রুপুর বিয়ে পর্ব ২৮
Bobita Ray
অথৈ মাকে ঘরে আসতে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসল।
রুমা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
“কী হয়েছে তোর?”
অথৈ হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু না মা।”
“তাহলে সবসময় এত মনমরা হয়ে থাকিস কেন?”
“তোমার দেখার ভুল মা।”
রুমা মেয়েকে আর ঘাঁটাল না। রুমার খুব ইচ্ছে অথৈ রুপুর শ্বশুরবাড়ি থেকে পড়াশোনা করুক। দিনকালের যে অবস্থা। মেয়েটাকে একা এতদূর ছাড়তে সাহস হয় না রুমার। বড্ড ভয় হয়। অথৈয়ের বাবাকে কথাটা এক@@সময় বলতে হবে। মানুষটার যে আত্মসম্মান বোধ। নিশ্চিত রাজি হবে না। তারপরেও একবার বলে দেখলে ক্ষতি কী!
রুপু শাশুড়ীমাকে দেখে টাস্কি খেল। বিড়বিড় করে বলল,
“সর্বনাশ..”
বীথি রানী বিরক্তি চেপে বলল,
“সর্বনাশের কী দেখলে?”
“এত সেজেছেন কেন আপনি? মা আপনি ভার্সিটিতে যাচ্ছেন। কোন বিয়ে বাড়িতে না। এত গয়নাগাটি পরেছেন কেন?”
“ফকিরের মতো যাব নাকি! লোককে দেখাতে হবে না। গয়না গায়ে না পরে হাতে নিয়ে গিয়ে দেখাব নাকি!”
রুপু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
“লোককে দেখানোর জন্য আপনি এত গয়না পরেছেন?”
“অবশ্যই দেখানোর জন্য পরেছি। না দেখলে বুঝবে কীভাবে আমরা বড়লোক।”
“প্লিজ গয়নাগুলো খুলে ফেলুন মা। নাহলে দিনেদুপুরে নির্ঘাত ডাকাতি হয়ে যাবে।”
“হবে না ডাকাতি। আমরা গাড়ি নিয়ে যাব।”
“আমি আজ গাড়িতে যাব না মা। প্রতিদিন যেমন রিকশায় করে যাই। আজও তেমন যাব।”
“তুমি না গেলে না যাবে। গয়না পরে কোনরকম রিস্ক আমি নিতে পারব না।”
“এরজন্যই তো বলছি। গয়নাগুলো খুলে ফেলুন।”
“বার বার এককথা বলোনা-তো। শুনতে বিরক্ত লাগে।”
“থাক আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে না।”
“যেতে হবে না মানে! একশোবার যাব। আমার সাথে একদম নখরা করবে না তুমি। নিজেই আমার হাত-পা ধরে সাধাসাধি করছিলে। যেই দেখলে আমি যেতে রাজি হয়েছি। সুন্দর করে সেজেছি। অমনি পল্টি খেলে। হিংসা হচ্ছে নাকি তোমার?”
“আজব তো। হিংসা হবে কেন? আপনি নায়িকা নাকি?”
বীথি রানী হাতের চুড়ি নেড়েচেড়ে ভাব নিয়ে বলল,
“নায়িকার থেকে কম কিসে। এ্যাই তুমি এখন চলো তো।”
রুপু হতাশ হয়ে বলল,
ঠিকাছে চলুন।”
বীথি রানী কায়দা করে ভ্যানাটি ব্যাগ কাঁধে ঝুলাল। তারপর পানের খিলি মুখে দিয়ে রুপুর পিছুপিছু হাঁটতে লাগল।
রুপু ওর ক্যাম্পাসের সামনে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। বীথি রানীও নামতে নিল। রুপু ইশারায় নামতে মানা করল। এই মেয়ের ভাবভঙ্গি দেখলেই বীথি রানীর আজকাল খুব মেজাজ খারাপ হয়। রাগী কণ্ঠে বলল,
“আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দিচ্ছ না কেন? সরে দাঁড়াও। গাড়িতে বসে থাকার জন্য আমি এখানে আসিনি।”
রুপু ফিসফিস করে বলল,
“ মা সামনে তাকিয়ে দেখুন।”
“কী দেখব। ওখানে কয়েকটা ছেলে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
“ওই ছেলে গুলোকেই তো দেখাচ্ছি মা।”
বীথি রানী ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই বয়সে ছেলে দেখে আমি কী করব। তোমার দেখার শখ হলে তুমি দ্যাখো। ভালো করে দ্যাখো।”
“মা এই ছেলেগুলো বখাটে ধরনের। গাড়ি থেকে এত গয়না পরে নামার পরে যদি গয়নাগুলো কোনভাবে চুরি হয়ে যায়। আমি কিন্তু দায় নেব না মা।”
“দায় নেবে না মানে! তুমি তাহলে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ কেন?”
