Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৩৫

যাত্রাপথ পর্ব ৩৫

যাত্রাপথ পর্ব ৩৫
মাশফিত্রা মিমুই

গরমে হাঁসফাঁস করছে মিছরি। জ্বরের উত্তাপ কমেছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে সারা দেহ ভিজে উঠেছে ঘামে। পরনের পোশাক স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গায়ে লেপ্টে আছে। অস্বস্তি নিয়ে ঘন শ্বাস ফেলে নড়তে চেয়েও সে পারলো না। ভারী কোনো বস্তু আষ্টেপৃষ্ঠে যেন জড়িয়ে রেখেছে তাকে। বাধ্য হয়েই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো সে। পাশে শোয়া পুরুষকে দেখে চমকালো। বাঁধন থেকে মুক্ত হতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে থেমে গেলো একসময়। হঠাৎ তার দিকে চোখ খুলে তাকালো নাজির। বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বললো,“নড়ো ক্যান, বউ? এতক্ষণে ঘুম ভাঙছে? জ্বর কী কমছে? দেহি।”

অস্থির হাতটা স্ত্রীর কপালে, গলায় ছোঁয়ালো নাজির। খানিক পর ফেলল স্বস্তির নিঃশ্বাস।পিঠে হাত ঠেকিয়ে বললো,“হ, কমছে। ঘামাইয়া কী অবস্থা! গলায় এইডা কীয়ের দাগ? ইশ্ খয়েরী হইয়া গেছে।”
লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলো মেয়েটি। মুখ লুকালো স্বামীর বুকে। নাজির বিষয়টা বুঝতে পারলো হয়তো। তাই হাসলো,“আহ, কি লজ্জা আমার বউয়ের! যাও গিয়া গোসল কইরা আইয়ো।”
“সকালে করেছি।”
“তো? সকালেরটা সকালে গেছে গা। এহন আবার করতে হইবো। না হইলে খারাপ লাগবো, রাইতে আর ঘুমাইতে পারবা না।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বলেই শোয়া থেকে উঠে বসলো নাজির। সাথে টেনে তুললো মিছরিকেও। মিছরির মুখ ভার। ঘুম থেকে উঠলেই শরীর দুর্বল লাগে তার, ইচ্ছে করে সারাদিন বসে থাকতে। এখানে আসার পর থেকে গোসল করতে তো আরো ভালো লাগে না। তবুও নাজির তাকে ধমকে, ঠেলেঠুলে পাঠালো।
পোশাক নিয়ে দুর্বল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কলপাড়ের কাছে যেতেই শোনা গেলো বাচ্চাদের হইচই। দড়িতে কাপড় ঝুলিয়ে সেদিকে দৌড়ালো মিছরি। মুহূর্তেই যেন তার সমস্ত ক্লান্তি, অসুস্থতা হারিয়ে গেলো কোথাও। চালতা গাছের ডালে বাঁধা দোলনায় দোল খাচ্ছে সুমা। আব্দুল্লাহ আর পাশের বাড়ির সমবয়সী রানা, মুনিয়া ঘাসের উপর অপেক্ষায় বসে আছে কখন তাদের পালা আসবে। মিছরি এগিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,“এই দোলনা তো আগে ছিল না। কবে বানালে? দেখলাম না তো।”
দুলতে দুলতেই জবাব দিলো সুমা,“আইজ দুপুরে।”

“আমাকে দুলতে দিবে? কয়েকবার দোল খেয়ে নেমে যাবো।”
নিচ থেকে মুনিয়া মুখ বাঁকিয়ে বললো,“হেরপর আমি দোল খামু।”
“তো খেও। নিষেধ করেছে কে? আমি একটু দোল খেয়েই গোসল করতে চলে যাবো।”
সুমা কর্কশ কণ্ঠে বললো,“দিমু না, যাও তুমি।”
“কেন?”
“তুমি মুটকি, আমার দোলনায় বইলে ছিঁড়া যাইবো। যাও এন্তে!”
শেষ কথাটা চিৎকার করেই বললো। মন খারাপ হয়ে গেলো মিছরির। খারাপ আচরণ সে একদম নিতে পারে না। এই বাড়ির মানুষগুলো সবকটাই অসভ্য।গিরগিটির মতো রূপ বদলায়। এই মধুর মতো মিষ্টি ব্যবহার তো এই আবার করলার মতো তিতা। নাজির বারান্দায় এসে সবে দাঁড়িয়েছে। চেঁচামেচি শুনে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলো স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। ধমকালো সে,“এনে কী, তাল মিছরি? কহন গোসল করতে পাঠাইছি? আমি আইলে কিন্তু পুসকনিত ফালাইয়া চুবামু।”

