যাত্রাপথ পর্ব ৫৩
মাশফিত্রা মিমুই
দূরের কোনো এক গ্ৰামে নদীর পাড়ে ভেসে উঠেছে অজ্ঞাত, বিভৎস একটি লাশ। ফুলে-ফেঁপে চেহারা বিকৃত, মাংসপিণ্ড খুলে খুলে যাচ্ছে। চেনার উপায়টুকু নেই। লাশ পঁচার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে সেথায়। কারো চোখে আতঙ্ক, আবার কারো চোখে বা নিছক কৌতূহল খেলা করছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পৌঁছাতে বেলা এগারোটা বাজলো। গাড়ি থেকে সশব্দে দরজা খুলে নেমে এলো কয়েকজন পুলিশ। মুহূর্তেই জনতার মধ্যে চাপা গুঞ্জন আরো বেড়ে গেলো।
একজন হাবিলদার সেই উলঙ্গ, বিভৎস লাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। বাকিরা উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। একজন হ্যাংলা মতন যুবক সাহস করে বলে উঠলো,“আমিই প্রথম দেখছি। রোজকার মতন কাইল রাইতেও মাছ ধরতে বাহির হইছিলাম। সারা রাইত মাছ ধইরা ভোরবেলায় কোষা পাড়ে ঠেকাইতেই দেহি পানিত কী জানি একটা ভাসে। সন্দেহবশত হারিকেন লইয়া কাছে গিয়া দেহি লাশ! ডরের চোটে তহনি আশেপাশের জাইল্লাগো ডাক দিয়া জড়ো করলাম। মনে হয়, কেউ মাইরা ফালাইয়া দিয়া গেছে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ছেলেটার শরীর এখনো কাঁপছে, ভয়ে নাকি ঠান্ডায় বুঝা গেলো না। পুলিশ মাথা নাড়িয়ে কলম দিয়ে গটগট করে খাতায় কী যেন লিখলেন। কিছুক্ষণ পর এম্বুলেন্স এসে সেখানে থামলো। দুর্গন্ধ দূর করতে কিছু একটা ছড়ালো। সবকিছু গুছিয়ে লাশ গাড়িতে উঠানোর অভিমুখে কোথা থেকে যেন ভিড় ঠেলে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন সিরাজ উল্লাহ। সঙ্গে তাঁর বড়ো পুত্র সাদ্দাম। সাদ্দামের দৃষ্টি ঢেকে রাখা লাশটার দিকে গিয়ে স্থির হলো। দারোগার উদ্দেশ্যে বললো,“আমার ছুডো ভাই কয়দিন ধইরা নিখোঁজ। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও কোথাও পাই নাই।”
দারোগা বাকি কথা বুঝে গেলেন। বললেন,“লাশ পঁচে গলে গেছে। চেনার আর উপায় নেই। এমনকি শরীরে কোনো চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সনাক্তকরণের জন্য আপনাদের থানায় আসতে হবে। সঙ্গে অবশ্যই নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি এবং পরিচয়পত্র আনবেন।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই এম্বুলেন্স, পুলিশের জিপ মরদেহ নিয়ে স্থান ত্যাগ করল। সিরাজ উল্লাহ মাটিতে বসে পড়লেন। দুদিকে মাথা নেড়ে অসহায় কণ্ঠে বিড়বিড় করলেন,“এইডা আমার সোহেল না। আমার সোহেল মরতে পারে না।”
সাদ্দাম ঠোঁট ফাঁক করে শ্বাস ফেলল। নিজের বুকের ভেতরেও কম অস্থিরতা বইছে না। তবুও পিতার বড়ো ছেলে হওয়ায় নিজের অস্থিরতা লুকিয়ে রেখে তাকে বাহু ধরে বসা থেকে উঠালো সে। বললো,“আমগো থানায় যাইতে হইবো, আব্বা। আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হোক তারপরেই সব বুঝা যাইবো। এহনি আম্মারে কিছু কওয়ার দরকার নাই।”
বাবাকে নিয়ে নিজেদের গ্ৰামে ফিরলো সাদ্দাম। বন্ধ চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসিয়ে রেখে বাড়ি থেকে ভাইয়ের পরিচয়পত্র নিয়ে এলো। তারপর বাপ-ছেলে মিলে চলে গেলো থানায়।