“কেন নিয়ে এসেছি। পরে বলছি। আপনি বরং গাড়িতে অপেক্ষা করুন। আমি চট করে পরীক্ষাটা দিয়ে আসি।”
রুপু আর বীথি রানীকে কোনকথা বলার সুযোগ না দিয়ে হাঁটা ধরল।
বীথি রানীর একা একা গাড়িতে বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে। বীথি রানী সব গয়না একে একে খুলে ভ্যানাটি ব্যাগে ভরে রাখল। তারপর গাড়ি থেকে নামল। রুপুর ক্যাম্পাসে কতক্ষণ একা একা হেঁটে বেড়াল। না সময় কাটছে না। রুপুর স্যার ম্যামের সাথে দেখা করতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু রুপুর স্যার ম্যাম কোথায় আছে কে জানে! একজন ভদ্রলোক এইদিকেই আসছে। হাতে খাতার একটা বাণ্ডিল দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই রুপুর কোন স্যার হবে। বীথি রানী কী চট করে গয়নাগুলো পরে নেবে? না থাক। গল্প করার ফাঁকে কৌশলে বুঝিয়ে দিতে হবে। বীথি রানী বড়লোক বাড়ির বউ। ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বীথি রানী তেলতেলে হেসে বলল,
“ভালো আছেন?”
ভদ্রলোক বড় বড় চোখ করে বীথি রানীর দিকে তাকাল। ভালো আছেন-এর উত্তর দেবে নাকি ‘আপনি কে?’ জিজ্ঞেস করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ভদ্রলোক ইতস্তত করে বলল,
“আপনি কে? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।”
“আমার বউমা এখানে পড়াশোনা করে। আজ ওর পরীক্ষা। দিনকালের যে অবস্থা। কোথাও ওকে একা ছাড়ি না।”
“ও আচ্ছা।”
“আমার বউমা সম্পর্কে দুটো কথা বলার ছিল।”
“কে আপনার বউমা? মানে নাম কী?”
“রুপু। আরেহ চিনেন না। আপনাদেরই তো ছাত্রী।”
“আমাদের ছাত্রী মানে? কিসে পড়ে, কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ে?”
“সেটা তো আমি বলতে পারব না। আরেহ আমার বউমা রুপুকে চিনেন না। রুপু কী ঠিকমতো ক্লাস করে না? ক্লাস করলে তো চেনার কথা ছিল। নাকি ক্লাস ফাঁকি দেয়?”
“কী সব বলছেন আপনি। কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
“আপনি কিসের শিক্ষক। মানে কী পড়ান?”
“আমি কিছুই পড়াই না।”
“তাহলে কী করেন?”
“আমি পিয়ন।”
বীথি রানী মিইয়ে যাওয়া গলায় মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
“থুত্তুরি আগে বলবেন তো। শুধু শুধু এতকথা বলে সময় নষ্ট করলাম।”
লোকটা বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল। বীথি রানী লোকটার গমন পথের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আপনমনে গজগজ করতে করতে বলল,
“তুই পিয়ন পিয়নের মতো থাকবি ব্যাটা। তুই কেন হেডমাস্টারের মতো সেজেগুজে খাতা হাতে করে ঘোরাঘুরি করছিস।”
ওই তো রুপু আসছে। বীথি রানী হন্তদন্ত পায়ে গাড়ির দিকে চলে গেল। গাড়িতে বসে তাড়াহুড়ো করে গয়নাগাটি পরা শুরু করল। মেয়েগুলো আসার আগে চোখে কী চট করে চশমাটা পরে ফেলবে। মেয়েগুলো গাড়ির কাঁচে টোকা দিয়ে বলল,
“হাই আন্টি?”