মাথা নিচু করে কলপাড় চলে গেলো মিছরি। সে যেতেই ঘর থেকে খেজুর পাতার পাটি এনে বারান্দায় বিছালো নাজির। খাবার ঘর থেকে খাবার বেড়ে এনে সবকিছু সাজিয়ে বসলো পাটিতে। ঘরের ভেতর গরম থাকলেও বাইরে ঠান্ডা বাতাস।
মিছরি গোসল সেরে উঠোন পর্যন্ত এসে একপলক তাকালো সেদিকে। মুখ ভার করেই কাপড় মেলে চুল ঝাড়তে লাগলো।নাজির তাড়া দিয়ে বললো,“এতক্ষণ লাগে গোসল করতে? এক্কেবারে আইলসা মাইয়া। এনে আইয়া বও।”
বাধ্য মেয়ের মতো মিছরি এসে বসলো লোকটার মুখোমুখি। নাজির টেনে নিলো তার হাত। দেখে বললো,“ব্যান্ডেজ ভিইজ্জা গেছে। খুইলা ফেলো।”

তারপর নিজেই কচুর লতি দিয়ে ভাত মাখালো। লোকমা পাকিয়ে মুখের সামনে ধরতেই নাকমুখ কুঁচকে নিলো মিছরি। বললো,“খাবো না এটা। গলা ধরবে।”
“খাওন লইয়া রংঢং করবা না। এই লতিতে গলা ধরে না। আমার ক্ষেতের লতি।”
“আপনার কচু ক্ষেতও আছে?”
“হ, হা করো এইবার।”
হা করল মিছরি। মুখে নিয়ে চিবোতে লাগলো। নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“বউ কেডা? আমি না তুমি?”
“হ্যাঁ?” প্রশ্নটা ঠিক বুঝলো না মিছরি।
“জিগাইলাম ঘরের আসল বউ কেডায়? আমার তো মনে হইতাছে আমিই বউ আর তুমি হইলা আমার জামাই। না হইলে কয়জন জামাই তার বউয়ের এমন সেবা যত্ন করে? বাবাগো! অসুখ হইলে সেবা করতে হয়, গোসলে পাঠাইতে হয়, আবার দুইবেলা মুখের সামনে খাওন আইনা খাওয়াইয়া পর্যন্ত দিতে হয়, রাগ ভাঙাইতে হয়। অথচ ঠিকই বিয়ার রাইতে আমারে থুইয়া পলাইয়া যাওয়ার ফন্দি আঁটছিলি দুই ভাই- বোনে। অন্য ব্যাডারে বিয়া করলে পাইতি এই আদর-সোহাগ?”

“খোঁটা দিচ্ছেন?”
“নাজির কাউরে খোঁটা দেয় না। চোখে আঙুল দিয়া ভুলগুলা দেখাইতাছি।”
“এটা আপনার দায়িত্ব।”
“আমার?”
“হ্যাঁ, আমার জ্বর এসেছে কীভাবে?”
“কেমনে?”
“আপনার জন্য। আপনিই আমাকে দিয়ে কঠিন কঠিন কাজ করিয়েছেন। আঙুল কেটেছে কীভাবে?”
“তোমার অসাবধানতায়।”
“জ্বি না, ভুল। আপনার বাড়ির কাজ করতে গিয়েই কেটেছে। কাজের সময় আপনি কেন আমার মাথায় এসে নৃত্য করবেন?”
“আমি নৃত্য করছি! কহন? আমি বারান্দায় বওয়া আছিলাম।”
“আপনার সাথে তর্কে যেতে চাইছি না।”
“পারলে তো যাইবা। বউ হিসাবে তোমার কোনো দায়িত্ব নাই?”
“আছে।”
“পালন করো না ক্যান?”
“শিখিয়ে দেন না কেন?”
“এইডাও এহন আমার দোষ? হা কর।”

