Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৩৩

যাত্রাপথ পর্ব ৩৩

যাত্রাপথ পর্ব ৩৩
মাশফিত্রা মিমুই

পড়ন্ত বিকেল। মেঘহীন নীলাম্বরের নিচে নীরবে নিভৃতে বসে আছে নাজির। দৃষ্টি পানিতে, বুড়োর কথা শোনার আগ্রহ না থাকলেও কান খাড়া করে রেখেছে ঠিকই।
অপরজনের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কথা বলার মাঝে কোথায় থামতে হয় বৃদ্ধ খুব ভালো করেই তা জানেন। একসময় নীরবতার সমাপ্তি ঘটিয়ে বলা শুরু করলেন তিনি,“এই গেরামে তহন বসতি নাই বললেই চলে। আফাজ উদ্দিনের বাপ, সামাদ মিয়ার বাপ সবুর, আরো কিছু মানুষ স্থানীয়। একজনের বাড়ি থাইক্যা আরেকজনের বাড়ি অনেক দূরে। সারাদিন শিয়াল ডাকতো, সাপ উইঠা আইতো ঘরে, গাছে গাছে দেখা যাইতো বান্দর। চারিদিকে শুধু বন আর জঙ্গল। আমার পূর্ব পুরুষের বাড়ি বাড়ীয়া ইউনিয়নে। রক্তের শরিকরা দুইদিন পরপর হাতাহাতি আর ঝামেলা করতো। তাই আব্বায় বউ, সন্তান লইয়া বাধ্য হইয়াই একসময় আইয়া পড়ল এই দূর গেরামে। আমি আব্বার একমাত্র পোলা। অনেক চেষ্টার পরেও আর কোনো পোলাপাইন হয় নাই। হুনছিলাম, কেউ নাকি আম্মারে কালাজাদু করছিল।

এইখানে আইয়া মাইনষের দেখাদেখি আব্বায় শুরু করল কৃষিকাজ, কোনোমতে ছনের ছাউনি দিয়া তুললো কুঁড়েঘর। বহু বছর কাটানোর পর গেরামের মাইনষের মতামত নিয়া শুরু করল বিদ্যালয়ের কাম। তহন এইডা বাংলাদেশ আছিলো না। আছিলো ভারতবর্ষ। দেশে চলতাছিলো ইংরেজগো শাসন।
ধীরে ধীরে সময় যাইতে লাগলো। আমগো অবস্থা বদলাইলো, গেরামে নতুন বিদ্যালয় উঠলো, সরকার থাইক্যা পাইলো অনুমোদন। আমগো আর কোনো কিছুর অভাব নাই। হের মাঝে আব্বায় এক দুপুরে লগে কইরা লইয়া আইলেন এক যুবক পোলা। আমার বয়সী সে। মুখ শুকনা, চোখ লাল। আম্মারে ডাইকা আব্বায় তারে ভাত দিতে কইলো। আম্মায় ভাত দিলো, ঘুমানের জায়গা দিলো। হুনলাম পোলার বাড়ি সিলেট। মেলা বড়ো বংশের পোলা। বাপ-মা নাই। গত হইছে বছর দুয়েক আগে। সম্পত্তি লইয়া দ্বন্দ্বের মাঝে কোনো এক আত্মীয়র গায়ে রাগের মাথায় ছুরি চালাইয়া দিয়া ডরে রাইতের আন্ধারে ট্যাহা পয়সা, সোনা গয়না যা পারছে লইয়া পলাইয়া আইছে। সেই পোলা আর কেউ না, তোর দাদা ফতেহ আলী শাহ।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এক ধ্যানে বসে থাকা নাজির নড়েচড়ে উঠলো। পানি থেকে দৃষ্টি তুলে তাকালো বুড়োর দিকে। আগ্ৰহ যেন চট করে বেড়ে গেলো তার। আকবর মিয়া তা দেখে হেসে বললেন,“আমার আব্বায় মাটির মানুষ। কারো দুঃখ সহ্য করতে পারতো না। পোলার বয়সী পোলার কাহিনী হুইন্নাই মায়া হইলো। তাই থাকার জায়গা দিলেন, খাওন দিলেন, প্রথমে রাখালের কাম দিলেন, পরে গিয়া দিলেন কৃষিকাজ। ধীরে ধীরে ফতেহর উন্নতি হইতে লাগলো। তহন তো আর কাগজে কলমে জমি লেইখা দেওয়ার এত গুরুত্ব আছিলো না। মুখে যদি কইতো, এই জমি তোর তাইলে তোরই। জনবসতি কম থাকায় আব্বারে সাক্ষী রাইখা এক লোকের থাইক্যা সোনার এয়ারিং দিয়া বিশাল এক জমি কিনলো ফতেহ। হেরপর হেনে তুললো ঘর। প্রথম প্রথম তারে সহ্য না হইলেও একসময় আমরা হইয়া গেলাম জানপ্রাণ ওয়ালা বন্ধু। লোকে ডাকতো মানিক জোড়া। এমনকি আব্বায় আমগো বিয়াও দিলো একলগে, এক বাড়ির দুই মাইয়ার লগে। সম্পর্ক আরো গভীর হইলো। যাতায়াত লাইগাই থাকলো।

