মৌটুসী পর্ব ৩
ঋতস্বিনী মাহবিশ
ছুটির ঘণ্টা বাজতেই নিস্তব্ধ স্কুল প্রাঙ্গণ প্রাণ ফিরে পেল যেমন। ক্লাসরুমের বন্ধ দরজাগুলো ধড়াস করে খুলে যেতে লাগল, দৌড়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসতে লাগল রং বেরং পোশাক পরা একঝাঁক কচিকাঁচার দল।
মৌটুসী এই ভীরের মাঝে বিপরিতগামী হয়ে দুতলায় উঠল না আর। সিড়ির সরাসরি মাঠের এক পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ থামতেই দুতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা বাচ্চাদের ভীড়ের মাঝে এবার চড়ুইয়েরও দেখা মিলল। মুহূর্তেই তার ভেতরের সকল মন খারাপ গায়েব হয়ে গেল, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি।
বীর আর চড়ুইকে হাত ধরে নামিয়ে নিয়ে আসছে সাফওয়ান। মৌটুসী আরেকটু এগিয়ে গিয়ে হাত উঁচিয়ে ইশারা করতেই চড়ুই তাকে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। সাফওয়ানের হাত ঝাঁকিয়ে বলল,
“চাচ্চু, ওই যে আমার মাম্মা।”
সাফওয়ান ওদের নিয়ে মৌটুসীর দিকে এগিয়ে এল। এসেই চড়ুই মাম্মার সাথে বীরের পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল,
“মাম্মা, আমার নতুন বন্ধু, ওর নাম বীর।”
মৌটুসী বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে আদর করে দিল। “তোমার বন্ধু তো খুব মিষ্টি একটা বাবু, চড়ুই পাখি!”
বীর পিটপিট চোখে মৌটুসীর দিকে চেয়ে আছে।
চড়ুই এবার সাফওয়ানকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“আর এটা সাফান চাচ্চু।”
সাফওয়ান হেসে বলল,
“সাফান না চড়ুই, সাফওয়ান।” তারপর মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভদ্র ভঙ্গিতে বলল, “আপু, আমি সাফওয়ান। বীরের দূর সম্পর্কের চাচ্চু হই।”
মৌটুসী বিনয়ী হাসল। ছেলেটা তার চেয়ে গুটি দুই-তিনেক বছরের ছোটই হবে বোধহয়!
“আমি মৌ। চড়ুইয়ের মাম্মা।”
বীর চড়ুইয়ের একটা হাত ধরে বলল,
“তুমি এখন তোমাল মাম্মাল সাথে চলে যাবে চুলুই পাখি?”
চড়ুই ঘনঘন উপর-নিচ মাথা নাড়াল।
“কালকে তো আবার আসব! আমার জন্য জায়গা রেখো।”
বীরের মুখটা মলিন হয়ে এল। মৌটুসী মুচকি হেসে ওর গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“মন খারাপ করো না বীর সোনা, কাল আাবার দেখা হবে।”
তারপর চড়ুইয়ের হাত ধরে গেটের দিকে হাঁটা দিল। চড়ুই কয়েক কদম গিয়েই পেছন ফিরে তাকাল। বীরের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল সে, হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল তার নতুন বন্ধুকে।
মৌটুসী চড়ুইয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল,
“চড়ুই পাখি দুষ্টুমী করে নি তো?”
”একদম না, চড়ুই পাখি বাবু হয়ে বসে ছিল আর মিসের সাথে পড়েছিল।”
মৌটুসী একটু হেসে আবার জিজ্ঞেস করল,
“আর টিফিন ফিনিস করে নি?”
”হুম, করেছে তো। বীর বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করে। সেও আমাকে তার সেন্ডুইচয়ের ভাগ দিয়েছে।”
মেইন গেটের পাশে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোরাক। অগণিত অভিভাবকের ভিড় ঠেলে ভেতরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি সে। একটু পর সাফওয়ান বীরকে নিয়ে বেরিয়ে এল। গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতেই সামনে পাপাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ানের হাত ছেড়ে ‘পাপা’ বলে এক দৌড়ে সেদিকে ছুটে গেল। বোরাক তৎক্ষণাৎ একটু নিচু হয়ে ঝুঁকে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। দীর্ঘকায়-সুঠাম বোরাক শিকদারের বলিষ্ঠ বাহুর ভাঁজে ছোট্ট বীর শিকদারকে দেখাটাও একপ্রকার চোখের প্রশান্তি। বীর বাবার গলা জড়িয়ে কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল,
“তুমি এসেছ পাপা?”