মুখ মলিন করেই চুপচাপ খেতে লাগলো মিছরি। শ্বাস ফেলে নাজির বললো,“মন দিয়া সংসার করবা, শুধু আমার কথা হুনবা, কারো লগে অকারণে তর্ক করবা না, না কইয়া বাপের বাড়িও দৌড় দিবা না, আর বলদের মতো সবাই যা কইবো তাই করতে যাইবা না।”
“কেন? আপনি কোথায় যাবেন?”
“যামু এক জায়গায়। কাইল সকালে খাইয়া বাহির হমু, ফিরতে দেরি হইতে পারে।”
“কোন জায়গায়?”
প্রশ্নের উত্তর দিলো না নাজির। দৃশ্যটা বিথীর চোখেই সর্বপ্রথম পড়ল। নাজির থাকায় কিছু বললো না। বরং ডেকে আনলো মর্জিনাকে। মর্জিনা এদের কান্ড দেখে অবাকই হলেন। সিঁড়িতে বসতে বসতে বললেন,“এই দিন দেখার লাইগাই মনে হয় বাইচ্চা আছিলাম। আমগো ঘাউড়া নাজিরও শেষমেশ বউ লইয়া রংঢং শুরু কইরা দিছে।”
আচমকা কাউকে দেখে মিছরি নড়েচড়ে উঠলো। লজ্জায় মাথা নাড়ালো, আর খাবে না। নাজির চোখ রাঙালো। শাসিয়ে চাপা স্বরে বললো,“সবটি ভাত না খাইয়া উঠলে দুইদিন খাওন দিমু না। মাইনষের কথায় দৌড় মারতে হইবো ক্যান?”

ভয়ে ঠাঁই বসে রইল মিছরি। চুপ করে খেতে লাগলো। নাজির চাচীর উদ্দেশ্যে বললো,“কী করমু কন, প্রাণের চাচী? ব্যাডা মাইনষের জাত, বাহিরে কঠোর কিন্তু বউয়ের কাছে আইলেই আত্মা হইয়া যায় নরম।”
“তা দেখতেই পাইতাছি। আমার জামাইরে তো আর কম খোঁচা দেস নাই।”
“আমনের জামাইরে ভুল কিছু কই নাই। সে তো আসলেই বউ পাগলা।”
“আর তুই?”
“আমি সোয়ামি, নিজের দায়িত্ব পালন করতাছি।”
“নিজের বেলা ষোলো আনা! ফাজিল।” পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“তোর বউয়ের হাতে কী হইছে? জামাইরে দিয়া কষ্ট করাও ক্যান?”
“হাত কাইট্টা গেছে। সামিউল ভাইয়ের বউডা এইবার আমার বউয়ের উপরে নির্যাতন শুরু করছে।”
বিথী আঁতকে উঠলো,“হায়হায়, কবে অত্যাচার করছি? মিছা অপবাদ দিবেন না।”
“আমনে চুপ থাকেন, ভাবি। আমি সবই দেখি। আমার ছুডো বউডার কিছু হইলে আমি আমনের নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করমু।”

মর্জিনা বললেন,“আমি তো তোরে আগেই কইছিলাম, বড়োজন আর তার ঘরের সবকয়ডা বাটপার। আমার লগে খা। কিন্তু হুনলি না। এহনো সময় আছে, আমার ভাগে আইয়া পড়।”
“আমনেরা সবটিই এক। আমনে আমার বউ দিয়া আরো বেশি কাম করাইবেন। যেই ফাঁকিবাজ আমনে!”
“হ, সবসময় খালি আমার দোষ দেহোস।”
বিপরীতে চুপ রইল নাজির। খাওয়ানো শেষে হাত ধুয়ে জিজ্ঞেস করল,“সবই তো ঠিক আছিলো। তাইলে মুখ এমন কইরা রাখছো ক্যান? হইছে কী?”
নাক টানলো মিছরি। অভিযোগের সুরে বললো, “একটু দোলনায় চড়তে চেয়েছি তাই সুমা আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। আমাকে মুটকি বলেছে, আমি বসলে নাকি ওর দোলনা ছিঁড়ে যাবে। আমি কী এত মোটা?”
এঁটো থালাবাসন গুছিয়ে নাজির কলিমের মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,“এইগুলা একটু ধুইয়া আনেন তো, চাচী। আমি পারি না এইসব।”

নাজিরের মুখের উপর না করলেন না তিনি। চুপচাপ নিয়ে গেলেন সামনে থেকে। নাজির বসা থেকে উঠে চালতা গাছের দিকে এগিয়ে উঁচু স্বরে বললো,“এই সুমা! তুই তোর চাচীরে কী কইছোস?”
“কই, কী কইছি?”
“মুটকি কইছোস ক্যান? একটা থাপড়া মাইরা তোমার জাউড়ামি ছুডাইয়া দিমু। ইশকুলে এইসব শিখায়?”
কথাগুলো কিছুটা কঠিন শোনালো। সুমা নাক ফুলিয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। এই যেন কেঁদে দেবে। বিথী দৌড়ে এলো। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললো, “এমনে বকেন ক্যান? পোলাপাইন মানুষ কী না কী কইছে তা ধরতে হইবো? আমনের বউই বা কেমন যে পোলাপাইনের নামে বিচার দেয়?”
“পোলাপাইন পোলাপাইনের মতন থাকবো। বড়ো গো লগে এমন আচরণ করবো ক্যান? মুটকি আবার কেমন শব্দ? পাড়ার মহিলাগো লগে কুইটনামি না কইরা মাইয়ারে ঠিকমতো মানুষ করেন। আর কহনো এমন কথা হুনলে পানিত ফালাইয়া দিয়া আইমু।”
সুমা ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো,“আমার দোলনায় চড়তে চাইছে, মা!”
কথাটা শুনেই বিথী বললো,“দেখছেন, এমনি এমনি কয় নাই। ডিঙি মাইয়া মাইনষের ক্যান দোলনায় চড়তে হইবো?”

