Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১২

যেই তুমি এলে পর্ব ১২

যেই তুমি এলে পর্ব ১২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“ তোমার মেহেদি রিক্ত ভাইয়ার শার্টে লাগল কীভাবে? ”
অকস্মাৎ পরিচিত নারী কণ্ঠটা কর্ণপাত হতেই ঘুরে তাকাল কাইফা। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রোশনী। মুখে স্বাভাবিক হাসি থাকলেও চোখেমুখে মিশে আছে অদ্ভুত এক কৌতূহল। কাইফা এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। যেন কোথা থেকে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তারপর ধীরে গলায় সবটা খুলে বলল,
“ আসলে… কিছুক্ষণ আগে বাগানে ছবি তুলতে গিয়ে আমি রোহানের পেছনে ছুটছিলাম। হঠাৎ কর্নার ঘুরতেই দুর্ঘটনাবসত উনার সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায়। আর না বুঝেই উনার শার্টে হাত দিয়ে ফেলি। তখনই মেহেদিটা লেগে যায়।”
মেয়েটার চোখে মুখে স্পষ্ট অস্বস্তির ছাপ। রোশনী কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ আমি জানতাম, নিশ্চয়ই এমন কিছু হয়েছে। ”
কাইফা মৃদু বিস্ময়ে তাকাল।
“ কিন্তু সবাই তো অন্যরকম ভাবছে…”
রোশনী ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল,
“ মানুষের কাজই হলো না জেনে গল্প বানানো। তুমি ওগুলো নিয়ে ভেবো না। জাস্ট চিল! ইট ওয়াজ এন এক্সিডেন্ট। ”
কাইফা ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। পরিবেশটা হালকা করার জন্য রোশনী আবার বলল,
“ চলো, এখন নিচে চলোও। আর কত ঘরে বসে থাকবে? আমার কয়েকজন বন্ধু এসেছে। ওদেরকে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই
এসো। ”
কাইফা দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলল,
“ এখন নিচে যাব? ”
“ হ্যাঁ, কেন কী হয়েছে?”
“ না এমনিতেই। নিচে তো অনেক লোকজন।”
রোশনী ওর বিষয়টা বুঝতে পারল।
“ তুমি চাইলে নিকাব করে নাও। ”
কথাটা শুনে কাইফা হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তৎক্ষণাৎ হিজাবের সামনের অংশটা আলতো করে টেনে সেফটিপিন লাগিয়ে মুখ ঢেকে নিল সে। মুহূর্তের মধ্যেই রমণীর নাক-মুখ আড়াল হয়ে গেল। শুধু দৃশ্যমান রইল এক জোড়া শান্ত, গভীর, সুনেত্র।

রোশনী কাইফাকে নিয়ে অতিথিদের ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। একজন একজন করে নিজের বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সে। কাইফাও ভদ্রভাবে সবার সঙ্গে সালাম বিনিময় করছে। ওদের কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অর্না বেগম। অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন তিনি।
ঠিক তখনই কয়েকজন ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন তার কাছে।
একজন মৃদু হেসে বললেন,
“ অর্না আপা, ওই নিকাব পরা মেয়েটা কে? আগে তো কখনো দেখিনি। ”
অর্না বেগম দৃষ্টি ঘুরিয়ে কাইফার দিকে তাকালেন। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে সাবলীল গলায় উত্তর করলেন,
“ ও? ওর নাম কাইফা। আমার বোনের মেয়ে। ”
“ ওহ আচ্ছা! আপনার বোনের মেয়েতো দেখছি মাশাআল্লাহ বেশ সুন্দর! ”
আরেকজন বললেন,
“ ওদের বাড়ি কোথায়? পড়াশোনা কতদূর? ”
অর্না বেগম স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“ বাড়ি কুমিল্লা, মাদ্রাসায় পড়ে। ”
একজন ভদ্রমহিলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ ওর কি বিয়ে হয়ে গিয়েছে বা কোথায় ঠিক করা আছে কোনোকিছু? ”
ওনাদের আগ্রহ দেখে অর্না বেগম সংক্ষেপে কাইফার সম্পর্কে সব তথ্য দিলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল। পরক্ষণেই আরেকজন হাসিমুখে বললেন,

“ আপা, একটা কথা বলি? কিছু মনে করবেন না। ”
“ আরে না বলুন! ”
“ আমার বড় ছেলের জন্য এমন একটা মেয়েই খুঁজছি। আপনার বোনের মেয়েকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। মেয়েটার যদি বিয়ে না হয়ে থাকে… তাহলে একদিন ওর অভিভাবকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন? ”
কথাটা শেষ হতে না হতেই আরেকজন হেসে বললেন,
“ আপনি একাই সুযোগ নেবেন নাকি? আপা আমারও কিন্তু আপনার বোনের মেয়েকে অপূর্ব লেগেছে। আপনি চাইলে আমার ভাগ্নের জন্য…”
অর্না বেগম মৃদু হেসে থামিয়ে দিলেন,
“ আহা থামবে! তোমরা তো এখন থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে দিলে! ”
ঠিক সেই সময় পাশ দিয়েই যাচ্ছিল রিক্ত। প্রথমে কথাগুলোতে মন দেয়নি। কিন্তু পরক্ষণেই একেকজনের কথপোকথন কানে আসতেই তার পদক্ষেপ স্থির হয়ে গেল। দৃষ্টি নিজে থেকেই চলে গেল কাইফার দিকে। রোশনীর পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে কথা বলছে সে। কথার ফাঁকে ফাঁকে রমণীর হরিণী আঁখি যুগল মাঝে মধ্যে হেসে উঠছে। যা অত্যধিক আকর্ষণ সৃষ্টি করছে তার নিকাব আবৃত মুখশ্রীজুড়ে।
আশপাশের কিছু ছেলেদের দৃষ্টিও ওর সেই মুখশ্রীতেই নিবদ্ধ। সকলের ভিড়ে তার হিজাবিনী সত্তা যেন এক অদৃশ্য কৌতূহল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। রিক্তের চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এলো। কেন যেন ভালো লাগল না কথাগুলো। মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠল সে।

