যাত্রাপথ পর্ব ২২
মাশফিত্রা মিমুই
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। শোনা যাচ্ছে বদ্ধ খোপ থেকে গৃহস্থ বাড়ির মোরগের ডাক আর খাবারের সন্ধানে বের হওয়া পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। বসার ঘরে বাপ, চাচা আর দাদার সামনে এক কোণে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে মাসুম। ভেতর থেকে ভেসে আসছে মেয়েলি কান্নার শব্দ। আহাজারি করে বলছে,“ভাইজানের কোনো দোষ নেই, তোমরা বকো না তাকে।”
বোনের কান্নায় মাসুমের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। দাদা আকবর মিয়া লাঠিতে শব্দ তুলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“এইডা কী তুমি ঠিক কাজ করতাছিলা? ছুডোরা বড়ো গো থাইক্যা শিখে। আর তুমি বড়ো হইয়া ছুডো বোইনরে কিনা পলানো শিখাইতাছিলা?”
“মুক্তির পথ দেখাইতাছিলাম। বড়ো ভাই হিসাবে এইডা আমার দায়িত্ব।”
“ক্যান, আমরা কী তোমার বোইনরে আগুনে ফালাইয়া দিতাছি?”
“কোনো সন্দেহ?”
“মাসুম! দাদার লগে তর্ক করার সাহস পাইছোস কই থাইক্যা? জিহ্বা কিন্তু ছিঁড়া দিমু।” পিতা কাশেম আলী ছেলের ঝটপট জবাব দেখে গর্জে উঠলেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাসুম এখনো নির্বিকার। চোখেমুখে অপরাধবোধের ছিটেফোঁটা পর্যন্ত নেই। শেষ রাতেই বোনকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু বেশিদূর আর যেতে পারেনি। জিন্নত আলী লোকটা বয়স্ক হলেও তাঁর চোখ, কান এখনো যৌবনের মতো তীক্ষ্ণ। ঠিক শুনে ফেলল মানুষের হাঁটাচলা আর ফটকের দরজা খোলার শব্দ। তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি।মূল ফটক পর্যন্ত যেতেই দেখে ফেললেন তাদের। তারপর দৌড়ে এসে জাগিয়ে তুললেন বাকিদের। বাপ, চাচা তখনি গিয়ে হাতেনাতে দুই ভাই-বোনকে ধরে ফেলল। মিছরিকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে এলো বাড়ি। মিছরি আসা মানেই তো তার পিছুপিছু এমনিতেই চলে আসবে মাসুমও। ভাইরা যে তার উপর রেগে নেই তা নিশ্চিত। তাই তো বাপ, চাচাদের সাথে এবার আর তারা যায়নি দুজনকে আটকাতে।
আকবর মিয়া হাত উঁচিয়ে ইশারায় ছেলেকে থামিয়ে দিলেন। নাতির উদ্দেশ্যে বললেন,“এই কথা ক্যান মনে হইলো? তোমার বোইন কী আমার পর?”
“পর নাকি আপন হেইডা তো আমনেই জানেন। রক্তের সম্পর্ক হইলেই সবাই আপন হইয়া যায় না। আমনে ওর বিয়া ক্যান নাজিরের লগে ঠিক করবেন? ওর লগে যে আমগো মিছরি সুখী হইবো তার কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবেন? তাইলে পারভেজ শাহর লগে সম্পর্ক জানার পরেও ক্যান ফাহমিদার বিয়া অন্য জায়গায় দিলেন?”
“আস্তে কথা ক, মাসুম। বাড়িত আত্মীয়-স্বজন দিয়া ভরা।” নজরুল আলম শাসিয়ে বললেন।
আকবর মিয়া বললেন,“পারভেজ শাহ আর নাজির শাহ এক না। ওরা এক বংশের হইলেও মানুষ ভিন্ন, বাপ ভিন্ন, পরিণতিও ভিন্ন। আর সুখ, দুঃখ হইলো আল্লাহর নেয়ামত। তোমার বোইনরে যে অন্য কেউর লগে বিয়া দিলেই সুখী হইবো তার কী গ্যারান্টি আছে?”
