Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ২৮

যাত্রাপথ পর্ব ২৮

যাত্রাপথ পর্ব ২৮
মাশফিত্রা মিমুই

বিকেলের গাঢ় কমলা রোদ এসে পড়েছে উঠোনের পশ্চিম পাশে। চারপাশের গাছের ছায়া ধীরে ধীরে লম্বা হচ্ছে। নাজির ভিটের সামনে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে ডাকলো,“তাল মিছরি!”
একডাকে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিছরি। চোখেমুখে কৌতূহল আর বিস্ময়। নাজির নিজের চুলে হাত চালিয়ে একটু বিরক্তির সুরে বললো,“দেহো, শরীরের কী অবস্থা! ঘরে আর ঢুকমু না। আলমারি থাইক্যা আমার লুঙ্গি, গামছাডা পুকুরঘাটে দিয়া যাও। দুইডা ডুব দিয়া আসি।”
আপাদমস্তক লোকটাকে দেখলো মিছরি। সারা দেহে কাদামাটি লেগে আছে। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো, “পুকুর কোনদিকে?”

নাজির যারপরনাই অবাক হলো। ভ্রুয়ের মাঝখানটা কুঁচকে গেলো। বললো,“শ্বশুরবাড়ি আইছো ছয়দিন, অথচ পুকুরঘাট চিনো না? ওই যে দালানের বাম পাশে।” হাতের ইশারায় পথ দেখিয়ে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না সে। প্রস্থান করল।
কাঠের আলনা থেকে স্বামীর ঝুলন্ত লুঙ্গি, গামছা নিয়ে পুকুরের দিকে পা বাড়ালো মিছরি। বাড়ি থেকে বেশি একটা দূরে নয়। উঠোন পেরিয়ে সামান্য একটু হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে।
ইট দিয়ে বাঁধানো পুরোনো পুকুরঘাট। পানি একদম স্বচ্ছ, টলটলে। পাড়ে দাঁড়িয়েও ভেতরের শ্যাওলাটা পর্যন্ত দেখা যায়। চারপাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আম, কাঁঠাল, চালতা আর কলাগাছ। মাথার উপর মৃদু বাতাসে পাতাগুলো দুলছে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাখিরা কিচিরমিচির করছে অবিরত। বাড়ির ভেতরকার গরম আর অস্থিরতার তুলনায় এখানকার আবহাওয়া আর দৃশ্য শীতল ও সুন্দর।
মিছরির দৃষ্টি প্রকৃতি থেকে এবার গিয়ে স্থির হলো পানিতে উদোম হয়ে ডুব দিতে থাকা নাজিরের দিকে। চেহারাটা পানি পেয়ে ঝকঝকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। স্ত্রীকে দেখতেই সে মিষ্টি হেসে ডাকলো,“বউ, বউ, ও বউ!”
মিছরির বুক ক্ষণিকের জন্য ধক করে কেঁপে উঠলো। অপ্রস্তুত হলো ভীষণ। এই ডাকটা তার কাছে অদ্ভুত লাগে। ভেতরে জেগে ওঠে নাম না জানা অনুভূতির দল। নিচু গলায় প্রত্যুত্তর করল,“কী?”

“আইয়ো, একলগে ডুব দেই।”
“না।”
“ক্যান?”
“আমি গোসল করেছি।”
“তো? একবার গোসল করলে কী বারবার করা যায় না? বউ মাইনষেগো দিনে পাঁচ ছয়বার গোসল করতে হয়।”
“কেন? বিয়ের পর কী শরীরে ময়লা বেশি জমে?”
“না, জামাইয়ের পিরিতের রস জমে।”
“হ্যাঁ?”
কথাটির অর্থদ্বার বুঝতে পারলো না মিছরি। বরং চোখেমুখে ভয় আর লজ্জা একত্রে মিলিত হয়েছে যেন। তার নিরীহ, বোকা চাহনিতে নাজিরের হাসিটা চওড়া হলো। তার বউটা একটু বেশিই অবুঝ। কত কিছু যে ধরে ধরে শেখাতে হবে! ভেবেই ক্লান্ত শ্বাস ফেলল নাজির। পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে বললো,“কাছে বসাইয়া পরে না হয় বিস্তারিত ধইরা ধইরা শিখামু। এহন আইয়ো, একলগে একটু গোসল করি। মোহাব্বত বাড়বো।”
“প্রয়োজন নেই, আমি ঘরে গেলাম।”