বোরাক ছেলের গালে চুমু এঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এসেছি কলিজা। পাপা তার সানশাইনের কাছে এসেছে।”
সাফওয়ান এগিয়ে আসতেই গাড়িতে উঠে পড়ল তারা। বীরের মাথা থেকে কালো টুপিটা খুলে নিতে নিতে বোরাক জিজ্ঞেস করল,
“আমার বাবার স্কুল কেমন কাটল?”
”খুববব ভালো পাপা।”
বীরের উৎসাহী কণ্ঠস্বর আর চোখ-মুখের খুশির ঝলক দেখে স্বস্তি পেল বোরাক। সবসময় বাড়ির চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকা, গুটিকয়েক মানুষের সাথে অভ্যস্ত বীর স্কুলের এই বিশাল কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিল সে। কিন্তু এবার বীরের হাসিমুখের অভিব্যক্তি দেখে সত্যিই নিশ্চিত হলো।
গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে স্টেয়ারিংয়ে হাত রাখতেই কেন যেন হুট করেই বোরাকের মানসপটে একবার মৌটুসীর রোষে ভরা মুখটা ভেসে উঠল। ড্রাইভিংয়ে সে খুবই দক্ষ। পূর্বে এমন কোনো ভুলের কোনো রেকর্ড নেই তার। আজ যে কীভাবে কী হয়ে গেল? ছোট দুর্ঘটনাটাই এখনো তাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে রেখেছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।
বোরাকের ঘোর কাটল বীরের কথায়,
“জানো পাপা, আমাল একটা বন্ধু হয়েছে! চুলুই পাখি।”
বোরাক নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
“আচ্ছা! চড়ুই পাখির সাথে বন্ধুত্ব করে এসে আমার কলিজা?”
”হ্যাঁ।”
পেছন থেকে সাফওয়ান বলল,
“ভাই, এই চড়ুই কিন্তু পাখি নয়। এটা হলো মিষ্টি একটা চড়ুই। তাই না বীর?”
”হ্যাঁ, চুলুই পাখি পাখি নয়। ও আমাল মানুষ বন্ধু।”
”তাই না-কি? তাহলে তো সেই মিষ্টি চুড়ুইকে দেখতেই হচ্ছে।”
গাল ভরে হেসে বীর বলল, “ওকে পাপা, কালকে তোমাল সাথে চুলুই পাখিল মিট কলিয়ে দেব।”
বোরাক সাফওয়ানকে জিজ্ঞেস করল,
“বীর কিছু খেয়েছে সাফওয়ান?”
”হুম ভাই, খেয়েছে। আজকে আমাদের গুড বয় বীর অনেক খেয়েছে। নুডলস খেয়েছে, আবার একটা সেন্ডুইচ পুরোটায় শেষ করেছে।”
”নুডলস?”
”চড়ুই মেয়েটা নিয়ে এসেছিল। সেখান থেকে খেয়েছে। আমি গিয়ে দেখছি দুজন একসাথে খুব মজা করে নুডলস খাচ্ছে।”
”মাম্মা, জানো বীর না তোতলিয়ে কথা বলে। ও ওর নামটাও ভালোভাবে বলতে পারে না। আমাকে বলে, চুলুই পাখি।”
বলেই ঠোঁট টিপে হাসল চড়ুই।
মৌটুসী বাইক চালাতে চালাতে তার কোমর জড়িয়ে রাখা চড়ুইয়ের হাতের ওপর আলতো করে এক হাত রাখল। বোঝানোর সুরে বলল,
”হাসে না মাম্মা। এটা স্বাভাবিক, বীর তো এখনও অনেক ছোট! আরেকটু বড়ো হলে ঠিক হয়ে যাবে। আর মানুষের এসব সমস্যা নিয়ে হাসা-হাসি করা একেবারেই উচিত না। তুমি কিন্তু বীরের সামনে এই নিয়ে কখনো হাসবে না, একদম না!”