সেখানে গিয়ে প্রথমে নিখোঁজের নালিশ করল। বিভিন্ন তথ্য জমা দিয়ে চলে গেলো হাসপাতালে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করতে করতে সপ্তাহ পেরোলো। এই দিনগুলো লোকটা শুধু একটা দোয়াই করেছেন, এই ছেলে যেন কিছুতেই সোহেল না হয়।
কিন্তু সিরাজ উল্লাহর সেই দোয়া কবুল হলো না। রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেলো, এটাই হচ্ছে সিরাজ পুত্র সোহেল। সংবাদের সত্যতা তিনি মানতে পারলেন না। হাসপাতালে বসেই হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। সাদ্দামের চোখেও অশ্রু। আদরের ভাইটাকে এভাবে লাশ হিসেবে দেখার কথা কখনো কী ভেবেছিল সে?বারণ সত্ত্বেও সোহেলের মরদেহ নিয়ে কাটাছেঁড়া করা হলো। কিন্তু পচন ধরা লাশে আর কীই বা পাওয়া যাবে? সেই বিভৎস লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল পেরিয়ে রাত হলো তাদের। গ্ৰামে পা দিতেই হাওয়ার বেগে সেই সংবাদ ছড়িয়ে গেলো চারিদিকে। শায়লা মাটিতে গড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে পরপর দুইবার জ্ঞান হারালেন। সিরাজ উল্লাহর অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়।
সংবাদ পেয়ে আমিরুল শাহ, ফরিদা আর তাদের দুই পুত্রও তৎক্ষণাৎ ছুটে এলো ফরিদার বাপের বাড়িতে। মুমিনুল শাহ এবং তাঁর পুত্ররা কেউই এলো না। এমনকি নাজিরও না। এলো শুধু নওশাদ। স্বজন হারানো শত্রুর চোখে অশ্রু না দেখলে কী করে হয়?
ফরিদাকে দেখে শায়লা এলোমেলো ছুটে এলেন। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গিয়েছে মহিলার। হেঁচকি তুলে ঘ্যাড়ঘ্যাড় গলায় বললেন,“আপাগো, আমার কী সর্বনাশ হইয়া গেছে দেহেন। ওরা কয় আমার সোহেল নাকি মইরা গেছে, ওইডা নাকি হের লাশ। আমি তো আমার পোলারে চিনি না, আপা। মুখ কই ওর? ধরা যায় না ক্যান?”
ভাই বউকে কী বলে সান্ত্বনা দেবেন ঠিক বুঝতে পারেন না ফরিদা। দুর্বল পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ান সাদা কাফন দিয়ে ঢেকে রাখা লাশের কাছে। সামিউল মুখ থেকে কাফনটা স্বল্প সরাতেই উপস্থিত সকলে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। ফরিদা পড়ে যেতে গিয়েও পড়লেন না। পারভেজ ধরে নিলো মাকে। আমিরুল শাহ এসে শ্যালকের পাশে বসলেন। সাদ্দামের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“কেমনে কী হইছে? মরলো কেমনে? তোরাই বা জানলি কেমনে?”
সাদ্দাম ফুফাকে সবটা খুলে বললো। বেশ কয়েকদিন খোঁজাখুঁজির পর যখন তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিল তখনি লোক মারফত খবর পেলো নদীতে ভেসে ওঠা পরিচয়হীন লাশের। তারপর সন্দেহবশত হাসপাতাল, থানা পুলিশের কাছে দৌড়ে জানা যায় সন্দেহই সত্য। এই অজ্ঞাত লাশ আর কারো নয় বরং সোহেলের। সব ঝামেলা মিটিয়ে কিছুক্ষণ আগে তারা লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
আমিরুল শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সামিউল জিজ্ঞেস করল,“খুন করছে কেউ?”