নাজিরের রাগ হলো, একেবারে বাচ্চাদের মতো রাগ।বউটা কিনা তাকে অবজ্ঞা করে চলে যাচ্ছে? নাজির শাহকে উপেক্ষা করছে! না, কিছুতেই তা মেনে নেওয়া যায় না। পানিতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে পাড়ে উঠে এসে চলে যেতে থাকা বউকে টেনে ধরে কোলে তুলে নিলো সে।
তার এহেন কান্ডে থ হয়ে গেলো মিছরি। আশ্চর্য চোখে কিয়ৎক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে নিয়ে পানিতে নামতে নামতে নাজির বললো,“এমনে তাকায় না, ময়না পাখি। চোখ কোটর থাইক্যা বাহির হইয়া যাইবো। তহন সোয়ামিরে দেখবা কেমনে?”
মিছরির হুঁশ ফিরলো। হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠলো,“নামান আমায়, নামান বলছি। আমি সাঁতার জানি না।”

“কও কী! গেরামের মাইয়া হইয়া সাঁতার পারো না? ছ্যাহ!”
“পারি, তবে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারি না। ধরার জন্য নারিকেল বা কলাগাছ কিছু একটা লাগে।”
“আস্তা একটা সোয়ামি থাকতে নারিকেল, কলাগাছ লাগবো ক্যা? তুমি আমারে ধইরা রাখবা।” হাসিমুখে কথাটা বলেই মেয়েটাকে পানিতে ফেলে ঘাড় ধরে পরপর তিনবার চুবালো নাজির। সারাদিনের ক্লান্তি, অস্থিরতা দূর হয়ে অবশেষে শান্তি এসে ঠাঁই নিলো তার বুকের ভেতর।
পুরুষালি বুকের সাথে লেপ্টে হাঁপাচ্ছে মিছরি। ঠোঁট জোড়া ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। কণ্ঠে কম্পিত কান্নার ঢেউ নিয়েই বললো,“আপনি খুব খারাপ লোক।”
“তোমার গুষ্টি জাইন্না বুইঝাই খারাপ লোকের লগে তোমারে বিয়া দিছে। নতুন কিছু কও, বউ। বিয়ার পর থাইক্যা এই এক বাক্য হুনতে হুনতে মুখস্থ হইয়া গেছে।”

“ছাড়ুন আমায়।”
“ছাড়ার লাইগা বিয়া করছি?”
“তো কেন করেছেন?”
গাল দুটো চেপে ধরে মেয়েটির ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালো নাজির। ফিসফিস করে বললো,“তোমারে আর তোমার চৌদ্দ গুষ্টিরে জ্বালাইতে।”
মিছরি ফ্যালফ্যাল নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। অসময়ে পানিতে ভিজে থাকায় কাঁপুনি ধরলো সারা দেহে। ঠিক তখনি ভেসে এলো কারো কর্কশ ধ্বনি, “আস্তাগফিরুল্লাহ! ছিঃ, ছিঃ, দিনদুপুরে এইগুলা কেমন ধরণের নষ্টামি?”
মিছরি লাফিয়ে উঠে দূরত্ব তৈরি করল। কিন্তু বেশিক্ষণ পানির উপরে ভেসে থাকতে না পেরে চেপে ধরলো নাজিরের হাত। মর্জিনা মুখে আঁচল গুঁজে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নাজির সেদিকে তাকালো। ভ্রু নাচিয়ে বললো,“একটু গোসল করতাছি। এইখানে নষ্টামির কী আছে, প্রাণের চাচী? আর আমনেই বা এনে কী করেন?”
“গোসল করোস, না কী করোস তা তো দেখলামই। দিন দিন নষ্ট হইয়া যাইতাছে পোলায়।”
“নিজের বিয়া করা বউ।”

