Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ২০

যাত্রাপথ পর্ব ২০

যাত্রাপথ পর্ব ২০
মাশফিত্রা মিমুই

রাতের আঁধার কেটে ধরণীতে ফিরেছে সূর্যের সফেদ আলো। বেলা বাড়ার পূর্বেই গৃহস্থালির সমস্ত কাজ শেষ করে দুপুরের রান্নার আয়োজনে লেগে পড়েছে বাড়ির গৃহিণীরা। আকবর মিয়া এবং নাজিরের পাশাপাশি যেই ফসলি জমি রয়েছে, সেখানেই বসেছে দুই পরিবারের ছোটখাটো এক বৈঠক।
শাহ বাড়ির মাত্র তিনজন সেখানে উপস্থিত। আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ আর সামিউল শাহ। বাকি ছেলেদেরকে এ ধরণের কোনো বৈঠকে জোরপূর্বক উপস্থিত রাখার প্রয়োজন মনে করেন না তারা।

মাস্টার বাড়ি থেকে এসেছে আকবর মিয়া, নজরুল আলম, কাশেম আলী আর তালেব। মাসুম, রুহুল, সুজন এই সম্বন্ধে রাজি না থাকায় আসেনি। মাস্টার বাড়ির ভেতরে প্রবেশে অনিচ্ছুক থাকায় দুই পরিবারের সুবিধার্থে এই বৈঠক আমিরুল শাহ নিজেই এখানে ডেকেছেন। তাই তিনিই নীরবতা ভেঙে কিছুটা কটাক্ষ করে বললেন,“শেষ পর্যন্ত আমার ভাতিজারে কানপড়া দিয়াই ছাড়লেন? এই দুনিয়াত কী পোলা মাইনষের আকাল পড়ছিল? আমগো বাড়িই ক্যান? একটুও কী ডর নাই?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আকবর মিয়ার গম্ভীর মুখখানায় একছটা হাসি ফুটে উঠলো। বুক সমান সাদা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে নরম স্বরে বললেন,“ডর আমার বাপেরই আছিলো না। হের পোলা হইয়া আমার কেমনে থাকবো? আমার পোলা, নাতিনগোও এই শিক্ষা দিয়াই বড়ো করছি। আল্লাহ ছাড়া কাউরে ডরাবি না।”
“চাপার জোর এহনো কমে নাই দেহি! তা আমার ওই অকেজো ভাইয়ের পোলার পিছে লাগছেন ক্যান? এত দরদ একুশ বছর আগে কই আছিলো?”
“সেই প্রশ্ন তো আমারো। এতকাল কই আছিলো দরদ? অযথা কথা বাড়াইস না। মনে রাখিস, ময়লা ঘাঁটলে নিজের হাতই নষ্ট হয়। তাই আসল কথায় আয়।”
“আমরা কেউ আমনেগো লগে সম্পর্কে রাজি না।”
“নাজিরের বাপ বাইচ্চা থাকতে তোরা রাজি হওয়া না হওয়ার কেডা? তাছাড়া নাজির রাজি। রাজি না হইলে তো আর তগো পাঠাইতো না।”

“ওয় পোলাপাইন মানুষ। বয়স অল্প। আমনের মতো চতুর মাইনষের কু মন্ত্রনায় হয়তো না বুইঝাই হ কইয়া দিছে।”
“পোলাপাইন মানুষ? বয়স অল্প? তা ওই অল্প বয়সী পোলারে দিয়া এত খাটাখাটুনি করাস কেমনে? মায়া লাগে না? ইশকুলে বই-খাতা লইয়া দৌড়ানোর বয়সে ক্ষেতে হাল চইষা বেড়াইছে। তহন দরদ কই আছিলো? এক গেরামের হওয়ায় কোনো কিছুই দৃষ্টির আড়াল হয় নাই। তাই কথাবার্তা একটু বুইঝা হুইনা কইস।”
আমিরুল শাহর কণ্ঠস্বর রোধ হলো। বলার মতো আর কোনো যুক্তিসংগত কথাই খুঁজে পেলেন না। মুমিনুল শাহ বড়ো ভাইকে নীরব হয়ে যেতে দেখে নিজেই বলে উঠলেন,“আমরা এই বিয়ায় রাজি না। নাজিরের লগে দেখা হইলে না কইরা দিয়েন।”