পূর্বের মতো তৎক্ষণাৎ উত্তর দেওয়ার মতো যৌক্তিক কিছু খুঁজে পেলো না মাসুম। তাই নীরব রইলো কিছুক্ষণ। বললো,“নাজির মোটেও ভালা না। মুখে লাগাম নাই। বয়সেও মিছরির থাইক্যা কত্ত বড়ো। ওয় কেমনে মানাইয়া নিবো? তার মধ্যে ছুডো বেলাত্তে হেগো লগে আমগো শত্রুতা দেইখা আইতাছি। ওরাই কী মাইনা নিবো? মনে যে খারাপ কিছু নাই বুঝবেন কেমনে?”
“বিয়া হইলো আল্লাহর তরফ থাইক্যা, মাসুম। আরো কত মাইনষের এর থাইক্যাও অধিক বয়সের পার্থক্যে বিয়া হইতাছে। এক কথা কয়দিন কমু? ভুইল্যা যাইয়ো না, এক গেরামে বাড়ি। আমি থাকি আর না থাকি এই বোইন পিরিতি সারাডা জীবন দিলে রাইখো। এহন ঘরে যাও।”
সবার অগোচরে হওয়া বৈঠক শেষ করে নিজেই সবার আগে প্রস্থান করলেন আকবর মিয়া। মাসুমের কথা এবারেও অগুরুত্বপূর্ণ হয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। আর না মাসুম বুঝলো দাদার কথা।
যার জন্য মনে একবার খারাপ লাগা, ঘৃণার সৃষ্টি হয় তার জন্য হঠাৎ করে কিংবা কোনো যুক্তিতেই ভালো লাগা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। মাসুমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নাজিরের সাথে সর্বদাই তার সাপে, নেউলে সম্পর্ক। জীবনে একবার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল। সেই ছেলেকে প্রিয় বোনের স্বামী রূপে কীভাবে মেনে নেবে সে? কিছুতেই যেন ভাবতে পারছে না। তাই রেগেমেগে ঘরে গিয়ে খিল আঁটলো সে। আজ আর বেরোবেই না।
রঙিন কাগজ আর ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে বিয়ে বাড়ি। গোসল সেরে শেরোয়ানি পরে জামাই সাজে প্রস্তুত নাজির। বাইরে চলছে বরযাত্রী সাজানোর তোড়জোড়। গ্ৰাম এক হওয়ায় গরু বা ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করা হলো না। শুধু দূর গ্ৰাম থেকে আনা হয়েছে পালকি।
নাজির প্রথমেই চলে এলো বাবার ঘরে। দুই হাত মেলে আনন্দিত কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো করে বললো,“আব্বা, আব্বা, কেমন লাগতাছে?”
শুয়ে থাকা সুবহান আলী শাহর মুখশ্রীতে আনন্দ ঝলক দিয়ে উঠলো। মুখ দিয়ে টেনে টেনে অ্যা অ্যা আওয়াজ করলেন। তাঁর হাতের ইশারায় এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো নাজির। মাথা নোয়ালো কিছুটা। সুবহান আলী শাহ কাঁপতে থাকা হাতটা ছেলের মাথায় রাখলেন। ধীরে ধীরে ঠোঁট, জিভ নাড়িয়ে বলার চেষ্টা করলেন,“বা…ক…
“হ, মাস্টার বাড়ির মাইয়ারে বিয়া করতে যাইতাছি। ভালা কইরা দোয়া কইরা দেও দেহি।”
“আ আ…
“যাই তাইলে, ঘুমাও তুমি। বউ নিয়া ফিইরা দেহা করতাছি।”
বাবার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। দরজার সম্মুখে দেখা পেয়ে গেলো নওশাদের। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নওশাদ বললো,“আব্বার কথা তুমি বুঝতে পারো কীভাবে? আমি তো বুঝি না।”
“বুঝার লাইগা কথা কইতে হয়, সময় দিতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয়। তুই কোনোটা নিছোস? নিজ ইচ্ছায় দেহাও তো করোস না।”
খানিকক্ষণ নীরব রইলো নওশাদ। হাঁটতে লাগলো বড়ো ভাইয়ের পিছুপিছু। ধীর কণ্ঠে বললো,“হঠাৎ শত্রু বাড়িতে আত্মীয়তার সম্পর্ক করছো কেন? তুমি তো ওদের ঘৃণা করতে, তাই না?”