বীথি রানী গাড়ি থেকে বের হয়ে বলল,
“ইশ, আজ কী গরম পড়েছে। তোমরা ভালো আছো? তোমাদের পরীক্ষা কেমন হলো?”
“হয়েছে মোটামুটি। চলুন কান্টিনে বসে কথা বলি আন্টি। তার আগে পরিচয় পর্বটা সেরে নেই। আমি মৌ। আমার বামপাশের সুন্দর মেয়েটাকে দেখছেন, ওর নাম অনিমা। আর ওর নাম শীলা। তন্নিরও আপনার সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল। ওর বাবুটার জ্বর দেখে কোনরকমে পাশ মার্ক তুলেই চলে গেছে। আমি রুপু, অনিমা বিবাহিত। শীলার এখনো বিয়ে হয়নি। তবে খুব শীঘ্রই হয়ে যাবে। আন্টি চলুন প্লিজ।”
বীথি রানী ওদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রুপু পেছন থেকে ফিসফিস করে বলল,
“মা গলার হারটা উল্টো করে পরেছেন কেন?”
বীথি রানী দাঁড়িয়ে গেল। হারটা ঠিক করতে করতে বলল,
“এতক্ষণ ঠিক করেও তো দিতে পারতে।”
“আপনার তো আবার মান-অপমান বোধ প্রবল। ওদের সামনে হারটা ঠিক করে দিতে গেলেই তো বলতেন। ওদের সামনে আপনাকে অপমান করার জন্য ইচ্ছে করে কাজটা করেছি।”
“থাক থাক। মেয়েগুলো দেখতেও যেমন সুন্দরী। ব্যবহারও ভালো। তোমার মতো না।”
মৌ বীথি রানীকে বলল,
“আন্টি কী খাবেন বলুন?”
“কিছু খাব না মা। তোমরা খাও। আমি দেখি।”
অনিমা বলল,
“রুপুর মুখে আপনার ব্যাপারে কতকথা শুনেছি। আমাদের তো বিশ্বাসই হতো না। এখন বুঝতে পারছি। রুপু এতদিন যা বলেছে, কমই বলেছে।”
বীথি রানী হতবাক হয়ে সবার দিকে বোকার মতো তাকাল। হায়, ডাইনিটা ওদের কাছে কী কী বদনাম করেছে কে জানে! বীথি রানীর কী এখন কেঁদে ফেলা উচিত? কান্নার অভিনয়টা বীথি রানী অবশ্য ভালোই পারে। কাঁদতে কাঁদতে রুপুর নামে বদনাম করলে কেমন হয়? সমস্যা হচ্ছে রুপুর সামনে বসে রুপুর নামে বদনাম করার মতো সাহস বীথি রানীর নেই। শেষে ডাইনিটা এমন তর্ক জুড়ে দেবে। উল্টো রুপুটা বীথি রানীকে মেয়েগুলোর সামনে আরও বেশি খারাপ বানানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। বীথি রানী ভয়ে ভয়ে বলল,
“রুপু কী এমন বলেছে আমার নামে?”
মৌ একগাল হেসে বলল,
“রুপু বলেছে, ওর শাশুড়ী মায়ের মতো ভালো শুধু ভালো না অতিরিক্ত ভালো শাশুড়ীমা এই গোটা পৃথিবীতে আর দুটো খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
বীথি রানী সন্দিহান গলায় বলল,
“সত্যিই?”
“হ্যাঁ আন্টি। শুধু কী তাই। রুপু প্রায়ই বলে, ও নাকি ইদানীং সংসারটা আপনার ছেলের থেকেও বেশি আপনার সাথে করছে।”
“এসব আবার কী ধরনের কথা?”
“সত্যি বলছি আন্টি, রুপু বলে কী জানেন?”
“কী বলে?”
