যাত্রাপথ পর্ব ৪৯
মাশফিত্রা মিমুই
পৌষের শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে জনজীবন। শ্বাসকষ্ট আর নিউমোনিয়া বাসা বাঁধছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের দেহে। ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া ধরণীতে দ্বিগিদ্বিক খালি চোখে দেখা দুষ্কর। ফজরের নামাজ শেষে কবর জিয়ারতে এসেছে নাজির। এটাই বর্তমানে তার নিত্যদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে, আকবর মিয়ার ইন্তেকালের পর থেকে।
একে একে দাদা-দাদী, বাবা এবং আকবর মিয়ার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফিরলো সে। তিন পাশের তিনটি রান্নাঘর থেকেই কালো ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে।
একপাশে ফরিদা এবং বিথী, আর অপরপাশে রান্না করছেন মর্জিনা। নাশতা শেষে পরিবার নিয়ে বাপের বাড়ি যাবেন তিনি। ওখানকারই এক আত্মীয়ের মেয়েকে ছেলের জন্য পছন্দ করে কয়েকদিন আগে আংটি পরিয়ে এসেছিলেন। আজ সেই মেয়ের সঙ্গেই ঘরোয়াভাবে নাজমুলের বিয়ে। ধুমধাম করে বিয়ে করার ইচ্ছে ছেলেটার নেই। চাচাতো ভাইদের দেখে যা শিক্ষা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। তবে মুমিনুল শাহ বলে দিয়েছেন, বউ নিয়ে ফেরার পর বউ ভাত করা হবে গোটা গ্ৰামের মানুষ আমন্ত্রণ জানিয়ে।
নাজির সোজা হেঁটে চলে এলো নিজেদের রান্নাঘরের দিকে।বাইরে থেকে উঁকি দিতেই দেখতে পেলো গায়ে কালো চাদর মুড়ি দিয়ে পিঁড়িতে বসে রাঁধতে থাকা মিছরিকে। ভেতরে এসে স্ত্রীর পাশে বসে পড়ল সে। কড়াইতে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী করো? আলু ভাজি?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“হ্যাঁ, রুটির সাথে খেতে ভালো লাগবে না?”
“হ।”
একটি ছোট্ট ডেকচিতে আটার খামি মেখে রেখেছে মিছরি। বেলুন পিঁড়ি পাশেই ধুয়ে রাখা। শেষবারের মতো ভাজিটা খুন্তি দিয়ে নেড়ে নিচে নামিয়ে রাখলো সে। চেষ্টা করল রুটি বেলতে।কিন্তু কিছুতেই ঠিকঠাক হচ্ছে না। কোনোটা বাঁকা হচ্ছে, কোনোটা বা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে যাচ্ছে। নাজির স্ত্রীর কাজ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সংসার করার জন্য যাবতীয় তৈজসপত্রই সে কিনে এনে দিয়েছে তাকে। রোজ পছন্দমতো তাজা তাজা বাজারও করে। নাজিরের বাজারের হাত বরাবরই ভালো। চাচার সংসারে খাওয়াকালীন সে-ই প্রায়শই বাজার করতো।
মিছরির হাত থেকে বেলুনটা কেড়ে নিলো নাজির। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই বললো,“তোমার বানানো রুটি আইজ আর খাওন যাইবো না, ময়না পাখি। দাও আমি বানাই। তুমি সেঁকতে সেঁকতে শিখো।”
মলিন মুখে মিছরি তাকিয়ে রইল স্বামীর হাতের দিকে। নাজির কলসির পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে খামি গোল করে বেলতে লাগলো। দুর্ভাগ্যবশত তার রুটিও গোল হলো না। পূর্বে কখনো বেলেছে নাকি? মিছরি হেসে ফেলল,“আপনি নিজেই তো পারেন না।”
চোখমুখ কুঁচকে নিলো নাজির। পাশ থেকে তুলে নিলো একটি গোল কাঁসার বাটি। সেটা দিয়ে আঁকা বাঁকা মানচিত্রের মতো রুটিতে চাপ প্রয়োগ করতেই হয়ে গেলো গোল। তা দেখিয়ে সে বড়াই করে বললো, “তাইলে এইডা কী? যার মাথায় বুদ্ধি আছে, সে পারে না এমন কিছু দুনিয়াত নাই।”
মিছরি ভারি অবাক হলো। এত সুন্দর সহজ একটা বুদ্ধি কিনা তার মাথাতেই এলো না? মন খারাপ হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আবার ভালোও হয়ে গেলো। দুজনে একসঙ্গে কাজ করায় সকালের নাস্তা দ্রুতই তৈরি হয়ে গেলো। তিনজন মানুষের কয়টা রুটি বা আর লাগে? সেঁকা হতে হতে ওখানে বসেই স্বামী- স্ত্রী মিলে নাশতা করে নিলো। মর্জিনা ভাতের পাতিল উপুড় করে বললেন,“সারাক্ষণ বউডার লগে চিপকা থাকে। দিন দুনিয়াতে কী আর কারো বউ নাই? শুধু তোরই বউ আছে রে, নাজির?”