“চুপ হারামজাদা।” থুথু ফেলতে ফেলতে ভেতরে চলে গেলেন তিনি।
মিছরিও সুযোগ বুঝে স্বামীকে জোরে ধাক্কা দিয়ে উঠে এলো পাড়ে। নাজির হাসলো,“বাড়িত তোমার ভাসুর, দেওররা আছে। গামছাডা ভালা কইরা গায়ে জড়াও, বউ। ঘরে গিয়া কিন্তু শাড়ি পরবা।”
কথামতো গামছাটা গায়ে জড়িয়ে নিলো মিছরি। যেতে যেতে বললো,“শাড়ি পরতে পারি না।”
“তাইলে পারোস কী, নডী?”
“আপনি নডী।”
“মুখে মুখে কথা! ঘরে আইয়া পরনে শাড়ি না দেখলে আমি টাইন্না ধইরা পরামু।”
আরো কয়েকটা ডুব দিয়ে উঠে এলো নাজির। ভেজা লুঙ্গি দিয়ে শরীর মুছে শুকনোটা পরিধান করে চলে এলো বাড়ির ভেতরে। দেখতে পেলো কলপাড় থেকে সদ্য গোসল সেরে বেরিয়ে আসা নওশাদকে। ভেজা কাপড় দড়িতে মেলে দিয়ে ঘরে যেতে যেতে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“দাঁড়া আইতাছি, এক লগে খাইতে বইমু।”
ঘরে এসে দেখলো আনাড়ি হাতে শাড়ি পরার চেষ্টা করছে মিছরি, কিন্তু পারছে না। মনে হচ্ছে যেন দড়ি প্যাঁচাচ্ছে নিজের শরীরে। নাজির সাদা একটা গেঞ্জি পরে উদাস কণ্ঠে বললো,“আনাজ কাটতে পারো না, রাঁধতে পারো না, সাঁতার কাটতে পারো না, উঠান ঝাড়ু দিতে গিয়া বয়স্ক মাইনষের মতো হাঁপানি উঠে, মাজা বিষ করে, সোয়ামির সেবা করতে পারো না, দুইডা পিরিতের আলাপ পারো না, এহন দেহি শাড়িডাও পরতে পারো না। তুমি তাইলে পারোডা কী? বুইড়া ঝাক্কাসে তো আমারে রীতিমতো ঠকাইয়া দিলো! এহন কী হইবো? যৌবন কী এমনেই কাটাইতে হইবো?”

“ঝাক্কাস নয়, আমার দাদার নাম আকবর।”
“যাই হোক, ঠকাইছে না? চাইছিলাম তো সর্বগুণে গুণান্বিত একটা বউ।”
“আমার নানীও তো বলতো, আমার নাকি কোনো এক রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে হবে। পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চেপে বর আসবে, নিয়ে যাবে রাজপ্রাসাদে। কিন্তু বাস্তব? শেষমেশ বিয়ে হলো এক কৃষকের সাথে, বর এলো হেঁটে হেঁটে। মুখে দুটো মধুর কথা তো কখনো শুনতেই পেলাম না বরং ঝরে শুধু কটু, অশুদ্ধ আর নোংরা বাক্য।”
নাজির অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। খানিক পর বলে ওঠে,“ওরে বাবাগো! আমি তো তোমারে বলদ আর পোলাপাইন মানুষ ভাবছিলাম। কিন্তু তুমি দেহি ভালাই বুদ্ধিমান! মুখ দিয়া তো উচিত কথার খই ফুডে!”
“বুদ্ধিমান নয়, বুদ্ধিমতী হবে। জানেনই যখন আমার বয়স কম তাহলে বিয়ে করেছেন কেন? আপনাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছি?”