“রুপু বলে, আমার শাশুড়ী খুব সহজ সরল। ওনার মনের ভেতরে কোনরকম জটিল প্যাঁচ নেই। আমাকে তো একদণ্ড না দেখে থাকতেই পারে না। খেতে গেলে রুপু কোথায়? শুতে গেলে রুপু কোথায়, স্নান করতে গেলে রুপু কোথায়, বেড়াতে গেলে রুপু কোথায়? সারাক্ষণ রুপু রুপু আর রুপু। এলাকায় এমন কোন মানুষ নেই যে তাদের কাছে আমার নামে সুনাম করে না আমার শাশুড়ীমা। আর সারাক্ষণ তো আমার পেছন পেছন ঘুরঘুর করে। আমি কখন কী করছি, কখন কোথায় যাচ্ছি, কখন ঘুমাচ্ছি, কখন খাচ্ছি, কখন কী কাজ করছি। বরের মুখে শোনা, আমার শাশুড়ী মায়ের অবশ্য আগে তেমন অসুখ বিসুখ ছিল না। কিন্তু আমার বিয়ের পরে কীভাবে কীভাবে যে ওনার শরীরে নানান রকমের অসুখে বাসা বেঁধেছে। অসুখ শরীরে আমার কাজকর্ম খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। কাজও করতে চায়। আমিই দেই না করতে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। আর কত! এখন আর আমার মনেই হয় না। আমি ওনার ছেলের সাথে সংসার করতে এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছি। আমার মনে হয়, আমি শাশুড়ী মায়ের সাথেই সংসার করতে এসেছি। ওনি আমার সবকিছু এত খেয়াল করে। আমার বর তার সিকিভাগও করে না। সে না করুক। জীবনে আর কিছু পাই না আর পাই। গিনেসবুকে লিখে রাখার মতো একজন শাশুড়ীমা তো পেয়েছি।”
বীথি রানী কথাগুলো শুনতে শুনতে আনন্দে বিভোর হয়ে গেল। ডাইনিটা ধুর ডাইনি বলা ঠিক হচ্ছে না। রুপুটা সত্যিই কী নিজের বান্ধবীদের কাছে বীথি রানীর নামে এত ভালো ভালো কথা বলেছে? বলবেই তো। ভালো দেখেই তো ভালো বলেছে। বীথি রানী তো আর বাকি দশটা শাশুড়ীর মতো রুপুকে কোনদিন খাওয়া-পরার কষ্ট দেয়নি। এক সংসারে থাকতে গেলে ঘটি-বাটিতে ঠোকাঠুকি লাগেই। সেইসব ঠোকাঠুকি এত ধরতে নেই। তবে সংসারটা শাশুড়ীমায়ের সাথে করছে। এই কথাটা শুনতেই যা একটু দৃষ্টিকটু লাগছে।
বীথি রানী আনন্দ জোয়ারে বেশিক্ষণ ভাসতে পারল না। মৌ বলল,
“আমার শাশুড়ী কী ডাইনির ডাইনি জানেন আন্টি?”
হঠাৎ বীথি রানীর মুখটা চুপসে গেল। হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ছিঃ মা শাশুড়ীর নামে বদনাম করতে হয় না।”
“আপনার কী গায়ে লাগছে আন্টি? না মানে আপনিও তো শাশুড়ী। শাশুড়ী হলে কী হবে। আপনি তো আর আমার শাশুড়ীর মতো খারাপ শাশুড়ী না। আমার শাশুড়ী বিয়ের পর থেকেই আমার সাথে ঝগড়া করে। তা-ও খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। এই যেমন, আমি নাকি বেশি খাই। পড়ার বাহানা দিয়ে কাজ করি না। ঘুমাই বেশি, বাবা-মা আমাকে কিছুই শিখিয়ে-পড়িয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠায়নি। ওনার ছেলের থেকেও আমার নাকি বয়স বেশি। বরের সাথে কেন রাত জেগে গল্প করি। কেন এত বিলাসিতা করি। কোন জিনিস পছন্দ হলেই কিনে ফেলতে হবে নাকি। সংসারের প্রতি আমার কোন মায়া-দয়া নেই। আরও কত কী যে বলে। আমার বাবা-মাকে পর্যন্ত অপমান করতে ছাড়ে না। আমার শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটা লোকের কাছে আমার নামে বদনাম করে করে আমাকে খারাপ বানিয়ে রেখেছে। তাদের সাথে বেশি মিশি না দেখেও আমার শাশুড়ীর কত অভিযোগ। মন্দের ভালো। শাশুড়ীর ছেলেটা ভালো। তার ছেলে জানে, তার মা কতবড় মিচকে শয়তান। তাই আমার সাথে মায়ের কথাশুনে ঝগড়া করে না। উল্টো আমার নামে কিছু বলতে এলে তার মাকেই কথা শুনিয়ে দেয়। যাইহোক,