মিছরির গা ঘেঁষে বসে ঠান্ডা হাত দুটো আগুনের তাপে গরম করছে নাজির। উত্তরে বললো,“আমনের হিংসা হয়?”
“হ, হিংসায় জ্বইল্লা পুইড়া যাইতাছি।”
“দেইখাই বুঝা যায়। থাক, হিংসা কইরেন না। আমনের জামাই বুইড়া হইলে কী হইবো? আমনে এহনো সুন্দর আছেন। জোয়ান পোলা দেইখা আবার বিয়া দিয়া দিমু না হয়।”
“কয়দিন আগে আমার জামাইয়ের বিয়া দিতে চাইছিলি, এহন আবার আমার বিয়া? তোরে দুইবেলা পিডান দরকার।”
“আমনে ভালা মানুষ হইলে এই ব্যাডার সংসার আর করতেন না।”
“ক্যান, কী করছে আবার?”
উত্তর দিলো না নাজির। মর্জিনাও ঘাঁটলেন না। ভেবে নিলেন মশকরা। বললেন,“ভালা মাইনষের মতো বউ লইয়া তৈয়ার থাকবি। বারোটা বাজলে সবাই আমার বাপের বাড়ি মেলা দিমু।”
“না চাচী, কাম আছে। কাইল রাইতে কোন গোলামের পুতে জানি প্রজেক্টে জাল ফেলাইয়া বড়ো মাছডি সব লইয়া গেছে। হেরে পাইলে পুসকনিত ফালাইয়া পিডামু। ওইদিকে সরিষা ক্ষেতে দুইবেলা পোলাপাইন গিয়া ফুল ছিঁড়ে। নেট বদলাইয়া বরই কাটা দিতে হইবো। আমনেরা বউ লইয়া আইয়েন, বউ ভাতের সব কাম আমি নিজে তদারকি করমু।”
মর্জিনার মন খারাপ হলো। জায়ের রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন,“আমার পোলার বেলায় সবার যত তালবাহানা। ধুমধাম কইরা বিয়া না দিয়া মহাভুল কইরা ফেলাইতাছি যেন? কেউ যাইতো না।”
ফরিদা বুঝলেন, তাকেই ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে। তাই বললেন,“সামিউল হের বউ, পোলাপাইন লইয়া যাইবো, লগে পারভেজ আর আয়েশারাও যাইবো। হেরপরেও তোর এত দুঃখ আইয়ে কইত্তে? আমি এহন তগো লগে গেলে কাইল নতুন বউ বরণ কইরা ঘরে তুলবো কেডায়? এতদূর থাইক্যা অতিথিও তো কম আইবো না। রানবো বাড়বো কেডায়? সবকিছুতে রাগলে হয় না।”
মর্জিনা চুপচাপ কিছুক্ষণ ভাবলেন। কথা ভুল নয়। ফেরার পথে সঙ্গে করে মাকেও নিয়ে আসবেন ভেবেছেন। কয়েকদিন না হয় থাকবে এখানে। তাই আর কিছু বললেন না।
নওশাদ এসে সকালের নাশতা করল। তাকে যেতে বললেও সে গেলো না। ভাই না গেলে সে গিয়ে আর কী করবে? বেলা বাড়তেই স্বামী, তিন ছেলেকে নিয়ে মর্জিনা বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
নাজিরও চলে গেলো বেলাইয়ের দিকে। তাজা একটা রুই মাছ এনে ধরিয়ে দিলো কলিমের মায়ের হাতে। এবার আর নতুন করে গোয়ালে গরু তোলেনি সে। আগে যা ছিল তাই নতুন করে বাচ্চাকাচ্চা দিয়েছে। বড়ো চাচার গরু চুরির টাকা অন্য কাজের জন্য সে তুলে রেখেছে ব্যাংকে।
মিল্টন এলো দুপুরে। বাঁশ বাগান থেকে বাঁশ কেটে এনে নাজিরের সাথে মিলে মাচার ঘর তৈরি করল। নওশাদ জিজ্ঞেস করল,“এগুলো দিয়ে কী করবে?”