”না না, আমি ওর সামনে হাসি নি তো। আমি শুধু তোমার কাছেই একটু হাসলাম। বীর আমার বন্ধু না? ওকে কেন কষ্ট দিব? আমি তো গুড গার্ল!”
মেয়ের পাকা পাকা বুঝদার কথা শুনে মৌটুসী মৃদু হাসল।
“জানি তো, আমার চড়ুই পাখির মতো গুড গার্ল আর একটাও হয় না!”
”মাম্মা, আরো শোনো, বীর না এখনো ফিডারে করে মিল্ক খায়।”
”বীর ছোট যে!”
”কিন্তু আমি তো মিল্ক মগে করে খাই, তাহলে কি আমি বড় হয়ে গেছি?”
বড় রাস্তা ছেড়ে সবজিপাড়ার একটা ছোট গলিতে মোড় নিল স্কুটি। গলির ভেতরে কিছুটা এগোতেই একটা পুরোনো ঢালু ছাদের বাংলা বাড়ির সামনে থামল তা। ইঞ্জিনের শব্দ থামতেই ভেতর থেকে ভেসে এল মেয়েমানুষের চড়া গলার চিৎকার। মৌটুসীর বুঝতে বাকি রইল না ভেতরে কী কাণ্ড ঘটছে। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে দ্রুত বাইকের স্ট্যান্ড নামাল সে, তারপর চড়ুইয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
যা ভেবেছিল, তাই।
বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামলা বর্ণের এক যুবতী; আর রান্নাঘরে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা, সম্ভবত চুলায় কিছু বসিয়েছেন। এই দুজন দুই প্রান্ত থেকে তীব্র তর্কে মেতেছেন। চিৎকার-চেঁচামেচিতে চারপাশ অস্থির।
মৌটুসী বারান্দার মেয়েটির দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটি তাকে দেখেই আরো একতোড় চেতল যেন। গলার আওয়াজ আকাশ ছুঁল এবার। হাওয়া বদলে মৌটুসীর সন্তানসহ বাপের বাড়ি পড়ে থাকার খোটা দিতে ছাড়ল না। মৌটুসী সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সরাসরি রান্নাঘরে চলে গেল। চুলাটা বন্ধ করে দিয়ে ভদ্রমহিলার হাত থেকে খুন্তিটা কেড়ে নিয়ে রাখল। তারপর ঘর্মাক্ত হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
“আম্মা! চলো এখান থেকে! ঘরে চলো, চড়ুইকে গোসল করাবে চলো।”
ভদ্রমহিলা শুনলেন না মেয়ের কথা। এই মুহূর্তে তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলেন। ফুঁসতে ফুঁসতে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, “আল্লাহ আমার কোন পাপের শাস্তি স্বরূপ এরকম একটা ডাইনিকে আমার ঘরে পাঠাইছে মৌ? কত বড় পাপ করছিলাম এই জীবনে? আমার সুখের সংসারটারে জাহান্নাম বানাই দিল! কোন পাপের ফল ভোগ করতেছি আমি?”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীও চেঁচিয়ে পাল্টা প্রত্যুত্তর দিতে ছাড়ল না।
মৌটুসী সেদিকে কান না দিয়ে ফের মায়ের হাত ধরে টেনে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে কঠিন গলায় বলল, “যখন সব জানো-বুঝো তখন জবাব দিতে যাও কেন? কুকুর গু চাটছে, কারণ ওটা তার স্বভাব, সে কুকুর! এখন তুমিও কি তাল মিলিয়ে তার সাথে সেই গু চাটবে? নাকি নাক সিটকে চুপচাপ সেখান থেকে চলে আসবে?”