তারপর বহু বছর পার হইলো। ইংরেজরা বাক্স পটলা বাইন্ধা দেশ ছাড়লো, দেশ ভাগ হইলো, কিন্তু আব্বায় দেইখা যাইতে পারলেন না। তার আগেই ইন্তেকাল করলেন। আব্বার ইন্তেকালের পর আম্মা বদলাইয়া গেলেন। বছর দুয়েক জীবিত থাকার পর সেও দুনিয়া ত্যাগ করলেন। আমগো পরিবারে শোক নামলো। নজরুল, তমিজা তহন প্রাইমারিত পড়ে। বাকিরা ছুডো। ফতেহ আর তার বউ আইয়া সান্ত্বনা দিলো। আমগো সম্পর্ক আরো গাঢ় হইলো যেন মায়ের পেটের আপন দুই ভাই। দুইজনে আলাদা আলাদা ব্যবসা শুরু করলাম। তার মাঝেই নজরুলের মা জুলেখা কলেরায় আক্রান্ত হইয়া সপ্তাহ খানেক পর ইহলোক ত্যাগ করল। আমি যেন পড়লাম অথৈ এক সমুদ্দুরে। এইবার শোক নাইম্মা আইলো দুই বাড়ির মধ্যেই। পোলাপাইনরা মায়ের লাইগা কান্দে, তোর দাদী খোদেজাও কান্দে। কি এক অবস্থা! আমিও শান্তি পাই না। জুলেখা আমার সংসারে পা রাখছিল অনেক ছুডো থাকতে। বারোডা বছর একলগে সংসার করছি। আমার পাঁচ সন্তানের জননী সে। অথচ কথা দিছিলাম পুরা জীবন আমরা একলগে পার করমু।”

“তাইলে এহন যেয় আছে সে দ্বিতীয় পক্ষ? মিছরির সৎ দাদী?”
“হ, পরের বছর তোর দাদার জোরাজুরিতে বিয়া করি দুনারে। দুনা বন্ধ্যা থাকায় তার প্রথম জামাই আরেক বিয়া কইরা ঘরে সতীন তোলে। সতীন আর শাশুড়ির নির্যাতনে শেষমেশ মাইয়াডা গিয়া উঠে বাপের বাড়ি। কিন্তু সেইখানেও শান্তি পায় না। জামাইয়ে একসময় তারে তালাক দেয়। গেরামের মানুষ শুরু করে উত্ত্যক্ত,। মুখে চুনকালি মাইখা সমাজ ছাড়া করার হুমকি দেয়।
আমার ছুডো ছুডো পাঁচ সন্তান, এই সমাজে একলা এক পুরুষের পক্ষে ঘর, বাহির সামলানো সম্ভব? তাই সংসারডা সামলানোর লাইগা দুনারে বিয়া কইরা ঘরে আনলাম। তবুও কোথাও সন্দেহ থাইক্যাই যায়। হেয় পারবো তো আমার পোলাপাইনডিরে নিজের কইরা নিতো? কিন্তু বিয়ার পর আমার সব সন্দেহ ভুল প্রমাণিত কইরা দিয়া আমার পুরা সংসারডার হাল ধরলো দুনায়। কোনো অভিযোগ করার সুযোগই দিলো না। একসময় আমিও নির্ভর হইয়া উঠলাম হের উপরে।”

“আমনের পারিবারিক কাহিনী হুনার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। থামেন তো।”
“তোর ধৈর্য নাই, ব্যাটা। তোর বাপের কাহিনী থাইক্যা শুরু করি তবে।” তারপর কিছুক্ষণ ভেবে মনে করার চেষ্টা করলেন সব। বললেন,“তোর দাদার আর কিছুর অভাব আছিলো না। জমিজমা, ব্যবসা সব দাঁড়াইয়া গেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দুই বন্ধু মিল্যা বহুত জমিজমা কিনছিলাম। ফতেহর তিন পোলার মধ্যে তার সবচেয়ে বাধ্যগত পোলা আছিলো তোর বাপ। আর বাকি দুইডা বখাটে, উচ্ছৃঙ্খল। খারাপ সঙ্গ পাইয়া নেশাপানি করতো। তাই তাগো সোজা করার লাইগা আমরা দুইজনে পথ খুঁজতে লাগলাম। শেষে আমিরুলের বিয়ার লাইগা দুইজনে মিল্যা শুরু করলাম মাইয়া খোঁজার কাম। কিন্তু মনমতো পাই না। শেষমেশ তমিজার জামাইয়ের বৌদলতে শ্রীপুর গিয়া তার দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়ার বিবাহযোগ্য মাইয়ার খোঁজ পাইলাম। উচ্চ বংশীয় মাইয়া, লেখাপড়া মোটামুটি জানে। যেমন তার রূপ, তেমন তার আচার ব্যবহার। তোর দাদায় মুগ্ধ হইয়া হেইদিনই বিয়ার কথা পাকা কইরা আইলো। মাইয়ার হাতে পরাইয়া দিলো আংটি। কিন্তু আমিরুলে বেঁইকা বইলো। ওয় তোর দাদার পছন্দের মাইয়া কিছুতেই বিয়া করবো না। তোর দাদায় জিগাইলো, ক্যান করবি না? উত্তর দিলো, তার পছন্দের মাইয়া আছে। সেইডাই হইলো ফরিদা। তোর দাদায় তো কিছুতেই ওই মাইয়া ঘরে তুলবো না। কারণ মাইয়ার বংশ ভালা না। বাপে চোর, দুইদিন পরপর গেরামে কিছু হারাইলেই সবাই গিয়া তারে ধরে, শালিস বসে। ওই বংশের মাইয়ারে কী শাহ বংশের লগে মানায়?”