“পুসকনির কাছে বসাইয়া আইজ সারা রাইত মাছ পাহারা দেওয়ামু। চোরের চুরি করার শখ মিটাইয়া দিমু।”
মিল্টন তাল মিলিয়ে বললো,“আমার মনে হয়, এইডা ওই পাড়ার সিদ্দিক আর মিন্নতের কাজ। ওই দুইডায় ছাড়া আর কার এত বড়ো সাহস? লগে চেয়ারম্যানের চ্যালাও থাকতে পারে। সারাদিন চেয়ারম্যানের পা চাটে, রাইত হইলে এর ওর বাড়িত চুরি করে।”
“মিন্নতে বুইড়া মানুষ, ওয় হইবো না। বাকি দুইডায় হইলেও হইতে পারে। খালি হাতেনাতে ধরতে পারলে হেরপর বুঝামু নাজির শাহর জিনিসে হাত দেওয়ার মজা।”
দুপুরের রান্নার আয়োজন শুরু করল মিছরি। ভাতের চাল বেছে কলপাড়ের দিকে পা বাড়াতেই নাজির বললো,“শীতের মধ্যে বেশিকিছু রানতে হইবো না। ফুলকপি, আলু, শিম দিয়া মাছ রাইন্ধা থোও।”
“আমি ফুলকপি খাই না।”
“ক্যান?”
“গন্ধ সহ্য হয় না।”
“তাইলে তোমার লাইগা ভাজা মাছ তুইলা রাইখো। নাকি ফুলকপি বাদ দিবা? যেইডা ইচ্ছা।”
মিছরি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। যতটুকু কাজ করার তা করে মিল্টনকে নিয়ে পুকুরে চলে গেলো নাজির। শীতে মাছ চাষে লাভ বেশি। গত শীতেও পুকুরে মাছ চাষ করেছিল সে। ফলন বরাবরই ভালো। আল্লাহর রহমতে সে যেই কাজে হাত দেয় সেই কাজেই সফল হয়ে আসে। পাড়ের মধ্যে সুন্দর করে মাচা বাঁধলো নাজির। তার উপরে আবার দিলো ছাউনি। যাতে খুব সহজে ভেতরে দুজন মানুষ এই শীতের মধ্যে আরামে বসে বা শুয়ে পাহারা দিতে পারে।
দুপুরে রান্নাবান্নার মাঝখানেই সিরাজ উল্লাহ এলেন। বাড়ির ভেতরে পা রেখেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বোনের উদ্দেশ্যে বললেন,“কী রান্ধো, বুবুজান?”
আচানক ভাইকে দেখে চমকালেন ফরিদা। মাঝখানে কতগুলো মাস আসেনি! ইদানিং যেন যাতায়াত একটু বেড়ে গিয়েছে। রাগ দেখিয়ে বললেন,“এইডা তোর আওয়ার সময়? আরেকটু আগে আইলে তো ভাত বেশি কইরা রানতাম। খোপের মোরগটাও ভালা বড়ো হইছে, তোর লাইগা তুইলা রাখছিলাম।”
“রাখো তো তোমার মোরগ, তুমি যেইডা দিয়া ভাত দিবা আমি সেইডাই তৃপ্তি সহকারে খাইয়া ফেলামু। তোমার রান্ধা একেবারে আম্মার লাহান, সেই স্বাদ!”
ভাইয়ের প্রশংসায় খুশি হলেন ফরিদা। লাউয়ের তরকারিতে ধনেপাতা ছড়িয়ে চুলা থেকে নামিয়ে নিলেন কড়াই। বললেন,“তোর দুলাভাই বাড়িত নাই। ঘরে গিয়া ব, যা।”
“হেয় বাড়িত থাকলেই কী আর না থাকলেই কী? হের কথা আর কইয়ো না।”
“ক্যান, কী হইছে আবার?”