“তাতে তোর কী?”
“ওরা আমাদের শত্রু। চাচারাও তো এই বিয়েতে মন থেকে রাজি নয়। তোমার জোরজবরদস্তিতে শুধু রাজি হয়েছে।”
“তাগো মতামতে কী যায় আসে?”
“ওরা আমাদের অভিভাবক।”
“হেগো মতো অভিভাবকের মায়রে বাপ। তোর পিছে কয় ট্যাহা ঢালছে? দায়িত্ব নিছে কহনো? বারো বছর বয়স থাইক্যা কাম করা শুরু করছি। খাওয়াইছি, পড়াইছি আমি। আর অভিভাবক মানে চাচাগো। নিমকহারাম একটা। সর সামনে থাইক্যা। তোরে দেখলেই রাগ উডে।”
“বিয়ের কারণে এখনো রেগে আছো?”
“শুধু বিয়া করছোস নাকি পলাইয়া বিয়া করছোস? তাও এক বেয়াদব মাইয়ারে। তা বউ লইয়া থাকোস কই? শ্বশুরবাড়ি?”
তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো না নওশাদ। পথিমধ্যেই থেমে দাঁড়ালো। কথাগুলো তীরের ফলার মতো গিয়ে বিঁধলো তার বুকে। এগোনোর সাহস পেলো না আর। নাজির পেছন ফিরে তাকালো না। সোজা হেঁটে উঠোনের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সামিউল তাকে ডাকলো। তারপর সকলে বরযাত্রী নিয়ে রওনা হলো।
মিছরি বিছানায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। তাকে ঘিরে আছে চাচাতো, ফুফাতো বোন আর ভাবিরা। পরনে লাল বেনারসি, মাথায় লাল দু’পাট্টা, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে টকটকে লাল লিপস্টিক। স্বর্ণের অলঙ্কারে দেহ ঢেকে আছে। যেন কোনো নিটোল অপ্সরী নেমে এসেছে মর্ত্যলোকে। সাতসকালে ছেলের বাড়ি থেকে সবকিছু দিয়ে যাওয়া হয়েছে। জামাকাপড় থেকে শুরু করে গহনা পর্যন্ত। ফলে বাবার বানিয়ে রাখা গহনাগুলো আর ঠাঁই পেলো না তার অঙ্গে।
উপস্থিত মেয়েগুলোর মুখে যেন লাগাম নেই। খানিক পরপর ফিসফিস করে লজ্জা দেওয়ার জন্য কত কী যে বলে চলেছে মিছরির কানের ধারে! তার অধিকাংশই মিছরির বোধগম্য হয় না। বিয়ে মানেই তার কাছে শুধু সংসার, রান্নাবান্না, অপরিচিতদের সঙ্গে বসবাস আর কিছু দায়িত্ব। এর বেশি মিছরির জানা নেই। বয়সের তুলনায় অবুঝ মেয়ে।
কিছু সময় পেরোতেই বাইরে হইচই শুরু হলো। বরযাত্রী চলে এসেছে। সবাই সেদিকে দৌড়ালো। ঘর হয়ে গেলো প্রায় ফাঁকা। শুধু ফাহমিদা তাকে রেখে গেলো না। বসে রইলো পাশে। সুজাতা দৌড়ে এসে বিছানায় বসলো। এত ভিড়ের মধ্যে ফুফুর কাছে সে ঘেঁষতেই পারছিল না এতক্ষণ। ফুফুকে আপাদমস্তক ভালো করে দেখে বললো,“তোমাকে তো বউ বউ লাগছে, ফুফু।”
ফাহমিদা জবাব দিলো,“ও তো বউই।”
“জামাই কে?”
“জামাই না, বল ফুফা।”
“ফুফা কে?”
“নাজির শাহ।”
সুজাতা অবাকই হলো বোধহয়। সে শুধু জানতো তার ফুফুর বিয়ে। বিয়ের পর সে এই গ্ৰামেই থাকবে।সুজাতা যখন তখন চাইলেই গিয়ে দেখা করে আসতে পারবে। তার চিন্তিত, ভাবুক মুখ দেখে ফাহমিদা জিজ্ঞেস করল,“কী, তুইও রাজি না? তোরও নাজিররে পছন্দ না?”
