে বিদায় নিয়ে উঠে দরজা পর্যন্ত চলে গেল। তখন টনক নড়ল আরোয়ার। তাড়াতাড়ি করে পিছু ডেকে বলল,

মৌটুসী পর্ব ৩০

“এই সাফওয়ান কোথায় যাচ্ছ?”
সাফওয়ান দাঁড়িয়ে বলল,”বাসায়। কেন, কোনো কাজ আছে?”
“হ্যাঁ, একটু বসো, আমার মালা গাঁথা শেষ হোক। তারপর কয়েকটা ভিডিও ক্লিপ নিয়ে দিবে আমাকে।”
অগত্যা ফের ঘুরে এসে সোফার উপর বসল সাফওয়ান।

মৌটুসী পর্ব ৩২