“অনুশোচনা জন্মাইছে বুকের মাঝে, তোমার মতন ভালা মানুষির নাটক চু**
“রান্ধা, গোসল শেষ কইরা আহি। পরে কথা কমু না হয়।”
“বাড়ি খালি খালি লাগে ক্যান? তোমার সুন্দরী জা, আর হের ছাও কই?”
“নাজমুলের বিয়া আইজ। তাই বাপের বাড়ি গেছে।”
“বিয়া! আমারে তো মুমিনে কিছু কইলো না একবার! তার লাইগা বাপের বাড়ি গেছে ক্যান? বাড়িঘর সাজানো না ক্যান?”
“পোলায় অনুষ্ঠান কইরা নাকি বিয়া করতো না। করলে ঘরোয়াভাবে কাজী ডাইকা করবো। তাতেই হের মা রাজি। তাই গেছে গা। একটু পরে আমগো বউ নাতিরা যাইবো।”
“নাজির কই? যাইবো না?”
“না, সারাক্ষণ তো কামেই পইড়া থাহে। মাঝখানে একবার জানি কী হইছিল, সব ছাইড়া দিয়া চুপ হইয়া গেছিলো। এহন আবার দেহি শুরু করছে। ওরে আমি বুঝি না।”
সিরাজ উল্লাহ প্রত্যুত্তর না করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেন। ভিটের পাশের রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া আর তেল মশলার শব্দ আসছে। বড়ো বড়ো কদম ফেলে ওদিকে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন,“নাজিরের বউয়ে কী রান্ধে?”
হঠাৎ অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ শুনে লাফিয়ে ওঠে মিছরি। মাথার ঘোমটা আরেকটু টেনে জড়সড় হয়ে বসে। সিরাজ উল্লাহর দৃষ্টি মেয়েটির দিকেই স্থির। হেসে জিজ্ঞেস করলেন,“কার মাইয়া জানি তুমি? নজরুল নাকি কাশেমের?”
“কাশেম আলী আমার আব্বা।”
“বাপের বাড়িত যাও না?”
“যাই তো।”
“নাজিরে যায় না? শ্বশুরবাড়ির লগে সম্পর্ক কেমন? আগে তো সহ্যই করতে পারতো না।”
“তিনিও যান, তবে থাকেন না। আমার বাপের বাড়ির সবার সাথেই সম্পর্ক ভালো। দাদাজান তো উনাকে খুব পছন্দ করতেন।”
লোকটার অধরের হাসি মিলিয়ে গেলো। অন্যমনস্ক হয়ে বললেন,“তাইলে তো অসুবিধা।”
মিছরি বুঝলো না সেকথা। তাই রান্নায় মনোযোগ দিলো। সিরাজ উল্লাহও হাত-মুখ ধুয়ে চলে গেলেন ঘরে।
রান্না শেষে ভাত, তরকারি ঘরে রেখে গোসল সেরে এলো মিছরি। নাজির কাজ শেষ করে এলো যহরের আজানের পর। এসেই গোসল করল দুই ভাই, নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে উঠতেই দেখা হয়ে গেলো সিরাজ উল্লাহর সঙ্গে। নাজির ভ্রু কুঁচকালো। লোকটা আজ আর আগ বাড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বললো না। না দেখার ভান করে পানি দিয়ে কুলি করে ভেতরে চলে গেলো। নাজির ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“এই মালে ঘনঘন বাড়িত আইতাছে ক্যান?”
নওশাদ আনত স্বরে বললো,“নির্ঘাত কোনো ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। এই জন্যই বলে, শত্রুকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখতে নেই।”
বাঁকা দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো নাজির। রাগে কপালের রগ ভেসে উঠেছে। বললো,“যা মাইরা দিয়া আয়।”
“চলো যাই, জম্পেশ একটা প্রতিশোধ নিয়ে আসি।”
“সবুর কর, ব্যাটা। শত্রু নির্মুল করতে শত্রুর পথই ধরতে হয়। সংখ্যা আর শক্তিতে যে তারা বেশি!”
দুই ভাই কথা বলতে বলতে বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেদের ঘরে চলে গেলো। মিছরি নীরবে বিছানায় বসে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে লোকটা। ঠিক সেভাবেই আচমকা তাকে টেনে নিজের বুকের উপর ফেলল। জিজ্ঞেস করল,“কী দেখো, ময়না পাখি?”