“পছন্দ।”
“পছন্দ?”
সুজাতা মাথা নাড়ায়,“দেখলেই শুধু বকে, তবে ভালো আছে। আম, পেয়ারা, বার্মিজ খাওয়ায়। আইসক্রিমও খাইয়েছে একদিন।”
“পেটুক একটা। যা এহন, বাহিরে গিয়া খেল। আর দেখিস তো কত ট্যাহা ওরা বরযাত্রীর থাইক্যা উসুল করে। তারপর আমায় আইয়া কইবি।”
সুজাতা দৌড়ালো। মিছরির মুখে রা নেই। ফাহমিদা তার উদ্দেশ্যে বললো,“মুখ এমন কইরা বইয়া থাকিস না তো। ব্যাডারে টাইট দিয়া রাখবি। প্রয়োজন হইলে আঁচলে বাইন্ধা রাখবি। ব্যাডা মানুষ যেমনই হোক না ক্যান, বউয়ের কাছে আইয়া পোলাপাইন হইয়া যায়। এইবার ক বকলে, মারলে কী করবি?”
“আমিও বকবো, মারবো।” নাক টেনে বললো মিছরি।
ফাহমিদা হতাশ হলো। বললো,“ধুর বলদি। তুই ওই ব্যাডার লগে পারবি? বকলে পোলাপাইনের মতো গড়াইয়া কানবি, মারতে আইলে জড়াইয়া ধইরা রাখবি। ছুডো বেলায় তো এইগুলাই করতি। কেউ কিছু না দিলে মাডিত গড়াগড়ি খাইতি, ভাইয়েরা মারতে আইলে তাগোই গিয়া ধইরা রাখতি। আর হেরাও গইলা যাইতো। জামাইয়ের লগেও এমন করবি। সংসার করতে অনেক বুদ্ধি লাগে। এই কয় মাসেই আমি খুব ভালা কইরা তা বুইঝা গেছি।”
এই পর্যায়ে এসে মিছরির ভীষণ লজ্জা লাগছে। ভয়ে কিংবা লজ্জায় হাত, পায়ের তালু ঘেমে উঠেছে। এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের তালুতে চিমটি কাটছে।
ফটকে লাল ফিতা বেঁধেছে কনে পক্ষের অল্প বয়সী মেয়েরা। নাজির ফিতার ওপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে এদের কর্মকাণ্ড। সামিউল ফিসফিস করে বললো, “মুখে রুমাল চাইপা ধর, বেহায়া।”
নাজির ভ্রু কুঁচকালো,“ক্যান?”
“ধরতে হয়।”
“চুরি করতে আইছি নাকি? বিয়া করতে আইছি। আমি ক্যান মুখ ঢাকমু?”
সামিউল চোখ রাঙালো। এই ছেলে আসলেই নির্লজ্জ। ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললো,“কী চাই তুমগো?”
ফুফাতো বোন নয়না দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো, “ট্যাহা লাগবো। না হইলে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া যাইবো না।”
নাজমুল, শাহরিয়ার একসঙ্গে বলে উঠলো,“এক পয়সাও দিমু না।”
আরেক মেয়ে ফিরোজা বিপরীতে বললো,“না দিলে যান গা।”
নাজির চোখমুখ কুঁচকে বললো,“কত লাগবো? কও তাড়াতাড়ি। ট্যাহা পয়সা লইয়া ভিতরে ঢুকার জায়গা দেও। কবুল কইয়া, বউ লইয়া জাইগা।”
“দুলাইভাইয়ের দেহি তড় সয় না! আমগো বোইনরে লইয়া যাওয়ার এত তাড়া?”
“তো তাড়া থাকবো না? তোমার বোইনডা একটু দেরি কইরা পয়দা হওয়ায় কত বছর ধইরা আমারে একলা পইড়া থাকতে হইছে। তার শোধ তুলতে হইবো না?”
মেয়েরা ভারি মজা পেলো। এমন রসিক দুলাভাই আজ পর্যন্ত তারা দেখেনি কোথাও। পারভেজ বললো, “এত তাড়াতাড়ি হার মাইনা নিবি?”