“চড়লে চড়বো, আমনেগো কী? দোলনা তো আমিই বাইন্ধা দিছি। আমার বউ চড়লে অসুবিধা কী?”
নাজিরের সাথে মুখ লাগালো না বিথী। কথায় যে পারবে না তা সে জানে। তাই মেয়েকে নিয়ে ঘরে চলে গেলো। নাজির ভেতরে এসে একই স্বরে বললো, “আমার বউরে আমি মারমু, বকমু আবার ওরে লইয়া আমিই ঢং করমু। এইডা আমার স্বামীগত অধিকার। কিন্তু আমি ছাড়া অন্য কেউ করলে তার অবস্থা খারাপ কইরা দিমু কইয়া দিলাম।”
আঁচলে মুখ ঢেকে মুচকি হাসলো মিছরি। মুখমন্ডলের সমস্ত মলিনতা কেটে গিয়ে সূর্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। নাজির আড়চোখে তা দেখে এগিয়ে গেলো গোয়াল ঘরের দিকে। মিল্টন আর লতিফ এসেছে।

দূর গাছে একনাগাড়ে কাক ডাকছে। রোদের উত্তাপ রোজকার মতোই। সকালের খাবার খেয়ে নাজির বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। গন্তব্য শ্রীপুরের উজিলাব গ্ৰাম। গ্ৰামের মহাসড়কে গাড়ি সচরাচর পাওয়া যায় না। ঘণ্টার মধ্যে দুয়েকটা টেম্পুর দেখা মিলে তবে তাও মাঝেমধ্যে।
নাজির চা খেতে খেতে রাস্তায় নজর রাখছে। সুজন এসে বসলো পাশে। দোকানিকে চায়ের নির্দেশ দিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,“মিছরি কেমন আছে?”
ঘাড় ফিরিয়ে একবার পাশে তাকালো নাজির। চায়ের কাপের শেষ চা টুকু মাটিতে ফেলে পুনরায় তাকালো রাস্তায়। মাথা নাড়িয়ে বললো,“ভালাই।”
“আমগো উপরের রাগ ওর উপরে ঝাড়িস না। ছুডো মানুষ, মনডাও নরম। বুঝাইলে সব বুঝে।”
“নিজের বউয়ের উপর অন্যের রাগ ঝাড়মু ক্যান?”
“কোথাও যাইবি?”

“হ, জেলা শহরে যামু একটু। কাম আছে।”
“মিছরিরে আমগো বাড়িত দিয়া যাইতি তাইলে। চাচী অনেক চিন্তায় আছে। সেদিন তো না খাইয়াই আইয়া পড়ছে।”
“ঘনঘন বাপের বাড়ি গেলে আমগো বাড়ির বাকি মহিলারা বাঁকা চোখে দেখবো, হিংসা করবো, একলা পাইয়া কথাও হুনাইবো। পরে কোনোদিন না হয় যাইবো।”
আজ ছেলেটার মাথা ঠান্ডা, গলার স্বরও নরম। কথা বলছে সুন্দর করে। সুজন অবাকই হলো। এমন সুন্দর আচরণ নাজিরের থেকে সে আশা করেনি। দূর থেকে টেম্পুর সাইরেনের আওয়াজ হলো। নাজির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করল,“তুমগো বাড়ির বুইড়ার কী খবর? কয়দিন ধইরা দেহি না।”
“বাড়ি থাইক্যা কম বাহির হয়। কয়দিন ধইরা অসুখ।”
“ডাক্তার দেহাও না ক্যান? বয়স হইলে যে কত রোগ দেহা যায়! কবিরাজ বাদ দিয়া হাসপাতালে লইয়া যাও।”
“গত সপ্তাহে নিছিলাম।”
“আচ্ছা, যাইগা।”