নাজির অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল,“বড়ো চাচীরে চাচায় পছন্দ কইরা বিয়া করছে! তাইলে এহন সহ্য করতে পারে না ক্যান?”
“তুই খালি ভুল প্রশ্ন করোস। তোর জিগানো উচিত আছিলো, তোর চাচীর বাপের বংশ এত উন্নত হইলো কেমনে।”
“কেমনে?”
“এই উত্তর একটু পরে দেই। তার আগে আরো কিছু কাহিনী হুন। আমিরুল শেষ পর্যন্ত তোর দাদার বিরুদ্ধে গিয়া ওই ঘেঘা বংশের মাইয়াই বিয়া কইরা আনলো। পোলার কান্ডে ফতেহ গোস্বা করল। তার মাথা হেঁট হইছে, কিছুতেই ওই পোলার বউ ঘরে তুলবো না। শেষে আর না পাইরা খোদেজা ভাবি আমার কাছে আইয়া অনুরোধ করলেন, তোর দাদারে যাতে বুঝাই। ছেলে অন্ত প্রাণ আছিলেন কিনা!”

“বুঝছিলো?”
“তাইলে? আমার কথা ফেলার সাহস আছিলো তাঁর? খুব বিশ্বাস করতো আমারে‌।”
“আর ঠিক করা মাইয়া? আমার নানার বাড়িও তো শ্রীপুরেই।”
“ওই মাইয়াই তোর মা নাসরিন। তোর দাদারে আমি কইলাম, তারে যেন সুবহানের লগে বিয়া দিয়া দেয়। কথাডা হুইন্না তোর দাদা মহাখুশি হইলো। অমন যোগ্য খানদানি মাইয়া কী সহজে হাতছাড়া করা যায়? তারে শুধু সুবহানের লগেই মানায়। সে-ই এই মাইয়ার কদর বুঝবো। সুবহানের বয়সও কম। আমিরুলের অনেক ছুডো সে। কিন্তু মুমিনের পিঠাপিঠি। তবুও ধুমধাম কইরা কয়দিন পর সুবহানের বিয়া হইলো। কয়দিনেই তোর মায় সবার প্রিয় হইয়া উঠলো। কী ভালা মাইয়া! আমারে অনেক সম্মান করতো। তোর দাদারও প্রিয় পুত্রবধূ আছিলো সে।

বছর ঘুরতেই আমিরুলের ঘরে সামিউল হইলো। তোর দাদায় মনে করল, পোলায় হয়তো এইবার ভালা হইবো। তাই ব্যবসার দায়িত্ব আমিরুল, সুবহান দুই ভাইয়ের হাতে দিয়া দিলো। আর জমিজমার দায়িত্ব দিলো মুমিনরে। কিন্তু না, ওরা আর ভালা হইলো না। মুমিনডাও হাঁটলো বড়ো ভাইয়ের পথেই। তোর দাদার কয়েক বিঘা জমি বেইচ্চা জুয়া খেলা শুরু করল, ব্যবসায় চুরি করতে গিয়া খাইলো ধরা। সেই খবরও তোর দাদার কানে আইয়া পড়ল। ইচ্ছামতো দুইডারে উঠানে ফালাইয়া পিডাইলো। তোর দাদার আবার রাগ আছিলো খুব। শরীরের জোরও অনেক। আমার কাছে মাঝে মাঝে আইয়াই আফসোস কইরা কইতো, আমি পোলা দুইডারে মানুষ করতে পারলাম না রে, আকবর। তাই পরামর্শ দিলাম, ব্যবসায়ের দায়িত্ব সুবহানের হাতে ছাইড়া দিতে।”
থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধ। আফসোস করে বললেন,“একসময় গিয়া বুঝলাম, তোর বাপের উপরে তোর দুই চাচার বহুত রাগ।”