“তোরা করোস না ক্যান?”
“আমগো সব কথা কী আর ওয় হুনে নাকি?”
“তাইলে আমগো কথা হুনবো ভাবলি কেমনে? পরে যদি গন্ডগোল বাঁধায়? চিনোস না ওই ঘাউড়ারে?”
চিন্তায় পড়লেন দুই ভাই। কথা ভুল নয়। একবার মুখ থেকে যা বের হয় নাজির তা করেই ছাড়ে। মাঝপথে বুড়োর মত বদলালে বাড়ি থেকে মেয়ে তুলে আনতেও দু’বার ভাববে না। এই ছেলের মতিগতির ঠিক নেই। পূর্বেও এমন কাজ সে করেছে।
দশম শ্রেণীতে থাকতে শাহরিয়ারের একবার এক মেয়েকে ভীষণ পছন্দ হওয়ায় নাজিরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে বলেছিল, মেয়েটাকে ছাড়া নাকি সে থাকতে পারবে না। তার কয়েকদিন পরেই সেই মেয়েকে কোথা থেকে যেন নাজির ধরে আনে বাড়িতে। শাহরিয়ারের তখন মনের বদল ঘটেছে। মন বসেছে পাশের গ্ৰামের আরেক মেয়ের উপর। তার জন্য কি মারটাই না ছেলেটাকে সে মেরেছিল! পুরুষ মানুষের মন বদল হবে কেন? ভালোবাসা কী এতটাই সস্তা?

ভাগ্যিস সামিউল আর নাজমুল তখন বাড়িতে ছিল! নইলে ওই ছেলেকে সেদিনই সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাতে হতো। শেষে বাধ্য হয়ে মেয়ের বাবার সাথে শাহ বাড়ির দুই কর্তা আপোষে বসে অর্থের বিনিময়ে ঝামেলার মিমাংসা করেছিলেন।
কাশেম আলী বললেন,“বিয়ার দিন তারিখ তবে ঠিক করা হোক। তোরা ঠিক করবি? নাকি আমরাই করমু?”
উত্তর দিলেন না দুজনে। তাই আকবর মিয়াই বললেন, “কয়দিন ধইরা যেই বৃষ্টি হইতাছে! এহন যদি বিয়ার আয়োজন করি তাইলে দেহা যাইবো বিয়া পড়ানের আগে বৃষ্টি নামছে। তগো জানামতে ভালা কোনো দিন আছে রে, নজরুল?”

নজরুল আলম দুদিকে মাথা নাড়ালেন অর্থাৎ তিনি জানেন না। তাই কাশেম আলী বললো,“কয়দিন পর শ্রাবণ মাস শুরু হইবো। রেডিওতে হুনছি প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টি বাদলের আশংকা কম।”
“তাইলে শুভ কাজে দেরি করমু না। পহেলা শ্রাবণেই বিয়ার দিন তারিখ ঠিক করলাম। চিন্তা করিস না শাহর ব্যাটা। আকবর মিয়া তার নাতিনের লগে সংসার করার লাইগা যা যা লাগে সব পাঠাইবো।”
দুই ভাই আর কিছু বললেন না। মাথা নাড়িয়ে কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে চলে গেলেন বাড়ির দিকে।
নাজিরের মাথা থেকে বিয়ের ভূত নামাতে গতরাতে আমিরুল শাহ ছোটো ভাইয়ের ঘর অবধিও গিয়েছিলেন। সুবহান আলী শাহ তখন সবসময়কার মতো বিছানায় শোয়া। রাতের খাবার খাইয়ে নাজির গিয়েছে মাছ ধরতে। এটাই তার অবসর সময়ের শখ।

বড়ো ভাইকে অসময়ে দেখে ভদ্রলোক ভারি আশ্চর্য হলেন। বহু বছর ধরে একে অপরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে। কোনো কারণ বা প্রয়োজন ছাড়া তাঁর খবরও কেউ নেয় না। সেখানে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষ এলো ঘরে! বড়োই অবাক করা কান্ড। চোখেমুখে আতঙ্ক নিয়েই তিনি শুয়ে রইলেন। আমিরুল শাহ হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছোস, সুবহান? শরীর ভালা?”