মৌটুসী ভদ্রমহিলাকে টেনে ঘরে নিয়ে খাটের ওপর বসিয়ে দিল। শীতের মধ্যেও ঘামছেন তিনি। উত্তেজিত হওয়ার ফলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মৌটুসী ফ্যানটা আস্তে করে ছেড়ে মায়ের পাশে এসে বসল। পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বুঝিয়ে বলল,
“তোমাকে আর কতবার কীভাবে বুঝালে নিজেকে সামলাতে শিখবে আম্মা? হাই প্রেসারের রোগী তুমি, উত্তেজিত হয়ে এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করলে কী হতে পারে জানো?”
ভদ্রমহিলা এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর কষ্ট চেপে রাখতে পারলেন না। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ডুকরে উঠলেন তিনি, “আমার সংসারটা ধ্বংস করে দিল রে মা। আমার সুখ, আমার ছেলে—সব কেড়ে নিল ওই ডাইনিটা!”
মৌটুসী মাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। সংসারের এই তিক্ততা, এই নিত্যদিনের হাহাকার যেন তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চড়ুই ততক্ষণে লক্ষ্মী মেয়ের মতো নিজের ছোট ছোট কাজগুলো গুছিয়ে নিয়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে সে অভ্যস্ত। নানিমনি আর মামিমার মাঝে এসব নতুন কিছু নয়। সে জানে, এই সময় নানিমনির মেজাজ গরম থাকে। তাই কোনো শব্দ না করে নিজের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে, শীতের ভারী কাপড়গুলো ছেড়ে পাতলা পায়জামা-ফতুয়া পরে নিয়েছে। এখন সে খাটের এক কোণে একেবারে পা গুটিয়ে বাবু হয়ে বসে আছে সে।
মৌটুসী মাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“আম্মা আমাকে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। রোদ উঠেছে, চড়ুইকে গোসল করিয়ে দাও। আর ওই মহিলার সাথে একটাও কথা বলবে না। বাকিটা আমি রাতে এসে শুনছি।”
তারপর চড়ুইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“চড়ুই পাখি, নানিমনির সব কথা শুনবে। বিরক্ত করবে না তাকে।”
চড়ুই বাধ্য মেয়ের মতো মাথা কাত করে বলল,
“আচ্ছা মাম্মা।”
মৌটুসী ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা পেরিয়ে পাশের ঘরের দরজার কাছে গেল। মেহেরুন এখনো রান্নাঘরে নিজের মতো চিল্লাপাল্লা করেই যাচ্ছে। সাথে ধুপধাপ করে হাঁড়িপাতিল ঘাটছে, রাখছে আবার প্রয়োজনেরটা নিচ্ছে। মৌটুসী বরাবরেরই মতোই তাকে এড়িয়ে ভেজানো দরজাটা অল্প খুলে উঁকি দিল ভেতরে। দরজার সরাসরি বিছানার ওপর শুয়ে আছেন মধ্যবয়স্ক ছামাদ আলী। গত দুই বছর যাবৎ বিছানার সাথে শয্যাশায়ী তিনি, বিছানায় এখন তার পৃথিবী। শরীরের বাঁ পাশটা অবশ, নিথর। মুখটা একদিকে বেঁকে যাওয়ায় কথা বলতেও এখন ভীষণ কষ্ট হয়, অস্পষ্ট শোনায় বাক্যগুলো।
দরজা খোলার মৃদু শব্দে ছামাদ আলী ধীর গতিতে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন। ভদ্রলোকের নিস্প্রভ চোখে একরাশ প্রশ্ন, মুখ দিয়ে অস্পষ্ট ভাঙা ভাঙা স্বরে বলতে চাইলেন, “বাইরে কী হইছে আম্মা?”