সাদ্দাম মাথা নাড়ায়,“খুন না করলে শরীরে কোপের দাগ থাকবো ক্যান? পানিত পড়ছে কেমনে? ওয় তো সাঁতার জানা পোলা। শাপলা ভর্তি বিলের এই মাথা থাইক্যা ওই মাথা সাঁতার কাইট্টা বড়ো হইছে। আমার সেই ভাইডা!” কাঁদতে কাঁদতে নাক টানলো সে।
“কাউরে সন্দেহ হয় না?”
“কারে সন্দেহ করমু? শত্রু তো কম নাই। দুইদিন পর পর এর ওর লগে ঝামেলা লাগে। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন আগেও ওই পাড়ার দেলুর লগে হাতাহাতি হইছে। বাজারে কেডায় নাকি হুমকি দিছে। বারবার কইছি, অযথা মাইনষের লগে ঝামেলা করিস না। কিন্তু না, আব্বায় শাসনের বদলে আরো উষ্কানি দিছে। আর হেয়ও উষ্কানি পাইয়া…”
সিরাজ উল্লাহ শুনলেন কী শুনলেন না বুঝা গেলো না। ছেলে হারিয়ে লোকটা একেবারে ভেঙে পড়েছেন। দেখতে অসহায় লাগছে। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করা কী এতই সহজ? অথচ অমানুষ, পাপিষ্ঠ সিরাজ উল্লাহকে আজ এই কঠিন কাজটাই করতে হবে। প্রতিবেশীরা তাকে সহানুভূতি দেখাচ্ছে। কিন্তু তাঁর পাপের কথা যদি জানতে পারতো তাহলে হয়তো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতো এতক্ষণে।
গ্ৰামের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলো। মসজিদের মাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো মৃত্যু সংবাদ। সেই রাতেই অল্প কয়েকজন মানুষ নিয়ে জানাজা পড়িয়ে কবর দেওয়া হলো সোহলকে। সিরাজ উল্লাহ কবরের দিকে তাকিয়ে একা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। নওশাদ নিঃশব্দে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালো। আফসোসের সুরে বিদ্রুপ করে বললো,“চোখের সামনে আপন মানুষদের মরতে দেখলে কত কষ্টই না লাগে! এই কষ্ট সবার জীবনেই আসে, কারো আগে আবার কারো বা পরে।”
ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফিরে তাকালেন তিনি। নওশাদের দৃষ্টি অন্ধকারে কোথাও স্থির। স্বল্প আলোয় কালো চোখ জোড়া হীরের মতো চকচক করছে। মুহূর্তেই যেন তার চোয়াল শক্ত হলো। শিকারি দৃষ্টিতে সিরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো, “আপনি তাও লাশ দেখেছেন, কবর দিতে পেরেছেন। কিন্তু আমরা তো সেটাও দেখতে বা করতে পারিনি। তাহলে বুঝুন, আমাদের কষ্টটা কেমন? আপনার থেকেও বেশি।”
সিরাজ উল্লাহর চোখেমুখে বিস্ময়। নওশাদ নিজ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। দ্বিতীয়বার আর তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে পেলো না। মুচকি হেসে মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে। লোকটা সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। দুর্বল কণ্ঠে ডেকে বললেন,“আমারে ধর, কেউ আমারে ধর।”
সামিউল এসে মামাকে ধরে নিয়ে বাড়ি গেলো। রাতে কেউ ঘুমালো না। শায়লা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে মরার মতো পড়ে রইলেন ঘরের এক কোণায়। ফরিদা ভাই বউয়ের পাশে বসে রইলেন। পাড়া প্রতিবেশীরা দাফন শেষে চলে গিয়েছে। হয়তো সকালে আবার আসবে। আমিরুল শাহ বারান্দায় বসে গভীর ভাবনায় বিভোর। কী হচ্ছে এসব? বিষধর সাপের গর্তে কে হাত ঢোকালো? কার এত বড়ো সাহস? শ্যালক আর স্ত্রীর সন্দেহই কী তবে ঠিক ছিল? নাজির! না, সে হতে পারে না। মানুষ খুন করার মতো সাহস যে তার নেই। এমনকি একা একটা লাশ কীভাবেই বা নদীতে ভাসালো? সন্দেহজনক তেমন কিছুই তো দেখেননি। ভেবে কোনো কূল কিনারা খুঁজে পাননা তিনি। তাহলে কী আরো কোনো শত্রু রয়েছে, যাদের এখনো তিনি চিনতে পারেননি? এখানে এসেই যেন ভাবনার সব সুতো ছিঁড়ে যায়।