“কিছু না।”
“ক্যান? হঠাৎ আবার কী হইলো?”
“ভালো লাগছে না।”
“ক্যান?”
“জানি না।”
চোখ মেলে তাকালো নাজির। স্ত্রীর সারা মুখে অসংখ্য চুমু দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বললো,“একটা তাল মিছরির দানা আইনা দেই? ভালা লাগবো।”
“মিছরি দানা?”
“হ, পোলাপাইন।”
“কোত্থেকে?”
“তোমার পেট থাইক্যা।”
“ছাড়ুন আমায়।”
“ছাড়লে আম্মা হইবা কেমনে?”
মিছরি উত্তর দেয় না। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে থাকে। বেশ কিছু সময় পেরোনোর পর বললো,“রাতে না ফিরলে খবর আছে। আমি একা একা থাকতে পারবো না।”
“এই জন্যই কইছি পোলাপাইন আইনা দেই। কয়ডা চাও? এক হালি নাকি ডজন? বাড়িডা ভইরা থাকবো। কি যে সুন্দর লাগবো!”
“অসভ্য লোক!”
নাজির হেসে ওঠে। স্ত্রীর লম্বা চুলের ভাজে হাত চালিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। তার সেই ঘুম ভাঙে বিকেলে, আছরের আজানের ধ্বনিতে।
ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আসতেই দেখলো সিরাজ উল্লাহ এখনো যাননি। নওশাদের ঘরে শিকল দেওয়া। কোথাও গিয়েছে হয়তো। ফতুয়া খুলে গায়ে শার্ট জড়ালো নাজির। ঘর থেকে বের হতে হতে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললো,“আমি ছাড়া কেউ ডাকলেও দরজা খুলবা না। মাগরিবের আগেই কাম শেষ কইরা ঘরে খিল দিবা। ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আইয়া পড়মু।”
মিছরি শুধু মাথা নাড়ালো। ফটক পর্যন্ত যেতেই ফরিদা পিছু ডাকলেন,“কই যাস, নাজির?”
নাজির বিরক্ত হলো। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারলো না। তিনি ফের জিজ্ঞেস করলেন,“বাড়িত আইবি কহন?”
“আইজ রাইতে আর আইমু না। ক্যান কিছু লাগবো? পিছন ডাকবেন না।”
“না, কী লাগবো? এমনিই জিগাইলাম। আইবি না ক্যান?”
“মাছ পাহারা দিমু।” নাজির আর দাঁড়ালো না। সোজা হেঁটে চলে গেলো।
ফরিদা চলে এলেন ঘরে। আমিরুল শাহ কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরেছেন। খেয়েদেয়ে কেদারায় বসে আছেন। সিরাজ উল্লাহ তাঁর সামনে বসে হুক্কা টানছেন। বোনকে দেখতেই জিজ্ঞেস করলেন,“গেছে গা?”
“হ, সারারাত বলে মাছ পাহারা দিবো।”
“দিনদিন সাহস বাইড়া যাইতাছে। কাউরে মানে না। এমনকি আমারেও কিনা খোঁচা মারে, হুমকি দেয়!”
“বিয়ার পর থাইক্যা বদলাইছে। আগে আমার কথাই যা হুনতো, সম্মান করতো, সব হিসাব দিতো। অথচ এহন আমারে পাত্তাই দেয় না, কথা কয় না, ডাকলেও হুনে না। ওই মাস্টর বাড়ির মাইনষে আর বউডায় কানপড়া দিতাছে। আমগো বিরুদ্ধে উষ্কানি দিতাছে।”
“দিছো ক্যান বিয়া?”
“আমি দিছি? আটকানোর কম চেষ্টা তো করি নাই।”
“হাতের বাহিরে যাওয়ার আগে সমস্যা উপড়াইয়া ফেলা উচিত।”
“পোলার যেই হেডাম! পারবি? এহন আবার দল ভারী হইছে। নওশাদেরও শহরে ফেরার নাম নাই। কেডায় জানতো এমন হইবো? তেমন কইরা তো মানুষ করি নাই। কেমনে কেমনে যে হইলো? ভাবলেই অস্থির লাগে।”
“আমরা আবার কবে মাইনষের লগে সরাসরি শত্রুতা করি? দুর্বলতায় হাত দিয়া দল কমাইয়া দিলেই হয়।”
ফরিদা ভ্রু কুঁচকালেন। আমিরুল শাহ এতক্ষণ শুধু শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন,“ঘনঘন আওয়া দেইখাই বুঝা যায়, তোমার মতলব ভালা না। গলা ঝাইড়া কাশো, সিরাজ।”
সিরাজ কূটিল হাসলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,“সেই বহু বছর আগে যেইডা করছিলাম, সেইডাই। এতদিন পার হইলো কিন্তু কোনো কাকপক্ষী কী টের পাইছে?”