মিল্টন দাম্ভিক কণ্ঠে বললো,“হার আবার কী? আমার ভাইজান সবসময় জয়ী। ট্যাহা পয়সা লইয়া মাইয়াগো লগে কাইজ্জা করার সময় নাই। আমার ভাইজান অনেক বড়লোক। ট্যাহা পয়সা ছিনিমিনি খেলে। ঠিক কইছি না, ভাইজান?”
নাজির খুশি হলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,“একদম ঠিক কইছোস। এর লাইগাই তোরে আমি এত ভালা পাই।” সামিউলের উদ্দেশ্যে বললো,“যা চায় তাই দিয়া দেও দেহি, ভাই। গরম লাগতাছে।”
সামিউল বাঁকা দৃষ্টিতে চাচাতো ভাইয়ের দিকে তাকালো। যা চাইলো তাই পকেট থেকে বের করে দিয়ে দিলো। নাজির সেই সুযোগে তার হাত থেকে আরো দুটো বড়ো বড়ো নোট ছোঁ মেরে নিয়ে দিয়ে দিলো মেয়েদের হাতে। বললো,“ধরো, এইডা তুমগো বকশিশ। সারাজীবন এই অধমের কথা মনে রাখবা। ঠিক আছে?”
ছেলে-মেয়েরা খুশি হয়ে গেলো। মরিচ গোলানো শরবত আর খেতে দিলো না। কাঁচি বাড়িয়ে দিলো ফিতা কাটার জন্য। নাজির ফিতা কেটে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়াতেই গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তারা আনন্দিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো, “এক বড়ো না দুই বড়ো? আমগো দুলাভাইয়ের মন বড়ো। দুলাভাই, দুলাভাই! জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।”
অদূরে দাঁড়িয়ে আকবর মিয়ার তিন নাতি পলকহীন চোখে সেসব দেখছে। মাসুম ঘর থেকে সত্যি সত্যি আর বের হয়নি। নাজির আর মিল্টনের মুখখানায় দাম্ভিকতা। তাদের দিকে তাকিয়ে দুজনেই হাসলো। মুখে কোনো শব্দ প্রয়োগ না করেই ইশারায় বুঝিয়ে দিলো, দেখ তোদের বাড়িতেই তোদের মেয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। তারা সেই চোখের ভাষা বুঝলো। চোয়াল শক্ত করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। আর কিছুই বলার নেই। কিছুই না। সামিউল বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল,“নাটুকী পোলা। এক বিয়াতই সব উসুল কইরা আমার বাপরে ফকির বানাইয়া দিতাসে।”
সর্বপ্রথম বরযাত্রীদের ভোজন করানো হলো। সেসব তদারকি করছে মাস্টার বাড়ির পুরুষেরা। পারভেজ সরু দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো। দৃষ্টিগোচর হলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহমিদাকে। মুহূর্তেই বুকটা ধক করে ওঠে। কয়েক পা সেদিকে এগোতেই আচমকা এক পুরুষকে এসে মেয়েটির গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াতে দেখে থমকে গেলো সে। লোকটাকে দেখে ফাহমিদা লাজুক হাসে। দৃষ্টি নামিয়ে কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে পালিয়ে বাঁচে। পারভেজের আর বুঝতে বাকি থাকে না, মেয়েটা এখন অন্যকারো। বহু আগেই নিজের কাপুরুষতার কারণে তাকে হারিয়ে ফেলেছে সে। তাই গন্তব্য বদলে বাকিদের কাছে ফিরে যায়।
গ্ৰামের যত চটকদার, প্রভাবশালী শ্রেণীর লোক আছে তাদের বেশিরভাগই বরযাত্রী হয়ে এসেছে। বাদবাকি কনেপক্ষ। আফাজ উদ্দিনও কনেপক্ষ। তাই খেতে বসে দোষ ত্রুটি খুঁজতে লাগলো বরপক্ষের লোকেরা। না পেয়ে হতাশ হলো। আকবর মিয়া নিজে তদারকি করে সবকিছু আয়োজন করেছেন। ভুল ধরা এত সহজ নাকি? তবুও সিদ্দিক মুখ কুঁচকে বললো, “গোশত সিদ্ধ হয় নাই, লবণ বেশি হইছে।”
আকবর মিয়ার কান পর্যন্ত তা পৌঁছে গেলো। তিনি এসে নাজিরের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,“সব ঠিক আছে তো, নাতজামাই?”