“আমার আব্বার উপরে!”
“হ, তাগো ধারণা মতে তোর আব্বাই তোর দাদার কান ভাঙাইয়া সব সম্পত্তি একলা ভোগ করতে চায়। এই গেরামের অনেক মানুষের তো আমগো উপরে হিংসা আছিলো। তাই পোলা দুইডারে উষ্কানি দিতো। আমার নজরুলরেও বহুবার দিছিলো। আমি আগে আগেই টের পাইয়া ওরে বুঝাইলাম। শক্ত হাতে হাল ধরলাম। তাই ওরা আর ভুল পথে যাইতে পারে নাই।
ধীরে ধীরে সেই হিংসা ছড়াইয়া পড়ল বাড়ির বউগো মাঝেও। মুমিনের বিয়ার সময়ও মাইয়া সেই পছন্দ করছে। কিন্তু মর্জিনা ভালা বংশের মাইয়া হওয়ায় এইবার আর তোর দাদায় দ্বিমত করে নাই। হের বাপ আছিলো পালোয়ান। সেই শক্তি সামর্থ্যবান লোক। কিন্তু মর্জিনা আছিলো একটু বেশিই চঞ্চল। মুখের উপরে ঠাসঠুস কথা কইয়া দিতো। যদিও ওর রাগ ওই ঝগড়ার মধ্যেই। পরে ঠিকই মিল্যা যাইতো।”

“আর বড়ো চাচী?”
“ওয় শান্তশিষ্ট, তবে আমারে সবসময় এড়াইয়া চলতো। দেখলেও কথা কইতো না। নাসরিন যেমনে হাইসা কথা কইতো, সালাম দিতো, কিছু বানাইলে দিতো ওয় তেমন আছিলো না। পরে গিয়া বুঝলাম তোর দুই চাচাও আমারে সহ্য করতে পারে না। ওগো ধারণা মতে, নাসরিনের লাইগাই আমি সুবহানরে পছন্দ করি বেশি। হের বহু বছর পর তোর জন্ম হইলো, তোর বাপ-মা কি খুশি! কি খুশি! হেগো জীবনে সুখ থাকলেও শাহ বাড়িত সুখ আছিলো না। রোজ তোর চাচাগো লাইগা ঝামেলা হইতো। পরের বছর যুদ্ধ শুরু হইলো, যুদ্ধের সময় হুনলাম পিঠপিছে ওরা দুই ভাই রাজাকারের লগে হাত মিলাইছে। সেই সংবাদ তোর দাদার কান পর্যন্তও পৌঁছাইয়া গেলো। সেই পিডান পিডাইলো দুইটারে। পিডান খাইয়া আইয়া পড়ল হেরা আমার বাড়ি। দোষ দিলো, আমি নাকি মাইর খাওয়াইছি।
তোর দাদায় মুক্তিযুদ্ধ করল, বাম হাতে গুলি খাইয়া শরীরের একপাশ অবশ হইলো। কিন্তু দুনার লাইগা আমি আর যুদ্ধে যাইতে পারলাম না। কিছুতেই দিলো না।”

“তাইলে এত সুন্দর সংসার রাইখা, আমগো রাইখা মা পলাইলো ক্যান?”
“এহনো তোর মনে হয় যে তোর মা পলাইছে?”
নাজির উত্তর দিলো না। মনে হচ্ছে সে গোলক ধাঁধায় আটকে পড়েছে। যেখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব। আকবর মিয়া বললেন,“শাহ বংশে তোর মায়ের মতন চরিত্রবান, নম্র, ভদ্র বউ আর একটাও আছিলো না। তোর আব্বায় তারে মেলা ভালাবাসতো। যুদ্ধের কয় বছর পর জন্মাইলো নওশাদ। এত সুন্দর দুইডা পোলা, ভালা স্বামী, বিত্তবান শ্বশুরবাড়ি ছাইড়া কোন মাইয়া মানুষ পলায়? কীয়ের অভাব আছিলো তার?”
বরশি নড়ছে। বোধহয় আবার কোনো মাছ উঠেছে। নাজিরের আগ্ৰহ, খেয়াল সেদিকে নেই। সে এখন ঘুরে আকবর মিয়ার মুখোমুখি বসেছে। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,“তাইলে? কই সে? সবাই ক্যান কয় আমার মা পলাইয়া গেছে? ক্যান কয়?”

“তার উত্তর পাইতে হইলে তোরে তোর নানার বাড়ি যাইতে হইবো। তোর নানা-নানী বাইচ্চা নাই। তোর দাদায় যেই বছর মরলো সেই বছরই আমার আর তার ঝগড়া হইলো। জানোস কী লইয়া? তোর চাচাগো লইয়া। জীবনের ওই প্রথম আমগো ঝগড়া হইলো। তোর দাদায় আমার উপরে বেজার হইয়া কথা কওয়া বন্ধ কইরা দিলো। কিন্তু গেরামে ছড়াইলো আমরা নাকি জমিজমা লইয়া ঝগড়া করছি। ফতেহরে নাকি মারার হুমকি পর্যন্ত দিছি। এই কথা কেডায় ছড়াইছে জানোস?”