মৌটুসী হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে বাবার রুক্ষ চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “তেমন কিছু না আব্বা। ভাবি আর আম্মার মাঝে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে আরকি। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না তো।”
ছামাদ আলী অসহায় দৃষ্টিতে মেয়ের পানে তাকিয়ে। মৌটুসী জিজ্ঞেস করল,
“ক্ষুধা লেগেছে আব্বা তোমার? আমি আম্মাকে বলে দিচ্ছি, তোমাকে খাইয়ে দেবে। আমাকে আবার দোকানে যেতে হবে।”
ছামাদ আলী মাথা নাড়িয়ে বুঝালেন ক্ষুধা লাগেনি তার। মৌটুসী বলল,
“আচ্ছা তাহলে একটু পরেই খেয়ো। আম্মা ফাঁকা হলে খাইয়ে দিবে। আমি আসি।”
মৌটুসী চলে গেলেও লালবানু বেগম একই জায়গায় ঠাই বসে রইলেন। দৃষ্টি কোনো এক দিকে স্থির ওনার। চড়ুই উঠে গিয়ে ওয়ারড্রবের নিচের ড্রয়ার খুলে একটা ট্রাউজার আর ফুল হাতের গেঞ্জি বের করে নানির কাছে এসে মিষ্টি করে বলল,
“নানিমনি চলো গোসল করব।”
লালবানু বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল-গলার ঘামটুকু মুছে চড়ুইকে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চললেন।
একতলা এই বাড়িটি ইটের দেয়াল বিশিষ্ট হলেও ওপরে টিন, মেঝে প্লাস্টার। তিনদিক ঘিরে চার রুমের মাঝে চারকোনা একটা ইট বিছানো আঙিনা। এক পাশে আধপাকা একটা রান্নাঘর, পাশেই একটা বড়সড় ওয়াশরুম। অন্য পাশটায় বাড়ির মূল দরজা।
মৌটুসীর এক বড় ভাই আছে, নাম রবিন। রবিনের আর মেহেরুনের ঘরে ছয়-সাত বছরের এক ছেলেও আছে, নাম মাসুম। বউ বাচ্চা নিয়ে এই বাড়িতেই থাকে রবিন। তবে হাঁড়ি আলাদা তাদের। একই ছাদের নিচে থাকলেও শাশুড়ি-বৌমা একে অপরের সাথে কথা বলেন না। শাশুড়িকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে চলে মেহেরুন। প্রায়ই গৃহস্থালির এটা-ওটা নিয়ে ঝগড়াবিবাদ লেগেই থাকে তাদের মাঝে। জবেদা বেগমও আবার একটু একরোখা, চুপ থেকে পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে পারেন না। কথায় আছে বউ গরম হলে শাশুড়িকে একটু নরম হতে হয়। কিন্তু উভয় পক্ষই যখন গরম তখন সেখানে আগুন তো লাগবেই!
”ফুপুমনি……”
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সোফার ওপর আশাকে দেখে দরজা থেকেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেদিকে ছুট লাগাল বীর।
আশাও হাসিমুখে ভাইপোর দিকে হাত বাড়িয়ে। কাছে আসতেই কোলে তুলে বসিয়ে নিল তাকে। গালে-মুখে আদর দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,
“আমার বীর সোনা! স্কুলে গিয়েছিলে বাবা?”
”হ্যাঁ, আমি এখন বলো হয়ে গেছি ফুপুমনি, এখন স্কুলে যাই আমি।”
আশা মুচকি হেসে বীরের ফর্সা আদুরে গাল টেনে দিল।
বোরাক শিকদারও এগিয়ে এল তাদের দিকে। আশার পাশে বসে টিভি দেখতে থাকা দেড় বছরের ভুবনের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হাসান ভাই আসে নি?”
”না ভাইয়া, কয়দিন খুব ব্যাস্ত ও। একেবারে এসে নিয়ে যাবে।”
”আচ্ছা, কী খাবি খালাকে রান্না করতে বলিস। আর কিছু লাগলে সাফওয়ানকে বাজারে পাঠাবি।”
”আচ্ছা, সমস্যা নেই। আমি ম্যানেজ করে নিব।”
”আরোয়া এখনো ফিরে নি?”
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল বোরাক।
”না, আজকে দুটোর দিকে ক্লাস শেষ হবে বলল।”
বীর ফুপুমনির বুকে মুখ লুকিয়ে আরাম করে বসে আছে। আনমনে কামিজের সামনের বোতাম খুঁটতে খুঁটতে মলিন মুখে বলল,
“ফুপুমনি তুমি আল ঢাকা যেও না। তুমি চলে গেলে আমাল ভালো লাগে না।”
”কেন সোনা? পাপা, আরোয়া ফুপি, সাফওয়ান চাচ্চু, খালামনিরা সবাই তো আছে!”