রাতটা কোনোমতে কাটলো। পরদিন স্ত্রী, পুত্রদের নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন আমিরুল শাহ।
দুদিন পর খুনের মামলার তদন্তের জন্য থানা থেকে পুলিশ এলো। ঘটনাস্থলে আগেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষ। তাই বাড়ির আশেপাশের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা এলো বনখড়িয়া গ্ৰামের শাহ বাড়িতে। দুপুরের রান্না শেষে যে যার ঘরে অবস্থান করছে। নাজির সবে গোয়ালের গরুদেরকে খাবার দিয়ে গোসল সেরে এসেছে। পুলিশকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো সে। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই পেট মোটা দারোগা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“এইডা সোহেলের ফুফুর বাড়ি না?”
“হ, ওই যে ওই ঘর।” হাতের ইশারায় দেখালো।
শব্দ পেয়ে জাহিদ বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখলো। হঠাৎ পুলিশ দেখে নিজেই গিয়ে ডেকে আনলো বড়ো চাচা-চাচীকে। সাথে বাবার কানেও পৌঁছে দিলো সেই খবর। ফরিদা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। নাজির আর সেখানে দাঁড়ালো না। ঘরে গিয়ে গায়ে পোশাক জড়ালো। নওশাদ দুপুরের খাবার খাচ্ছিলো। সেও হাত ধুয়ে বেরিয়ে এলো।
ভেতরে গিয়ে বসতে বলা হলেও পুলিশ বসলো না। আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ উভয়েই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। মর্জিনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাদের কর্মকান্ড দেখছে। পেছনে কারো অস্তিত্ব টের পেতেই সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন পুত্রবধূকে। দিন তিনেক আগেই বাপের বাড়ি থেকে ফিরেছে মেয়েটা। চাপা স্বরে ধমক দিয়ে বললেন,
“এনে কী? ঘরে যাও।”
শাশুড়ির ভয়ে ঘরে চলে গেলো শিউলি। মুমিনুল শাহ জিজ্ঞেস করলেন,“আমনেরা হঠাৎ এইখানে? কী প্রয়োজনে আইছেন?”
দারোগা আশেপাশে তাকিয়ে এতক্ষণ দেখছিলেন। প্রশ্ন শুনে সেদিকে তাকিয়ে বললেন,“সোহেল হত্যার তদন্তের জন্য এসেছি।”
“লাশ পাওয়া গেছে সেই কোন দূরে, লাশের বাড়িও আটলড়া গেরামে। তাইলে আমগো বাড়িত ক্যান?”
“এটা তার ফুফুর বাড়ি না?”
“না, এইডা আমগো বাড়ি। তার ফুফু এই বাড়ির বউ মাত্র।”
ফরিদা সরু দৃষ্টিতে দেবরের দিকে তাকালেন। পুলিশের উদ্দেশ্যে বললেন,“আমিই হের ফুফু। যা কওয়ার আমারে কন।”
“নিহতের পিতা থানায় মামলা করেছেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে নাকি শেষ এই বাড়িতেই তাকে দেখা গিয়েছিল। সাথে খুনী সন্দেহে একজনের নামও লিখে এসেছেন।”
ফরিদা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মুমিনুল শাহ জিজ্ঞেস করলেন,“শেষ দেখা গেছে তো কী হইছে? দেহেন, এইসব পুলিশি ঝামেলায় পড়তে চাই না। গেরামে আমগো একটা সম্মান আছে। একজনের লাইগা বাকিরা সহ্য করবো ক্যান?”
