রুপুর বিয়ে পর্ব ২
Bobita Ray
“তোর চোখ-মুখ এমন শুকনো লাগছে কেন বাবা? রাতে ঘুমাসনি?”
বিনয়ের মা বিথী রানীর কথা শুনে সবাই বিনয়ের মুখের দিকে তাকাল। বিনয় হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ঘুমিয়েছি তো মা।”
“চোখে-মুখে জলের ছিটা দিবি চল।”
অগত্যা বিনয়কে মায়ের পিছুপিছু যেতে হলো। রুপু পুরোটা সময় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চুপটি করে বসে রইল। এইসব সার্কাস দেখতে আর ভালো লাগছে না।
বিনয়ের মা বিনয়কে খুব যত্ন করে খাওয়াচ্ছে। বিনয় অবশ্য একবার বলেছি,
“রুপু তুমিও খেয়ে নাও।”
কেউ রুপুর খাওয়ার কথা শুনে কিছু বলল না। যেন কেউ কথাটা শুনতেই পায়নি। চক্ষু লজ্জার জন্য রুপুও আর ওদের সাথে খেতে বসতে পারল না।
বার বেলায় রুপুর শাশুড়ীমা রুপুর ঘরে এসে বসল। বলল,
“আমার বোনেরা সবাই আজ চলে যাবে। ওরা খুব করে চাইছিল নতুন বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে যেতে। আজ দুপুরের রান্নাটা তুমি করবে।”
রুপু চুপটি করে বসে রইল।
“এভাবে বসে না থেকে দয়া করে রান্নাঘরে চলো। আমার পোড়া কপাল। কী সুন্দর মেয়ে দেখে রেখে এলাম। অথচ গছিয়ে দিল কালী ভূত। ভালো হবে না। আমাদের যারা ঠকিয়েছে তাদের কারো ভালো হবে না।”
ওনার ঘ্যানঘ্যানানি শোনার চেয়ে রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করা অনেক ভালো। ভাগ্যিস রান্নাটা শখের বশে মায়ের কাছ থেকে শিখেছিল রুপু। নাহলে এই রান্না না জানার জন্যও হাজারটা কটু কথা শুনতে হতো।
এই বাড়িতে দুজন কাজের লোক আছে। একজন পার্মানেন্ট আরেকজন প্রতিদিন তিন/চার ঘণ্টা কাজ করে দিয়ে চলে যায়। যে এই বাড়িতে থেকে কাজ করে। তাকে সবাই ময়নার মা বলে ডাকে। ময়নার মা রান্নাঘরেই ছিল। বিথী রানী ময়নার মাকে বলল,
“আজকের রান্নাটা নতুন বউ করবে। তুই বরং সবকিছু দেখিয়ে দে। হাতে হাতে কুটে বেছে দে।
“ আচ্ছা বড়মা।”
বিথী রানী চলে যেতেই ময়নার মা মুখ ঝামটা দিল। একা একাই গজগজ করতে করতে বলল,
“বোনগুলোই বেশি শয়তান। যে তারিখে আসে একটা না একটা শয়তানি বুদ্ধি দিয়ে যায়। এই যে নতুন বউদি হা করে দেখছো কী? কাজে লেগে পড়ো। যা না পারো তা আমার কাছ থেকে ভালো করে শিখে-পড়ে নাও। গুঞ্জন উঠেছে কাজের লোক তাড়িয়ে দেবে। এই সংসারে কী আর এমন কাজ। এই কাজ নাকি তুমি একাই করতে পারবে। আমরা হলাম ঝি। পরের বাড়ি পেটের দায়ে পরে থাকি। না রাখতে চাইলে তো আর জোর করে থাকতে পারব না। এত বড় সংসারের কাজ একা একা কীভাবে কী করবে কে জানে!”
ময়নার মায়ের কথা শুনে রুপু সত্যি সত্যি চমকে উঠল। তবে প্রতিউত্তর করল না।
রুপুর ধারণা ছিল ওর রান্না করা খাবার খেয়ে সবাই প্রশংশায় পঞ্চমুখ হবে। অথচ হলো তার উল্টোটা। শুধু রুপুর শ্বশুর বাদে কম-বেশি সবাই কিছু না কিছু খুঁত ধরল। কারো কাছে লবন বেশি তো ঝাল কম। ঝাল বেশি তো লবন কম। ভাতগুলো বেশি ঝরঝরা হয়ে গেছে। আর একটু নরম হলে ভালো হতো।
রুপুর শাশুড়ী মা খেতে খেতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার হয়েছে পোড়া কপাল। নাহলে বেছে বেছে এমন বউ আমার কপালে জুটবে কেন!”
রুপুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এত অভিযোগ আর ভালো লাগছে না। ও কতদিন ধৈর্য ধরতে পারবে কে জানে!