আঁতকে উঠলেন লোকটা। চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। বললেন,“মুখ সামলাও, সিরাজ। যুগ বদলাইছে। যত হোক নাজির সম্পর্কে তোমার ভাইগ্না লাগে।”
“আপন চাচারাই ভাতিজার ভালা চায় না আর আমি তো চাচীর ভাই! নাজিরের বউডারে দেখলাম গায়ে গতরে, চেহারায় ভালাই সুন্দর। প্রথম দেখায় আমার সোহেলের অনেক মনে ধরছিল। কিন্তু নাজিরে কী করল? ওই মাগীর লাইগা আমার পোলার গায়ে হাত তুললো। সোহেল নারাজ হইছে, আমিও নারাজ। ওয় নাজিরের ডরে এই গেরামে আর ঢুকতে পারে না।”
“তো বেয়াদবি করছে ক্যান? ওয় জানে না নাজির কেমন? লুচ্চামি বাদ দেও। খুন খারাপি আর চাই না। আগের গুলাই না আবার ভারী পইড়া যায়! শান্তি পাই না আর। মাস্টর বাড়ি সরকার বাড়ির লাহান না। খুব শক্তিশালী! বুইড়া মরছে তো কী হইছে? হের পোলারা কম না। হেগো ঘরের গুলারও যেই তেজ!”
“মাইয়ার চরিত্রে তো আগে থাইক্যাই দাগ! বেশির ভাগ মাইনষেও আমনের পক্ষে। করবো কী? কোনো প্রমাণ থাকবো? পরিবেশ, সুযোগ সব আমগো হাতের মুঠোয়। ভবিষ্যতে না আবার ওই মাইয়া আর বংশই আমনের কাল হইয়া দাঁড়ায়?”
“তুমি এইবারও নিজের স্বার্থ চিন্তা করতাছো, সিরাজ। আমি এইসবে নাই।”
“আছিলেন কবে? আমার সোহেলডা বাপ ভক্ত। যা কই সব হুনে। সেই পোলায় একটা আবদার করছে। কেমনে না মিটাইয়া থাকি? অনেকদিন পার হইছে। কী কও, বুবু?”
ফরিদা চুপ করে রইলেন। কিছু ভাবছেন সম্ভবত। সিরাজ উল্লাহ জানেন, বড়ো বোনকে বোঝানো কঠিন কোনো কাজ নয়। এই বোনটা ভাই অন্ত প্রাণ। ওদিকে বিলসকিসটা শয়তান। সারাক্ষণ ভাইকে সন্দেহ করে। দুলাভাইয়ের নিষেধাজ্ঞায় তেমন একটা ওদিকে ঘেঁষতে পারেন না তিনি। যদিও শাহদের মতো ততটা ধনী তারা নয়। ফিসফিস করে বললেন,“এইডাও আরেক নাসরিন, বুবু। তোমার সাজানো সংসার ধ্বংস করতে আইছে। বুইড়া আকবর মিয়া কী এমনি এমনি নাতিন পাঠাইছে? এত ভাইবা লাভ কী? ভালা মাইনষের লাইগা এই দুনিয়া না। এত ভালা মানুষ সাইজা কী পাইছো জীবনে? সমস্যা ডালপালা মেইল্লা গজানোর আগেই গোড়া থাইক্যা উপড়াইয়া ফেলতে হয়। যেমন ফতেহ আলী শাহ আর নাসরিনরে ফেলছিলাম!”
আমিরুল শাহ অশান্ত হয়ে উঠলেন,“এইসব আমার বাড়িত চলবো না। নাজির জানলে সমস্যা বাড়বো, কাউরে ছাড়বো না। ওরে এমনিতেই এক ঘরে কইরা রাখছি, আর কী দরকার?”
