যাত্রাপথ পর্ব ৪৬
মাশফিত্রা মিমুই
ধরণীতে ভোর এলো একবুক মন খারাপ, হতাশা আর ব্যর্থতা নিয়ে। রোজ কেজির উপর কেজি দুধ দেওয়া গাভী জোড়া মরে পড়ে আছে গোয়াল ঘরে। অথচ গতকালও তারা সুস্থ ছিল, বিকেলে বালতি ভরা দুধ দিয়েছে, ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে তাদের খাবার খাইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল নাজির। সেই সুস্থ গাভী জোড়া আচমকা মরলো কীভাবে?
ঘনঘন শ্বাস ফেলে উৎকণ্ঠা নিয়ে গোয়াল ঘরে প্রবেশ করল নাজির। সম্মুখ দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ল। মনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো গাভী জোড়াকে। তাদের মুখের কাছে লেগে আছে সাদা ফেনা। আঙুলের ডগায় তুলে নাকের কাছে এনে তা শুঁকলো সে। এক মুহূর্তে বুকের সমস্ত ধুকপুকানি যেন থেমে গেলো।
নওশাদ সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।গরুর খামারটা গড়ে তুলতে যে তার ভাইকে ঠিক কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে তা নওশাদ ছাড়া আর জানবে কে? সাল তখন কত? নওশাদের মনে নেই। তবে তখন সে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। ভাই পড়ে নবমে। তবে নামেই পড়ে। পরীক্ষা ছাড়া বিদ্যালয়ের ধারে কাছেও তাকে দেখা যেতো না। শিক্ষকরা প্রায়ই এসে বলতেন,“নাজির কই রে, নওশাদ? কাল তাকে ক্লাসে থাকতে বলবি। নাহলে কিন্তু পরীক্ষায় বসতে দেবো না।”
নওশাদ বাড়িতে এসে নাজিরকে বললেও নাজির না শোনার ভান ধরে থাকতো। কখনো কখনো বলতো, “লেহাপড়া কইরা লাভ কী? তোর স্যার ম্যাডামরা কী আইয়া তোর আর আমার দায়িত্ব নিবো? নাকি ভাত কাপড় দিতে পারবো? যা পড়ছি তাই অনেক। তুই গিয়া বাংলাদেশ পাস কর।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বড়ো ভাইয়ের উপরে আর কিছু বলার সাহস পেতো না নওশাদ। ভাইটা তার অনেক ভালো। কখনো হাত ছাড়েনি। এই যে সে কত ভুল করেছে! তবুও ছাড়েনি। এই খামারের সূচনা হয়েছিল সামান্য এক ছাগলের বাচ্চা দিয়ে। মাঝেমধ্যেই ঝন্টু মিয়ার জমি বেছে দিতো নাজির। কখনো পরিষ্কার করে দিতো গরু ভর্তি গোয়াল ঘর। ঝন্টু মিয়ার স্ত্রীর থেকেই সে এনেছিল এক অসুস্থ ছাগলের বাচ্চা। তারপর কোনো এক দৈব্য বলেই ছাগল ছানাটা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলো, বড়ো হতে লাগলো নাজিরের কাছে। নাজির তাকে নিজের ভাগের খাবার খাওয়াতো, ঘাস খাওয়াতো, সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো মাঠঘাট। একসময় ছাগলটা বাচ্চা দিলো। কীভাবে বাচ্চা দিলো সেকথা বোধহয় ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না বলেই মনে হয়। আশেপাশে তো আর পুরুষ ছাগলের অভাব নেই।
রিজিক, সফলতা সব আল্লাহর তরফ থেকেই আসে। মানুষের কাজ আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করে যাওয়া। নাজিরও তা করেছে। সেইবার ছাগলটা তিন তিনটে বাচ্চা দিলো। এতগুলো ছাগল পালা নাজিরের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পায় না সেখানে আবার ছাগল!রাখার মতো জায়গাও অবশ্য ছিল না। তবুও খালি পড়ে থাকা ঘরেই রাতটা কাটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ছানারা একটু বড়ো হতেই মা ছাগল রেখে বাকিগুলো সে বিক্রি করে দিলো। সেই টাকায় কিনে আনলো একটি খাসি আর কিছু খাবার। পরের বছর বেশ চড়া দামে খাসিটা বিক্রি করে দিলো কোরবানি ঈদের হাটে।