“কেডায়?”
“তোর বড়ো চাচায়। সেই কথা তোর দাদার কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই এক সপ্তাহ পর সে আমার বাড়িত আইলো, মাফ চাইলো, সম্পর্ক ঠিক করল। রাইতে দুইজনে এক লগে বড়ো বউয়ের হাতের রান্না খাইলাম। বড়ো বউ মানে নজরুলের বউ। উঠানে বইয়া গল্প করলাম। আমারে কইলো, তিন পোলার মধ্যে সব সম্পত্তি ভাগ কইরা দিমু। সুবহানরে দিয়া দিমু ব্যবসা। ওয়ই ভালা সামলাইতে পারবো। তার পরিবার আমার লগেই থাকবো। বাকি দুইডারে আলাদা কইরা দিমু। ওরা জমি কইরা খাইবো। তার পরেরদিন দুপুরেই সেই অঘটনটা ঘটলো। আমার বন্ধুরে কেউ….
কান্নায় ভেঙে পড়লেন বুড়ো। নাজির অবাক চোখে তাকিয়ে শুধু দেখলো। এই চোখের পানি মিথ্যে নয়। মিছে মিছে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে না। আকবর মিয়া পুনরায় বললেন,“আমি বাড়িত নাই। কাশেমরে লইয়া গেছি শহরে। আমার তো বিশাল কাপড়ের ব্যবসা। সেই টাঙ্গাইল থাইক্যা সরাসরি কাপড় আইয়ে দোকানে। কোনো এক ঝামেলা হওয়ায় গেছিলাম। আইয়া হুনি এই খবর। আমি যদি থাকতাম! ওইদিনই যে ক্যান গেলাম? আমি থাকলে এইডা কিছুতেই হইতে দিতাম না। কার এত কইলজা যে আমার বন্ধুর গায়ে হাত তোলে? তার পরেরদিন পুলিশ আইলো। খুনের দায়ে ধইরা নিয়া গেলো আমারে আর আমার নজরুলরে। দুইদিন আটক রাইখা পরে কোনো তথ্য প্রমাণ না পাইয়া ছাইড়া দিলো।”

“তাইলে কেডায় মারছে?”
“পুরা ঘটনা হুইনা তোর কারে মনে হয়? যেইদিন বাড়ি ফিরলাম হেইদিন সুবহান আর নাসরিন আইলো আমার বাড়িত। অনেক কান্নাকাটি করল। মামলা নাকি করছিল আমিরুল আর তার শালা সিরাজে। সুবহান কইলো, প্রথম নাকি লাশ দেখছিল শুক্কুর আলী। সুবহান তহন দুপুরের ভাত খাইতে আইছে বাড়িত। ঘটনা হুইন্না হেয়ই ভাইগো লইয়া গেলো। কিন্তু ততক্ষণে সে আর জীবিত নাই। তারপর ওই বাড়িত যাওয়া আমার লাইগা বন্ধ হইয়া গেলো। আমার লগে যোগাযোগ রাখার লাইগা তোর বাপ-মায়ের লগে ওরা ঝামেলা শুরু করল। একলা পাইয়া কইরা দিলো কোণঠাসা। কয়েক মাস পর জমিজমার ভাগ লইয়া শুরু হইলো অশান্তি।
নাসরিন মাঝেমধ্যেই আমার কাছে আইয়া কানতো আর কইতো, ভাসুর দেওর নাকি ব্যবসা থাইক্যা তাগোরে অধিকার ছাইড়া দিতে কয়। আমি তো আর কিছু করতে পারি না। হাত-পা বান্ধা। বড়ো পোলা আমিরুল। মুমিনেও বড়ো ভাইয়ের পক্ষে। সিরাজের আনাগোনা বাড়লো। ওরা যদি আমারে বাড়িত ঢুকতে না দেয় তাইলে আমার আর কী করার আছে?”

“তার মানে আব্বা সুস্থ থাকতেও ওরা এমন করছে?”
“হ, কয়েক মাস এই অশান্তি চললো। তারপর হঠাৎ এক রাইতে নাসরিন নিখোঁজ হইয়া গেলো। অথচ তার আগেরদিন বিকালেও তোরে আর নওশাদরে লইয়া সে তগো দাদীর কাছে আইছিল। নওশাদ কিছু বোঝে না, মাসুম আর রুহুলের লগে খেলে। তুই আমারে দেখলে শুধু কোলে চইড়া দাড়ি ধইরা টানতি আর কইতি, আমাল নাই ক্যান? আমালেও দেও।”
কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠলেন বুড়ো। একপাশের দুটো দাঁত পড়ে গিয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন,“তোরা তো দুই বিঘা পাইছোস। কিন্তু তগো চাচাগো ভাগে কত বিঘা পড়ছে জানোস কিছু?”