নাজির সরু দৃষ্টিতে তাকালো। বিড়বিড় করল, “বুইড়ার যত নাটক! চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসাবে নিলে ভালা অভিনয় করবো।” কিন্তু মুখে বললো,“না, সবই ঠিক আছে, দাদাশ্বশুর।”
সন্তুষ্ট হলেন আকবর মিয়া। অধরে ফুটে উঠলো হাসি। ফের জিজ্ঞেস করলেন,“গোশত সিদ্ধ হইছে? লবণ ঠিক আছে?”
“ঠিকই আছে।”
এবার আকবর মিয়া সিদ্দিকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দাম্ভিক হাসলেন। সিদ্দিক দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। খুব সূক্ষ্মভাবে যে তাকে অপমান করা হয়েছে ভালো করেই বুঝতে পারলো। খাওয়া-দাওয়া শেষে আমিরুল শাহ বললেন,“এইবার তাইলে বিয়া পড়ান যাক, নাকি?”
কাশেম আলী বললেন,“হ, শুরু করেন।”
মেয়েরা আবারো এসে ঘিরে ধরলো মিছরিকে। নয়না দুষ্টু হেসে বললো,“দুলাভাই কিন্তু আমগো পছন্দ হইছে রে, মিছরি। দুলাভাই খুব ভালা। এক চাওয়াতেই ট্যাহা দিয়া দিছে।”
তার খালাতো বোন রাবেয়া বললো,“শুধু কী তাই? লগে বকশিশও দিছে।”
তাদের গল্প আর দীর্ঘ হলো না। মুরুব্বিরা এসে উপস্থিত হলেন ঘরে। দাদী সৈয়দুন নেছা, মা পারুল, আর চাচী দিলারা তাদের সরিয়ে বসলেন মেয়েকে ঘিরে। সাথে আছেন ছেলেপক্ষ থেকে মর্জিনার মা হেলেনা খাতুন আর ফরিদার বোন বিলকিস।
কাজী সাহেব সর্বপ্রথম খুতবা পাঠ করলেন। তারপর শুরু করলেন বিয়ে পড়ানোর কাজ। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন,“কইন্যার ওয়ালী কে হইবে?”
আকবর মিয়া পুত্রকে ইশারায় ডেকে বললেন,“কনের বাপ হইবো।”
কাশেম আলী পাশে এসে বসলেন। কাজী আর দেরি না করে শুরু করলেন,“কাশেম আলীর একমাত্র কইন্যা তারামন খাতুন মিছরিকে এক হাজার এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া বিয়ে করিতে আপনি সম্মত? সম্মত থাকলে কবুল বলেন, বাবা।”
নাজির সময় নিলো না। হাস্যোজ্জ্বল মুখে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,“জ্বি, কবুল।”
“আবার বলেন।”
“কবুল।”
“আরেকবার।”
“কবুল।”
“আলহামদুলিল্লাহ।” কাজীর সাথে সাথে উপস্থিত সকলেই একসঙ্গে বলে উঠলেন। এমনকি নাজিরও বললো।
“এবার কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন।” একটি কাগজ এগিয়ে দিলেন কাজী।
নাজির তা হাতে নিয়ে ভালো করে পড়ল। প্রথমে টিপ সই তারপর স্বাক্ষর করল। সেই কাগজটি নিয়ে কনের পিতা অর্থাৎ কাশেম আলীর সাথে ভেতরে চলে এলেন তিনি। খুক খুক করে কেশে অনুমতি নিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন। খাটের সম্মুখ চেয়ারে বসে একইভাবে শুরু করলেন বিয়ে পড়ানোর কাজ, “সুবহান আলী শাহর বড়ো পুত্র নাজির শাহর সঙ্গে এক হাজার এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে করিতে আপনি সম্মত? সম্মত থাকলে কবুল বলেন, মা।”
নাজির যত দ্রুত বললো, মিছরি তত দ্রুত বললো না। শক্ত হয়ে বসে রইলো মায়ের শরীর ঘেঁষে। ঘোমটার আড়ালে মুখমন্ডল ঘামে ভিজে উঠেছে তার। পারুল ফিসফিস করে বললেন,“যা কইতে কইছে তা কও, মা।”
মিছরি শুনলো না সেকথা। হেলেনা হেসে বললেন, “লজ্জা পায়। এমন একটু হয়।” বলেই এগিয়ে গিয়ে টাকা গুঁজে দিলেন মিছরির হাতে। বললেন,“এইবার জলদি কইরা কইয়া ফেল দেহি, বু।”
