রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭
অধরা মিনহা
ইফরাদ হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু হাসি। ফোনের গ্যালারিতে ভেসে আছে তার আর আনতারার সেই সেলফি, যেটা সেদিন আনতারার ফোনে তুলেছিলো। অনেকক্ষণ ধরেই ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইফরাদ। কেন দেখছে, তা সে নিজেও জানে না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারছে, আনতারাকে দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগছে।হঠাৎ গ্যালারি থেকে বের হয়ে ইফরাদ কন্টাক্ট লিস্টে ঢোকে। তারপর একটুও না ভেবে একটা নাম্বারে ক্লিক করে। কেন করছে, সেটাও তার জানা নেই। মন চাইল, তাই করে ফেলল।
ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম, মাই জানা। কিন্তু নামটা ইফরাদের মন ভরাতে পারছে না। ইফরাদ এডিট অপশনে গিয়ে এক মুহূর্তও না ভেবে নামটা বদলে Mine লিখে সেভ করে দেয়। এতক্ষণ যে বিরক্তি কাজ করছিল, মুহূর্তেই সেটা উধাও হয়ে যায়। Mine নামটা দেখেই অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ে ইফরাদের মনে।
ইফরাদ হেসে নিকনেমটা দেখে মনে মনে বলে,
— উমমমমম, এখন লাগছে আমার আমার।
তবে এতটুকু ভালো লাগায় হবে না। মনটাকে আরো হালকা, আরো ফুরফুরে করতে ইচ্ছে হলো। আনতারার সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করা যাক। আনতারার সাথে দুষ্টামি করলে সব বোরিং উড়ে যাবে। যেই ভাবা, সেই কাজ।ইফরাদ হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে আনতারার চ্যাট ওপেন করে। তারপর ভয়েস মেসেজে ক্লিক করে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে,
— এই মন শুধু তোমার, তুমি শুধু আমার। খুঁজে ফিরি আজও তোমাকে বারে বার। ভালোবাসি তোমায়।
গান শেষ হতেই আর দেরি কর না। সঙ্গে সঙ্গে ভয়েস মেসেজটা পাঠিয়ে দেয়। তারপর ফোনের স্ক্রিনের দিকেই চোখ রেখে অপেক্ষা করতে লাগল আনতারার উত্তরের।
তখনি সাফিন কেবিনের দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে বলে,
— স্যার, সব রেডি। মিটিংয়ে সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
ইফরাদ একবার সাফিনের দিকে তাকিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখে। না, এখনো মেসেজটা সিন হয়নি।ইফরাদ ফোনটা পকেটে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর পেরিয়ে মিটিং রুমের সামনে আসে। সাফিন দরজা খুলে দিতেই ইফরাদ দেখে, ভেতরে সবাই উপস্থিত। কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা, বোর্ডের সদস্যরা, সবাই আয়তাকার টেবিল ঘিরে বসে আছেন। সামনে স্মার্ট ইন্টারঅ্যাকটিভ বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইরাইনা।
ইফরাদকে দেখতেই সবাই সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইফরাদ গিয়ে নিজের কিং-সাইজ চেয়ারে বসতেই বাকিরাও আবার বসে পড়ে। ইরাইনা বোর্ডে টাচ করতেই বোর্ডে থাকা তাদের পারফিউমের ছবিটা সরে একটা পিডিএফ ফাইল ভেসে উঠে। সেটার দিকে ইঙ্গিত করে ইরাইরা বলে,
— মাত্র দুই সপ্তাহেই আমাদের পারফিউমের ডিমান্ড একদম আনএক্সপেক্টেড ছিল। মানুষ যেভাবে রেসপন্স করছে, উই আর টোটালি ইমপ্রেসড।
ইরাইনা সামনে দাঁড়িয়ে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে। কিন্তু ইফরাদের সেদিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। ইফরাদ চেয়ারে বসেই সাবধানে পকেট থেকে ফোনটা বের করে। মনটা যেন অস্থির হয়ে আছে। কিছুতেই শান্ত হতে চাইছে না। শুধু আনতারার রিপ্লাই দেখার জন্য বুকের ভেতর কেমন আনচান আনচান করছে। তার পুরো মনজুড়ে এখন প্রেম। বুকের প্রতিটা ধুকপুকানিতে প্রেমেরই অনুভূতি।
এখানে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছে, সেটা দেখলে বোঝার উপায় নেই। বরং ইফরাদকে দেখে মনে হবে, সে অফিসে না, পার্কে এসেছে প্রেম করতে। দিব্যি টেবিলের নিচে ফোন হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে বসে আছে।চ্যাটে ঢুকতেই দেখে, ভয়েস মেসেজটা সিন হয়েছে। এবার ইফরাদের অস্থিরতা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আনতারার রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায় অধীর দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল ইফরাদ। ঠোঁটের কোণে আবারো ফুটে উঠে মৃদু হাসি।