হাতের ইশারায় টেম্পু থামিয়ে সে উঠে বসলো তাতে। সুজন আশ্চর্যই হলো। চায়ের স্বাদ কেন যেন বিচ্ছিরি লাগছে তার কাছে। টাকা দিয়ে বসা থেকে উঠে চলে গেলো বাড়ির পথে।
তখন মধ্য দুপুর। যহরের আজান হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। নির্দিষ্ট গ্ৰামে পৌঁছে বিপাকে পড়ল নাজির। সব তার কাছে অচেনা। পূর্বে এই গ্ৰামে সে আসেনি। আসার প্রয়োজনও পড়েনি। দোকানপাট সব বন্ধ। ধূ ধূ মরুভূমির মতো শূন্য পড়ে আছে পথঘাট। তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাজির। উজিলাব গ্ৰামের অজানা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করতে লাগলো,“শালারা মরছে নাকি?”
কিছুটা পথ এগোতেই আচমকা দেখা মিললো এক হাফ প্যান্ট পরা বাচ্চা ছেলের। নাজির তাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল,“বাতেন সরকাররে চিনো?”

ছেলেটি দুদিকে মাথা নাড়ালো,“না।”
অসন্তুষ্ট হলো নাজির। ত্যাছড়া স্বরে বললো, “এলাকার আর মানুষ কই? মরছে?”
“এই দুপুরবেলা আর কই থাকবো? বাড়িত হেরা।”
“তোমার দাদা আছে?”
“না, দাদী আছে।”
“লইয়া চলো। হেগো জিগাইলে মনে হয় চিনবো।”
ছেলেটা সঙ্গে করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেলো তাকে। টিনের চৌচালার এক জোড়া মাটির বাড়ি। হাঁস, মুরগির ল্যাদা দিয়ে ভরে আছে উঠোন। গন্ধে নাক চাপলো নাজির। হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল তার বাড়িতেও আছে কিন্তু এত গন্ধ তো কখনো পায়নি। ছেলেটা দাদী আর মাকে ডেকে আনলো। মা জিজ্ঞেস করল,“কারে খোঁজেন?
নাজির কৃত্রিম হাসলো,“বাতেন সরকারের বাড়িটা কোনদিকে জানেন? পথঘাট ফাঁকা, কাউরে যে জিগামু সেই উপায়টুকুও নাই।”

মহিলা শাশুড়ির দিকে তাকালেন। বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন,“কোন বাতেন? এলাকা কোনডা?”
“এলাকা জানলে তো হইতোই। বাতেন সরকার তাঁর নাম। কিন্তু বাইচ্চা নাই। তার বউ বাইচ্চা আছে কিনা তাও সন্দেহ। তবে সন্তান চাইরডা। ছুডো মাইয়ার নাম নাসরিন।”
বৃদ্ধা মনে করার জন্য সময় নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর জবাব দিলেন,“হেয় তো এই পাড়ায় থাহে না, বাপ। সরকার বংশ অন্য পাড়ার। বউ, জব্বার কই? হেরে ডাক দিয়া কও ওরে বরকত সরকারের বাড়ি পর্যন্ত দিয়া আইতো।”
মহিলাটি শাশুড়ির কথামতো স্বামীকে ঘর থেকে ডেকে আনলেন। লোকটা বোধহয় সবে দুপুরের খাবার খেয়ে শুয়েছিল। হঠাৎ বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটায় ললাটে ফুটে উঠেছে বিরক্তির ভাঁজ। মায়ের আদেশে বললেন, “আমার লগে আইয়েন।”

নাজির চুপচাপ তার পিছুপিছু হাঁটতে লাগলো। নির্দিষ্ট বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশি একটা সময় লাগলো না। তাকে ফটক পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলেন জব্বার।
চারিদিকে শুধু টিনের চালার মাটির ঘর। তবুও বাড়ি, উঠোন চকচক করছে। মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই লেপা হয়েছে। গৃহস্থ বাড়িতে সাড়াশব্দ নেই। দুপুরের খাবার খেয়ে ভাত ঘুম দিয়েছে হয়তো। হাঁক ছেড়ে ডাকতেই একজন মহিলা তাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে বসালো একটি চেয়ারে। বেশ কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে হাজির হলেন একজন বয়স্ক লোক। চুল, দাড়ি আদ্যোপান্ত পেকে গিয়েছে। পরনে লুঙ্গি আর একটি সাদা হাতাকাটা গেঞ্জি। যার মধ্যে ফুটো আছে তিনটি।
নাজির সালাম দিলো। লোকটা সালামের জবাব নিয়ে তার থেকে কিছুটা দূরে দোলনা চেয়ারে বসে হুক্কায় টান মারলেন। তাকে আপাদমস্তক দেখে ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করলেন,“কই থাইক্যা আইছেন?”