মিছরি এবারো নিশ্চুপ। কাজী তাড়া দিচ্ছেন। কাশেম আলী এবার এগিয়ে এলেন। মেয়ের মাথায় পরম স্নেহে হাত রেখে কোমল স্বরে বললেন,“কন আম্মা। মন থাইক্যা কইবেন, ঠিক আছে? সারাজীবন এই কথা মানবেনও।”
বাবার স্পর্শে ফুঁপিয়ে উঠলো মিছরি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো,“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
“আলহামদুলিল্লাহ! তিনবার কইতে হয়। আর দুইবার কন, মা।”
“কবুল, কবুল।”
আবারো আলহামদুলিল্লাহ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। সেই শব্দ বাইরে পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। সকলে খুশি হয়ে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি আর মিষ্টি মুখে মেতে উঠলো। কাবিননামায় স্বাক্ষর করতে গিয়ে হাত ঠকঠক করে কাঁপলো মিছরির। সবাই কোলাকুলি করলেও শাহ বাড়ির লোকেদের সঙ্গে মাস্টার বাড়ির কেউই হাত পর্যন্ত মিলালো না। মিল্টন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো,“ভাইজানের বিয়া হইয়া গেছে! আমার তো খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করতাছে।”
“নাচ, একটু দেহি।”
“বাড়িত গিয়া নাচমু। এনে শরম করে।”
সবকিছু গুছিয়ে কাজী বেরিয়ে এলেন। হাত তুলে দোয়া করলেন রবের নিকট। বড়োদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,“এইবার স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে বসিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে সবাই দোয়া করেন।”
নাজিরের অদ্ভুত সব অনুভূতি হচ্ছে। বিয়ে করার পেছনে যেই উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন, অবশেষে সত্যি সত্যি তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আজ থেকে আরো একজনের দায়িত্ব তার কাঁধে। একজন নারীর দায়িত্ব। সেই নারী তার স্ত্রী।
মিছরির ঘর প্রায় খালি করে দেওয়া হলো। পেছনের জানালায় বাচ্চারা উঁকি দেওয়ায় সেই জানালাটাও বন্ধ করে দেওয়া হলো। নাজিরকে নিয়ে যাওয়া হলো মিছরির ঘরে। মুখোমুখি দুজনকে বসানো হতেই সৈয়দুন নেছা বললেন,“বউয়ের ঘোমটা তুইল্যা মুখ দেহো দেহি, নাতজামাই।”
নাজিরের বুকটা বোধহয় খানিক কাঁপলো। ঢোক গিলে বাহ্যিকভাবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস চালালো। বিলকিস তাড়া দিয়ে বললেন,“কী রে, বউ কেমন সুন্দরী দেখ।”
হেলেনা বললেন,“পুরা উঠাইয়া দেইস না আবার। এমন কইরা উঠাইবি যাতে শুধু তুই দেখতে পাস।”
বয়স্ক লোকদের কথায় নাজির কিছুটা বিরক্তই হলো। তারা না বললেও নাজির কখনোই ঘোমটা পুরোটা তুলে নিজের বউ কাউকে দেখাতো না। নিজেকে ধাতস্থ করে দুই হাত বাড়িয়ে ঘোমটা কিছুটা উঁচু করে নিজেই মাথা এগিয়ে নিয়ে তাকালো। মিছরি চোখ জোড়া খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে। শ্বাস- প্রশ্বাসের গতি তীব্র। নাজির ফ্যালফ্যাল নয়নে কতক্ষণ যে তাকিয়ে থাকলো কে জানে? গালের তিলটা চুম্বকের মতো তাকে টানলো। এভাবে আগে কখনো কোনো নারীর দিকে নিখুঁত দৃষ্টিতে তাকায়নি সে। এমনকি পূর্বে দেখা হওয়া মিছরির দিকেও নয়। যার দরুণ আজকে মেয়েটির সৌন্দর্যে সে বিমোহিত হয়ে গেলো। তৃপ্তির স্বরে বললো,“মাশাআল্লাহ!”