“তোমার দাদায় পিছন পিছন দুই সপ্তাহ ঘুরছে।”
“তাতে কী? আমার মতামত কেন নেননি? আমি তো এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না, আমাকে জোর করা হয়েছে।”
“ক্যান, প্রেমিক আছিলো নাকি?”
“ছিঃ, এসব থাকবে কেন?”
“তাইলে?”
“আপনাকে পছন্দ নয়।”
“ক্যান?”
“আপনি খারাপ লোক। আমার ভাইজানের সাথে খারাপ আচরণ করেন।”
“তোর ভাইজান যহন খারাপ আচরণ করে?”
“আপনি করেন বলেই করে। আপনার ব্যবহারও খারাপ।”
“আর কী খারাপ?”
“সব।”

“বিয়ার সপ্তাহ পার হইলো না তাতেই খারাপ কইয়া নাকের পানি চোখের পানি এক করতাছোস? এর থাইক্যাও খারাপ তোর কপালে লেখা আছে।”
মিছরির দৃষ্টি শাড়ির দিকে নিবদ্ধ। আপন কেউ সামান্য কিছু বললেই তার চোখ ভিজে ওঠে। অথচ নাজিরকে সে আপন বলে মনে করে না। একটুও না। তবুও বিয়ের পর থেকে লোকটার সামান্য চোখ রাঙানিতেও তার কান্না পাচ্ছে। এটাই কী সেই তিন কবুলের ক্ষমতা? নাজির দৃষ্টি না সরিয়েই জিজ্ঞেস করে,“আব্বার ঘরে গেছিলা? দুপুরের খাওন দিছিলা?”

“না।”
“ক্যান?”
“কেউ বলেনি।”
“তোমার শ্বশুর, কেডায় কইয়া দিবো? কাল থাইক্যা দুপুরের খাওন তুমি খাওয়াইবা। সকাল আর রাইতেরটা আমি দেইখা নিমু।”
“আমার ভয় করে।”
“ক্যান? ভূত নাকি?”
“উনি কেমন করে যেন তাকায়, মুখ দিয়ে কীসব শব্দ করে।”
“কথা কইতে পারে না, জিহ্বার ডগা কাডা, সারাক্ষণ বিছানায় পইড়া থাকায় হঠাৎ মানুষ দেখলে উত্তেজিত হইয়া যায়, কথা কইতে চায়। দেখতে দেখতে অভ্যাস হইয়া যাইবো।”
“এমন অবস্থা কীভাবে হয়েছে?”
“ক্যান, তোমার দাদায় কয় নাই?”
মিছরি অবাক হয়,“দাদাজান জানে?”
“জানবো না ক্যান? করছে তো হেয়ই।”
নাজির ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মিছরি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে। শেষ কথাটা বোধগম্য হলো না। দাদা করেছে মানে? তার দাদা নিতান্তই ভালো মানুষ। অন্যায় না করলে নিরপরাধ কারো সাথে গলা উঁচিয়ে কথা পর্যন্ত বলেন না। তিনি কিনা! না, আর ভাবতে পারে না মিছরি। নাজির মিথ্যে বলছে। লোকটা একটা মিথ্যুক।

দিনের সব কাজ সেরে সামিউলদের ফটকের সিঁড়িতে বসে আছে কলিমের মা। মাগরিবের আজান দিলেই চলে যাবে বাড়ি। মর্জিনা নিজের বারান্দায় বসে পান খাচ্ছেন। বিথী বিলি কেটে দিচ্ছে তাঁর চুলে। ঘর হতে ভেসে আসছে বাংলা ছড়ার সুর। মায়ের নির্দেশে সুমা গলা ফাটিয়ে পড়ছে। ফরিদা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। খুচরো টাকা গুনে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,“নে, ধর। কাইল একটু সকাল সকাল আইয়া পড়িস।”
“ক্যান? আবার কোনো অনুষ্ঠান আছে নাকি?”
“অনুষ্ঠান না, আয়েশার শ্বশুরবাড়ি থাইক্যা মেমান আইবো। তাই একটু আয়োজন করমু। বিয়ার সময় তো সবাই আইতে পারে নাই,তাই বউ দেখার উসিলায় একটু দাওয়াত খাইয়া যাইবো।”
“বউ দেহার কী আছে? নিজের ভাইয়ের বউ তো আর না। চাচতো ভাইয়ের বউ।”
“কী যে কস না! আমগো বাড়িত আপন ভাই আর চাচতো ভাইয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য আছে? সবাই এক দাদার নাতি-নাতনি। রক্তও এক, শাহ বংশের রক্ত। তুই কলিমরে লইয়া আইয়া পড়িস। একেবারে রাইতের খাওন খাইয়া বাড়িত যাবি।”