আমিরুল শাহ জিজ্ঞেস করলেন,“কার নাম কইছে?”
“নাজির শাহ।”
ফরিদা বাদে উপস্থিত সকলে অবাক হলেন। আমিরুল শাহ যেন এমন কিছুরই অপেক্ষা করছিলেন এতক্ষণ। নাজির শুনেছে কথাগুলো। তাই নওশাদকে ইশারায় চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে বললো,“আমিই নাজির শাহ। কেডায় কী নালিশ জানাইছে? কারে কী করছি আমি?”
পুলিশের চোখ এবার এসে থামলো যুবক ছেলেটির দিকে। আপাদমস্তক ভালো করে দেখলো একবার। বললো,“মৃতের পিতা সিরাজ উল্লাহ খুনের আসামি হিসেবে আপনার নামে মামলা করেছেন। আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”
নাজিরের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ নেই। সে স্বাভাবিক, গম্ভীর। চুপ থাকার নির্দেশ দেওয়ার পরেও নওশাদ এগিয়ে এসে বললো,“কেউ মামলা করল আর পুলিশ এসে তাকে আসামি বানিয়ে ধরে নিয়ে গেলো, মামার বাড়ির আবদার নাকি? পুলিশের কাজ আগে তদন্ত করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ জোগাড় করা। প্রমাণ বা আদালত কর্তৃক ওয়ারেন্ট আছে আপনাদের কাছে?”
দারোগার গলার জোর কিছুটা দুর্বল হলো। জিজ্ঞেস করলেন,“আপনি কে?”
“উনার আপন ছোটো ভাই।”
ভাতিজার কথা শুনে মুমিনুল শাহ বেশ সাহস পেলেন বোধহয়। তাই খেঁকিয়ে উঠলেন,“কইলেই হইলো? কথা নাই বার্তা নাই, কেডা না কেডায় নালিশ করছে তাই ধরতে আইয়া পড়ছে। আমগো বাড়ির পোলা সিরাজের পোলারে খুন করবো ক্যান? আমগো সম্পর্কে ধারণা আছে আমনেগো? এই গেরামের নামকরা বংশ আমরা।”
দারোগা পরিস্থিতি সামলানোর উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনারা শান্ত হন, ঠান্ডা মাথায় কথা বলি।”
“সরাসরি আইয়া আসামি বানাইয়া ধইরা নিয়া যাওয়ার কথা কইলে শান্ত থাকমু কেমনে? আমগো গন্ডমূর্খ ভাবছেন? আইন সম্পর্কে জানি না কিছু? এই গেরামের চেয়ারম্যানের লগে আমগো পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক আছে।”
নাজির একপলক বড়ো চাচাকে দেখে ছোটো চাচার দিকে তাকালো। এই লোকটার মতলব সে বুঝতে পারে না। এতকিছুর পরেও সদা নাজিরের পক্ষে কথা বলার জন্য যেন এগিয়ে থাকে। এতে লাভ কী তাঁর? ভাবনা বাদ দিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে পুলিশের উদ্দেশ্যে সে বললো,“আমি ক্যান মারমু, স্যার? তার লগে আমার কী জমিজমা লইয়া কোনো বিবাদ আছিলো? নাকি সে আমার আত্মীয়? বড়ো চাচীর ভাই পুত বইল্যা মাঝেমধ্যে বাড়িত আইতো। আমগো মধ্যে সম্পর্কও ভালা আছিলো। দোকানপাড় গিয়া একটু জিগাইলেই জাইনা যাইবেন। আর আমনে কিনা সরাসরি খুনী বানাইয়া দিলেন?”