এভাবেই নাজিরের মাথায় ব্যবসায়ীক চিন্তা এলো। ওই টাকায় ভাইয়ের জন্য কিছু পোশাক আশাক আর আবারো ছোটো এক জোড়া খাসি কিনে আনলো সে। বড়ো করে পরের বছর একইভাবে বিক্রি করে দিলো। বাড়িতে তুললো পুরোনো টিনের চালা আর মাটির দেয়াল দিয়ে একটি গোয়াল ঘর। পরপর বেশ কয়েক বছর এভাবেই করতে করতে মুনাফা আর পশু দুটোই যখন বাড়লো, তখন সামাদ মিয়ার বুদ্ধিতে হাটে গিয়ে কসাইয়ের থেকে কম দামে কিনে নিয়ে এলো একটি বাছুর। দুর্ভাগ্যবশত সেই বাছুর এক বছর পালার পর মারা গেলো। নাজিরের কি কষ্ট যে হয়েছিল! ছেলেটা সেদিন কেঁদেছিল পর্যন্ত। তারপর ক্ষেতে, খামারে, হাটে বহু পরিশ্রম করে, বাড়ির বাদবাকি সব ছাগল বিক্রি করে কিনে ফেলল একটি গরু। আল্লাহ এবারো তার সহায় হলেন। পরের বছর জেলা শহরের হাটে গিয়ে এক ধনী ব্যক্তির কাছে চড়া দামে সেই গরুটা বিক্রি করে এলো। সেখান থেকেই নাজিরের উন্নতি শুরু। ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়লো, মাটির গোয়াল ঘরের গাঁথুনি হলো ইটের। নতুন ঘর তুললো, ভাইকে পড়াশোনার জন্য শহরে পাঠালো, অন্যের অধীনে কাজ ছেড়ে শুরু করল নিজ জমি এবং অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষবাস। মিল্টন, লতিফকেও নিয়ে নিলো কাজে।
বর্ণনা দেওয়া সহজ হলেও নিজের অবস্থান বদলাতে নাজিরকে কম কিছু করতে হয়নি। অথচ আজ তার আদর যত্নে বড়ো করা পোষা গরু দুটো মারা গেলো। খামারের সবচেয়ে বেশি দুধ দেওয়া গরু। কত ক্ষতি হয়ে গেলো ছেলেটার! এই ক্ষতি কীভাবে, কতদিনে পোষাবে সে? নওশাদ আনত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এবার কী হবে, ভাই?”
নাজির উত্তর দিলো না। ফরিদা দূরে বসে আহাজারি করছেন। তাঁর আহাজারিতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন আমিরুল শাহ আর সিরাজ উল্লাহ। গত রাতে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। এই বাড়িতেই থেকেছেন।স্ত্রী, সন্তানেরা নিজের বাড়িতে। তাঁরা এসে মৃত গাভী দুটোর দিকে তাকিয়ে মুখ দিয়ে আফসোস ভরা শব্দ করলেন। আমিরুল শাহ দুঃখ নিয়ে বললেন,“আহারে, তাজা গাই গরু দুইডা কেমনে মইরা পইড়া রইছে!”
সিরাজ উল্লাহ তাল মিলিয়ে বললেন,“মাইনষের জীবনেরই গ্যারান্টি নাই আর এ তো গরুই। এহন কী করবি রে, নাজির? কত ক্ষতি হইয়া গেলো। কোন পাপের শাস্তি যে আল্লাহ দিলো।”
নাজির চট করে মাথা তুলে তাদের দিকে তাকালো। ঠোঁট উল্টে রেখেছে অথচ চোখ জোড়ায় খেলা করছে প্রগাঢ় আনন্দ। এরাই কী তবে জঘন্য কাজটা করল? গত রাতের অপমানের প্রতিশোধ নিলো? নাজিরের চেহারা কঠিন হয়ে এলো। মিল্টন, লতিফ এসেছিল দুধ ধুইয়ে নিয়ে যেতে। এমন অবস্থা দেখে তারাও হায় হুতাশ করছে। মুমিনুল শাহ মেসওয়াক করতে করতে বড়ো ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন। আচমকা কথার মধ্যে বলে উঠলেন,“মুখে ফেনা কীয়ের? মনে হইতাছে কেউ ইচ্ছা কইরা বিষ দিয়া মারছে।”
মর্জিনা স্বামীর কথায় মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আমারো তাই মনে হইতাছে। না হইলে সুস্থ দুইডা গাই হঠাৎ কইরা মরে কেমনে?”