কলিমের মা খুশি হলেন বলেই মনে হলো। হেসে বললেন,“আমনে আসলেই ভালা মানুষ, ভাবি। যত দেহি ততই অবাক হই। এই যে গহনা লইয়া নাজির যেই কান্ডডা করল! আমনে কিন্তু একটুও রাগলেন না। ঠিকই মায়া দেহাইতাছেন।”
ফরিদা পিঁড়ি পেতে বসলেন। গ্ৰিলে রাখা অর্ধ সমাপ্ত নারিকেল পাতার পাটিটা নিয়ে বুনতে লাগলেন। মৃদু হেসে বললেন,“তুই একটু বেশি বেশিই কস।”
কলিমের মা সেকথায় গুরুত্ব দিলো না। নজরে পড়ল জগ হাতে কলপাড় যাওয়া মিছরিকে। বললেন,“এই মাইয়ারে দেখলেই আমার হেই বদনামের কথা মনে পড়ে। দুনিয়াত কী মাইয়ার অভাব পড়ছিল? আমগো নাজির একটু ঘাউড়া হইলেও পোলা ভালা, চেহারা সুরৎ আর বংশ ভালা। খুঁজলে এর থাইক্যাও হাজার গুণ সুন্দরী, চরিত্রবান মাইয়া পাওয়া যাইতো। কিন্তু না, ছ্যাড়ায় বদনাম রটা মাইয়াই ঘরে আনলো, ছিঃ!” বলেই মাটিতে একদলা থুথু ফেললেন তিনি।

ফরিদা একপলক সেদিকে তাকালেন। বিপরীতে কিছু বললেন না। কলিমের মায়ের কণ্ঠস্বর ফাটা বাঁশের মতো। তাই কথাটা ঠিকই কর্ণগোচর হলো মিছরির। কোনোদিকে না তাকিয়ে দ্রুত হেঁটে প্রবেশ করল সে কলপাড়। দুপুরের খাবার বিকেলে খেয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নাজির। যাওয়ার আগে মিছরিকে ভালো করে বলে গিয়েছে,“উঠানের শুকনা কাপড় আইন্না ভাঁজ কইরা রাখবা, জগ আর কলসিতে পানি ভইরা হারিকেন জ্বালাইবা সব ঘরে। আইয়া কোনো খুঁত পাইলে খবর আছে।”
কলসিটা বড়ো আর ভারী হওয়ায় কাঁখে নিতে পারে না মিছরি। তাই সেটা আগেই ভরে কোনোমতে হেঁচড়ে ঘরে নিয়ে গিয়েছে সে। এবার নিচ্ছে জগ। উঠোনের মাঝামাঝি আসতেই ডাক পড়ল কলিমের মায়ের, “ওই মাস্টর বাড়ির মাইয়া! দেইখাও যাওগা ক্যান?”
ফরিদা কথাটা সংশোধন করে দিলেন,“এহন মাস্টর বাড়ির মাইয়ার পরিচয় আর নাই। এহন ওয় শাহ গো বাড়ির বউ। নাজিরের বউ কইবি।”

“আমি তো নাজিরের বউ হিসাবে মানতেই পারি না।”
“তোর মানা না মানায় নাজিরের কী?”
তাদের কথার মধ্যেই মিছরি জগ হাতে এগিয়ে এলো। সব কথা শুনে ফেলায় ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। কলিমের মা সরু দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে নাক সিঁটকে বললেন,“বউ মানুষ নাকফুল পরো নাই ক্যান? নাক কী ফোঁড়ানো না?”
মর্জিনা মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“না, এইডা লইয়াই তো বউ ভাতে কান্ড হইয়া গেছিলো। নাজির কইছিল পরে ফোঁড়াইয়া দিতে।”
“এইগুলা তো বাপের বাড়ি থাইক্যাই কইরা দেওয়া হয়। কী গো বউ, এত বড়ো ঘরের মাইয়া হওয়ার পরেও এই অবস্থা ক্যান? নিয়মের বালাই নাই?”
“দাদী ফোঁড়াতে চেয়েছিল কিন্তু আমিই দেইনি। ভয় লাগে।”
“ডর লাগলে তো হইবো না। কাইল আমি মিজানের মায়রে আইতে কমু, ভাবি? গেরামের বেশিরভাগ মাইয়া মাইনষের নাক হেয়ই তো ফোঁড়ায়।”
ফরিদা অনুমতি দিলেন,“কইস, তবে কাইল না পরশু আইতে কইস। বাড়ি ভর্তি মাইনষের মাঝখানে এইসব করতে হইবো না।”