“না, তেমন কিছু না। আসলে তিনি অভিযোগ করেছেন… তাই।”
“তাই আমনে কইতে পারেন না। ক্ষমতা আছে বইল্যা তার অসৎ ব্যবহার করা তো উচিত না, স্যার। এমন কইরা অপমান করলে থানায় তো আমগো গিয়াও আমনের বড়ো আফিসারের লগে কথা কইতে হয়।”
বড়ো ভাইয়ের দূরদর্শিতা দেখে অবাক হয় নওশাদ। এত শিক্ষিত হয়েও তো সে অপরাধ করার পর এমন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে না। তবে আমিরুল শাহ একটা কথাও বললেন না। তিনি দর্শক মাত্র। ধরে নিয়ে গেলে যাক, তাতে তাঁর কী? বরং লাভই হবে। ফরিদা মুখ খুললেন,“জমিজমা লইয়া ঝামেলা না থাকলেও, ঝামেলা যে নাই এমন তো না। তুই সোহেলের গায়ে হাত তুলছোস, সবার সামনে মারার হুমকি দিছোস। অস্বীকার করতে পারবি?”
পুলিশের চোখেমুখে কৌতূহল। নাজির মৃদু হেসে বললো,“ক্যান ঝামেলা হইছিল? তালি কী এক হাতে বাজে? নাকি আমি তার বাড়িত গিয়া হুমকি দিয়া আইছিলাম? খুনের হুমকি দিছিলাম? কইলে পুরা কইবেন।”
দারোগা বললেন,“পুরো ঘটনা খুলে বলুন। আমাদের আবার ফিরতে হবে।”
মর্জিনা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। লোহার গেইট ধরে বললেন,“এইটুক ঝামেলা সব বাড়িতই হয়। তাই বইল্যা কেউ কাউরে খুন করে? আমি ওর চাচী। আমি নিজে তহন উপস্থিত আছিলাম। পোলা আর হের বাপ সারাক্ষণ এই বাড়িত পইড়া থাকতো। কেউ আমনের বউ লইয়া খারাপ কথা কইলে কী আমনে বইয়া থাকবেন? তাই এক কথা দুই কথা হইছে। তাও বহু আগে। ধরেন কয়েক মাসও পার হইছে। মারলে তো তহনি মারতো। এতদিন পর এই সামান্য ঘটনা লইয়া কেডায় মারে? হিংসায় বাঁচে না, তাই বাপ-মা মরা পোলাডার ঘাড়ে দোষ চাপাইতে চায়।”
সবকিছুর মাঝে ছোটো জায়ের দখলদারিত্বে বিরক্ত ফরিদা। সে কী জানে এসবের? তবুও ফরিদা আছেন বলেই যেন মাঝখানে বাগড়া দিতে চলে আসতে হবে। মুমিনুল শাহ স্ত্রীকে কিছু বললেন না। উল্টে একমত পোষণ করলেন। নাজির ফটকের দিকে কয়েক পা এগিয়ে বললো,“ব্যক্তিগত কোনো ঝামেলা নাই। এমন কথা কাটাকাটি কত মাইনষের লগেই হয়। এই যে আমার নিজের কতগুলা চাচতো ভাই। তাগোরেও বকি, মারি। তাই বইল্যা কী জানে মাইরা দিমু? যেই পোলা মরছে তার চরিত্র বিশেষ ভালা না। এর ওর থালে মুখ দেওয়া কুত্তা। কয়দিন আগেই তো চত্বর বাজারের এক লোকের বউয়ের লগে পরকীয়া করতে গিয়া ধরা খাইছে। বাজারে বিচারও হইছিল। এই যে আমার বড়ো চাচায় মেম্বর লইয়া গিয়া ছাড়াইয়া আনছে। পূজার মাঝে এক হিন্দু মাইয়ার লগেও নেশা পানি খাইয়া আকাম করছে। তার উপরে জুয়া খেলে, চুরি ডাকাতি করে, জোয়ানকালে হের বাপ দাদারাও করতো। কত হুমকি ধামকি যে অন্যেরে দিছে! তাগো মাঝেই না আবার কেউ!”