“বনখড়িয়া।”
ভ্রু যুগলের মাঝখানের সমান স্থানটা কুঁচকে গেলো লোকটার। নাজির বললো,“বাতেন সরকার তো নাই, তাই না?”
“না, মারা যাওয়ার অনেক বছর পার হইছে।”
“তাঁর বউ আছে?”
“না, সেও মারা গেছেন।”
“আপনি?”
“আমি তেনার বড়ো পোলা, বরকত সরকার। আমনে কেডা? এত বছর পর আমার আব্বা-আম্মার খোঁজে আইছেন? যহন আব্বা মরছে তহন আমনে দুনিয়াত আছিলেন কিনা তাও সন্দেহ।”
নাজির সামান্য হাসলো,“দুনিয়াত আছিলাম কিন্তু ছুডো ছিলাম। আমনের বাকি ভাই-বোনেরা কই?”
“ভাই হইলো দুইডা, হেরা ঘরেই আছে। আমনের বয়সী হেগো পোলাপাইনও আছে। যা কওয়ার আমারে কইতে পারেন।”
“তাগোও ডাকেন। আইছি যেহেতু সবার সামনেই কথা কইয়া যাইগা।”
বরকত সরকার হাঁক ছাড়লেন,“মামুন! মেহমানরে খাতিরদারির ব্যবস্থা করতে ক। আর তোর চাচাগো ডাইকা লইয়া আয়।”

“খাতিরদারির কোনো প্রয়োজন নাই। আমার কাম শেষ হইলেই বিদায় নিমু।”
“তা কইলে তো হয় না। অতিথি আপ্যায়ন করা আমগো নিয়ম।”
নাজির চুপ রইল। লোকটা জিজ্ঞেস করলেন,“আমার আব্বারে কেমনে চিনেন? এত বছর পর হঠাৎ খোঁজে আইলেন যে? বনখড়িয়া গেরামের কোন বাড়ির পোলা আমনে?”
নাজির সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। একজন মহিলা এসে তার সামনে কয়েক পদের বিস্কুট, চানাচুর, মিষ্টান্ন আর কমলার দানা রেখে চলে গেলেন। নাজির সেসব ছুঁলো না পর্যন্ত। এই বাড়িতে পানিও সে পান করবে না। বাকি দুই ভাই এসে বসলো বড়ো ভাইয়ের পাশে। তাদের চুল, দাড়িতেও পাক ধরেছে। বয়সের ভারে কুঁচকে গিয়েছে চামড়া। পূর্বের প্রশ্নের উত্তরটা এবার নাজির দিলো,“বাতের সরকার সম্পর্কে আমার নানা লাগে। আমি শাহ বংশের সুবহান আলী শাহর বড়ো পোলা নাজির শাহ। নাসরিনরে মনে আছে? বাতেন সরকারের মাইয়া? দুর্ভাগ্যবশত তিনি আমার জন্মদাত্রী মা।”

উপস্থিত লোক তিনজনের স্বাভাবিক মুখখানা কেমন যেন হয়ে গেলো। বিস্মিত, আতঙ্কিত নাকি শঙ্কিত? বুঝতে পারলো না নাজির। মেজো ভাই রফেদ সরকার বলে উঠলেন,“তুমি নাজির! কত্ত বড়ো হইয়া গেছো। চিনাই যায় না।”
ছোটো ভাই আবু বললেন,“এত বছর পর আমগো কথা মনে পড়ল?”
“আমনেগোও তো মনে পড়ে নাই। বাপ-মা ছাড়া দুই দুইডা ভাগিনা কী অবস্থায় আছে তাও তো কহনো উঁকি মাইরা দেহেন নাই।”
“তার পিছে কারণ আছে।” বরকত সরকার বললেন।
“কারণ জাইন্না আমার কোনো কাম নাই। এইসব সম্পর্ক জোড়া লাগাইতে এইহানে আসি নাই। আমি আইছি অন্য কামে। আমনেগো বোইনে কই? ঠিকানা দেন। কথা আছে হের লগে।”
একে অপরের দিকে তাঁরা চাওয়াচাওয়ি করলেন। তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টি স্থির করলেন মেঝেতে। রফেদ সরকার বললেন,“তার খবর আমরা জানি না। একুশ, বাইশ বছর আগে আমগো কাছে খবর আইছিলো সে নাকি কার লগে পলাইয়া গেছে। তারপর আর কহনো দেখা হয় নাই। খোঁজার অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু পাই নাই।”
“মিছা কথা কম কন। আমার মন মেজাজ কিন্তু ভালা নাই। ঠিকানা দেন, না হইলে দেখা করার ব্যবস্থা কইরা দেন যাই গা।”