“ ইনভাইটে এসেছে খেয়ে দেয়ে চলে যাবে। অপরিচিত একটা মেয়েকে নিয়ে এতো আগ্রহের কি আছে? মানে এক নিমিষেই বিয়ে অব্দি চলে গিয়েছে? আজব পাবলিক! ”
ভাবনাটা মাথায় আসতেই নিজেই থমকে গেল।
পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল—
“ আমি এসব নিয়ে ভাবছি কেন? ”
উত্তর মিলল না। তবু অদ্ভুতভাবে আরেকবার চোখ চলে গেল কাইফার দিকে। কিয়ৎক্ষণ শান্ত চোখে রমণীকে নিরীক্ষণ করল মানব। পরপর বিরক্ত নিয়ে স্থান ত্যাগ করল।

কয়েক মিনিট পর—
রোহান চারদিকে কাইফাকে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত প্যান্ডেলের পেছনের দিকটায় এসে পেয়ে গেল। সেখানে এক প্রান্তে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল কাইফা। ওর খানিকটা অদূরে ফ্রেন্ডদের নিয়ে ছবি তুলছে অর্শী ও রোশনী। তাকে বলা হলেও যায়নি সে।
এর মাঝেই রোহান হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,
“ কাইফা আপি! ”
কাইফা ঘুরে তাকাল।
“ কী হয়েছে? ”
“ রিক্ত ভাইয়া তোমাকে ডাকছে। ”
মেয়েটা বিস্মিত হলো। ওভাবেই অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,
“ আমাকে? ”
“ হুম। ভাইয়ার রুমে যেতে বলেছে।”
কাইফার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ কেন? ”
রোহান কাঁধ ঝাঁকাল। শিশুসুলভ কণ্ঠে জবাব দিল,
“ জানি না। শুধু বলেছে, তোমাকে নিয়ে যেতে।”

রমণী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। বিভ্রান্ত মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারছিল না, যাওয়া উচিৎ হবে কিনা? শেষ পর্যন্ত ধীর পায়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে। অতঃপর অজস্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঠেলে দ্বিতীয় তলায় উঠে এল।
রিক্তের কক্ষের দরজাটা আধখোলা ছিল। সে আলতো করে নক করল।
ঠক… ঠক…
ভেতর থেকে ভেসে এলো পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ,
“ কাম ইন। ”
কাইফা পা টিপে ভেতরে প্রবেশ করল। রিক্ত তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।শব্দ পেয়ে ফিরে তাকাল। দু’জনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
প্রথমে কাইফাই মুখ খুলল।

“ আপনি… আমাকে ডেকেছেন? ”
রিক্ত কোনো ভূমিকা না করেই বিছানার ওপর রাখা সাদা শার্টটার দিকে ইশারা করল। শার্টের বুকের বাঁ পাশে এখনো গাঢ় মেহেদির দাগ।
“ শার্টে যে ট্যাগ লাগিয়েছো মনে আছে? ”
কাইফা এক মুহূর্ত শার্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“ আমি তো ইচ্ছে করে লাগাইনি।”
“ জানি। কিন্তু দাগটা তোমার কারণেই লেগেছে।”
মেয়েটা মাথা নিচু করল। অস্বস্তি মাখা কন্ঠে বলল,
“ জ্বি, সেজন্য আ’ম স্যরি! ”
“ স্যরি বললে হবে না। এখন এটা পরিষ্কার করে দাও। ”
কাইফা এবার চোখ তুলে সরাসরি মানুষটার পানে তাকাল।
“ এটা তো মেহেদির দাগ! কিভাবে পরিষ্কার করব?”
“ কীভাবে কি করবে আই ডোন্ট নো! বাট তুমি যেভাবেই হোক দাগটা তুলে দিবে। ”
রমণীর নেত্র যুগল খানিকটা সরু হয়ে এলো।

“ অদ্ভুত তো! এই লোকের কি আর শার্ট নেই? এই একটা শার্টের জন্য বস্ত্রহীন থাকবেন নাকি উনি! ”
“ ক্যান ইউ্য হিয়ার মি? ”
ভাবনায় ছেদ পড়ল মেয়েটার। সময় নিয়ে নিষ্প্রাণ গলায় জবাব দিল,
“ আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। ”
সে শার্টটা হাতে তুলে নিল। রিক্ত শান্ত গলায় ওয়াশরুম দেখিয়ে বলল,
“ গো এহেড। ”
কাইফা আর কিছু না বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর পানির শব্দ ভেসে এলো।

যেই তুমি এলে পর্ব ১১

রিক্ত স্থির চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। পরপর কোটটা তুলে নিয়ে কামরা হতে বেরিয়ে গেল। বাইরে করিডোর দিয়ে কয়েকজন অতিথি আর কাজের লোক যাতায়াত করছিল। একবার সেদিকে তাকিয়ে রিক্ত নিঃশব্দে কিছু একটা ভেবে দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন কাজটা খুবই স্বাভাবিক।
ওয়াশরুমে থাকা কাইফা কিছুই টের পেল না। সে তখন মনোযোগ দিয়ে শার্টের বুকে লেগে থাকা মেহেদির দাগটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। আর বিড়বিড় করে বলছে,
“ পেঁচামুখো লোক একটা! ”

যেই তুমি এলে পর্ব ১২ (২)