কথা শেষ না করে বড়ো চাচীর দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ হাসলো নাজির। ফরিদা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ছেলে কিনা! নাজির দারোগার দিকে হাত নাড়িয়ে বললো,“আইয়েন, হাঁটতে হাঁটতে কথা কই।”
সবার উদ্দেশ্যে আরো কিছু কথা বলে হাবিলদার দুজনকে নিয়ে দারোগা আগে আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। মিছরি স্বামীকে ডাকলো,“এখনো তো খাননি কিছু। খেয়ে যান।”
“আইয়া খামু। নওশাদ বিকালের দিকে ক্ষেতে যাইস একটু।”
নওশাদ বিপরীতে কিছু বললো না। ইচ্ছে করল ভাইয়ের সঙ্গে যেতে, কিন্তু বকবে বলে যেতে পারলো না। মুমিনুল শাহ ভাই-ভাবির উদ্দেশ্যে বললেন,“এই কামডা কী ঠিক হইলো, ভাইজান? তোমার শালারে বুঝাইয়ো। বয়স তো কম হয় নাই। আমগো সম্মান নষ্ট করার পাঁয়তারা করে? আর ভাবি, আমনেরেও কই। এমনিতে তো দেওরের পোলা আমার পোলা কইয়া জান দেন। তাইলে আইজ কী হইলো? এইসব কইরা বিপদ ডাইকা আইনেন না। লোকে জানলে মন্দ কইবো। জোয়ানকালে তো আমগো কম বিপদে ফালান নাই।”
স্ত্রীকে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন তিনি। আমিরুল শাহ নীরবে ত্যাগ করলেন স্থান। ফরিদা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। ইদানিং মাথা কাজ করছে না। কী যে হচ্ছে! সব যেন ভাবনার বাইরে।
নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পুলিশদের মন থেকে সন্দেহ সরিয়ে সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলো নাজির। মিছরি এখনো ভাত নিয়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে। তা দেখে সে হাসলো। শব্দহীন হেঁটে সামনে এসে বসে পড়ল। মিছরি জিজ্ঞেস করল,“কী বললো ওরা? এখনো আপনাকে সন্দেহ করছে?”
নাজির তার কপালের ক্ষতস্থানের দিকে তাকালো। ক্ষত শুকিয়ে গেছে, তবে দাগ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। সামনে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বললো,“যা কানপড়া দিছি! করার তো কথা না।”
“কিন্তু আপনার বড়ো চাচা-চাচী, এমনকি ওই লোকের বাবাও তো সব জেনে গেছে।”
“জানুক, তুমি চিন্তা কইরো না তো। কইছি না, সব ভুইলা যাও। প্রমাণ থাকলে তো কিছু করবো। এহন খাও তাড়াতাড়ি।”
দুজনে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিলো।মসজিদের মাইকে আছরের আজান শুনে ঘর থেকে বের হলো নাজির। সন্ধ্যা হলেই আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে। নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ালো সরিষা ক্ষেতের পাড়। চারিদিকে হলদে ফুল ফোটে আছে। কি সুন্দর যে দেখতে লাগছে! এবারেও ফলন ভালো। বললো,“এই সপ্তাহেই শস্য কাইট্টা শেষ করমু। লাভ মনে হয় ভালাই হইবো।”
“শুনেছি, সরিষা ক্ষেতের জন্য নাকি জমি কিনবে?”
“ভাবছিলাম কিনমু, কিন্তু না কইরা দিছি।”
“কেন? টাকার সমস্যা?”
“না, নিজেগো থাকতে অন্যের জমি ট্যাহা নষ্ট কইরা কিনমু ক্যান?”
“নিজেদের জমি?”
নাজির উত্তর দেয় না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার পরিশ্রমের ফসলের দিকে। নওশাদ ভাইয়ের হেঁয়ালি দেখে অস্থির হলো। আচমকা বলে উঠলো,“অনেক হয়েছে, ভাই। এত অপেক্ষা আর ভালো লাগে না। ওরা আমাদের আর কোনো ক্ষতি করার আগে আমরাই চলো মেরে দেই।”
“কারে?”