আনতারা বসে কাপড় ভাঁজ করছে। সকালে কাপড় ধুয়েছিল। একটু আগেই বারান্দা থেকে শুকনো কাপড়গুলো এনে গুছিয়ে ভাঁজ করতে বসেছে। ঠিক তখনি পাশে রাখা ফোনটা নোটিফিকেশনের শব্দে বেজে উঠে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে, ইফরাদ একটা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। আনতারা কৌতূহল নিয়ে ভয়েসটা চালু করতেই ভেসে এলো ইফরাদের কণ্ঠ,
— এই মন শুধু তোমার, তুমি শুধু আমার। খুঁজে ফিরি আজও তোমাকে বারে বার। ভালোবাসি তোমায়।
ভয়েস মেসেজটা শুনে আনতারা বিস্ময়ে থমকে গেল। এটা কী পাঠাল ইফরাদ? পরের মুহূর্তেই বিষয়টা বুঝতে না বুঝতেই আনতারার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে মিষ্টি লজ্জামাখা হাসি। ভয়েসটা শেষ হতেই আনতারা আবার প্লে করে। দ্বিতীয়বার আরো মন দিয়ে শুনে। আসলে শুধু গান না, গানের কথাগুলো আনতারার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। আর ইফরাদের কণ্ঠে উচ্চারিত, ‘ভালোবাসি তোমায়’ এই দুইটা শব্দ সরাসরি আনতারার হৃদয়ে গিয়ে ধরা দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর আনতারা গভীর ভাবনায় পড়ে গেল। উত্তরে সে কী বলবে? কী লিখবে?
কিছুক্ষণ ভেবে বাংলিশে টাইপ করে,
— সুন্দর আপনার কন্ঠ।
ইফরাদ টেবিলের নিচে ফোনটা হাতে নিয়ে বসে ছিল, শুধু আনতারার রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায়। এবং আনতারার মেসেজ এলো। মেসেজটা পড়েই ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে ফেলে। এত সাধারণ একটা কমপ্লিমেন্ট? এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু আশা করেছিল ইফরাদ। কী আনরোমান্টিক মেয়ে! এত কষ্ট করে, এত এতো প্রেম নিয়ে গান গেয়ে পাঠানোর পর শুধু একটা সুন্দর কন্ঠ বলে কমপ্লিমেন্ট দিলো?
ইফরাদ ভেবেছিল, আনতারা হয়তো লিখবে, “আমার লজ্জা লাগছে।” তখন সুযোগ বুঝে ইফরাদ আরো একটু টিজ করত। দুজনের মধ্যে জমে উঠতো মিষ্টি একটা মাখোমাখো প্রেমের মুহূর্ত। কিন্তু না, তেমন কিছুই হলো না এই আনরোমান্টিক মেয়েটার জন্য। তবে ইফরাদও এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। মুহূর্তেই ভ্রু দুটো স্বাভাবিক করে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে আবার ভয়েস মেসেজে গেয়ে উঠে,
— পড়লে মনে তোমাকে আর কে আমাকে রাখে?
পাগলামি বলে থাকে লোকজনে।
সাফিন ইফরাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণ ধরে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ইফরাদের সব কাণ্ডকারখানা দেখছে। মিটিং রুমে বসে কেউ বউকে গান গেয়ে পাঠায়? কোন ব্যাটার কাজের সময় এতো মাখোমাখো প্রেম হয় বউয়ের সাথে? না এটা ব্যাটা ইফরাদ। বুঝতে হবে। সামনে দাঁড়িয়ে ইরাইনাও প্রেজেন্টেশন দিতে দিতে ইফরাদের দিকে নজর করে। ইরাইনা বুঝতে পেরেছে, ইফরাদের মনোযোগ এখানে নেই। মাথা নিচু করে টেবিলের নিচে কী যেন করছে ইফরাদ। তবে ঠিক কী করছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
সবকিছু দেখেও ইরাইনা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কারণ সে চায়নি বিষয়টা অন্য কারো নজরে পড়ুক। সবাই তখনো মনোযোগ দিয়ে ইরাইনার কথা শুনছে। এদিকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ইফরাদ আবার মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে অপেক্ষা করতে লাগে আনতারার উত্তরের। আগের মতোই বুকের ভেতর কাজ করছে মিষ্টি কৌতূহল। এবার আনতারা কী উত্তর দেবে? এই প্রেমের আহ্বানে কীভাবে সাড়া দেবে?
আনতারা কাপড় ভাঁজ করতে করতেই আবার ফোনে নোটিফিকেশনের শব্দ পেল। ইফরাদের আরেকটা ভয়েস মেসেজ। ভয়েসটা চালু করতেই একই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
— পড়লে মনে তোমাকে আর কে আমাকে রাখে?
পাগলামি বলে থাকে লোকজনে।
শুনেই আনতারা হালকা শব্দ করে হেসে উঠে। লোকটার পাগলামি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই মানুষটা কি অফিসে কাজ করতে গেছে, নাকি এসব করতেই গেছে? অফিসে বসে কেউ এভাবে গান গেয়ে পাঠায় নাকি? লোকটা সত্যিই পাগল হয়ে গেছে।আনতারা লিখতে গেল,
— পাগল হয়ে গেলেন?