মুখ দিয়ে কীসব শব্দ করলেন লোকটা। আমিরুল শাহ সেসব বুঝলেন না। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন ভাইকে। যৌবনকালে লোকটা বেঁটে ছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে উচ্চতা যেন কমেছে আরো। মাথায় বিশাল এক টাক পড়েছে। যদিও আমিরুল শাহর মাথায়ও টাক রয়েছে তবে ছোটো ভাইয়ের মতো এতটা নয়। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে, পায়ে পঁচনও ধরেছে। চোখের নিচে জমেছে নিদ্রাহীন রাত্রির স্বাক্ষী স্বরূপ গাঢ় কালচে দাগ। তা দেখে আচমকাই ভাইয়ের জন্য কষ্ট জাগলো আমিরুল শাহর মনে। যতোই হোক, একই মায়ের পেটের আপন ভাই তো! মনে মনে রবের কাছে অসুস্থ ভাইয়ের মৃত্যু কামনা করলেন। আর কতকাল চার দেয়ালের ভেতরে একটি বিছানায় পঙ্গুত্ব নিয়ে শুয়ে থেকে এভাবে কষ্টে তড়পাবে সে? এর থেকে বরং মৃত্যুই শ্রেয়। পৃথিবী তো তাঁর মতো ক্ষমতাশালী, চতুর, সবল লোকেদের জন্যই। সেখানে সুবহান আলী শাহদের কোনো মূল্য আছে নাকি?

নীরবতা ভেঙে দ্রুত কথা সেরে ফেলতে চাইলেন। এই ঘরে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। দমবন্ধ লাগছে। হালকা কেশে বললেন,“তোর বড়ো পোলায় একেবারে তোর বিপরীত স্বভাবের হইছে। পয়দা করছোস তুই অথচ হইছে একেবারে আমার মতন জাউড়া। তুই তো জানোসই, জাউড়ারা কেমন হয়? পোলারে একটু বুঝা। জীবনে বাপের কোনো দায়িত্বই তো পালন করতে পারলি না। এইবার কর। ওরে কাশেমের মাইয়ারে বিয়া করার চিন্তা মাথা থাইক্যা ঝাইড়া ফেলতে ক। মাস্টর বাড়ির লগে শাহ গো সম্পর্ক কী আর ঠিক হওয়ার মতো? আমি জানি, নাজির তোর কথা হুনবো। একটু বুঝাইস ওরে।”

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করে বললেন, “জোয়ান কালের ভুল খুব খারাপ জিনিস। সারাজীবন ভোগায়।”
সুবহান আলী শাহ উত্তেজিত হয়ে গেলেন। মুখ থেকে ঝরতে লাগলো লালা। কণ্ঠস্বর থেকে নিঃসৃত শব্দের তেজও ক্রমশ বেড়েই চললো। অথচ সেসবে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না আমিরুল শাহ। অগুরুত্বপূর্ণ মানুষের অস্পষ্ট ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে লাভ কী? চলে এলেন নিজের দালানে।

ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি যেন নিশ্চিতই ছিলেন, এই বিয়ের কথা আর এগোবে না। ছোটো ভাই ঠিক বুঝিয়ে নেবে নাজিরকে। বাবার কথা কী আর নাজির ফেলতে পারবে? অথচ তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
সুবহান আলী শাহ কী তবে কিছু বলেনি?নাকি নাজিরই কথা শোনেনি? একবার ভাবলেন, আবার যাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলালেন। নাজির জানলে বিপদ হবে। বড়ো ধরণের ঝামেলা বাঁধাবে ছেলেটা। তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সামিউল অবশ্য পিতার কানে ফিসফিস করে বললো, “এত চিন্তা কীয়ের, আব্বা? মাইয়া আইবো আমগো বাড়ি। হেরা কিচ্ছু করতে পারবো না। নাজিররে চিনেন না? এমনি এমনি রাজি হওয়ার পোলা ওয় না। নিশ্চয়ই শয়তানী কোনো মতলব আছে। এতে আমগো লাভই হইবো। ইশারায় মানুষ নাচাইতে ওয় ভালা জানে।”
পুত্রের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলেন লোকটা। স্ত্রীকে ডেকে জানালেন সমস্ত কথা। বিয়ের আয়োজন করতে হবে। কতদিন পর আবার শাহ বাড়িতে বিয়ের উৎসব! নওশাদের বিয়েটা তো নামমাত্রই শুধু হয়েছে।