আমিরুল শাহ, সিরাজ উল্লাহর মুখভঙ্গি বদলে গেলো। তাও খুব ভালো করেই লক্ষ্য করল নাজির। নিশ্চিত হলো, ছোটো চাচা এসবে নেই। চোখ রাঙিয়ে তাকে ইশারায় ধমক দিয়ে চুপ থাকার নির্দেশ দিলেন আমিরুল শাহ। সিরাজ উল্লাহ বললেন,“কার এত বড়ো সাহস যে শাহ বাড়িত ঢুইকা নাজির শাহর গরু মারবো? আবার মারতেও পারে। শত্রুর তো অভাব নাই। মাইনষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হইলো জিহ্বা। তোর জিহ্বা বেশি চলে, নাজির। সবাইরে সব কথা কইতে নাই। যে বাড়িত ঢুইকা গরু মারতে পারে, সে ঘরে ঢুইকা মানুষ মারতে কতক্ষণ?”
হুমকি দিলো লোকটা? নাজির, নওশাদের তা বুঝতে সময় লাগলো না। নাজির উঠে দাঁড়ালো। চোখেমুখে কাঠিন্য ভর করেছে। আর কতবার? আর কতবার, কতভাবে অমানুষগুলো তাকে ভাঙবে? তারা কী বুঝতে পারছে না, নাজির ভাঙতে ভাঙতে ঠিক কতটা ভেঙেছে? কতটা আফসোস আর প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে? সেই তাপ, ধ্বংস কী সহ্য করতে পারবে তারা? পারবে নিজেদের বাঁচাতে? মিল্টনের উদ্দেশ্যে বললো,“যা, মরা গরু দুইডা মাটি চাপা দিয়া আয়।”
মিল্টন, লতিফ কোদাল নিয়ে চলে গেলো। চাচা আর তাঁর শ্যালকের দিকে তাকিয়ে নাজির বললো,“হ, ভুল কিছু কন নাই। জিহ্বাই মাইনষের বড়ো শত্রু। যারা বলদ তারাই অস্ত্রের মতো জিহ্বা চালায়।”
সিরাজ উল্লাহ কথাটা শুনে সন্তুষ্ট হলেন। ছেলে এবার সঠিক পথে এসেছে, হুমকিতে ভয় পেয়েছে। নাজির চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ইশারায় নওশাদকে চলে আসার নির্দেশ দিলো। রহস্যজনকভাবে বললো, “ইটের বদলে পাথর কেমনে মারতে হয় জানোস, নওশাদ?”
“ইটের বদলে পাথর মারা?” বুঝলো না সে।
নাজির দুর্বোধ্য হাসলো। চোখ জোড়া ঘোলাটে। বুকে হাত ঘষতে ঘষতে বললো,“আইজ রাইতে সজাগ থাকিস। তোরে আমি ইটের বদলে পাথর মারা শিখামু।”
নওশাদের মস্তিষ্ক কথাগুলোর মূল অর্থ ধরতে পারলো না। তবে পাল্টা প্রশ্নও করল না। তার মনটাও খারাপ।
বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন দিয়ে ভরা। মরহুম আকবর মিয়ার তিন কন্যার পরিবার, কাশেম আলীর শ্বশুর বাড়ির লোকজন, বাড়ির মেয়েরাসহ তাদের স্বামী সন্তান। বরিশাল থেকে আসতে কায়সার ইসলামদের ভোর হয়েছে। তাই জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। শেষ দেখাও দেখতে পারেননি। তা নিয়ে বৃদ্ধর আফসোস যেন শেষই হচ্ছে না। বেয়াইয়ের সঙ্গে গলায় গলায় ভাব না থাকলেও দুজনই একে অপরকে ভীষণ পছন্দ করতেন। তাই তো বিনা দ্বিধায় এতদূরে আদরের কন্যাকে বিয়ে দিয়েছিলেন কায়সার ইসলাম।