“আমিরুল শাহ আর তাঁর স্ত্রী।”
“খাঁচার পাখি কহনো শিকার করতে দেখছোস?”
কথাটা ঠিক বুঝতে পারলো না নওশাদ। প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বড়ো ভাইয়ের দিকে। নাজির দুর্বোধ্য হাসে,“খাঁচার পাখি হয় দুর্বল। সারাদিন যাই করুক, দিনশেষে খাঁচাই তাগো শেষ আশ্রয়স্থল।”
“তাহলে?”
“শিকার করতে হয় বনের পাখি। তাগো নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা বা দুর্বলতা নাই। তারা এক জায়গায় থাকে না, নতুন ডাল আর মালের সন্ধানে পথহীন উইড়া বেড়ায়। তারা হয় হিংস্র, চতুর।”
ভাইয়ের জটিল কথার অর্থদ্বার উদ্ধার করতে সময় লাগে নওশাদের। যখন বুঝতে পারে তখনি অবাক কণ্ঠে বলে,“সিরাজ উল্লাহ!”
অধরের হাসি আরো প্রশস্ত হয় নাজিরের। নওশাদের চোয়াল ততই শক্ত হয়,“তাহলে আর অপেক্ষা কীসের?”
“অপেক্ষা নতুন ধান ঘরে তোলার, কালবৈশাখী ঝড়ে সবকিছু ধ্বংস হওয়ার। ততদিন উড়ুক না হয়।”
“এতদিন!”
“সবুরে মেওয়া ফলে।”
“সহ্য হচ্ছে না আমার।”
“তাইলে আয় একেবারে বড়ো পাখি আগে শিকার করি।”
“বড়ো পাখি?”
“হ, ছুডো পাখি যহন তহন ধরা যাইবো কিন্তু তাগোরে রক্ষা করা, মদদ দেওয়া বড়ো পাখিরে সুযোগ বুইঝা এক থাপায় ধইরা আরেক থাপায় কেল্লাফতে কইরা দিতে হইবো। তাইলেই ছুডো পাখি বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবো।”
“কার কথা বলছো?”
“আমগো প্রিয় চেয়ারম্যান আতা চাচা।”
যাত্রাপথ পর্ব ৫২
নওশাদ চমকায়,“মাথা ঠিক আছে? এত সহজ? সে রাজনীতি করে, ছেলে সাঙ্গপাঙ্গদের ডিঙিয়ে কাছে ঘেঁষাই তো অসম্ভব। যদি সম্ভব হয়ও তবুও কীভাবে? উল্টে ধরা পড়ে যাবো।”
“তোর বুদ্ধিতে করলে ধরা পড়বি, কিন্তু আমার বুদ্ধি জটিল। নাজির শাহ প্রমাণ রাইখা কাম করে না।”
নওশাদের দৃষ্টিতে কৌতূহল জমে। কৌতূহল নাজির ভারি পছন্দ করে। বললো,“গোলামের পুতে জানি কোন দল করে? কয়দিন পর বড়ো সমাবেশ হইবো। সমাবেশ মানে তো বুঝোসই? দলে দলে মারামারি।হের বিরোধী নূরুজ্জামান পরপর দুই ইলেকশনে হাইরা অবস্থা খারাপ। ব্যাডার লগে ভিতরে ভিতরে ঝামেলা আছে। সুযোগ পাইলেই টপকাইয়া দিবো। আমগো কাম শুধু তারে সুযোগ কইরা দেওয়া। কেডায় জানবো বুদ্ধি কার? চেয়ারম্যানের লগে আমগো সম্পর্ক কত্ত ভালা! মারলে একমাত্র লাভ বিপক্ষ দলের।”
নওশাদ অবাক হয়। বড়ো ভাইয়ের বুদ্ধি দেখে গর্বে বুক ভরে ওঠে। এত গভীর ভাবনা কখনো ভেবেছে বলে মনে পড়ে না তার।