“আইচ্ছা।”
বিথী বললো,“নাজিরের কপালডা খারাপ। একে তো বাপ-মা পায় নাই, ভাইডা ঠকাইলো তার উপর বউ পাইছে যা তা। কোনো কামের না গো, চাচী। রান্ধন বাড়ন পারে না, বাপের বাড়ি থাইক্যা ঘর সাজানিও দেয় নাই। আমার বিয়ার সময় আমার আব্বায় আবার সব দিছিলো।”
ফরিদা বিরক্ত হলেন এসব কথায়। বললেন,“ওই তো দিছে কমদামি কিছু সাজানি। যা এক বছরের মাথায় ঘুণে খাইছে। সেগুন কাঠ তো দিতে পারলো না।”
“যা সামর্থ্যে কুলাইছে তাই দিছে, আম্মা। আমার বাপ অত নামকরা বড়লোক না।”
সবাই মিলে যে তাকে আর তার পরিবারকে অপমান করছে মিছরি খুব ভালো করেই তা বুঝে গেলো। রাগ নিয়ন্ত্রণে রেখে বললো,“আমার দাদা ঘর সাজানি থেকে শুরু করে সংসারে যাবতীয় যা যা লাগে সবই সঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনাদের বাড়ির ছেলেই তা নেয়নি‌। বরং আমায় যেই ছয় ভরির হারটা দেওয়া হয়েছিল সেটা পর্যন্ত ফেরত দিয়ে এসেছে। তাই আমার পরিবার নিয়ে অযথা কিছু বলবেন না।”
“মাইয়ার মুখে দেহি কথার ফুলঝুড়ি! এত বড়ো মুখ কেমনে করো? তোমার বদনাম কিন্তু এহনো ধামাচাপা পড়ে নাই।”

“কীসের বদনাম? যেই অন্যায় করিনি সেই অন্যায়ের দায় আমার নয়।”
“কেডায় দেখছে অন্যায় করছো নাকি করো নাই? নেহাৎ আমগো নাজিরে আছিলো তাই শেষ রক্ষা হইছে। কতগুলা বিয়াও তো ভাঙছে হুনছিলাম।”
বিথী সতর্ক করল,“আস্তে কন, চাচী। নাজিরের কানে গেলে আবার সমস্যা হইবো। দুপুরে তার বউরে দুইডা কথা কইছি দেইখা যেই রাগ দেখাইলো!”
মিছরি সেখানে আর দাঁড়ালো না। ঘুরে হাঁটা ধরলো ঘরের দিকে। এই মহিলাগুলো জঘন্য। এমন মহিলা সে শেষ দেখেছিল নিজের আপন ছোটো ফুফুকে।
তারপর দিনের আলোয় আঁধার ভর করল। হাঁস, মুরগি খোপে ঢুকিয়ে, গোয়ালের গরু গোয়ালে রেখে যে যার গিয়ে দরজায় খিল আঁটলো। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগলো বন্য শেয়ালের ডাক। বিদ্যুৎহীন ঘরে সামান্য হারিকেনের আলোয় মাগরিবের নামাজ পড়ে হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে ভীতু হয়ে বিছানায় বসে রইল মিছরি। হঠাৎ করে তার মন খারাপ হলো। এই বাড়ির মানুষেরা অদ্ভুত, আচরণে ছদ্মবেশ। জা লিলিটাও কেমন যেন। বউ ভাতে ভাব করলেও তারপর থেকে এড়িয়ে যায় তাকে। মিছরি কী খারাপ মেয়ে? তার সাথেই কেন এমন করে সবাই?
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সাথে তাল মিলিয়ে দরজায় টোকা পড়ল। পরপর বেশ কয়েকবার। মিছরি কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,“কে?”