নিজের আফসোস, দুঃখ মনে চেপে রেখে জামাতার উদ্দেশ্যে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,“মন খারাপ কইরো না, আব্বাজান। আল্লাহর কাছে দোয়া করো। একদিন সবাইরেই এই দুনিয়া ত্যাগ করতে হইবো। এহন এই বাড়ির কর্তা তোমরা দুই ভাই। তোমরা দুর্বল হইয়া গেলে এই বংশের হাল ধরবো কেডায়? তুমগো লইয়া বেয়াই সাহেবের অনেক গর্ব আছিলো। যহন কথা হইতো তহনি তুমগো প্রশংসা করতো। দুর্বলতা বেশি প্রকাশ করলে আশেপাশের শত্রুরা পাইয়া বইবো।”
নজরুল আলমও এসে বসলেন। তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি পৃথিবীতে নেই। রেশমার জন্মের সময় শ্বশুর ইহকাল ত্যাগ করেন। আর শাশুড়ি চলে যান ফাহমিদার জন্মের আগে। ওদিকে এখন শুধু দুই শালীই রয়েছে। তারাও নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মৃত্যুর খবর শুনে গতকাল এসেছিল। জানাজার পর আবার চলে গেছে বাড়ি। তাই এখন তাদের পিতা সমতুল্য গুরুজন এই কায়সার ইসলামই। তিনি ভারাক্রান্ত মনে বললেন, “কাইল দুপুরে আমগো দুই ভাইরে একলগে বসাইয়া আব্বায় কত কথা কইলেন। কিন্তু বিহালেই আচমকা অসুস্থ হইয়া গেলেন, কান্নাকাটি করলেন, আমগো হাত ধইরা কয়ডা কথা কইয়াই…
কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। বহু কষ্টে চোখের পানি আটকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কায়সার ইসলাম তাদের সান্ত্বনা দিলেন। ইহকাল, পরকাল নিয়ে কথা বললেন। একটু পর সেখানে এসে বসলো তাঁর দুই পুত্র, নজরুল কাশেমের বোন জামাইসহ ভাগ্নে আর মেয়ে জামাইরা। শুরু হয়ে গেলো তাদের গল্প গুজব।
বড়ো মামা বলে উঠলেন,“মিছরির জামাই কই? হেরে তো একবারও দেখলাম না। শত্রুতা এহনো মিটে নাই? যতই হোক দাদাশ্বশুর তো।”
কাশেম আলী প্রত্যুত্তর করলেন,“হের লগে আবার আমগো কীয়ের শত্রুতা? মনোমালিন্য যা আছিলো বিয়ার পরেই আব্বায় মিটাইয়া নিছে।”
“তাইলে আইলো না ক্যান?”
জবাব দিলো তালেব,“কেডায় কইছে আইয়ে নাই?কাইল সকালে আইয়াও দাদাজানের লগে গপ্পো কইরা গেছে। মরার সংবাদ হুইনা বিকালেও আইয়া মিছরিরে লইয়া দেইখা গেছে। জানাজা পড়া, কবর দেওয়ার সময়ও আছিলো।”
“ওহ, সবাইরে দেখলাম কিন্তু তারে দেখলাম না। তাই জিগাইলাম। বিয়ার সময় তো আইতেই পারি নাই।”
“এক গেরামের, তাই বাড়িত গেছে গা।”
বহু বছর পর একসঙ্গে হওয়ায় তাদের গল্পের আসর জমে উঠলো।
সৈয়দুন নেছার ভীষণ জ্বর। মিছরি তাঁর শিয়রে বসে এতক্ষণ জলপট্টি দিচ্ছিলো। বহু কসরতে সকালে কিছু খাইয়ে ওষুধ খাওয়াতে পেরেছে। তবুও জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করছেন বৃদ্ধা। দিলারা বেগম ফলমূল নিয়ে ঘরে এলেন। বিছানায় বসে শাশুড়ির কপাল, গলায় হাত রেখে বললেন,“আম্মার কাছে আমি আছি, তুই এহন যা।”
মিছরি মাথা নাড়িয়ে চলে যাচ্ছিলো। তিনি পিছু ডেকে বললেন,“তুই আইজ যাবি গা? জামাই কী লইয়া যাইতে আইবো?”