“চৌদ্দ চৌদ্দ কইরা আটাইস।”
শব্দ করেই হেসে দিলেন তিনি। নাজির ভ্রু কুঁচকে নিলো। বুড়ো কী পাগল হয়েছে? তার কৌতূহল দমন করে বললেন,“তোর দাদার প্রায় একশ বিঘার উপরে জমি আছিলো। তাইলে আটাইস বিঘা পায় কেমনে? রেজিস্ট্রি আফিসে যাইস। তুই বিশাল ধনী ঘরে পয়দা হইছোস রে, শাহর নাতি। শুধু ঠইকা গেলি।”
বিস্ময়ে নাজিরের ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে যায়। বৃদ্ধ ফের পূর্বের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন,“স্বামী সন্তানের লাইগা যেই নারীর এত টান সেই নারী কেমনে পলায়? আমি বিশ্বাস করি না। পরেরদিন তোর চাচীরা রটাইলো তোর মায় অন্য পুরুষের লগে ভাইগা গেছে। আর কী কী রটছে সব তো তুই জানোসই। আমার কথা বিশ্বাস না হইলে নিজে যাচাই কর, নাজির। যদি পলায় তাইলে বাপের বাড়ির লগে অবশ্যই যোগাযোগ থাকবো। আমি খোঁজ নিছিলাম কিন্তু ওরা কয় জানে না কিছু। হেরপর আমিও আর কোনোদিন ওই মিহি যাই নাই।”

“তাইলে ওরা খোঁজ নেয় নাই ক্যান?”
“কার খোঁজ নিবো? তগো? এই দুনিয়া স্বার্থের উপরে চলে, নাজির।স্বার্থের সামনে সম্পর্কের কোনো দাম নাই। তোর মায় ধনী ঘরের মাইয়া। কইছিলাম না? তোর দাদার নিষেধাজ্ঞার পরেও ওয়ারিশ আনছিলো। তোর মামারা তা দিতে চায় নাই। বোইন গেলে গা তাগোই তো লাভ। তগো খোঁজ নেওয়া মানে ওইসব হাতছাড়া করা। চাইর ভাইয়ের পর তোর মায় বাপের একমাত্র মাইয়া। তাই ভাগে সম্পত্তিও বেশি।”
এসব কথা নাজিরের অজানা। বড়ো চাচা বলেছিল, মামারা নাকি জানতো মায়ের সম্বন্ধে। মায়ের কথাতেই তারা কখনো তাদের খোঁজ নেয়নি। অথচ!

ভেতরটা কাঁপছে নাজিরের। মনে হচ্ছে, অতল এক সমুদ্রে পড়েছে সে। যেখান থেকে সাঁতরে পাড়ে ওঠা অসম্ভব। এত বছরের বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে। বুড়োর কথা বিশ্বাস করতে চায় না মন। নিশ্চয়ই বুড়ো সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ করে তাকে ভুল পথে পরিচালিত করতে চাইছে। অপরদিকে মস্তিষ্ক বিদ্রোহ করে বলছে, তুই বোকা, নাজির। ভীষণ বোকা। এতগুলো বছরেও নিজ থেকে একটু খোঁজ নিলি না? ওই পিশাচদের কথা বিশ্বাস করে নিলি? ওরা কী কখনো তোর ভালো চেয়েছিল? কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“আর আমার আব্বায়?”

“যেইদিন তোর মায়ের পলানোর খবর রটলো হেইদিন ভোরেই তোর বাপের দেহ পাওয়া গেলো নদীর পাড়ে। প্রথম দেখছিল সামাদের বাপে। দেইখাই সোজা সে আমারে আইয়া জানাইলো। আমি তহন উঠানে বওয়া। খবর পাইয়া নজরুলরে লইয়া দৌড়াইলাম। হাসপাতাল নিয়া ভর্তি করাইলাম। সম্ভবত কেউ ভারী জিনিস দিয়া অনেক পিডাইছিলো। তাই পায়ের হাড় ভাঙছে, জিভ কাটতে গিয়া ভুলবশত ধারালো জিনিস পায়ের উপর পইড়া গিয়া আঙুল কাটছে। কথাগুলো ডাকতারে কইছে। ওইখান থাইক্যা ঢাকায় পাঠাইলো। খবর হুইন্না তোর চাচারা ছুটলো। পরে আর আমগো লগে দেখা করতে দিলো না। বরং সব দায় চাপাইলো আমার উপরে। কিন্তু আগের বারের লাহান এইবারও আর কিছু প্রমাণ করতে পারলো না।

বিচার ডাক দিলাম আমি। কইলাম তগো দুই ভাইয়ের দায়িত্ব যাতে আমারে দেওয়া হয়। কারণ আমার মনে সন্দেহ জাগছে। যদি পরের আঘাত তগো উপরে আইয়ে? যারা অত বড়ো বড়ো তিনডা মাইনষের এই অবস্থা করতে পারে তাগো লাইগা ওই পোলাপাইন দুইডা মারতে কতক্ষণ? কিন্তু চেয়ারম্যান রাজি হইলো না। তহন নতুন চেয়ারম্যান এই আতাউরে হইছে। শেষে আমি কইলাম, তগো যদি কিছু হয় তাইলে সব দায়ভার আমিরুল, মুমিনুল শাহর। তাই হয়তো শেষ পর্যন্ত….