উপস্থিত সকলের শ্রবণালী পর্যন্তই তা পৌঁছালো। বিলকিস পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন,“হইছে, অনেক দেখছোস বাপ। বাকি দেখাদেখি বাড়িত গিয়া হইবো।”
নাজির ঘোমটা ছেড়ে দিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মিছরি তাকালো ঠিকই কিন্তু সময়মতো দেখতে পারলো না লোকটির মুখখানা। তাকাতে দেরি করে ফেলেছে। এরপর দুজনকে মিষ্টি মুখ করানো হলো। বড়োরা এসে দুজনকে প্রাণ ভরে দোয়া করলেন, উপদেশ দিলেন। একসময় বিদায়ের সময় এলো। নাজির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই হঠাৎ কাশেম আলী তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,“আমার রত্নডারে তোর হাতে তুইল্যা দিলাম, নাজির। কহনো তারে কষ্ট দেইস না। যদি ভুল করে তাইলে আমারে কইস তবুও আমার মাইয়ারে কিছু কইস না। দেইখা রাখিস। সব দায়িত্ব আইজ থাইক্যা তোর।”
নাজির শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটার দিকে। বাবারা বুঝি এমনই হয়? মেয়ের জন্য এভাবেই বুঝি তাদের কঠিন চোখ থেকে পানি ঝরে? হ্যাঁ, ঝরে তো। এই যে কাশেম আলীর ঝরছে! শত্রুদের ছেলের কাছে নিজের কন্যাকে সঁপে দিয়ে তার সামনেই অশ্রু ঝরাচ্ছে। তিনি চলে যেতেই তালেব এসে বললো, “দাদাজানের লাইগা তোর হাতে আমার বোইন তুইল্যা দিতে বাধ্য হইছি। ছুডো মানুষ, বয়স কম, সংসারের কিছু বোঝে না। তাই বইল্যা ওর উপর কোনো তেজ দেখাবি না কইয়া দিলাম। ফলাফল ভালা হইবো না।”
নাজির দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। যেতে যেতে বললো, “আমার বউ আমি বুইঝা নিমু। তোমার জ্ঞান দিতে হইবো না।”
সৈয়দুন নেছা আর চাচী দিলারা মিছরির উদ্দেশ্যে উপদেশের স্বরে বললেন,“জামাইয়ের অবাধ্য হবি না। সব কথা মাইনা চলবি। ডরাইবি না একদম। কাছে আইতে চাইলে আইতে দিবি। মুখে মুখে তর্ক করবি না।”
মিছরি কাঠের পুতুলের মতো এবারেও নীরব। বাইরে সবাই তাড়া দিতেই কাশেম আলী যখন মেয়েকে নিয়ে যেতে এলেন তখনি দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মাসুম। ভাইকে দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো মেয়েটা। মাসুম তাকে এক হাতে আগলে ধরে বললো,“ধুর বলদ, কান্দোস ক্যান? তুই আমার বোইন না? মিছরিরা কান্দে না, কান্দায়। আমি আছি। বিয়া আটকাইতে পারি নাই তো কী হইছে? হারামজাদায় কিছু কইলে খালি একটা ডাক দিবি। গলাডা ঘাড় থাইক্যা নামাইয়া দিয়া আইমু।”
যাত্রাপথ পর্ব ২১
মিছরির কান্না তবুও থামলো না। ঘোলাটে দৃষ্টিতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ভাইদের দেখলো। বিশেষ করে তালেবকে। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। ছোটো ভাই ব্যতীত বাড়ির সবার প্রতি তার অভিযোগ আর অভিমানের পাহাড় জমেছে। কারো সাথে সে কথা বলবে না। কখনোই না। তারপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে তাকে বসানো হলো পালকিতে।