”পাপা তো সালাদিন অফিসেই থাকে। খালামনিলা সবাই শুধু কাজ আর লান্নাই করে। আলোয়া ফুপি সবসময় ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে। দাদুনও তো আর আসে না। শুধু সাফান চাচ্চু একটু খেলে, কিন্তু সবসময় না।”
বীরের এই সরল স্বীকারোক্তিতে ওর ছোট্ট মনের একরাশ বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। অথচ সেই ভারী ভারী কথাগুলো কী অবলীলায় না বলে দিল বাচ্চাটা! এই বিশাল শিকদার ম্যানশন, এত এত আভিজাত্য, অথচ সেই বাড়ির মধ্যমণি নিঃসঙ্গতায় কাতর! তাকে একটু আদুরে আগলে রাখার কেউ নেই। আশা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল বীরের মলিন মুখপানে। কী বলবে সে? খানিক বাদে বীরকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল আশা। কিন্তু এবারও কিছু বলতে পারল না।
বীর নিজেই আবার বলে উঠল, “তুমি আল চলে যেও না ফুপুমনি!”
আশা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এছাড়া তার আর কী-ই বা করার আছে? তার নিজেরও তো সংসার আছে। স্বামী আছে, সন্তান আছে। তাদের ছেড়ে এখানে পড়ে থাকা সম্ভব নয় তার পক্ষেও। তবুও অন্তত বর্তমান সময়টুকু বীরকে খুশি করতে বা রাখতে বলল,
”আচ্ছা বাবা, যাব না।”
মিথ্যা এই আশ্বাসটুকু বীর সত্যি ভেবে বসল। তার মলিন চোখ-মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল মুহূর্তেই। “বীল লাভস ইউ ফুপুমনি!”
”মি টু সোনা বাবা।”
ছোট্ট ভুবন অনেকক্ষণ যাবৎ তার মায়ের কোলে বসে আদর নিতে বীরকে দেখে এবার ধৈর্যহারা হয়ে পড়ল। মুখ দিয়ে আধো আধো বুলি কেটে বীরকে ধমকে নামতে বলছে সে। সাথে ছোট ছোট আঙুলের আক্রমণ তো আছেই। আশা ছেলেকেও একহাতে আগলে নিল। বীর মুখ কুঁচকে বলল,
“ভুবন পঁচা ফুপুমনি। ওকে লাখব না। ফোপাল সাথে ঢাকা পাঠিয়ে দিব। আল তোমাকে আমাল কাছে লেখে দেব”
আশা হেসে বলল,
“আচ্ছা? কিন্তু ভাই তো এখনো অনেক ছোট, মাকে ছেড়ে একা ঢাকা থাকবে কীভাবে?”
”কেন? গলুল মিল্কি খাবে আল থাকবে!”
এর মধ্যেই বোরাক হাতে একটা ফাইল নিয়ে নেমে এল।
“আশা বীরকে একটু গোসলটা করিয়ে দে।”
আশা ভাইকে আবার বেরিয়ে যেতে দেখে বলল,
“ভাইয়া খেয়ে যাও একেবারে। দুপুর তো হয়েই গেছে।”
”বাইরে খেয়ে নেব আমি। তোরা খেয়ে নিস।”
বোরাক চলে গেলে আশা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে ভুবনকে কোলে নিয়ে বীরের হাত ধরে বলল,
”চলো বীর, গোসল করতে হবে।”
গোসলের কথা শুনেই হাত গুটিয়ে ফেলল বীর। মুখ কুঁচকে বলল,
মৌটুসী পর্ব ২
“গোসল দিতে শীত লাগে ফুপুমনি।”
”শীত লাগবে না বাবা। গিজার ছেড়ে গরম পানি দিয়ে গোসল করব আমরা!”
”তাও লাগে। কাপল খুললেই শীত লাগে।”
”একটু লাগলে কিছু হবে না সোনা। দেখো, ভুবন ভাইও গোসল করবে। একসাথে করবে চলো। অনেক মজা মজা হবে।”