রুপুর মুখে আপনার প্রশংসা শুনে শুনে বিরক্ত ধরে গিয়েছিল। সারাজীবন দেখে আসছি শাশুড়ী খারাপ। অথচ আমার বান্ধবী জোর গলায় বলে, সব শাশুড়ী খারাপ হয় না। যেমন তার শাশুড়ী। রুপুর মুখে আপনার গল্প শুনে শুনে আপনাকে দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। ইশ, আপনার মতো যদি সব শাশুড়ী মা হওয়ার চেষ্টা করতো। তাহলে শাশুড়ী-বউদের সম্পর্ক কতই না সুন্দর হতো।”
বীথি রানীর লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। রুপু কোন আক্কেলে এই মেয়েগুলোর কাছে ওনার নামে এত ভালো ভালো কথা বলেছে। বীথি রানী তো এতটাও ভালো না। উল্টো বিয়ের দিন থেকে রুপুকে কোন না কোনভাবে জ্বালাচ্ছে। এরথেকে মেয়েগুলোর কাছে বদনাম করলেই তো বেশি ভালো হতো। অন্তত মেয়েগুলোর কাছে রুপুর নামে দুটো মন্দ কথা জোর
গলায় বলা যেত। এখন এদের মাঝখানে ভালো শাশুড়ীমা সেজে বসে থাকতে হবে। ভালো ফ্যাসাদে পড়া গেল তো। দ্যাখো দ্যাখো.. রুপুটা আবার মিটিমিটি হাসছে। বীথি রানী কটমট চোখে রুপুর দিকে তাকাল। রুপু শাশুড়ীমাকে একচোখ টিপে শব্দ করে হেসে ফেলল। বীথি রানী বিস্ফোরিত চোখে রুপুর দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কী দিনকাল পড়ল রে বাবা। বজ্জাত মেয়েটা মায়ের বয়সী শাশুড়ীমাকে চোখটিপ দিচ্ছে। আবার দ্যাখো, কেমন দাঁত বের করে খিকখিক করে হাসছে। বীথি রানী এত শক একসাথে নিতে পারলে হয়। নির্ঘাত আজ বদহজম হয়ে যাবে।
বীথি রানীর খুব হাসফাস লাগছে। অন্য সময় হলে নিম্ন মানের ফাজলামোর জন্য রুপুকে কড়া করে একটা ধমক দেওয়া যেত। এখন তো আবার ভদ্র শান্তশিষ্ট শাশুড়ীমা সেজে থাকতে হবে৷ যেখানে সারাক্ষণ মুখে মিথ্যা তেলতেলে হাসি ধরে রাখতে হচ্ছে। সেখানে ধমক দেওয়ার কথা ভাবাও তো দুঃস্বপ্ন।
রুপু বলল,
“মা আপনি কিছুই তো মুখে নিলেন না।”
“আমি কিছু খাব না। তোমরা খাও।”
মৌ বলল,
“আন্টি প্লিজ এককাপ চা অন্তত আমাদের সাথে বসে খান।”
নানান রকম খাবারে টেবিল ভরে ফেলেছে। এত খাবার দেখে বীথি রানীর খুব লোভ লাগছে। বিশেষ করে আইসক্রিমের বাটিটা আর গরম গরম সিঙ্গারা দেখে। একি জিভে জল এসে যাচ্ছে। হতচ্ছাড়ি মেয়েগুলো দেখো কেমন গপাগপ খাচ্ছে। বীথি রানীকে আর একবারও সাধছে না। খাবারের সুঘ্রাণে বীথি রানী আর থাকতে না পেরে বলল,
“একটা সিঙ্গারা দাও তো। খেয়ে দেখি কেমন। একি..এ-কি করছ? এত দিও না। খেতে পারব না।”
মৌ বলল,
“আস্তে আস্তে খান আন্টি। আপনার মতো ভালো শাশুড়ীমাকে ইচ্ছে করছে নিজের কলিজাটা কেটে ভুনা করে খাওয়াই।”
বীথি রানীর গা শিরশির করে উঠল। এ আবার কেমন কথার ধরন। বীথি রানী খেতে খেতে বলল,
“মা এভাবে বলতে হয় না৷ মানুষের মাংস খাওয়ার কথা শোনাও পাপ।”
“কথার কথা বললাম আন্টি। আপনার জায়গায় আমার শাশুড়ীমা থাকলে রাক্ষসের মতো গপাগপ গিলত। তারপর বাড়ি গিয়ে ঠিকই বদনাম করতো। ওনার খাওয়ায় কম পড়েছে। কী ধুরন্ধর মহিলা যে আন্টি আপনি না দেখলে বিশ্বাসই করবেন না।”
“তোমরা কী সারাক্ষণই শাশুড়ীর নামে বদনাম করো?”