“বলতে পারছি না, কিছু তো বলেনি।”
“বিহালের দিকে বাড়ি খালি হইয়া যাইবো। রেশমা, কাজলের পোলাপাইনের ইশকুল খোলা। ফাহমিদা পোয়াতি তাই হের হড়ি আপাতত থাকতে নিষেধ করছে। তুই কয়দিন থাইক্যা যা, মা। কাছাকাছিই তো বাড়ি।”
“আচ্ছা, দেখি।”
মিছরি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। পথেই দেখা হয়ে গেলো ছোটো ফুফু সরলার সাথে। মুখখানা মলিন। চোখের কোণে শুকিয়ে আছে অশ্রু। রুবিও পাশেই বসা। জামিল আসেনি। এই গ্ৰামে পা দেওয়া তার জন্য নিষিদ্ধ। রুবিও একটু পর চলে যাবে। সরলা থাকবে কিনা বলা যাচ্ছে না। এ বাড়ির কেউই তার সঙ্গে কথা বলছে না, এমনকি বোনেরাও এড়িয়ে চলছে। মিছরিকে দেখতেই কেমন করে যেন তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে আজ আর ঘাবড়ালো না মেয়েটা। মাথা উঁচু করেই গম্ভীর মুখে প্রবেশ করল নিজের ঘরে। ফাহমিদার ঘর এখন আর ফাঁকা নেই। সেই ঘরে তার স্বামী থাকার সম্ভাবনা বেশি।
কিছুক্ষণ বাদে ফাহমিদা আর পলি এলো ঘরে। পলির পেটটা একটু উঁচু হয়েছে। ফাহমিদারটা এখনো বুঝা যাচ্ছে না। ননদ, ভাবিতে দুজনেই বিছানায় বসেছে। পেটে হাত বুলাতে বুলাতে ফাহমিদা বললো,“তোর ইচ্ছা করে না?”
“কী?”
“মা হইতে। কবে হবি? জামাইরে কস না ক্যান? বাপ হওয়ার শখ নাই ব্যাডার?”
লজ্জা গিলে খেয়ে চোখমুখ কুঁচকে নিলো মিছরি। মুখ ফিরিয়ে বললো,“তোমাদের মুখে কিছু আটকায় না? বিয়ের পর তুমি যা তা হয়ে গিয়েছো, আপা।”
“লজ্জার কী আছে? এমন ভান করে যেন জামাই ধরে নাই, ছোঁয় নাই।”
পলি চট করে জিজ্ঞেস করল,“হাছাই ধরে নাই?”
মিছরি চোখ রাঙালো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “তোমরা আসলেই যা তা। তোমাদের সঙ্গে কোনো কথা নেই, আড়ি।” বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। ছোটো বলে যখন তখন তাকে লজ্জা দিতে চলে আসে এরা।
পথে দেখা হয়ে গেলো পরিচিত এক মুখের সাথে। তাকে দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আরিফ। শাড়ি পরায় মেয়েটাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। আগের থেকে স্বাস্থ্য খানিকটা কমেছে। তাতেই যেন লাগছে অপ্সরা। মুখ ফুলিয়ে বললো,“তোর জামাই কী তোকে খেতে দেয় না? এত চিকন হয়েছিস কীভাবে?”
আরিফের সঙ্গে বরাবরই মিছরির দা কামড়ার সম্পর্ক। সেও মুখ বাঁকিয়ে বললো,“আগের থেকে সুন্দরী হয়েছি, তাই না?”
“পেত্নী হয়েছিস।”
“তার মানে সুন্দরী।”
“কই তোর কাইল্লা জামাই?”
“কাইল্লা কাকে বলো? তোমার থেকেও অনেক সুন্দর, লম্বা, শক্তিশালী। তোমার মতো চিকাকে মাথায় তুলে আছাড় মেরে দিতে পারবে।”
“চুপ, মুটকি। জামাই নিয়ে কি গর্বের কথা! ঠিকই তো বিয়ে না করার জন্য কেঁদেছিলি। একবার পালাতে পারলে এখন আমার বউ হয়ে ঘুরতে হতো।”
“ভালো হয়েছে পারিনি।”
পাশ কাটিয়ে চলে গেলো মেয়েটা। আরিফ সেদিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলো। ঘোলাটে চোখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট। যেই বেদনা সম্পর্কে কেউ কখনো জানেনি আর না কখনো কেউ জানতে পারবে। যা মানুষের ভাগ্যে থাকে না তা শত চেষ্টার পরেও সে অর্জন করতে পারে না। আর যা ভাগ্যে থাকে তা পাহাড়ের চূড়ায় থাকলেও ঠিকই একদিন না একদিন সেই মানুষটার দরজায় এসে কড়া নাড়ে। তার জলজ্যান্ত উদাহরণ তো স্বয়ং মিছরি নামক মেয়েটিই। নাজির শাহর ঘরণী।
একা একা হাঁটতে হাঁটতে দালানের শেষ মাথায় পৌঁছে গেলো মিছরি। ফুফাতো বোনদের দেখে থেমে গেলো সে। একজন বড়ো ফুফু তমিজার কন্যা ফিরোজা, অপরজন মেজো ফুফু আবেদার দ্বিতীয় কন্যা শালিক। মিছরি তাদের কাছে এসে বসলো। এই দুজন তারচেয়ে বয়সে বড়ো হলেও এখনো অবিবাহিত। তাই তাকে নিয়ে দুষ্ট কথা বলার সুযোগ নেই। শালিক হেসে জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছোস?”