কিন্তু লিখেও পাঠায় না। পরক্ষণেই তার মনে হলো, লোকটার এই পাগলামিতে একটু সায় দেওয়া যায় না?
আসলে এই পাগলামি তার ভীষণ ভালো লাগছে। তার নিজের মনও চাইছে, এই মিষ্টি পাগলামির অংশ হতে।
কিছুক্ষণ ভেবে আনতারাও ভয়েস বাটনে ক্লিক করে। তারপর সুমিষ্ট কণ্ঠে গেয়ে উঠে,
— তাই জানিনা, না জানি হয়ে অভিমানী,
হেরেছি-জিতেছি কে কতো খানি?
এভাবে স্বভাবে করেছি তোমায় আমার।
এতটুকু গেয়েই ভয়েসটা পাঠিয়ে দিল আনতারা। সেন্ড করার পরই বুকের ভেতর ধুকপুক করে কাঁপতে শুরু করে। তবে এই ধুকপুকানি ভয়ের না। অন্যরকম অনুভূতি। হাতও কাঁপছে আনতারার। লজ্জাও লাগছে মারাত্মক। এমন অনুভূতির কারণ সে নিজেও জানে না।
ভয়েস পাঠানোর মিনিট দুয়েক পরই আনতারার রিপ্লাই এসে পৌঁছায় ইফরাদের কাছে। তবে এবার আর মেসেজ না। একটা ভয়েস। আনতারা কী পাঠিয়েছে, সেটা শোনার জন্য ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গেই ভয়েসটা চালু করে। কানে তখন এয়ারপড লাগানো।
প্লে করতেই কানে ভেসে এলো আনতারার সুমিষ্ট কণ্ঠ,
— তাই জানিনা, না জানি হয়ে অভিমানী,
হেরেছি-জিতেছি কে কতো খানি?
এভাবে স্বভাবে করেছি তোমায় আমার।
ব্যাস! ইফরাদ মুহূর্তেই শেষ। প্রচণ্ড খুশিতে ইফরাদের আর মিটিং রুমে বসে থাকার ধৈর্য রইল না। আনতারা যে এমনভাবে উত্তর দেবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
এই একটা ভয়েস মেসেজে ইফরাদের মনে পিয়ার কা লাড্ডু ফুটতে শুরু করে। ইফরাদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— এক্সকিউজ মি। আমি একটু আসছি। তোমরা কন্টিনিউ করো।
সবার দৃষ্টি সামনে থেকে সরে গিয়ে ইফরাদের দিকে স্থির হয়। ইরাইনাও কথা থামিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদের ঠোঁটে লেগে আছে চাপা হাসি।
প্রেমিক যেমন হাসে প্রেমিকার সাথে দুষ্টুমিষ্টি আলাপ করে? তেমন হাসি। ইফরাদের এমন হাসি দেখে সবাই খানিকটা অবাক। ইরাইনাও অবাক। ফোনে কার সঙ্গে চ্যাট করছে ইফরাদ, যে এভাবে হাসছে? এটা কোনো মজার কিছুর হাসি না, এটা নিখাদ প্রেমের হাসি। সবার দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইফরাদ মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে এল। অফিসের এক কোণায় গিয়ে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে, আশেপাশে কেউ আছে কি না। কেউ নেই।
এবার কানের এয়ারপড খুলে ফোনের ভলিউম একটু কমিয়ে আবার আনতারার ভয়েসটা চালু করে। আবারও ভেসে এলো সেই মিষ্টি কণ্ঠ। ইফরাদের খুশির আর বাধ থাকে না। সে জোরেই হেসে উঠে।বিশ্বাসই হচ্ছে না, আনতারা সত্যিই তাকে এই ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। ইফরাদ দুষ্টু হেসে মেসেজ পাঠায় আনতারাকে।
— সত্যি নাকি?
কিছুক্ষণ পরই আনতারার উত্তর এলো,
— কি?
— ওগুলো গানের কথার, নাকি মনের?
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করে,
— আপনারগুলো কি মনের কথা?
— প্রশ্ন আগে আমি করেছি, মাই জানা।
— ভুলে গেছেন? ওয়াইফ ফাস্ট?
ইফরাদ হেসে ফেলে।
— আমার কথা দিয়েই আমাকে প্যাঁচে ফেলছো!
— সে অধিকারও আছে। বউ হই।
— বউ অধিকারের একটা সুযোগও ছাড়ো না।
— আপনার প্রতি অধিকার, ভালোবাসা কিছুই ছাড়ব না আমি।
ইফরাদের ঠোঁটের হাসিটা আরো গভীর হয়ে উঠে।
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬
— তুমি আনতারা তো?
— কী মনে হচ্ছে? অন্য কেউ?
ইফরাদ ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। তারপর দ্রুত টাইপ করে,
— এসে দেখছি, কে তুমি!