“আমরা হাছা কথাই কইতাছি, নাজির। তিনডা বছর আমরা লোক লাগাইয়া খুঁজছি, তুমগো বাড়ি পর্যন্ত গেছি, কিন্তু কোথাও তারে পাই নাই। আমগো কাছে খবর আইছিলো, আমগো গেরামের কেউর লগেই নাকি সে পলাইছে। অথচ পুরা গেরাম চিরুনি তল্লাশি দিয়াও তেমন কাউরে পাই নাই।”
“তার মানে কইতে চাইতাছেন সে পলায় নাই?”
“আমরা জানি না কিচ্ছু। আমগো অনেক আদরের আছিলো সে। সবার ছুডো। বিয়াও হইছিলো খুব কম বয়সে। পরহেজগার, সংসারি মাইয়া। যতবার বাপের বাড়িত আইছে ততবারই তোমার বাপে দিয়া গেছে, আবার যাওয়ার সময় আইয়া লইয়া গেছে। বাড়িত আইলে সবসময় ভাবিগো লগে লগে থাকতো। জামাই ভক্ত মাইয়া মানুষ। তোমরা হওয়ার পর আওয়া বন্ধ কইরা দিলো, আমরাই মাঝে মাঝে গিয়া দেখা কইরা আইতাম। সেই মাইয়া হঠাৎ কইরা পলাইয়া গেলো, তোমার বাপের অমন অবস্থা হইলো, আর এত বছরেও আমগো লগে যোগাযোগ পর্যন্ত করল না, খোঁজাখুঁজি কইরাও তারে খুঁইজা পাইলাম না। আর কী প্রমাণ লাগবো?” বরকত সরকার বললেন।
নাজিরের ভেতরে বিস্ময় কিন্তু বাইরে সে স্বাভাবিক। নীরব বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। আবু জিজ্ঞেস করলেন,“তোমার বাপে এহনো বাইচ্চা আছে?”

“হ আছে, নামমাত্র।”
“তারে জিগাও নাই কী হইছে?”
“কথা কইতে পারে না। আমনেগো তো জানার কথা।”
“জানি না। তোমার চাচারা দেহা করতে দেয় নাই। আমগো বেইজ্জতি করছে। চেয়ারম্যান লইয়া হুমকি ধামকি দিছিলো, গেরামে ঢুকলে মামলা করবো।”
“আর আমনেরা মামলার ভয়ে গেলেন না? এক বাপ- মায়ের ঘর থাইক্যা জন্ম নেওয়া বোইনরে ভুইল্যা গেলেন? দুইডা ভাগিনা কী অবস্থায় আছে তাও চিন্তা হইলো না? যাকগা, তাইলে তো ওয়ারিশের পাওনা জমিও পইড়া রইছে, তাই না?”
তিনজনের মুখভঙ্গি কেমন যেন হয়ে গেলো। মুখে শব্দ না করে মাথা নাড়ালেন শুধু। নাজির জিজ্ঞেস করল,“কেডায় আমনেগো কাছে খবর লইয়া আইছিলো? প্রথমে জানছেন কবে? ঘটনার কতদিন পরে?”

“জানছি ঘটনার এক দুই সপ্তাহ পরে। আমগো গেরামের একজনের আত্মীয়র বাড়ি তুমগো গেরামে। হের মারফত সর্বপ্রথম হুনছিলাম তয় বিশ্বাস করি নাই। ভাইজান কইছিল পরদিন যাইতে কিন্তু পরদিন সকালেই তুমগো বাড়ির চাকর মারফত খবর আসে। লগে লগে আমরা শাহ বাড়িতে যাই। ততক্ষণে সবার মুখে মুখে এই ঘটনা ছড়াইয়া গেছে, তোমার আব্বাও হাসপাতালে ভর্তি। কতগুলা বছর যে শরমের ঠেলায় সমাজে চলতে পারি নাই! তারপর হার মাইনা নিছি। তোমার চাচারা খুবই খারাপ মানুষ। হেগো লগে আছিলো চেয়ারম্যান আর হের পোলায়। যে বর্তমান চেয়ারম্যান হইছে। আমগো চেয়ারম্যানের লগেও তার খাতির অনেক। আমরা আর কী করতাম কও? এমনিতেই সম্মান লইয়া টানাটানি, তার উপর হুমকি ধামকি। তার কয় মাস পর তোমার বড়ো চাচায় আইলো। কইয়া গেলো, নাসরিনের পাওনা সম্পত্তি আমনেরা রাইখা দেন। ভোগ করবেন নাকি দান করবেন আমনেগো ব্যাপার। তবুও আমগো লগে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না। সব সম্পর্ক এনেই শেষ। আমনেগো বাড়ির মাইয়া যা করছে! এমনকি এও কইছে, তুমগো কারো লগে যাতে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করি। তারাই বুইঝা লইবো।”