ওদের বিয়ে উপলক্ষে আসা আত্মীয়-স্বজন একে একে চলে যেতেই বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেল। এত বড় বাড়িতে এখন শুধু রুপুরা তিনজন আছে। রুপু রুপুর শাশুড়ী মা আর ময়নার মা। বিনয় বাবার সাথে শো-রুমে গেছে। বিনয়দের তিনতলা বাড়ির নিচতলা পুরোটা ভাড়া দেওয়া। দোতলা ও তিনতলায় ওরা থাকে। দোতলায় তিনটে শোবার ঘর, একটা ড্রয়িং রুম, দুটো বাথরুম আর একটা ছোট কিচেন। তিনতলার একপাশে বড় রান্নাঘর, রান্নাঘরের একপাশে খাবার টেবিল। সেখানেই ওরা সবাই তিনবেলা ভাত খায়। আরেকপাশে আলাদা ঠাকুরঘর ও ছাদবাগান। বিনয়রা দুই ভাই। বিনয়ের ছোট ভাই অয়ন বছর তিনেক আগে দেশের বাইরে পড়তে গেছে। বিনয় এম.এ পাস করে অনেকদিন বেকার ছিল। কোনো চাকরি-বাকরি না পেয়ে অগত্যা বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছে।
“বউমা…বউমা.. এই ভরসন্ধ্যা বেলা একা একা ছাদে কী করছ তুমি?”
রুপু বলল,
“ছাদটা ঘুরে দেখছি মা।”
“মাথার কাপড় ফেলেছ কেন? তোমার নতুন বিয়ে হয়েছে। গা থেকে এখনো হলুদের গন্ধ যায়নি। কোন বাতাস ভালো কোন বাতাস মন্দ… শিগগিরই ঘরে চলো।”
রুপু কথা বাড়াল না। শাশুড়ী মায়ের সাথে অযথা তর্ক করতে ইচ্ছে করছে না দেখে চুপটি করে নিজেদের শোবার ঘরে চলে গেল।
বিথী রানীও রুপুর পিছুপিছু গেল। খাটের মধ্যিখানে পা তুলে আরাম করে বসে বলল,
“ভালো করে তো দেখতেই পারলাম না। তোমাদের বাড়ি থেকে কী কী গহনা দিয়েছে। দেখি মেয়েকে কী কী গহনা দিয়েছে তোমার বাবা?”
“গহনা গুলো আলমারিতে রাখা আছে মা।”
“নামিয়ে নিয়ে আসো। দেখে চোখ জুড়াই।”
রুপুর একটু ভয় ভয় লাগছে। গহনাগুলো দেখে যদি ওনি আবারও রেগে যান। তাহলে আবারও বচন শুরু করবে। বাড়িতে এইমুহূর্তে ময়নার ছাড়া আর কেউ নেই। যে ওনি রেগে গেলে শান্ত করবে। রুপু নতুন বউ। এখনই ওনার মুখে মুখে তর্ক করতে ইচ্ছে করছে না।
রুপু গহনার বাক্স এনে ওনার সামনে নামিয়ে রাখল। ভদ্রমহিলা খুব আগ্রহ নিয়ে গহনাগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে বলল,
“গলার হারটা সম্ভবত একভরি ওজনের হবে। হাতের বালাও তাই। কানের দুল, আংটি আর নাকফুল মিলিয়ে টোটাল এক ভরি হবে। মোট তিনভরির মতো গহনা আছে। আর গহনা কোথায় বউমা? তোমার বাবা না খুব বড় মুখ করে সাতভরি গহনা দেওয়ার কথা বলেছিল?”