বাড়িতে চাপা উৎসবমুখর পরিবেশ। অবশেষে বিবাহ যোগ্য শেষ কন্যারও ক’দিন বাদেই বিয়ে। বিয়ে, পাত্র সম্পর্কে জানার পর থেকেই একনাগাড়ে কান্না করছে মিছরি। মায়ের আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো,“এই বিয়ে আমি করবো না, মা। আব্বাকে তুমি বুঝাও। ও মা!”
পারুল অসহায় মুখে বসে আছেন। শুনছেন মেয়ের আকুতি ভরা কান্নার শব্দ। অথচ কিছুই করার নেই তাঁর। বিয়েতে তিনিও রাজি নন। বহুদিন ধরেই তাঁর ইচ্ছে ছিল ভাগ্নের হাতেই মেয়েকে সঁপে দেওয়ার। কিন্তু শ্বশুর, স্বামী যে কী শুরু করল! স্বামীকে বলার পর তিনি বললেন,“আব্বার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। আব্বা বুইঝা হুইনাই এই বিয়া ঠিক করছে। তাই তুমি চুপ থাকো। মায়ের দায়িত্ব তো কোনোকালেই ঠিকমতো পালন করতে পারলা না।”
তারপর আর পারুলের বলার মতো কিছুই থাকে না। স্বামী বদমেজাজি লোক। সব রাগ শুধু বদ্ধ ঘরে স্ত্রীর উপরে এসেই ফলান। মুখের উপর কথা বললে গায়ে হাত তোলেন। যৌবনে একবার শ্বশুরের কাছে এ নিয়ে নালিশ করায় শ্বশুর রেগে গিয়েছিলেন ভীষণ। তখনি ছেলেকে সামনে দাঁড় করিয়ে গাল বরাবর দিয়েছিলেন থাপ্পড়। বাধ্য করেছিলেন স্ত্রীর কাছে মাপ চাইতে। সেই ঘটনার পর থেকে তেমন একটা স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেননি তিনি। মুখ দিয়েই যত গালি দেওয়া।

সস্নেহে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পারুল বললেন,“কান্দে না, মা। তোর আব্বায় তোরে অনেক ভালোবাসে। কহনো তোর খারাপ হইবো এমন কিছুই করে নাই। এইবারও করবো না। তুই খুব সুখী হইবি।”
“আমি ওই বদ লোককে কিছুতেই বিয়ে করবো না। ওই লোক ভালো না। ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে একবার ঝগড়া করেছিল। মারার হুমকিও দিয়েছিল। করবো না বিয়ে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন পারুল। মৌন হয়ে ভাবতে বসলেন। দরজায় টোকা পড়ল তখনি। বাইরে থেকে ভেসে এলো অনুমতি চেয়ে প্রশ্ন,“ভিতরে আইমু?”
মিছরি মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে বসলো। কণ্ঠস্বর শুনে বুঝে গেলো, বাবা এসেছে। পারুল সিঁথি পর্যন্ত ঘোমটা টেনে উঠে দাঁড়ালেন। যেতে যেতে বললেন,“হ আইয়েন।”

অনুমতি পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন কাশেম আলী। অধরে মৃদু হাসি। পারুল চলে গেলেন। বাপ, মেয়ের কথার মধ্যে থাকা তাঁর নিষেধ। কাশেম আলী বিছানায় এসে বসলেন। কিছু সময় মেয়ের ফোলা মুখখানায় চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,“কানছেন ক্যান, আম্মা? সবাইরে ছাইড়া শ্বশুরবাড়ি যাইতে হইবো বইলা দুঃখ লাগতাছে?” প্রশ্ন করে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিলেন না। নিজেই ফের বললেন, “চিন্তা নাই, আম্মা। আমনের শ্বশুরবাড়ি খুব কাছে, ওই যে ওই পশ্চিমপাড়ায়। যাইতে আইতে বেশি সময় লাগে না। এই ধরেন পাঁচ, দশ মিনিট।”
ডুকরে কেঁদে উঠলো মিছরি। মেয়ের কান্না সহ্য হয় না লোকটার। হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধার নেমে এলো। বিচলিত হয়ে বললেন,“কী হইছে, আম্মা? আবার কান্দেন ক্যান?”