আর কথা বাড়ান না আকবর মিয়া। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেলো টেরই পাননি। বাড়ি ফিরে মাগরিবের নামাজের সাথে আছরেরটা কাযা পড়তে হবে। ঘাড় কাত করে তিনি নাজিরের দিকে তাকান। ছেলেটার কঠিন মুখটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। হয়তো পায়ের তলার শক্ত মাটিতে ফাটল ধরেছে। নাকি ধরেছে এতকালের বিশ্বাসে? আকবর মিয়া বুঝতে পারেন, ছেলেটা তাঁর কথা এখনো ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। মিলছে না তার হিসাব। তবুও তিনি শান্তি পান। বহু বছর ধরে গোপন রাখা কথাগুলো, চিন্তাগুলো উগড়ে দিতে পেরে। নরম স্বরে বলেন,“শাহরা কয় আকবর মিয়ায় নাজির শাহর লগে তার নাতনি বিয়া দিছে খারাপ মতলবে। কিন্তু আকবর মিয়া যে ওই ছোট্ট এক নাতনির নাম কইরা নাজির শাহরে আসলেই কী দিছে সেইডা সময় কইবো। তোর হাতে আমি আমার আসল হাতিয়ার তুইল্যা দিছি, নাজির। আইজ হয়তো বুঝবি না, তবে সময় আইলে ঠিকই বুঝবি। সেই মুহূর্তে এই বুইড়ার প্রতি তোর সমস্ত রাগ, ঘৃণা হয়তো অদৃশ্য হইয়া যাইবো। শুধু দেখার লাইগা এই দুনিয়াত থাকবো না এই আকবর মিয়া।”

আকবর মিয়া বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বাড়িতে না গেলে নাতিগুলো চিন্তায় গ্ৰাম মাথায় তুলবে। লুঙ্গি ঠিক করতে করতে বললেন,“আমার জীবনের এই সুদীর্ঘ পথ, গন্তব্যহীন যাত্রা হয়তো ফুরাইলো। আমি মরলে এই বিশাল দুনিয়ার কিছুই আইবো যাইবো না। সব আগের মতোই চলতে থাকবো। হয়তো কোথাও নতুন কেউ জন্ম নিবো! আচ্ছা, আমি মরলে আমার লাইগা দোয়া করবি তো, নাজির? আফসোস করবি একটু? আমি জানি, একদিন তুই সব আন্ধার সরাইয়া আলোর দেখা পাবি। তোর জীবনে মুক্তির আনন্দ আইবো। তহন পারলে এই বুইড়ারে মাফ কইরা দেইস, দাদা। কবরের ধারে আইয়া একটু না হয় বসিস। ওই একলা আন্ধার কবরে থাকতে আমার খুব কষ্ট হইবো রে, নাজির। খুব কষ্ট হইবো।”
কী করুণ শোনালো বৃদ্ধর কণ্ঠস্বর! নাজির অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাঁর যাওয়ার পথে। অবয়ব মিলিয়ে যেতেই সে লম্বা হয়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল। নাজির জানে, পৃথিবীর যত শত্রুতা ও অনিষ্ট সব আপন মানুষেরাই করে।

জগ, কলসি ভরে ঘরে পানি এনে রেখে বারান্দার বসে দুই হারিকেনে কেরোসিন তেল ভরছে মিছরি। একটু পরেই মাগরিবের আজান দেবে। অন্ধকার নামবে ধরণীতে। শরীরটা ব্যথা করছে, এক দুপুর ঘুমানোর পরেও এখন ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কলিমের মায়ের যাওয়ার সময় হয়েছে। তাই ফরিদাকে ডাকলো। ফরিদা টাকা হাতে দিতেই গুনতে গুনতে বলে উঠলো,“কম লাগতাছে, ভাবি। বাকি ট্যাহা কই?”
ফরিদা আঁচলে চাবি বাঁধতে বাঁধতে বললেন,“নাজিরে তো আইজ ট্যাহা দিলো না। ভুইলা গেলো নাকি?”
মিছরি কথাটা শুনেই দৌড়ে ঘরে গেলো। টাকার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে। তোশকের নিচ থেকে টাকা এনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বললো,“এই যে টাকা।”

দুজনেই তার দিকে তাকালেন। ফরিদার ললাট কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেলো। জিজ্ঞেস করলেন,“নাজিরে দিয়া গেছে?”
“হ্যাঁ, বললেন চাচী যাওয়ার সময় যেন দিয়ে দেই। কিন্তু আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনাদের কথা শুনে মনে পড়ল।”
“সবসময় তো আমার হাতেই দিয়া যায়।”
কলিমের মা উঠে এলেন। টাকাটা নিয়ে বললেন, “এহন বাড়িত বউ আইছে। চাচীগো হাতে কী আর দিবো?” গোনা শেষে পুনরায় বললেন,“এনে আবার চল্লিশ ট্যাহা কম ক্যান?”
“কাজ যা করেছেন সে অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়েছে। আজ কম কাজ, তাই কম টাকা।”
“কম কাম করছি মানে?”