“তোমার সোয়ামি, ময়না পাখি।”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো মিছরি। দৃষ্টিগোচর হলো নাজিরের ক্লান্ত মুখখানা। চোখ জোড়া ঘুমের অভাবে বসে গেছে। তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকেই পরনের গেঞ্জিটা আলনায় খুলে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। মিছরি দরজা আটকে এসে মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। শিয়রে বসে আচমকাই চুলের ভাঁজে হাত রাখলো। নাজির চোখ খুলে তাকালো না। ঘটনাটা তার ছাব্বিশ বছরের জীবনে এই প্রথম ঘটছে। ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরার পর এই প্রথম যত্ন নিয়ে তার মাথায় কেউ হাত বুলাচ্ছে। মিছরি জিজ্ঞেস করল,“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“হাটে, কাম আছিলো।”
“সারাদিন শুধু কাজই করেন? একটু বিশ্রাম নিতে পারেন না?”
“সময় নাই।”
“কেন?”

“বুঝবা না। ঘরে দরজা লাগাইয়া বইয়া আছিলা ক্যান? কারো লগে ভাব জমাইতে পারো নাই?”
প্রশ্নটায় কিছুক্ষণ মৌন রইল মিছরি। নাজির শোয়া থেকে উঠে বসলো। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে তাকিয়ে থাকলো স্নিগ্ধ মুখখানায়। বললো, “কেউ কিছু কইছে?”
“উনি প্রথমদিন বলেছিলেন উনাকে যেন জা না মনে করে বড়ো বোন মনে করি। অথচ সবার সামনে আজ আমাকে আর আমার পরিবারকে অপমান করে কথা বলেছেন।”
“কেডায়? বড়ো ভাবি?”
“হুম।”

“কী কইছে?”
“বাবার বাড়ি থেকে কিছু দেয়নি।”
“তুমি কী কইছো?”
“ওরা দিতে চাইলেও আপনি নেননি।”
“আর?”
“কলিমের মা আমার চরিত্র আর বদনাম রটানোর ঘটনাটা নিয়ে বাজে কথা বলেছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজির,“মাস্টর বাড়ির মাইয়া হইয়াও এত বলদ কেমনে হইলা? বিয়া মানেই হইলো যুদ্ধ। আর শ্বশুরবাড়ি হইলো সেই যুদ্ধের ময়দান। এইখানে জামাই ছাড়া কেউ নিজের না। আমি এই বাড়ির পোলা, আমিই তো কেউর নিজের না। আর তুমি? তুমি তো শত্রু বাড়ির মাইয়া।”
“তাই বলে এমন করবে?”
“বাপের বাড়ি গিয়া কুটনীতি, চোগলখোরী শিইখা আইবা। না হইলে শাহ বাড়ি তোমার লাইগা না।”
“এসব করা ভালো নয়।”
“এ্যা হ্যাঁ, ভালা মানুষ আইছে। কাইজ্জা না হয় আমিই শিখাইয়া দিমু, চিন্তা নাই।”

যাত্রাপথ পর্ব ২৭

ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো মিছরি। যেন ক্ষমতা থাকলে ঝাঁপিয়ে পড়তো এখনি। নাজির সেই দৃষ্টি দেখে আনমনে হাসলো। সময় নিয়ে বললো,“এই দুনিয়াতে নারীই নারীর শত্রু। বদনাম শব্দটার সৃষ্টিও নারীগো লাইগাই হইছে। তাই একবার নামের আগে পিছে, চরিত্রে বদনামের দাগ লাগলে সেই দাগ আর সহজে যায় না। মরার আগ পর্যন্ত লোকে মনে রাখে। তাই মাইনষের কথায় দুঃখ পাইয়া মুখ ফুলাইয়া বইয়া থাইক্যা লাভ নাই। এই দুনিয়া বড়োই নিষ্ঠুর রে, তালমিছরি! যত আগে বুঝতে পারবা ততই তোমার জন্য ভালা।”
আচমকা লোকটার মুখে কঠিন সত্য শুনে আশ্চর্য হয় মিছরি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

যাত্রাপথ পর্ব ২৯