“আব্বা, আমি বিয়ে করবো না।”
“ধুর, বলদ মাইয়া। বিয়া করবেন না ক্যান? সবাইরেই করতে হয়। দেহেন না, ফাহমিদারও বিয়া হইছে। সেও শুরুতে করতে চায় নাই। কিন্তু এহন সে অনেক সুখী। আমনেও সুখী হইবেন। জামাই যদি কিছু কয় লগে লগে আমার কাছে আইয়া কইবেন। আমনের ভাইগো লইয়া গিয়া ডর দেখাইয়া আইমু।”
শেষ কথাটা বলেই শব্দ করে হেসে উঠলেন তিনি। কান্না থামিয়ে মিছরি হা করে দেখলো সেই হাসি। বাবা রাগী হলেও তার সামনে প্রাণখোলা মানুষ। জীবনেও একটা ধমক পর্যন্ত দেয়নি। বুঝে গেলো, তার মতামতের ধার ধারে না কেউ। এই বিয়ে হবেই। যেভাবে হয়েছিল ফাহমিদার!
সৈয়দুন নেছা পুত্রবধূকে নিয়ে ঘরে এলেন। নাতনির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,“হায় আল্লাহ! আমার নাতনির তো দেহি নাক ফোঁড়ানিই হয় নাই। ওর নাক ফোঁড়াইয়া দেও। কয়দিন পর বিয়া, লোকে কী কইবো? শুকাইতেও তো একটু সময় লাগবো।”

মিছরি বাবার পেছনে লুকালো। চিৎকার করে বললো, “আমার ভয় লাগে। আমি নাক ফোঁড়াবো না। কিছুতেই না।”
মেয়ের আর্তনাদে কাশেম আলী বাঁধা দিলেন,“থাউক, আম্মা। এই লইয়া আর জোরাজুরি কইরেন না। বিয়ার আয়োজন করেন।”
যদিও নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির সব মেয়েদেরই অল্প বয়সেই নাক ফুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু মিছরির বেলাতেই হয়নি। তখন কি কান্না তার! শেষে বাবাও মেয়ের কান্না দেখে বলেছিলেন,’এহন থাউক। বড়ো হওয়ার পর দেহা যাইবো।’ অথচ বড়ো হওয়ার পরেও মেয়ের ভয় আর কমেনি।

বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হতেই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শুরু হয়ে গিয়েছে। তৈরি হয়ে আধ ঘণ্টা সড়কে টেম্পুর জন্য দাঁড়িয়ে থেকে জেলা শহরের একটি আসবাবের দোকানে এসে পৌঁছেছে নাজির। সবসময়কার মতো মিল্টন তার সঙ্গী। পারভেজও অবশ্য চাচাতো ভাইয়ের পিছুপিছুই এসেছে‌। দোকানির সঙ্গে কথা বলে সেগুন কাঠের একটি আলমারি আর শোকেস তৈরির বায়না দিয়ে বেরিয়ে এলো নাজিরসহ বাকিরা।
চারিদিকে দুপুরের রোদের আলো ঝলমল করছে। তাপ একটু বেশিই। মিল্টন গোমড়া মুখে বললো, “শেষমেশ আমনেও বিয়া কইরা ফেলবেন, ভাইজান?”

“ক্যান, তুই খুশি না?”
“খুশি তো হওয়ার কথা কিন্তু হইতে পারতাছি না। এত মাইয়া থাকতে মাস্টর বাড়ির মাইয়াই ক্যান, ভাইজান? ওরা তো আমগো শত্রু। তালেব, মাসুমের বোইনরে আমি ভাবি হিসাবে মানতে পারমু না আগেই কইয়া দিলাম।”
“ভাবি না মানতে পারলে চাচী কইয়া ডাকিস।”
“কী যে কন না, ভাইজান! আমনে আমার ভাইজান হইলে আমনের বউরে আমি চাচী কইয়া কেমনে ডাকমু?”
“তুই তো ভাবি হিসাবে মানতেই পারবি না। না মানতে পারলে এইডাই শেষ উপায়।”
পারভেজ বললো,“আমারে জ্ঞান দিয়া এহন নিজে শত্রু বাড়ির মাইয়া বিয়া করবি? লজ্জা নাই?”
“আমি কী তোর মতো বাপের পোষা কুত্তা, বলদ? নাকি বেকার? আমি রোজগার কইরা বাপ চালাই, ভাই চালাই, আরো মাইনষের সংসার চালাই। মুখের উপরে জবাব দিতে পারি। তোর বাপ রাজি না তারপরেও দেখ তাগো দিয়াই বিয়া ঠিক করাইয়া আইছি। তুই পারতি? এক চটকানা খাইয়াই তো কয় সপ্তাহ জানি পলাইয়া আছিলি। নির্লজ্জ।”
“তোর বাপরে বোবা, পঙ্গু বানাইয়া দিছে। দাদারে খুন করছে। তারপরেও?”