“আলহামদুলিল্লাহ, তুই?”
“আর ভালা থাকা! নানাজানের মৃত্যুতে মন ভালা না। আম্মায় কইছিল, শীত আইলেই বেড়াইতে আইবো। এইবার আইলে অনেকদিন থাকমু। কিন্তু শীত আওয়ার আগেই!”
মিছরি প্রত্যুত্তর করল না। চুপচাপ শুনলো। বহুদিন পর এই মেয়েটার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। মেজো ফুফুর দুজন মেয়ে। ছেলে একটা আছে তবে অনেক ছোটো। সুজাতার বয়সী। ফুফুদের মধ্যে মেজো ফুফু সবচেয়ে সুন্দরী এবং তার ধনী ঘরে বিয়ে হলেও সন্তানের জননী হতে হতে জীবনের অর্ধেকটা সময়ই পেরিয়ে গিয়েছে। তাই সন্তানদের তেমন একটা কাছ ছাড়া ফুফা করেন না। বাকি ভাই-বোনেদের সঙ্গে প্রায় দেখা হলেও এদের দেখা পাওয়া ভারি কঠিন।
বিকেলের দিকে বাড়িতে মানুষজন কমতে শুরু করল। সবাই আবার আসবে চারদিনের মিলাদে। তবে মিছরির নানারা আপাতত যাচ্ছে না। একেবারে চারদিন পরেই ফিরবে। ফুফুদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য মাসুম, রুহুলকে পাঠানো হলো।
ইকরাম হোসেন, অলিউল খানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নজরুল আর কাশেম আলী পথ ধরে হাঁটছেন। কথার একফাঁকে অলিউল খানকে নিয়ে হাঁটার গতি কমিয়ে দিলেন কাশেম আলী। বাকিরা সামনে এগিয়ে যেতেই তিনি বললেন,“মৃত্যুর আগে আব্বায় একটা আবদার করছিল, দুলাভাই।”
“কী আবদার?”
কথাটা বলার জন্য থেমে সময় নিলেন তিনি। অলিউল খানের আগ্ৰহ বাড়লো। জিজ্ঞেস করলেন,“আমগো লইয়া?”
“হ, শালিকের বিয়া লইয়া।”
“কথার মধ্যে থামাথামি আমার পছন্দ না, কাশেম। যা কওয়ার জলদি কও।”
“আমনে তো জানেনই সব। মাইয়া জামাই গো মাঝে আমনেরেই আব্বায় একটু বেশি বিশ্বাস করতো।”
“তা আর কইতে? তেনার লাইগাই তো এত সম্পদ, ক্ষমতা চাচতো ভাইগো থাইক্যা রক্ষা করতে পারছি।”
“আব্বার ইচ্ছা হইছিলো, নওশাদের লগে শালিকের বিয়া দিতো। কাইল সকালেই কথাডা তুললো। আর তারপরেই তো!”
“নওশাদ কেডা?”
“ফতেহ চাচার নাতি, সুবহান ভাইয়ের ছুডো পোলা। বড়োডার লগে তো আমার মাইয়ারই বিয়া দিছেন আব্বায়।”
“পোলা কেমন?”
যাত্রাপথ পর্ব ৪৫
“পোলা ভালা। বড়োডার থাইক্যা ভদ্র, নরম স্বভাবের। অনেক শিককিত। শহরের বড়ো বিশ্ববিদ্যালয় থাইক্যা ডিগ্ৰি লইয়া আইছে। আমনে চাইলে আলাপ করাইয়া দিমু। তবে একটু খুঁত আছে। খুঁত তো চান্দেরও থাহে তাই না? তবে ধরতে পারেন ওইডা অল্প বয়সের ভুল। ভুল মানুষ মাত্রই করে।”
“কী ভুল?”
কাশেম আলী পিতার মতো অত বুদ্ধিমান না হলেও কথার প্যাঁচে মানুষ নাচাতে পারেন ভালো। তাই প্রথমেই কথাটা বললেন না। বরং হাঁটতে লাগলেন সামনের পথ ধরে। আগে গুণ বলা যাক, তারপর না হয় খুঁত।