আবারো সেই চাচা! এই চাচারা নাজিরকে একটু ভালো মানুষ হয়ে থাকতে দিচ্ছে না। এত কী দায় তাদের? এত কীসের লোভ? কপালের শিরাগুলো যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নাজির উপলব্ধি করল, সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সময় এটা হয়তো নয়। যতই সে কঠিন মানুষ হওয়ার অভিনয় করুক, এখনো তার হৃদয় নরম। নইলে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? এতকিছু মেনে নিতে পারছে না কেন? চোখের সামনে সত্য রেখে কেনই বা মিথ্যেতে বেঁচে ছিল এতদিন? শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। কাঁপছে বোধহয়। চুলে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,“কোন চাকর? নাম জানেন?”

সে জানে লোকটা যে আব্বাস নয়। আব্বাস বড়ো চাচার বিশ্বস্ত হলেও সামিউলের বয়সী। সে এসব করতে পারবে না। তাছাড়া সে তো তাদের বাড়িতে কাজে এসেছে ওই ঘটনার বহু পরে। মামারা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। অনেক বছর আগের ঘটনা কী আর এখনো মুখস্থ থাকে? রফেদ সরকার বলে উঠলেন,“হ, মনে পড়ছে। নাম মোতালেব। তহন ভাইজানের সমবয়সীই আছিলো।”
“মোতালেব?” নামটা নাজিরের অচেনা লাগলো। নাম শুনলেও চেহারা মনে করতে পারছে না। গ্ৰামে এই নামে মানুষ থাকলেও এত বয়স্ক কেউ নেই। এ আবার নতুন কোন চরিত্র?
আরো কিছু কথা বলে উঠে গেলো সে। বরকত সরকার বললেন,“এত তাড়াতাড়ি যাও গা? একটু বও, সবার লগে পরিচিত হইয়া যাও। এত বছর পর আইলা!”

“পরিচিত হইয়া লাভ নাই। আমার কাম শেষ। ভালো থাকেন আমনেরা।”
“আবার কবে আইবা?”
“আর আইমু না।”
“হুনো নাজির, আব্বা। মামাগো উপরে রাগ কইরো না। আমগো কিছু করার আছিলো না। যোগাযোগ রাইখো। যহন ইচ্ছা আইয়া পইড়ো। বিয়া করছো তুমি?”
“হ, কয়েক মাস আগেই করছি।”
“তোমার না আরেকটা ভাই আছিলো? কী জানি নাম? মনে পড়তাছে না।”
“নওশাদ শাহ।”
“হ হ, কেমন আছে ওয়? কী অবস্থা? করে কী?”
“ভালাই আছে, শহরে বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে।”
“কিছু খাইয়া যাও, একটু বও। কত কথা আছে তোমার লগে। নাসরিন আসলেই পলায় নাই? না হইলে তুমি তো এতদূর আওয়ার মানুষ না। তোমার চাচারা জানে?”

“জানে না। হেরা জানলে কখনো হয়তো এই পর্যন্ত আইতে পারতাম না। আশা করি, আমনেরাও তাগোরে জানাইবেন না। আমি চাই না কেউ জানুক। জীবনে তো ভাই বা মামার দায়িত্ব পালন করতে পারলেন না এইডা না হয় করেন। আর হ, কহনো যোগাযোগ করার চেষ্টা কইরেন না। মায়া দেহানেরও দরকার নাই। মনে করবেন, বোইনসহ বোইনের সব অস্তিত্ব কবরে। যাইগা, আল্লাহ হাফেজ।”

যাত্রাপথ পর্ব ৩৪

নাজির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। পেছনে হয়তো লোকগুলো অবাক চোখে তাকিয়ে তার প্রস্থান দেখলো, আবু বেশ কয়েকবার বুঝি ডাকলোও। কিন্তু নাজির সাড়া দিলো না। এখন আর এসব আত্মীয় বা শুভাকাঙ্খীর কোনো প্রয়োজন নেই তার জীবনে। উপরে আল্লাহ আর নিচে বাপ-মা ছাড়া কেউই কারো আপন হয় না। অথচ নাজিরের বাপ-মা নেই। কারো সহানুভূতির তার প্রয়োজন নেই। এর অতল পর্যন্ত সে পৌঁছেই ছাড়বে। যা হওয়ার হোক।

যাত্রাপথ পর্ব ৩৬