রুপুর মুখটা শুকিয়ে গেল। বিয়ের দিনও এই গহনার জন্য বেশ ভালোই গণ্ডগোল হয়েছে। গণ্ডগোলের মূল হোতা ছিল বিনয়ের মামা-মামী, মেসো-মাসিরা।
রুপুর শ্বশুরের পরিবেশ শান্ত করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এখানে অবশ্য সরাসরি ওনাদের দোষ দেওয়া যায় না। ওনারা রুপুর ছবি দেখে পছন্দ করে মৌখিক ভাবে বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল। ওনাদের তেমন চাওয়া-পাওয়া ছিল না। শুধু বিনয়ের মায়ের ইচ্ছে ছিল শুধু মেয়েটা যেন সাজিয়ে দেয়। রুপুর বাবা বিনয়ের বাড়ি-ঘর ব্যবসা বানিজ্য দেখে এত বেশি পছন্দ করে ফেলল। বড় মুখ করে বলল,
“আপনারা কিছু না নিতে চাইলেও আমার মেয়েকে আমি কম করে হলেও সাতভরি গহনা দিয়ে সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাব।”
ওদের বিয়ে ঠিক হয়ে চারমাস মতো ছিল। রুপুর মা অনেকবার রুপুর বাবাকে বলেছে। গহনা গুলো কিনে ফেলো। ভদ্রলোক স্ত্রীর কথা গায়েই মাখলেন না। বললেন, রুপুর বিয়ের এক সপ্তাহ আগে কেনা যাবে।”
কে জানতো অল্পদিনের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম এমন হু হু করে বেড়ে যাবে। রুপুর মধ্যবিত্ত বাবা সারাজীবনের জমানো সঞ্চয় শেষ করে সাত ভরির জায়গায় মাত্র তিনভরি স্বর্ণ কোনোভাবে জোগাড় করতে পারল। তাছাড়া দেড়শো বরযাত্রী সহ মেয়ের বিয়ে খরচে জলের মতো টাকা চলে গেল।
“এত কী ভাবছ বউমা? এত কম স্বর্ণ দিয়েছে কেন তোমার বাবা? খুব না বড় মুখ করে বলল সাত ভরি স্বর্ণ দিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পাঠাবে। ছোটলোকের জাত।”
রুপু রাগে কাঁপতে কাঁপতে মনে মনে ভয়ংকর একটা গালি দিল বিনয়ের মাকে। গালিটা জোরে দিতে পারলে আর একটু শান্তি লাগতো। নির্ঘাত রুপুর মা দিব্যি কাটিয়ে দিয়েছে। এইবাড়িতে রুপুকে যে যা খুশি বলুক। ভুলেও যেন রুপু কারো মুখে মুখে তর্ক না করে। রুপুর বাবা সারাজীবনের সঞ্চয় শেষ করে রুপুকে বিয়ে দিয়েছে। এখন রুপু যদি চ্যাটাং চ্যাটাং করে সবার কথার যোগ্য জবাব দিয়ে দেয়। তাহলে এরা বিয়েটা ভেঙে দিতেও পারে। রুপুর বিবাহযোগ্য ছোট একটা বোন আছে। ওর জন্য বোনটার ভালো ঘরে বিয়ে হবে না। আর রুপুরও ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যাবে। বড়লোকের বাড়িতে বিয়ে হয়েছে। একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিলে তবেই না জীবনে সুখী হতে পারবে রুপু।
“এই তুমি কথা বলছো না কেন?”
“আমি কিছু জানি না মা।”
“সব জানো তুমি। তোমাদের শিরায় শিরায় শয়তানি বুদ্ধি। আজ আসুক তোমার শ্বশুর বাড়িতে। এতবড় একটা কাণ্ড ঘটে গেছে। অথচ কেউ আমাকে কিছুই বলল না কেন! এর জবাব দিতে হবে।”
বিথী রানী গহনার বাক্সগুলো নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
তখন থেকে ফোনটা তারস্বরে বাজছে। মায়ের ফোন। এমুহূর্তে মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবে ফোনটা ধরা উচিত। ফোনে মাকে কঠিন কিছু কথা বলা উচিত। সবচেয়ে ভালো হতো রুপু যদি মাকে জেদি কণ্ঠে বলতে পারতো। তোমাদের মতো ছোটলোকের জাতের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই মা। আর জীবনেও আমাকে ফোন করবে না।
এই কথাটা ইচ্ছে করলেও কখনো মুখ ফুটে বলতে পারবে না রুপু। মা রুপুকে অসম্ভব ভালোবাসে। রুপুর মুখে এত ভয়ংকর কথা শুনলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করে বসবে মা। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রিসিভ করল।
“হ্যালো মা?”
“মা না। আমি অথৈ। তুই কেমন আছিস দিদি?”
“ভালো আছি।”
“তোর গলাটা এমন লাগছে কেন দিদি? কিছু কী হয়েছে?”
“না কী হবে! ঠাণ্ডা জলে স্নান করে গলাটা বসে গেছে।”
“কেন তোদের বাড়িতে গিজার নেই? বড়লোকের বাড়ি। থাকার কথা তো।”
“আছে তো।”
“তুই ভালো আছিস তো দিদি?”
রুপুর চোখে জল এসে গেল। বলল,
“ভালো থাকব না কেন? খুব ভালো আছি আমি। আমার ভালো থাকার কথা ভেবেই তো বাবা-মা এত বড় ঘরে বেশ ধুমধাম করে বিয়ে দিল।”
রুপুর বিয়ে পর্ব ১
“মা বলছিল, তুই অষ্টমঙ্গলায় কবে আসবি?”
“জানি না। ওর যখন সময় হবে তখন হয়তো যাব। আমি এখন ফোন রাখছি অথৈ। তোর জামাইবাবু এসেছে। আমাকে ডাকছে বোধহয়।”
অথৈ কিছু সন্দেহ করার আগেই মিথ্যা কথা বলে ফোন রেখে দিল রুপু। আজ এই বাড়িতে আরও একবার অশান্তি হবে। আরও একবার রুপুকে অপমানিত হতে হবে। রুপুর নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে।