“ওয় আমার হাউ** করবো। ওর মতো চুনোপুঁটিরে শেষ করতে সিরাজ উল্লাহর এক হাতই যথেষ্ট। বাপ- মায়ের খবরই জানতে পারলো না আবার বউয়ের খবর জানবো! নিজের কথা ভাবেন। একবার পাপ করলে আর পিছু হটার পথ নাই, দুলাভাই।”
আমিরুল শাহর বুক কেঁপে ওঠে। কী করবেন, বলবেন বুঝে উঠতে পারেন না। সিরাজ উল্লাহ পৈশাচিক হেসে পান গুঁজে দেন মুখে, হাঁক ছেড়ে ডাকেন আব্বাসকে। অথচ তাদের এই নোংরা যড়যন্ত্রের কথা কেউ টের পায় না, জানতে পারে না।
উঠোন থেকে শুকনো কাপড় এনে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখলো মিছরি। জগ, কলসি ভরে কলপাড় থেকে খাওয়ার পানি নিয়ে এলো। সন্ধ্যা নেমেছে বাইরে। গোয়ালের গরুদের পানি দিয়ে, অযু করে ঘরে এসে খিল দিলো দরজায়। মাগরিবের আজান দিতেই নামাজ আদায় করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল টেরই পেলো না। ঘুম ভাঙলো খটখট শব্দে। উঠে বসলো মিছরি। কান পাততেই শুনতে পেলো পাশের ঘরে তালা খোলার শব্দ হচ্ছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“বাইরে কে?”
“আমি নওশাদ, ভাবি।” থেমে পুনরায় বললো,“ভাই বলেছে রাতের খাবার খেয়ে যেতে। তাই খেতে এসেছি।”
“আমি বেড়ে দেবো?”
“প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই বেড়ে নিতে পারবো।”
মিছরি তবুও ঘর থেকে বের হলো। পেটে চাপ পড়েছে, একটু লেট্রিনে যেতে হবে। অযুও করা প্রয়োজন। এই সুযোগে কাজ সেরে আসা যাবে। নওশাদ তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,“ভাত খেয়েছেন, ভাবি?”
“না, উনি এলে খাবো।”
“আচ্ছা, আমি খেয়েই চলে যাবো। দরজা খুলবেন না। কার মনে কী আছে কে জানে?”
মিছরি মাথা নাড়িয়ে হারিকেন নিয়ে কলপাড়ের দিকে চলে যায়। নিজের কাজ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে নামাজে বসে। পুনরায় শুনতে পায় তালা লাগানোর শব্দ। মনে হয়, নওশাদ চলে গিয়েছে।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হতে লাগলো। তাল মিলিয়ে বাড়তে লাগলো ঠান্ডা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে লেপ মুড়ি দিয়ে বিছানায় পূর্বের মতো শুয়ে রইল মিছরি। আচমকাই নিস্তব্ধ নিশীথে দরজায় ঠক্ ঠক্ আওয়াজ হলো। মিছরি শব্দ করল না। নাজির এলে সর্বপ্রথম নাম ধরে ডাকে, তারপর দরজায় কড়া নাড়ে। তার সাড়া না পেয়ে বাইরে থেকে ভেসে এলো নারী কণ্ঠের ডাক,“বউ! ঘুমাইয়া পড়ছো? ও বউ!”
কণ্ঠস্বর চিনতে অসুবিধা হয় না মিছরির। ফরিদার ডাক এটা। স্বামী কারো ডাকে সাড়া দিতে নিষেধ করে দিয়েছে। তাই চুপ রইল। কিন্তু ফরিদা যেন হার মেনে নিতে চাইলেন না। জোরে জোরে দরজায় করাঘাত করতে লাগলেন। ডাক বৃদ্ধি পেলো। যেন দেরি হলেই দরজা ভেঙে ঢুকে পড়বে। বাধ্য হয়েই দরজার নিকটে গিয়ে দাঁড়ালো মিছরি। গলা উঁচিয়ে বললো,“বড়ো চাচী?”
“আরে হ, বড়ো চাচী। কহন ধইরা ডাকতাছি? জামাই থুইয়া এত কীয়ের ঘুম? দরজা খোলো।”
“কোনো প্রয়োজন?”