“আপনার কাজ ছিল আমার শ্বশুরকে খাওয়ানো, ঘরদোর আর গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা। কিন্তু সেসব কাজ আজ আমি করেছি। আপনি শুধু আমাদের ভাগে বাড়ির ওই পেছনের দিকটা একটু লেপেছেন। তাই সেই অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়েছে।” নাজিরের শেখানো বুলিগুলোই আওড়ালো সে। মহিলার মুখটা হয়েছে একেবারে দেখার মতন। অবশেষে একটু হলেও মিছরির মনে শান্তি লাগছে।
কলিমের মা ত্যাছড়া স্বরে বললেন,“কইলেই হইবো? নাজির জানে? নাকি বাকি ট্যাহা মাইরা দিছো?”
“আমি এমন ঘরের মেয়ে নই যে সামান্য ক’টা টাকা মেরে দেবো। আর দিলে দিলাম। তাতে আপনার কী? আমার স্বামীর টাকা। সংসারের যাবতীয় দায়িত্বও আমারই।”

“তাইলে আমিও আর কাম করমু না। তুমিই করো গিয়া তোমার সংসারের কাম।”
“প্রয়োজন হলে তাই করবো। কাজের লোকের অভাব পড়েছে নাকি? বিষ দাঁতওয়ালা কাজের লোক আমার লাগবে না। আমার বাপের বাড়িতে খবর পাঠালে বিনে পয়সায় কাজের লোক দিয়ে যাবে।”
মুখ বাঁকিয়ে হারিকেন নিয়ে শ্বশুরের ঘরে চলে গেলো মিছরি। সেও কী কথা কম জানে নাকি? শুধু একটু লাজুক, আর বাবার বাধ্যগত মেয়ে। তাই ভদ্রতার খাতিরে এতদিন চুপ ছিল।
কলিমের মা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। ফরিদার উদ্দেশ্যে বললেন,“দেখলেন, ভাবি? মাইয়ার চোপা বাড়ছে।”

ফরিদা সবই দেখলেন কিন্তু কিছু বললেন না। ঘরে চলে গেলেন। শ্বশুরের ঘরে আলো দিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে একেবারে অযু করে ঘরে এলো মিছরি। আজান দিতেই পড়ে নিলো নামাজ।
নাজির বাড়ি ফিরলো এশার খানিক পর। ক্লান্ত শ্রান্ত দেহ নিয়ে ফিরে সোজা গোসল করে এলো। লোকটার এসব কার্যকলাপ মিছরির মোটেও পছন্দ নয়। হুটহাট গোসল করে কবে যেন নিউমোনিয়া বাঁধায়। বিছানায় পা দুলিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে সে বললো,“আজও আপনি দেরি করে ফিরেছেন। একা একা যে আমার ভয় করে, বলেছি তো আপনাকে।”

নাজিরের মুখটা ফ্যাকাসে। দরজা আটকে স্ত্রীর দিকে তাকালো। মেয়েটাকে শাড়ি পরলে একেবারে বউ বউ লাগে। নাজির শাহর বউ! নাজির চমকে ওঠে। এই মেয়েটা আসলেই তার বউ। বউ মানেই শান্তি শান্তি একটা শব্দ। নিজের মানুষ, যার কাছে সমস্ত লাজ লজ্জা ভুলে যাওয়া যায়। যার কাছে সমস্ত কিছু বলা যায়। নাজিরের মাথা আজ আর কাজ করছে না। এই জীবনে দুঃখের সময় কখনো জড়িয়ে ধরার মতো কাউকে সে পায়নি। তবে আজ এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো নিজের স্ত্রীকে।
আচমকা এমন কান্ডে মিছরির শরীরটা দুলে উঠলো। লোমকূপ খাঁড়া হয়ে গেলো। কিশোরী মনে উঠলো ঝড়। তার জীবনে প্রথম এত গভীর স্পর্শ নাজির শাহ নামক পুরুষটির। যেখানে বিস্ময় আছে কিন্তু ভয় বা ক্ষতি নেই। কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“কী হয়েছে আপনার?”

যাত্রাপথ পর্ব ৩২

“তোমার শরীর গরম ক্যান?”
“জানি না।”
নাজিরের হাতের বাঁধন আরো শক্ত হলো। মেয়েটার নরম হাড়গোড় যেন ভেঙে যাবে আজ। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালো সে মিছরির দিকে। মিছরি সেই দৃষ্টির ভাষা বোঝে না। তাই শুধু চেয়ে রইল। বইয়ের পাতার মতো পড়ার চেষ্টা করল গভীর এক জোড়া চোখ। কিন্তু বেশি সময় তাকে দেওয়া হলো না। হঠাৎ তার নরম ঠোঁট দুটোতে গভীর, নরম ছোঁয়া লাগলো। ভিন্ন ঠোঁটের ছোঁয়া!

যাত্রাপথ পর্ব ৩৪