“আগে করতাম না। কিন্তু শাশুড়ীর মুখে কটুকথা শুনে শুনে এখন ওনার স্টাইলেই ওনার নামে লোকের কাছে বদনাম করি। ওনি যেমন ওনার আত্মীয়র কাছে আমাকে পঁচায়। আমিও তেমন আমার আত্মীয় ও কাছের মানুষের কাছে ওনাকে পঁচাই।”
খাবারের বিল আসতেই মৌ বলল,
“রুপু খুব বড়াই করে বলছিল, আমার শাশুড়ীমা দেখবি তোদের কাউকে বিল দিতেই দেবে না।”
বীথি রানী মনে মনে রুপুর গুষ্টি উদ্ধার করে মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তাইতো..তাইতো আমি থাকতে তোমরা কেন বিল দেবে।”
“না থাক আন্টি। আপনি এই প্রথম আমাদের ক্যাম্পাসে আসলেন। খাবার বিলটা আমাদের দেওয়া উচিত।”
“না না তোমরা খাও। আমি বিল দিয়ে দেব।”
“ঠিকাছে। এত করে দিতে চাচ্ছেন যখন মানা করা উচিত না। বেয়াদবি হয়ে যাবে। এই তোরা আর কেউ কিছু খাবি? আন্টি বিল দেবে বলছে।”
রাক্ষসী গুলো খেতে খেতে পাক্কা পনেরোশো টাকা বিল উঠিয়ে ফেলেছে। রাগে, দুঃখে টাকার শোকে বীথি রানীর শরীরের ভেতরে জ্বলে যাচ্ছে৷ বাপের জন্মে মনে হয় কিছু খায়নি৷ এত অল্প সময়ে এই অবস্থা। এখানে একঘন্টা থাকলে নিশ্চিত গয়না বেচে বিল দিতে হবে।
বীথি রানী উঠে দাঁড়াল। মৌ বলল,
“একি আন্টি আপনি উঠছেন কেন? বসুন প্লিজ। আপনার সাথে তো ঠিকমতো গল্পই করতে পারলাম না।”
“আজ না মা। অন্য একদিন। এই বউমা চলো।”
“আন্টি আর একটু সময় বসুন না। আপনার সাথে দেখা হয়ে যে কী ভালো লাগল। আপনারাই হলেন জাত বড়লোক আন্টি। আপনাদের মনে কোনরকম অহংকার নেই।”
মেয়েগুলোকে আর কোনকথা বলার সুযোগ না দিয়ে বীথি রানী রুপুর হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল।
মেয়েগুলোর চোখের আড়াল হতেই বীথি রানী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রুপুকে চাপা কণ্ঠে বলল,
“এই মেয়েগুলোর সাথে আর জীবনেও মিশবে না তুমি।”
রুপু অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“কেন মা?”
“কেন মানে? মেয়েগুলো কী শয়তানের শয়তান। এত শয়তান অভদ্র মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখিনি। সারাক্ষণ শুধু শাশুড়ীর নামে বদনাম। শাশুড়ীর ছেলে ভালো লাগে। শাশুড়ীকে ভালো লাগে না। এতই যখন খারাপ লাগে। বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি আসিস কেন শয়তানের দল। এবার বুঝতে পারছি। এদের সাথে মিশে মিশেই তুমি খারাপ হচ্ছ।”
“যাহ্ বাবা.. আমি আবার কী করলাম?”
“এখনও কিছু করোনি। করতে কতক্ষণ। দেখা যাবে এদের কাছ থেকে শিখে শিখে আমার নামেও লোকের কাছে বদনাম করবে।”
রুপুর বিয়ে পর্ব ২৭
“আপনি খুব ভালো করেই জানেন মা, এই অভ্যাস আমার নেই। আমি আপনাকে যা বলি সরাসরিই বলি। লুকোছাপা পেছনে কূটকচাল করার অভ্যাস আমার অন্তত নেই।”
“থাক থাক। আর নিজের নামে সাফাই গাইতে হবে না।”