“প্রয়োজন ছাড়া তোমার কাছে আইমু ক্যান? তোমার ভাসুরে বউ, পোলাপাইন লইয়া তোমার ছুডো চাচীর বাপের বাড়ি গেছে নাজমুলের বিয়া খাইতে। নিজ চোখেই তো দেখছো। বাড়িত আমি ছাড়া আর কেউ নাই। একলা একলা ডরও লাগে। একটু খোলো।”
তখন কলপাড়ে যেতেই ভেতর থেকে কথার আওয়াজ শুনেছিল সে। তারা কী চলে গিয়েছে? ফের কড়া নড়লো, ডাক এলো। ভাববার আর সময় পেলো না মেয়েটি। বয়সই বা তার কত? বয়সে এত বড়ো নারীর মনের কুটিলতা বুঝা কী তার মতো কিশোরীর পক্ষে সম্ভব? তাই খুলে দিলো দরজা।
ফরিদা হাসলেন। কেমন বিদঘুটে, নোংরা সেই হাসি! বাইশ বছর আগের মতোই ঠেলেঠুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তবে আজ শিকার ভিন্ন। তাঁর পিছুপিছু এলো সোহেল। অদূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে দুটো অবয়ব। তাদের চিনতে তেমন অসুবিধা হলো না মেয়েটার। আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“উনি এখানে! আপনি না বললেন বাড়িতে কেউ নেই?”
“আমি আছি, ভাবিজান। আমনে একলা হুইনাই মনডা খারাপ হইয়া গেলো। তাই সঙ্গ দিতে আইছি।”
সোহেল হেসে বললো। ফরিদা তাকে তাড়া দিলেন,“যা করার তাড়াতাড়ি কর। আমি বাহিরে আছি।”
সোহেল মুখ ভার করল,“তুমি বাহিরে আছো মানে? শরম করবো না? তোমার শরম না থাকলেও আমার আছে। আব্বা! ফুফুরে লইয়া আমনেরা ভিতরে যান। ভাবির লগে বোঝাপড়া শেষে আমি সব সামলাইয়া নিমু।”
সিরাজ উল্লাহ দূর থেকেই হাসলেন। বোনের উদ্দেশ্যে বললেন,“আমার বাঘের বাচ্চা। তুমি আইয়া পড়ো, বুবু। ও কাম শেষ হইলে ডাক দিবো।”
আসন্ন বিপদ সম্পর্কে বুঝতে আর বাকি রইল না মিছরির। স্বামী, দেবরের সতর্কতা বুঝে গেলো, বুঝে গেলো দরজা খুলে যে সে মারাত্মক ভুল করেছে। কিন্তু না খুলেও যে উপায় ছিল না! এ যেন জামিলের আরেকটি রূপ। আজ তো আশেপাশে নিজের কোনো মানুষ নেই। কে বাঁচাবে তাকে? কম্পিত কণ্ঠে বললো, “কীসব নোংরা কথা বলছেন? মাথা ঠিক আছে? বের হন আমার ঘর থেকে। উনি জানলে কী হবে ভাবতে পারছেন? আপনাদের মেরে ফেলবে।”
“তুমি বাঁচলে তো আমরা মরমু। এইসবে আমগো হাত পাকা। অনেক দেমাগ দেহাইছো, আমগো বিরুদ্ধে গিয়া শাশুড়ির পথে হাঁটছিলা না? আইজ এর মূল্য শোধ করো। এর দায়ভার তোমার বাপ, দাদার।”
ফরিদা চলে গেলেন। মিছরির বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।এই নারীটি কীভাবে তার অনিষ্ট করার কথা ভাবতে পারে? চিৎকার করে বললো,“আমি আপনাকে ভালো মনে করেছিলাম। নারী হয়ে অন্য নারীর সর্বনাশ করার কথা কীভাবে ভাবতে পারেন আপনি? এখনো সময় আছে, এসব বন্ধ করুন। ভালো হবে না কিন্তু।”
যাত্রাপথ পর্ব ৪৮
ফরিদা পিছু ফিরে তাকালেন না। নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে তিনি ভাবেন না। সোহেল দরজার খিল আটকে দিলো। আঁতকে উঠলো মিছরি। কী করবে? কোথায় পালাবে সে? নাজির কোথায়? কেন আসছে না? জানোয়ারটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে, মনে হচ্ছে কোনো এক নরখাদক। কোনো উপায় না পেয়ে মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগলো সে।