“তোর বাপ, ভাই আর চাচা মিল্যা আমার বাপের লগে বাটপারি কইরা জমি খাইছে, আমারে ব্যবসার একটা ট্যাহাও দেয় নাই। ছুডো থাইক্যা কত কষ্ট করছি। সেসব দেহোস নাই, গোলামের পুত? এহন তোর বাপের লগে আমার কী করা উচিত? কইলজা বাহির কইরা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু নাকি থানায় যামু?”
“নিষেধ করছে কেডায়? কিছু করোস নাই ক্যান?”
“পরে তো তোমরা ভাইয়েরা আইয়া আমারে ঘুমের ঘোরে কুপাইয়া মারবা। সাথে আবার তোমগো কুলাঙ্গার এক দুলাভাইও আছে। হালারে সহ্য হয় না।”
“আমি এমন না। আমার বাপ, ভাইরাও এমন না।”
“হ, তোমরা আমার হাউ**।”
“মুখ ভালা কর, ভাই।”
“তগো থুতমা দেখলেই আর ভালা করতে পারি না।”
“থুতমা আবার কোন দেশের ভাষা, ভাইজান?” মিল্টন জিজ্ঞেস করল।
“আমার নানা শ্বশুরের দেশের।”

বুঝতে পারলো না মিল্টন। হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর বুঝতে পেরেই শব্দ করে হাসলো। মিল্টন পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“নওশাদ ভাই বিয়াত আইবো না? সংবাদ পাঠাইলেন না তো, ভাইজান।”
“পাঠামু না। ওয় কী আমারে ওর বিয়াত দাওয়াত দিছিলো? আমিও দিমু না। একেবারে বিয়া কইরা বউ ঘরে তুইলা ছবিসহ চিঠি পাঠামু।”
ভারি মজা পেলো মিল্টন। পারভেজ ভোঁতা মুখে বললো,“ছুডো চাচায় আব্বাসের হাত দিয়া চিঠি পাঠাইয়া দিছে।”
নাজির ভ্রু কুঁচকালো,“হেরে মাতব্বরি করতে কইছে কেডায়?”
“আব্বায়।”

যাত্রাপথ পর্ব ১৯

“এর লাইগাই তোর বাপরে আমার সহ্য হয় না। ফতেহ আলী শাহ একটা বাইন্সুদ পয়দা করছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল পারভেজ। তার আসাটাই বোধহয় ভুল হয়েছে আজ। নাজিরের সাথে কথা বলা মানেই তার বাপ তুলে গালি দেওয়া। অবশ্য এই ঘাড়ত্যাড়া সেই গালি সামনাসামনিও দেয়। বিপরীতে আমিরুল শাহ কিছু বলতে পারেন না। হা করে তাকিয়ে থাকেন মুখের দিকে। রাগতে রাগতে নাজির হাওয়া। একটা হোটেল দেখে নাজির বললো,“ক্ষুধা লাগছে। চল খাইয়া আসি। এরপর বিয়ার শাড়ি আর পাঞ্জাবি কিনতে যামু। ধুর, বিয়া মানেই খরচ আর খরচ। এর থাইক্যা আক্কাসের নাতিনরে লইয়া পলাইয়া গেলেই ভালা হইতো। ট্যাহা পয়সা বাঁচতো। সব তোর বাপের থাইক্যা উসুল করমু রে, পারভেজ।”
পারভেজ চুপ রইলো। তার বাপের ভাগ্য দেখে ঘনঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

যাত্রাপথ পর্ব ২১